আনআম

উইকিসংকলন থেকে

[সম্পাদনা] সূরা আনআম

রুকুঃ ২০ আয়াতঃ ১৬৫

পরম করুণাময় পরম দয়াময় আল্লাহ্‌র নামে

||১||

১| প্রশংসা আল্লাহ্‌রই যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন আর সৃষ্টি করেছেন আলো ও অন্ধকার। এ সত্ত্বেও অবিশ্বাসীরা তাদের প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করায়।
২। তিনিই তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর একটা কাল নির্দিষ্ট করেছেন। আর একটা নির্ধারিত সময়সীমা আছে যা তিনিই জানেন; তবু তোমরা সন্দেহ কর।
৩। তিনিই আকাশ ও পৃথিবীর আল্লাহ্‌। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন। আর তোমরা যা কর তাও তাঁর জানা।
৪। আর তাদের প্রতিপালকের এমন কোনো নিদর্শন তাদের কাছে উপস্থিত হয় না যা থেকে তারা মুখ ফেরায় না।
৫। সত্য যখনই তাদের কাছে এসেছে তারা তা প্রত্যাখান করেছে। যা নিয়ে তারা ঠাট্টাবিদ্রূপ করত তার সংবাদ তারা ভালো করেই জানতে পারবে।
৬। তারা কি দেখে না যে, তাদের আগে কত মানবগোষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি? আমি তাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যা তোমাদেরকেও করি নি। আর তাদের ওপর আমি মুষলধারে বৃষ্টি নামিয়েছিলাম ও তাদের নিচে নদী বইয়েছিলাম। তারপর তাদের পাপের জন্য আমি তাদেরকে ধ্বংস করেছি ও তাদের পরে নতুন মানবগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছি।
৭। যদি তোমার কাছে কাগজে লেখা কিতাব ও পাঠাতাম, আর তারা যদি হাত দিয়ে তা স্পর্শ করত, তবু অবিশ্বাসীরা বলত, ‘এ স্পষ্ট জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়’।
৮। আর তারা বলে, ‘তার কাছে কোনো ফেরেশতা পাঠানো হয় না কেন?’ যদি আমি ফেরেশতা পাঠাতাম তা হলে তা তাদের কাজকর্মের শেষবিচার হয়ে যেত, আর তাদেরকে কোনো অবকাশ দেওয়া হ’ত না।
৯। তাকে যদি ফেরেশতা করতাম তবে তাকে মানুষের আকৃতিতেই পাঠাতাম, আর তাদেরকে তেমনি সন্দেহে ফেলতাম যেমন সন্দেহে তারা এখন আছে।
১০। তোমার পুর্বেও অনেক রসুলকে ঠাট্টাবিদ্রূপ করা হয়েছে। অবশেষে তারা যে নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করেছিল তা-ই ঘিরে ফেলেছিল তাদেরকে – যারা বিদ্রূপ করেছিল।

||২||

১১। বলো, ‘পৃথিবীতে সফর করো, তারপর দেখো যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছিল তাদের কী পরিণাম হয়েছিল’।
১২। বলো, ‘আকাশ ও পৃথিবীতে যা আছে তা কার?’ বলো, ‘আল্লাহ্‌রই’। দয়া করাকে তিনি তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। কিয়ামতের দিন তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই একত্র করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে তারা বিশ্বাস করবে না।
১৩। রাত্রি ও দিনে যা-কিছু থাকে তা তাঁরই। আর তিনি সব শোনেন, সব জানেন।
১৪। বলো, ‘আমি কি আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করব? তিনিই জীবিকা দেন কিন্তু তাঁকে কেউ জীবিকা দেয় না’। আর বলো, ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে যেন আমি আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে অগ্রণী হই। আমাকে আরও আদেশ করা হয়েছে তুমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’।
১৫। বলো, ‘আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই তবে আমি ভয় করি মহাদিনের শাস্তি আমার ওপর পড়বে।
১৬। সেদিন যাকে শাস্তি থেকে বাঁচানো হবে তার ওপর তিনি তো দয়া করবেন, আর সে-ই স্পষ্ট সাফল্য’।
১৭। আল্লাহ্‌ যদি তোমাকে কষ্ট দেন তবে তিনি ছাড়া আর কেউ তা দূর করতে পারবে না।
১৮। আর যদি তিনি তোমার ভালো করেন তবে তিনিই তো সর্বশক্তিমান। আর তিনি পরাক্রমশালী নিজের দাসদের ওপর। আর তিনি তত্ত্বজ্ঞানী ও সবজান্তা।
১৯। বলো, ‘সাক্ষী হিসাবে কে সর্বশ্রেষ্ঠ?’ বলো, ‘তোমাদের ও আমার মধ্যে আল্লাহ্‌ই (শ্রেষ্ঠ) সাক্ষী। আর এই কোরান আমার কাছে পাঠানো হয়েছে যেন আমি তোমাদেরকে আর যার কাছে এ পৌঁছবে তাদেরকে এ দিয়ে সতর্ক করি! তোমরা কি এ-সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ্‌র সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যও আছে?’ বলো, ‘আমি সে-সাক্ষ্য দিই না’। বলো, ‘তিনি একমাত্র উপাস্য আর তোমরা যে (তাঁর) শরিক কর আমি তাতে নেই’।
২০। যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে সেরূপ চেনে যেরূপ তাদের সন্তানদেরকে চেনে। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে তারা বিশ্বাস করবে না।


||৩||

২১। আর যে-ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে বা তাঁর নিদর্শনকে প্রত্যাখান করে তার চেয়ে বড় সীমালঙ্ঘনকারী কে? সীমালঙ্ঘনকারীরা অবশ্যই সফলকাম হবে না।
২২। আর যেদিন তাদের সকলকে একত্র করা হবে সেদিন আমি অংশীবাদীদেরকে বলব, ‘যাদেরকে তোমার আমার শরিক মনে করতে তারা আজ কোথায়?’
২৩। তখন তাদের এ বলা ছাড়া অন্য কোনো অজুহাত থাকবে না যে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র শপথ! আমরা তো অংশীবাদী ছিলাম না’।
২৪। দেখো, তারা নিজেরাই নিজেদেরকে কীভাবে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে আর তারা যে মিথ্যা রচনা করত তা কীভাবে তাদের জন্য নিষ্ফল হয়ে যায়।
২৫। আর তাদের মধ্যে কিছু লোক তোমার দিকে কান পেতে থাকে, কিন্তু আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়েছি যেন তারা তা বুঝতে না পারে। আমি তাদেরকে বধির করেছি। আর তারা সমস্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করলেও তাতে বিশ্বাস করবে না, এমনকি তারা যখন তোমার কাছে উপস্থিত হয়ে তর্ক শুরু করে তখন অবিশ্বাসীরা বলে, ‘এ তো সেকালের উপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়’।
২৬। আর তারা অন্যকে তা শুনতে বাধা দেয় ও নিজেরাও তা থেকে দূরে থাকে। আর এভাবে তারা শুধু নিজেদেরই ক্ষতি করে, যদিও তারা তা বোঝে না।
২৭। তুমি যদি দেখতে পেতে যখন তাদেরকে আগুনের পাশে দাঁড় করানো হবে ও তারা বলবে ‘হায়! যদি আমরা ফিরে যেতে পারতাম তবে আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনকে মিথ্যা বলতাম না ও আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম’।
২৮। না, পূর্বে তারা যা গোপন করত তা এখন তাদের কাছে প্রকাশ পেয়েছে আর তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেও, যা করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল আবার তারা তা-ই করত, আর তারাই মিথ্যাবাদী।
২৯। আর তারা বলে, ‘আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন এবং আমাদেরকে আর পুনর্জীবিত করা হবে না’।
৩০। তুমি যদি তাদেরকে দেখতে পেতে, যখন তাদের প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে ও তিনি বলবেন, ‘এই কি প্রকৃত সত্য নয়!’ তারা বলবে, ‘আমাদের প্রতিপালকের শপথ, তা নিশ্চয়ই সত্য’। তিনি বলবেন, ‘তবে তোমরা যে অবিশ্বাস করতে তার জন্য তোমরা এখন শাস্তি ভোগ করো’।

||৪||

৩১। যারা আল্লাহ্‌র সম্মুখীন হওয়াকে মিথ্যা বলেছে তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থ। যখন হঠাৎ ক’রে তাদের কাছে কিয়ামত এসে পড়বে তখন তারা বলবে, ‘হায়! আফসোস যে একে আমরা অবজ্ঞা করেছিলাম’। তাদের পিঠে তারা তাদের পাপের বোঝা বইবে। দেখো, তারা যে বইবে তা খুব খারাপ।
৩২। আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়াকৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়; আর সাবধানিদের জন্য পরকালের আবাসই ভালো; তোমরা কি বোঝ না?
৩৩। আমি জানি এরা যে-কথাবার্তা বলে তা নিশ্চয়ই তোমাকে কষ্ট দেয়, কিন্তু তারা কেবল তোমাকেই মিথ্যাবাদী বলে না, এই সীমালঙ্ঘনকারীরা আল্লাহ্‌র আয়াতকেও অস্বীকার করে।
৩৪। তোমার পূর্বেও অনেক রসুলকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল, কিন্তু তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা ও কষ্ট দেওয়া সত্ত্বেও যে-পর্যন্ত না আমার সাহায্য তাদের কাছে পৌঁছেছিল তারা ধৈর্য ধরেছিল। আর আল্লাহ্‌র বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। রসুলদের কিছু খবর তো তোমার কাছে পৌঁছেছে।
৩৫। তাদের (কাফেরদের) মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই যদি তোমার কাছে বড় মনে হয়, পারলে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বা আকাশে সিঁড়ি লাগিয়ে তাদের জন্য নিদর্শন নিয়ে এসো। আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় সকলকে একসঙ্গে সৎপথে আনতেন। সুতরাং তুমি মুর্খদের মতো হয়ো না।
৩৬। যারা শোনে শুধু তারাই সাড়া দেয়। আর মৃতকে আল্লাহ্‌ পুনরুজ্জীবিত করবেন। তারপর তাঁরই দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।
৩৭। তারা বলে, ‘তার প্রতিপালকের নিকট হতে তার কাছে কোনো নিদর্শন অবতীর্ণ হয় না কেন? বলো, ‘নিদর্শন অবতারণ করতে নিশ্চয় আল্লাহ‌ সক্ষম’। কিন্তু তাদের অনেকেই (এ) জানে না।
৩৮। পৃথিবীতে এমন জীব নেই বা নিজ ডানায় ওড়ে এমন কোনো পাখি নেই যা তোমাদের মতো একটি দল নয়। কিতাবে কোনো কিছু লিখে দিতে আমি ক্রটি করি নি। তারপর তারা সকলে তাদের প্রতিপালকের কাছে একত্রিত হবে।
৩৯। যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা বলে তারা বধির ও মূক, তারা রয়েছে অন্ধকারে। আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা বিপথগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছা তিনি সরল পথে স্থাপন করেন।
৪০। বলো, ‘তোমরা ভেবে দেখো, তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌র গজব পড়লে বা তোমাদের কাছে কিয়ামত উপস্থিত হলে যদি তোমরা সত্য কথা বল, তবে তোমরা কি আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কাউকেও ডাকবে?
৪১। না, শুধু তাঁকেই ডাকবে। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের দুঃখ দূর করবেন। আর তোমরা ভুলে যাবে যাকে তোমরা তাঁর শরিক করতে।

||৫||

৪২। আর তোমার পূর্বেও বহু জাতির নিকট আমি রসুল প্রেরণ করেছি, তারপর তাদেরকে অর্থসংকট ও দুঃখদৈন্য দিয়ে পীড়িত করেছি, যাতে তারা বিনীত হয়।
৪৩। আমার শাস্তি যখন তাদের ওপর পড়ল তখন তারা কেন বিনীত হল না? বরং তাদের হৃদয় কঠিন হয়ে গিয়েছিল এবং তারা যা করছিল শয়তান তাকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল।
৪৪। তাদেরকে যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা যখন তা ভুলে গেল তখন তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে, তাদেরকে যা দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে যখন তারা মত্ত হল তখন হঠাৎ আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম, ফলে তারা তখন নিরাশ হয়ে পড়ল।
৪৫। তারপর সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়ের মূলোচ্ছেদ করা হল। আর প্রশংসা আল্লাহ্‌রই যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।
৪৬। বলো, ‘তোমরা আমাকে বলো, আল্লাহ্‌ যদি তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন ও তোমাদের হৃদয়ে মোহর এটেঁ দেন তবে আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন উপাস্য আছে যে তোমাদেরকে ওগুলো ফিরিয়ে দেবে?’ লক্ষ করো, আমি কেমন নানাভাবে কথাগুলো বর্ণনা করি। তা সত্ত্বেও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।
৪৭। বলো, ‘তোমরা আমাকে বলো, আল্লাহ্‌র শাস্তি অগোচরে বা প্রকাশ্যে তোমাদের ওপর পড়লে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায় ছাড়া আর কে ধ্বংস হবে?’
৪৮। আমি তো রসুলদেরকে সুসংবাদবাহী ও সর্তককারী হিসাবেই পাঠাই, কেউ বিশ্বাস করলে ও নিজেকে সংশোধন করলে তার কোনো ভয় নেই আর সে দুঃখিতও হবে না।
৪৯। যারা আমার নিদর্শনকে মিথ্যা বলেছে সত্যত্যাগের জন্য তাদের ওপর শাস্তি নামবে।
৫০। বলো, ‘আমি তোমাদেরকে বলি না যে আমার কাছে আল্লাহ্‌র ধনভান্ডার আছে। অদৃশ্য সম্পর্কেও আমি জানি না। তোমাদেরকে এ-ও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয় আমি শুধু তা-ই অনুসরণ করি’। বলো, ‘অন্ধ ও চক্ষুস্মান কি সমান? তোমরা কি চিন্তাভাবনা কর না?’

||৬||

৫১। যারা ভ্য় করে যে তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের কাছে এমন অবস্থায় সমবেত করা হবে যে তিনি ছাড়া তাদের কোনো অভিভাবক বা সুপারিশকারী থাকবে না, তাদেরকে তুমি এ (কোরান) দিয়ে সর্তক করো, হয়তো তারা সাবধান হবে।
৫২। যারা তাদের প্রতিপালককে সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টিলাভের জন্য ডাকে তাদেরকে তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না। তাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয়, আর তোমার কোনো কর্মের জবাবদিহির দায়িত্বও তাদের নয় যে তুমি তাদের তাড়িয়ে দেবে, তাড়িয়ে দিলে তুমি সীমালঙ্ঘনকারীদের শামিল হবে।
৫৩। আর এভাবে আমি তাদের এক দলকে অন্য দল দিয়ে পরীক্ষা করেছি যেন তারা বলে, ‘আমাদের মধ্যে কি এদেরকেই আল্লাহ্‌ অনুগ্রহ করলেন?’ আল্লাহ্‌ কি কৃতজ্ঞদের সম্বন্ধে ভালো করে জানেন না?
৫৪। যারা আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে তারা যখন তোমার কাছে আছে তখন তাদেরকে তুমি বোলো, ‘তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের প্রতিপালক দয়া করাকে তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞানতাবশত যদি খারাপ কাজ করে, তারপর তওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে তবে তো আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু’।
৫৫। এভাবে আমি আয়াত বিশদভাবে বর্ণনা করি যাতে অপরাধীদের সামনে পথ প্রকাশিত হয়।


||৭||

৫৬। বলো, ‘তোমরা আল্লাহ্‌ ছাড়া যাদেরকে ডাক তাদের উপাসনা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে’। বলো, ‘আমি তোমাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করি না; করলে আমি বিপথগামী হব ও যারা সৎপথ পেয়েছে তাদের একজন হতে পারব না’।
৫৭। বলো, ‘আমি আমার প্রতিপালকের স্পষ্ট প্রমাণের ওপর নির্ভর করি, অথচ তোমরা তা প্রত্যাখান করেছ। তোমরা যা সত্বর চাচ্ছ তা আমার কাছে নেই। কর্তৃত্ব তো আল্লাহ্‌রই। তিনি সত্য বয়ান করেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ মীমাংসাকারী’।
৫৮। বলো, ‘তোমরা যা সত্বর চাচ্ছ তা যদি আমার কাছে থাকত তবে আমার ও তোমাদের মধ্যকার বিরোধের তো মীমাংসাই হয়ে যেত। আর আল্লাহ্‌ তো সীমালঙ্ঘনকারীদের সম্বন্ধে ভালো করেই জানেন।
৫৯। তাঁরই কাছে রয়েছে অদৃশ্যের চাবি; তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না। জলে-স্থলে যা-কিছু আছে তা তিনিই জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটা পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণা অঙ্কুরিত হয় না বা এমন কোনো রসাল ও শুষ্ক জিনিস যা কিতাবে সুস্পষ্টভাবে নেই’।
৬০। তিনি রাত্রে তোমাদের ঘুম আনেন। আর দিনে তোমরা যা কর তা তিনি জানেন। তারপর তিনিই আবার তোমাদেরকে জাগান যাতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পুরো হয়। তারপর তাঁর দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে তিনিই জানিয়ে দেবেন।


||৮||

৬১। তাঁর দাসদের ওপর তিনি অপ্রতিহত আর তিনিই তোমাদের হেফাজতের জন্য (রক্ষণাবেক্ষণকারী) প্রেরণ করেন। অবশেষে তোমাদের কারও মৃত্যু ঘনিয়ে এলে আমার প্রেরিতরা তার মৃত্যু ঘটায়, আর তারা কোনো কসুর করে না।
৬২। তারপর তাদের প্রকৃত প্রতিপালকের কাছে তাদেরকে আনা হয়। মনে রেখো, হুকুম তো তাঁরই, আর হিসাবগ্রহণে তিনি সবচেয়ে তৎপর।
৬৩। বলো, ‘কে তোমাদেরকে উদ্ধার করে যখন তোমরা স্থল বা সমুদ্রের অন্ধকার থেকে কাতরভাবে ও গোপনে তাঁর নিকট অনুনয় কর, ‘আমাদেরকে এর থেকে উদ্ধার করলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের সামিল হব’।
৬৪। বলো, ‘আল্লাহ্‌ই তোমাদেরকে তার থেকে এবং সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। এ সত্ত্বেও তোমরা তাঁর শরিক কর’।
৬৫। বলো, ‘তোমাদের ওপর বা নিচে থেকে শাস্তি পাঠাতে, তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে বিভিক্ত করতে বা এক দলকে অন্য দলের অত্যাচারের স্বাদগ্রহণ করাতে তিনিই পারেন’। দেখো, আমি কেমন বিভিন্নভাবে আয়াত বয়ান করি যাতে তারা বুঝতে পারে।
৬৬। তোমার সম্প্রদায় তো তাকে মিথ্যা বলেছে, যদিও তা সত্য। বলো, ‘আমি তোমাদের কর্মবিধায়ক নই’।
৬৭। প্রত্যেক বার্তার জন্য নির্ধারিত কাল রয়েছে, আর শীঘ্রই তোমরা তা জানবে।
৬৮। তুমি যখন দেখ তারা আমার নির্দশন নিয়ে নিরর্থক আলোচনায় মেতে আছে তখন তুমি দূরে সরে যাবে যে-পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গে যোগ দেয়। আর শয়তান যদি তোমাকে ভুল করায়, তবে খেয়াল হওয়ার পরে সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবে না।
৬৯। ওদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তাদের নয় যারা সাবধানতা অবলম্বন করে; তবে উপদেশ দেওয়া কর্তব্য যাতে ওরা সাবধান হয়।
৭০। যারা তাদের ধর্মকে ক্রীড়াকৌতুকরূপে গ্রহণ করে আর পার্থিব জীবন যাদেরকে প্রতারিত করে তুমি তাদের সঙ্গ বর্জন করো, আর এ (কোরান) দিয়ে তাদেরকে উপদেশ দাও, যাতে কেউ নিজ কৃতকর্মের জন্য ধ্বংস না হ্য়, যখন আল্লাহ্‌ ছাড়া তার কোনো অভিভাবক ও সুপারিশকারী থাকবে না, আর বিনিময়ে সবকিছু দিলেও তা নেওয়া হবে না। এরাই কৃতকর্মের জন্য ধ্বংস হবে। অবিশ্বাস করার কারণে এদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত গরম পানীয় ও নিদারুণ শাস্তি।

||৯||

৭১। বলো, ‘আল্লাহ্ ছাড়া আমরা কি এমন কিছুকে ডাকব যা আমাদের কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না? আল্লাহ্‌ আমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শনের পর আমরা কি সেই ব্যক্তির মতো আগের অবস্থায় ফিরে যাব যাকে শয়তান পৃথিবীতে পথ ভুলিয়ে হয়রান করেছে, যদিও তার সহচরগণ তাকে পথের দিকে ডাক বলে, ‘আমাদের কাছে এসো’। বলো, ‘আল্লাহ্‌র পথই পথ। আর আমাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ করা হয়েছে।
৭২। আর তোমরা নামাজ পড়ো ও তাঁকে ভয় করো। আর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে সমবেত করা হবে’।
৭৩। তিনি যথাবিধি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যখন তিনি বলেন, ‘হও’, তখন তা হয়ে যায়। তাঁর কথাই সত্য। যেদিন শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে সেদিনকার কর্তৃত্ব তো তাঁরই। অদৃশ্য ও দৃশ্য সবকিছু তাঁর জানা। তিনিই তত্ত্বজ্ঞানী, সব খবর রাখেন।
৭৪। স্মরণ করো, ইব্রাহিম তার পিতা আজরকে বলেছিল, ‘আপনি কি মূর্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভুল করতে দেখছি’।
৭৫। আমি এভাবে ইব্রাহিমকে আকাশ ও পৃথিবীর পরিচালনাব্যবস্থা দেখাই যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের একজন হয়।
৭৬। তারপর রাতের অন্ধকার যখন তাকে ছেয়ে ফেলল তখন নক্ষত্র দেখে বলল, ‘ও-ই আমার প্রতিপালক’। তারপর যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, ‘যা অস্তমিত হয় তা আমি ভালোবাসি না’।
৭৭। তারপর যখন সে চাঁদকে উঠতে দেখল সে বলল, ‘এ আমার প্রতিপালক’। যখন তা অস্তমিত হল, তখন সে বলল, ‘আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ না দেখালে আমি তো পথভ্রষ্টদের শামিল হব’।
৭৮। তারপর যখন সে সূর্যকে উঠতে দেখল তখন বলল, ‘ এ-ই আমার প্রতিপালক। এ সবচেয়ে বড়’। যখন তাও অস্তমিত হল তখন সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যাকে আল্লাহ্‌র শরিক কর, তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই।
৭৯। নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরাচ্ছি যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই’।
৮০। তার সম্প্রদায় তার সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করল। সে বলল, ‘তোমরা কি আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে তর্কে নামবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। আমার প্রতিপালক অন্য ইচ্ছা না করলে তোমরা যাকে তাঁর শরিক কর তাকে আমি ভয় করি না। সবকিছুই আমার প্রতিপালকের জানা, তবু কি তোমরা বুঝবে না?
৮১। তোমরা যাকে আল্লাহ্‌র শরিক কর আমি তাকে কেমন করে ভয় করব? যার বিষয়ে তিনি তোমাদেরকে কোনো সনদ দেন নি তাকে তোমরা আল্লাহ্‌র শরিক করতে ভয় কর না? সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বলো দুই দলের মধ্যে নিরাপত্তা কোন দলের প্রাপ্য।
৮২। যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের বিশ্বাসকে সীমালঙ্ঘন করে কলুষিত করে নি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত’।

||১০||

৮৩। আর আমি আমার এই যুক্তি ইব্রাহিমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের সাথে মোকাবিলা করতে। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময় তত্ত্বজ্ঞানী।
৮৪। আর আমি তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকুব, তার তাদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। পূর্বে আমি নুহ্‌কেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ও তার বংশধর দাউদ, সুলায়মান, আইউব, ইউসুফ, মুসা ও হারুনকেও, আর এভাবেই সৎকর্মপরায়ণদেরকে আমি পুরস্কৃত করি।
৮৫। আর আমি জাকারিয়া, ইয়াহ্‌ইয়া, ঈসা ও ইলিয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম। এরা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভূক্ত।
৮৬। আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাইল, আল-ইয়াসায়া, ইউনুস ও লুতকে। আর তাদের প্রত্যেককে বিশ্বজগতের (সবকিছুর) ওপর আমি শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম।
৮৭। আর তাদের পিতৃপুরুষ, বংশধর ও ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছিলাম, তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম ও সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম।
৮৮। এ আল্লাহ্‌র পথ। নিজের দাসদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এ-পথে পরিচালিত করেন। তারা যদি শরিক করত, তবে তাদের কৃতকর্ম নিষ্ফল হত।
৮৯। এদেরকেই আমি কিতাব, কর্তৃত্ব ও নবুয়ত প্রদান করেছি। তারপর যদি এরা এগুলোকে প্রত্যাখ্যানও করে তবে আমি তো এমন এক সম্প্রদায়ের ওপর এগুলোর ভার অর্পণ করব যারা এগুলো প্রত্যাখ্যান করবে না।
৯০। এদেরকেই আল্লাহ্‌ সৎপথে পরিচালিত করেন, সুতরাং তুমি তাদের পথের অনুসরণ করো। বলো, ‘এর জন্য আমি তোমাদের কাছে পারিশ্রমিক চাই না, এ তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ’।

||১১||

৯১। আর তারা আল্লাহ্‌র যথাযোগ্য মর্যাদা দান করে নি যখন তারা বলে, ‘আল্লাহ্‌ মানুষের কাছে কিছুই অবতীর্ণ করেন নি’। বলো, ‘তা হলে কে সেই কিতাব অবতীর্ণ করেছিল মুসা যা নিয়ে এসেছিল, যা মানুষের জন্য ছিল আলো ও পথনির্দেশ, যা তোমরা কাগজের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করে কিছু প্রকাশ করেছ আর যার বহুলাংশ গোপন করেছ, আর যা এখন তোমাদের শিক্ষা দেয় যা তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা জানতে না?’ বলো, ‘আল্লাহ্‌ই’। তারপর তাদেরকে তাদের নিরর্থক সংলাপের খেলায় মগ্ন হতে দাও।
৯২। আমি কল্যাণময় করে অবতীর্ণ করেছি এই কিতাব যা এর পূর্বেকার কিতাবের সমর্থক আর যা দিয়ে তুমি মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী লোকদেরকে সর্তক কর। যারা পরকালে বিশ্বাস করে তারা এতে বিশ্বাস করে এবং তারা তাদের নামাজের হেফাজত করে।
৯৩। আর যে আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা বানায় বা বলে, ‘আমার কাছে প্রত্যাদেশ হয়’, যদিও তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় না এবং যে বলে, ‘আল্লাহ্‌ যা অবতারণ করেছেন আমিও তার মতো অবতারণ করতে পারি’, তার চেয়ে বড় সীমালঙ্ঘনকারী আর কে? আর যদি তুমি দেখতে পেতে যখন সীমালঙ্ঘনকারীরা মৃত্যুযন্ত্রণায় ভুগবে আর ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে বলবে, ‘তোমাদের প্রাণ বের করো। তোমরা আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে অন্যায় বলতে ও তাঁর নির্দশন সম্বন্ধে অহংকার করতে, তাই আজ তোমাদেরকে অপমানকর শাস্তি দেওয়া হবে’।
৯৪। তোমরা আমার কাছে নিঃসঙ্গ অবস্থায় এসেছ যেমন প্রথমে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম। তোমাদেরকে যা দিয়েছিলাম তা তোমরা পেছনে ফেলে এসেছ। তোমরা যাদেরকে অংশী করতে সেই সুপারিশকারীদেরকেও তোমাদের সাথে দেখছি না। তোমাদের মধ্যেকার সম্পর্ক অবশ্য ছিন্ন হয়েছে, আর তোমরা যা ধারণা করেছিলে তাও নিষ্ফল হয়েছে।

||১২||

৯৫। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ বীজ ও আঁটিকে অঙ্কুরিত করেন। তিনিই মৃত থেকে জীবন্তকে বের করেন ও জীবন্ত থেকে মৃতকে বের করেন। এই তো আল্লাহ‌, সুতরাং তোমরা কোথায় ফিরে যাবে?
৯৬। তিনিই ঊষার উন্মেষ ঘটান। আর তিনিই বিশ্রামের জন্য রাত্রি এবং গণনার জন্য চন্দ্র ও সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন। এসব পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ কর্তৃক সুবিন্যস্ত।
৯৭। আর তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্র সৃষ্টি করেছেন যাতে করে তোমরা তার সাহায্যে স্থলে ও সমুদ্রে অন্ধকারে পথ পাও। জ্ঞানীদের জন্য তিনি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বয়ান করেছেন।
৯৮। আর তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমাদের জন্য স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসস্থান রয়েছে। অনুধাবনকারী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি এ বিশদভাবে বয়ান করেছেন।
৯৯। আর তিনিই আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করেন, তারপর তা দিয়ে তিনি সব রকম গাছের চারা ওঠান; তারপর তার থেকে তিনি সবুজ পাতা গজান, পরে তার থেকে ঘনসন্নিবিষ্ট শস্যদানা সৃষ্টি করেন। আর তিনি খেজুর গাছের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি বের করেন ও আঙুরের বাগান সৃষ্টি করেন, (সৃষ্টি করেন) জয়তুন ও ডালিম, যা একে অন্যের মতো, আবার নয়ও। যখন তাদের ফুল ধরে আর ফল পাকে তখন সেগুলোর দিকে লক্ষ করো; নিশ্চয়ই এগুলোতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।
১০০। আর তারা জিনকে আল্লাহ্‌র শরিক করে, অথচ তিনিই জিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর ওরা অজ্ঞানতাবশত আল্লাহ্‌র প্রতি পুত্রকন্যা আরোপ করে। তিনি মহিমান্বিত। আর ওরা যা বলে তিনি তার ঊর্ধ্বে।


||১৩||

১০১। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, তাঁর সন্তান হবে কেমন করে? তাঁর তো কোনো স্ত্রী নেই, তিনিই তো সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন ও সব জিনিসই তিনি ভালো করে জানেন।
১০২। এই তো আল্লাহ্‌, তোমাদের প্রতিপালক। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি সবকিছুরই স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তাঁর উপাসনা করো; তিনি সবকিছুরই তত্ত্বাবধায়ক।
১০৩। তাঁকে তো দৃষ্টিতে পাওয়া যায় না, বরং দৃষ্টিশক্তি তাঁরই অধিকারে; আর তিনিই সূক্ষ্মদর্শী, সব খবর তাঁর জানা।
১০৪। তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের কাছে প্রত্যক্ষ প্রমাণ তো এসেছে। যে-কেউ তা লক্ষ করবে তা তার নিজের জন্যই করবে, আর কেউ লক্ষ না করলে তাও তার নিজের জন্যই, আর আমি তোমাদের রক্ষক নই।
১০৫। আর আমি এভাবে নিদর্শনগুলো বিভিন্ন প্রকারে বয়ান করি। ফলে, অবিশ্বাসীরা বলে, ‘তুমি এর পূর্ববর্তী কিতাব পড়ে বলছ’। কিন্তু আমি তো জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্টভাবে বয়ান করি।
১০৬। তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার ওপর যা প্রত্যাদেশ হয় তুমি তারই অনুসরণ করো, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। আর অংশীবাদীদের থেকে তুমি দূরে থাকো।
১০৭। আর যদি আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করতেন তবে তারা শরিক করত না। আর তাদের জন্য আমি তোমাকে রক্ষক নিযুক্ত করি নি, আর তুমি তাদের অভিভাবকও নও।
১০৮। আর তারা আল্লাহ্‌কে ছেড়ে যাদেরকে ডাকে তাদেরকে তোমরা গাল দেবে না, তা হলে, তারা (সীমালঙ্ঘন করে) অজ্ঞানতাবশত আল্লাহ্‌কেও গাল দেবে। এভাবে প্রত্যেক জাতির চোখে তাদের কার্যকলাপ শোভন করেছি। তারপর তাদের প্রতিপালকের কাছে তারা ফিরে যাবে। তখন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকার্য সম্বন্ধে জানিয়ে দেবেন।
১০৯। আর তার আল্লাহ্‌র নামে কঠিন শপথ করে বলে, তাদের কাছে যদি কোনো নিদর্শন আসত তবে অবশ্যই তারা বিশ্বাস করত। বলো, ‘নিদর্শন তো আল্লাহ্‌র এখতিয়ারভুক্ত’। আর তাদের কাছে নিদর্শন এলেও তারা যে বিশ্বাস করবে না, এ কিভাবে তোমাদেরকে বোঝানো যাবে?
১১০। আর তারা যেমন প্রথমবারে ওতে বিশ্বাস করে নি তেমনি আমিও তাদের অন্তরে ও নয়নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করব আর অবাধ্যতায় তাদেরকে উদ্‌ভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে দেব।

||১১||

১১১। তাদের কাছে ফেরেশতা পাঠালেও এবং মৃত ব্যক্তিরা তাদের সাথে কথা বললেও এবং সব জিনিস তাদের সামনে হাজির করলেও তারা বিশ্বাস করবে না, কারণ তাদের অধিকাংশই অজ্ঞ।
১১২। আর আমি এভাবে মানুষ ও জিনের মধ্যে শয়তানকে প্রত্যেক নবির শত্রু করেছি, ধোঁকা দেওয়ার জন্য তারা একে অন্যকে চমকপ্রদ কথা দিয়ে উসকানি দেয়। যদি তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন তবে তারা এ করত না। তাই তুমি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যা রচনাকে পরিত্যাগ করো।
১১৩। আর তারা এজন্য প্ররোচিত করে যে, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মন যেন ওর প্রতি অনুরাগী হয় ও ওর প্রতি যেন তারা তুষ্ট হয়, আর তারা যা করে তাতে যেন তারা লিপ্ত থাকরে পারে।
১১৪। বলো, ‘তবে কি আমি আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কাউকে সালিশ মানব? যখন তিনি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট কিতাব অবতীর্ণ করেছেন?’ যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা জানে এ তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে সত্যসহ অবতীর্ণ হয়েছে। তাই যারা সন্দেহ করে তুমি তাদের শামিল হয়ো না।
১১৫। আর সত্য ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে তোমার প্রতিপালকের বাণী সম্পূর্ণ ও তাঁর কথা পরিবর্তন করার কেউ নেই। তিনি সব শোনেন, সব জানেন।
১১৬। আর যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামতো চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা তো কেবল অনুমানের অনুসরণ করে। আর তারা মিথ্যাই বলে।
১১৭। কে তাঁর পথ ছেড়ে বিপথে যায় তা তোমার প্রতিপালক ভালো ক’রেই জানেন। আর কে সৎপথে আছে তাও তিনি ভালো ক’রে জানেন।
১১৮। যদি তোমরা তাঁর নিদশর্নে বিশ্বাস কর তবে যাতে আল্লাহ্‌র নাম নেওয়া হয়েছে তা খাও।
১১৯। আর তোমাদের কী হয়েছে যে যাতে আল্লাহ্‌র নাম নেওয়া হয়েছে তোমরা তা খাবে না, যখন তিনি তোমাদের পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন তোমাদের জন্য কী হারাম, যদি না তোমরা নিরুপায় হও? অনেকে অজ্ঞানতাবশত নিজেদের খেয়ালখুশির দ্বারা অন্যকে বিপথগামী করে। তোমার প্রতিপালক সীমালঙ্ঘনকারীদের সম্বন্ধে ভালো ক’রেই জানেন।
১২০। আর তোমরা প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন পাপ বর্জন করো। যারা পাপ করে তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেওয়া হবে।
১২১। আর যাতে আল্লাহ্‌র নাম নেওয়া হয় নি তা তোমরা খেয়ো না; তা তো অনাচার। আর শয়তান তো তার বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে উসকানি দেয়। যদি তোমরা তাদের কথামতো চল তবে তোমরা তো অংশীবাদী হয়ে যাবে।

||১২||

১২২। যে-লোক মৃত ছিল, যাকে আমি পরে জীবিত করেছি আর যাকে মানুষের মধ্যে চলার আলো দিয়েছি, সেই লোক কি ঐ লোকের মতো যে অন্ধকারে রয়েছে আর সে-জায়গা থেকে বের হতে পারছে না? এভাবে অবিশ্বাসীদের চোখে তাদের কৃতকর্ম শোভন করা হয়েছে।
১২৩। এভাবে প্রত্যেক জনপদে আমি অপরাধীদের প্রধান নিযুক্ত করেছি যেন তারা সেখানে ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু তারা যে শুধু নিজেদের বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করে, তারা তা বোঝে না।
১২৪। আর যখন তাদের কাছে কোনো নিদশর্ন আসে তারা তখন বলে, ‘আল্লাহ্‌র রসুলগণকে যা দেওয়া হয়েছিল আমাদেরকে তা না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কখনও বিশ্বাস করব না’। রিসালাতের দায়িত্ব আল্লাহ্‌ কার ওপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভালো জানেন। যারা অপরাধ করেছে, চক্রান্ত করার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে থেকে তাদের ওপর লাঞ্ছনা ও কঠোর শাস্তি পড়বে।
১২৫। আল্লাহ্‌ কাঊকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাইলে তিনি তার হৃদয় ইসলামের জন্য বড় করে দেন ও কাউকে বিপথগামী করতে চাইলে তিনি তার হৃদয় খুব ছোট করে দেন, তার কাছে ইসলাম মেনে চলা আকাশে চড়ার মতোই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে! যারা বিশ্বাস করে না আল্লাহ্‌ তাদেরকে এভাবে অপদস্থ করেন।
১২৬। আর এটাই তোমাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত সরল পথ। যারা উপদেশ গ্রহণ করে তাদের জন্য আমি নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বয়ান করেছি।
১২৭। তাদের প্রতিপালকের কাছে তাদের জন্য রয়েছে শান্তির নিকেতন, আর তারা যা করত তার জন্য তিনিই তাদের অভিভাবক।
১২৮। আর যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্র করবেন (ও বলবেন) ‘হে জিন সম্প্রদায়! তোমরা অনেক লোককে তোমাদের অনুগামী করেছিলে,’ আর তাদের মানুষ-বন্ধুরা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের মধ্যে কেউ-কেউ অন্যদের দ্বারা লাভবান হয়েছি, আর তুমি আমাদের জন্য যে-সময় নির্ধারিত করেছিলে এখন আমরা তার সামনে এসে গেছি’ সেদিন আল্লাহ্‌ বলবেন, ‘আগুনই তোমাদের বাসস্থান, সেখানে তোমরা চিরদিন থাকবে, যদি না আল্লাহ্‌ অন্যরকম ইচ্ছা করেন’। তোমার প্রতিপালক তো তত্ত্বজ্ঞানী, মহাজ্ঞানী।
১২৯। এভাবে তাদের কৃতকর্মের জন্য সীমালঙ্ঘনকারীদের এক দলকে আমি অন্য দলের ওপর প্রবল ক’রে থাকি।

|| ১৬||

১৩০। (আমি বলব,) ‘হে জিন ও মানুষ সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে থেকে কি রসুলরা তোমাদের কাছে আসে নি যারা আমার নিদর্শন তোমাদের কাছে বয়ান করত ও তোমাদেরকে এদিনের মোকাবিলা করার জন্য সর্তক করত? ওরা বলবে, ‘আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করলাম’। পৃথিবীর জীবন ওদেরকে ঠকিয়েছিল, আর ওরা যে অবিশ্বাস করেছিল তাও ওরা স্বীকার করবে।
১৩১। এ এজন্য যে, অবিশ্বাসীদেরকে অজ্ঞ রেখে কোনো জনপদকে তার অন্যায় আচরণের জন্য ধ্বংস করা তোমার প্রতিপালকের কাজ নয়।
১৩২। আর প্রত্যেকে যা করে সেই অনুসারে তার স্থান নির্ধারিত রয়েছে। আর ওরা যা করে সে-সম্বন্ধে তোমরা প্রতিপালক জানেন না এমন নয়।
১৩৩। তোমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, দয়াশীল। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে সরিয়ে দিতে পারেন আর তোমাদের পরে যাকে ইচ্ছা তোমাদের জায়গায় বসাতে পারেন, যেমন তিনি তোমাদেরকে অন্য এক সম্প্রদায়ের বংশ হতে সৃষ্টি করেছেন।
১৩৪। তোমাদের নিকট যা ঘোষণা করা হচ্ছে তা বাস্তবায়িত হবেই। তোমরা তা ব্যর্থ করতে পারবে না।
১৩৫। বলো, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যা করছ তা করতে থাকো, আমিও আমার কাজ করছি। তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে কার পরিণাম ভলো। আর সীমালঙ্ঘনকারীরা কখনও সফল হবে না’।
১৩৬। আল্লাহ্‌ যে-শস্য ও গবদিপশু সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্য থেকে তারা আল্লাহ্‌র জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে ও নিজেদের ধারণানুযায়ী বলে, ‘এ আল্লাহ্‌র জন্য, আর এ আমাদের শরিকদের (দেবতাদের) জন্য’। যা তাদের অংশীদারদের অংশ তা আল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছায় না, আর যা আল্লাহ্‌র অংশ তা তাদের অংশীদারদের কাছে পৌঁছায়। কী খারাপ তাদের মীমাংসা!
১৩৭। আর এইভাবে বহু অংশীবাদীর দৃষ্টিতে তাদের দেবতারা সন্তানহত্যাকে শোভন করেছে, তাদের ধ্বংস করার জন্য ও তাদের ধর্মবিশ্বাসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য। আর আল্লাহ্‌ ইচ্ছা করলে তারা এটা করত না। তাই তাদের মিথ্যা নিয়ে তাদেরকে থাকতে দাও।
১৩৮। আর তারা তাদের ধারণা অনুসারে বলে, ‘এসব গবাদিপশু ও ফসল নিষিদ্ধ, আমরা যাকে ইচ্ছা করি সে ছাড়া কেউ এসব খেতে পারবে না’। আর কতক গবাদিপশু রয়েছে যাদের পিঠে চড়া তারা হারাম করে আর কিছু পশু আছে যাদেরকে জবাই করার সময় তারা আল্লাহ্‌র নাম নেয় না। এসব তারা আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা বানানোর জন্য বলে, এ-মিথ্যা বানানোর প্রতিফল তিনি তাদেরকে দেবেন।
১৩৯। তারা আরও বলে, ‘এসব গবাদিপশুর গর্ভে যা আছে তা আমাদের পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট ও এ আমাদের স্ত্রীদের জন্য হারাম, আর এ যদি মৃত জন্মায় তবে (নারীপুরুষ) সকলে ওর অংশীদার’। তাদের এমন বলার প্রতিফল তিনি তাদেরকে দেবেন। তিনি তো তত্ত্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ।
১৪০। তারা তো ক্ষতিগ্রস্থ যারা নির্বুদ্ধিতার জন্য ও অজ্ঞানবশত নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করে এবং আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা বানানোর জন্য আল্লাহ্‌ যে জীবিকা দিয়েছেন তা হারাম করে। তারা অবশ্যই বিপথগামী আর তারা সৎপথও পায় নি।

||১৭||

১৪১। আর তিনিই বাগান তৈরি করেন জাফরি দিয়ে আবার জাফরি ছাড়া; (সৃষ্টি করেন) খেজুর ও বিভিন্ন স্বাদের খাদ্যশস্য, জয়তুন ও ডালিম, দেখতে এক, আবার নয়ও। যখন তাতে ফল ধরে তখন তোমরা ফল খাবে আর ফসল তোলার দিনে অপরকে যা দেয় তা দেবে। আর তোমরা অপচয় কোরো না, কারণ তিনি অপচয়কারীদেরকে ভালোবাসেন না।
১৪২। আর গবাদিপশুর মধ্যে কিছু ভারবাহী ও কিছু ছোট আকারের পশু রয়েছে। আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে যা জীবিকা হিসেবে দিয়েছেন তার থেকে খাও। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না, সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু ।
১৪৩। (এ-পশুগুলো) আট রকম। এক জোড়া মেষ আর এক জোড়া ছাগল। বলো, ‘নর দুটো, মাদি দুটো বা মাদি দুটোর গর্ভে যা আছে তিনি কি তা হারাম করেছেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে প্রমাণ দিয়ে আমাকে জানাও’।
১৪৪। তারপর এক জোড়া উট ও এক জোড়া গোরু। বলো, ‘নর দুটো, মাদি দুটোই বা মাদি দুটোর গর্ভে যা আছে তিনি কি তা হারাম করেছেন? আর আল্লাহ্‌ যখন এসব নির্দেশ দেন তখন কি তোমরা উপস্থিত ছিলে? সুতরাং যে-ব্যক্তি অজ্ঞানবশত মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা বানায় তার চেয়ে বড় সীমালঙ্ঘনকারী আর কে? আল্লাহ্‌ তো সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।

||১৮||

১৪৫। বলো, ‘আমার ওপর যে-প্রত্যাদেশ হয়েছে তাতে লোকে যা খায় তার মধ্যে মড়া, বহমান রক্ত ও শুকরের মাংস ছাড়া আমি কিছুই হারাম পাই না, তা অপবিত্র বা অবৈধ যা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যের নাম নিয়ে কাটা হয়েছে। তবে কেউ অবাধ্য না হয়ে ও সীমালঙ্ঘন না ক’রে নিরুপায় হলে তোমার প্রতিপালক অবশ্যই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু’।
১৪৬। আর ইহুদিদের জন্য আমি নখরযুক্ত পশু হারাম করেছিলাম। আর গোরু-ছাগলের চর্বিও তাদের জন্য আমি হারাম করেছিলাম; তবে এগুলোর পিঠের, পেটের বা হাড়ের লাগা চর্বি নয়। তাদের অবাধ্যতার দরুণ তাদেরকে এ-প্রতিফল দিয়েছিলাম। আমি তো সত্য বলছি।
১৪৭। তারপর যদি তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী ব’লে প্রত্যাখান করে তবে বলো, ‘তোমাদের প্রতিপালক অসীম দয়ার অধিকারী, আর তাঁর শাস্তি অপরাধীদের ওপর হতে রদ হয় না’।
১৪৮। যারা শির্‌ক করেছে তারা বলবে, ‘আল্লাহ্‌ যদি ইচ্ছা করতেন তবে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষরা শির্‌ক করতাম না এবং কোনোকিছুই নিষিদ্ধ করতাম না’। এভাবে তাদের পূর্ববর্তীরাও প্রত্যাখান করেছিল, শেষে তারা আমার শাস্তি ভোগ করেছিল। বলো, ‘তোমাদের কাছে কোনো প্রমাণ আছে কি? থাকলে আমার কাছে তা পেশ করো। তোমরা শুধু কল্পনার অনুসরণ কর, শুধু মিথ্যাই বল’।
১৪৯। বলো, ‘চূড়ান্ত প্রমাণ তো আল্লাহ্‌রই। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন তোমাদের সকলকে তিনি সৎপথে পরিচালিত করতেন’।
১৫০। বলো, ‘আল্লাহ্‌ যে এসব নিষিদ্ধ করেছেন এ-সম্বন্ধে যারা সাক্ষ্য দেবে তাদের হাজির করো’। তারা সাক্ষ্য দিলেও তুমি তাদের তাদের কাছে এ স্বীকার কোরো না। যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখান করেছে, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না ও প্রতিপালকের সমকক্ষ দাঁড় করায় তুমি তাদের খেয়ালখুশির অনুসরণ কোরো না।


||১৯||

১৫১। বলো, ‘এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা তোমাদের প’ড়ে শোনাই। তা এইঃ ‘তোমরা তাঁর কোনো শরিক করবে না, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের জন্য তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের কাছে যেয়ো না। আল্লাহ্‌ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছে যর্থাথ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা কোরো না। তোমাদেরকে তিনি এ-নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা বুঝতে পার’।
১৫২। তোমরা পিতৃহীনের বয়স না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির কাছে যেয়ো না। আর তোমরা পরিমাপ ও ওজন ন্যায্যভাবে করবে। আমি কাউকেও তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্বভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে তখন আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায্য বলবে আর আল্লাহ্‌কে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এইভাবে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর’।
১৫৩। আর নিশ্চয়ই এ আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এ-ই অনুসরণ করবে আর অন্য পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিছিন্ন করবে। এভাবে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা সাবধান হও।
১৫৪। আর আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম যা সৎকর্মপরায়ণের জন্য সম্পূর্ণ- যা সবকিছুর প্রাঞ্জল বিবরণ, পথনির্দেশ ও দয়াস্বরূপ-যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে বিশ্বাস করে।

||২০||

১৫৫। এ-কল্যাণময় কিতাব আমি অবতীর্ণ করেছি; সুতরাং তোমরা ওর অনুসরণ করো ও সাবধান হও, হয়তো তোমাদেরকে দয়া করা হবে।
১৫৬। তোমরা যেন না বলতে পার যে, ‘কিতাব তো শুধু আমাদের পূর্বে দুই সম্প্রদায়ের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল, আমরা তাদের পঠনপাঠন সম্বন্ধে তো অজ্ঞই ছিলাম।
১৫৭। কিংবা তোমরা যেন বলতে না পার যে, ‘যদি কিতাব আমাদের জন্য অবতীর্ণ হত তবে আমরা তো তাদের চেয়ে আরও ভালো পথ পেতাম’। এখন তো তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ, পথনির্দেশ ও দয়া এসেছে। তারপর যে-কেউ আল্লাহ্‌র নিদর্শনকে প্রত্যাখান করবে ও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার চেয়ে বড় সীমালঙ্ঘনকারী আর কে হবে? যারা আমার নিদর্শনসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের এ-আচরণের জন্য আমি তাদেরকে খারাপ শাস্তি দেব।
১৫৮। তারা শুধু এর প্রতীক্ষা করে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আসবে, বা তোমার প্রতিপালক আসবেন, বা তোমার প্রতিপালকের কোনো নিদর্শন আসবে। যেদিন তোমার প্রতিপালকের কোনো নির্দেশ আসবে সেদিন যে-ব্যক্তি পূর্বে বিশ্বাস করে নি তার বিশ্বাস কোনো কাজে আসবে না, বা যার বিশ্বাস কোনো ভালো কিছু অর্জন করে নি তার সৎকর্মও কোনো কাজে লাগবে না। বলো, ‘প্রতীক্ষা করো, আমরাও প্রতীক্ষা করছি’।
১৫৯। অবশ্য যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোনো কাজের দায়িত্ব তোমার নয়, তাদের বিষয় আল্লাহ্‌র এখতিয়ারে। আল্লাহ্‌ তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদের জানিয়ে দেবেন।
১৬০। কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে আর কেউ কোনো অসৎকাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে এবং তারা অত্যাচারিত হবে না।
১৬১। বলো, ‘নিশ্চয় আমার প্রতিপালক আমাকে পরিচালিত করেছেন সরল পথে, সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মে – একনিষ্ঠ ইব্রাহিমের সমাজে, আর সে তো অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না’।
১৬২। বলো, ‘আমার নামাজ, আমার উপাসনা, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ্‌রই উদ্দেশে।
১৬৩। তাঁর কোনো শরিক নেই, আর আমাকে এ-ব্যাপারেই তো আদেশ করা হয়েছে যেন আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমি অগ্রণী হই’।
১৬৪। বলো, ‘আমি কি আল্লাহ্‌কে ছেড়ে অন্য কোনো প্রতিপালক খুঁজব, যখন তিনি সবকিছুর প্রতিপালক? প্রত্যেকেই নিজের কাজের জন্য দায়ী আর কেউ অন্য কারও ভার বইবে না। তারপর তোমাদের প্রতিপালকের কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে-বিষয়ে তোমরা মতভেদ ঘটিয়েছিলে তা তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবেন’।
১৬৫। তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে খলিফা (প্রতিনিধি) করেছেন। আর তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরীক্ষা করার জন্য তোমাদের কাউকে অন্যের ওপর মর্যাদায় বড় করেছেন। তোমার প্রতিপালকের শাস্তি দিতে সময় লাগে না। আবার তিনি তো ক্ষমা করেন, করুণা করেন।


অনুবাদটি নেওয়া হয়েছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অনুবাদিত 'কোরানশরিফ সরল বঙ্গানুবাদ' থেকে।