বিষাদ সিন্ধু/মহরম পর্ব/চতুর্বিংশ প্রবাহ /৩

উইকিসংকলন থেকে

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেন
মহরম পর্ব (চতুর্বিংশ প্রবাহ /৩)

আবদুল ওহাব অশ্বে কশাঘাত করিয়া শত্রুদল সম্মুখে চক্রাকারে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, কেহই তাঁহার সম্মুখে আসিতে সাহস করিল না, নদীকূলও ছাড়িয়া দিল না। আবদুল ওহাব পুনরায় সক্রোধে বলিতে লাগিলেন, "যোদ্ধাই হউক, বীরেন্দ্রই হউক, উদ্যোগী পুরুষই হউক, সেই ধন্য, যে সময়কে অতি মূল্যবান জ্ঞান করে। তোদের সকল বিষয়েই জ্ঞান আছে দেখিতেছি। যদি সাহস থাকে, যদি আবদুল ওহাবের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে কাহারো ইচ্ছা হয়, তবে শীঘ্র আয়। আবদুল ওহাব আজ বিধর্মীর রক্তপাতে ফোরাতজল রক্তবর্ণে রঞ্জিত করিয়া দ্বিগুণ রঞ্জন বৃদ্ধি করিবে, এই আশয়েই তোদের সম্মুখে আসিয়াছে। শত্রুসম্মুখীন হইতে এত বিলম্ব? শত্রু যুদ্ধপ্রার্থী তোরা বিশ্রামপ্রার্থী! ধিক্ তোদের বীরত্বে! ধিক্ তোদের সাহসে! আজ সাত রাত নয় দিন আবদুল ওহাব জলস্পর্শ করে নাই, ফোরাত নদীতীরে মহানন্দে ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করিয়া রহিয়াছিস্। ইহাতেও এত বিলম্ব, এত ভয়! শীঘ্র আয়, একে একে তোদের সকলকেই নরকে প্রেরণ করিতেছি।"

বিপক্ষদল হইতে দীর্ঘকার এক বীরপুরুষ বহির্গত হইয়া অতি উচ্চ লোহিতবর্ণ অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক বিশেষ দক্ষতার সহিত অসিচালনা করিতে করিতে আবদুল ওহাবের সম্মুখীন হইয়া বলিতে লাগিল, "মূর্খেরাই দর্প করে! কাপুরুষেরাই অহঙ্কার প্রদর্শন করিয়া থাকে। শৃগাল! বাক্চাতুরী ছাড়িয়া পুনরায় শিবিরে প্রস্থান কর-তোকে মারিয়া কী হইবে? আবদুল ওহাব, তুই কাহার সন্তান, তোর জননী কাহার কন্যা, সেই সকল পরিচয় লইয়া আসিতেই আমার একটু বিলম্ব হইয়াছে। তুই কেন এই নবযৌবনে পরের জন্য আপন প্রাণ হারাইবি? তোকে বধ করিলে এজিদের নিকট যশলাভ হইবে না। তোদের হোসেনকে যুদ্ধক্ষেত্রে আসিতে বল, তুই যদি কিছুদিন সংসারে বাস করিতে বাসনা করিস, ফিরিয়া যা, তোকে চাহি না!"

আবদুল ওহাব ক্রোধে অধীর হইয়া বলিলেন, "বিধর্মী কাফের! এত বড় আস্পর্ধা তোর! অগ্রে তুই হোসেনকে যুদ্ধক্ষেত্রে আহ্‌বান করিস্? আবদুল ওহাবের পদাঘাতে কি কিছুমাত্র বল নাই? রে ক্ষুদ্রকীট! চরণশরণাগত দাস বাঁচিয়া থাকিতে প্রভুকে আহ্‌বান কেন? অগ্রে আবদুল ওহাবের পদাঘাত সহ্য কর, তাহার পর অন্য কথা।"-সদর্পে এই কথা বলিয়া আবদুল ওহাব অশ্ব ঘুরাইয়া বিধর্মীর নিকট যাইয়া এমনি জোরে তরবারির আঘাত করিলেন যে একাঘাতে অশ্ব সহিত তাহাকে দ্বিখণ্ডিত করিয়া ফেলিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্ব চক্র দিয়া শত্রুবিনাশী আবদুল ওহাব প্রত্যেক চক্র পরিবর্তনে বিপক্ষগণকে আহ্‌বান করিতে লাগিলেন। একে একে সত্তরজন বিধর্মীকে নরকে প্রেরণ করিয়া পুনরায় পরিক্রমণের জন্য শত্রুগণকে আহ্‌বান করিতে লাগিলেন। কিন্তু কেহই তাহার সম্মুখে আর অগ্রসর হইল না। দূর হইতে শর নিক্ষেপ করিয়া পরাস্ত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। আবদুল ওহাব ভীত হইলেন না,-দুই হস্তে অসি চালনা করিয়া নিক্ষিপ্ত শর খণ্ডে খণ্ডে বিচ্ছিন্ন করিতে লাগিলেন। মধ্যে মধ্যে শত্রু-নিপ্তি শর আবদুল ওহাবের গাত্রে বিদ্ধ হইয়া রক্তধারা প্রবাহিত করিতে লাগিল। সেদিকে আবদুল ওহাবের দৃষ্টি নাই, কেবল শত্রু-বিনাশ কৃতসঙ্কল্প।

বহু পরিশ্রম করিয়া আবদুল ওহাব পিপাসায় আরো কাতর হইলেন। কি করেন, কোন উপায় না পাইয়া বেগে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে হোসেনের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইয়া বলিলেন, "হজরত বড় পিপাসা! এই সময় ওহাবকে যদি একবিন্দু জল দান করিতে পারেন, তাহা হইতে শত্রুকুল-"

"জল? জল আমি কোথায় পাইব ভাই?" অধিকতর কাতর দেখিয়া বলিতে লাগিলেন, "ভাই! যদি সেই ক্ষমতাই থাকিত, তবে তোমার আর এমন দশা হইবে কেন?"

দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া মহা উত্তেজিত কণ্ঠে আবদুল ওহাবের জননী বলিতে লাগিলেন, "আবদুল ওহাব! যুদ্ধক্ষেত্র হইতে কি ফিরিতে আছে? তুমি যদি ইচ্ছা করিয়াও না ফিরিয়া থাক, কাহারো আদেশেও যদি ফিরিয়া থাক, তাহা হইলেও কি শত্রু হাসিবে না? কী ঘৃণা! কী লজ্জা! কেন তুমি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলে? শত্রুকে পিঠ দেখাইয়া সামান্য জল-পিপাসায় প্রাণ রক্ষা করিতে যুদ্ধ ছাড়িয়া ফিরিয়া আসিলে! তোমার ও কলঙ্কিত মুখ আমি আর দেখিব না। আমি তোমাকে জীবিত ফিরিয়া আসিবার জন্য যুদ্ধে পাঠাই নাই। হয় ফোরাতকূল উদ্ধার করিয়া হোসেনের পুত্রপরিজনকে রক্ষা করিবে দেখিব, না হয় রণক্ষেত্র-প্রত্যাগত তোমার মস্তকশূন্য দেহ দেখিয়া এই বৃদ্ধ বয়সে জীবন শীতল করিব, এই আমার আশা ছিল। তুমি বীরকুলকলঙ্ক, আমার আশা ফলবতী হইতে দিলে না।"

সভয়ে কম্পিত হইয়া আবদুল ওহাব কহিলেন, "জননী! আবার আমি যাইতেছি, আর ফিরিব না-হয় নদীকূল উদ্ধার, নয় আবদুল ওহাবের মস্তক দান। কিন্তু জননী! পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত! পিপাসা নিবারণ করিবার আর উপায় নাই! একটিমাত্র নিবেদন, চরণদর্শনে পিপাসা শান্তি। আর-একবার আমার স্ত্রীর মুখখানি।"

"হাঁ বুঝিয়াছি সেই মুখখানি!-মুখখানি দেখিতে পার, কিন্তু অশ্ব হইতে নামিতে পারিবে না।" মাতার আজ্ঞানুযায়ী সেই অবস্থাতেই আবদুল ওহাব আপন স্ত্রীর নিকট যাইয়া বলিলেন, "জীবিতেশ্বরী! আমি যুদ্ধযাত্রী! যুদ্ধ করিতে করিতে তোমার কথা মনে পড়িল, পিপাসাতেও প্রাণ আকুল। ভাবিলাম তোমাকে দেখিলে বোধ হয় কিছু শ্রান্তি দূর হইবে, পিপাসাও নিবারণ হইবে। এই মনে করিয়াই আসিয়াছি, কিন্তু অশ্ব হইতে নামিবার আদেশ নাই! মাতার আজ্ঞা, অশ্বপৃষ্ঠে বসিয়াই সাক্ষাৎ।"

পতিপরায়ণা পতিব্রতা সতী পতির নিকট যাইয়া অশ্ববল্গা ধারণপূর্বক মিনতি বচনে কহিতে লাগিলেন, "জীবিতেশ্বর! সমরাঙ্গণে অঙ্গনার কথা মনে করিতে নাই। যুদ্ধেক্ষেত্র অন্তঃপুরের কথা যাহার মনে পড়ে, সে আবার কেমন বীর?-শত্রুকে পৃষ্ঠ দেখাইয়া যে যোদ্ধা স্ত্রীর মুখ দেখিতে আইসে, সেই বা কেমন বীর? প্রাণেশ্বর আমি নারী, আমি তো ইহার মর্ম কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। প্রভু মোহাম্মদের বংশধরগণের বিপদ সময়ে সাহায্য করিতে স্ত্রীপরিবার সন্তান-সন্ততির কথা যে যোদ্ধৃপুরুষ মনে করে, তাহাকে আমি বীরপুরুষ বলি না। যদি আপনারা যুদ্ধক্ষেত্রকে ভয় করেন, তবে আমরাই,-এই আমরাই এলোচুলে রণরঙ্গিণী রণবেশে সমরাঙ্গণে অসিহস্তে নৃত্য করিব। রণরঞ্জিত বস্ত্রে আমরাও রণসাজে সাজিতে কুণ্ঠিত হইব না। দেখি, কোন্ বিপক্ষ যোদ্ধা আমাদের সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারে? দেখার দিন, কথার দিন, বিশ্রামের দিন, ঈশ্বর-প্রসাদে যদি পাই, তবে মনের আনন্দে আপনাকে সেবা করিব। হোসেনের বিপদ চিরকাল থাকিবে না, কিন্তু এমন দিন পাইয়া আপনি আর খোয়াইবেন না; এমন দিন আপনি আর পাইবেন না। এমন সময়ে কি বিলম্ব করা উচিত? ছি! ছি! বীরপুরুষ! তোমারে ছি ছি! শত্রু যুদ্ধার্থী হইয়া অপেক্ষা করিতেছে, তুমি কি না কাপুরুষের মত অবরোধপুরে আসিয়া অবরোধবাসিনী কুলবালার মুখ দেখিতে অভিলাষী হইয়াছ? ছিঃ তোমাকে!"

অশ্ব হইতেই নতশিরে সাধ্বী-সতীর কপোল চুম্বন করিয়া আবদুল ওহাব আর তাঁহার দিকে ফিরিয়াও চাহিলেন না। সতীর মিষ্ট ভর্ৎসনায় অন্তরে অন্তরে লজ্জিত হইয়া সজোরে অশ্বে কশাঘাত করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করিলেন। শত্রুগণকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন, "রে বিধর্মী কাফেরগণ। ভাবিয়াছিলি যে, আবদুল ওহাব পলাইয়াছে। আবদুল ওহাব পলায় নাই! ঈশ্বরের নামে অতি অল্প সময় এই জগৎ দেখিতে আমি তোমাদিগকে অবসর দিয়াছিলাম। আয় দেখি, কতজনে আবদুল ওহাবের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে আসিবি আয়।"

আবদুল ওহাবের মাতা তাহার অজ্ঞাতে যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটে যাইয়া আবদুল ওহাবের যুদ্ধ দেখিতে লাগিলেন। পূর্বেই সেনাপতি ওমর সকলকেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন যে আবদুল ওহাব কোন কারণবশতঃ ফিরিয়া গিয়াছে, এখনই আবার আসিবে। এবার সকলে একত্রে হইয়া আবদুল ওহাবকে আক্রমণ করিতে হইবে। যাহার যে অস্ত্র আয়ত্ত আছে, সে সেই অস্ত্র আবদুল ওহাবের প্রতি নিক্ষেপ করিবে।

রণেক্ষেত্র একেবারে একযোগে বহু সংখ্যক সৈন্য মণ্ডলাকারে চতুর্দিক ঘিরিয়া একেশ্বর আবদুল ওহাবের প্রতি অস্ত্র বর্ষণ করিতে লাগিল। বীরবর আবদুল ওহাব শত্রুবেষ্টিত হইয়া দুই হস্তে অসি চালনা করিতে লাগিলেন। এজিদের সৈন্যের অন্ত নাই; কত মারিবেন! শেষে শত্রুপক্ষের অস্ত্রাঘাতে আবদুল ওহাবের মস্তক দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া বহুদূরে বিনিক্ষিপ্ত হইল! সেই ছিন্ন মস্তক আবদুল ওহাবের মাতার সম্মুখে গিয়া পড়িল। বীরজননী পুত্রশির ক্রোড়ে লইয়া ত্রস্তে শিবিরে আসিয়া নির্জনকে হোসেনের সম্মুখে রাখিয়া দিলেন। এই অবসরে আবদুল ওহাবের শিক্ষিত অশ্ব শিরশূন্য দেহ লইয়া অতিবেগে শিবিরের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। শিরশূন্য দেহ অশ্বপৃষ্ঠ হইতে সকলের সম্মুখে মৃত্তিকায় পড়িয়া গেল। আবদুল ওহাবের মাতা শোণিতাক্ত হস্ত উত্তোলন করিয়া ঈশ্বরসমীপে প্রার্থনা করিলেন এবং আবদুল ওহাবের উদ্দেশে আশীর্বাদ করিলেন যে, "আবদুল ওহাব! তুমি ঈশ্বর-কৃপায় স্বর্গীয় সুখভোগে সুখী হও, হোসেনের বিপদ সময়ে প্রাণ দিয়া সাহায্য করিলে। প্রভু মোহাম্মদের বংশধরগণের পিপাসাশান্তিহেতু কাফেরের হস্তে জীবন বিসর্জন করিলে, তোমার শত শত আশীর্বাদ! তুমি যে জননীর গর্ভে জন্মিয়াছিলে, তাহারও সার্থক জীবন। তোমার মস্তক দেহ হইতে কে বিচ্ছিন্ন করিল?" আবদুল ওহাবের মাতা আবদুল ওহাবের মস্তক লইয়া পতিত দেহে সংলগ্ন করিয়া বলিতে লাগিলেন, "আবদুল ওহাব! বৎস! প্রাণাধিক! অশ্ব সজ্জিত আছে, তোমার হাতের অস্ত্র হাতেই রহিয়াছে, বিধর্মী রক্তে অস্ত্র রঞ্জিত করিয়াছ, তবে আর ধুলায় পড়িয়া কেন? বাছা!-দুঃখিনীর জীবন সর্বস্ব! উঠিয়া অশ্বে আরোহণ কর। প্রাণাধিক! -এইবার যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিলে আর আমি তোমাকে যুদ্ধে পাঠাইব না। ঐ দেখ তোমার অর্ধাঙ্গরূপিণী বনিতা তোমার যুদ্ধবিজয় সংবাদ শুনিবার জন্য সতৃষ্ণ শ্রবণে সতৃষ্ণ নয়নে অপেক্ষা করিতেছে।"

আবদুল ওহাবের বিয়োগে হোসেন কাঁদিলেন। হোসেনের পরিজনবর্গ ডাক ফুকারিয়া কাঁদিলেন। আবদুল ওহাবের মাতা অশ্রুনয়নে রোষভরে বলিতে লাগিলেন, "আবদুল ওহাব! এত ডাকিলাম, উঠিলে না? তোমার মায়ের কথা আর শুনিলে না?" শোকাবেগে এই কথা বলিয়া বৃদ্ধা পুনরায় পুত্রমস্তক বক্ষে ধারণ করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, "আমার পুত্রহন্তা কে? আবদুল ওহাব কাহার হস্তে জীবন বিসর্জন করিল? কে আমার আবদুল ওহাবের মস্তক আমার ক্রোড়ে আনিয়া নিক্ষেপ করিল? দেখি, দেখি, দেখিব দেখিব!!" বলিয়া আবদুল ওহাব-জননী তখনি ত্বরিত পদে আবদুল ওহাবের অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। হোসেন অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া নিষেধ করিলেন, কিছুই শুনিলেন না। -পুত্রমস্তক কোলে করিয়াই অশ্বপৃষ্ঠে যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, "কোন্ কাফের, কোন্ পাপাত্মা, কোন্ শৃগাল আমার পুত্রের মস্তক দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়াছে? ঈশ্বরের দোহাই, এই যুদ্ধক্ষেত্রে একবার আসিয়া সেই পাপাত্মা, সেই পিশাচ, সেই কাফের সম্মুখে দেখা দিক!"

ঈশ্বরের দোহাই শুনিয়া আবদুল ওহাব-হন্তা যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়া দর্পসহকারে বলিতে লাগিল, "আমারই এই শাণিত অস্ত্রে আবদুল ওহাবের মস্তক সেই পাপদেহ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে।" আর কোন কথা হইল না। আবদুল ওহাব-জননী পুত্রঘাতককে দেখিয়া সক্রোধে আবদুল ওহাবের মস্তক এমন জোরে তাহার মস্তক লক্ষ্য করিয়া মারিলেন যে, ঐ আঘাতেই কাফেরের মস্তক ভগ্ন হইয়া মজ্জা নির্গত হইতে লাগিল। তখনই পঞ্চত্বপ্রাপ্তি।

এই ঘটনা দেখিয়া ওমর মহারোষে আবদুল ওহাবের জননীর চতুর্দিকে সৈন্য বেষ্টন করিলেন। বৃদ্ধা বলিতে লাগিলেন, "বৎসগণ! তোমাদের মঙ্গল হউক! আমার জীবনে মায়া নাই। পুত্রশোক নিবারণ করিবার জন্য এই বৃদ্ধবয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়াছি। তোমরা আমাকে নিপাত কর। যে পথে আমার আবদুল ওহাব গিয়াছে, আমিও সেই পথে যাই। কিন্তু আকাশে যদি কোন বিচারকর্তা থাকেন, তিনি তোমাদের বিচার করিবেন।" অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আবদুল ওহাব-জননী শত্রুহস্তে প্রাণত্যাগ করিয়া স্বর্গবাসিনী হইলেন।

আবদুল ওহাবের মাতা প্রাণত্যাগ করিতে গাজী রহমান হোসেনের পদচুম্বন করিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন। তিনিও বহুসংখ্যক বিধর্মীকে জাহান্নমে পাঠাইয়া শত্রুহস্তে শহীদ হইলেন। -ক্রমে জাফর প্রভৃতি প্রধান প্রধান বীরগণ হোসেনের সাহায্য জন্য শত্রুসম্মুখীন হইয়া যুদ্ধ করিলেন, কিন্তু কেহই জয়লাভে কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। প্রায় দেড় লক্ষ বিপক্ষসৈন্য বিনাশ করিয়া মদিনার প্রধান প্রধান যোদ্ধামাত্রেই শত্রুহস্তে আত্মসমর্পণ করিয়া স্বর্গধামে মহাপ্রস্থিত হইলেন।


পরবর্তী পাতা