সূরা নিসা

উইকিসংকলন থেকে

[সম্পাদনা] সূরা নিসা

রুকুঃ ২৪ আয়াতঃ ১৭৬

পরম করুণাময় পরম দয়াময় আল্লাহ্‌র নামে

||রুকু ১||

১. হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো যিনি তোমাদেরকে একই আত্মা থেকে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নরনারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর তোমরা ভয় করো আল্লাহ্‌কে যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে দাবি কর। আর তোমরা মাতৃগর্ভকে (অর্থাৎ জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করাকে) ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তোমাদের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।
২. আর তোমরা পিতৃহীনকে তাদের ধনসম্পদ সমর্পণ করবে আর ভালোর সঙ্গে মন্দ বিনিময় করবে না। আর তোমরা তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদকে মিলিয়ে খেয়ে ফেলো না। এ তো মহাপাপ।
৩. আর তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে পিতৃহীনদের ওপর সুবিচার করতে পারবে না তবে বিয়ে করবে (স্বাধীন) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন বা চার জনকে। আর যদি আশঙ্কা কর যে সুবিচার করতে পারবে না তবে একজনকে বা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে। এভাবেই তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভাবনা বেশী।
৪. আর তোমরা নারীদেরকে তাদের দেনমোহর খুশি মনে দিয়ে দাও। যদি তারা খুশি মনে তার কিছু ছেড়ে দেয় তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ করো।
৫. আর অল্পবুদ্ধিসম্পন্নদেরকে তাদের সম্পত্তি দিয়ো না যা আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে রাখতে দিয়েছেন। তার থেকে তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করবে ও তাদের সাথে ভালোভাবে কথা বলবে।
৬. তোমরা পিতৃহীনদের ওপর লক্ষ রাখবে, যে-পর্যন্ত না তারা বিবাহযোগ্য হয়। আর তাদের মধ্যে ভালোমন্দ বিচারের জ্ঞান দেখলে তোমরা তাদের সম্পদ তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে। তার বড় হয়ে যাবে বলে অন্যায়ভাবে তাড়াতাড়ি ক’রে তোমরা তা খেয়ে ফেলো না। যে অভাবমুক্ত সে যেন যা অবৈধ তা থেকে নিবৃত্ত থাকে। আর যে বিত্তহীন সে যেন সংগত পরিমাণে ভোগ করে। তোমরা যখন তাদের সম্পদ সমর্পণ করবে তখন সাক্ষী রেখো। হিসাবগ্রহণে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট।
৭. পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে। আর পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক অথবা বেশীই হোক, এক নির্ধারিত অংশ।
৮. আর সম্পত্তি ভাগের সময়ে আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন বা অভাবগ্রস্ত লোক উপস্থিত থাকলে তাদেরকে তার থেকে (কিছু) দাও; আর তাদের সঙ্গে ভালো কথা বলো।
৯. আর তারা ভয় করুক যে, অসহায় ছেলেপিলে পেছনে ফেলে রেখে গেলে তাদের জন্য তারাও উদ্বিগ্ন হবে। সুতরাং তারা যেন আল্লাহ্‌কে ভয় করে ও ন্যায়সংগত কথা বলে।
১০. যারা পিতৃহীনদের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তারা তো তাদের পেটে আগুন পোরে। তার জ্বলন্ত আগুনে জ্বলবে।


||রুকু ২||

১১. আল্লাহ্‌ নির্দেশ দিচ্ছেন তোমাদের সন্তানসন্ততি সম্পর্কে : এক ছেলে পাবে দুই মেয়ের অংশের সমান; যদি দুই মেয়ের বেশি থাকে তবে তারা পাবে যা সে রেখে গেছে তার দুই-তৃতীয়াংশ, আর যদি এক মেয়ে থাকে তবে সে পাবে অর্ধেক, আর তার যদি সন্তান থাকে তবে তার পিতামাতা প্রত্যেকে পাবে তার ছয় ভাগের এক ভাগ, কিন্তু যদি তার সন্তান না থাকে, শুধু পিতামাতা তার উত্তরাধিকারী হয় তবে তার মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ, কিন্তু যদি তার ভাইয়েরা থাকে তবে তার মা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ, মৃত ব্যক্তির অসিয়তের দাবি বা ঋণ পরিশোধের পরে। তোমাদের পিতামাতা ও তোমাদের সন্তানরা, তোমরা জান না এদের মধ্যে কে তোমাদের উপকারের দিক দিয়ে বেশি আপন। এ আল্লাহ্‌র বিধান। আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী।
১২. তোমাদের স্ত্রী যা রেখে যায় তার অর্ধেক তোমরা পাবে। যদি তাদের একটি সন্তান থাকে তবে তোমরা পাবে তাদের রেখে-যাওয়া সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ, তাদের অসিয়তের দাবি বা ঋণ পরিশোধের পরে। আর তারা পাবে তোমরা যা রেখে যাও তার চার ভাগের এক ভাগ যদি তোমাদের সন্তান না থাকে, কিন্তু যদি একটি সন্তান থাকে তবে যা রেখে যাও তার আট ভাগের এক ভাগ তারা পাবে, তোমাদের অসিয়তের দাবি বা ঋণ পরিশোধের পরে। আর যদি কোনো পুরুষ বা স্ত্রীলোক সম্পত্তি রেখে যায় যার উত্তরাধিকার গ্রহণ করবার জন্য পিতামাতা বা সন্তানসন্ততি নেই আর তার আছে এক ভাই বা এক বোন তবে তাদের প্রত্যেকে পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ, কিন্তু যদি তারা সংখ্যায় বেশি হয় তবে তিন ভাগের এক ভাগের অংশীদার হবে অসিয়তের দাবি ও ঋণ পরিশোধের পরে, অবশ্যই সেই ঋণ যেন (উত্তরাধিকারীদের) ক্ষতি না করে। এ হচ্ছে আল্লাহ্‌র নির্দেশ। আল্লাহ্‌ জানেন, তিনি সহ্য করেন।
১৩. এসব আল্লাহ্‌র নির্ধারিত সীমা। আর যে আল্লাহ্‌র ও রসুলের অনুগত হয়ে চলবে, আল্লাহ্‌ তাকে স্থান দেবেন জান্নাতে যার নিচে নদী বইবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, আর এ মহাসাফল্য।
১৪. অপরদিকে যে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসুলের অবাধ্য হবে ও তাঁর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করবে তিনি তাকে আগুনে ছুড়ে ফেলে দেবেন, সেখানে সে থাকবে চিরকাল; আর তার জন্য র‌য়েছে অপমানকর শাস্তি।

||রুকু ৩||

১৫. তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে তোমরা চারজন সাক্ষী নেবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদেরকে ঘরে আটক করবে, জে-পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয় বা আল্লাহ্‌ তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করেন।
১৬. আর তোমাদের পুরুষদের মধ্যে যে-দুজন এ করবে তাদেরকে শাস্তি দেবে। তবে যদি তারা তওবা করে ও শুদ্ধ হয় তবে তাদেরকে রেহাই দেবে। আল্লাহ্‌ তো ক্ষমা করেন, দয়া করেন।
১৭. আল্লাহ্‌ তো সেইসব লোকের তওবা গ্রহণ করবেন যারা ভুল ক’রে মন্দ কাজ করে। এরাই তো তারা যাদেরকে আল্লাহ্‌ ক্ষমা করেন। আল্লাহ্‌ তো সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী।
১৮. আর যারা (আজীবন) মন্দ কাগ করে তাদের জন্য তওবা নয়। আর তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, ‘আমি এখন তওবা করছি’। আর যাদের অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যু হয় তাদের জন্যও তওবা নয়। এরাই তো তারা যাদের জন্য আমি নিদারুণ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।
১৯. হে বিশ্বাসীগণ! জবরদস্তি ক’রে নারীদেরকে তোমাদের উত্তরাধিকার গণ্য করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদের ওপর অত্যাচার কোরো না। তারা যদি প্রকাশ্যে ব্যভিচার না করে, তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করবে। তোমরা যদি তাদেরকে ঘৃণা কর তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ্‌ যার মধ্যে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকে ঘৃণা করছ।
২০. আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর জায়গায় অন্য স্ত্রী নেওয়া ঠিক কর আর তাদের একজনকে প্রচুর অর্থও দিয়ে থাক, তবুও তার থেকে কিছুই নেবে না। তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ ও জুলুম ক’রে তা নিয়ে নেবে?
২১. কেমন ক’রে তোমরা তা নেবে, যখন তোমরা পরস্পর সহবাস করেছ ও তারা তোমাদের কাছ থেকে শক্ত প্রতিশ্রুতি নিয়েছে?
২২. নারীদের মধ্যে তোমাদের পিতৃপুরুষ যাদেরকে বিয়ে করেছে তোমরা তাদেরকে বিয়ে কোরো না। পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। এ তো অশ্লীল, বড়ই ঘৃণার ব্যাপার ও জঘন্য প্রথা।

||রুকু ৪||

২৩. তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে তোমাদের মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে, ভাগিনী, দুধবোন, দুধমা, শাশুড়ি ও তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যার সাথে সহবাস হয়েছে তার পূর্বস্বামীর ঔরসে তার গর্ভজাত মেয়েরা যারা তোমার অভিভাবকত্বে আছে, তবে যদি তাদের মায়ের সাথে সহবাস না হয়ে থাকে তবে তাদের সাথে তোমাদের (বিয়ে হওয়ায়) কোনো দোষ নেই। আর তোমাদের জন্য তোমাদের ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী ও দুই বোনকে একসঙ্গে বিয়ে করা (নিষিদ্ধ করা হয়েছে)। পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। আল্লাহ্‌ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
২৪. আর নারীর মধ্যে তোমাদের ডান হাতের তাঁবের ছাড়া সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ। তোমাদের জন্য এ আল্লাহ্‌র বিধান। উল্লিখিত নারীরা ছাড়া আর সকলকে ধনসম্পদ দিয়ে বিয়ে করা বৈধ করা হ্ল, ব্যভিচারের জন্য নয়। তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা উপভোগ করবে তাদেরকে নির্ধারিত মোহর দেবে। মোহর নির্ধারণের পর কোনো বিষয়ে পরস্পর রাজি হলে তোমাদের কোনো দোষ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী।
২৫. আর তমাদের মধ্যে কারও স্বাধীন বিশ্বাসী নারী বিয়ে করার সামর্থ্য নাথাক্লে তোমরা তোমাদের ডান হাতের তাঁবের বিশ্বাসী যুবতী বিয়ে করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদের বিশ্বাস সম্বন্ধে ভালো করেই জানেন। তোমরা একে অপরের সমান। সুতরাং তোমরা তাদের মালিকদের অনুমতি নিয়ে তাদেরকে বিয়ে করবে আর তারা যদি ব্যভিচার না করে বা উপপতি না নিয়ে সৎচরিত্রের হয় তবে তাদেরকে ন্যায়সংগতভাবে মোহর দেবে। বিয়ের পর যদি তারা ব্যভিচার করে তবে তাদের শাস্তি স্বাধীন নারীর অর্ধেক। তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারকে ভয় করে এ তাদের জন্য; আর তোমরা ধৈর্য ধরলে তো তোমাদের জন্য মঙ্গল।

আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।


||রুকু ৫||

২৬. হিতাহিত নির্দেশ দিতে আর তোমাদেরকে ক্ষমা করতে আল্লাহ্‌ তোমাদের পূর্ববর্তীদের চরিতকথা তোমাদের কাছে পরিষ্কার ক’রে বলতে চান। বস্তুত আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী।
২৭. আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান; আর যারা কামনা-বাসনার অনুসরণ করে তারা চায় তোমরা ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হও।
২৮. আল্লাহ্‌ তোমাদের ভার হালকা করতে চান। মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল।
২৯. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি ইন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না, তোমরা অবশ্য পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করতে পার। আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কোরো না, আল্লাহ্‌ তো তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।
৩০. আর যে কেউ বিদ্বেষবশত ও অন্যায়ভাবে তা করবে আমি নিশ্চয় তাকে আগুনে পোড়াব, আর এ আল্লাহ্‌র পক্ষে সহজসাধ্য।
৩১. তোমাদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা গুরুতর তা থেকে বিরত থাকলে তোমাদের ছোটখাটো পাপগুলো আমি মোচন করব ও তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করার অধিকার দেব।
৩২. যা দিয়ে আল্লাহ্‌ তোমাদের কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লালসা কোরো না। পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য, আর নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ প্রার্থনা করো, আল্লাহ্‌ তো সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।
৩৩ আর প্রত্যেকের জন্য আমি উত্তরাধিকার নির্ধারিত করেছি যা পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়রা রেখে যায় সে-সম্পর্কে। আর যাদের সঙ্গে দান হাত দিয়ে তোমরা অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছ তাদের প্রাপ্য তাদেরকে দাও। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ সবকিছু দেখেন।

||রুকু ৬||

৩৪. পুরুষ নারীর রক্ষাকর্তা, কারণ আল্লাহ্‌ তাদের এককে অপরের ওপর বিশিষ্টতা দান করেছেন, আর এ এজন্য যে, পুরুষরা তাদের ধন্সম্পদ থেকে ব্যয় করে। তাই সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং যা লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ্‌র হেফাজতে তারা তার হেফাজত করে। স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে ভালো করে উপদেশ দাও, তারপর তাদের বিছানায় যেয়ো না ও তাদেরকে প্রহার করো। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো পথ খুঁজবে না। আল্লাহ্‌ তো মহান শ্রেষ্ঠ।
৩৫. আর যদি দুজনের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা কর তবে তোমরা তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও ওর (স্ত্রীর) পরিবার হতে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চায় তবে আল্লাহ্‌ তাদের মধ্যে ফয়সালার অনুকুল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।
৩৬. তোমরা আল্লাহ্‌র উপাসনা করবে ও কোনোকিছুকে তাঁর শরিক করবে না। এবং পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী ও দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গীসাথি, পথচারী ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসদাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন না আত্মম্ভরী ও দাম্ভিককে।
৩৭. যারা কৃপণতা করে ও মানুষকে কৃপণতার নির্দেশ দেয় এবং আল্লাহ্‌ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তা গোপন করে (আল্লাহ্‌ তাদেরকেও ভালোবাসেন না)। আর আমি অবিশ্বাসীদের জন্য অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত ক’রে রেখেছি।
৩৮. আর যারা লোক-দেখানোর জন্য তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ্‌ ও শেষদিনে বিশ্বাস করে না (আল্লাহ্‌ তাদেরকেও ভালোবাসেন না)। আর শয়তান কারও সঙ্গী হলে সে-সঙ্গী কতই-না জঘন্য!
৩৯. তারা আল্লাহ্‌ ও শেষদিনে বিশ্বাস করলে আর আল্লাহ্‌ তাদেরকে যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করলে তাদের কী ক্ষতি হ’ত? আল্লাহ্‌ তাদেরকে ভালোভাবেই জানেন।
৪০. আল্লাহ্‌ অণুপরিমাণও জুলুম করেন না। অণুপরিমাণ পুণ্যকর্ম হলেও আল্লাহ্‌ তাকে দ্বিগুণ ক’রে দেন এবং নিজের থেকে মহাপুরস্কার দান করেন।
৪১. তখন তাদের কী অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং তোমাকেও তাদের সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত করব?
৪২. যারা অস্বীকার করেছে ও রসুলের অবাধ্য হয়েছে তারা সেদিন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইবে! আর তারা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে কোনো কথাই গোপন করতে পারবে না।

||রুকু ৭||

৪৩. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নেশার অবস্থায় নামাজের কাছে যেয়ো না যতক্ষণ না তোমরা কি বলছ তা বুঝতে পার, আর পথ চলার সময় ছাড়া অপবিত্র অবস্থাতেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা গোসল কর। আর যদি তোমরা অসুস্থ থাক বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আস বা স্ত্রীর সাথে সংগত হও আর পানি না পাও, তবে তাইয়াম্মুম করবে প্রিষ্কার মাটি দিয়ে ও (তা) মুখে ও হাতে বুলিয়ে নেবে। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ পাপমোচনকারী, ক্ষমাশীল।
৪৪. যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছে তাদেরকে কি তুমি ভুলের বেসাতি করতে দেখ নি? আর তারা তো চায় তোমরাও পথভ্রষ্ট হও।
৪৫. আল্লাহ্‌ তোমাদের শত্রু দেরকে ভালোভাবে জানেন। আর অভিভাবক হিসাবে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট, সাহায্যকারী হিসাবেও আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট।
৪৬. ইহুদিরা কথাগুলো বিকৃত করে এবং বলে, ‘আমরা শুনলাম ও মানলাম না, আর আমাদের শোনা না-শোনার মতোই’। আর তারা তাদের জিহ্বা কুঁচকে ধর্মকে অবজ্ঞা করে বলে ‘রায়িনা’। কিন্তু তারা যদি বলত, ‘শুনলাম ও মানলাম এবং শোন ও আমাদের দিকে তাকাও’, তবে তাদের জন্য ভালো ও সংগত হ’ত। কিন্তু তাদের অবিশ্বাসের জন্য আল্লাহ্‌ তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন। তাই তাদের অল্পলোকই বিশ্বাস করে।
৪৭. তোমাদের যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তোমরা তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে বিশ্বাস করো সে সময় আসার পূর্বে, যখন তমাদের মুখপাত্রদেরকে আমি ধ্বংস করব, তোমাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দেব। এবং শনিবার-অমান্যকারীদেরকে যেমন অভিশাপ দিয়েছিলাম আমি তেমন অভিশাপ তোমাদেরকে দেব। আল্লাহ্‌র আদেশ তো কার্যকর হয়েই থাকে।
৪৮. আল্লাহ্‌ তো তাঁর অংশী করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে-কেউ আল্লাহ্‌র অংশী করে সে এক মহাপাপ কের।
৪৯. তুমি কি তাদেরকে দেখ নি যারা নিজেদেরকে পবিত্র মনে করে? না, আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা পবিত্র করেন, আর তাদের ওপর সামান্য পরিমাণও অত্যাচার করা হবে না।
৫০. দেখো! তারা আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে কেমন মিথ্যা বানায়, আর প্রকাশ্য পাপ হিসাবে এ-ই যথেষ্ট।


||রুকু ৮||

৫১. তুমি কি তাদেরকে দেখ নি যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল? তারা জিব্‌ত (প্রতিমা) ও তাগুত (অসত্য দেবতা)-এর ওপর বিশ্বাস করে। তারা অবিশ্বাসীদের সম্বন্ধে বলে যে, ‘বিশ্বাসীদের চেয়ে এদের পথই ভালো’।
৫২. এরাই তো তারা যাদেরকে আল্লাহ্‌ অভিশাপ দিয়েছেন, আর আল্লাহ্‌ যাকে অভিশাপ দেন তুমি কখনও কাউকে তাকে সাহায্য করতে দেখবে না।
৫৩. তবে কি তারা রাজশক্তির অংশীদার? সেক্ষেত্রেও তারা কাউকে খেজুর-আঁটির এক ক্ষুদ্রাংশও দেবে না।
৫৪. বা তারা কি তার ঈর্ষা করে আল্লাহ্‌ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা-যা দিয়েছেন? কারণ, আমি ইব্রাহিমের বংশধরকে তো কিতাব ও হিকমত দিয়ে ছিলাম, আর তাদেরকে দিয়েছিলাম এক বিশাল রাজ্য।
৫৫. তারপর তাদের মধ্যে কেউ-কেউ তাতে বিশ্বাস করেছিল, আর কেউ-কেউ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। পুড়িয়ে ফেলার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট।
৫৬. যারা আমার আমার আয়াতকে অবিশ্বাস করে আমি তাদেরকে আগুনে পোড়াবই। যখনই তাদের চামড়া পুড়ে যাবে তখনই তার জায়গায় আমি নতুন চামড়া সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। আল্লাহ্‌ তো শক্তিমান, তত্ত্বজ্ঞানী।
৫৭. আর যারা বিস্বাস করে ও ভালো কাজ করে তাদেরকে আমি জান্নাতে প্রবেশ করাব, যার নিছে নদী বইবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখানে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র সঙ্গিনী, আর আমি তাদেরকে চিরস্নিগ্ধ ছায়ানীড়ে প্রবেশ করাব।
৫৮. আল্লাহ্‌ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানত তার মালিককে ফিরিয়ে দেবে। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে যে-উপদেশ দেন তা কত ভালো। আল্লাহ্‌ তো সব শোনেন, সব দেখেন।
৫৯. হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহ্‌ ও পরকালে বিশ্বাস কর তবে তম্রা আল্লাহ্‌র অনুগত হও। রসুল এবং তোমাদের শাসকদের অনুগত হও। আর যদি কোনো বিষয়ে তমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে সে-বিষয় আল্লাহ্‌ ও রসুলের কাছে ফিরিয়ে দাও (মীমাংসার জন্য)। এ-ই ভালো ও (এর) শেষ ভালো।

||রুকু ৯||

৬০. তুমি কি তাদেরকে দেখ নি যারা দাবি করে যে তোমার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে ও তোমার পুর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছিল তার ওপর তারা বিশ্বাস করে, অথচ তারা তাগুত (অসত্য দেবতা)-এর কাছে বিচার চায় যদিও তা প্রত্যাখান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? আর শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট ক’রে নিয়ে যায় বহুদুরে।
৬১. যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে ও রসেলের দিকে এসো’, তখন তুমি মুনাফিকদেরকে দেখবে তোমার কাছ থেকে একেবারে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
৬২. তাদের কী অবস্থা হবে যখন তাদের কাজকর্মের জন্য তাদের ওপর বিপদ এসে পড়বে? তখন তারা তোমার কাছে আল্লাহ্‌র শপথ ক’রে বলবে, ‘আমরা মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আর কিছুই চাই নি’।
৬৩. তাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ্‌ তা জানেন। তাই তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো, তাদেরকে সৎ উপদেশ দাও আর তাদেরকে এমন কথা বলো যা তাদের মর্ম স্পর্শ করে।
৬৪. আমি এ-উদ্দেশ্যে রসুল প্রেরণ করেছি যে, আল্লাহ্‌র নির্দেশক্রমে তাকে অনুসরণ করা হবে। যখন তারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছিল তখন তারা তোমার কাছে এলে, আল্লাহ্‌র ক্ষমা চাইলে, আর রসুল তাদের জন্য ক্ষমা চাইলে নিশ্চয় তারা আল্লাহ্‌কে পেত পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালুরূপে।
৬৫. কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যেকার বিরোধ নিষ্পন্ন করার ভার তোমার ওপর না দেবে আর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোনো দ্বিধা থাকবে ও সর্বান্তঃকরণে তা মেনে না নেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা বিশ্বাস করবে না।
৬৬. আর আমি যদি তাদেরকে নির্দেশ দিতাম, ‘তোমরা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করো বা নিজ গৃহ ত্যাগ করো’, তবে তারা অল্প কয়েকজন ছাড়া তা মানত না। আর তাদেরকে যা করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তারা তা করলে তাদের জন্য নিশ্চয়ই ভালো হ’ত ও অন্তরের স্থৈর্যে তারা আরও দৃঢ় হ’ত।
৬৭. আর তখন আমি তাদেরকে আমার কাছ থেকে বড় পুরস্কার দিতাম।
৬৮. আর আমি তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করতাম।
৬৯. আর যে-কেউ আল্লাহ্‌ ও রসুলের অনুসরন করবে সে তাদের সঙ্গী হবে যাদেরকে আল্লাহ্‌ অনুগ্রহ করেছেন - যেমন নবি, সত্যবাদী, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি। এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী।
৭০. এ আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ! জ্ঞানে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট।

||রুকু ১০||

৭১. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো, তাপর হয় দলেদলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হও বা একত্রে অগ্রসর হও।
৭২. আর তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যে গড়িমসি করবেই। তোমাদের কোনো বিপথ হলে সে বলবে, ‘আল্লাহ্‌ আমার ওপর বড় দয়া করেছেন যে, আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম না’।
৭৩. আর যদি তোমাদের ওপর আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ হয়, তবে তোমাদের ও তাদের মধ্যে কোনো সম্বন্ধই ছিল না এমন ভাব করে বল্বে, ‘হায়! আমি যদি তাদের সাথে থাকতাম তবে আমিও বিরাট সাফল্য লাভ করতাম’।
৭৪. অতএব যারা পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবন বিক্রি করে তারা আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম করুক এবং সে নিহত হোক বা বিজয়ী হোক তাকে আমি শীঘ্রই মহাপুরস্কার দেব।
৭৫. তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আল্লাহ্‌র পথে ও অসহায় নরনারী এবং শিশুদের জন্য সংগ্রাম করবে না যারা বলছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! এ অত্যাচারী শাসকের দেশ থেকে আমাদের অন্যত্র নিয়ে যাও, তোমার কাছ থেকে কাউকে আমাদের অভিভাবক করো এবং তোমার কাছ থেকে কাউকে আমাদের সহায় করো’।
৭৬. যারা বিশ্বাসী তারা আল্লহ্‌র পথে সংগ্রাম করে ও যারা অবিশ্বাসী তারা তাগুত (অসত্য দেবতা)-এর পথে সংগ্রাম করে। সুতরাং তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো। শয়তানের কৌশল তো দুর্বল।

||রুকু ১১||

৭৭. তুমি কি তাদেরকে দেখ নি যাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘তোমরা তোমাদের হাতকে সংযুক্ত করো আর নামাজ কায়েম করো ও জাকাত দাও’। তারপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল তখন তাদের একদল আল্লাহ্‌কে ভয় করার মতো বা তার চেয়েও বেশি মানুষকে ভয় করেছিল। আর তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য কেন যুদ্ধের বিধান দিলে? আমাদেরকে কিছু সময়ের জন্য অবকাশ দাও-না!’ বলো, ‘পার্থিব ভোগ সামান্য! আর যে সংযমী তার জন্য পরকালই ভালো। তোমাদের ওপর সামান্য পরিমাণও অত্যাচার করা হবে না’।
৭৮. তোমরা যেখানেই থাক-না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে থাকলেও’। আর তাদের ভালো হলে তার বলে, ‘এ আল্লাহ্‌র কাছ থেকে’। আর তাদের কোনো মন্দ হলে তারা বলে, ‘এ তোমার জন্য’। বলো, ‘সবই আল্লাহ্‌র কাছ থেকে’। এ-সম্প্রদায়ের কী হয়েছে যে এরা একেবারেই কোনো কথা বোঝে না!
৭৯. তোমার যা ভালো হয় তা আল্লাহ্‌র কাছ থেকে আর যা খারাপ হয় তা তোমার নিজের জন্য। আর আমি তোমাকে মানুষের জন্য রসুল হিসাবে পাঠিয়েছি। আল্লাহ্‌র সাক্ষ্যই যথেষ্ট।
৮০. যে রসুলের অনুগত্য করে সে আল্লাহ্‌রই অনুগত্য করল। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাদের ওপর আমি তোমাকে পাহারা দিতে পাঠাই নি।
৮১. আর তারা বলে, ‘আনুগত্য (আমাদের তোমার প্রতি),’ তারপর যখন তারা তোমার কাছ থেকে চলে যায় তখন রাত্রে একদল তারা যা বলে তার বিপরীত পরামর্শ করে। তারা রাত্রে যা পরামর্শ করে আল্লাহ্‌ তা লিখে রাখেন। তাই তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো ও আল্লাহ্‌র ওপর ভরসা করো। কর্মবিধানে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট।
৮২. আচ্ছা তবে কি তারা কোরান সম্বন্ধে চিন্তা করে না? এ যদি আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারও হত তবে তার মধ্যে তারা তো অনেক অসংগতি পেত।
৮৩. আর যখন শাস্তি বা ভয়ের কোনো সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা তা রটনা করে। যদি তারা তা রসুল বা তাদের কর্তৃপক্ষের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা খোঁজখবর নেয় তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত, তবে তমাদের কিছু লোক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করত।
৮৪. অতএব আল্লাহ্‌র পথে সংগ্রাম করো। তোমাকে শুধু তমার নিজের জন্য দায়ী করা হবে। আর তুমি বিশ্বাসীদেরকে উদ্ধুদ্ধ করো। হয়তো আল্লাহ্‌ অবিশ্বাসীদের শক্তি রোধ করবেন। আল্লাহ্‌ শক্তিতে প্রবলতর ও শাস্তিদানে কঠোরতর।
৮৫. কেউ কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করলে তার মধ্যে তার অংশ থাকবে, আর কেউ কোনো মন্দ কাজের সুপারিশ করলে তার মধ্যেও তার অংশ থাকবে। আল্লাহ্‌ তো সব বিষয়ই লক্ষ রাখেন।
৮৬. আর যখন তোমাদেরকে অভিবাদন করা হয় তখন তোমরাও তেমনি বা তার চেয়ে ভালোভাবে অভিবাদন করবে। আল্লাহ্‌ তো সব বিষয়ের হিসাব নেন।
৮৭. আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি তোমাদেরকে কিয়ামতের দিনে একত্র করবেন - এতে তো কোনো সন্দেহ নেই। কে আছে আল্লাহ্‌র চেয়ে বড় সত্যবাদী।

||রুকু ১২||

৮৮. তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা (ওহুদ যুদ্ধের ব্যাপার নিয়ে) মুনাফিকদের সম্বন্ধে দুদলে বিভক্ত হয়ে গেলে, যখন আল্লাহ্‌ তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন? আল্লাহ্‌ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তোমরা তাকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাও? আসলে আল্লাহ্‌ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি তার জন্য কখনও কোনো পথ পাবে না।
৮৯. তারা চায় তারা যেমন অবিশ্বাস করেছে তোমরাও তেমন অবিশ্বাস কর যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও। তাই আল্লাহ্‌র পথে হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের মধ্য থেকে কাউকে তোমরা বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তাদেরকে যেখানে পাবে পাকড়াও করবে ও হত্যা করবে। তাদের মধ্য থেকে কাউকে বন্ধু ও সাহায্যকারী হিসাবে তোমরা গ্রহণ করবে না।
৯০. অবশ্য তাদেরকে নয় যারা এমন এক সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হয় যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ, বা যারা তোমাদের কাছে এমন অবস্থায় আসে যখন তাদের মন তোমাদের সাথে বা তাদের সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ করতে চায় না। আল্লাহ্‌ যদি ইচ্ছা করতেন তবে তাদেরকে তোমাদের ওপর ক্ষমতা দিতেন ও নিশ্চয় তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করত। সুতরাং তারা যদি তোমাদের কাছ থেকে চলে যায়, তোমাদের সাথে যুদ্ধ না করে ও তোমাদের কাছে শান্তি প্রস্তাব করে তবে আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পথ রাখেন না।
৯১. অবশ্য তোমরা কিছু লোক পাবে যারা তোমাদের সাথে ও তাদের সম্প্রদায়ের সাথে শান্তি চায়। যখনই তাদেরকে ফিৎনার দিকে ফেরানো হয়, তখনই এ-ব্যাপারে তারা আগের অবস্থায় ফিরে যায়। যদি তারা তোমাদের কাছ থেকে চ’লে না যায়, তোমাদের কাছে শান্তি প্রস্তাব না করে এবং তাদের হাত না সামলায় তবে তাদেরকে যেখানেই পাবে পাকড়াও করবে ও হত্যা করবে। আর আমি এদের বিরুদ্ধে তোমাদেরকে স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছি।

||রুকু ১৩||

৯২. কোনো বিশ্বাসীকে হত্যা করা কোনো বিশ্বাসীর জন্য সংগত নয়, তবে ভুল ক’রে করলে তা স্বতন্ত্র। আর কেউ কোনো বিশ্বাসীকে ভুল ক’রে হত্যা করলে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা আর তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ দেওয়া বিধেয়, যদি তারা ক্ষমা না করে। আর যদি সে (নিহত ব্যক্তি) তোমাদের শত্রু পক্ষের লোক হয় ও বিশ্বাসী হয় তবে এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়। আর যদি সে (নিহত ব্যক্তি) এমন এক সম্প্রদায়ভুক্ত হয় যার সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ দেওয়া ও এক বিশ্বাসী দাস মুক্ত করা বিধেয়, আর যে সংগতিহীন সে একটানা দুইমাস রোজা রাখবে। তওবার জন্য এ আল্লাহ্‌র বিধান। আল্লাহ্‌ তো সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী।
৯৩. আর যা-কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বিশ্বাসীকে হত্যা করবে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে ও আল্লাহ্‌ তার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে অভিশাপ দেবেন ও তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন।
৯৪. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা যখন আল্লাহ্‌র পথে বের হবে তখন পরীক্ষা ক’রে নেবে। আর কেউ তোমাদের মঙ্গল কামনা করলে বা শ্রদ্ধা জানালে ইহজীবনের সম্পদের লোভে তাকে বোলো না, ‘তুমি বিশ্বাসী নও’। কারণ আল্লাহ্‌র কাছে অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর র‌য়েছে। তোমরা তো পূর্বে এমনই ছিলে! তারপর আল্লাহ্‌ তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, সুতরাং তোমরা পরীক্ষা ক’রে নেবে। তম্রা যা কর আল্লাহ্‌ তা ভালো ক’রেই জানেন।
৯৫. বিশ্বাসীদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে ব’সে থাকে ও যারা আল্লাহ্‌র পথে নিজেদের ধনপ্রাণ দিয়ে জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা নিজেদের ধনপ্রাণ দিয়ে জিহাদ করে আল্লাহ্‌ তাদেরকে যারা ঘরে ব’সে থাকে তাদের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহ্‌ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে ব’সে থাকে তাদের চেয়ে যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ্‌ মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
৯৬. এ তাঁর তরফ থেকে মর্যাদা, ক্ষমা ও দয়া। আল্লাহ্‌ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

||রুকু ১৪||

৯৭. যারা নিজেরদের ওপর অত্যাচার করে তাদের প্রাণ নেওয়ার সময় ফেরেশতারা বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?’ তারা বলে, ‘দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম’। তারা (ফেরেশতারা) বলে, ‘তোমরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস তো করতে পারতে, আল্লাহ্‌র দুনিয়া কি এমন প্রশস্ত ছিল না?’ এরাই বাস করবে জাহান্নামে, আর বাসস্থান হিসাবে তা কী জঘন্য!
৯৮. তবে যেসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না ও কোনো পথও পায় না,
৯৯. আল্লাহ্‌ হয়তো তাদের পাপ ক্ষমা করবেন, কারণ আল্লাহ্‌ পাপমোচনকারী ক্ষমাশীল।
১০০. আর যে-কেউ আল্লাহ্‌ পথে দেশত্যাগ করবে সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয় ও প্রাচুর্য লাভ করবে। আর যে-কেউ আল্লাহ্‌ ও রসুলের উদ্দেশে দেশত্যাগী হয়ে বের হয় আর তার মৃত্যু ঘটে তার পুরস্কারের ভার আল্লাহ্‌র ওপর। আল্লাহ্‌ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

||রুকু ১৫||

১০১. আর তোমরা যখন পৃথিবীতে সফর করবে তখন যদি তোমাদের ভয় হয় যে অবিশ্বাসীরা তোমাদেরকে নির্যাতন করবে, তবে নামাজ সংক্ষেপ করলে তোমাদের কোনো দোষ নেই। অবিশ্বাসীরা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু ।
১০২. আর তুমি যখন তাদের মধ্যে থাকবে ও তাদেরকে নিয়ে নামাজ পড়বে তখন একদল তোমার সঙ্গে যেন দাঁড়ায় আর তারা যেন সশস্ত্র থাকে। তারপর সিজদা করা হলে তার যেন তোমাদের পিছনে অবস্থান করে; আর তারা যেন সর্তক ও সশস্ত্র থাকে। অবিশ্বাসীরা চায়, তোমরা যেন তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও যাতে তারা তোমাদের ওপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। কিন্তু তোমাদের কোনো দোষ নেই যদি বৃষ্টিবাদলের জন্য তোমাদের কষ্ট হয় বা তোমাদের অসুখ হয় আর তোমরা অস্ত্র রেখে দাও, কিন্তু অবশ্যই হুঁশিয়ার থাকবে! আল্লাহ্‌ তো অবিশ্বাসীদের জন্য অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।
১০৩. তারপর যখন তোমরা নামাজ শেষ করবে, তখন দাঁড়িয়ে, ব’সে বা শুয়ে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করবে। যখন তোমরা নিশ্চিন্ত হবে তখন নামাজ কায়েম করবে। নির্ধারিত সময়ে নামাজ কায়েম করা বিশ্বাসীদের জন্য অবশ্যকর্তব্য।
১০৪. আর (শত্রু ) সম্প্রদায়ের সন্ধানে তোমরা শৈথিল্য প্রদর্শন কোরো না। যদি তোমরা কষ্ট পাও তা হলে তোমরা যেমন কষ্ট পাও তারাও তেমনি কষ্ট পায়; কিন্তু তোমরা আল্লাহ্‌র কাছে যে-আশা কর তারা সে-আশা করতে পারে না। আর আল্লাহ্‌ তো সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।

||রুকু ১৬||

১০৫. আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষের মধ্যে সেইমতো বিচার করতে পার আল্লাহ্‌ তোমাকে যেমন জানিয়েছেন। আর তুমি বিশ্বাসঘাতকদের জন্য তর্ক কোরো না।
১০৬. আর তুমি আল্লাহ্‌র কাছ থেক ক্ষমা চাও, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
১০৭. আর তুমি তাদের পক্ষে কথা বলো না যারা নিজেদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ বিশ্বাসঘাতক পাপিষ্ঠকে ভালোবাসেন না।
১০৮. এরা মানুষের কাছ থেকে লুকোতে চায় কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে লুকোতে পারে না। আর আল্লাহ্‌ তাদের সঙ্গে থাকেন যখন তারা রাত্রে এমন বিষয় পরামর্শ করে যা তিনি পছন্দ করেন না। আর তারা যা-ই করে তা আল্লাহ্‌র জ্ঞানের আয়ত্তে।
১০৯. দেখো, তোমরাই পার্থিব জীবনে তাদের পক্ষে কথা বলেছ। কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌র সামনে কে তাদের পক্ষে কথা বলবে, বা কে তাদের জন্য ওকালতি করবে?
১১০. আর কেউ মন্দ কর্ম ক’রে বা নিজের ওপর অত্যাচার ক’রে পরে আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে সে আল্লাহ্‌কে পাবে ক্ষমাশীল ও পরম দয়াময় হিসাবে।
১১১. আর যে-কেউ পাপ কাজ করে সে তা দিয়ে নিজেরই ক্ষতি করে, আল্লাহ্‌ তো সর্বজ্ঞ তত্ত্বজ্ঞানী।
১১২. কেউ কোনো দোষ বা পাপ ক’রে পরে তা কোনো নির্দোষ ব্যক্তির ওপর আরোপ করলে সে মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করবে।

||রুকু ১৭||

১১৩. আর তোমার ওপর যদি আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তবে তাদের একদল তো তোমাকে পথভ্রষ্ট করতে চাইতই, কিন্তু তারা নিজেদেরকে ছাড়া আর কাউকেই পথভ্রষ্ট করে না ও তোমার কোনোই ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ্‌ তোমার কাছে কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করেছেন, আর তুমি যা জানতে না তা তিনি তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, আর তোমার ওপর আল্লাহ্‌র মহাঅনুগ্রহ র‌য়েছে।
১১৪. তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো ভালো নেই, তবে যে দান-খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তিস্থাপনের নির্দেশ দেয় (তার মধ্যে ভালো আছে), আর আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টিলাভের আশায় যে এইরকম করবে তাকে আমি মহাপুরস্কার দেব।
১১৫. আর যদি কারও কাছে সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পরও সে রসুলের বিরুদ্ধাচারণ করে ও বিশ্বাসীদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে তবে সে যেদিকে ফিরে যায় আমি সেদিকেই তাকে ফিরিয়ে দেব ও জাহান্নামেই তাকে পোড়াব; আর বাসস্থান হিসাবে তা কতই-না জঘন্য!

||রুকু ১৮||

১১৬. আল্লাহ্‌ তো শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধের জন্য যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর কেউ আল্লাহ্‌র শরিক করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়।
১১৭. তাঁর পরিবর্তে তার (প্রাণহীন) দেবদেবীর ও বিদ্রোহো শয়তানের পূজা করে।
১১৮. আল্লাহ্‌ তাকে (শয়তানকে) অভিশাপ দেন ও সে বলে, ‘আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (আমার দলে) নিয়ে ফেলব,
১১৯. আর আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই; তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করব। আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব এবং তারা পশুর কান ফুটো করবে (দেবদেবীকে উৎসর্গ করার জন্য)। আর আমি নিশ্চয় নির্দেশ দেব এবং তারা আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকে বিকৃত করবে’। আর যে আল্লাহ্‌র পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহ্ণ করে, সে তো প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১২০. সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় ও তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে, আর শয়তান তাদেরকে যে- প্রতিশ্রুতি দেয় সে তো ছলনা মাত্র।
১২১. এদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম, তার থেকে তারা নিষ্কৃতির উপায় পাবে না।
১২২. আর যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, যার নিচে নদী বইবে; সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কে আছে আল্লাহ্‌র চেয়ে বড় সত্যবাদী?
১২৩. তোমাদের খেয়ালখুশি ও কিতাবিদের খেয়ালখুশি অনুসারে কাজ হবে না। যে-কেউ মন্দ কাজ করবে সে তার প্রতিফল পাবে আর আল্লাহ্‌ ছাড়া সে তার জন্য কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না।
১২৪. আর পুরুষই হোক বা নারীই হোক যারাই বিশ্বাসী হয়ে সৎকাজ করবে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে ও তাদের প্রতি অণুপরিমাণও জুলুম করা হবে না।
১২৫. আর তার চেয়ে ধর্মে কে ভালো যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহ্‌র কাছে আত্মসমর্পণ করে ও একনিষ্ঠভাবে ইব্রাহিমের সমাজ অনুসরণ করে? আর আল্লাহ্‌ ইব্রাহিমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।
১২৬. আর আকাশ ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব আল্লাহ্‌রই এবং সবকিছুকে আল্লাহ্‌ পরিবেষ্টন ক’রে র‌য়েছেন।

||রুকু ১৯||

১২৭. আর লোকে তোমার কাছে নারীদের বিষয় পরিষ্কারভাবে জানতে চায়। বলো, ‘আল্লাহ্‌ তাদের সম্বন্ধে তোমাদেরকে পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছেন, আর যে কিতাব তোমাদের কাছে আবৃত্তি করা হয় (তাও জানিয়ে দেয়), পিতৃহীনা নারীর সম্পর্কে যাদের প্রাপ্য তোমরা দাও না অথচ তোমরা তাদেরকে বিয়ে করতে চাও, আর অসহায় শিশুদের সম্বন্ধে, আর পিতৃহীন্দের ওপর তোমাদের ন্যায়বিচার কায়েম করা সম্পর্কে। আর তোমরা যা ভালো কাজ কর আল্লাহ্‌ তা ভালো করেই জানেন।
১২৮. কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীর কাছ থেকে দুর্ব্যভার ও উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা করে তবে তারা আপস-নিষ্পত্তি করতে চাইলে তাদের কোনো দোষ নেই। আপস করা তো ভালো। কিন্তু মানুষ লালসায় আসক্ত। আর যদি তোমরা সৎকর্মপরায়ণ ও সাবধান হও তবে (জেনে রেখো) তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ তার খবর রাখেন।
১২৯. আর তোমরা যতই ইচ্ছা কর-না কেন তোমাদের স্ত্রীদের সাথে কখনোই সমান ব্যাহার করতে পারবে না। তবে তোমরা কোনো-একজনের দিকে সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকে পোড়ো না ও অপরকে ঝুলিয়ে রেখো না। আর যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর ও সাবধান হও তবে আল্লাহ্‌ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
১৩০. আর যদি তারা পরস্পর পৃথক হয়ে যায় তবে আল্লাহ্‌ তাঁর প্রাচুর্য দ্বারা তাদের প্রত্যেকের অভাব দূর করবেন। আল্লাহ্‌ তো উদার, তত্ত্বজ্ঞানী।
১৩১. আকাশে ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সব আল্লাহ্‌রই। তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদেরকে ও তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় করবে। আর তোমরা তা অবিশ্বাস করলেও আকাশে ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে তা আল্লাহ্‌রই। আর আল্লাহ্‌ আভিবমুক্ত, প্রশংসার্হ।
১৩২. আর আকাশে ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই আল্লাহ্‌র আর কর্ম্বিধানে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট।
১৩৩. হে মানবসমাজ, তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে সরিয়ে অপরকে আনতে পারেন, আর আল্লাহ্‌ এ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।
১৩৪. যে-কেউ ইহকালের পুরস্কার চাইবে (সে জেনে রাখুক যে), আল্লাহ্‌র কাছে ইহকাল ও পরকালের পুরস্কার রয়েছে। আল্লাহ্‌ সব শোনেন, সব দেখেন।

||রুকু ২০||

১৩৫. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তম্রা আল্লাহ্‌র উদ্দেশে সাক্ষ্য দেবে, যদি তা তোমাদের নিজেদের বা পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধেও হয়; সে বিত্তবান হোক বা বিত্তহীনই হোক আল্লাহ্‌ উভয়েরই যোগ্যতত অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। যদি তোমরা প্যাঁচালো কথা বল বা পাশ কেটে চল তবে তোমরা যা কর আল্লাহ্‌ তার খবর রাখেন।
১৩৬. হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ্‌, তাঁর রসুল, তাঁর রসুলের ওপর তিনি যে-কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তাতে এবং যে-কিতাব তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে বিশ্বাস করো। আর যে আল্লাহ্‌, তাঁর ফেরেশতাদেরকে, তাঁর কিতাবসমূহে, তাঁর রসুলদেরকে এবং পরকালকে অবিশ্বাস করবে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হবে।
১৩৭. যারা বিশ্বাস করার পর অবিশ্বাস করে এবং আবার বিশ্বাস করে ও আবার অবিশ্বাস করে, তাদের অবিশ্বাস করার ঝোঁক বাড়তে থাকবে। আল্লাহ্‌ তাদেরকে কিছুতেই ক্ষমা করবেন না, আর তাদেরকে কোনো পথও দেখাবেন না।
১৩৮. মুনাফিকদের সুখবর দাও যে তাদের জন্য রয়েছে নিদারুণ শাস্তি।
১৩৯. যারা বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে তারা কি তাদের কাছে সম্মানের আশা করে? সব সম্মান তো আল্লাহ্‌রই।
১৪০. কিতাবের মাধ্যমে তোমাদের প্রতি তিনি (এই) প্রত্যাদেশ করেছেন যে যখন তোমরা শুনবে আল্লাহ্‌র কোনো আয়াতকে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং তাকে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে-পর্যন্ত তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত না হয় তোমরা তাদের সঙ্গে বসবে না, অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে। মুনাফিক ও অবিশ্বাসীদের সকলকেই আল্লাহ্‌ জাহান্নামে একত্র করবেন।
১৪১. যারা তোমাদের ভালোমন্দের প্রতীক্ষায় থাকে তারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে তোমাদের জয় হলে বলে, ‘আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?’ আর ভাগ্য যদি অবিশ্বাসীদের অনুকূল হয়, তার বলে, ‘আমরা কি তোমাদের দেখাশোনা করি না আর আমরা কি তোমাদেরকে বিশ্বাসীদের হাত থেকে রক্ষা ক্রি নি?’ আল্লাহ্‌ কিয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে বিচার করে দেবেন, আর আল্লাহ্‌ কখনোই বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসীদের জন্য কোনো পথ রাখবেন না।

||রুকু ২১||

১৪২. মুনাফিকরা আল্লাহ্‌কে ধোঁকা দিতে চায়। আসলে তিনিই (আল্লাহ্‌ই) তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে থাকেন। আর যখন তারা নামাজে দাঁড়ায় তখন ঢিলেঢালাভাবে কেবল লোক দেখানোর জন্য দাঁড়ায়, এবং আল্লাহ্‌কে তারা অল্পই স্মরণ করে।
১৪৩. এতেও দ্বিধাগ্রস্ত, না এদিকে না ওদিকে! আর আল্লাহ্‌ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি তার জন্য কখনও কোনো পথ পাবে না।
১৪৪. হে বিশ্বাসীগণ! বিশ্বাসীদের পরিবর্তে অবিশ্বাসীদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ কোরো না। তোমরা কি আল্লাহ্‌কে তোমাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণ দিতে চাও?
১৪৫. মুনাফিকগণ তো আগুনের সবচেয়ে নিচের স্তরে থাকবে, আর তাদের জন্য তুমি কখনও কনো সাহায্যকারী পাবে না।
১৪৬. কিন্তু যারা তওবা করে, নিজেদেরকে সংশোধন ক’রে আল্লাহ্‌কে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করে ও আল্লাহ্‌র উদ্দেশে তাদের ধর্মকে শুদ্ধ করে তারা বিশ্বাসীদের সঙ্গে থাকবে। আর বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ্‌ মহাপুরস্কার দেবেন।
১৪৭. তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর ও বিশ্বাস কর, তবে আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে শাস্তিপ্রদান করে কী করবেন? আল্লাহ্‌ অত্যন্ত জ্ঞানী, গুণগ্রাহী।
১৪৮. মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন না, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার কথা স্বতন্ত্র। আল্লাহ্‌ সব শোনেন, সব জানেন।
১৪৯. যদি তোমরা প্রকাশ্যে বা গোপনে সৎকর্ম কর বা (কারও) অপরাধ ক্ষমা কর, তবে তো আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, শক্তিমান।
১৫০. যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসুলদেরকে অবিশ্বাস করে, আর ইচ্ছা ক’রে আল্লাহ্‌ ও রসুলদের মধ্যে পার্থক্য করে আর বলে, ‘আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অবিশ্বাস করি, আর এদের মাঝের এক পথ অবলম্বন করতে চায়’,
১৫১. প্রকৃতপক্ষে এরাই অবিশ্বাসী, আর অবিশ্বাসীদের জন্য আমি অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি।
১৫২. আর যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসুলদেরকে বিশ্বাস করে ও তাদের একের সাথে অপরের পার্থক্য করে না তাদেরকেই তিনি পুরস্কার দেবেন। আর আল্লাহ্‌ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

অনুবাদটি নেওয়া হয়েছে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অনুবাদিত 'কোরানশরিফ সরল বঙ্গানুবাদ' থেকে।