বিষাদ সিন্ধু/মহরম পর্ব/ত্রয়োবিংশ প্রবাহ /৫

উইকিসংকলন থেকে

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেন
মহরম পর্ব (ত্রয়োবিংশ প্রবাহ /৫)

গৃহিণী দেখিলেন স্বামী ঘোর নিদ্রায় অচেতন। কী উপায়ে ছেলে দুটিকে রক্ষা করিবেন, এই চিন্তা করিয়া পরামর্শে বসিলেন। এ পর্যন্ত পরিচারিকা ভিন্ন, বাড়ির অন্য কাহাকেও বালকদ্বয়ের কথা বলেন নাই। এখন বাধ্য হইয়া স্বামীর ঐরূপ ভাব দেখিয়া তাঁহার মুখের কথা শুনিয়া দয়াবতী স্নেহময়ী রমণী অস্থির হইয়াছেন। কী উপায়ে পিতৃহীন বালকদ্বয়কে রক্ষা করিবেন? স্বামীর মনের ভাব-অদ্যকার ভয়ের কারণই অধিক, আর আশ্রয়ের স্থান কোথায়? প্রকাশ হইলে ছেলে দুটির মাথা যায়। হইতে পারে নিজের প্রাণের আশা অতি সঙ্কীর্ণ। স্বামী পুরস্কারের লোভে স্ত্রীর বিরোধী হইতে পারেন। আর একটা গোলের কথা, স্বামীর সঙ্গে বালক দুটি লইয়া কথান্তর হইলে পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই জানিবে! ভাল করিতে কেহ আগে যাইতে চাহে না; মন্দ করিতে কোমর বাঁধিয়া দৌড়িতে থাকে। যাইয়া বলিলেই হইল-অমুকের ঘরে ছিল। অমুক স্ত্রীলোকের আশ্রয়ে ছিল। আর প্রাণের আশা কী?-সকল কথা ভাবিয়া চিন্তিয়া আরো দুইটি লোকের সহিত পরামর্শ করিয়া কার্য করাই স্থির করিলেন।

একজন তাঁহার গর্ভজাত পুত্র; সে বুদ্ধিমান্, বিচক্ষণ-দয়ার শরীর, সে শরীরে পিতার গুণ অল্প ছিল, মাতার গুণ অধিক;-সেই একজন। আর এক পুত্র তাঁহার গর্ভজাত নহে,-পালকপুত্র। শৈশবকাল হইতে আপন স্তন্যপান করাইয়া প্রতিপালন করিয়াছেন। তাঁহার সম্পূর্ণ গুণের অধিকারী সেই পালকপুত্র হইয়াছে। সেই তাঁহার সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। আপন গর্ভজাত পুত্র তাহার পিতা হারেসের কথা অমান্য করিতে পারে না। অন্যায় কার্য হইলেও প্রতিবাদ করে না,-চুপ করিয়া নীরবে থাকে। পালকপুত্রটি তাহা নহে। সে তাঁহারই অনুগত-বাধ্য, হারেসের কথা সে শুনে না। হারেস কোন অন্যায় কথা বলিলে সে অকপটে নির্ভয়ে তাহার প্রতিবাদ করে।

তাহার মনে ধারণাই এই যে, যাঁহার শরীরের শোণিতে আমার জীবন রক্ষা হইয়াছে, দেহ বৃদ্ধি হইয়াছে, যাঁহার স্নেহ-মমতা অনুগ্রহে এত বড় হইয়াছি, তিনিই আমার সর্বস্ব-তিনিই আমার পূজনীয়া, তিনিই আমার মুক্তিদাত্রী মাতা,-মাতাই আমার সম্বল-মাতাই আমার বল। হারেস-জায়া নিশীথ সময়ে দুই পুত্রকে চুপি চুপি ডাকিয়া আনিয়া অন্য কক্ষে অতি নির্জন স্থানে দুই পুত্রকে সম্মুখে করিয়া বসিলেন।

পালকপুত্রকে বলিলেন, "বাবা! তুই আমার পেটে না জন্মিলেও আমি তোকে আমার বুকের দুধ দিয়া প্রতিপালন করিয়াছি। কত মল-মূত্র দুই হাতে পরিষ্কার করিয়া তোকে বাঁচাইয়াছি। বাবা! তুই আমার শরীরের সার অংশ দ্বারা প্রতিপালিত হইয়াছিস্। আমার শরীরের রক্ত অংশে তোর দেহপুষ্টি হইয়াছে।" আপন গর্ভজাত সন্তানের হস্ত ধরিয়া বলিলেন, "বাবা! তোতে আর এতে ভিন্ন কী? অতি সামান্য! সেই সামান্য অংশটুকু ছাড়িয়া দিলে-তুইও যেমন, (পালকপুত্রের হস্ত ধরিয়া-) এও তেমনই। পরিচারিকাকে যে কথা বলিতে বলিয়াছিলাম, তোমাদের দুই জনকে একত্র বসাইয়া সে তাহা বলিয়াছে। তোমরা সকলই শুনিয়াছ। এখন সেই বালক দুইটির রক্ষার উপায় কি? আমি ভাবিয়াছিলাম তোমাদের পিতা বাটী আসিলে, ছেলে দুইটির কথা বলিব। তিনি কতই দুঃখ করিবেন। ছেলে দুইটির রক্ষার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিবেন। এখন দেখিতেছি, তিনিই তাহাদের সংহারক, তিনিই তাহাদের প্রাণনাশক-প্রধান শত্রু। মোহরের লোভে তিনি বালক দুইটিকে ধরিবার জন্য বহু চেষ্টা-বহু পরিশ্রম করিয়াছেন। নিদ্রা হইতে উড়িয়া এই রাত্রিতেই পুনরায় তাহাদের অন্বেষণে ছুটিবেন। তিনি যদি বালক দুইটির সন্ধান পান, তাহা হইলে আর রক্ষা নাই। কিছুতেই তাহারা দুরন্ত বাঘের মুখ হইতে রক্ষা পাইবে না-বাঁচিবে না। এক্ষনে তোমরাই আমার সহায়-সম্বল। তোমরা দুই ভাই যদি আমার সহায়তা কর, তোমরা দুই ভাই যদি আমার পক্ষে থাকিয়া পিতৃহীন বালক দুটির রক্ষ্রর জন্য চেষ্টা কর-তবে তাহারা বাঁচিতে পারে। তোমাদের পিতার চক্ষে পড়িলে আর কিছুতেই রক্ষা পাইবে না।"

দুই ভাই বলিল, "মাতঃ! আপনি ব্যস্ত হইবেন না। আমরা সকলই শুনিয়াছি-বালকদ্বয়ের অবস্থা সকলই শুনিয়াছি, আমাদের বাটীতেই আছে তাহাও জানিয়াছি! আপনি অত উতলা হইবেন না। পিতা গুরুজন, তাঁহার নিন্দা করিব না। আমরা তাঁহার অর্থলালসার কথা শুনিয়া বড়ই দুঃখিত হইয়াছি,-আক্ষেপ করিয়াছি। কি করি, পিতা গুরুজন, তাঁহার কথার প্রতিবাদ করাই মহাপাপ; যাহাই হউক, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন; রাত্রি দ্বিপ্রহর অতীত হইলেই আমরা দুই ভাই, বালকদ্বয়কে সঙ্গে করিয়া মদিনায় যাইব। যদি সুবিধা করিতে পারি ভালই, না করিতে পারি, আমরা সঙ্গে করিয়া লইয়া মদিনায় রাখিয়া আসিব।"

গৃহিণী সন্তুষ্টচিত্তে অথচ চক্ষুজলে ভাসিতে ভাসিতে দুই পুত্রের দুই হাত দুই হাতে ধরিয়া আপন মাথার উপর রাখিয়া বলিলেন, "বাবা, তোরা আমার মাথার উপর হাত রাখিয়া বল যে, আমরা সাধ্যানুসারে বালকদ্বয়কে রা করিব।"

পুত্রদ্বয় অকপটচিত্তে স্বীকার করিল, আর বলিল, "মাতঃ! আপনি নিশ্চয় জানিবেন বালকদ্বয়ের অনিষ্ট সম্বন্ধে আমাদের পিতার কোন কথা আমরা শুনিব না; বরং তাঁহার বিরোধী হইব। আপনার আদেশ-আপনার আজ্ঞা পালন করিতে যদি আমাদের প্রাণও যায় তত্রাচ আপনার আদেশের অন্যথা করিব না, কি পশ্চাৎপদ হইব না।"

দুই পুত্র লইয়া গৃহিণী অন্য গৃহে পরামর্শ করিতেছেন। অন্য কক্ষে অতি নির্জন স্থানে ভ্রাতৃদ্বয় শুইয়া আছে। ভিন্ন আর এক কক্ষে হারেস শুইয়াছেন। ঈশ্বরের মহিমার অন্ত নাই। মোহাম্মদ ও এব্রাহিম, নির্জন কে নিদ্রায় ছিলেন, হঠাৎ মোহাম্মদ জাগিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে এব্রাহিমকে জাগাইয়া বলিল, "ভাইরে, আর ঘুমাইও না। শুন-স্বপ্নবিবরণ শুন। এখনই পিতাকে স্বপ্নে দেখিলাম। শুন, অতি আশ্চর্য স্বপ্ন।"

"স্বপ্নে দেখিলাম-আকাশের দ্বার হঠাৎ খুলিয়া গেল। স্বর্গীয় সৌরভে জগৎ আমোদিত ও মোহিত হইল। দেখিলাম, স্বর্গীয় উদ্যানে হজরত মোহাম্মদ রসুল মকবুল (দ.), হজরত আলী (ক.), হজরত বিবি ফাতেমা জোহ্‌রা এবং হজরত 'হাসন-উদ্যানে ভ্রমণ করিতেছেন। পিতৃদেব তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ বেড়াইতেছেন। আমরা দুই ভ্রাতা দূরে দাঁড়াইয়া আছি। ইতিমধ্যে হজরত রসুল মকবুল, আমাদের পিতৃদেবকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, 'মোস্‌লেম! তুমি চলিয়া আসিলে, আর তোমার দুইটি পুত্রকে জালেমের হস্তে রাখিয়া আসিলে?' পিতৃদেব করজোড়ে নিবেদন করিলেন, "হজরত! এলাহির কৃপায় তাহারাও 'ইন‌শাআল্লাহ্' আগামীকল্য পবিত্র পদচুম্বনের জন্য আসিবে।"

এব্রাহিম বলিল, "ভাই! আমিও ঐ স্বপ্ন দেখিয়াছি! আর চিন্তা কি? রাত্রি প্রভাতেই আমরা পিতৃদেবের নিকট যাইব। এস ভাই, এইক্ষণে দুই ভাই গলাগলি করিয়া একবার শয়ন করি। জগতের নিদ্রার আজ শেষ নিদ্রা, নিশিরও শেষ। আমাদের পরমায়ুরও শেষ! এস ভাই, এস! গলাগলি করিয়া একবার শয়ন করি।" দুই ভাই এই বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিতেই, পাপমতি হারেসের নিদ্রাভঙ্গ হইল। অতি ত্রস্তে শয্যা ত্যাগ করিয়া স্ত্রীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "আমার বাড়িতে বালকের ক্রন্দন? কাহার ক্রন্দন! কোথায় তাহারা? কোথা হইতে তাহারা আসিয়াছে? কে তাহাদিগকে তোমার নিকট আনিয়া দিল? শীঘ্র-শীঘ্র প্রদীপ জ্বালিয়া আন। আর যাহারা কাঁদিতেছে, তাহাদিগকেও আমার সম্মুখে লইয়া আইস।"

হারেস-জায়া নীরব। কারণ দুর্দান্ত স্বামীর নিদ্রাভঙ্গ। প্রদীপ জ্বালিতে আদেশ। 'যাহারা কাঁদিতেছে, তাহাদিগকে আমার সম্মুখে আনয়ন কর'-এই সকল কথায় সতী-সাধ্বী দয়াবতীর প্রাণপাখি যেন দেহপিঞ্জর হইতে উড়ি-উড়ি ভাব করিতে লাগিল। কী করিবেন, কোথা যাইবেন-কিছুই বোধ নাই-জ্ঞান নাই-নীরব। হারেস গৃহিণীর এইরূপ ভাব দেখিয়া অবাক্ হইলেন। এ কী? এ এরূপ হইল কেন? হারেস জিজ্ঞাসা করিলেন, "তোমার এ কী ভাব হইল?" কোন উত্তর নাই। নির্বাকে একেবারে স্বামীর মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। হারেস স্ত্রীর এইরূপ অন্যমনস্ক ভাব দেখিতে পাইয়া নিজেই প্রদীপ জ্বালিয়া যে গৃহ হইতে ক্রন্দনের শব্দ আসিতেছিল সন্ধান করিয়া প্রদীপহস্তে সেই গৃহে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন, দুইটি বালক গলাগলি করিয়া শুইয়া কাঁদিতেছে। হারেস দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। অস্ফুটস্বরে বলিলেন, "এ কাহারা? আমার বাড়ির নির্জন স্থানে পরম রূপবান দুইটি বালক শয়নাবস্থায় কাঁদে কেন?" হারেস কর্কশভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তোরা কে? কাঁদছিস্ কেন? শীঘ্র বল্-কে তোরা?"

বালকদ্বয় সভয়ে উত্তর করিল, "আমরা হজরত মোস্‌লেমের পুত্র।" হারেস নিকটে যাইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিতে লাগিল, "মোস্‌লেমের পুত্র! তোরাই মোস্‌লেমের পুত্র! আমি কী আহাম্মক-কী পাগল! ঘরে শিকার রাখিয়া জঙ্গলে ঘুরিতেছি! কী পাগলামি! যাক্, যাহা হইবার হইয়াছে। আমার অদৃষ্টজোরেই ঘরে আসিয়াছে। পঞ্চ হাজার মোহর পায় হাঁটিয়া আমার নির্জন ঘরে আসিয়া রহিয়াছে। এখন কী করি! রাত্রি প্রভাত হইতে অনেক বিলম্ব। আর যাইবে কোথা!" এই বলিয়া দুই ভ্রাতার জোলফে জোলফে বন্ধন করিলেন। চুলে টান পড়ায় দুই ভাই কাঁদিয়া উঠিতেই হারেস-নির্দয় হারেস উভয় ভ্রাতার সুললিত কোমল গণ্ডে সজোরে চপেটাঘাত করিয়া বলিল, "চুপ! চুপ! কাঁদবি তো এখনই মাথা কেটে ফেল্‌বো।"

বলিতে বলিতে দুই ভ্রাতার হস্ত বন্ধন করিয়া, দ্বারে জিঞ্জির লাগাইয়া দ্বার ঘেঁষিয়া শয্যা পাতিয়া তরবারিহস্তে বসিয়া রহিলেন। স্বগতঃ বলিতে লাগিলেন, "আর ঘুমাইব না। আর কী-হোঃ হোঃ! আর কী, প্রভাতেই মোহরের তোড়া, মোহরের ঝন‌ঝন্,-এইবার সুখের সীমা কতদূর দেখিয়া লইব।"

গৃহিণী কাঁদিতে কাঁদিতে স্বামীর পা দুখানি ধরিয়া বলিলেন, "ছেলে দুটির প্রতি দয়া কর।" হারেস বলিলেন, "দয়া তো করিবই, রাত্রিটা আছে বলে দয়া দেখিতে পাইতেছ না। একটু পরেই দয়া-মায়া সকলই দেখিবে।"

"দেখ, তুমি আমার স্বামী। তোমার পায়ের উপর মাথা রাখিয়া বলিতেছি ছেলে দুইটির প্রতি কোনরূপ অত্যাচার করিয়ো না। এতিমের উপর কোনরূপ কর্কশ ব্যবহার করিতে নাই। ছেলে দুটির প্রতি দয়া কর। টাকা কয় দিন থাকিবে?"

হারেস স্ত্রীর মাথায় পদাঘাত করিয়া বলিল, "দূর হ!হতভাগিনী, দূর হ! আমার সম্মুখে হতে দূর হ! তোকে কী করিব? তুই চলে যা-তোর কথাই শুনিব কি-না? পাঁচ হাজার মোহর লক্ষ্মীর কথায়, বুড়ী রূপসীর মায়া কান্নায় ছাড়িয়া দিব? এ তো আমার ঘরে তোলা টাকা। দেখ! ফিরে আমার বিছানার নিকট আস্‌বি কি মাথা মাটিতে গড়াইয়া দিব। তোরা সকলে ভেবেছিস্ কী? আমার চক্ষে ঘুম নাই। তোদের চক্ষে ঘুম নাই। আর তোরা কখনোই একথা মনে করিস্ না যে, মোস্‌লেমের দুই পুত্র আমার হাতছাড়া হইয়া মোহরগুলি হাতছাড়া হইবে, তাহা হইবে না। আর তোরা যা ভাবছিস্ তাহাও হইবে না। আমি নিশ্চয় বুঝিয়াছি, মোস্‌লৈমের দুই পুত্রকে জীবন্ত ভাবে, মহারাজ জেয়াদের দরবারে লইয়া যাইতে আমার মত লোকের সাধ্য নাই। পথে বাহির হইলেই, চারিদিক্ হইতে পুরস্কারলোভী গুণ্ডার দল বালক দুটিকে জোর করিয়া লইয়া যাইবে। কী অন্যায় কথা! ধরিলাম আমি, পুরস্কার পাইব আমি। তাহা না হইয়া যার বল বেশি সেই বলপূর্বক লইয়া মহারাজ জেয়াদ্-দরবারে উপস্থিত করিয়া বিজ্ঞাপিত পুরস্কার লইবে। টাকার লোভ বড় শক্ত লোভ। আমি সে সকল ভবিষ্যৎ আশঙ্কার মধ্যেই যাইব না। রাত্রি প্রভাত হইলেই মোস্‌লেম-পুত্রদ্বয়ের শুধু মস্তক লইয়া রাজদরবারে উপস্থিত করিব। তাহাতেই আশা, পূর্ণ কার্যসিদ্ধি। মহারাজ অধিক পরিমাণে সন্তুষ্ট হইবেন।"

স্ত্রীকে সম্বোধন করিয়া হারেস বলিলেন, "তুই স্ত্রীলোক। ওরে তুই কী বুঝিবি? এ সকল উপার্জনের অঙ্গ তুই কী বুঝিবি রে? ছেলে দুটিও দেখ্ছি ওদের পাগলী মায়ের কথায় পাগল হইয়াছে। আমার চক্ষে ঘুম নাই। তোমাদের চক্ষে ঘুম নাই? যা যা, তোরা বিছানায় যা!"

এদিকে রাত্রি প্রভাত সংবাদ, কুক্কুট দল সপ্তস্বরে কুফা নগরকে জাগ্রত করিতে লাগিল। হারেস প্রত্যূষে উঠিয়াই, মোস্‌লেমের পুত্রদ্বয়কে বন্ধন করিয়া ঘোড়ার পিঠে চাপাইয়া, সু-ধার তরবারি ও ঘোড়ার বাগডোর হস্তে ধরিয়া ফোরাত নদীতীরে যাইতে লাগিল। হারেসের দুই পুত্রও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়িল। গৃহিণীও কাঁদিতে কাঁদিতে অশ্ব-পশ্চাতে মাথায় ঘা মারিতে মারিতে ছুটিলেন। গৃহিণীও দুই পুত্রসহ গোপনে পরামর্শ করিয়াছেন, যে উপায়ে হয় তাঁহারা তিনজনে একত্রে বালক দুটিকে রক্ষা করিবেন, উপস্থিত যমের হস্ত হইতে রক্ষা করিবেন। পুত্রদ্বয় মাতার পদস্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, দেহে প্রাণ থাকিতে আমাদের দুই ভ্রাতার শির স্কন্ধে থাকিতে, মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়ের শির দেহ-বিচ্ছিন্ন হইতে দিব না। দৌড়িতে দৌড়িতে সকলেই ফোরাতনদী তীরে উপস্থিত হইলেন।

হারেসের ক্ষণকালও বিলম্ব সহিতেছে না। শীঘ্র শীঘ্র কার্য শেষ করিয়া দুই ভ্রাতার দুইটি মাথা মহারাজ জেয়াদ্-দরবারে উপস্থিত করিলেই তাহার কার্যের প্রথম পালা শেষ হয়। দ্বিতীয় পালা মোহরগুলি গণিতে যে বিলম্ব। যে ঘোড়ার পৃষ্ঠে বালকদ্বয়ের মাথা চাপাইয়া রাজদরবারে লইয়া যাইবেন, সেই ঘোড়ার পৃষ্ঠেই মোহরের ছালা তুলিয়া শীঘ্র বাটীতে আসিতে পারিবেন। এইরূপ কার্যপ্রণালী মনে মনে স্থির করিয়া শীঘ্র শীঘ্র বালকদ্বয়ের মাথা কাটিতে আগ্রহ করিতেছেন। বালক দুটিকে অশ্ব হইতে নামাইয়া সম্মুখে খাড়া করিলেন। তাহারা যদিও পিতা মোস্‌লেমকে স্বপ্নে দেখিয়া শীঘ্রই পিতার নিকট যাইতেই হইবে স্বপ্নযোগে শুনিয়া আনন্দিত হইয়াছিল, সে আনন্দ কতক্ষণ? কুহকিনী দুনিয়ার এমনই মায়া যে, তাহাক ছাড়িবার কথা কর্ণে প্রবেশ করিলেই, প্রাণ কাঁদিয়া উঠে। মৃত্যুর কথা মনে পড়িলেই হৃদয়ে ভয়ের সঞ্চার হয়; প্রাণের মায়া কাহার না আছে? মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়, হারেসের সম্মুখে দণ্ডায়মান। উলঙ্গ খরধার অসিহস্তে, কালান্তকের ন্যায় রক্তজবা সদৃশ আঁখিতে চাহিয়া বালক দুটির আপাদমস্তক প্রতি হারেসের দৃষ্টি। দুই ভাই কাঁদিতে কাঁদিতে হারেসের পদতলে মাথা রাখিয়া বলিতে লাগিলেন, "দোহাই তোমার! আমাদিগকে প্রাণে মারিয়ো না। তোমার পদতলে মাথা রাখিয়া বলিতেছি আমাদিগকে ছাড়িয়া দাও। আমাদের চিরদুঃখিনী মায়ের মুখখানি একবার দেখিতে আমাদিগকে ছাড়িয়া দাও-মদিনায় যাই আর কখনো কুফায় আসিব না।"


পরবর্তী পাতা