বিষাদ সিন্ধু/মহরম পর্ব/পঞ্চবিংশ প্রবাহ /৩

উইকিসংকলন থেকে

বিষাদ সিন্ধু মীর মশাররফ হোসেন
মহরম পর্ব (পঞ্চবিংশ প্রবাহ /৩)

কাসেমের চক্ষু কেবারে বন্ধ হইল!-প্রাণবিহঙ্গ দেহপিঞ্জর হইতে অনন্ত আকাশে উড়িয়া হাসানের নিকট চলিয়া গেল। শূন্যদেহ সখিনার দেহযষ্টি হইতে স্খলিত হইয়া ধরাতলে পতিত হইল। পুরবাসীরা সকলেই কাসেমের মৃতদেহ স্পর্শ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে লাগিলেন।

সখিনা স্বামীর মৃতদেহ অঙ্গে ধারণ করিয়া করুণস্বরে বলিতে লাগিলেন, "কাসেম! একবার চাহিয়া দেখ, তোমার সখিনা এখনো সেই বিবাহ-বেশ পরিয়া রহিয়াছে! কেশগুচ্ছ যে ভাবে দেখিয়াছিলে, এখনো সেইভাবে রহিয়াছে। তাহার এক গাছিও স্থানভ্রষ্ট হয় নাই। লোহিতবসন পরিধান করিয়া বিবাহ হয় নাই; প্রাণেশ্বর! তাই আপন শরীরের রক্তভারে সেই বসন রঞ্জিত করিয়া দেখাইলে! আমি আর কী করিব? জীবিতেশ! জগতে সখিনা বাঁচিয়া থাকিতে তোমার দেহ-বিনির্গত শোণিতবিন্দু মৃত্তিকা-সংলগ্ন হইতে দিবে না!" এই বলিয়া কাসেমের দেহবিনির্গত শোণিতবিন্দু সখিনা সমুদয় অঙ্গে মাখিতে লাগিলেন। মাখিতে মাখিতে কহিতে লাগিলেন, "বিবাহ সময়ে এই হস্তদ্বয় মেহেদি দ্বারা সুরঞ্জিত হয় নাই,-একবার চাহিয়া দেখ!-কাসেম! একবার চাহিয়া দেখ! তোমার সখিনার হস্ত তোমারই রক্তধারে কেমন শোভিত হইয়াছে। জীবিতেশ্বর! তোমার এ পবিত্র রক্ত মাখিয়া সখিনা চিরজীবন এই বেশেই থাকিবে! যুদ্ধজয়ী হইয়া আজ বাসরশয্যায় শয়ন করিবে বলিয়াছিলে, সে সময় তো প্রায় আগত;-তবে ধূলিশয্যায় শয়ন কেন হৃদয়েশ?-বিধাতা, আজই সংসার-ধর্মের মুখ দেখাইলে, আজই সংসারী করিলে, আবার আজই সমস্ত সুখ মিটাইলে!-দিন এখনো রহিয়াছে। সে দিন অবসান না-হইতেই সখিনার এই দশা করিলে! যে সূর্য সখিনার বিবাহ দেখিল, সেই সূর্যই সখিনার বৈধব্য দশা দেখিয়া চলিল! সূর্যদেব! যাও, সখিনার দুর্দশা দেখিয়া যাও। সৃষ্টিকাল হইতে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন তুমি কত ঘটনা, কত কার্য কত সুখ, কত দুঃখ দেখিয়াছ, কিন্তু দিনকর! এমন হরিষে বিষাদ কখনো কি দর্শন করিয়াছ? সখিনার তুল্য দুঃখিনী কখনো কি তোমার চক্ষে পড়িয়াছে? যাও সূর্যদেব! সখিনার সদ্যবৈধব্য দেখিয়া যাও।"

সখিনা এইরূপ নানাপ্রকার বিলাপ করিতে করিতে অস্থির হইয়া পড়িলেন। কাসেমের অবস্থা দর্শনে হোসেন একেবারে অচৈতন্য হইয়া পড়িয়াছিলেন, কিঞ্চিৎ পরে সংজ্ঞা পাইয়া বলিতে লাগিলেন, "কাসেম! তুমি আমার কুলপ্রদীপ, তুমি আমার বংশের উজ্জ্বল মণি, তুমিই আমার মদিনার ভাবী রাজা,-আমি অভাবে তোমার শিরেই রাজমুকুট শোভা পাইত। বৎস! তোমার বীরত্বে,-তোমার অস্ত্র-প্রভাবে মদিনাবাসীরা সকলেই বিমুগ্ধ। আরবের মহা মহা যোদ্ধাগণ তোমার নিকট পরাস্ত; তুমি আজ কাহার ভয়ে রণক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিয়া, লোহিতবসনে নিস্পন্দভাবে ধরাশায়ী হইয়া রহিলে! প্রাণাধিক!-বীরেন্দ্র! ঐ শুন, শত্রুদল মহানন্দে রণবাদ্য বাজাইতেছে। তুমি সমরাঙ্গণ হইতে ফিরিয়া আসিয়াছ বলিয়া তোমাকে তাহারা ধিক্কার দিতেছে। কাসেম, গাত্রোত্থান কর-তরবারি ধারণ কর। ঐ দেখ, তোমার প্রিয় অশ্ব ক্ষতবিক্ষত শরীরে, শোণিতাক্ত কলেবরে তোমাকে ধরাশায়ী দেখিয়া অবিশ্রান্ত অশ্রুবর্ষণ করিতেছে! শরাঘাতে তাহার শ্বেতকান্তি পরিবর্তিত হইয়া শোণিতধারায় লোহিতবর্ণ ধারণ করিয়াছে। তথাপি রণক্ষেত্রে যাইবার জন্য উৎসাহের সহিত তোমারই দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, সম্মুখস্থ পদদ্বারা মৃত্তিকা উৎপ্তি করিতেছে। কাসেম! একবার চক্ষু মেলিয়া দেখ, তোমার প্রিয়তম অশ্বের অবস্থা একবার চাহিয়া দেখ! কাসেম! আজি আমি তোমার বিবাহ দিয়াছি। যাহার সঙ্গে কোন দিন কোন সম্বন্ধ ছিল না, পরিচয় ছিল না, প্রণয় ছিল না, এমন কোন কন্যা আনিয়া তোমাকে সমর্পণ করি নাই, আমার হৃদয়ের ধনকেই তোমার হস্তে দিয়াছি। তোমারই পিতৃ-আদেশে সখিনাকে তোমার হস্তে সমর্পণ করিয়াছি।"

হাসানকে উদ্দেশ করিয়া হোসেন অতি কাতরস্বরে বলিতে লাগিলেন, "ভ্রাতঃ! জগৎ পরিত্যাগের দিন ভাল উপদেশ দিয়া গিয়াছিলেন! যেদিন বিবাহ সেই দিনই সর্বনাশ! যদি ইহাই জানিয়াছিলে, যদি সখিনার অদৃষ্টলিপির মর্ম বুঝিতে পারিয়াছিলে, তবে কাসেমের সঙ্গে সখিনার বিবাহের উপদেশ কেন দিয়াছিলে ভাই! তুমি তো স্বর্গসুখে রহিয়াছ, এ সর্বনাশ একবার চক্ষে দেখিলে না!-এই অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইবে বলিয়াই কি অগ্রে চলিয়া গেলে? ভাই! মৃত্যুসময়ে তোমার যত্নের রত্ন, হৃদয়ের অমূল্য মণি কাসেমকে আমার হাতে হাতে দিয়া গিয়াছিলে, আমি এমনি হতভাগ্য যে, সেই অমূল্য নিধিটি রক্ষা করিতে পারিলাম না। আর কি বলিব! তোমার প্রাণাধিক পুত্র কাসেম একবিন্দু জলের প্রত্যাশায় শত্রুহস্তে প্রাণ হারাইল। কাসেম বিন্দুমাত্র জল পাইলে এজিদের সৈন্যের নাম মাত্র অবশিষ্ট থাকিত না, দেহসমষ্টি শোণিতপ্রবাহের সহিত ফোরাত প্রবাহে ভাসিয়া কোথায় চলিয়া যাইত, তাহার সন্ধানও মিলিত না। আর সহ্য হয় না। সখিনার মুখের দিকে আর চাহিতেই পারি না। কই আমার অস্ত্র শস্ত্র কোথায়? কাসেমের শোকাগ্নি আজ শত্রুশোণিতে পরিণত হউক। সখিনার বৈধব্যসূচক চিরশুভ্র-বসন শত্রুশোণিতে রঞ্জিত করিয়া চিরকাল সধবার চিহ্নে রাখিব!-কই আমার বর্ম কোথায়? কই আমার শিরস্ত্রাণ কোথায়? (জোরে উঠিয়া) কই আমার অশ্ব কোথায়? এখনি অন্তর জ্বালা নিবারণ করি!-শত্রুবধ করিয়া কাসেমের শোক ভুলিয়া যাই!" পাগলের মত এই সকল কথা বলিয়া হোসেন যুদ্ধসজ্জায় সজ্জিত হইতে চলিলেন।

হোসেন পুত্র আলী আকবর করজোড়ে বলিতে লাগিলেন, "পিতঃ! এখনো আমরা চারি ভ্রাতা বর্তমান! যদিও শিশু, তথাপি মরণে ভয় করি না। আমরা বর্তমান থাকিতে, আপনি অস্ত্র ধারণ করিবেন? বাঁচিবার আশা তো একরূপ শেষ হইয়াছে; পিপাসায় আত্মীয় স্বজনের শোকাগ্নি-উত্তাপে জিহ্বা, কণ্ঠ, বক্ষ, উদর সকলই তো শুষ্ক হইয়াছে; এরূপ অবস্থায় আর কয়দিন বাঁচিব? নিশ্চয়ই মরিতে হইবে। বীরপুরুষের ন্যায় মরাই শ্রেয়ঃ। স্ত্রীলোকের ন্যায় কাঁদিয়া মরিব না।" এই কথা বলিয়া পিতৃচরণে প্রণাম করিয়া আলী আকবর অশ্বে আরোহণ করিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যাইয়া দ্বৈরথ যুদ্ধে কাহাকেও আহ্বান না করিয়া একেবারে ফোরাতকূল রক্ষকদিগের প্রতি অস্ত্রবর্ষণ করিতে লাগিলেন। রক্ষীরা ফোরাতকূল ছাড়িয়া পলাইতে আরম্ভ করিল। এজিদের সৈন্যে মহা হুলস্থূল পড়িয়া গেল। আলী আকবর যেমন বলবান তেমনি রূপবান ছিলেন। তাঁহার সুদৃশ্য রূপলাবণ্যের প্রতি যাহার চক্ষু পড়িল, তাহার হস্ত আর আলী আকবরের প্রতি আঘাত করিতে উঠিল না! যে দেখিল, সেই আকবরের রূপে মোহিত হইয়া তৎপ্রতি অস্ত্রচালনায় বিরত হইল। অস্ত্রচালনা দূরে থাকুক, পিপাসায় আক্রান্ত, শীঘ্রই মৃত্যু হইবে, এই ভাবিয়াই অনেক বিধর্মী দুঃখ করিতে লাগিল! আলী আকবর বীরত্বের সহিত নদীকূলরীদিগকে তাড়াইয়া অশ্বপৃষ্ঠে থাকিয়াই ভাবিতেছেন, কি করি। সমুদয় শত্রু শেষ করিতে পারিলাম না। যাহারা পলাইতে অবসর পাইল না তাহারাই সম্মুখে দাঁড়াইল। ঐশ্বরী মায়ায় তাহাদের পরমায়ুও শেষ হইল। কিন্তু অধিকাংশ রক্ষীরাই প্রাণভয়ে নদীকূল ছাড়িয়া জঙ্গলে পলাইল। আমি এখন কী করি!

ঈশ্বরের মায়া বুঝিতে মানুষের সাধ্যমাত্র নাই। আবদুল্লাহ্ জেয়াদ তাহার লক্ষাধিক সৈন্য লইয়া সেই সময়েই ফোরাত-তীরে আসিয়া আলী আকবরকে ঘিরিয়া ফেলিল! তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল! জেয়াদের সৈন্য আলী আকবরের তরবারির সম্মুখে শ্রেণীবদ্ধরূপে পড়িয়া যাইতে লাগিল। এ পর্যন্ত আলী আকবরের অঙ্গে শত্রুপক্ষেরা কোন অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে পারে নাই; কিন্তু আলী আকবর সাধ্যানুসারে বিধর্মী মস্তক নিপাত করিয়াও শেষ করিতে পারিলেন না। যাহারা পলাইয়াছিল, তাহারাও জেয়াদের সৈন্যের সহিত যোগ দিয়া আলী আকবরের বিরুদ্ধে দাঁড়াইল। আকবর সৈন্যচক্র ভেদ করিয়া দ্রুতগতিতে শিবিরে আসিলেন। পিতার সম্মুখীন হইয়া বলিতে লাগিলেন, "ফোরাতকূল উদ্ধার হইতে ইতে কিন্তু কুফা হইতে আবদুল্লাহ্ জেয়াদ লক্ষাধিক সৈন্য লইয়া এজিদের সৈন্যের সাহায্যার্থে পুনরায় নদীতীর বন্ধ করিয়া দাঁড়াইয়াছে। যে উপায়ে হয়, আমাকে একপাত্র জল দিন, আমি এখনই জেয়াদকে সৈন্যসহ শমনভবনে প্রেরণ করিয়া আসি। এই দেখুন আমার তরবারি কাফের-শোণিতে রঞ্জিত হইয়াছে। ঈশ্বরকৃপায় এবং আপনার আশীর্বাদে আমার অঙ্গে কেহ এ পর্যন্ত একটিও আঘাত করিতে পারে নাই। কিন্তু পিপাসায় প্রাণ যায়।"

হোসেন বলিলেন, "আকবর! আজ দশ দিন কেবল চক্ষের জল ব্যতীত এক বিন্দু জল চক্ষে দেখি নাই। সেই চক্ষের জলও শুষ্ক হইয়া গিয়াছে। জল কোথায় পাইব বাপ?"

আলী আকবর বলিলেন, "আমার প্রাণ যায়, আর বাঁচি না।" এই বলিয়া পিপাসার্ত আলী আকবর ভূমিতলে শয়ন করিলেন। হোসেন বলিতে লাগিলেন, "হে ঈশ্বর! জীবনে মানবজীবন রক্ষা হইবে বলিয়া জলের নাম তুমি জীবন দিয়াছ! জগদীশ্বর! সেই জীবন আজ দুর্লভ! জগজ্জীবন! সেই জীবনের জন্য আজ মানবজীবন লালায়িত। কার কাছে জীবন ভিক্ষা করি দয়াময়?-আশুতোষ! তোমার জগজ্জীবন নামের কৃপায় শিশু কেন বঞ্চিত হইবে জগদীশ?-করুণাময়! তুমি জগৎ সৃষ্টি করিয়াছ। ভূগোল বলে, স্থলভাগের অপেক্ষা জলের ভাগই অধিক। আমরা এমনি পাপী যে, জগতের অধিকাংশ পরিমাণ যে জল, যাহা পশুপীরাও অনায়াসে লাভ করিতেছে, তাহা হইতেও আমরা বঞ্চিত হইলাম! ষষ্টি সহস্র লোকের প্রাণ বোধ হয়, এ জলের জন্যই বিনাশ হইল! মায়াময়! সকলই তোমার মায়া।"

আলী আকবরের নিকট যাইয়া হোসেন বলিলেন, "আকবর! তুমি আমার এই জিহ্‌বা আপন মুখের মধ্যে দিয়া একটু শান্তিলাভ কর। জিহ্‌বাতে রস আছে, উহাতে যদি তোমার পিপাসার কিছু শান্তি হয়, দেখ!-বাপ! অন্য জলের আশা আর করিয়ো না।"

আলী আকবর পিতার জিহ্বা মুখের মধ্যে রাখিয়া কিঞ্চিৎ পরেই বলিলেন, "প্রাণ শীতল হইল। পিপাসা দূর হইল। ঈশ্বরের নাম করিয়া আবার চলিলাম।"

এই বলিয়াই আলী আকবর পুনরায় অশ্বে আরোহণপূর্বক সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। অতি অল্প সময় মধ্যেই বহুশত্রু নিপাত করিয়া ফেলিলেন। এদ্দর্শনে জেয়াদ্ এবং ওমর প্রভৃতি পরামর্শ করিল যে, "আলী আকবর আর ক্ষণকাল এইরূপ যুদ্ধ করিলেই আমাদিগকে এক প্রকার শেষ করিবে। আলী আকবরকে যে গতিকেই হউক, বিনাশ করিতে হইবে। সম্মুখযুদ্ধে আকবরের নিকটে অগ্রসর হইয়া কেহই জয়লাভ করিতে পারিবে না। দূর হইতে গুপ্তভাবে আমরা কয়েকজন উহাকে লক্ষ্য করিয়া বিষাক্ত শর সন্ধান করিতে থাকি, অবশ্যই কাহারো শর আকবরের বক্ষ ভেদ করিবেই করিবে।" এই বলিয়াই প্রধান প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষেরা বহুদূর হইতে শরনিক্ষেপ করিতে লাগিল। আলী আকবর কাফেরবধে একেবারে জ্ঞানশূন্য হইয়া মাতিয়া গিয়াছেন। শরসন্ধানীরা শর নিক্ষেপ করিতেছে। একটি বিষাক্ত শর আলী আকবরের বক্ষ ভেদ করিয়া পৃষ্ঠদেশ পার হইয়া গেল। আলী আকবর সমুদয় জগৎ অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন। পিপাসাও অধিকতর বৃদ্ধি হইল। জলের জন্য কাতরস্বরে বারবার পিতাকে ডাকিতে লাগিলেন। সম্মুখে দেখিতে পাইলেন যেন, তাঁহার পিতৃব্য জলপাত্র হস্তে করিয়া বলিতেছেন, "আকবর! শীঘ্রই আইস! আমি তোমার জন্য সুশীতল পবিত্রবারি লইয়া দণ্ডায়মান আছি।" আলী আকবর জলপান করিতে যাইতেছিলেন; পিপাসায় তাঁহার কণ্ঠ শুষ্ক হইতেছিল; কিন্তু ততদূর পর্যন্ত যাইতে হইল না, জলপিপাসা শান্তি করিতেও হইল না, জন্মের মত জীবন-পিপাসা ফুরাইয়া গেল। আলী আকবর অশ্ব হইতে পতিত হইলেন। প্রাণবায়ু বহির্গত-শূন্যপৃষ্ঠ অশ্ব শিবিরাভিমুখে দৌড়িল। অশ্বপৃষ্ঠ শূন্য দেখিয়া, আলী আকবরের ভ্রাতা আলী আসগর এবং আবদুল্লাহ্ ভ্রাতৃশোকে শোকাকুল।-তিলার্ধকালও বিলম্ব না করিয়া, জিজ্ঞাসা কি অনুমতি অপেক্ষা না রাখিয়া তাঁহারা দুই ভ্রাতা দুই অশ্বরোহণে শত্রু সম্মুখীন হইলেন। ক্ষণকাল মহাপরাক্রমে বহুশত্রু বিনাশ করিয়া রণস্থলে বিধর্মীহস্তে শহীদ্ হইলেন। যুগল অশ্ব শূন্যপৃষ্ঠে শিবিরাভিমুখে ছুটিল। অশ্বপৃষ্ঠে পুত্রদ্বয়কে না দেখিয়া, হোসেন আহত সিংহের ন্যায় গর্জিয়া উঠিলেন। বলিলেন, "এখনো কী আমি বসিয়া থাকিব? এ সময়ও কী শত্রুনিপাতে অস্ত্রধারণ করিব না? পুত্র, ভ্রাতৃষ্পুত্র সকলেই শেষ হইয়াছে, আমি কেবল বসিয়া দেখিতেছি; আমার মত কঠিন প্রাণ জগতে কি আর কাহারো আছে?"

হোসেনের কনিষ্ঠ সন্তান জয়নাল আবেদীন ভ্রাতৃশোকে কাতর হইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে শিবির হইতে দৌড়িয়া বাহির হইলেন। হোসেন পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়িয়া গিয়া তাহাকে ধরিয়া আনিলেন, অনেক প্রবোধ দিয়া বুঝাইতে লাগিলেন। মুখে শত শত চুম্বন করিয়া ক্রোড়ে লইয়া সাহারবানুর নিকট আসিয়া বলিলেন, "জয়নাল যদি শত্রুহস্তে প্রাণত্যাগ করে, তবে মাতামহের বংশ জগৎ হইতে একেবারে নির্মূল হইবে, সৈয়দবংশের নাম আর ইহজগতে থাকিবে না। কেয়ামতের দিন পিতা এবং মাতামহের নিকট কী উত্তর করিব? তোমরা জয়নালকে সাবধানে রক্ষা কর; সর্বদাই চক্ষে চক্ষে রাখ। কোন ক্রমেই ইহাকে শিবিরের বাহির হইতে দিয়ো না।"


পরবর্তী পাতা