অগ্নিপরীক্ষা
এম, পি, প্রোডাকসন্স লিমিটেডের নিবেদন
অগ্নিপরীক্ষা
পরিচালনা: অগ্রদূত
| কাহিনী: আশাপূর্ণা দেবী | চিত্রনাট্য: নিতাই ভট্টাচার্য্য |
| গীতিকার: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার | সঙ্গীত পরিচালক: অনুপম ঘটক |
| চিত্রশিল্পী: বিভূতি লাহা | শিল্পনির্দেশ: সত্যেন রায়চৌধুরী |
| চিত্রশিল্পী: বিজয় ঘোষ | ব্যবস্থাপক: তারক পাল |
| শব্দযন্ত্রী: যতীন দত্ত | রূপসজ্জা: বসির আমেদ |
| সম্পাদক: সন্তোষ গাঙ্গুলী | নৃত্যপরিচালক: বিনয় ঘোষ |
| দৃশ্যসজ্জা: সুধীর খাঁ |
সহকারীগণ
| পরিচালনায়: সরোজ দে, পার্ব্বতী দে | দৃশ্যসজ্জায়: জগবন্ধু সাউ, সুকুমার দে |
| পরিচালনায়: নিশীথ বন্দ্যোপাধ্যায় | দৃশ্যসজ্জায়: যোগেশ পাল |
| সঙ্গীতে: হীরেন ঘোষ | রূপসজ্জায়: বটু গাঙ্গুলী |
| চিত্রগ্রহণে: দিলীপ মুখার্জী | রূপসজ্জায়: রমেশ দে |
| শব্দধারণে: অনিল তালুকদার | ব্যবস্থাপনায়: সুবোধ পাল |
| শব্দধারণে: জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় | আলোকনিয়ন্ত্রণে: সুধাংশু পাল |
| শব্দধারণে: শৈলেন পাল | আলোকনিয়ন্ত্রণে: নারায়ণ চক্রবর্ত্তী |
| সম্পাদনায়: রমেন ঘোষ | আলোকনিয়ন্ত্রণে: শম্ভু ঘোষ, নন্দ মল্লিক |
স্থিরচিত্র: ষ্টিল ফটো সার্ভিস
চিত্রপরিস্ফুটনা: ইউনাইটেড সিনে লেবরেটারীজ্
শ্রীযুক্ত মণি মুখোপাধ্যায় ★ কৃষ্ণবাগান এ্যাথ্লেটিক্ ক্লাব
নান্ এণ্ড কোং লিঃ ★ দি গ্র্যামো রেডিও ষ্টোরসন্যাশনাল সাউণ্ড স্টুডিওতে আর, সি, এ, শব্দযন্ত্রে গৃহীত
| পরিবেশক: ডি-ল্যুক্স ফিল্ম ডিষ্ট্রিবিউটার্স লিমিটেড |
| পরিবেশক: ৮৭, ধর্ম্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা-১৩ |
কাহিনী
হু হু করে ছুটে চলেছে ট্রেন তাপসীর বিক্ষুব্ধ অন্তরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ..
পালিয়ে যাচ্ছে সে। দুর্ব্বার এক আকর্ষণের হাত থেকে। কিরীটির কাছ থেকে। দীর্ঘদিন নিজের সঙ্গে অহরহ যুদ্ধ ক’রে ক্ষতবিক্ষত তার মন আজ বুঝি আত্মরক্ষার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
তাই সে পালিয়ে যাচ্ছে তার অভিশপ্ত জীবন নিয়ে কিরীটির সঙ্গে তার বাগদানের আসর থেকে। কারণ—সে পূর্ব্ব বিবাহিতা, উৎসর্গীকৃতা!
ট্রেন ছুটে চলেছে কুসুমপুরের দিকে। ... তাদের বংশের ভিটে। দশ বছর আগে সেখানে একদিন ভাগ্য তার সঙ্গে খেলেছিল এক নিষ্ঠুর প্রহসন। তখন তার সবেমাত্র বয়ঃসন্ধি। এক মৃত্যুপথযাত্রীর কামনায় কি করে যে তার বিয়ে হয়ে গেল তাঁর কিশোর নাতির সঙ্গে—সে বোধ হয় বুঝতেও পারেনি সেদিন। সব অনুষ্ঠানও সম্পূর্ণ করা যায়নি। শুধু বন্ধনটুকুই অক্ষয় হ’য়ে রইলো।
শুধু মনে পড়ে সেদিন সকালে রাধাবল্লভজীর মন্দির প্রাঙ্গনে যে সপ্রতিভ কিশোরটি হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়েছিল—তার পরণে ছিল পূজার চেলীর বাস, দেবকুমারের মতোই ছিল তার কান্তি। যেখানে পা দুখানি সে রেখেছিল সেখানে বুঝি দুটি রাঙা স্থল পদ্মই ফুটে উঠেছিল!
উগ্র আধুনিকা তার মা চিত্রলেখা। ‘পুতুল খেলা’র এ বিয়েকে তিনি স্বীকার করেননি। তাঁর মেয়ের রূপ আছে। নব্য শিক্ষায়, সভ্যতায় তাকে পটিয়সী ক’রে তাঁদের হাল ফ্যাসানের সমাজের সকলকে টেক্কা দেবার সাধ তাঁর। কোথাকার এক গ্রাম্য জমিদারের নাতি বুলু। কতো বিলাত-ফেরৎ ধনী পাত্র তাপসীর জন্যে ধর্ণা দেবে। সেই গর্ব্বের স্বপ্নে মেয়ের মন থেকে সে বিয়ের স্মৃতি মুছে ফেলবার প্রয়াসের অন্ত ছিল না তাঁর।
কিন্তু হায়, এ নিদারুণ সত্যকে যদি এতো সহজেই মুছে ফেলা যেতো! তাকে নিয়ে চিত্রলেখার আতিশয্যে কখনো সে করেছে বিদ্রোহ—কখনো নিরূপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করেছে। নিজের অসামান্য রূপ-গুণ-যৌবনকে নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত করে, উন্মুখ হৃদয়ের কণ্ঠরোধ করে বার বার সে প্রত্যাখ্যান করেছে প্রলোভনকে, বার বার প্রত্যাখ্যান করেছে চিত্রলেখার নির্ব্বাচিত সুপাত্রদের।
তবু মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর প্রশ্ন তাকে জর্জ্জরিত করেছে—কেন, কেন সে চিরকাল এমনি বঞ্চিত হয়ে থাকবে? পাপের ভয়ে, না তার সেই খেলাঘরের বরের আশায়? কোথায় সেদিনকার সেই অপরিণত বয়স্ক বালক—তার স্বামী! কোনোদিন কি আর সে ফিরে আসবে তাপসীর কাছে স্বামীত্বের দাবী নিয়ে? না তাপসীই চিরকাল তাকে খুঁজে বেড়াবে? আশাহীন আনন্দহীন, প্রেমস্পর্শহীন নিরর্থক জীবনটা কিসের আশায় সে নির্জ্জন ঘরে ধূপের মতো জ্বালিয়ে নিঃশেষ করতে থাকবে?... কে জানে—এতোদিন ধ’রে যে বাধাকে দুর্লঙ্ঘ্য মনে করে পলে পলে নিজেকে ক্ষয় করে আসছে, আসলে, সেটা একটা বিরাট ফাঁকি কি না!
ট্রেন ছুটে চলেছে হু হু করে।... প্রতি মুহূর্ত্তে কিরীটির আর তার মাঝে ব্যবধান যতো বাড়ছে তার হৃদয়তন্ত্রীগুলোতে ততো প্রবল টান পড়ছে যেন। আর সকলের মতো কিরীটিকে সে ফেরাতে পারলো কই। কেন তার সামনে নিজেকে এতো অসহায় মনে হয়—তার আকর্ষণে সব ধৈর্য্য, সব সংকল্প ভেসে যেতে চায়! তবু কিরীটি এসে দাঁড়িয়েছে নীরব প্রার্থীর মতো—সসম্ভ্রমে। যদি সে দস্যুর মতো লুঠ করতে চাইতো? পারতো কি তাপসী তার খুঁটি আঁকড়ে থাকতে?
আকর্ষণ আর বিকর্ষণের একি নিষ্করুণ দোটানার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে! কে দেবে তাকে আজ পথের নির্দ্দেশ?
সে যুগের সীতা একদিন এই রকম এক অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণা হয়ে নারীর কপালে দিয়েছিলেন জয়-তিলক। আর আজ সে কি দেবে—কলঙ্ক? বৃদ্ধা বসুন্ধরা বুঝি আজ বধিরা—নইলে এতো বড়ো সঙ্কটের দিনে সেদিনের মতোই তাপসীকে কোল দিতেন।
সংগীতাংশ
[ ১ ]
বঁধুর কাজল সজল জলদ অঙ্গে
রূপের লাবণী ঝলে—
আহা, সে-রূপ নিরখি রাধার নয়নে
মনের আকুতি জ্বলে।
(তখন সখীদের কানে কানে শ্রীমতী বলিলেন)
পাঁজর কাটিয়া সে-রূপ যে আজি
পরাণে পশিল আসি—
শিরে শিখি-পাখা, হাতে ফুল-বাঁশী,
অধরে মধুর হাসি—
(যে-রূপে রমণীর কুল শীল লাজ-মান
কিছুই থাকে না)
সে-রূপ দেখে যে এলাম,
আমার মদন মোহন আজ ভুবন মোহন রূপে
দেখে যে এলাম।
দাঁড়িয়ে আছে—যমুনার তটে দাঁড়িয়ে আছে,
হৃদয় যমুনার তটে দাঁড়িয়ে আছে।
বাম আঁখি কেন সঘনে নাচিছে
কি হ’ল বুঝিতে নারি,
বঁধুয়া এসেছে চেয়ে দেখ্ শুক
কহিল হাসিয়া সারী।
(তখন শুক কহিল)
আজ তাই কিরে তোর রাধিকা হাসিছে—
বহিছে মলয় বায়,
ও তার বসন উড়িছে চিকুর ফুরিছে
পিককুল ঐ গায়।
আজ কুসুম গন্ধ লাগিছে ভালো—
জীবনে সুদিন এসেছে ব’লে
লাগিছে রাধার সকলি ভালো,—
ও তার জীবন ভরিয়া এনেছে হাসি—
সেই সে রূপেরি আলো।
[ ২ ]
জীবন নদীর জোয়ার ভাঁটায়
কত ঢেউ ওঠে পড়ে,
সে হিসাব কভু রাখে না কালের খেয়া,
কত পথ সে ত’ পার হ’য়ে যায়—
পালে তার হাওয়া ভরে॥
ওরে ও যাত্রী এই খেয়াতেই
পাড়ি দিতে হবে আজি,
কূল হ’তে কূলে নিয়ে যেতে তোরে
নিয়তি সেজেছে মাঝি;
তার কঠিন মুঠি যে চিরদিনই তোর
ভাগ্যেরই হাল ধরে।
সমুখে যে তোর হাতছানি দেয়
চির অজানার ডাক;
এই পথে যেতে পিছে পড়ে রবে
জীবনের কত বাঁক।
ওরে ও যাত্রী কে জানে কোথায়
কোন্ কূলে গিয়ে কবে,
ক্লান্তি না-জানা অকূলের এই
পথ তোর শেষ হবে;
অতীতেরি শোকে কেন তবু চোখে
শ্রাবনেরি ধারা ঝরে॥
[৩]
গানে মোর কোন্ ইন্দ্রধনু
আজ স্বপ্ন ছড়াতে চায়,
হৃদয় ভরাতে চায়।
মিতা মোর কাকলি কুহু—
সুর শুধু যে ঝরাতে চায়,
আবেশ ছড়াতে চায়!
মৌমাছিদের মিতালী,
পাখায় বাজায় গীতালী।
মীড় দোলানো সুরে আমার
কণ্ঠে মালা পরাতে চায়।
বাতাস হ’লো খেয়ালী,
শোনায় কি গান হেঁয়ালী।
কে জানে গো তার বাণী আজ
কি সুর প্রাণে ধরাতে চায়—
আবেশ ছড়াতে চায়।
[৪]
ফুলের কানে ভ্রমর আনে স্বপ্ন ভরা সম্ভাষণ,
এই কি তবে বসন্তের নিমন্ত্রণ।
দখিন হাওয়া এলো ঐ বন্ধু হ’য়ে তাই কি আজ
কণ্ঠ আমার জড়িয়ে ধরে জানায় শুধু আলিঙ্গন।
ঐ যে বন-ফুলের বন দোলে,
তাই কি আমারি এ-মন দোলে,
পথিক পাখী যায় উড়ে যায়—
কোন্ সে দুরে যায় গো যায়।
মুগ্ধ প্রাণে যায় যে এঁকে পাখায় ছায়ার আলিম্পন।
আজ আমার কণ্ঠ ভ’রে সুর এলো
আর কাছে আরো আপন হ’য়ে দূর এলো—
নতুন কোরে তাই যেন গো
আজ নিজেরে পাই যে পাই।
প্রাণে আমার পরশ ছোঁয়ায় কিছু পাওয়ার শুভক্ষণ।
[৫]
যদি ভুল কোরে ভুল মধুর হ’লো
মন কেন মানে না,
কেন একটু ছোঁয়া দোলায় আমায়
কেউ তো জানে না।
আজ হারিয়ে যেতে তবে কিসের বাধা—
যদি এ ভুল হ’লো গো ভালো
আঁধারে সে আলো।
আহা তাই এ বাণী খুঁজে পায় কি হাসি—
সুরে আজ পড়ে সে বাঁধা—
তবে ফাগুন কেন দেখেও আমায়
কাছে তার টানে না।
কেন সে আমায় আজ এমন কোরে
ডাক দিয়ে ঐ যায়—
তারি সুরে হৃদয় আমার
ব্যাকুল হ’তে চায়।
এই একটু খুসী—এই একটু নেশা,
কেন ভোলালো আমায়
আর দোলালো আমায়
বল’ এ কি মায়া মোর আঁখি ছায়া
স্বপ্নে যেন মেশা―
তবু আমায় দেবার হৃদয় নিয়ে
কেন সে মালা আনে না॥
[৬]
আজ আছি কাল কোথায় রব’
কোথায় রব’ (কে জানে)—
কাল কি হবে তাই ভেবে আজ
মিছেই কেন আকুল হব’।
আনন্দ আর গানে গানে
এই ক’টি দিন কাটিয়ে যাও,
জীবনেরি পানশালাতে
উৎসবে প্রাণ মিশিয়ে নাও।
ক্ষণিক হলেও দু’জনারে দু’জন চিনে লব’।
তুমি আমি রব না কেউ
আয়ুর প্রদীপ হবেই ক্ষীণ,
তাই তো বলি হেসে-খেলে
মন ভরিয়ে যাক্ না দিন।
আছি দু’জন সবার চেয়ে এই ত’ অভিনব॥
[৭]
কে তুমি আমারে ডাকো—
ফিরে ফিরে চাই দেখিতে না পাই
অলখে লুকায়ে থাকো।
মনে তো পড়ে না তবুও যে মনে পড়ে
কেন হাসিতে গেলেই হৃদয় আঁধারে ভরে,
সমুখের পথে যেতে পিছনে টানিয়া রাখো।
নতুন অতিখি দাঁড়ায়ে রয়েছে দ্বারে,
তবু ফিরাতে হবে যে তারে।
যদি ভুল ক’রে মালা দিতে চাই কারো গলে
বলো কেন কাঁপে হাত বাধা পাই পলে পলে।
আমারি আকাশ শুধু মেঘে মেঘে কেন ঢাকো॥
‘অগ্নিপরীক্ষা'র রূপায়ণে—
সুচিত্রা সেন, চন্দ্রাবতী,
সুপ্রভা মুখার্জী, যমুনা সিংহ,
শিখারাণী বাগ, অপর্ণা দেবী,
উত্তমকুমার, জহর গাঙ্গুলী,
কমল মিত্র, জহর রায়
অনুপকুমার
শ্যামলী চক্রবর্ত্তী, সবিতা ভট্টাচার্য্য, মঞ্জুশ্রী, ঞ্জলী, রত্না, পঞ্চানন ভট্টাচার্য্য, গোকুল মুখার্জী, মনোজ বিশ্বাস, মাঃ বিভু, মাঃ শ্যামল, শম্ভু কুণ্ডু, অমূল্য, গোপাল, ভবতোষ, মিহির, শিশির, কাল্লু, বলাই, দীপ্তিকুমার, পটল, বিভূতি, নিরঞ্জন, সত্যেন, বীরেশ্বর ভট্টাচার্য্য, জয়ন্ত ভট্টাচার্য্য।
এম, পি, প্রোডাকসন্স লিমিটেড (৮৭, ধর্ম্মতলা স্ট্রীট, কলিকাতা) কর্ত্তৃক প্রকাশিত এবং ইম্পিরিয়াল আর্ট কটেজ (১ এ, টেগোর ক্যাশল ষ্ট্রীট, কলিকাতা—৬) হইতে মুদ্রিত।
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।