অন্ধকারের বন্ধু/দশম পরিচ্ছেদ
দশম পরিচ্ছেদ
হেমন্তের কথা
সতীশবাবু, আমি সংক্ষেপেই সব বলব। যবনিকা পতনের সময় বেশী বাক্যব্যয় ভালো নয়।
বিনোদের উপরে আমার একবারও সন্দেহ হয় নি—সে মাতাল ও জুয়াড়ি জেনেও। প্রথমত, মদ খাওয়া, জুয়াখেলা আর খুন করা এককথা নয়। দ্বিতীয়ত, এটা ভালো ক’রেই জানা গিয়েছে যে, খুনের সময় সে বাড়ীতে ছিল না। সে যে সত্যসত্যই রাত বারোটা পর্য্যন্ত থিয়েটারে ছিল এবং তারপরে রাত প্রায় দেড়টা পর্য্যন্ত ছিল হোটেলে, এর প্রমাণ আমি নিজে গিয়েই সংগ্রহ করেছি। হোটেল থেকে সে ফিরে এসেছিল প্রচণ্ড মাতাল হয়ে। সে এমন বেহুস হয়েছিল যে, খেতে গিয়ে জামা-কাপড়ে ঢেলেছিল মাংসের ঝোল আর জামা-কাপড়ের নানা জায়গা পুড়িয়ে ফেলেছিল সিগারেটের আগুনে। এমন চৈতন্যহীন মত্ত অবস্থায় কেউ এ-ভাবে এত চালাকি খেলিয়ে চুপিচুপি খুন করতে পারে না। সতীশবাবু, কেবল এই একটিমাত্র কারণে বিনোদের উপরে সন্দেহ করা আপনাদের উচিত হয়নি। বেহুঁস মাতাল যে খুন করতে পারে না, এ-কথা আমি বলছি না। আমার মনে হচ্ছে, খুব বেশী মাতাল এত গোপনে খুন ক'রে স'রে পড়তে পারে না।
তবু যে সে পালিয়ে গেছে, তার একমাত্র কারণ হচ্ছে, পুলিস তাকে গ্রেপ্তার করতে চায়, কোনগতিকে এটা সে জানতে পেরেছিল, এবং পালাবার আগে সে যে কারেন্সি থেকে রাহাখরচের জন্যে নিজের কিছু টাকা ভাঙিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, এটা আমরা অনায়াসেই অনুমান করতে পারি।
আপনারা সন্দেহ করেছিলেন, হত্যাকারী হ'চ্ছে বাড়ীর লোক। কারণ বাড়ীর সব দরজা ছিল ভিতর থেকে বন্ধ। এবং কুকুরটা চেনা লোক দেখেই চ্যাঁচায় নি। কিন্তু কাদামাখা পদচিহ্ন ও অচেনা রবারের জুতোর অস্তিত্ব দেখেই আমি বুঝেছিলুম, খুনীরা এসেছে বৃষ্টির পরে, রাস্তা থেকেই। আমি মনে মনে খুনের রাতের ঘটনাগুলো সাজিয়েছিলুম এই ভাবে। (অবশ্য এটা জানবেন যে সমস্ত প্লটটা একদিনে একসঙ্গে হঠাৎ আমার মনের ভিতরে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে নি। কোন ঘটনা-সূত্র পেয়েছি আগে, আবার গোড়ার দিককার কোন সূত্র পেয়েছি শেষের দিকেই।)
ধরুন, রাম আর শ্যাম মতিবাবুকে খুন করবে। রাত সাড়ে-দশটার সময় মতিবাবুর বাড়ীতে ঢোকবার দরজা বন্ধ হয়, খুনীরা সে খবর রাখে। রাত ন'টার সময় বৃষ্টি থামল। রাম ও শ্যাম ঘটনাস্থলে প্রবেশ করলে। রামের সঙ্গে মতিবাবুর চেনাশোনা ছিল। মতিবাবু তখনো শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করেন নি, পরিচিত লোক ব'লে রাম বিনা আহ্বানেই ভিতরে গিয়ে ঢোকে। কুকুরটাও রামকে বিলক্ষণ চিনত, তাই গোলমাল করেনি। আর রামের সঙ্গে গিয়েছিল ব'লে শ্যামকে দেখেও চ্যাঁচায় নি। শ্যাম নিশ্চয় দরজার বাইরে এক-আধ মিনিট অপেক্ষা করেছিল, কারণ তার জুতোর স্পষ্ট ছাপ আমরা পেয়েছি। চলন্ত লোকের পায়ের ছাপ আর দণ্ডায়মান লোকের পায়ের ছাপ একরকম হয় না, এটা সকলেই জানে। পরে রামের আহ্বানে শ্যামও তাকে সাহায্য করবার জন্যে ঘরের ভিতরে যায়। কাজ শেষ ক'রে দুজনেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। রাত সাড়ে দশটার সময়ে দ্বারবান রাস্তার দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ক'রে দেয়। কাজেই বাইরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ থাকা খুবই স্বাভাবিক।
রাম হচ্ছে মতিবাবুর বন্ধু, সে তাঁর সব অভ্যাসের কথা জানে। ডায়ারির ভিতরে মতিবাবুর কোন কোন গুপ্তকথা আছে এটাও হয়তো তার অজানা ছিল না। খুনের রাতে হয়তো কোন কারণে ভয় পেয়ে বা সময় অভাবে সে ডায়ারি পড়বার সুযোগ পায়নি। কিন্তু পরে যথাসময়ে কাজে লাগাতে পারবে বুঝে ডায়ারি আর চাবির গোছা নিয়ে পালায়। সে এ বাড়ীর বন্ধু, খুনের পরেও এখানে তার প্রবেশ বন্ধ হবার ভয় নেই। খুব সম্ভব, রাম হ্যাণ্ডনোটে মতিবাবুর কাছ থেকে বারে বারে টাকা ধার করেছিল, তাই যাবার সময়ে নির্ব্বিচারে সব হ্যাণ্ডনোটও সঙ্গে নিয়ে পালায়।
ঘটনাস্থলে এসে মতিবাবুর মৃতদেহ দেখে আমি অবাক্ হ'য়ে যাই। লাসের গলায় ঐ নীলদাগটা কিসের? আঙুলের চাপে ঠিক ও-রকম কালশিরা পড়ে না। তারপর লাসের পিঠের তলায় ঐ ভাঙা কাঁচের টুক্রো থাকার মানে কি? ধ্বস্তাধ্বস্তি হ'ল বিছানায়, কুঁজোর মুখ থেকে গেলাস কেন এখানে এল, কেনই বা ভাঙল, কেনই বা একজন খুনীর হাত কাট্ল?
আমার মন বললে, একজন খুনী গেলাসে কোন বিষাক্ত পদার্থ ঢেলে মতিবাবুর কাছে আসে। আর একজন তাঁকে চেপে ধরে। মতিনাবুকে খেলাসের বিষ খাওয়ানোর চেষ্টা হয়তিনি ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে করতে বিছানা থেকে নেমে পড়েন এবং সেই মুহূর্ত্তেই গেলাসের বিষ তাঁর গলায় ঢেলে দেওয়া হয়। সে বিষ এমন ভয়ানক যে মতিবাবু চ্যাঁচাবারও সময় পাননি—কিন্তু তাঁর ধ্বস্তাধ্বস্তির চোটে খুনীর হাতের গেলাস ভেঙে ও খুনীর হাত কেটে যায়। তারপর ভাঙা কাঁচের উপরে গিয়ে পড়ে মতিবাবুর দেহ। সব ব্যাপার ঘটে দু-এক সেকেণ্ডের মধ্যে।
বিষ যদি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে নিশ্চয়ই মতিবাবুকে গলা টিপে মারা হয় নি। কিন্তু ডাক্তাররা শবদেহে বিষের কোন অস্তিত্ব পাননি। তবু আমার সন্দেহ গেল না। কারণ ঐ ভাঙা গেলাস! ওটা না থাকলে আমি ডাক্তারদের কথাই বিশ্বাস করতুম। কিন্তু গেলাস যখন পাওয়া গেছে, মতিবাবুকে নিশ্চয়ই কিছু খাওয়ানো হয়েছে। সেটা কি হ'তে পারে? হয়তো এমন কোন নতুন বিষ, ডাক্তাররা যার নাম জানেন না।
আপনারা কেউ লক্ষ্য করেননি, কিন্তু দত্তকে প্রথম দিন দেখেই আমি লক্ষ্য করেছিলুম, তার ডানহাতের একটা আঙুলের ওপরে ‘ফ্লেস-কলারে’র ‘প্ল্যাষ্টার’ লাগানো আছে। গোয়েন্দার প্রথম কর্ত্তব্য,সকলকে সন্দেহ করা। খুনীর হাত বা আঙুল কেটেছে তার প্রমাণ রয়েছে, দত্তেরও আঙুল কাটা। দত্ত হচ্ছে মতিবাবুর বন্ধু। তার এ-বাড়ীতে অবাধ গতি। এবং সে হচ্ছে রাসায়নিক, তার পক্ষে কোন অজানা বিষের অস্তিত্ব জানা অসম্ভব নয়। এ সন্দেহগুলোও আমার মাথায় ঢুকেছিল। কিন্তু সন্দেহ মাত্র।
ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত ঐ দস্তানার রহস্য নিয়েও অনেক ভেবেছিলুম। কারণ ও-রকম পুরু পশমী দস্তানা কেউ হাতে পরে না, বিশেষ বাংলাদেশে। তবে প্রথমে কোনই সদুত্তর পাইনি।
পরে বুঝেছি ঐ দস্তানাটা ছিল হরিহরের—অর্থাৎ দত্তের সঙ্গীর হাতেই। সেইই দস্তানা-পরা হাতে কাঁচের গেলাসটা ধরেছিল আর কাঁচের গেলাসটা তাকে দিয়েছিল দত্তই। সেই সময়েই গেলাসের গায়ে দত্তের আঙলের ছাপ পড়ে। কিংবা গেলাসটা ভাঙবার পর দত্ত তার উপরে হাত দিয়েছিল।
কিন্তু রক্তমাখা দস্তানাটা কেন আমি নিয়ে যেতে চাই, সেটা জানবার জন্যে দত্ত আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তারপর সে চ'লে যায় ও পথে আমরা আক্রান্ত হই। পাহারাওয়ালার কাছ থেকেও ভাঙা গেলাসটা কেড়ে নেবার চেষ্টা হয়। আমার কাছে দস্তানা আর পাহারাওয়ালার কাছে ভাঙা গেলাস আছে, এ-কথা বাইরের লোকের মধ্যে কেবল দত্তই জানত। সেজন্যেও তাকে আমি সন্দেহ করি। কিন্তু কেবল সন্দেহ ক'রে তো লাভ নেই, আগে দরকার প্রমাণ।
সতীশবাবু, আমি যে দু-একটি বিষয় প্রথমে আপনার কাছে লুকিয়েছিলুম, পরে আজই সকালে আপনার কাছে প্রকাশ করেছি। ঘটনাস্থলের কর্দ্দম চূর্ণ পরীক্ষা করবার পর তার মধ্যে আমি কাদার সঙ্গে পেয়েছিলুম চূণ, সুরকি, বালি ও কয়লার গুঁড়ো। যেদিন আমরা দত্তের বাড়ীতে চা খেতে যাই, সেদিন দেখলুম, সরু গলির মধ্যে তৈরি হচ্ছে একখানা নতুন বাড়ী। লক্ষ্য করলুম, তার পাশেই রয়েছে একটা কয়লার দোকান। গলির সেখানটায় মাটির সঙ্গে চূণ, বালি, সুরকি ও কয়লার গুঁড়ো ছড়ানো। তার দু-তিনখানা বাড়ীর পরেই দত্তের বাড়ী। সুতরাং এখানকার মাটি মাড়িয়ে তাকে রোজই আনাগোনা করতে হয়। বৃষ্টিতে পথে কাদা হ'লে এখানকার কাদার চাপ যে তার জুতোর গোড়ালি আর সোলের ফাঁকে লেগে থাকবে, এটা বেশ সহজেই বোঝা যায়। ঐ নতুন বাড়ী ও কয়লার দোকানই দত্তের প্রতি বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট করে।
দত্তের বাড়ী থেকে ফেরবার পথে আমি সকলের অগোচরে সেই নতুন বাড়ীর সামনের পথ থেকে এক মুঠো ধূলো তুলে নিয়ে গিয়েছিলুম। পরে পরীক্ষা ক'রে দেখেছিলুম, আগেকার কর্দ্দম-চূর্ণ আর এই একমুঠো ধূলোর উপাদানে কোন প্রভেদই নেই। মতিবাবুকে যে খুন করেছে, ঐ নতুন বাড়ীর সামনেকার মাটি মাড়িয়েই তাকে যেতে হয়েছে।
তারপর দত্তের রসায়নাগার দেখে আমার সন্দেহ আরো বেড়ে উঠল। সেখানে আবিষ্কার করলুম, দ্রবীভূত বাতাস। আমিও রসায়ন-শাস্ত্র পড়েছি, রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু সেদিন দত্তের সামনে ন্যাকা সেজেছিলুম, তাঁর কাছ থেকে কথা আদায় করবার জন্যে।
ধাঁ ক'রে আমার মাথায় একটা ভীষণ সত্যের ইঙ্গিত জাগল। দ্রবীভূত বাতাসকেই দত্ত বিষের মত ব্যবহার করেছে। সতীশবাবু, আপনি হয়তো জানেন না, এই দ্রবীভূত বাতাসকে রাসায়নিকরা নানা নির্দ্দোষ কাজে লাগান বটে, কিন্তু এ-জিনিস মানুষের মুখের ভিতরে ঢেলে দিলে তখনি তার মৃত্যু হবে, অথচ মৃতদেহে তার কোন চিহ্নই পাওয়া যাবে না। কি মারাত্বক বুদ্ধি-চাতুরী। ভাগ্যে দ্রবীভূত বাতাস হচ্ছে অত্যন্ত দুর্ল্লভ জিনিষ—সাধারণ হত্যাকারীর নাগালের বাইরে। নইলে দ্রবীভূত বাতাস মানুষের সমাজে বিষম বিভীষিকা সৃষ্টি করতে পারত।
দ্রবীভূত বাতাস এমন ভয়ানক ঠাণ্ডা যে, পরীক্ষাগারে হাতে পুরু দস্তানা না পরলে কাঁচের পাত্রে তাকে নিয়ে ব্যবহার করা অসম্ভব! এই জন্যেই হত্যাকারী হাতে দস্তানা প'রে কাঁচের গেলাসে দ্রবীভূত বাতাস ঢেলে মতিবাবুকে তা পান করতে বাধ্য করেছিল।
তারপর হরিহরের অস্তিত্ব আবিষ্কার। সতীশবাবু আমাকে যে ছবি দিয়েছিলেন তাতে হরিহরের মুখে দাড়ী-গোঁফ নেই, কিন্তু দত্তের মুখে আছে গোঁফ আর ফ্রেঞ্চ-কাট্ দাড়ী। দত্তের বয়স এখন চল্লিশের ওপারে, তার মুখেরও কিছু-কিছু পরিবর্ত্তন হয়েছে বটে, কিন্তু হরিহরের মুখের সঙ্গে দত্তের মুখের কিছু-কিছু সাদৃশ্য আমি পেয়েছিলুম। আমি কিছু-কিছু ছবি আঁকতেও জানি। হরিহরের চোখ নাক ঠোঁট অনেকটা দত্তের মতই। তাই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে হরিহরের ছবির মুখে বসিয়ে দিলুম দত্তের মত গোঁফ আর ফ্রেঞ্চ-কাট্ দাড়ী! ফল হ'ল বিস্ময়কর! বুঝেছ রবীন, সতীশবাবু সেই ছবি দেখে সেখানাকে প্রথমে দত্তের ছবি ব'লেই ধ'রে নিয়েছিলেন! তারপর আমাদের জানতে বাকি রইল না, আমাদের দত্ত-মশাই— থুড়ি, মিঃ দত্ত —হচ্ছেন কোন্ দেশের বাজ-পাখী!
‘লিক্উইড্ এয়ার’ দিয়ে দত্ত তার পাপ কাজের সঙ্গীকেও পাঠিয়ে দিয়েছে যমের বাড়ী। কি ক'রে তাকে মারা হয়েছে এখনো তা প্রকাশ পায়নি বটে, তবে হত্যাকারী যে দত্ত তাতে আর সন্দেহ নেই! দ্রবীভূত বাতাসের এমন ভয়াবহ ব্যবহার পৃথিবীর আর কোন অপরাধীই বোধহয় জানে না। দত্ত তাকে মেরেছে কেন? একজন সাক্ষী বা অংশীদার বা পথের কাঁটা সরাবার জন্যেই।
দত্ত জানত, আমি রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে অল্প-বিস্তর নাড়াচাড়া করি। তার ভয় হয়েছিল এ-রকম অসাধারণ দস্তানা দেখে আমার মনে দ্রবীভূত বাতাস সম্বন্ধে কোন ইঙ্গিত জাগা হয়তো অসম্ভব নয়। অপরাধীর মন কিনা! তাই উপর-চালাকি করতে গিয়ে দস্তানা কেড়ে নিয়ে আমার হাতে সমর্পণ করতে বাধ্য হয় মতিবাবুর ডায়ারিখানা!
আর একটু বাকি আছে। দত্তকে হাতে-নাতে ধরবার জন্যে আজ আমি এখানে ফাঁদ পেতেছিলুম। খুনীর পকেট থেকে ডায়ারি হস্তগত ক’রেই আমি বুঝেছিলুম; খুনী যখন মতিবাবুর চাবি নিয়ে গেছে, তখন টেবিলের গুপ্তস্থান থেকে চল্লিশ হাজার টাকার হীরে-মুক্তো চুরি করার প্রথম সুযোগ সে কখনোই ছাড়বে না। দত্তের আবির্ভাবের আগেই আমি টেবিলের ডানদিকের টানার ফাঁকে এমন ভাবে একটা আল্পিন ঢুকিয়ে রেখেছিলুম যে, কেউ টানা খুললেই আল্পিনটা স'রে প'ড়ে যাবে!
তারপর দত্ত এল। পাহারাওয়ালাকে শেখানো ছিল, সে একটা বাজে কথা ব'লে আমাদের বাইরে ডেকে নিয়ে গেল। দত্ত রইল ঘরে একা। মিনিট-কয় পরে আমরা ফিরে এলুম। টেবিলের কাছে গিয়ে দেখি, টানার ফাঁকে আল্পিন নেই! তখনি বোঝা গেল, দত্ত সুযোগের অপব্যবহার করেনি!
এদিকে দত্ত যখন এখানে ব'সে আমার সঙ্গে কথা কইছে, সতীশবাবু তখন গিয়েছেন দত্তের রসায়নাগার ও বাড়ী খানাতল্লাস করতে। তারই ফলে আবিষ্কৃত হয়েছে দস্তানা-জোড়া! ঐ দস্তানাও এই মামলায় এক বড় সাক্ষীর কাজ করবে।
দত্ত, এখনো কি তুমি অপরাধ স্বীকার করবে না? দেখছ তো, তোমার প্রতি পদক্ষেপের হিসাব রয়েছে আমার কাছে! অতিরিক্ত চালাকের মতন তুমি খুনের জন্যে এমন একটা দিন নির্ব্বাচন করেছিলে, যেদিন হয়েছিল মতিবাবুর সঙ্গে বিনোদের ঝগড়া। তারপরে আমাদের ভিতরের খবর জানবার আর বিনোদের উপরে দোষ চাপাবার জন্যে তুমি সেজেছিলে পুলিসের সাহায্যকারী বন্ধু! তুমি হ'চ্ছ গভীর জলের মাছ! অসাধারণ মস্তিষ্কচালনা করেছিলে বটে, কিন্তু পাপীর সমস্ত চাতুয্যই মিথ্যা। ভগবান ঘুমিয়ে থাকেন না।
এত সেয়ানা হয়েও দত্ত ধরা পড়ল প্রধান তিনটে কারণে। প্রথমত, সেই তুচ্ছ চুণ-বালি-সুরকি-কয়লার গুঁড়ো। দ্বিতীয়ত, ভাঙা কাঁচের উপরে তার আঙুলের ছাপ। তৃতীয়ত, উপরচালাকি ক'রে সে যদি আমাকে চায়ের নিমন্ত্রণ না করত, তাহলে আমিও ঐ দ্রবীভূত বাতাসের অভাবিত ও বিস্ময়কর ব্যবহারটা আন্দাজে কল্পনা করতে পারতুম না। বলতে কি, দ্রবীভূত বাতাসের কথা একবারও আমি ভাবিনি। কিন্তু দত্তের রসায়নাগারে ঐ দুর্লভ জিনিষটিকে দেখেই আমার মনের ভিতরে জেগেছিল একটা আশ্চয্য সন্দেহ!
সতীশবাবু, এখনো কি আপনি বিনোদকে গ্রেপ্তার করতে চান? কিন্তু আর সে আপনাকে ভয় করবে না, দুদিন পরেই আবার তার দেখা পাবেন। খবরের কাগজে হত্যাকারীর গ্রেপ্তারের বিবরণ বেরুলেই বিনোদ আর অজ্ঞাতবাস করতে রাজি হবে না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিনোদ এবারে ভালো ছেলে হবে।
সতীশবাবু, আর একটা কথা। য়ুরোপে এখন বিজ্ঞান-জানা খুনী, চোর বা অপরাধীর দল রীতিমত ভারি। ভারতবর্ষের সৌভাগ্য যে, এদেশের অপরাধীরা এখনো পাপ কাজে বিজ্ঞানের সাহায্য নিতে শেখেনি। অবশ্য এটা সকলেই জানে যে, বিখ্যাত পাকুড় খুনের মামলায় প্রকাশ পেয়েছে, অপরাধীরা হত্যাকার্য্যে প্লেগের জীবাণু ব্যবহার ক'রে অভাবিত চিন্তাশক্তির পরিচয় দিয়েছে! কিন্তু এ-শ্রেণীর শিক্ষিত অপরাধী এখানে দুর্ল্লভ। নইলে এ-দেশী পুলিসকে সাত হাত জলের তলায় প'ড়ে অন্ধকার হাত্ড়ে হাবুডুবু খেতে হ’ত। তবু আমার মত হচ্ছে, এদেশেরও পুলিসের উচিত, বিজ্ঞান সম্বন্ধে অন্তত প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করা? কেননা অদূর-ভবিষ্যতে ভারতবর্ষেও বৈজ্ঞানিক-অপরাধীর দল ভারি হওয়ার সম্ভাবনা আছে যথেষ্টই।
এস রবীন, শ্রীমান দত্তের সামনে পরলোকের দরজা খুলে দিয়ে এখন আমরা সসম্মানে প্রস্থান করি। নমস্কার, সতীশবাবু! দত্ত, কিছু মনে কোরো না। তোমাকে আর নমস্কার করবার ইচ্ছা হচ্ছে না!
শেষ