বিষাদ সিন্ধু/উদ্ধার পর্ব/দ্বিতীয় প্রবাহ/২
উইকিসংকলন থেকে
| ←দ্বিতীয় প্রবাহ/১ | বিষাদ সিন্ধু উদ্ধার পর্ব (দ্বিতীয় প্রবাহ/২) |
তৃতীয় প্রবাহ→ |
আজর স্ত্রীপুত্রগণের নিকট যাইয়া বিষন্নভাবে বলিলেন, "হোসেনের মস্তক রাখিতে সঙ্কল্প করিয়াছিলাম, তাহা বুঝি ঘটিল না। মস্তক না লইয়া সৈনিক-পুরুষ কিছুতেই যাইতে চাহে না; আমি তোমাদের সহায়ে সৈনিক-পুরুষের ইহকালের মত লক্ষ টাকা প্রাপ্তির আশা এই স্থান হইতে মিটাইয়া দিতে পারিতাম। কিন্তু আমি স্বয়ং যাচ্ঞা করিয়া হোসেনের মস্তক আপন তত্ত্বাবধানে রাখিয়াছি; আবার সেও বিশ্বাস করিয়া আমার হস্তে সমর্পণ করিয়াছে; এ অবস্থায় উহার প্রাণবধ করিলে সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতার সহিত নরহত্যা পাপপঙ্কিলে ডুবিতে হয়। রাজঅনুচর, রাজকর্মচারী, রাজাশ্রিত লোককে, প্রজা হইয়া প্রাণে মারা, সে-ও মহাপাপ। আমার স্থির সিদ্ধান্ত এই যে, নিজ মস্তক স্কন্ধোপরি রাখিয়া হোসেনের মস্তক সৈনিকহস্তে কখনোই দিব না। তোমরা ঐ খড়্গ দ্বারা আমার মস্তক দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া সৈনিকের হস্তে দাও, সে বর্শায় বিদ্ধ করুক। খণ্ডিত শির প্রাপ্ত হইলে তিলার্ধ কালও এখানে থাকিবে না বলিয়াছে। তোমরা যত্নের সহিত হোসেনের মস্তক কারবালায় লইয়া, দেহ সন্ধান করিয়া অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উদ্যোগ করিবে, এই আমার শেষ উপদেশ। সাবধান, কেহ ইহার অন্যথা করিয়ো না!"
আজরের জ্যেষ্ঠ পুত্র সায়াদ বলিতে লাগিলেন, "পিতঃ! আমরা ভ্রাতৃদ্বয় বর্তমান থাকিতে আপনার মস্তক দেহ-বিচ্ছিন্ন হইবে? এ কী কথা! আমরা কি পিতার উপযুক্ত পুত্র নহি? আমাদের অন্তরে কি পিতৃভক্তির কণামাত্রও স্থান পায় নাই! আমরা কি এমনই নরাকার পশু যে স্বহস্তে পিতৃমস্তক ছেদন করিব? ধিক্ আমাদের জীবনে! ধিক্ আমাদের মনুষ্যত্বে! যে পিতার ঔরসে জন্মগ্রহণ করিয়া জগতের মুখ দেখিয়াছি; মানুষের পরিচয়ে মানুষের সহিত মিশিয়াছি, সেই পিতার শির যে-কারণে দেহ বিচ্ছিন্ন হইবে সে-কারণের উপকরণ কি আমরা হইতে পারিব না? পিতঃ! আর বিলম্ব করিবেন না, খণ্ডিত-মস্তক প্রাপ্ত হইলেই যদি সৈনিক-পুরুষ চলিয়া যায়, তবে আমার মস্তক লইয়া তাহার হস্তে প্রদান করুন। সকল গোল মিটিয়া যাউক।"
"ধন্য সায়াদ! তুমি ধন্য! জগতে তুমিই ধন্য! পরোপকারব্রতে তুমিই যথার্থ দীক্ষিত! তোমার জন্ম সার্থক। আমারও জীবন সার্থক। যে উদরে জন্মিয়াছ, সে উদরও সার্থক প্রাণাধিক! জগতে জন্মিয়া পশুপক্ষীদিগের ন্যায় নিজ উদর পরিপোষণ করিয়া চলিয়া গেলে মনুষ্যত্ব কোথায় থাকে?" ইহা বলিয়াই আজর দোলায়মান খড়্গ টানিয়া লইয়া হস্ত উত্তোলন করিলেন।
পরের জন্য-বিশেষ খণ্ডিত মস্তকের জন্য-আজর, হৃদয়ের হৃদয়-আত্মার আত্মা, প্রাণের প্রাণ জ্যেষ্ঠ পুত্রের গ্রীবা লক্ষ্যে খড়্গ উত্তোলন করিলেন। পিতার হস্ত উত্তোলনের ইঙ্গিত দেখিয়া সায়াদ গ্রীবা নত করিলেন, আজরের স্ত্রী চক্ষু মুদিত করিলেন। কবির কল্পনা-আঁখি ধাঁধা লাগিল, বন্ধ হইল। সুতরাং কি ঘটিল, কি হইল, লেখনী তাহা প্রকাশ করিতে পারিল না!
উঃ! কী সাহস! কী সহ্যগুণ! দেখ রে! পাষণ্ড এজিদ! হৃদয় দেখ। পরোপকারব্রতে পিতার হস্তে সন্তানের বধ দেখ্! দেখ রে সীমার! তুইও দেখ! মনুষ্যজীবনের ব্যবহার দেখ! খড়্গ কম্পিত হইল, রঞ্জিত হইল, পরোপকার আর মৃতশিরের সৎকারহেতু প্রাণাধিক পুত্রশোণিতে আজ পিতার হস্ত রঞ্জিত হইল, লৌহ-নির্মিত খড়্গ কাঁপিয়া স্বাভাবিক ঝন্ঝন্ রবে আর্তনাদ করিয়া উঠিল, কিন্তু আজরের রক্ত-মাংসের শরীর হেলিল না, শিহরিল না-মুখমণ্ডল মলিন হইল না! ধন্য রে পরোপকার! ধন্য রে হৃদয়!!
এদিকে সীমার বর্শাহস্তে বহির্ভাগে দণ্ডায়মান হইয়া মহাচিৎকার করিয়া বলিতেছে, "খণ্ডিত শির হস্তে না করিয়া যে আমার সম্মুখে আসিবে, তাহার মস্তক ধুলায় লুণ্ঠিত হইবে, অথচ হোসেনের মস্তক লইয়া যাইব।"
আজর খণ্ডিত শির হস্তে করিয়া সীমার সম্মুখে উপস্থিত হইলে সীমার মহাহর্ষে শির বর্শায় বিদ্ধ করিতে যাইয়া দেখিল যে, সদ্যকর্তিত শোণিত রঞ্জিত রক্তধারা বহিয়া পড়িতেছে। আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল, "এ কী? তুমি উন্মাদ হইয়া এ কী করিলে? এ মস্তক লইয়া আমি কী করিব? লক্ষ টাকা প্রাপ্ত আশয়ে হোসেন-মস্তক গোপন করিয়া কাহাকে বধ করিলে? তোমার মত নরপিশাচ অর্থলোভী তো আমি কখনো দেখি নাই! আহা এই বুঝি তোমার হিতোপদেশ! এই বুঝি তোমার পরোপকারব্রত! ওরে নরাধম! এই বুঝি তোমার সাধুতা? কী প্রবঞ্চক! কী পাষণ্ড! ওরে নরপিশাচ আমাকে ঠকাইতে আসিয়াছিস?"
"ভ্রাতঃ! আমি ঠকাইতে আসি নাই। তুমিই তো বলিয়াছ যে, খণ্ডিত মস্তক পাইলেই চলিয়া যাইবে। এখন এ কী কথা-এক মুখে দুই কথা কেন ভাই?"
"আমি কি জানি যে তুমি একজন প্রধান দস্যু! টাকার লোভে কাহার কী সর্বনাশ করিবে কে জানে?"
"তুমি কি পুণ্যফলে হোসেন-মস্তক কাটিয়াছিলে ভাই? মস্তক পাইলেই চলিয়া যাইবে-কথা ছিল, এখন বিলম্ব কেন? আমার কথা আমি রক্ষা করিলাম; এখন তোমার কথা তুমি ঠিক রাখ।"
"কথা কাটিলে চলিবে না। যে মস্তকের জন্য র্কাবালা প্রান্তরে রক্তের স্রোত বহিয়াছে, যে মস্তকের জন্য মহারাজ এজিদ্ ধনভাণ্ডার খুলিয়া দিয়াছেন, যে মস্তকের জন্য চতুর্দিকে 'হায় হোসেন' 'হায় হোসেন' রব হইতেছে, সেই মস্তকের পরিবর্তে এ কী?-ইহাতে আমার কী লাভ হইবে? তুমি আমার প্রদত্ত মস্তক আনিয়া দাও।"
"ভাই! তুমি তোমার কথা ঠিক রাখিলে না, ইহাই আমার দুঃখ। মানুষের এমন ধর্ম নহে।"
সীমার মহা গোলযোগে পড়িল। একটু চিন্তা করিয়া বলিল, "এ শির এখানেই রাখিয়া দাও, আমি খণ্ডিত মস্তক পাইলেই চলিয়া যাইব, পুনরায় প্রতিজ্ঞা করিলাম। আন দেখি, এবারে হোসেন-শির না আনিয়া আর কি আনিবে? আন দেখি!"
আজরের মুখভাব দেখিয়াই মধ্যম পুত্র বলিলেন, "পিতঃ! চিন্তা কী? আমরা সকলেই শুনিয়াছি, খণ্ডিত-মস্তক পাইলেই সৈনিকপ্রবর চলিয়া যাইবেন। অধম সন্তান এই দণ্ডায়মান হইল, খড়্গ হস্তে করুন, আমরা বাঁচিয়া থাকিতে মহাপুরুষ হোসেনের শির দামেস্করাজের ক্রীড়ার জন্য লইয়া যাইতে দিব না।"
আজর পুনরায় খড়্গ হস্তে লইলেন, যাহা হইবার হইয়া গেল। শির লইয়া সীমারের নিকট আসিলে সীমার আরো আশ্চর্যান্বিত হইয়া মনে মনে বলিল, "এ উন্মাদ কী করিতেছে!" প্রকাশ্যে বলিল, "ওহে পাগল! তোমার এ পাগলামি কেন? আমি হোসেনের শির চাহিতেছি।"
"এ কী কথা! ভ্রাতঃ! তোমার একটি কথাতেও বিশ্বাসের লেশ নাই! ধিক্ তোমাকে!"
পুনরায় সীমার বলিল, "দেখ ভাই! তুমি হোসেনের শির রাখিয়া কি করিবে? এক মস্তকের পরিবর্তে দুইটি প্রাণ অনর্থক বিনাশ করিলে, বল তো ইহারা তোমার কে?"
"এ দুইটি আমার সন্তান।"
"তবে তো তুই বড় ধূর্ত ডাকাত। টাকার লোভে আপনার সন্তান স্বহস্তে বিনাশ করিতেছ! ছি ছি! তোমার ন্যায় অর্থপিশাচ জগতে আর কে আছে? তুমি তোমার পুত্রের মস্তক ঘরে রাখিয়া দাও, শীঘ্র হোসেনের মস্তক আনয়ন কর, নতুবা তোমার নিস্তার নাই।"
"ভ্রাতঃ! আমার গৃহে একটি মস্তক ব্যতীত আর নাই, আনিয়া দিতেছি, লইয়া যাও।"
"আরে হাঁ হাঁ, সেইটিই চাহিতেছি; সেই একটি মস্তক আনিয়া দিলেই আমি এখনই চলিয়া যাই।"
আজর শীঘ্র শীঘ্র যাইয়া যাহা করিলেন, তাহা লেখনীতে লেখা অসাধ্য। পাঠক! বোধ হয় বুঝিয়া থাকিবেন। এবারে সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের শির লইয়া আজর সীমারের নিকট উপস্থিত হইলেন।
সীমার ক্রোধে অধীর হইয়া বলিতে লাগিল, "আমি এতক্ষণ অনেক সহ্য করিয়াছি। পিশাচ! আমার সঞ্চিত শির লইয়া তুই পুরস্কার লইবি? তাহা কখনোই পরিবি না!"
"আমি পুরস্কার চাহি না। আমার লক্ষ লক্ষ বা লক্ষাধিক লক্ষ মূল্যের তিনটি মস্তক তোমাকে দিয়াছি। ভাই! তবু তুমি এখান হইতে যাইবে না?"
"ওরে পিশাচ! টাকার লোভ কে সম্বরণ করিতে পারে? হোসেনের শির তুই কী জন্য রাখিয়াছিস্? তোর সকলই কপট। শীঘ্র হোসেনের মস্তক আনিয়া দে!"
"আমি হোসেনের মস্তক তোমাকে দিব না। এক মস্তকের পরিবর্তে তিনটি দিয়াছি, আর দিব না,-তুমি চলিয়া যাও।"
সীমার ক্রোধে অধীর হইয়া বলিল, "তুই মনে করিস্ না যে হোসেন-মস্তক মহারাজ এজিদের নিকট লইয়া যাইয়া পুরস্কার লাভ করিবি। এই যা, একেবারে দামেস্কে চলিয়া যা!" সীমার সজোরে আজরের বক্ষে বর্শাঘাত করিয়া ভূতলশায়ী করিল এবং বীরদর্পে আজরের শয়ন গৃহের দ্বারে যাইয়া দেখিল, সুবর্ণ পাত্রোপরি হোসেনের মস্তক স্থাপিত রহিয়াছে, আজরের স্ত্রী খড়্গহস্তে তাহা রক্ষা করিতেছেন। সীমার এক লম্ফে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া হোসেনের মস্তক পূর্ববৎ বর্শাবিদ্ধ করিয়া আজরের স্ত্রীকে বলিল, "তোকে মারিব না, ভয় নাই সীমার-হস্ত কখনোই স্ত্রী-বধে উত্তোলিত হয় নাই; কোন ভয় নাই।"
আজরের স্ত্রী বলিলেন, "আমার আবার ভয় কি! যাহা হইবার হইয়া গেল। এই পবিত্র মস্তক রক্ষার জন্য আজ সর্বহারা হইলাম, আর ভয় কি? মনের আশা পূর্ণ হইল না-হোসেনের শির কারবালায় লইয়া যাইয়া সৎকার করিতে পারিলাম না, ইহাই দুঃখ। তোমাকে আমার কিছুই ভয় নাই। আমাকে তুমি কি অভয় দান করিবে?"
"কি অভয় দান করিব? তোকে রাখিলে রাখিতে পারি, মারিলে এখনই মারিয়া ফেলিতে পারি।"
"আমার কি জীবন আছে? আমি তো মরিয়াই আছি। তোমার অনুগ্রহ আমি কখনোই চাহি না।"
"তুই আমার অনুগ্রহ চাহিস না? সীমারের অনুগ্রহ চাহিস না? আরে পাপিয়সী! তুই স্বচক্ষেই তো দেখিলি, তোর স্বামীকে কি করিয়া মারিয়া ফেলিলাম। তুই স্ত্রীলোক হইয়া আমার অনুগ্রহ চাহিস না?"
এই বলিয়া সীমার বর্শাহস্তে আজরের স্ত্রীর দিকে যাইতেই, আজরের স্ত্রী খড়্গহস্তে রোষভরে দাঁড়াইয়া বলিলেন, "দেখিতেছিস! ওরে পাপিষ্ঠ নরাধম, দেখিতেছিস্? তিনটি পুত্রের রক্তে আজ এই খড়্গ রঞ্জিত করিয়াছি; পরপর আঘাতে স্পষ্টতঃ তিনটি রেখা দেখা যাইতেছে। পামর! নিকটে আয়, চতুর্থ রেখা তোর দ্বারা পূর্ণ করি।"
সীমার একটু সরিয়া দাঁড়াইল। আজরের স্ত্রী বলিল, "ভয় নাই, তোকে মারিয়া আমি কি করিব। আমার বাঁচিয়া থাকা আর না-থাকা সমান কথা। তবে দেখিতেছি, এই খড়্গে তিন পুত্র গিয়াছে, আর ঐ বর্শাতে তুই আমার জীবন-সর্বস্ব পতির প্রাণ বিনাশ করিয়াছিস্।" এই কথা বলিতে বলিতে আজর-স্ত্রী সীমারের মস্তক লক্ষ্য করিয়া খড়্গাঘাত করিলেন। সীমারের হস্তস্থিত বর্শায় বাধা লাগিয়া দক্ষিণ হস্তে আঘাত লাগিল। বর্শাবিদ্ধহোসেন মস্তক বর্শাচ্যুত হইয়া মৃত্তিকায় পতিত হইবামাত্র আজর-স্ত্রী ক্রোড়ে করিয়া বেগে পলাইতে লাগিলেন; কিন্তু সীমার বামহস্তে সাধ্বী সতীর বস্ত্রাঞ্চল ধরিয়া সজোরে ক্রোড় হইতে হোসেন-শির কাড়িয়া লইল। আজরের স্ত্রী তখন একেবারে হতাশ হইয়া নিকটস্থ খড়্গ দ্বারা আত্মবিসর্জন করিলেন, সীমারের বর্শাঘাতে মরিতে হইল না। সীমার হোসেন-শির পূর্ববৎ বর্শায় বিদ্ধ করিয়া দামেস্কাভিমুখে চলিল।
| পরবর্তী পাতা→ |