বিষয়বস্তুতে চলুন

অণুকথা সপ্তক/প্রগতি রহস্য

উইকিসংকলন থেকে

প্রগতি রহস্য

(১)

 আজ যা পাঁচজনকে শোনাতে বসেছি, তা একটা উড়ো গল্প নয়; আমাদের বর্তমান প্রগতির আংশিক ইতিহাস, অথবা দুটী ভদ্রলোকের আংশিক জীবনচরিত। এ দুই ব্যক্তির কেউ অবশ্য চিরস্মরণীয় নন। আমার স্মৃতিপটে এঁদের যে রূপ অঙ্কিত আছে, সেই ছবি ঈষৎ enlarge ক’রে আপনাদের সুমুখে খাড়া করতে চাই; যদিচ তাঁরা কেউ সুদৃশ্য ছিলেন না।

 আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন, এ কথা স্মরণ করিয়ে দেবার স্বার্থকতা কি?—আমার উত্তর হচ্ছে, আমাদের ভিতর ক’জন চিরস্মরণীয় হবেন?—দু’এক জনের বেশী নয়। তাই বলে আমরা যারা আছি, আমাদের মতামতের ও বিদ্যাবুদ্ধির কি কোন মূল্য নেই? আমাদের মত সাধারণ লোকের সঙ্গে অসাধারণ লোকের প্রধান তফাৎ এই যে, আমরা আছি, আর তাঁরা ছিলেন। যখন তাঁরা ছিলেন, তখন তাঁরা আমাদেরই মত, কাউকে হাসিয়েছেন, কাউকে কাঁদিয়েছেন, কাউকে ঘুঁসো দেখিয়েছেন, কারও কাছে জোড়হাত করেছেন। অর্থাৎ আমরা আজ যা করি, বছর পঞ্চাশ আগে তাঁরাও তাই করেছেন। আমরা কেউ কেউ সেকালের কথা শুনতে যে ভালবাসি তার কারণ, একাল সেকালেরই পুনরুক্তি মাত্র। আমাদের প্রতি ব্যক্তির যেমন একটু আধটু বিশেষত্ব আছে, তাঁদেরও তেমনি ছিল। সেই বিশেষত্বই আমার মনে আছে, আর সেই কথা আপনাদের নিবেদন করতে চাই। কি সূত্রে এঁদের কথা আজ মনে পড়ে গেল, তা বলছি।

(২)

 প্রগতি যে আমাদের হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। প্রগতির মানে কি?—কোনও বড় জিনিষের কোনও ছোট অর্থ নেই, যা দু’কথায় বোঝানো যায়; আর অনেক কথায় তার ব্যাখ্যা করতে গেলে, লোকে সে কথায় কর্ণপাত করবে না। প্রগতির প্রমাণ এই যে, আমি যদি বলি প্রগতি হয় নি, তবে লোকে বলবে—তুমি অন্ধ, আর না হয়ত তুমি সেকেলে কুপমণ্ডুক। দেখতে পাচ্ছ না যে, আমাদের কাব্যে ও চিত্রে, নৃত্যে ও গীতে কি পর্যন্ত প্রগতি হয়েছে ও হচ্ছে? তুমি প্রমথ চৌধুরী দেখ্‌ছ যে, আমরা আজও পরাধীন ও পরবশ;—কিন্তু ভুলে যাচ্ছ যে, আমাদের পরাধীনতাই আমাদের সকল প্রগতির মূল, আর তুমিও ঐ প্রগতির জোয়ারে খড়কুটোর মত ভেসে চলেছ।

 আমি বলি—তথাস্তু। এখন জিজ্ঞাসা করি, দেশে প্রগতি আনলে কে?—যদি বল ইংরেজ, তাহ’লে কথাটা ঠিক হবে না। ইংরেজ ত আমাদের প্রগতির পথ বন্ধ ক’রে দিয়েছে India Act-এর বেড়া তুলে! এর পর আমাদের প্রগতির উল্টোরথ টানতে হবে।  তবে কি রামমোহন রায় এই প্রগতির রথ নূতন পথে চালিয়েছেন?—অবশ্য এ পথ রামমোহন প্রথম আবিষ্কার করেন। তার পর বহু লোক এই রথের দড়ি টেনেছেন। এই শ্রেণীর দু’টি লোকের কথা তোমাদের শোনাব; তার মধ্যে একজন ছিলেন প্রগতির নীরব কর্মী আর একজন নীরব ভাবুক।

(৩)

 আমি ছেলেবেলায় একটা মফঃস্বলের সহরে বাস করতুম, লেখাপড়া করবার জন্য। সেকালে উক্ত সহরে দু’জন গণ্যমান্য মুখুয্যে মহাশয় ছিলেন। একজনের ছিল অগাধ টাকা, আর একজনের ছিল অগাধ বিদ্যে—দুইই স্বোপার্জ্জিত; কেননা, উভয়েই ছিলেন দরিদ্র সন্তান, কিন্তু উভয়েই self-help-এর মন্ত্র সাধন করে একজন হয়েছিলেন ধনী, অপরটি বিদ্বান্ ৷

 কেনারাম মুখুয্যে কোন জমিদারের মেয়ে বিয়ে করে, তাঁর শ্বশুরকুলের দত্ত মাসহারার টাকা বাঁচিয়ে, সে উদ্বৃত্ত টাকা সুদে খাটাতেন। আমি এ কথা জানতুম এই সূত্রে যে, আমাদের মত লোকের অর্থাৎ যাদের আয়ের চাইতে ব্যয় বেশী, তাদের দরকার হলেই তিনি তিন চার হাজার টাকা অপব্যয় করবার জন্য ধার দিতেন, শতকরা বারো টাকা সুদে।

 সে সহরে আর একটি ভদ্রলোক ছিলেন, যিনি জাতে সুবর্ণ-বণিক ও ধর্ম্মে খৃষ্টান। তাঁর স্ত্রী তাঁর ঘর আলো করে থাক্‌ত, আর তার নাম ছিল—My dear। তাঁর কোন ostensible means of livelihood ছিল না, অথচ টাকার কোনও অভাব ছিল না। ছোট ছেলের কৌতূহলের অন্ত নেই—তাই আমি My dear-এর স্বামীকে একদিন জিজ্ঞাসা করি যে, শ্রীযুক্ত কেনারাম মুখুয্যে এত টাকা করলেন কি ক’রে?—তিনি বললেন যে, টাকা করা একটা আলাহিদা বিদ্যে। সে বিদ্যে যে জানে, সে বিনে পয়সায় দেদার পয়সা করতে পারে। পরে শুনেছি, তিনি আগে গভর্ণমেণ্টের চাকরী করতেন, কিন্তু অফিসে self-help-এর বিদ্যের এতটা বেপরোয়াভাবে চর্চ্চা করেছিলেন যে, সরকার তাঁকে কর্ম্মচ্যুত করতে বাধ্য হন; জেলে দেননি পাদরি সাহেবের খাতিরে। তিনি ছিলেন প্রগতির একটি উপসর্গ। কি হিসেবে, তা পরে বলব।

(৪)

 কেনারাম বাবু বোধহয় কখনো ইস্কুলকলেজে পড়েন নি। তিনি ইংরেজি জানতেন কি না, বলতে পারি নে। যদিও জানতেন ত সে নামমাত্র। এ ধারণা আমার কোত্থেকে হ’ল, তা বলছি।

 মুখুয্যে-গৃহিণীর একটি ছোটখাটো operation হবার কথা ছিল। ছুরি চালাবেন একটি লালমুখো গোরা ডাক্তার। Operationএর ফলাফল জানতে আমরা তাঁর বাড়ী উপস্থিত হয়ে দেখি, মুখুয্যে মহাশয় বারান্দায় পাগলের মত ছুটোছুটি করছেন ও বলছেন ‘হরিবোল’, ‘হরিবোল'। আমরা এ কথা শুনে বুঝলুম যে, মুখুয্যে-গিন্নির কর্ম্ম সাবাড় হয়েছে।

 তারপরে তার একটি আশ্রিত আত্মীয় বললেন যে, operation খুব ভালয় ভালয় হয়ে গিয়েছে। আমরা সেই কথা শুনে জিজ্ঞেস করলুম যে, মুখুয্যে মহাশয় তবে “হরিবোল” “হরিবোল” এই মারাত্মক ধ্বনি করছেন কেন?—তিনি হেসে বললেন, উনি ইংরেজী বলছেন। কাটাকুটি ব্যাপারটা যে ‘horrible’—তাই বলতে চেষ্টা করছেন!

 এর থেকেই তাঁর ইংরেজি বিদ্যের বহর বুঝতে পারবেন। তিনি যে আমাদের নব প্রগতিকে মনে মনে গ্রাহ্য করেছিলেন, সে ইংরেজি পড়ে নয়, লোকচরিত্র দেখেশুনে। তাঁর মতামত এখন উল্লেখ করছি।

 আমার যখন বয়স বছর বারো, তখন কেনারাম বাবু আমাকে একদিন বলেন যে, আমাদের এ দেশে উন্নতি কোন জিনিষে এনেছে জানো?—আমি বললুম “না”।

 তিনি বললেন Brandy। Brandy না খেলে মুরগী-খাওয়া যায় না, আর মুরগীর পিঠপিঠ আসে আর সব প্রগতি। Brandy পান করলে নেশা হয়, অর্থাৎ কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত হয়। তখন মুরগী নির্ভয়ে খাওয়া যায়। আর সেই সঙ্গে হিন্দু মুসলমানের জাতিভেদ থাকে না। মুরগী খেতে হলেই মুসলমানের হাতে খেতে হয়। তারপরেই স্ত্রী-শিক্ষার প্রয়োজন হয়। কেন না, অশিক্ষিত স্ত্রীলোকেরা ওরূপ পান-ভোজনে মহা আপত্তি করে; শিক্ষিত হ’লে করে না। আর স্ত্রী-শিক্ষার পিঠপিঠ আসে স্ত্রী-স্বাধীনতা। তারা লেখাপড়া শিখবে অথচ অন্দরমহলে আটক থাকবে,—এ হতেই পারে না। এর থেকেই দেখতে পাচ্ছ প্রগতির মূল হচ্ছে Brandy, ইংরেজী শিক্ষা নয়। ইংরেজী শেখা শক্ত, কিন্তু Brandy গেলা খুব সহজ। এ বিষয়ে অশিক্ষিত-পটুত্ব কি লোকের দেখনি?—এই কারণে আমি Brandy-খোরদের উৎসাহ দিই। ঐ নেশার পথই হচ্ছে যথার্থ প্রগতির পথ। যদিও আমি নিজে মদও খাইনে, মাংসও খাইনে।

 খৃষ্টান ভদ্রলোকটি এঁর সাহায্য করতেন, কারণ তাঁর ওখানে গেলেই তিনি চায়ের সঙ্গে মুরগীর ডিম অর্থাৎ প্রগতির-ডিম সকলকেই খাওয়াতেন!

(৫)

 পূর্ব্বে বলেছি মুখুয্যে মহাশয়দ্বয়ের ছবি আঁকবার যোগ্য নয়। এঁদের কেউই রূপে শ্রীকৃষ্ণ বা মহাদেব ছিলেন না। দুজনেই রঙ ও রূপে ছিলেন আমাদের মতই সাধারণ বাঙ্গালী। শুধু বাঞ্ছারাম বাবুর কোনও অঙ্গ ছিল অসাধারণ সঙ্কুচিত, কোন অঙ্গ আবার তেমনি প্রসারিত। তাঁর চোখ দুটি ছিল অযথা সঙ্কুচিত আর নাসিকা বেজায় প্রসারিত। আর তাঁর চুল ছিল উর্দ্ধমুখী। সে চূলের ভিতর চিরুণিব্রুসের প্রবেশ নিষেধ, আর গুম্ফ ঐ একই উপাদানে গঠিত। আর তাঁর উদরের আয়তন ছিল অসাধারণ প্রবৃদ্ধ। লোকে বলত তাঁর পেটের ভিতর একখানা গোটা Webster's Dictionary বাসা বেঁধেছে। এ রসিকতার অর্থ—তিনি নাকি A থেকে Z পর্য্যন্ত সমস্ত ইংরেজী শব্দ উদরস্থ করেছেন। এক কথায়, তাঁর চেহারা ছিল ঈষৎ ভীতিপ্রদ।

 কিন্তু আমরা ছেলের দল তাঁকে ভয় করতুম না, করতেন আমাদের মাষ্টার মহাশয়রা। কেননা, তিনি ছিলেন সেকালের একজন জবরদস্ত School Inspector। তিনি পরীক্ষা করতেন আমাদের, কিন্তু আমাদের ভুলভ্রান্তির জন্য শাস্তি দিতেন মাষ্টার মহাশয়দের। কাউকে করতেন বরখাস্ত, কাউকে করতেন জরিমানা। কারণ তাঁর কথা ছিল—ছেলেরা যদি ভুল ইংরেজী লেখে ত’ জাতির প্রগতি হবে কোত্থেকে?—প্রগতি অর্থে তিনি বুঝতেন,—ইংরেজী ভাষার ষত্ব-ণত্বের জ্ঞান। তাঁর তুল্য ইংরেজী যে ইংরেজরাও জানে না, এই ছিল লোকমত।

(৬)

 তাঁর ইংরেজী জ্ঞানের একটা নমুনা দিই। আমাদের সহরের গভর্ণমেণ্টের একটি বৃত্তিভোগী স্কুলের second কেলাসের ছাত্রদের তিনি মুখে মুখে পরীক্ষা করছিলেন। সে সময়ে পড়ানো হচ্ছিল Psalm of Life নামক একটী কবিতা। ছেলেদের মুখে psalm pasalamaয় রূপান্তরিত হয়েছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করেন—এ উচ্চারণ তোমাদের কে শিখিয়েছে? ছেলেরা উত্তর করলে—মাষ্টার মহাশয়! বহু ব্যঞ্জনবর্ণ পাশাপাশি থাকলে, উহ্য স্ববর্ণগুলি উচ্চারণের সময় জুড়ে দিতে হবে। সেইজন্য আমরা তিনটী অলিখিত a. ঠিক ঠিক জায়গায় বসিয়েছি। বাঞ্ছারাম বাবু বলেন,—তিনটী vowel না জুড়ে দুটী ব্যঞ্জনবর্ণ ছেঁটে দিতে পারতে, তাহলেই ত উচ্চারণ ঠিক হ’ত। এটী মনে রেখো যে, ইংরেজরা লেখে এক, বলে আলাদা, এবং করেও আলাদা। এই হচ্ছে তাদের অভ্যুদয়ের কারণ।

 এর পর second masterকে তিনি থার্ড মাষ্টার করে দিলেন। লোকে বলে, সেকেণ্ড মাষ্টার ব্রাহ্ম ব’লে তাঁর এই শাস্তি হ’ল। মাষ্টার মহাশয় যে ঘোর ব্রাহ্ম ছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই,—কেননা, তিনি তাঁর মেয়ের বিয়েতে শালগ্রামের বদলে একটী তামাকের ডেলা সাক্ষী রেখে বিবাহকার্য সম্পন্ন করেছিলেন। অপরপক্ষে বাঞ্ছারাম বাবু ছিলেন একাধারে ঘোর নাস্তিক এবং হিন্দু! ব্রাহ্মদের তিনি দুচক্ষে দেখতে পারতেন না; কেননা তাঁরা হিন্দুয়ানীর বিরোধী ও ভগবানে বিশ্বাস করেন। ব্রাহ্মধর্ম্ম হচ্ছে—ইংরেজী না জানার ফল। তাঁর মতে এ ধর্ম্ম হচ্ছে বৈষ্ণব ধর্ম্মের মাস্‌তুতো ভাই।

(৭)

 যাঁরা মনে করেন যে, ইংরেজী না জানলে লোকে সভ্য হয় না, তাঁদের বলি যে, একথা যদি সত্য হয়, তাহ’লে বাঞ্ছারাম বাবু ছিলেন আমাদের প্রগতির একটি অগ্রদূত।

 তিনি মরবার সময়ও ইংরেজী বলতে বলতে মরেছেন। ইংরেজী শিক্ষার ফলে তিনি বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হন। ডাক্তাররা বললে যে, রোগের একমাত্র ঔষধ ব্রাণ্ডি, ও পথ্য মুরগীর মাংস। নিরামিষাশী বাঞ্ছারাম বাবু এ ওষুধপথ্য সেবনে কিছুতেই রাজী হলেন না। তিনি বললেন To be, or not to be, that is the question। সেক্সপিয়ারের এ-প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন। তার কথা হচ্ছে—We are such stuff as dreams are made on, and our little life is rounded with a sleep.

 তারপর তাঁর যখন আসন্নকাল উপস্থিত হ’ল, তখন তাঁর ইংরেজীনবীশ উকীল ডাক্তার বন্ধুরা সব বাড়ীতে উপস্থিত হন। বড় ডাক্তার বাবু এসে দেখলেন, সকলের চোখ দিয়ে জল পড়ছে। তিনি রোগীর নাড়ী টীপে বললেন— My eyeballs burn and throb, but have no tears-এ কথা শুনে মুমূর্ষু রোগী বললেন—Long live Byron। এর পরেই তিনি চিরনিদ্রায় মগ্ন হলেন।—এখন আমরা যখন প্রগতির উল্টো রথ টানতে বাধ্য হব, তখন পূর্ব্ব-প্রগতির কোন্ ধারা বজায় থাকবে? কেনারাম বাবুর অনুমত পানভোজন?—না বাঞ্ছারাম বাবুর অভিমত ইংরেজী ভাষা? যে ভাষার লেখার সঙ্গে বলা মেলে না, আর বলার সঙ্গে করা মেলে না।