বিষয়বস্তুতে চলুন

অন্ধকারের বন্ধু/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

সাজাহানের পাঞ্জা

 হেমন্তের বাড়ীর একতালায় পাশাপাশি দুখানি হল ঘর ছিল। তার একখানি হচ্ছে পরীক্ষাগার। সেখানে আছেএকটি সুদীর্ঘ টেবিলের উপরে নানারকম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং দেওয়ালের তাকে তাকে সাজানো হরেকরকম তরল ও চূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ-ভরা কাঁচের জার, শিশি ও বোতল।

 আর-একখানি ঘর হচ্ছে একসঙ্গে তার বৈঠকখানা ও লাইব্রেরী। তার চারিদিকের দেওয়াল ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে বড়-ছোট, রোগা-মোটা কেতাবে ভরা আলমারি এবং মাঝখানে ধব্‌‌ধবে চাদর-বিছানো নরম বিছানা-ভরা চৌকি, চেয়ার, সোফা, কৌচ্ ও ছোট ছোট টেবিল প্রভৃতি।

 সেদিন বৈঠকখানায় ঢুকে দেখি, কৌচে ব'সে হেমন্ত কোলে পাতা একখানা বইয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

 চেয়ারে ব’সে প'ড়ে বললুম, “কি হে ভায়া, অত মন দিয়ে কি বই পড়া হচ্ছে?”

 হেমন্ত মুখ তুলে বললে, “বই পড়ছি না ভাই, ছবি দেখছি! “এখানা হচ্ছে ক্যালকাটা পুলিস জার্নাল।”

 -“পুলিস জার্নালের ছবি? তাহ'লে নিশ্চয় তোমার কোন স্যাঙাতের—অর্থাৎ চোর কি খুনীর চেহারা?”

 -"না রবীন, তোমার রসিকতা মাঠেই মারা গেল। এ ছবি দেখে আমি এক পৃথিবীবিখ্যাত অমর শিল্পীর কথা ভাবছি।”

 —“কি সর্ব্বনাশ, পুলিসের শনির দৃষ্টি আজকাল কি শিল্পীদেরও ওপরে গিয়ে পড়েছে?”

 —“রবীন, পুলিসের ওপরে অকারণে তুমি এতটা নির্দ্দয় হোয়োনা। আর পুলিসের দৃষ্টি শিল্পীদের ওপরে পড়বেই বা না কেন শুনি? শিল্পী মানেই কি সাধু? ফ্রান্সের বিখ্যাত কবি ভিলন কি চোর আর খুনী ছিলেন না? ইতালীর সিজিস্‌‌মোন্দো মালাতেসার নাম শুনেছ?”

 -“না। কে তিনি?”

 —“কবি, পণ্ডিত, ললিতকলার উপাসক। মধ্য-যুগে তার জন্ম। কিন্তু তার মত দুর্নীতিপরায়ণ ক্রিমিনাল তুমি কলকাতার কোন কফিখানা বা বস্তী খুঁজলেও পাবে না। ও-সব কথা যাক্! আমি এখন কি দেখছি জানো? তাজমহলের স্রষ্টা সাজাহান বাদসার পাঞ্জা।”

 —“দেখি।” বইখানি হাতে নিয়ে দেখলুম, একখানি ছবিতে ছাপা সম্রাট সাজাহানের ডানহাতের ছাপ।

 হেমন্ত বললে, “সেকালে মোগল সাম্রাজ্যের সমস্ত মুল্যবান কাগজ-পত্রের ওপরে সম্রাটের পাঞ্জার ছাপ থাকত। কারণ মোগলরা জানত, শীলমোহর বা হাতের সই জাল হ’তে পারে, কিন্তু পাঁচ-আঙুল-সুদ্ধ করতল বা পাঞ্জার ছাপ জাল হওয়া অসম্ভব। পৃথিবীর কোন দুজন মানুষের পাঞ্জার ছাপ একরকম হ’তে পারে না। বাংলা পুলিসের স্যার উইলিয়ম হার্সেল সাহেব পৃথিবীতে সর্ব্বপ্রথমে আসামীদের আঙুলের ছাপ নেবার পদ্ধতি গ্রহণ করেন এই সেদিন—১৮৭৭ খৃষ্টাব্দে। আজ এই পদ্ধতির আদর পৃথিবীর দেশে দেশে। কিন্তু ভারতে এই পদ্ধতির জন্ম বহুকাল আগে। কেবল মোগলদের পাঞ্জার ছাপ নয়, হিন্দুরাও প্রাচীন কাল থেকে দলিলের উপরে নাম-সইয়ের বদলে আঙুলের টিপ-সই ক’রে আসছে। সুতরাং আধুনিক পুলিসের আবিষ্কারের ভেতরে কোনই বাহাদুরি নেই।....

 ..কিন্তু রবীন, সাজাহান বাদসার পাঞ্জার ছাপ দেখে তোমার কিছু মনে হচ্ছে না?”

 —“হচ্ছে বৈকি! মনে হচ্ছে, এ হাতের ছাপ দেখলে সাজাহানকে স্মরণ হয় না!”

 —“ঠিক বলেছ। দিল্লী-আগ্রার নানা প্রাসাদে, মস্‌‌জিদে, স্মৃতি-সৌধের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালে যে শিল্পী সাজাহানের সৌন্দর্য্য-প্রীতি দেখলে অভিভূত হয়ে যেতে হয়, এই কি তাঁর নিজের হাতের ছাপ? আধুনিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের আঙুলের গড়ন দেখলে তার প্রকৃতি আর পেশা বোঝা যায়। কিন্তু সাজাহানের আঙুলের গড়ন দেখ! শিল্পীর আঙুলের গড়ন এ-রকম হওয়া উচিত নয়—যে কোন সাধারণ লোকের হাতের ছাপ এ-রকম হ'তে পারে। ব'সে ব'সে এই কথাই ভাবছিলুম।”

 পুলিস জার্নালখানা রেখে দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে আমি বললুম, “ভাই, উত্তরদিকের জান্‌‌লা দুটো বন্ধ ক'রে দি। এই দুর্জ্জয় শীতের ওপরে কাল আবার বৃষ্টি হয়ে ঠাণ্ডা আরো বেড়ে উঠেছে। চট্ ক'রে এক পেয়ালা চায়ের হুকুম দাও।”

 কৌচের উপরে পাদুটো লম্বা ক’রে ছড়িয়ে দিয়ে হেমন্ত বললে, “তা যেন দিচ্ছি! কিন্তু দুর্জ্জয় শীতকে যদি এতই ভয়, তবে আজ তুমি গঙ্গাপার হয়ে বাগানে বেড়াতে গিয়েছিলে কেন?”

 চমৎকৃত হয়ে বলনুম, “এ কথা তুমি কেমন ক’রে জানলে? কেউ বলেছে বুঝি?”

 —“তুমি তো সিধে ওপার থেকে এপারে নেমেই ধূলো-পায়ে আমার বাড়ীতে আসছ! এর মধ্যে খবর আর কে দেবে? কেমন, যা বলছি সত্যি কিনা?”

 —“হ্যাঁ ভাই, সত্যি। কিন্তু আমি কোন বাগানে বেড়াতে যাইনি! তুমি তো জানো, বেলুড়ে আমার ভগ্নীপতি থাকেন? তাঁর অসুখ শুনে দেখতে গিয়েছিলুম। তবে তাঁর বাড়ীর সামনে একটা বেশ বড় বাগান আছে বটে! কিন্তু এ-সব কথা তোমার তো জানবার নয়, তুমি তো কখনো সেখানে যাওনি!”

 —“না, তা যাইনি। কিন্তু তুমি তো এ-কথা জানো বন্ধু, সবর্বদা আমার চোখ খোলা রাখি ব'লে কোথাও না গিয়ে ও আমি অনেক কথাই বলতে পারি।”

 আশ্চর্য্য হয়ে ভাবতে লাগলুম, কোন্ সূত্র ধরে হেমন্ত আমার সম্বন্ধে এত কথা জানতে পারলে?; নিজের জামার বোতাম-ঘরে যে ‘কার্নেশান্' ফুলটি গুঁজে রেখেছিলুম হঠাৎ সেইদিকে আমার নজর পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝলুম হেমন্তের আবিষ্কারের মূল আছে এই ফুলটিতেই।

 হেমন্ত অর্দ্ধ-মুদিত চোখে আমার ভাবভঙ্গি নিরীক্ষণ করছিল। হাসতে হাসতে যেন অন্তর্যামীর মতই বললে, “না, বন্ধু, না! তুমি যা ভাবছ তা নয়! জামার বোতাম-ঘরের ঐ ফুলটি তুমি কলকাতার কোন বন্ধুর বাড়ী বা ফুলের দোকান থেকেও সংগ্রহ করতে পারতে! ঐ দেখেই আমি এত কথা আন্দাজ করিনি। তোমার জুতোর দিকে তাকালেই দেখবে, ওর নীচের দিকটায় লেগে রয়েছে ভিজে এঁটেল্-মাটি। ও-রকম মাটি কলকাতার কর্দ্দমাক্ত পথেও পাওয়া যায় না। দেখলেই বোঝা যায়, ও হচ্ছে গঙ্গামাটি। জুতো প'রে তুমি নিশ্চয়ই স্নান করবার জন্যে গঙ্গা-গর্ভে নামো নি। সুতরাং আন্দাজে বুঝলুম, তুমি নৌকা-যোগে গঙ্গা পার হয়েছ আর ভাঁটার সময় ব'লে নৌকা ছেড়ে নামতে বাধ্য হয়েছ ঘাট থেকে খানিক দূরে, গঙ্গামাটির উপরেই। তোমার বোতাম ঘরের ফুলটি খুব তাজা রয়েছে, সুতরাং বুঝতে পারলুম ওটি তুমি কলকাতা থেকে সঙ্গে ক'রে ওপারে নিয়ে যাওনি, তাহ'লে এতক্ষণে ফুলটি অল্পবিস্তর নেতিয়ে পড়ত। অতএব ফুলটিও তুলেছ অল্পক্ষণ আগে, গঙ্গার ওপারে গিয়েই—খুব সম্ভব, কলকাতায় ফেরবার সময়ে। আর বিলাতী মর্সুমী-ফুল ‘কার্নেশান’ তো ওপারের পথে-ঘাটে বনে-জঙ্গলে ফোটে না, সুতরাং ধ'রে নিলুম ওটি চয়ন করেছ তুমি কোন বাগান থেকেই। তোমার জুতোর গঙ্গামাটি এখনো শুকোবার সময় পায় নি। ঐ ভিজে মাটি দেখেই বুঝেছি, তুমি নৌকো থেকে নেমেই সিধে আমার বাড়ীতে এসে উঠেছ! দেখছ বন্ধু, একটু চেষ্টা করলেই মানুষ দেখে কত কথা আবিষ্কার করা যায়?”

 আমি বললুম, “তুমি আশ্চর্য্য লোক, হেমন্ত! আমার সঙ্গে অনর্গল গল্প করতে করতে এত খুটিনাটি লক্ষ্য আর সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা করেছ!”

 হেমন্ত বললে, “সবই অভ্যাসের ওপরে নির্ভর করে। আর মানুষের মন আর মুখ এক নয়। সে মুখে যখন এক কথা বলে, তার মন তখন অন্য কথা ভাবতে পারে।”

 আমি বললুম, “কিন্তু চা কই—আমার চা?...এই মধু! জল্‌‌দি এক কাপ্ চা নিয়ে আয়!” মধু হচ্ছে হেমন্তের চাকরের নাম।

 হেমন্ত বললে, “দালানে পায়ের শব্দ শুনছি। যখন খবর না দিয়েই আসছে, নিশ্চয় তখন চেনা লোক!”

 বৈঠকখানার ভিতরে ঢুকলেন সতীশবাবু এবং তাঁর পিছনে পিছনে আর একটি ভদ্রলোক—পরোনে তাঁর কোট-পেণ্ট্‌‌‌‌লুন।

 —“এই যে সতীশবাবু! আসুন, আসুন” ব'লেই হেমন্ত জিজ্ঞাসু চোখে পিছনের ভদ্রলোকটির দিকে তাকালে।

 সতীশবাবু বললেন, “ওঁকে চেনেন না বুঝি? উনি হচ্ছেন: এ-অঞ্চলের বিখ্যাত ডাক্তার মিঃ, এ, দত্ত।”

 —“মিঃ, এ, দত্ত? অর্থাৎ শ্রীযুক্ত অমরনাথ দত্ত? নমস্কার, নমস্কার! সতীশবাবু, উনি তো শুধু ডাক্তার নন, উনি যে রসায়ন-শাস্ত্র নিয়েও গবেষণা করেন, ইংরিজী কাগজে প্রবন্ধ লেখেন! মিঃ, দত্ত, এই কালকেই একখানি পত্রিকায় মানুষের দেহের ওপরে Butyl chloride-এর প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে আপনার একটি সুলিখিত প্রবন্ধ পড়েছিলুম।”

 সতীশবাবু বললেন, “আপনি এত খবরও রাখেন!”

 মিঃ দত্ত লজ্জিত ভাবে বললেন, “হেমন্তবাবুর মত পণ্ডিত লোকের মুখে আমার সুখ্যাতি শুনে আমি গর্বব অনুভব করছি!”

 হেমন্ত অট্টহাস্য ক'রে বললে, “আমি আবার পণ্ডিত নাকি? মোটেই নয়—মোটেই নয়! জ্ঞান-সমুদ্রের তীরে আমি খালি নুড়ি কুড়োবারই চেষ্টা করি! তা আমার পোড়াকপালে নুড়িও সহজে জোটে না! ওকি, আপনারা এখনো দাঁড়িয়ে রইলেন যে? বসুন, বসুন—ওরে মধু, আরো কাপ দুয়েক চা আন্ রে!”

 সতীশবাবু ও মিঃ দত্ত আসন গ্রহণ করলেন।

 এখানে সতীশবাবুর একটুখানি পরিচয়ের দরকার। সতীশবাবু হচ্ছেন কলকাতা পুলিসের একজন নাম করা ইন্‌স্পেক্টার এবং হেমন্তের সঙ্গে তার আলাপ পরিণত হয়েছে রীতিমত বন্ধুত্বে। তিনি প্রায়ই এখানে আসেন এবং অপরাধতত্ত্ব নিয়ে অনেকক্ষণ ধ’রে আলোচনা ক’রে যান। অনেক সাধারণ পুলিসের লোকের মত নিজেকে তিনি একজন সবজান্তা ও মস্ত-বড় মনুষ্য-রত্ন ব’লে বিবেচনা করেন না। কোন জটিল মামলা হাতে পেলে হেমন্তের সঙ্গে পরামর্শ করতে কুণ্ঠিত হন না একটুও।

 চায়ের বারকোস হাতে ক’রে মধু ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল।

 সতীশবাবু বললেন, “হেমন্তবাবু, লিপ্টনের ‘গ্রীন লেবেল’ চায়ের লোভে আজ আমি এখানে আসিনি। আমি মহাসমস্যায় পড়েছি, তাই এসেছি আপনার কাছে সুপরামর্শ নিতে।”

 হেমন্ত হাসিমুখে বললে, “সুপরামর্শ দেওয়া আর দাবা বোর্ডের ওপর-চাল দেওয়া, দুইই খুব সহজ। সুতরাং সুপরামর্শ চেয়ে আপনাকে হতাশ হ’তে হবে না।”

 সতীশবাবু চায়ের একটা পেয়ালা তুলে নিয়ে বললেন, “না হেমন্তবাবু, ব্যাপারটাকে আপনি হাল্‌কা ভাবে নেবেন না। আমার থানার এলাকায় সহরের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি খুন হয়েছেন আর চুরি গিয়েছে নগদ আশী হাজার টাকা।”

 হেমন্ত সোজা হয়ে ব’সে বললে, “কে খুন হয়েছে আর কার টাকা চুরি গিয়েছে?”

 —“হত ব্যক্তির নাম মতিলাল মুখোপাধ্যায়। টাকা চুরি গেছে তাঁরই।”

 —“হ্যাঁ, ও নাম আমি শুনেছি বটে। তিনি তো যদুগোপাল বসু স্ট্রীটে থাকতেন?”

 —“হ্যাঁ। খুনী ধরা পড়ে নি।”

 —“কোন সূত্র পাওয়া যায় নি?”

 —“সূত্রও পেয়েছি কিছু-কিছু, কিন্তু এত এলোমেলো যে কাজে লাগাতে পারছি না। সন্দেহ করবার মত লোকও পেয়েছি, তবু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।”

 হেমন্ত আবার কৌচের উপরে পা তুলে কুশনের উপরে হেলে পড়ল। তারপর দুই চোখ মুদে ফেলে বললে, “তাহ’লে আগে সব কথা শুনি। মিঃ দত্ত, চোখ মুদেছি ব'লে ভাববেন না আমি ঘুমোবার ফিকিরে আছি। সতীশবাবু আমার অভ্যাস জানেন, চোখ মুদলে আমার শোনবার আর চিন্তা করবার শক্তি দ্বিগুণ হয়ে ওঠে!”