বিষয়বস্তুতে চলুন

অন্ধকারের বন্ধু/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

কলকাতার বিলাতী ‘ফগ্'!

 রাস্তায় বেরিয়ে দেখলুম, আজ সহরের এ কী অবস্থা!

 চারিদিক ঢাকা প'ড়ে গিয়েছে যেন কুয়াশার ঘেরাটোপে। কলকাতায় যে এমন কুয়াশা হ'তে পারে, কখনো কল্পনা করিনি!

 মুখ তুললে বোঝা যায় না মাথার উপরে লক্ষ তারার চুম্‌‌কী বসানো নীলাকাশ ব'লে কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে! এদিকে ওদিকে যেদিকে তাকাই—সমস্ত দৃশ্য যেন লুপ্ত হয়ে গেছে পুরু ধোঁয়া আর ধোঁয়ার জঠরে। যেখানে যেখানে গ্যাস-পোষ্ট আছে সেখানকার কুয়াশা কিঞ্চিং স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে মাত্র, আলো কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। মাঝে-মাঝে পদশব্দ শোনা যাচ্ছে, কিন্ত পথিকরা অদৃশ্য!

 হেমন্ত বললে, “ও রবীন, এ হ'ল কি হে! লণ্ডনের বিখ্যাত বিলিতী ‘ফগ্‌’ কি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধান সহরে বেড়াতে এসেছে?”

 হেমন্ত রয়েছে আমার কাছ থেকে মাত্র এক হাত তফাতে, কিন্তু তাকেও দেখাচ্ছে যেন আবছায়ার মত!

 একে মতিবাবুর বাড়ীর পিছন দিককার এই সরু গলিটা সাধারণতই নির্জ্জন, তার উপরে শীতার্ত্ত রাত ও এই ভয়াবহ কুজ্ঝটিকা! মনে হচ্ছে আামরা চলেছি নিস্তব্ধ এক অন্ধকাররাজ্যের ভিতর দিয়ে অন্ধের মত!

 পিছনে আবার একাধিক অদশ্য জুতোর শব্দ হ'ল।

 আমি সাড়া দিয়ে বললুম, “কে আসে—সাবধান! আমাদের দেহের ওপরে যেন হোঁচট্‌ খাবেন না।”

 পর-মুহূর্ত্তেই মাথার উপরে অনুভব করলুম প্রচণ্ড এক আঘাত এবং চোখের সামনে ছড়িয়ে পড়ল রাশি রাশি সমুজ্জল সর্সে-ফুল এবং তারপরেই হারিয়ে ফেললুম জ্ঞান!......

 কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলুম জানি না। কিন্তু জ্ঞান ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুনলুম হেমন্তর কণ্ঠস্বর—“রবীন, রবীন!”

 — “অ্যা? কি বলছ? উঃ।”

 —“উঠে বোসো—”

 হেমন্ত আমাকে ধ'রে তুলে বসিয়ে বললে, “তোমার মাথা ফেটে গেছে। এখনি ব্যাণ্ডেজ করা দরকার! তাড়াতাড়ি আমার বাড়ীতে যেতে পারবে?”

 —“বোধহয় পারব। কিন্তু কে আমাকে আক্রমণ করলে?”

 —“এখন কোন কথা নয়, আগে বাড়ীতে চল।”

 .......নিজের বাড়ীতে ফিরে হেমন্ত আমার ক্ষতস্থানটা পরীক্ষা ক'রে বললে, “বড় বেঁচে গিয়েছ রবীন, আর-একটু হ'লেই আঘাতটা মারাত্মক হয়ে উঠত।” সে তাড়াতাড়ি জল দিয়ে ক্ষতস্থানটা ধুয়ে ঔষধ প্রয়োগ ক'রে ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে বসল।

 —“কিন্তু হেমন্ত, হঠাৎ আমার ওপরে গুণ্ডার আক্রমণ কেন?”

 —“গুণ্ডা নয় রবীন, হত্যাকারী!”

 —“হত্যাকারী?”

 —“হ্যা। এ হচ্ছে মতিবাবুর হত্যাকারীর কীর্ত্তি! খালি তোমাকে নয়, আমাকেও আক্রমণ করেছিল।”

 —“তুমি তাদের দেখতে পেয়েছ?”

 —“আবছায়ার মতন দেখেছি। দেখলেও চিনতে পারতুম না, তারা মুখোস প’রে এসেছিল।”

 —“কিন্তু কেন?”

 —“তারা আমার পকেট থেকে সেই দস্তানাটা চুরি ক'রে পালিয়েছে।”

 বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলুম। তারপর বললুম, “আমার সন্দেহ হচ্ছে, বিনোদের ওপরে। নিশ্চয় সে পাশের ঘরে লুকিয়ে ব’সে দস্তানা সম্বন্ধে তোমার মতামত শুনেছে।”

 —“তারপর তার কোন অনুচরের সঙ্গে আমাদের পিছু নিয়েছে?”

 —“হুঁ। আজকের বিদ্‌‌কুটে কুয়াশা তার পক্ষে হয়েছে একটা মস্ত সুযোগ।”

 —“দুর্য্যোগও হ'তে পারে রবীন।”

 —“দুর্য্যোগ?”

 —“হ্যাঁ, খানিকটা তাই বৈকি!”

 —“মানে?”

 —“এই দেখ!” হেমন্ত হাসতে হাসতে পকেট থেকে একখানা পকেট-বুক বার ক'রে সামনের টেবিলের উপরে রাখলে।

 —“পকেট-বুক!”

 —“হ্যাঁ।” পকেট-বুকখানা খুলে দু-এক পাতা উল্টে সে একটু বিস্মিত স্বরে বললে, “না, যা ভেবেছিলুম তা তো নয়!”

 —“কী তুমি ভেবেছিলে?”

 —“ভেবেছিলুম এর মধ্যে দস্তানা-চোরের নামধাম-গুপ্তকথা পাব। এখন দেখছি এখানা হচ্ছে মতিবাবুর ডায়ারি!”

 —“অ্যাঁঃ! তবে কি এইখানাই মতিবাবুর ঘর থেকে অদৃশ্য হয়েছে?”

 —“তাই তো বোধ হচ্ছে।”

 —“এখানা তুমি কোত্থেকে পেলে?”

 —“পিক-পকেট যেখান থেকে চিরকালই গুপ্তধন আহরণ করে!”

 —“হেমন্ত, আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না।”

 —“শোনো। কুয়াশায় গা ঢেকে আজ আমাদের একসঙ্গে আক্রমণ করেছিল দুজন লোক। খুব সম্ভব তাদের হাতে ছিল খাটো লোহার ডাণ্ডা। তারা নিশ্চয়ই আমাদের খুন করতে আসেনি, এসেছিল খালি ঐ দস্তানাটাই হাতাবার জন্যে। বোধহয় এই দস্তানা কেউ কেউ চেনে, দস্তানাটা দেখলে তারা মালিকের পরিচয় দিতে পারে। কিংবা অন্য কোন কারণও থাকতে পারে। কিন্তু সে কথা যাক্। ......একজন তোমাকে আক্রমণ করে, আর একজন আমার মাথা লক্ষ্য ক'রে ডাণ্ডা মারে, কিন্তু ফস্কে যায়। সে আবার ডাণ্ডা তোলবার আগেই আমি তাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরি এবং সঙ্গে সঙ্গে তার বুক-পকেটে অনুভব করি এই ডায়ারিখানির অস্তিত্ব। তুমি জানো রবীন, খুব বিপদেও আমার মাথা গুলিয়ে যায় না। চোখের নিমেষ পড়বার আগেই আমি এক হাতে তাকে জড়িয়ে সাঁৎ ক'রে তার পকেটে আর এক হাত চালিয়ে ডায়ারিখানা তুলে নিলুম—কিন্তু সেই মুহূর্তে অন্য লোকটা তোমাকে ছেড়ে আমারও মাথায় মারে ডাণ্ডা, আমিও মাটীর ওপরে প'ড়ে যাই। আমার মাথা ফাটেনি বটে, কিন্তু আচ্ছন্নের মতন হয়ে গেলুম। আমাকে সেই অবস্থায় পেয়ে দস্তানাটা নিয়ে তারা স'রে পড়ে। আমি যে পকেট মেরেছি এটা নিশ্চয়ই তারা জানতে পারেনি!”

 —“চোরের ওপরে আচ্ছা বাট্‌‌পাড়ি করেছ বটে।... কিন্তু হেমন্ত, ডায়ারি আর চাবির গোছা চুরি দেখে সত্যি-সত্যিই সন্দেহ হয় যে, বাড়ীর ভেতরের কোন লোকই মতিবাবুকে খুন করেছে। হ্যাঁ, সন্দেহ কেন, একরকম নিশ্চিত ভাবেই এ-কথা বলা যায়। বাইরের লোক খুন আর টাকা চুরি ক'রেই তুষ্ট
একটু ইতস্তত ক’রে যুবক বললে, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
—৬৬ পৃষ্ঠা
হ'ত—পরে মতিবাবুর চাবির গোছা আর ডায়ারি কোন কাজেই লাগাতে পারত না।”

 ডায়ারির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হেমস্ত অন্যমনস্ক ভাবে বললে, “হ্যাঁ, সতিশবাবুরও ঐ মত।”

 মিনিট পাঁচ-ছয় হেমন্ত ডায়ারি থেকে আর মুখ তুললে না। তারপর হঠাৎ উৎসাহিত কণ্ঠে বললে, “পেয়েছি রবীন, ডায়ারি চুরির কারণ পেয়েছি! এই পাতাখানা ছাড়া ডায়ারির অন্য কোথাও আমাদের পক্ষে বিশেষ কোন দরকারি কথা নেই। শোনো—” ব'লেই পড়তে লাগলঃ

 “আমার শোবার ঘরের বড় টেবিলের ডানদিকের টানার পিছনের কাঠে একটি গুপ্তস্থান আছে। বাঁ-কোণের শেষপ্রান্তে খুব ছোট একটি স্প্রিং আছে। সেটি টিপ্‌লেই গুপ্ত স্থানটি বেরিয়ে পড়বে। ওর মধ্যে প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার হীরা, চুণী, পান্না আর মুক্তা আছে। বৃদ্ধ হয়েছি, স্বাস্থ্য দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে, হঠাৎ যদি মারা পড়ি সেই ভয়ে আমার উত্তরাধিকারীর জন্যে এখানে এই কথাগুলি লিখে রাখলুম।”

 —“রবীন, খুনী জানত যে, ডায়ারির মধ্যে এই গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া যাবে!”

 আমি দৃঢ় স্বরে বললুম, “তাহ'লে এই খুনী নিশ্চয়ই বাড়ীর ভিতরের লোক! এইজন্যেই সে চাবি চুরি করেছে! কাল তাড়াতাড়িতে ডায়ারি পড়তে পারে নি, খুব শীঘ্রই সে কাজ হাঁসিল করবে!”

—“করবে নাকি? দেখা যাক্!” ব'লেই হেমন্ত উঠে ‘টেলিফোনে’র ‘রিসিভার’ তুলে নিয়ে থানার নম্বর বললে।

 -“কে? সতীশবাবু? থানায় ফিরে এসেছেন? হ্যাঁ, আমি হেমন্ত। শুনুন। মতিবাবুর দেহ শব-ব্যবচ্ছেদাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন তো? বেশ। তাঁর শোবার ঘর বন্ধ আছে? উত্তম। কিন্তু একটা জরুরি কথা মনে রাখবেন। ও ঘরের দরজার সামনে সর্ববদাই যেন পাহারা রাখা হয়—কেউ যেন কোন কারণেই ও-ঘরে ঢুকতে না পায়। কেন? কারণ নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু এখনো প্রকাশ করবার সময় হয় নি। রাগ করবেন না, যথাসময়ে সমস্তই বলব।

 .....বলেন কি? যে কনস্টেবল ভাঙা কাঁচের গেলাস নিয়ে একলা আসছিল, হঠাৎ পথে কারা তাকে আক্রমণ করেছে? তারপর? গেলাসটা ছিনিয়ে নিতে পারে নি শুনে সুখী হলুম। কনেষ্টবল কারুকে চিনতে পারে নি? হ্যাঁ, কলকাতার আজকের কুয়াশাটা আশ্চর্য্যই বটে! অভূতপূর্ব্ব! কি বললেন? মিনিট দুয়েক আগেই গলির মোড়ের কাছে কনষ্টেবল আর-এক পথিকের গায়ের ওপরে গিয়ে পড়ে? কে সে? বিনোদ? অত কুয়াশায় ওখানে সে কি করছিল? মাথা ধরেছে ব'লে বেড়াতে বেরিয়েছিল? এই বিশ্রী কুয়াশায়? আশ্চর্য্য ওজর তো! তাকে গ্রেপ্তার করবেন কিনা ভাবছেন? আপনার কর্ত্তব্য আপনিই ভালো বোঝেন, আমি আর কি বলব? এ-পথে আমি শিক্ষানবিস ছাড়া তো আর কিছুই নই!.........হ্যাঁ, আমার কাছেও একটা নতুন খবর আছে। আমাকে আর রবীনকেও আজ কারা আক্রমণ করেছিল। রবীনের মাথা ফেটে গেছে। বেচারী। আমার খুব বেশী লাগে নি বটে, কিন্তু সেই দস্তানাটা লুট হয়ে গেছে—কনষ্টেবলের মত আমার ভাগ্য ভালো নয়। না, চিনতে পারি নি। একে কুয়াশা, তার ওপরে উপন্যাসের দুরাত্মাদের মত তারা মুখোস প’রে এসেছিল। না, না, এত রাতে আমাদের আর দেখতে আসতে হবে না, আমরা ভালোই আছি। আচ্ছা, নমস্কার।” আমার দিকে ফিরে সে বললে, “রবীন, সব শুনলে তো?”

 অভিভূত কণ্ঠে বললুম, “ভাই হেমন্ত, এ যে আমরা সাংঘাতিক লোকের পাল্লায় পড়েছি! কাল খুন, আশী হাজার টাকা চুরি, আজ আমাদের আর কনস্টেবলকে আক্রমণ! আমি ভাই কালিকলম নিয়ে নাড়াচাড়া করি, এত গোলমাল আমার ধাতে সহ্য হবে না তো!”

 হেমন্ত বললে, “হুঁ, আমিও জানতুম বটতলার ডিটেক্‌‌টিভ নভেলেই এমন সব হৈ-হৈ কাণ্ড ঘটতে পারে!.... কিন্তু রবীন, বুঝতে পারছ কি, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণগুলো সরাবার জন্যে খুনীরা কি-রকম মরিয়া হয়ে উঠেছে? উপন্যাসকেও সত্য ক'রে তুলতে চাইছে? কিন্তু কে তারা—কে তারা? কিছুই ধরতে পারছি না যে!”

 আমি বললুম, “আচ্ছা, সতীশবাবুর কাছে তুমি একটা কথা ভাঙলে না কেন?”  দুষ্টুমি ভরা হাসি হাসতে হাসতে হেমন্ত বললে, “কি কথা?”

 -“মতিবাবুর ডায়ারির কথা?”

 হেমন্ত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললে, “রবীন, আমার এ লুকোচুরি মার্জ্জনীয়। সত্যি কথা বলতে কি, এইটেই হবে আমার জীবনের প্রথম উল্লেখযোগ্য ‘কেস'। পুলিসের কাছে এর সমস্ত বাহাদুরিটা আমি একলাই অর্জ্জন করতে চাই। আমার দৃঢ়-বিশ্বাস, আমি এ মামলাটার কিনারা করতে পারব। অবশ্য তারপরে আমি স'রে দাঁড়ার যবনিকার অন্তরালে—জনসাধারণের কাছ থেকে পুলিসকে ষোলো আনা সুখ্যাতি আদায় করবার অবসর দিয়ে।”

 -“কিন্তু এ আগুন নিয়ে খেলা হচ্ছে, আমাদের প্রাণ যেতেও পারে।”

 —“দেহের ভিতর থেকে এত-চট্‌পট্ প্রাণবায়ু যাতে বহির্গত না হয় সে-চেষ্টার ত্রুটি আমি করব না। কিন্তু কি আশ্চর্যা, আমি যে একটা মস্তবড় কথা ভুলে গিয়েছি রবীন!” ব'লেই হেমন্ত টপ্ ক'রে দাঁড়িয়ে উঠে নিজের পকেটের ভিতরে হাত চালিয়ে দিলে।

 —“কি খুঁজছ তুমি?”

 —“এইটে।” হেমন্ত বার করলে সেই কাগজের মোড়কটা —যার ভিতরে সে পূরে রেখেছিল খুনীর জুতো-থেকে-খসা খানিকটা শুক্‌‌নো কাদা।

 মোড়কটা খুলে হেমন্ত আশ্বস্ত স্বরে বললে, “আঃ, বাঁচা গেল! কাদার টুক্‌‌রোটা ধবস্তাধবস্তিতে গুঁড়িয়ে গেছে বটে, কিন্তু হারিয়ে যায় নি!”

 আমি বললুম, “ঐ এক টুক্‌‌রো কাদাকে তুমি এমন অমুলা নিধি ব'লে ভাবছ কেন? ওর ভেতর থেকে তুমি কি খুনীকে আবিষ্কার করতে চাও?”

 —“আশ্চয্য কি? আমার সঙ্গে পরীক্ষাগারে এস।”

 হেমন্ত তার পরীক্ষাগারে গিয়ে টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে ব'সে পড়ল। তারপর অণুবীক্ষণ ও সেই মোড়কের শুকনো কাদার গুঁড়ো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ।

 এ-রকম পরীক্ষার মধ্যে আমি কিছু রস-কস্ পাই না। ঘরের এক কোণে মাটি দিয়ে তৈরি একটি গায়ের-ছাল-ছাড়ানো মানুষ-মূর্ত্তি দাঁড় করানো ছিল—আামি তার সুমুখে দিয়ে দাঁড়ালুম। শিল্পী কেবল মূর্ত্তিই গড়ে নি, স্বাভাবিক সব রং বুলিয়ে নরদেহের ত্বকের তলায় যে-সমস্ত বিশেষত্ব থাকে তার এত্যেকটিই ফুটিয়ে তুলেছে। এ-সব দেখলে বেশ বোঝা যায়, পঞ্চভূত দিয়ে আমাদের দেহ তৈরি করতে ব’সে প্রকৃতি-দেবীকে কত মাথা খাটাতে, কত শিল্প-চাতুরী প্রকাশ করতে হয়েছে আশ্চর্য্য ও রহস্যময় হচ্ছে মানুষের দেহের ভিতরটা!

 এমন সময়ে হেমন্ত আমাকে ডেকে বললে, “এই শুক্‌‌নো কাদার ভেতরে কি কি আছে জানো?”

 জানবার জন্যে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তবু বললুম, “কি কি আছে?”

 —“এর মধ্যে আছে চুণ আর বালি, সুর্‌‌কি আর কয়লার গুঁড়ো। এগুলো মেশানো আছে কলকাতার পথের সাধারণ ধূলোর সঙ্গে।”

 আমি বললুম, “চুণ, বালি, সুরকি আর কয়লাও মেলে কলকাতার যেখানে-সেখানে। এর কোনটাকেই আমি অসাধারণ ব'লে মনে করি না।”

 —“করনা নাকি? ও!” এই ব'লেই হেমন্ত একেবারে চুপ মেরে গেল। তার মুখ দেখলেই বোঝা যায, অত্যন্ত একমনে সে যেন কোন মহা-দরকারি কথা চিন্তা করছে।

 খানিক পরে আমি বললুম, “দেখ ভায়া, এটা ভাবি বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু। শুক্‌‌নো কাদার গুঁড়ো অর্থাৎ ধূলো নিয়ে এত-বেশী মাথা ঘামানো হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কের অপব্যবহার।”

 হেমন্ত আমার পানে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল অন্যমনস্কের মত। তারপর ধীরে ধীরে বললে, “প্রিয় রবীন, তুমি হচ্ছ একটি প্রকাণ্ড উজবুগ্।”