খার্মিদেস
| খার্মিদেস , অনুবাদ করেছেন বেঞ্জামিন জোয়েট |
| সক্রেটিসের কথোপকথন; বেঞ্জামিন জোয়েটের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা অনুবাদ। |
কথোপকথনে যারা অংশ নিয়েছেন: সক্রেটিস (বর্ণনাকারী), খার্মিদেস, খারিফোন, ক্রিতিয়াজ
দৃশ্যপট: তাউরিয়াসের পালেস্ত্রা, রাজা আরকোনের প্রাসাদের বারান্দার নিকটবর্তী।
গতকাল সন্ধ্যায় আমি পোতিদিয়াতে অবস্থানকারী সেনাদল থেকে ফিরে এসেছি। ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করার জন্য কিছুক্ষণ আয়েশে কাটালাম। তারপর মনে হল, আমার পুরনো আস্তানায় যাওয়া দরকার। তাই রাজা আরকোনের বারান্দার সাথে লাগোয়া মন্দিরের পাশে সেই তাউরাসের পালেস্ত্রায় গেলাম। অনেকের সাথে দেখা হল, যাদের অধিকাংশের সাথেই আগে থেকে পরিচয় আছে, সবার সাথে অবশ্য নয়। আমার সেখানে যাওয়াটা তাদের জন্য বড়ই অপ্রত্যাশিত ছিল, সবাই তটস্থ হয়ে অভ্যর্থনা জানাল। এদের মধ্যে একটু পাগলাটে ধরণের খারিফোন দৌড়ে আমার কাছে এল, হাতখানা জড়িয়ে ধরে বলল, কিভাবে পালিয়ে আসলেন, সক্রেটিস? (বলে রাখা দরকার, পোতিদিয়াতে এ ধরণের কিছু একটা ঘটেছিল আমাদের চলে আসার কিছুদিন আগে। সে খবর এথেন্সে ভাসাভাসা ভাবে এসেছে মাত্র।)
আমি বললাম, যেভাবেই হোক, আসলাম তো।
সে বলল, এক খবরে জানলাম ব্যাপারটা গুরুতর এবং আমাদের পরিচিতজনের অনেকেই ধরা পড়েছে।
উত্তরে জানালাম, খবর অনেকটাই সত্য।
সে বলল, ধরে নিতে পারি আপনি সেখানে ছিলেন।
হ্যাঁ, ছিলাম।
তাহলে বসুন, এবং গল্পটা বিস্তারিত বলুন, আমাদের জ্ঞান খুবই ভাসাভাসা।
তার বেছে দেয়া জায়গাটিতেই বসলাম, খালিসক্রাজের ছেলে ক্রিতিয়াজের পাশে। ক্রিতিয়াজকে এবং পরে আস্তানার সবাইকে সম্ভাষণ জানিয়ে কাহিনীটা বিস্তারিত বললাম। এরপর তাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলাম।
সব শেষ হলে এখানকার অবস্থা, বিশেষত দর্শন এবং যুবসমাজের অবস্থা সম্বন্ধে অবগত হলাম। যুবকদের মাঝে কেউ প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য বা উভয়টিতে বিশেষত্ব অর্জন করেছে কি-না জানতে চাইলাম। ক্রিতিয়াজ ভিড়ের মধ্যে আলাপ করতে করতে দরজা দিয়ে ঢুকছে এমন কিছু যুবকের দিকে ইঙ্গিত করল। সে বলল, "সক্রেটিস, এদের মধ্যেই সৌন্দর্যের বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। কারণ, উচ্চমার্গীয় সৌন্দর্যের ধারক-বাহক তারা," অন্তত ক্রিতিয়াজ তা-ই মনে করছিল। আর নিজ থেকে খুব একটা বিস্মৃত হয়ে সে কথাটা বলেনি।
কে সে, আমি বললাম, এবং তার বাবা কে?
সে বলল, তার নাম খার্মিদেস; আমার মাসতুতো ভাই। আমার মামা গ্লাউকোনের ছেলে। খুব সম্ভবত আপনি তাকে চিনেন, যদিও আপনার এথেন্স ত্যাগের সময় সে নিছক শিশু ছিল।
অবশ্যই তাকে চিনি, আমি বললাম, এতটুকু বাচ্চা হলেও সে ছিল স্বকীয়। এতদিনে নিশ্চয়ই পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেছে।
সে বলল, কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনি বুঝতে পারবেন, এ সময়ের মধ্যে সে কতটা অগ্রসর হয়েছে এবং কেমন হয়ে উঠেছে। এ কথা শেষ করতে না করতেই খার্মিদেস প্রবেশ করল।
বন্ধু, মনে হচ্ছে এখন আমি কিছুই ঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারছি না, সৌন্দর্যের বিষয়টি তো নয়ই। চকের পরিমাপ যেমন সাদা দাগ আমার পরিমাপের অবস্থাও এখন তেমন, কোন বিকল্প নেই যেন। কারণ সব যুবকদের দেখেই এখন সুন্দর লাগছে। কিন্তু, বলতে দ্বিধা নেই, দরজা দিয়ে যখন ঢুকছিল তখন তার সৌন্দর্য ও সমাহিত ভাব দেখেই বিস্মিত হয়েছি; মনে হচ্ছিলে পুরো বিশ্ব যেন তার প্রেমে অনুরক্ত; তাকে ঢুকতে দেখে সভায় বিস্ময় ও সংকোচ ছড়িয়ে পড়ল; আর তাকে অনুসরণ করে প্রবেশ করল এক দল প্রেমিক। তাকে দেখে আমাদের মত বয়স্ক ব্যক্তিদের আকৃষ্ট হওয়াটা মোটেই বিস্ময়কর নয়, কিন্তু আমি দেখলাম, আশপাশের যুবক ছেলেদের মাঝেও একই অনুভূতি। সবাই, উপর থেকে শুরু করে সবচেয়ে কম বয়সী পর্যন্ত প্রত্যেকেই তার দিকে তাকাল, যেন এক ভাস্বর মূর্তি।
খারিফোন আমায় ডেকে বলল: তাকে দেখে আপনার কি মনে হচ্ছে, সক্রেটিস? মুখাবয়বটি কি সুন্দর নয়?
সবচেয়ে সুন্দর, আমি বললাম।
প্রত্যুত্তরে সে বলল, কিন্তু তার নগ্ন রূপ দেখলে মুখ নিয়ে কোন চিন্তাই করতেন না, সবদিক দিয়ে সে একেবারে নিখুঁত।
এবং তারা সবাই এ বিষয়ে একমত পোষণ করল।
হেরাক্লিসের দিব্যি, আমি বললাম, তার মত সৌন্দর্যের মূর্তরূপ আর কেউ হতে পারত না যদি তার মাঝে আরেকটি ছোট বৈশিষ্ট্য থাকত।
কি সেটা? ক্রিতিয়াজ বলল।
তার যদি একটা মহৎ আত্মা থাকত; এবং ক্রিতিয়াজ, তোমার ঘরের ছেলে হওয়ায় সে এমন আত্মার অধিকারী হওয়ার আশা করতেই পারে।
ক্রিতিয়াজ উত্তর করল, ভেতরে এবং বাইরেও সে অতি নির্মল ও ভাল।
সেক্ষেত্রে, তার দেহটি দেখার আগে তাকে কি তার আত্মাটিকে নিরাভরণ ও নগ্ন অবস্থায় দেখাতে বলা উচিত নয়? সে এমন একটা বয়সে আছে যে সহজেই কথা বলতে চাইবে।
অবশ্যই বলবে, ক্রিতিয়াজ বলল, এবং আমি আপনাকে বলতে পারি সে ইতোমধ্যে একজন দার্শনিক হয়ে উঠেছে, সেই সাথে উল্লেখযোগ্য কবিও। তার নিজের মতে নয়, অন্য সবার মতে।
আমি উত্তর করলাম, সেটা তো বংশ সূত্রেই তোমরা লাভ করেছ, তুমি যেমন অর্জন করেছ সোলনের থেকে। কিন্তু, তুমি কেন তাকে এখানে নিয়ে এসে দেখাও না? সে যদি আরও ছোট হত তবুও তোমার উপস্থিতিতে তার কথা বলাটা ভুল হত না। কারণ তুমি তো তার অভিভাবক ও ভাই।
বেশ, তাহলে আমি তাকে ডাকব; এবং অনুচরের দিকে তাকিয়ে বলল, খার্মিদেসকে ডাকো, আর তাকে বল আমি চাই সে যেন এখানে এসে এক চিকিৎসকের সাথে তার সেই রোগটির বিষয়ে কথা বলে যে রোগের কথা আমাকে গত পরশু দিন সে বলেছিল। তারপর আবার আমাকে উদ্দেশ্যে করে সে যোগ করল: সকালে ঘুম থেকে উঠার পর একটা মাথা ব্যথা হয় বলে সে গত কয়েকদিন ধরে আমাকে বলছে: এক্ষেত্রে আপনি কেন তাকে দিয়ে বিশ্বাস করিয়ে নেন না যে আপনি এই মাথা ব্যথা রোগের একটি উপশম জানেন?
কেন নয়, আমি বললাম; কিন্তু সে কি আসবে?
সে উত্তর দিল, অবশ্যই আসবে।
ডাকার সাথে সাথে সে চলে এল, এসে আমার আর ক্রিতিয়াজের মাঝখানে বসল।
সে আসার সাথে সাথেই সামনে বসা সবার মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম। সবাই নড়ে চড়ে নিজের পাশে তার জায়গা করে দেয়ার চেষ্টা করছিল। সবাই সরে বসার কারণে সারির একেবারে শেষের জনকে পেছনে চলে যেতে হল।
আর আমি বিব্রত বোধ করছিলাম। তার সাথে কথা বলার শক্তির উপর আমার বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। এবং ক্রিতিয়াজ যখন তাকে বলল, আমিই সেই ডাক্তার তখন সে আমার দিকে এক অবর্ণনীয় দৃষ্টিতে তাকাল। কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় পালেস্ত্রার সব লোক আমাদের দিকে জড়ো হয়ে আসল। আর তখনই বিরল ঘটনাটা ঘটল, তার পোশাক এক দিকে উঠে গেল আর আমি তার দৈহিক সৌন্দর্য্যের দীপ্তি কিছুটা হলেও অনুভব করলাম। নিজেকে ধরে রাখা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছিল।