সত্যপীরের কথা

উইকিসংকলন থেকে

সত্যপীরের কথা
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র
এই পাঁচালিটি অন্নদামঙ্গল খ্যাত রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের পনেরো বছর বয়সে রচিত। হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়ার অন্তর্গত দেবানন্দপুরে রামচন্দ্র মুন্সির নিকট ফারসি ভাষা অধ্যয়নকালে একবার গুরুগৃহে সত্যনারায়ণ পূজা উপলক্ষে পুথিপাঠের আয়োজন হয়। ভারতচন্দ্রের উপর পাঠের দায়িত্ব অর্পিত হলে তিনি প্রচলিত পুঁথি না পড়ে স্বলিখিত এই পাঁচালিটি পাঠ করে উপস্থিত শ্রোতৃবর্গকে মুগ্ধ করেন। শোনা যায়, সকলেই কিশোর ভারতচন্দ্রের এই কাব্যপ্রয়াসের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

গণেশাদি রূপধর                   বন্দে প্রভু স্মরহর
ধর্ম্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষদাতা।
কলিযুগে অবতরি                   সত্যপীর নাম ধরি
প্রণমহ বিধির বিধাতা।।
দ্বিজ ক্ষত্র বৈশ্য শূদ্র                   কলিযুগে ক্রমে ক্ষুদ্র
যবনে করিতে বলবান।
ফকীর-শরীর ধরি                   হরি হৈলা অবতরি
এক বৃক্ষতলে কৈলা স্থান।।
লম্বমান দাড়ি-গোঁপ                   গায়ে কাঁথা শিরে টোপ
হাতে আশা কাঁধে ঝোলে ঝুলি।
তেজঃপুঞ্জ হেন রবি                   মুখে বাক্য পীর নবি
নমাজে দর্গার চুমে ধুলি।।
জাহির কিরূপে হব                   কারে বা কিরূপে কব
ভাবেন বৃক্ষের তলে বসি।
ঈশ্বর-ইচ্ছায় ক্ষিপ্র                   বিষ্ণু নামে এক বিপ্র
সেইখানে উত্তরিল আসি।।
দীন দেখে দ্বিজবরে                   সত্যপীর কন তারে
প্রকাশ করিতে অবতার।
যে সত্য জনারগির                   সির্ণি বেদে দরপীর
পুলকে প্রসাদ খাও তাঁর।।
দ্বিজ বলে হরি বিনে                   পূজি নাহি অন্য জনে
কি বলে ফকীর দুরাচারী।
ফরীরের অঙ্গে চায়                   অদ্ভুত দেখিতে পায়
শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী।।
সম্ভ্রমে প্রণাম করি                   উঠে দেখে নাহি হরি
শূন্যে শুনে সির্ণি-ইতিহাস।
ক্ষীর চিনি আটা কলা                   পান গুয়া পুষ্পমালা
মোকাম পীঠের পরে বাস।।
দ্বিজ আসি নিজালয়                   আসি দ্রব্য সমুদয়
নিবেদন কৈল সত্য নামে।
পূজার প্রসাদ গুণে                   ধন্য হৈল ত্রিভুবনে
অন্তে গেলা শ্রীনিবাসধামে।।
দ্বিজ-স্থানে ভেদ পেয়ে                   সাত জন কাঠুরিয়ে
সির্ণি দিয়ে পূজে সত্যপীর।
দুঃখ-তিমিরের রবি                   সকলি বিদ্যায় কবি
অন্তে পেলে অনন্ত শরীর।।
সদানন্দ নামে বেণে                   সত্যপীরে সির্ণি মেনে
কন্যা হেতু করিল কামনা।
ঈশ্বর-ইচ্ছায় সার                   জন্মিলে দুহিতা তার
চন্দ্রমুখী চঞ্চল নয়না।।
কাদম্বকোদরস্থূলা                   কাদম্বরী-সুকোমলা
চন্দ্রমুখী চন্দ্রকলা নাম।
হাসে হেরে যার পানে                   ধৈরয কি থাকে প্রাণে
কামিনী কামনা করে কাম।।
কন্যা দেখি রূপযুত                   আনিয়া বণিক সুত
বিবাহ দিলেক সদাগর।
দম্পতির মনোমত                   কে জানে কৌতুক কত
একতনু নাগরী নাগর।।
সদাগর মত্ত মনে                   সির্ণি নাহি পড়ে মনে
সজামাতা সাজিল পাটন।
বাজে কাড়া দামা শিঙ্গা                   বাতগামী সাত ডিঙ্গা
দুর্গদেশে দিল দরশন।।
সত্যপীর ক্রোধ মন                   রাজ ভাণ্ডারের ধন
সাধুর নৌকায় থর থরে।
দৈবে দেখে রাজবলে                   কোটাল প্রভাতে চলে
লোৎ পেয়ে বাঁধে সদাগরে।।
মৃত্যু হইতে আয়ু রাখে                   বেড়ী পায় বন্দী রাখে
মেগে খায় নায়েব নফর।
যৌবনে প্রবাসে পতি                   কাল নিত্য চাহে রতি
সাধুকন্যা হইল ফাঁফর।।
ভেদ পেয়ে নিজ স্থানে                   সত্যপীর সির্ণি মানে
চন্দ্রকলা কান্তের কামনা।
প্রত্যুষে ফকীরপ                   স্বপনে দেখিল ভূপ
ছেড়ে দিল সাধু দুই জনা।।
সাতগুণ ধন লয়ে                   সাধু চলে নৌকা বেয়ে
প্রভু পথে হইলা ফকীর।
তথাপি নির্বোধ সাধু                   চিনিতে না পারে বিধু
ক্রোধে ধন হৈলা নব নীর।।
বিস্তর করিয়া স্তুতি                   পুন পেলে অব্যাহতি
নৌকায় পুরিল গিয়া ধন।
অব্যাহতি পেয়ে তনু                   ডিঙ্গা বেয়ে যায় পুনু
নিজ দেশে দিল দরশন।।
নিজ দেশে উত্তরিল                   সাধুকন্যা বার্ত্তা পেল
স্বামীরে দেখিতে বেগে ধায়।
প্রসাদ সিরিণি হাতে                   ফেলে যায় পথে পথে
লাফানে তা পানে নাহি চায়।।
সত্যপীর ক্রোধ-ভরে                   সাধুর জামাতা মরে
ক্রন্দন করয়ে চন্দ্রকলা।
ওরে বিধি হায় হায়                   এ যৌবন বৃথা যায়
যেন রতি কামের অবলা।।
ডুবিয়া মরিব জলে                   থাকিব স্বামীর কোলে
হেন কালে হৈল দৈববাণী।
সির্ণি ফেলাইয়া আলি                   পুন গিয়া খাও তুলি
পাবে পতি না কাঁদিও ধনি।।
উপদেশ পেয়ে ধেয়ে                   সির্ণি কুড়াইয়া খেয়ে
মৃত পতি বাঁচাইল প্রাণে।
জামাতার মুখ দেখি                   সদাগর হৈল সুখী
সিরিণি করিল সাবধানে।
এ তিন জনার কথা                   পাঁচালী প্রবন্ধে গাঁথা
বুদ্ধিরূপ কৈল নানা জনা।
দেবানন্দপুর গ্রাম                   দেবের আনন্দধাম
হীরারাম রায়ের বাসনা।।
ভারত ব্রাহ্মণ কয়                   দয়া কর মহাশয়
নায়কের গোষ্ঠীর সহিত।
ব্রতকথা সাঙ্গ হলো                   সবে হরি হরি বলো
দোষ ক্ষম যতেক পণ্ডিত।।
শুন সবে একচিত সত্যপীর গুণগীত
দুইলোকে পাবে প্রীত সিদ্ধমনস্কামনা।
গণেশাদি দেবগণ বন্দ সত্যনারায়ণ
সিদ্ধি দেহ অনুক্ষণ যারে সেই ভাবনা।।
কলির প্রথম হরি ফকীর-শরীর ধরি
অবনীতে অবতরি হরিবারে যন্ত্রণা।
দ্বিতীয়েতে বিষ্ণু নামে দরিদ্র দ্বিজের ধামে
ধর্ম্ম অর্থ মোক্ষ কাম দানে কৈল মন্ত্রণা।।
ব্রাহ্মণ ভিক্ষায় যায় প্রভু দেখা দিল তায়
হইয়া ফকীর-কায় মুখে দিব্য দাড়ী রে।
গায়ে কাঁথা শিরে টোপ গলে ছেলি মুখে গোঁপ
ঝুলিতে ঝুলিতে খোপ হাতে আশা বাড়ী রে।।
সেলাম হামারা পাড়ে ধূপমে তোম কাহে খাড়ে
পেরেশন দেশ বড়ে মেরে বাত ধরতো।
সির্ণি বদে পির বা সতি হামছো মিরবা
মোকামে হাজির বা দবর হস্ত তপতো।।
বিষ্ণুমূর্তি দেখি দ্বিজ নিবাসে আসিল নিজ
পূজিল গরুড়ধ্বজ সির্ণি দিয়া বিহিতে।
দেখিয়া বিপ্রের ধন ঘরে ঘরে সর্বজন
পূজে সত্যনারায়ণ খ্যাতি হৈল ক্ষিতিতে।।
চতুর্থে উৎকট কষ্ট কাঠুরের হল নষ্ট
জগতের হৈল শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি কৈল পালনা।
সত্যপীর-গুণ গেয়ে মনোমত ধন পেয়ে
সিরিণি প্রসাদ খেয়ে সিদ্ধি করে বাসনা।।
সদানন্দ নাম বেণে সত্যপীর সির্ণি মানে
পঞ্চমে পাইল কন্যা চন্দ্রকলা নামেতে।
কি কব তাহার ছাঁদ কাম ধরিবার ফাঁদ
মুখখানি পূর্ণচাঁদ জিত রতি-কামেতে।।
বর আনি নীলাম্বর রূপে গুণে মনোহর
সদানন্দ সদাগর কন্যা দিল দানেতে।
চন্দ্রকলা নিকেতনে সত্যদেব পূজা মানে
সত্যদেব ভাবি মনে সদা থাকে ধ্যানেতে।।
কন্যার বিবাহ দিয়ে জামাতারে সঙ্গে নিয়ে
সিরিণি বিস্মৃত হয়ে পাটনেতে চলিল।
পীর ক্রোধ করে তায় ধরা পড়ে চোর-দায়
গলে ডোর বেড়ী পায় কারাগারে রহিল।।
এসব প্রকারে ষষ্ঠে সদাগর মুক্ত কষ্টে
সপ্তমে সাধুর দৃষ্টে পথে কৈল ছলনা।
অষ্টমেতে ঘরে এলো চন্দ্রকলা বার্ত্তা পেলো
প্রসাদ খাইতেছিল ফেলে করে হেলনা।।
জলে ডুবে মরে পতি উভরায় কাঁদে সতী
কি হবে আহার গতি প্রভু কোথা গেলে রে।
এ নব-যৌবন-নিশি হয়ে তার পূর্ণ শশী
কোথা আছ অহর্নিশি প্রেমাধিনী ফেলে রে।।
যৌবন প্রভুর কাল মদন-দাহন জাল
কোকিল কোকিলা কাল রেখ পদতলে হে।
যৌবন প্রফুল্ল ফুল কেবল দুঃখের মূল
খেদে হয় প্রাণাকুল ঝাঁপ দিই জলে হে।।
স্তবে তুষ্ট জগৎকর্ত্তা বাঁচাইল তার ভর্ত্তা
সদানন্দ পেয়ে বার্ত্তা পূজারম্ভ করিল।
ভাঙ্গাইয়া কড়ি টাকা সির্ণি কাঁচা আর পাকা
যেন শশধর রাকা দুই লোকে তরিল।।
ভরদ্বাজ অবতংস ভূপতি রায়ের বংশ
সদা ভাবে হত কংস ভুরসিটে বসতি।
নরেন্দ্র রায়ের সুত ভারতে ভারতীযুত
ফুলের মুখুটি খ্যাত দ্বিজপদে সুমতি।।
দেবের আনন্দধাম দেবানন্দপুর নাম
তাহে অধিকারী নাম রামচন্দ্র মুনসী।
ভারতে নরেন্দ্র রায় দেশে যার যশ গায়
হয়ে মোরে কৃপাদায় পড়াইল পারসী।।
সবে কৈল অনুমতি সংক্ষেপে করিতে পুঁথি
তেমতি করিয়া গতি না করিও দূষণা
গোষ্ঠীর সহিত তাঁয় হরি হন বরদায়
ব্রতকথা সাঙ্গ পায় সঙ্গে রৌদ্র চৌগুণা।।