বিষাদ সিন্ধু/মহরম পর্ব/পঞ্চবিংশ প্রবাহ /২
উইকিসংকলন থেকে
| ←পঞ্চবিংশ প্রবাহ /১ | বিষাদ সিন্ধু মহরম পর্ব (পঞ্চবিংশ প্রবাহ /২) |
পঞ্চবিংশ প্রবাহ /৩→ |
কাসেম সমরক্ষেত্রে যাইয়া বলিতে লাগিলেন, "যুদ্ধ সাধ যদি কাহারো থাকে, যৌবনে যদি কাহারো অমূল্য জীবন বিড়ম্বনা জ্ঞান হইয়া থাকে, তবে কাসেমের সম্মুখে অগ্রসর হও।"
সেনাপতি ওমর পূর্ব হইতেই কাসেমকে বিশেষরূপে জানিতেন। কাসেমের তরবারি সম্মুখে দাঁড়াইতে পারে এমন বলবান বীর তাঁহার সৈন্যমধ্যে এক বর্জক ভিন্ন আর কেহই ছিল না। বর্জককে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন, "ভাই বর্জক! হাসানপুত্র কাসেমের সহিত যুদ্ধ করিতে আমাদের সৈন্যদল মধ্যে তুমি ভিন্ন আর কেহই নাই। ভাই! কাসেমের বলবীর্য, কাসেমের বলবিক্রম, কাসেমের বীরত্বপ্রতাপ সকলই আমার জানা আছে! তাহার সম্মুখে যাহাকে পাঠাইব, সে আর শিবিরে ফিরিয়া আসিবে না। আমি নিশ্চয় বলিতে পারি, কোন ক্রমেই কাসেমের হস্ত হইতে সে আর রক্ষা পাইবে না। নিরর্থক সৈন্যক্ষয় করা যুক্তিসিদ্ধ নহে। আমার বিবেচনায় তুমিই কাসেম অপেক্ষা মহাবীর। তুমিই কাসেমের জীবনপ্রদীপ নির্বাণ করিয়া আইস।"
বর্জক বলিলেন, "বড় ঘৃণার কথা! শামদেশে মহা মহা বীরের সম্মুখে আমি দাঁড়াইয়াছি, মিশরের প্রধান প্রধান মহারথীরা বর্জকের বীরত্ববীর্য অবগত আছে, আজ পর্যন্ত কেহই সম্মুখ যুদ্ধে অগ্রসর হইতে সাহস করে নাই; এখন কি-না, এই সামান্য বালকের সহিত ওমর আমাকে যুদ্ধ করিতে আদেশ করেন, বড়ই ঘৃণার কথা! হোসেনের সম্মুখে সমরক্ষেত্রে দণ্ডায়মান হইলে বরং কথঞ্চিৎ শোভা পায়; আর এ কি-না, কাসেমের সহিত যুদ্ধ। বালকের সঙ্গে সংগ্রাম! কখনোই না, কখনোই না! কখনোই আমি কাসেমের সহিত যুদ্ধ করিতে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা দিব না।"
ওমর বলিলেন, "তুমি কাসেমকে জান না। তাহাকে অবহেলা করিয়ো না। তাহার তুল্য মহাবীর মদিনায় আর নাই। ভাই বর্জক! তুই ভিন্ন কাসেমের অস্ত্রাঘাত সহ্য করে এমন বীর আমাদের দলে আর কে আছে?"
হাসিতে হাসিতে বর্জক বলিলেন, "কাহাকে তুমি কি কথা বল! ক্ষুদ্র কীট, ক্ষুদ্র পতঙ্গ কাসেম; তাহার মাথা কাটিয়া আমি কি বিশ্ববিজয়ী বীরহস্ত কলঙ্কিত করিব? কখনোই না, কখনোই না! সিংহের সহিত সিংহের যুদ্ধ হয়, শৃগালের সহিত সিংহ কোন কালে যুদ্ধ করে ওমর? সিংহ-শৃগাল! তুলনা করিলে তাহাও নহে। বর্জক সিংহ, কাসেম একটা পতঙ্গ মাত্র। কী বিবেচনায় ওমর! কী বিবেচনায় তুমি সেই তুচ্ছ পতঙ্গ কাসেমের সঙ্গে আমাকে যুদ্ধ করিতে পাঠাও? আচ্ছা, তোমার যদি বিশ্বাস হইয়া থাকে কাসেম মহাবীর, আচ্ছা, আমি যাইব না। আমার অমিততেজা চারি পুত্র বর্তমান, তাহারা রণক্ষেত্রে গমন করুক, এখনই কাসেমের মাথা কাটিয়া আনিবে।"
তাহাই, ওমরের তথাস্তু! আদেশমত বর্জকের প্রথম পুত্র যুদ্ধে গমন করিল। যুদ্ধক্ষেত্রে বর্শা চালাইতে আরম্ভ করিল। বিপক্ষ পরাস্ত হইল না। অবশেষে অসিযুদ্ধ! সম্মুখে কাসেম। উভয়ে মুখোমুখি হইয়া দণ্ডায়মান আছেন। বর্জকের পুত্র অস্ত্র প্রহার করিতেছেন কাসেম হাস্য করিতেছেন। বর্জকের পুত্রের তরবারিসংযুক্ত বহুমূল্য মণিমুক্তা দেখিয়া সহাস্য আস্যে কাসেম কহিলেন, "কী চমৎকার শোভা! মণিময় অস্ত্র প্রদর্শন করিলেই যদি মহারথী হয়, তবে বল দেখি, মণিমস্তক কালসর্প কেন মহারথী না হইবে?"
কথা না শুনিয়াই বর্জকের পুত্র কাসেমের মস্তক লক্ষ্য করিয়া অস্ত্র নিক্ষেপ করিলেন। অস্ত্র ব্যর্থ হইয়া গেল। পুনর্বার আঘাত। কাসেমের চর্ম বিদ্ধ হইয়া বাম হস্ত হইতে শোণিতের ধারা ছুটিল। ত্রস্তহস্তে শিরস্ত্রাণ ছিন্ন করিয়া ক্ষতস্থান বন্ধনপূর্বক ক্ষতযোদ্ধা পুনর্বার অস্ত্র ধারণ করিলেন। বর্জকের পুত্র বর্শা ধারণ করিয়া বলিলেন, "কাসেম! তলোয়ার রাখ। তোমার বামহস্তে আঘাত লাগিয়াছে। চর্ম ধারণে তুমি অক্ষম। অসিযুদ্ধেও তুমি এখন অক্ষম। বর্শা ধারণ কর, বর্শাযুদ্ধই এখন শ্রেয়ঃ।"
বক্তার কথা মুখে থাকিতে থাকিতে কাসেমের বর্শা প্রতিযোদ্ধার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া পৃষ্ঠ পার হইল। বর্জকের পুত্র শোণিতাক্ত শরীরে অশ্বপৃষ্ঠ হইতে ভূতলে পড়িয়া গেল। তাহার কটিবন্ধের মহামূল্য অসি সজোরে আকর্ষণ করিয়া কাসেম বলিলেন, "কাফের! মূল্যবান অস্ত্রের ব্যবহার দেখ।" এই কথার সঙ্গে সঙ্গেই বর্জক-পুত্রের মস্তক যুদ্ধক্ষেত্রে বিলুণ্ঠিত হইল। কাসেম বলিতে লাগিলেন, "রে বিধর্মী কাফেরগণ! আর কারে রণক্ষেত্রে কাসেমের সম্মুখে পাঠাবি, পাঠা।"
পাঠাইবার বেশি অবসর হইল না। দেখিতে দেখিতে মহাবীর কাসেম বর্জকের অপর তিন পুত্রকে শীঘ্র শীঘ্র শমনসদনে পাঠাইলেন। পুত্র-শোকাতুর বর্জক সেনাপতির আদেশের অপেক্ষা না করিয়া ভীম-গর্জনে স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা দিলেন। বীরদর্পে বলিতে লাগিলেন, "কাসেম! তুমি ধন্য! ক্ষণকাল অপো কর। তুমি আমার চারিটি পুত্র নিধন করিয়াছ, তাহাতে আমার কিছুমাত্র দুঃখ নাই। কাসেম! তুমি বালক। এত যুদ্ধ করিয়া অবশ্যই ক্লান্ত হইয়াছে। সপ্তাহকাল তোমার উদরে অন্ন নাই কণ্ঠে জলবিন্দু নাই, এ অবস্থায় তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করা কেবল বিড়ম্বনা মাত্র।"
কাসেম বলিলেন, "বর্জক! সে ভাবনা তোমার ভাবিতে হবে না। তুমি পুত্রশোকে যে প্রকার বিহ্বল হইয়াছ দেখিতেছে, তাহাতে তোমার পক্ষে এ সময় সংগ্রাম লিপ্ত হওয়াই বিড়ম্বনা।" বর্জক বলিলেন, "কাসেম! আমি তোমার কথা স্বীকার করি, পুত্র-শোকে অতি কঠিন হৃদয়ও বিহ্বল হয়; কিন্তু পুত্রহন্তার মস্তক লাভের আশা থাকিলে, এখনই পুত্রমস্তকের পরিশোধ হইবে, নিশ্চয় জানিতে পারিলে, বীরহৃদয়ে বিহ্বলতাই-বা কী? দুঃখই-বা কী? কাসেম! বল তো, তুমি ঐ তরবারিখানি কোথায় পাইলে? ও তরবারি আমার, আমি বহু যত্নে, বহুব্যয়ে মণিমুক্তা সংযোগে সুসজ্জিত করিয়াছি।"
কাসেম বলিলেন, "বেশ করিয়াছ!-তাহাতে দুঃখ কী? তোমার মণিমুক্তাসজ্জিত তরবারি দ্বারা তোমারই চারি পুত্র বিনাশ করিয়াছি। নিশ্চয় বলিতেছি, তুমিও এই মূল্যবান তরবারি আঘাত হইতে বঞ্চিত হইবে না। নিশ্চয় জানিয়ো, অন্য তরবারিতে, অন্যের হস্তে তোমার মস্তক বিচ্ছিন্ন হইবে না! আপেক্ষা করিয়ো না। তোমার এই মহামূল্য অসি তোমার জীবন বিনাশের নির্ধারিত অস্ত্র মনে করিয়ো।"
বর্জক মহাক্রোধে বর্শা ঘুরাইয়া বলিতে লাগিল, "কাসেম! তোমার বাক্চাতুরী এই মুহূর্তেই শেষ করিতেছি! তুমিও নিশ্চয় জানিয়ো, বর্জকের হস্ত হইতে আজ তোমার রক্ষা নাই।" এই বলিয়া সজোরে বর্শা আঘাত করিল। কাসেম বর্মদ্বারা বর্শাঘাত ফিরাইয়া বর্জকের বক্ষ লক্ষ্য করিয়া বর্শা উত্তোলন করিতেই বর্জক লঘুহস্ততা-প্রভাবে কাসেমকে পুনরায় বর্শাঘাত করিলেন। বীরবর-কাসেম বিশেষ চতুরতার সহিত বর্জকের বর্শা ফিরাইয়া আপন বর্শার দ্বারা বর্জককে আঘাত করিলেন। তরবারি ঘাত-প্রতিঘাতে উভয়ের বর্ম হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতে লাগিল। কাসেমকে ধন্যবাদ দিয়া বর্জক বলিতে লাগিল, "কাসেম্! আমি রুম, শাম, মিশর, আরব, আর-আর বহু দেশে বহু যোদ্ধার তরবারিযুদ্ধ দেখিয়াছি, কিন্তু তোমার ন্যায় তরবারিধারী বীর কুত্রাপি কখনোই আমার নয়নগোচর হয় নাই। ধন্য তোমার বাহুবল! তোমার শিক্ষাকৌশল! যাহা হউক, কাসেম! এই আমার শেষ আঘাত। হয় তোমার জীবন, না হয় আমার জীবন।" এই শেষ কথা বলিয়া বর্জক কাসেমের শির লক্ষ্য করিয়া তরবারি আঘাত করিলেন। কাসেম সে আঘাত তাচ্ছিল্যভাবে বর্মে উড়াইয়া দিয়া বর্জক সরিতে সরিতেই তাহার গ্রীবাদেশে অসি-প্রহার করিলেন। বীরবর কাসেমের আঘাত বর্জকের শির রণক্ষেত্রে গড়াইয়া পড়িল। এই ভয়াবহ ঘটনা দৃষ্টে এজিদের সৈন্যমধ্যে মহা হুলস্থূল পড়িয়া গেল।
বর্জকের নিপাত দর্শনে এজিদের সৈন্যমধ্যে কেহই আর সমরাঙ্গণে আসিতে সাহসী হইল না। কাসেম অনেকক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া, বিপদিগকে দেখিতে না পাইয়া একেবারে ফোরাত-তীরে উপস্থিত হইলেন। নদী রক্ষকেরা কাসেমের অশ্বপদধ্বনিশ্রবণে মহাব্যতিব্যস্ত হইয়া মহাশঙ্কিত হইল। কাসেম কাহাকেও কিছু বলিলেন না। তরবারি, তীর, নেজা, বল্লম, যাহা দ্বারা যাহাকে মারিতে সুবিধা পাইলেন, তাহার দ্বারা তাহাকে ধরাশায়ী করিয়া ফোরাতকূল উদ্ধারের উপক্রম করিলেন। ওমর, সীমার ও আবদুল্লাহ্ প্রভৃতিরা দেখিল, নদীকূল-রীরা কাসেমের অস্ত্র-সম্মুখে কেহই টিকিতেছে না। ইহারা কয়েকজনে একত্র হইয়া সমরপ্রাঙ্গণের সমুদয় সৈন্যসহ কাসেমকে পশ্চাদ্দিক হইতে ঘিরিয়া শর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। অনবরত তীর কাসেমের অঙ্গে আসিয়া বিদ্ধ হইতেছে; কাসেমের সে দিকে দৃকপাত নাই; কেবল ফোরাতকূল উদ্ধার করিবেন, এই আশয়েই সম্মুখস্থ শত্রুগণকে সংহার করিতেছেন। কাসেমের শ্বেতবর্ণ অশ্ব তীরাঘাতে রক্তধারায় লোহিতবর্ণ হইয়াছে! শোণিতধারা অশ্বপদ বহিয়া মৃত্তিকা রঞ্জিত করিতেছে। ক্রমেই কাসেম নিস্তেজ হইতেছেন;-শোণিত প্রবাহে চতুর্দিকেই অন্ধকার দেখিতেছেন। শেষে নিরুপায় হইয়া অশ্ববল্গা ছাড়িয়া দিলেন। শিক্ষিত অশ্ব কাসেমের শরীরের অবসন্নতা বুঝিতে পারিয়া দ্রুতপদে শিবির সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল, হাসনেবানু ও সখিনা, শিবির মধ্য হইতে অশ্বপদধ্বনি শুনিতে পাইয়া, বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, কাসেমের পরিহিত শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে, শোণিতধারা অশ্বপদ বহিয়া পড়িতেছে। কাসেম অশ্ব হইতে নামিয়া সখিনাকে বলিলেন, "সখিনা! দেখ তোমার স্বামীর সাহানা (লাল পোশাক।) পোশাক দেখ! আজ বিবাহ সময়ে উপযুক্ত পরিচ্ছদে তোমায় বিবাহ করি নাই, কাসেমের দেহবিনির্গত শোণিতধারা শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে পরিণত হইয়া বিবাহবেশ সম্পূর্ণ করিয়াছে। এই বেশ তোমাকে দেখাইবার জন্যই বহুকষ্টে শত্রুদল ভেদ করিয়া এখানে আসিয়াছি। আইস, এই বেশে তোমাকে একবার আলিঙ্গন করিয়া প্রাণ শীতল করি। সখিনা! আইস, এই বেশেই আমার মানসের চিরপিপাসা নিবারণ করি।"
কাসেম এই কথা বলিয়াই সখিনাকে আলিঙ্গন করিবার নিমিত্ত হস্ত প্রসারণ করিলেন। সখিনাও অগ্রবর্তিনী হইয়া স্বামীকে আলিঙ্গন করিলেন। কাসেমের দেহ-বিনির্গত শোণিত-প্রবাহে সখিনার পরিহিত বস্ত্র রক্তবর্ণ হইল। কাসেম সখিনার গলদেশে বাহু বেষ্টন করিয়া দণ্ডায়মান রহিলেন, নিজ বশে আর দাঁড়াইবার শক্তি নাই। শরাঘাতে সমুদয় অঙ্গ জর জর হইয়া সহস্র পথে শোণিতধারা শরীর বহিয়া মৃত্তিকায় পড়িতেছে। সজ্জিত মস্তক ক্রমশঃই সখিনার স্কন্ধদেশে নত হইয়া আসিতে লাগিল। সখিনার বিষাদিত বদন নিরীক্ষণ করা কাসেমের অসহ্য হইল বলিয়াই যেন চক্ষু দুটি নীলিমাবর্ণ ধারণ করিয়া ক্রমেই বন্ধ হইয়া আসিতে লাগিল। সে সময়ও কাসেম বলিলেন, "সখিনা! নব অনুরাগে পরিণয়সূত্রে তোমার প্রণয়-পুষ্পহার কাসেম আজ গলায় পরিয়াছিল; বিধাতা আজই সে হার ছিন্ন করিয়া ফেলিলেন। জগতে তোমাকে ছাড়িয়া যাইতেছি; দৈহিক সম্বন্ধগ্রন্থি ছিঁড়িয়া গেল, কিন্তু সখিনা! সে জন্য তুমি ভাবিয়ো না;-কেয়ামতে অবশ্যই দেখা হইবে। সখিনা! নিশ্চয় জানিয়ো ইহা আর কিছুই নহে, কেবল অগ্রপশ্চাৎ মাত্র। ঐ দেখ, পিতা আমার অমরপুরীর সুবাসিত শীতলজল-পরিপূরিত মণিময় সুরাহী হস্তে আমার পিপাসা শান্তির জন্য দাঁড়াইয়া আছেন। আমি চলিলাম।"
| পরবর্তী পাতা→ |