বিষয়বস্তুতে চলুন

অণুকথা সপ্তক/ঝোট্টন ও লোট্টন

উইকিসংকলন থেকে

ঝোট্টন ও লোট্টন

[১]

 যে কালের কথা বলছি, তখন আমি বাংলাদেশের কোন একটা সহরে বাস করতুম,—কলকাতায় নয়।

 পাড়াগাঁয়ে সহরের নানা অভাব থাকতে পারে, কিন্তু একটা জিনিষের অভাব নেই—অর্থাৎ জমির। সহরের ভিতরে না হোক বাইরে দেদার জমি পড়ে আছে,—জঙ্গল নয়, ধানের ক্ষেত। আর সেই সব ধান-ক্ষেতকে কেউ কেউ প্রকাণ্ড হাতাওয়ালা বাড়ীতে পরিণত করেছেন। আমি যে বাড়ীতে বাস করতুম, সেটা ছিল সেই জাতের বাড়ী।

 সে বাড়ীতে বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীচি-গোছ একটা মস্ত আস্তাবল ছিল,—বসতবাড়ীর গা ঘেঁসে নয়, দু’তিন রসি তফাতে বড় রাস্তার ধারে। সে আস্তাবলে ছিল মস্ত একটা গাড়িখানা, তার দু’পাশে দু’টি ঘোড়ার থান, আর তার ওপাশে সইস-কোচমানদের সপরিবারে থাকবার ঘর। আমি যে-সময়ের কথা বলছি, তখন সেখানে গাড়িও ছিলনা ঘোড়াও ছিল না, মানুষও থাকত না। ছিল শুধু ইঁদুর ও ছুঁচো, টিকটিকি ও আরসোলা; আর সেখানে যাতায়াত করত গো-সাপ ঢোঁড়াসাপ আর গিরগিটি, যাদের দেখবামাত্র আমাদের নীরব ও নিরীহ বিলিতী শিকারী কুকুরটা তম্মুহূর্ত্তে বধ করত; অথচ তাদের মাংস খেত না। সে ছিল ইংরেজরা যাকে বলে real sportsman। “কর্ম্মণ্যে-বাধিকারস্তে না ফলেষু কদাচন”—এ উপদেশ তাকে দেওয়া ছিল নিষ্প্রয়োজন; কারণ ফলনিরপেক্ষ হত্যাই ছিল তার স্বধর্ম্ম।

[২]

 একদিন সকালে আমাদের বাড়ীর বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি, এমন সময় শুনতে পেলুম সেই পোড়ো আস্তাবলে কে মহা চীৎকার করছে। কানে এল আমাদের মালী চিনিবাসের গলার আওয়াজ। সে তারস্বরে ‘নিকালো নিকালো’ বলে চেঁচাচ্ছে। বুঝলুম যার প্রতি এ আদেশ হচ্ছে, সে পশু নয়—মানুষ।

 এই গোলমাল শুনে আমি ও আমার এক আত্মীয় উপেনদাদা দুজনে সেখানে ছুটে গেলুম। গিয়ে দেখি আস্তাবলে গাড়িখানার মেঝেয় দুটি লোক বসে আছে। দুজনেই সমান অস্থিচর্মসার, আর দুজনেই মুমূর্ষু। রোগেই হোক, উপবাসেই হোক, তারা শুকিয়ে মুকিয়ে আমচূর হয়ে গেছে তারা যে চিনিবাসের কথা অমান্য করছে, তার কারণ তাদের নড়বার চড়বার শক্তি নেই। এমন কঙ্কালসার মানুষ জীবনে আর কখনো দেখিনি। তারা যে এখানে চলে এল কি করে, তা’ বুঝতে পারলুম না। বোধহয় আকাশ থেকে পড়েছিল।

 উপেনদা এদের দেখবামাত্র চিনিবাসের সঙ্গে যোগ দিয়ে “বেরিয়ে যাও” বলে চীৎকার করতে লাগলেন। আমি ওদুজনকেই থামালুম। আমি মনিব, সুতরাং আমি এক ধমক দিতেই চিনিবাস চুপ করলে। আর যদিও আমি তখন 4th Class-এ পড়ি, আর উপেনদা বি এ পড়েন, তবু তিনি জানতেন যে মা আমার কথা শোনেন, তাঁর কথা উপেক্ষা করেন। তিনি ভাবতেন তার কারণ অন্ধ মাতৃস্নেহ, কিন্তু আসলে তা’ নয়। তার যথার্থ কারণ, মা ও আমি উভয়েই এক প্রকৃতির লোক ছিলুম। অপর পক্ষে উপেনদার মতে, নিজের তিলমাত্র অসুবিধে করে অপরের জন্য কিছু করা অশিক্ষিত নির্ব্বুদ্ধিতার লক্ষণ।

 সে যাই হোক, আগন্তুক দুটিকে জিজ্ঞাসা করে বুঝলুম যে, তারা দুজনে ‘দেশ কা’ ভাই। কিন্তু কোন দেশ যে তাদের দেশ, তা’ তারা বলতে পারে না; কারণ তাদের নাকি “কুছ, ইয়াদ নেই”। তাদের আছে শুধু পেটে ক্ষিধে আর মনে বেঁচে থাকবার ইচ্ছে তারা আসছে বহুদূর থেকে, আর দু’দিন আমাদের এখানে থাকতে চায়। আর তাদের নাম ঝোট্টন ও লোট্টন। আমি সব দেখে-শুনে বল্লুম—“আচ্ছা, তুম-লোক হিঁয়া রহেনে সক্‌তা”। তারপর মার কাছে গিয়ে তাঁর অনুমতি নিলুম। উপেনদা মাকে ভয় দেখালেন যে ও-দুজন ডাকাত, আর এসেছে আমাদের বাড়ী লুটে নিয়ে যেতে। মা হেসে বল্লেন – “যেরকম শুনছি তাতে ওরা ভূত হতে পারে, কিন্তু ডাকাত কিছুতেই নয়।”

[৩]

 ফলে ঝোট্টন ও লোট্টন আমাদের আস্তাবলেই থেকে গেল। মা ওদের দুবেলা খাবার বন্দোবস্ত করে দিলেন ও দুদিন পরে ডাক্তার বাবুকে ডেকে পাঠালেন। তিনি বল্লেন এদের চিকিৎসা করতে অনেকদিন লাগবে, তাই হাঁসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়াই ভাল। চিনিবাস পরদিনই তাদের দুজনের হাত ধরে হাঁসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু হাঁসপাতাল তখন ভর্ত্তি, তাই সেখানে তাদের স্থান হল না। হাঁসপাতালের ডাক্তার বাবু চিনিবাসকে বল্লেন—রোজ সকালে একবার করে এদের নিয়ে এস, নিত্য পরীক্ষা করে ওষুধ দেব। ঝোট্টন রোজ যেতে রাজি হল, কিন্তু লোট্টন বল্লে সে রোজ অতদূর হাঁটতে পারবে না। চিনিবাস তখন প্রস্তাব করলে যে, সে লোট্টনকে পিঠে করে রোজ হাঁসপাতালে নিয়ে যাবে ও ফিরিয়ে আনবে। আর বাস্তবিকই দিন পোনেরো ধরে সে তাই করলে। লোট্টন দু’পা দিয়ে চিনিবাসের কোমর জড়িয়ে ধরত, আর দু’হাত দিয়ে তার গলা। চিনিবাসের এই কার্য্য দেখে আমরা সকলেই অবাক হতুম! মা বলতেন—চিনিবাস মানুষ নয়, দেবতা।

 এত করেও কিছু হল না। লোট্টন একদিন রাত্রে শুয়ে সকালে আর উঠল না। চিনিবাসই তার সৎকারের সব ব্যবস্থা করলে। লোট্টনকে মাদুরে জড়িয়ে একটা বাঁশে ঝুলিয়ে, সে পোড়াতে নিয়ে গেল; একা নয়, আর জন তিনেক জাতভাই জুটিয়ে। মা তার খরচ দিলেন এবং চিনিবাসকে ভাল করে বক্‌শিস্ দেবেন স্থির করলেন। কিন্তু এ বিষয়েও উপেনদা তাঁর আপত্তি জানালেন। তাঁর কথা এই যে, লোট্টনের সব খাবার চিনিবাস খেত, আর লোট্টন না খেতে পেয়ে মরে গিয়েছে। মা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি চিনিবাসকে লোট্টনের খাবার খেতে দেখেছ?” তিনি বল্লেন, “না, ঝোট্টনের মুখে শুনেছি।” মা আর কিছু বল্লেন না।

[৪]

 তারপর সন্ধ্যেবেলায় চিনিবাস লোট্টনের মুখাগ্নি করে ফিরে এল; এসে ঝোট্টনের সঙ্গে মহা ঝগড়া বাধিয়ে দিলে। চিনিবাসের চীৎকার শুনে আমি আর উপেনদা আস্তাবলে গেলুম। গিয়ে দেখি চিনিবাস এক একবার তেড়ে তেড়ে ঝোট্টনকে মারতে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। তার চেহারা ও রকম-সকম দেখে মনে হল, চিনিবাস শ্মশান থেকে ফেরবার পথে তাড়ি খেয়ে এসেছে। শেষটা বুঝলুম যে ব্যাপার তা নয়। লোট্টনের ত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে হবে, তাই নিয়ে হচ্ছে ঝগড়া। ঝোট্টন বলছে যে, সে যখন লোট্রনের ভাই, তখন সে-ই ওয়ারিশ। আর চিনিবাস বলছে যে, লোট্রন মরবার আগে তাকে বলে গিয়েছিল যে,—আমার যা কিছু আছে তা তোমাকে দিয়ে গেলুম।

 লোট্টনের থাকবার ভিতর ছিল একখানি কম্বল আর একটি লোটা। ঝোট্টন কম্বল দিতে রাজি ছিল, কিন্তু লোটাটি কিছুতেই দেবে না বল্লে। কম্বলটি বেজায় ছেঁড়াখোঁড়া, তবে লোটাটা ছিল ভাল। আমি ব্যাপার দেখে হতভম্ব হয়ে গেলুম। তবে এ মামলার বিচারটা একদিনের জন্য মুলতবি রাখলুম।

[৫]

 তার পরদিন সকালে চিনিবাস এসে বল্লে যে, কাল রাত্তিরে ঝোট্টন লোটাটা নিয়ে ভেগেছে, আর ফেলে গিয়েছে সেই ছেঁড়া কম্বলখানা। চিনিবাস রাগের মাথায় আরও বল্লে “ও শালা চোর হ্যায়, উস্‌কো রাস্তামে পকড়কে মারকে ও-লোটা হাম লে লেগা।” এ কথায় উপেনদাও রেগে তাঁর হিন্দীতে জবাব দিলেন—“তুমি চোরের উপর বাটপাড়ি করতে গিয়াথা, না পেরে এখন ঝোট্টনকে খুন করতে চাতা হ্যয়। ঐ লোটার লিয়ে তুমি লোটনকো পিঠে করে হাঁসপাতাল যাতা আতা থা। আর তার মরবার পর ও লোট্টনের জাতবিচার নেই করকে তার মড়া কাঁধে করেছ। তোমি মানুষ নেহি হ্যয়—পশু হ্যয়।” চিনিবাস জিজ্ঞেস করলে—“মুদা কোন জাত হ্যয় বাবুজি?”

 এর পর চিনিবাস ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল—উপেনদার কটু কথা শুনে নয়, হারাধন লোটার দুঃখে। ইতিমধ্যে মা এসে জিজ্ঞেস করলেন—এত দুঃখ কিসের? চিনিবাস বল্লে—“হমারা জরুকো বোল্‌কে আয়া যো একঠো আচ্ছা লোটা লা দেগা। বেগর লোটা ঘর যানেসে উস্‌কা সাথ লড়াই হোগা। ও ভি হামকো মারেগা, হাম ভি উস্‌কো মারেগা। ওঠো ছোটা জাতকে ওউরৎ হ্যয়, উস্‌কো মারনেসে ও ভাগে গা। তব্‌ হামারা ভাত কোন পাকায় গা? হাম ভুক্‌সে মরেগা।”

 এ বিপদের কথা শুনে মা বল্লেন—“আমি তোমাকে একটা নতুন ঘটি কিনে দেব।” এ আশা পেয়ে চিনিবাস শান্ত হল।

সমস্যা

 এ অকিঞ্চিৎকর ঘটনার গল্প আপনাদের কাছে বলবার উদ্দেশ্য এই যে,—মা বলেছিলেন চিনিবাস মানুষ নয়, দেবতা। আর উপেনদা বলেছিলেন সে মানুষ নয়, পশু। আমি বহুকাল বুঝতে পারিনি, এঁদের কার কথা সত্য। এখন আমার মনে হয় যে, চিনিবাস দেবতাও নয়, পশুও নয়—শুধু মানুষ। যে অর্থে ঝোট্টন লোট্টনও মানুষ, তুমি আমিও মানুষ।

 —আপনারা কি বলেন?