বিষাদ সিন্ধু/মহরম পর্ব/ত্রয়োবিংশ প্রবাহ /৬

উইকিসংকলন থেকে

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেন
মহরম পর্ব (ত্রয়োবিংশ প্রবাহ /৬)

বালকদ্বয়ের কাতর ক্রন্দন পাষাণপ্রাণ হারেসের কিছুই হইল না। সে দুরন্ত নরপিশাচ পিতৃহারা বালকদ্বয়ের করুণ ক্রন্দন কর্ণেই করিল না। একটি বর্ণও শুনিল না। হারেস বালকদ্বয়ের শির লক্ষ্য তরবারি উত্তোলন করে, আবার কে যে বাধা দেয় থামিয়া যায়। আবার ক্ষণকাল পরে মুখ-চক্ষু লাল করিয়া আঁখিদ্বয়ের তারা বাহির করিয়া বালকদ্বয়ের শির লক্ষ্য করিয়া তরবারি একবার উত্তোলন করে, আবার থামিয়া যায়। কী মর্মঘাতী দৃশ্য! হারেসের এই অত্যাচার অমানুষিক ব্যবহার ও হৃদয়বিদারক ঘটনার সূত্রপাত মুক্ত আকাশে দিননাথ শত সহস্র কিরণজাল বিস্তার করিয়া দেখিতেছেন। ফোরাত নদী তীরে ঘটনা, ফোরাত জলও দেখিয়া যাইতেছে, প্রবাহে প্রবাহে হারেসের এই কুকীর্তি দেখিয়া বহিয়া চলিয়া যাইতেছে। নদীতীরে পিতৃহারা অনাথ দুটি বালক, কৃপাণধারী যমদূত-সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া কাতর কণ্ঠে বলিতেছে, "ওগো! আমাদিগকে প্রাণে মারিয়ো না।" প্রাণের দায়ে, হন্তার পদতলে লুটাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিতেছে, "আমরা দুখিনীর সন্তান। জনমের মত পিতাকে এই দেশে হারাইয়াছি। মায়ের মুখখানি দেখিব। তোমার নিকটে প্রাণভিক্ষা চাহিতেছি-আমাদের দুই ভায়ের প্রাণ এখন তোমারই হাতে। দয়া করিয়া আমাদের প্রাণভিক্ষা দাও। আমরা জীবনে আর কুফায় আসিব না।"

বালক দুইটি কতই অনুনয়-বিনয় করিল-হারেসের মন গলিল না। হারেসের সম্মুখে বধ্যভূমে বালকদ্বয় দণ্ডায়মান। বামপার্শ্বে হারেসের দুই পুত্র-বিষাদবদনে দণ্ডায়মান। দয়াবতী হারেস-জায়াও পুত্রদ্বয়ের পশ্চাৎ-মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়ের প্রতি একদৃষ্টে চাহিয়া স্বামীর ভয়ে নীরবে কাঁদিয়া চক্ষুজলে ভাসিতেছেন। হারেস এক-এক বার তরবারি উত্তোলন করে, আবার থামিয়া যায়। একবার বালকদ্বয়ের মুখের দিকে, তৎপরেই ফোরাতের জল-স্রোতের দিকে চাহিয়া ঊর্ধ্বে দৃষ্টি করে। ক্রমেই বিলম্ব হইতে লাগিল।

হারেস যেন বিরক্ত হইয়া পালকপুত্রকে বলিল, "পুত্র! ধর তো, আমার এই তরবারি। আজ দেখিব তোমার তরবারির হাত। একচোটে দুইটি বালকের মাথা মাটিতে গড়াইয়া দাও দেখি!"

পুত্র উত্তর করিল, "পিতঃ! আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমি উহা পারিব না। নিষ্পাপ, নিরপরাধ, দোষশূন্য দুইটি পিতৃহীন অনাথ বালককে টাকার লোভে খুন করিতে আমি পারিব না। কখনোই পারিব না। বরং ঐ বালকদ্বয়ের প্রাণ রক্ষা করিতে যাহা আবশ্যক হয় তাহা করিব। আমার প্রাণ দিব, তত্রাচ ঐ বালকদ্বয়ের প্রতি কোনরূপ অত্যাচার হইতে দিব না। আমি আপনার এবং এ অবৈধ আদেশ কখনোই প্রতিপালন করিব না। টাকার লোভে মানুষ খুন! এ মানুষের কার্য নহে,-ডাকাত! ডাকাত!"

হারেস রোষকষায়িত লোচনে রক্তআঁখি ঘুরাইতে ঘুরাইতে বলিতে লাগিল, "কী রে পামর! আমার কার্য তোর চক্ষে হইল অবৈধ? তোর এত বিচারে কাজ কী? আর এত লম্বা-চওড়া কথা তুই কার কাছে শিখেছিস্? তুই আমার হুকুম মানিবি কি-না তাহাই বল? তুই বেটা ভারি বৈধ?"

"আপনি যাহাই বলুন, আমি মানুষ খুন করিতে পারিব না। আর এই দুটি বালককে আমি রক্ষা করিব। আমি এতক্ষণ কিছুই বলি নাই। দেখি আপনি পাপের কোন্ সীমায় গিয়া উপস্থিত হন? জানিবেন, পিতা বলিতে ঘৃণা বোধ হইতেছে। জানিবেন দস্যু মহাশয়! জানিবেন লোভীর লোভ পূর্ণ হয় না। ঈশ্বর তাহার মনের আশা পূর্ণ করেন না। এই দেখ তাহার দৃষ্টান্ত।"

বালকদ্বয় প্রতি চাহিয়া বলিল, "এস ভাই! তোমরা এস। আমি তোমাদিগকে এখনই মদিনায় লইয়া যাইতেছি।"

বালকদ্বয় মদিনার নাম শুনিয়াই যেন, প্রাণের ভয় ভুলিয়া গেল। হারেস-পালকপুত্র, হস্ত বাড়াইয়া বালকদ্বয়ের হস্ত ধরিয়া ক্রোড়ের দিকে টানিতেই হারেস ক্রোধে এক প্রকার জ্ঞানহারা হইয়া বিকম্পিত কণ্ঠে বলিল, "ওরে! নিমকহারাম! আমার হাত থেকে, বালকদ্বয়কে তুই কাড়িয়া লইবি! তোর এত বড় ক্ষমতা? এত বড় মাথা! তোকেই আগে শিক্ষা দেই।" পালকপুত্রের দক্ষিণ হস্ত মোস্‌লেম-পুত্রদ্বয়ের দিকে প্রসারিত, বালকদ্বয়ও ঐ প্রসারিত হস্ত ধরিতে একটু মাথা নোয়াইয়া অগ্রসর চেষ্টা, এই সময়ে হারেসের তরবারি পালকপুত্রের গ্রীবা লক্ষ্যে উত্তোলিত হইল। চক্ষের পলক পড়িতেও অবসর হইল না। হারেসের আঘাতে পালকপুত্রের শির ফোরাতকূলের বালুকা-মিশ্রিত ভূমিতে গড়াইয়া পড়িল। হারেসের রক্তরঞ্জিত তরবারি ঝন‌ঝন্ শব্দে কাঁপিয়া উঠিল। গৃহিণী পালকপুত্রের অবস্থা দেখিয়া আর ক্রন্দন করিলেন না। স্ত্রীস্বভাববশতঃ অস্থির হইয়া চতুর্দিক অন্ধকারও দেখিলেন না-আপন গর্ভজাত পুত্রের প্রতি আদেশ করিলেন, "বাছা এই তো সময়; তোমার প্রতিজ্ঞা পূরণ কর। বালক দুটিকে রক্ষা কর।" মাতৃ আজ্ঞা প্রাপ্তমাত্র পিতৃহীন বালকদ্বয়কে রাক্ষস হারেসের হস্ত হইতে বলপূর্বক কাড়িয়া লইতে একলম্ফে বালকদ্বয়ের নিকটে পড়িলেন। হারেস পালকপুত্রের শির দেহবিচ্ছেদ করিয়া বালকদ্বয়ের প্রতি অসি উত্তোলন করিতেই দয়াবতী গৃহিণীর গর্ভজাত সন্তান প্রতি আদেশ-আদেশমাত্র বীর পুত্র বালকদ্বয়কে বুকের মধ্যে করিয়া আঘাত ব্যর্থ করিলেন। হারেস ক্রোধে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল, "ওরে! তুইও তোর মায়ের কথায় আমার বিরোধী হইয়াছিস্? আমার লাভে বাধা দিতে পারিবি না। মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়কে রক্ষা করিতে পরিবি না-পারিবি না। ওরে মূর্খ! তোর জন্যও যমদূত দণ্ডায়মান। ছেড়ে দে ছোঁড়া দুটাকে!"

পুত্র বলিল, "কখনোই ছাড়িব না। নরপিশাচ অর্থলোভীর অর্থলাভ জন্য জীবন্ত জীবকে নরব্যাঘ্রের হস্তে দিব না-দিব না।"

"দিবি না? আচ্ছা যা তুইও যা,-বিদ্রোহী পুত্রকে চাহি না। যা বেটা জাহান্নামে যা-" মুহূর্তমধ্যে তরবারি কম্পিত হইয়া বিজলিবৎ চমকিয়া স্বীয় ঔরসজাত পুত্রের গ্রীবাদেশে বসিয়া, পিতার আঘাতে পুত্রের শির ফোরাতকূলে দেহ বিচ্ছিন্ন করিয়া দিল। গৃহিণীর চক্ষের উপর এই সকল হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটিতেছে। পালকপুত্র ও গর্ভজাত পুত্র, দুই পুত্রের খণ্ডিত দেহ মাটিতে পড়িয়া আছে। দুইটি মস্তক যেন তাঁহারই মুখের দিকে চক্ষু সহায়ে তাকাইয়া আছে। এখনো চক্ষুর পাতা বন্ধ হয় নাই। চারিটি চক্ষুই একদৃষ্টে মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া আছে। এ দৃশ্য দেখিয়া গৃহিণী পুত্রদ্বয়ের কথা মনেই করিলেন না, স্বামীর ভয়ানক উগ্রমূর্তি দেখিয়া ভয় করিলেন না। বালকদ্বয় প্রতিই তাঁহার লক্ষ্য-কি উপায়ে তাহাদিগকে রক্ষা করিবেন এই চিন্তাই প্রবল। হারেস রক্তরঞ্জিত তরবারি দ্বারা বালকদিগের মস্তকে আঘাত করিবেন এমন সময় গৃহিণী 'ও কি কর-কি কর' বলিয়া তরবারিসমেত স্বামীকে জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, "তুমি স্বামী আমি স্ত্রী, আমি এত বিনয় করিতেছি! মোস্‌লেম পুত্রদ্বয় শিরে অস্ত্র আঘাত করিয়ো না। দেখ! একবার ঐ দিকে চাহিয়া দেখ। তোমার কার্যফল দেখ। টাকার লোভে পুত্রসম পালকপুত্রের প্রাণ বিনাশ করিলে। তোমার হৃদয়ের সার, কলেজার অংশ নয়নের মণি যুবা পুত্রকে টাকার লোভে দুই খণ্ড করিলে! ভালই করিলে! টাকার লোভে আজ তোমার নিকট পিতৃস্নেহ পরাস্ত হইল। ভালই করিলে! তোমার এ কীর্তিগান চিরকাল জগতে লোকে গাহিবে। দুঃখ নাই।-তোমার পুত্রের প্রাণ তুমি বিনাশ করিয়াছ তাহাতে হতভাগিনীর দুঃখ নাই। তোমার ঔরসজাত নয়, আমার গর্ভেও জন্মে নাই, তবে আমার বুকের দুধ দিয়া উহাকে পালিয়া পুষিয়া এত বড় করিয়াছিলাম। তাহারই জন্য মনটা একটু দমিয়াছে। তাই বলিয়া তোমাকে কিছু বলিব না। একথা তুমি নিশ্চয় জানিয়ো-আমি বাঁচিয়া থাকিতে আমার প্রাণ দেহে থাকিতে, আমার সম্মুখে মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়ের মাথা কাটিতে দিব না। কখনোই দিব না। আমাকে আগে কাটিয়া খণ্ড খণ্ড কর। তাহার পর মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়ের গায়ে হাত দিয়ো-অস্ত্র বসাইয়ো।"

মানুষের কু-প্রবৃত্তি উত্তেজিত হইলে আর কী রা আছে? হারেস বলবান কৌশলী! কৌশলে স্ত্রীর হাত ছাড়াইয়া রক্ত-আঁখি ঘুরাইয়া বলিল, "তোকেও তোর ছেলের নিকট পাঠাচ্ছি। যা তোর ছেলে কোলে করে শুইয়া থাক্!" বিষম রোষে স্ত্রীর প্রতি আঘাত। "যা শুইয়া পড়। শুইয়া শুইয়া তামাশা দেখ-!"

হারেস-স্ত্রী মৃত্তিকায় পড়িতেই-হারেস উচ্চৈঃস্বরে বলিল, "এই মোস্‌লেমের পুত্রদ্বয় যায়। আয়! কে রক্ষা করিবি, আয়?"

মোহাম্মদের শিরে তরবারি আঘাত করিতেই এব্রাহিম কাঁদিয়া বলিল, "দেখ হারেস! আগে আমার মাথা কাটো।"-বলিয়া মাথা নোয়াইয়া দিয়া বলিলেন, "আমি বড় ভাইয়ের মাথা কাটা এই চক্ষে দেখিতে পারিব না। হারেস! তোমার পায়ে ধরি, আগে আমার মাথা কাটো।" হারেস মোহাম্মদকে ছাড়িয়া এব্রাহিমের মাথায় তরবারি বসাইতেই মোহাম্মদ কাঁদিয়া বলিল, "হারেস! অমন কার্য করিয়ো না-করিয়ো না। আমার প্রাণতুল্য কনিষ্ঠ ভাই। আমারই মাথা আগে কাটো, বড় ভাই, ছোট ভাইয়ের মাথা কাটা কোন্ প্রাণে দেখিবে? দোহাই তোমার-দোহাই তোমার ধর্মের-আগে আমার মাথা কাটো।"

হারেস মোহাম্মদের কথায় থতমত খাইয়া ক্ষণকাল স্থিরভাবে থাকিয়াই মহা সাংঘাতিক মূর্তিধারণ করিয়া অসি ঘুরাইয়া বলিল, "তোদের কাহারো কথা শুনিব না। আর শুনিব না, বিলম্ব করিব না। ভ্রাতৃমায়া মিটাইয়া দিতেছি।"-বলিয়া অগ্রে মোহাম্মদের মাথা কাটিল। পরে কনিষ্ঠ ভ্রাতা এব্রাহিমের মাথা মাটিতে গড়াইয়া দিল। সকলের মৃতদেহ ফোরাতজলে নিক্ষেপ করিয়া মোস্‌লেম-পুত্রদ্বয়ের মস্তক অতি সাবধানে লইয়া অশ্বে চাপিল। রক্তমাখা তরবারিহস্তেই একেবারে মহারাজ জেয়াদের দরবারে উপস্থিত হইয়াই বলিল, "বাদশাহ নামদারের আদেশ প্রতিপালন করিয়াছি। তবে আজ্ঞার কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত হইয়াছে। আপনি যাহা করিতেন, তাহাই করিয়াছি। জীবন্ত আনিতে পারিব না, অপরে কাড়িয়া লইবে সন্দেহে জীবনান্ত করিয়া-এই দুই ভাইয়ের দুটি 'মাথা' আনিয়াছি,-এই দেখুন! আমার পুরস্কার-আপনার আদেশিত পুরস্কার আমাকে দিন, আমি চলিয়া যাই। স্বীকৃত পঞ্চ সহস্র মোহর আনিতে আজ্ঞা করুন। মহারাজ! ছেলে দুইটিকে খুঁজিয়া বাহির করিতে যাহা হইবার হইয়াছে, তাহা বলিবার নহে।"

নরপতি আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্, রাজদরবারের সভাসদগণ, অমাত্যগণ, দরবারের যাবতীয় লোক হারেসের এই অমানুষিক কার্য দেখিয়া ক্ষণকাল নিস্তব্ধভাবে রহিলেন। সকলেই মোস্‌লেমের পুত্রদ্বয়ের জন্য অন্তরে বিশেষ আঘাতপ্রাপ্ত হইলেন। কাহারও মুখে কোন কথা সরিল না। নরপতি আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ হারেসের প্রতি লক্ষ্য করিয়া দুঃখিতভাবে বলিলেন, "ওহে! এমন সুন্দর বালক দুইটিকে এইরূপভাবে শিরচ্ছেদ করিলে; কেন? যাও, শীঘ্র দরবার হইতে বাহির হও। উহাদের ধূলি-রক্ত-জমাটযুক্ত মস্তক ধৌত করিয়া পরিষ্কার এক পাত্রে করিয়া আমার সম্মুখে আনয়ন কর!"

তখনই মস্তকদ্বয় ধৌত করিয়া মূল্যবান পাত্রোপরি রাখিয়া নরপতি সম্মুখে উপস্থিত করিল। জেয়াদ্ বলিলেন, "ওহে যুগল-বালকহন্তা পাষাণপ্রাণ হারেস! তোমার মন কী উপকরণে গঠিত বল শুনি? সত্যই কী মানব-রক্তমাংস তোমার দেহে নাই? অন্য কোন প্রকারে জীবনীশক্তি থাকিতে পারে! এই বালক দুটির মুখের লাবণ্য, চক্ষের ভাব, গণ্ডস্থলের স্বাভাবিক ঈষৎ গোলাপী আভা দেখিয়াও কী তোমার মনে কিছুই বলে নাই? হাতের তরবারি কী প্রকারে ঊর্ধ্বে উঠিল? ইহাদের বিষাদমাখা মুখভাব দেখিয়াও কী তরবারি নীচে নামিল না? মহারাজ এজিদ্ নামদার যদি মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়কে দামেস্কে পাঠাইতে আদেশ করেন, তখন আমি কী করিব? উপায় কী? অল্পবয়স্ক বালক দুইটিই কী আমার বেশি ভারবোধ হইয়াছিল? তাহাদের জীবিত থাকাই কী আমার বিশেষ ভয়ের কারণ হইয়াছিল? ওহে বীর! বালকহন্তা মহাবীর! আমার ঘোষণায় কি বালকদের শিরচ্ছেদ করিয়া মাথা আনিবার কথা ছিল? না ডঙ্গা বাজাইয়া মাথা আনিবার ঘোষণা করা হইয়াছিল?"

হারেস বলিল,"শিরচ্ছেদের কথা ছিল না। ধরিয়া আনিবার আদেশ ছিল। জীবিত অবস্থায় তাহাদিগকে দরবার পর্যন্ত আনা দুঃসাধ্য বলিয়াই মাথা আনিয়াছি। শত শত জন এই বালকদ্বয়ের সন্ধানে ছিল। আমাকে দরবারে আনিতে দেখিলেই কাড়িয়া লইত। তাহারা রাজদরবারে আনিয়া স্বচ্ছন্দে পুরস্কার লাভ করিয়া যাইত। পরিশ্রম আমার-লাভ করিত ডাকাতদল। আমি বাদশাহ নামদারের মঙ্গলকামী হিতৈষী। চির-শত্রুর বংশে কাহাকেও রাখিতে নাই। হয়তো সময়ে এই বালকদ্বয় বীরশ্রেষ্ঠ বীর শত্রুর ন্যায় দণ্ডায়মান হইত। আমি একেবারে নির্মূল করিয়া দিয়াছি। আমাকে স্বীকৃত পুরস্কারে পুরস্কৃত করিয়া বিদায় করুন, আজ দুই দিন দুই রাত্রি আমার আহার নাই-নিদ্রা নাই-বিশ্রামের সময় অবসর কিছুই নাই। এই দুইটি বালকের মস্তক গ্রহণ করিতে আমার দুটি পুত্র এবং স্ত্রীর মাথা কাটিয়াছি।" দরবার সমেত সকলে মহা দুঃখিত হইলেন। নরপতি জেয়াদ বলিলেন, "ওহে বীর! সে কী কথা?"

"কী কথা! -আপনার শত্রুকুল নির্মূল করিতে আমার বংশ নিপাত করিলাম, তত্রাচ আপনার নিকট যশলাভ করিতে পারিলাম না। যাহার জন্যে এত কাণ্ড তাহা-অর্থাৎ সে মোহরগুলি পাইব কি-না তাহাতেও এখন সন্দেহ হইল।"

মন্ত্রীদল মধ্য হইতে একজন বলিলেন, "আপনার পুরস্কার ধরা আছে। -আর তিনটি খুন কি প্রকারে কোথায় করিলেন বলুন শুনি।"

"তিনটি খুনই বটে! কেন করিলাম শুনুন। আমার দুই পুত্র, এক স্ত্রী-এই তিনটি। তাহারা কিছুতেই এই শত্রুবালকদের শির কাটিতে দিবে না। বাধা দিতে আরম্ভ করিল! একে একে বাধা দিল। একে একে লাল বসন পরাইয়া ফোরাতজলের কূলে শয়ন করাইয়া দিলাম। এক স্থানেই সকলের শিরচ্ছেদে রক্তপাত। -নড়াচড়া-পরে সকলের দেহই ফোরাতজলে ক্ষেপণ। -অবগাহন-নিমজ্জন-বিসর্জন!"

আবদুল্লাহ্ জেয়াদ্ বলিলেন, "এ দৃশ্য আমি দেখিতে পারি না। নিরপরাধ বালকদ্বয়ের শির যে আপন হাতে কাটিতে পারে, সেই কার্যে বাধা দিয়াছিল-কাহারা? এই নরপিশাচের সন্তান দুইজন আর সহধর্মিণী স্বয়ং। তাহাদিগকেও বিনাশ করিয়াছে! -মোহরের এতই লোভ যে দুইটি পুত্র একটি স্ত্রী, সকলকেই বিনাশ করিয়াছে-এমন নররাক্ষসের শির কিছুতেই স্বস্থানে থাকিতে পারে না। হায়! হায়! একই সময়ে পাঁচটি মানবজীবন শেষ করিয়াছে। আমার আদেশ-মোস্‌লেম-পুত্রদ্বয়হন্তা হারেস, এই দুই বালকের শির সম্মানের সহিত মাথায় করিয়া ফোরাতকূলে লইয়া যাইবে। এই দুই বালকের মস্তক যে স্থানে দেহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়াছিল, সেই স্থানে সেই অস্ত্রে মহাপাপীর মস্তক দেহবিচ্ছিন্ন করিয়া, ফোরাতজলে নিক্ষেপ করিয়া জল অপবিত্র করিয়ো না। শৃগাল-কুকুরের ভক্ষণের সুযোগ করিয়া দিয়ো। স্‌লেম-পুত্রদ্বয়ের দেহখণ্ড ফোরাতজলে ভাসাইয়া দিয়াছে, কী করিব।-কোন উপায় নাই। বিশেষ সন্ধান করিয়া দেখিয়ো। যদি এই যুগল ভ্রাতার মৃতদেহ প্রাপ্ত হওয়া যায়, তবে রীতিমত কাফন-দাফন করিয়া যথোচিতরূপে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াদি করিয়া আমার আদেশ সম্পূর্ণ করিয়ো এবং কার্য শেষে আমাকে সংবাদ জ্ঞাপন করিয়ো।"

ঘাতক প্রহরী কার্যকারক তখনই রাজাদেশ মত কার্য করিতে প্রবৃত্ত হইল। মোস্‌লেম-পুত্রদ্বয়ের খণ্ডিত শির, মহামূল্য বস্ত্রে আবরিত করিয়া হারেস-শিরে চাপাইয়া ফোরাতকূলে লইয়া চলিল। ফোরাতকূলে যাইয়া দেখিল, রক্ত আর বালিতে জমাট বাঁধিয়া একস্থানে চিহ্নিত হইয়া রহিয়াছে। আরো এক আশ্চর্য ঘটনা দেখিল যে, মোস্‌লেম পুত্রদ্বয়ের শিরশূন্য যুগল দেহ গলাগলি করিয়া জড়াইয়া জলে ভাসিতেছে। কী আশ্চর্য! স্রোতজলে যে মৃতদেহ ভাসাইয়া দিয়াছিল, স্রোত বিপরীতে কে টানিয়া আনিল? আরো আশ্চর্য সংযোগ করিল কে? রাজকীয় কার্যকারক এই অত্যাশ্চর্য ঘটনা দেখিয়া, তাঁহার মনেও একটা কথা হঠাৎ উদয় হইল। তিনি পাত্রস্থ দুইটি মস্তক ফোরাতজলের নিকটে ধরিতেই জড়িত যুগল দেহ ভাসিতে ভাসিতে আসিয়া আপন-আপন মস্তকে সংলগ্ন হইল। রাজকর্মচারী দুই মৃতদেহ উঠাইয়া পৃথক্ করিতে বহু চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কিছুতেই পৃথক্ করিতে পারিলেন না। সে গলাগলির হস্তবন্ধন ছিন্ন করিতে পারিলেন না। সে অপূর্ব ভ্রাতৃস্নেহ-হস্তবন্ধন বহু যত্নেও ছিন্ন করিতে পারিলেন না। শবদেহের সে আশ্চর্য ভ্রাতৃমায়া বন্ধন ছাড়াইয়া পৃথক্ করিতে সম হইলেন না। বাধ্য হইয়া দুই ভ্রাতার দেহ একত্রে স্নান করাইয়া একত্রে কাফন করিয়া এক গোরে দাফন্ করিলেন।

তাহার পর হারেসের প্রতি রাজাজ্ঞা যাহা ছিল, তাহা সম্পাদন করিতেই হারেস বলিল, "আমার উচিত শাস্তি হইল। অতিরিক্ত লোভের অতিরিক্ত ফল ভোগ করিলাম। হা-পুত্র! হা-স্ত্রী!! হা-লোভ!!!"

হারেসের খণ্ডিত দেহ বধ্যভূমিতে পড়িয়া রহিল।


পরবর্তী পাতা