মিথ্যার মুখোমুখি প্রতিদিন (প্রবন্ধ)

উইকিসংকলন থেকে

মিথ্যার মুখোমুখি প্রতিদিন মুনির হাসান
মিথ্যার মুখোমুখি প্রতিদিন
ISBN: 984-300-001701-9
প্রকাশক‌ সাম্পান প্রকাশন, চট্টগ্রাম
খরচ বাদ দিয়ে এই সংস্করণের উদ্দৃত্ত টাকা যাবে সমাজ অধ্যয়ন কেন্দ্রের গ্রন্থাগার তহবিলে।
গ্রন্থস্বত্ব: লেখক এই গ্রন্থের স্বত্ব ত্যাগ করেছেন, যে কেউ পূর্বানুমতি ছাড়াইএই পুস্তকটি বা অংশবিশেষ মুদ্রণ, বিতরণ ও ফটোকপি করতে পারবেন।

“রাজ দরবারে রাজ-জ্যোতিষী রাজার হাত দেখছেন। আঁকিবুঁকি কেটে গম্ভীর মুখে (কিছুটা বিষণœও) তিনি ঘোষণা করলেন, “মহারাজ, আপনার আয়ু আর মাত্র দশ দিন।” রাজা মশাই ঈষৎ চমকালেন। তারপর বললেন, ‘পন্ডিত মশাই, আপনার হাত গুণে কি বলবেন, আপনার আয়ু আর কতদিন?’ পন্ডিতকে, মনে হলো, প্রস্তুত হয়েই এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত দেখতে লাগলেন। শুরু হলো আবার আঁকিবুঁকি। অবশেষে রাজ-জ্যোতষীর আত্মতৃপ্তি- ‘আমি আরো বছর দশেক বাঁচবো মহারাজ।’ “জল্লাদকে ডাকো।” গমগম করে উঠলো রাজার কণ্ঠ। -ঐ ব্যাটা মিথ্যাবাদীর গর্দান নাও, এক্ষুণি।” তাৎক্ষণিকভাবে রাজসভায় পালিত হল রাজার আদেশ। জ্যোতিষীর আর বছর দশেক বাঁচা সম্ভব হল না।

গল্পটি আমরা কমবেশি সবাই ছোট বেলায় পড়েছি। কিন্তু সম্ভবত এর মর্মবাণী উপলদ্ধি করতে পারিনি অনেকেই। নতুবা দেশের অধিকাংশ জাতীয় দৈনিকের বিশেষ স্থান দখল করে রাখতে পারতো না একদল প্রতারক। ‘আজকের দিনটি কেমন যাবে’ এই শিরোনামে তারা প্রতিদিনই সরল জনগণকে প্রতারিত করে চলেছে। এই প্রতারকদের কেউ জ্যোতিষ সম্রাট, কেউ জ্যোতিষরতœ, কেউ.....। আবার আছেন প্রফেসর, বিশেষজ্ঞ, এমনকি ডক্টরেট ডিগ্রিধারীও। জনগণের অজ্ঞতা ও অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এরা প্রতিদিনই জনগণকে প্রতারণা করছে, বিভ্রান্ত করছে। এতদিন পর্যন্ত এই সব প্রতারক জাতীয় দৈনিকগুলোর ভেতরের পাতায় ছিল। হালে প্রথম পাতায়ও এদের লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অন্ধ কুসংস্কারকে লাই দিয়ে আমরা কি আদৌ কখনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবো?

আজকের দিনটি কেমন যাবে?

খবরের কাগজের পাতায় প্রতিদিনকার যে রাশিফল ছাপা হয় সেগুলোর অনেক ভক্ত-পাঠক রয়েছেন। আগে রাজা-রাজড়াদের দিনের কর্মসূচি ঠিক করার জন্য, প্রতিদিনকার শুভাশুভ দেখার জন্য, জ্যোতিষী থাকতেন। কালের বিবর্তনে সেইসব জ্যোতিষীরা এখন দখল করেছে দৈনিক পত্রিকার স্থান। জায়গা পাল্টালেও তাদের বোলচাল প্রায় আগের মতোই, অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো। এখানে দেশের দৈনিকগুলোর এক দিনের বয়ান দেয়া হলো কেবল সিংহ রাশির জাতকদের ‘শুভাশুভ’র ওপর ভিত্তি করে। ১৯৯৩ সালের ৭ আগস্ট, শুক্রবারের কয়েকটি জাতীয় দৈনিক থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মহাজাতক (দৈনিক ইত্তেফাক) ঃ প্রতিদ্বন্দ্বী সক্রিয় থাকবে। ব্যক্তিত্বের সংঘাত এড়িয়ে চলুন। আর্থিক ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কোনো নতুন যোগাযোগ হতে পারে। প্রিয়জন বা সন্তানের কোন সুখবর পাবেন। ডাঃ এম রহমান (বাংলা বাজার পত্রিকা) ঃ শারীরিক ব্যাপারে সজাগ থাকুন। কাজের প্রতি সিরিয়াস হোন। ব্যয় বাড়বে। প্রফেসর হাওলাদার (ইনকিলাব) ঃ সন্তান বিষয়ক দুশ্চিন্তা। শিক্ষা ভর্তি ইত্যাদি বিষয়ে টেনশন। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সহায়তা পাবেন। ? (দৈনিক বাংলা) ঃ ব্যবসা বাণিজ্যে আজ কোন অস্বভাবাবিক পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে। ডঃ এন এ চৌধুরী (খবর) ঃ মতানৈক্য ও কলহ-বিবাদের সম্ভাবনা থাকায় সতর্ক থাকুন। উচ্চাকাঙ্খা বজায় রাখুন, কিন্তু বাস্তববাদী থাকবেন। ভ্রমণ বা বই পড়া শুভ। একই দিনে সিংহ রাশির একজন জাতকের পরস্পরবিরোধী একাধিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখেছেন জ্যোতিষকূল শিরোমণিরা। অর্থটা তাহলে কি দাঁড়ালো?

কম্পিউটারে হাত দেখা

কম্পিউটারে জ্যোতিষচর্চা করার প্যাকেজ সফটওয়্যার ইতিমধ্যে বের হয়েছে। আমাদের জ্যোতিষীরা কম্পিউটার ব্যবহার করতে শুরু করেছেন কি না তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে অচিরেই যে শুরু করবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ধরনের একটি প্যাকেজ সফটওয়্যার-এর নাম ‘ফরচুনটেলার’। এই প্যাকেজটি জাতকের জন্ম তারিখ ও জন্ম সময় থেকে তার ভবিষ্যৎ ‘গণনা’ করে। জন্ম তারিখ ও সময় জানা না থাকলে একাধিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকেই গণনা করা হয়। কেমন গণনা করে এই প্যাকেজ? জাতক বেঁচে আছে না মরে গেছে তাইই বলতে পারে না। অর্থাৎ কোনো মৃত ব্যক্তির জন্মের দিনক্ষণ চেয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের দারুন ছক লিখে দেবে ঐ প্যাকেজ। এই প্যাকেজটি কোনো নাস্তিককে বানাতে পারে প্রচন্ড আস্তিক্যবাদী, চিকিৎসককে দার্শনিক, সুঠাম দেহের অধিকারীকে দুর্বল ইত্যাদি। তাই যদি কখনও দেখেন, ‘কম্পিউটারাইজড্ হাত দেখা’ তাহলে নিশ্চিতভাবে জানবেন, সেটি আপনাকে প্রতারিত করার জন্যই নতুন মাত্রা যোগমাত্র।

শেষ কথা নয়

জ্যোতিষ শাস্ত্রের অবৈজ্ঞানিকত্য, ঠকবাজি ও ধোঁকাবাজি নিয়ে কম লেখা হয়নি। অথচ দেখা যাচ্ছে, এদের ব্যবসার প্রসার বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তথাকথিত শিক্ষিত লোকের একটি অংশও এদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের উপাচার্যকে দেখা গেছে জ্যোতিষ সম্মেলনে ভাষণ দিতে। কিছুদিন আগে খোদ তথ্যমন্ত্রী জ্যোতিষদের মহাসম্মেলনে ভাষণ দিয়ে এসেছেন। পত্র-পত্রিকাগুলো আবার ফলাও করে সে ছবিও ছেপেছে। কাজেই নতুন করে এই প্রসঙ্গটি তুলে যারা জেগে জেগে ঘুমোন, তাদেরকে কতটুকু জাগ্রত করা যাবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে যারা জ্যোতিষপ্রিয়, তাদের পরিণতি সম্পর্কে নিচের ছড়াটি উদ্ধৃত করা হলো। ছড়াকারের নামটি সংগ্রহ করা যায়নি। আশা করি ছড়াকার তা মার্জনা করবেন।

স্বাস্থ্য ভালো যাত্রা শুভ
রাশিমালায় লেখা
রাশিমালা পড়ে খালু
চললে ঢাকা একা।
চলতি পথে আরিচাতে
প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতক
খালু আমার জ্যোতিষপ্রিয়
সিংহ রাশির ঘাতক।


পরবর্তী পাতা