যুদ্ধ কেন?
উইকিসংকলন থেকে
| যুদ্ধ কেন? |
| সিগমুন্ড ফ্রয়েড ও আইনস্টাইন এর জীবদ্দশায় যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় তার ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শী তাঁরা। বিশ্বজুড়ে মানুষের এই যুদ্ধউন্মত্ততায় মনোবৈজ্ঞানিক কারন অনুসন্ধান করতে আইনস্টাইন দারস্থ হয়েছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের নিকট। এ বিষয়ে তাদের মধ্যকার পত্র বিনিময় Why War? নামে একটি পুস্তিকা আকারে বের হয়।
এ রচনাটি Einstein on Peace বইয়ের Otto Nathan এবং Heinz Nordon সংস্করনের ১৮৬-২০৩ পৃষ্ঠা হতে গৃহিত । বইটি ১৯৬০ সালে নিউ-ইয়র্ক এর Schocken Books প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়। |
[১]
[বুদ্ধিজীবীদের প্রস্তাবিত সংঘের বিষয়ে আইনস্টাইন ফ্রয়েড কে খুবসম্ভব ১৯৩১ অথবা ১৯৩২ সালে যে চিঠিটি লিখেছিলেন তার বিবরন নিম্নে প্রদত্ত হলো:-]
সারাজীবন সত্যের অনুসন্ধান করার জন্য আপনি যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন আমি তার গুনগ্রাহী। যিশু থেকে গ্যাটে ও কান্ট এবং অন্যান্য মহামানব যারা মানবজাতিকে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পথ দেখিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সাধারন স্তরের মানুষ তাদের কথা অগ্রাহ্য করলেও তারাই কি সর্বজনগ্রাহী ও শ্রদ্ধেয় নন?
[২]
আমার বিশ্বাস সকল মহামানবই মানুষে-মানুষে সংঘাতের বিরুদ্ধে কখা বলেছেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রনহীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারনে মানুষের ভাগ্য দায়িত্বজ্ঞানহীন নেতৃত্বের হাতে অর্পিত হয়েছে।
[৩]
রাজনৈতিক নেতা বা গনতান্ত্রিক সরকারগুলোর ক্ষমতার উৎস পেশীশক্তি বা গনতান্ত্রিক নির্বাচন , তার কখনই নৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন বুদ্ধিজীবীদের কথা গ্রাহ্য করে না। সকল বাঁধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে আমাদের কি একবার এব্যবস্থা পরিবর্তন করার চেষ্টা করা উচিত নয়? এটা আমার কাছে আবশ্য কর্তব্য ছাড়া কোন অংশে কম কিছু মনে হয় না!
সকল মনীষী একতাবদ্ধ হয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলে আমার বিশ্বাস লিগ অফ নেশনস্ তাদের কর্ম ক্ষেত্রে ভরসা পাবে।
আমি আপনাকে এই পরামর্শগুলো দিচ্ছি , কারন আমি মনে করি যে আপনি আর অনেকের মত জেগে সপ্ন দেখেন না। আপনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন।
[১৯৩২ সালে গ্রীষ্মকালে বুদ্ধিজীবীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আইনস্টাইনের উদ্যোগে ‘যুদ্ধের কারণ ও প্রতিকার’ শিরোনামে একটি গনবিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিলো । এসময়ে আইনস্টাইন ও ফ্রয়েডের মধ্যকার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। ১৯৩২ সালে ৩০ জুলাই আইনস্টাইন যে অফিসিয়াল চিঠিটি ফ্রয়েডকে লিখেন তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোজন হিসাবে নিচের লেখাটুকু যুক্ত করা হয়েছিলো।]
আপনার চমৎকার রচনার আমি একজন গভীর ভক্ত। তাই এ সুযোগে আপনাকে আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা জানাই। আমি লক্ষ করেছি যে যারা সাধারনত আপনার থিওরীর ইপর আস্থা রাখে না তারাও মাঝে মাঝে আপনার উদ্ভাবিত শব্দ সম্ভার ব্যাবহার করতে পিছপা হয়না।
[এটি ফ্রয়েডের কাছে লেখা আইনস্টাইনের একটি খোলা চিঠি। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে এই চিঠিটির কথা অনেকেই জানে না।]
মিঃ ফ্রয়েড, সম্প্রতি লিগ অফনেশনস ও বুদ্ধিজীবীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন পৃথিবীর মানুষের চলতি সমস্যা হতে মুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্যে আমাকে একজনের নাম উল্লেখ করতে বলেছে। একারনে আমি আপনার শরনাপন্ন হলাম। সমস্যাটি হলো- ‘যুদ্ধের ভয়াবহতা হতে কী মানুষের কোন মুক্তি নেই?’ বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে উপরের বিষয়টি অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে জড়িত। সকল রকম প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে এখন পর্যন্ত কেউ মুক্তি পায়নি।
[৮]
এছাড়া আমার বিশ্বাস পেশাগত ক্ষেত্রে যারা এই সমস্যা সমাধানের জন্য সচেষ্ট আছেন তারাও তাদের ব্যর্থতা উপরব্ধি করতে পেরেছেন। আর আমি মনে করি আপনি রাজনৈতিক কোন বিষয় উপস্থাপনা করে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোন উত্তম পরামর্শ দিতে পারবেন।
[৯]
ব্যক্তিগতভাবে আমি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নই।তবে আমার ধারনা একটি আন্তর্জাতিক আইন ও বিচার সংস্থা গড়ে তুললে হয়তো জাতিতে-জাতিতে সংঘর্ষ রোধ হবে।কিন্তু বর্তমানে আমাদের এমন কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা নেই।তাই আবার ঘুরে-ফিরে একই কথাই দাড়াচ্ছে যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার খাতিরে বিশ্বের প্রত্যেক রাষ্ট্রকে কিছুটা সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করতে হতে পারে।
[১০]
[১৫]
আমি বিশ্বাস করি আপনার রচনার মাঝে আমি এসবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উত্তর পেতে পারি। কিন্তু আপনি যদি নিজে আলোচনায় উপস্থিত হন তবে হয়তো তা আরও উত্তম হবে। ইতি আপনার এ. আইনস্টাইন
[Leon Steinig নামে লিগ অফ নেশনস এর একজন সদস্য আইনস্টাইনকে ফ্রয়েডের সাথে যোগাযোগ করতে সহায়তা করেছিলেন। তিনি আইনস্টাইনকে ১৯৩২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি লিখেছিলেন।যার বিষয়বস্তু ছিলো--]
..............ভিয়েনাতে গিয়ে যখন আপনার চিঠিটি আমি ফ্রয়েডকে দেই, তখন তিনি আপনার চিঠির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানালেন। এবং বললেন 'যুদ্ধ সমস্যা' রোধের জন্য তিনি তার যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। এবং তিনি জানিয়েছেন অক্টোবরের মধ্যেই তিনি এবিষয় নিয়ে লিখে ফেলবেন।এবং জানালেন "আমি সমস্ত জীবন ধরে আমি সত্যি বলে এসেছি,এখন আমি বৃদ্ধ,তবুও সত্যিটাই বলব;যদিও জানি সত্যি কথা হজম করা বেশ কঠিন। তিনি এও বলেছেন যে হেনরি বনেট (প্যারিস বুদ্ধজীবী আন্তর্জাতিক সংঘের তৎকালীন প্রধান কর্মকর্তা) হয়তো তার হতাশাপূর্ণ চিঠি প্রকাশই করতে চাইবেন না।........................
প্রিয় মিঃ আইনস্টাইন আমি যখন জেনেছি যে আপনি আমাকে এমন বিষয় সম্পর্কে আমন্ত্রন জানাচ্ছেন যেটি একই সাথে জনস্বার্থের সাথেও যুক্ত তখন আমি অথ্যন্ত আনন্দের সাথে সম্মতি দিলাম।
কিন্তু আপনি চিঠিতে সংক্ষিপ্তভাবে মূল বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আমাকে একটু বিপদে ফেলেছেন (বিনয় অর্থে)। আমি আপনার উল্লেখিত বিষয়গুলো সাধ্যমত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
[৩৪]
আপনার প্রতি আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন। আমার চিঠিটি পেযে আপনি যদি হতাশ হয়ে থাকেন তবে আমি সেজন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ইতি আপনারই সিগমুন্ড ফ্রয়েড
[আইনস্টাইন ফ্রয়েডের কাছ থেকে চিঠিটি পেয়ে তেমন হতাশ হননি। ১৯৩২ সালের ৩ ডিসেম্বর তিনি ফ্রয়েডকে লিখেন --]
[৩৭]
যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সমস্যা গুলো সমাধান না হচ্ছে ততদিন যুদ্ধ লেগেই থাকবে।বর্তমান সমাজ যদি তা রোধ করতে না পারে তবেএই সভ্যতা খুব শিঘ্রই ধ্বংশ হযে যাবে।
[Die Friedensfront পত্রিকার সম্পাদক To Arnold Kalisch আইনস্টাইনকে একজন চেকশ্লোভিয়ান ডাক্তারের যুদ্ধবিরোধী একটি লেখা প্রচার করতে বলেছিলেন।সে সম্পর্কে ১৯৩২ সালে ২৬ এপ্রিল মাসে আইনস্টাইন তার জবাব দেন ---]
[৩৮]
আপনি জানেন যে মানষে মানুষে যুদ্ধ রোধে আমি যে কোন সহায়তা করতে রাজি আছি। ................কিন্তু আমি নিজেই বইটির মূল বিষয়ের সাথে একমত হতে পারছিনা। যুদ্ধকে মানসিক ব্যধি হিসাবে ভেবে নিলে কোন সভায় এর সম্পর্কে উদবেগ প্রকাশ করাকেও তাহলে মানষিক ব্যধি হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।সাধারন জনগন আবেগের বশে উত্থাতি কোন বিষয়কে সমর্থন করবে না এটাই স্বাভাবিক..........তাই আগ্রাসনকে একটি মানষিক রোগ হিসাবে বিবেচনা করলে এর সমাধানে আমরা এক পাও অগ্রসর হতে পারবো না..............

