অন্ধকারের বন্ধু/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ
বিনোদলালের অন্তর্ধান
পরদিন বৈকালে ব'সে ব'সে হেমন্তের সঙ্গে গল্প করছি, এমন সময়ে সতীশবাবু এসে ঢুকলেন ঘরের ভিতরে।
হেমন্ত বললে, “হঠাৎ এ সময়ে? কোন খবর-টবর আছে নাকি?”
সতীশবাবু চেয়ারের উপরে ব'সে প'ড়ে বললেন, “ভালো-মন্দ দুই খবরই আছে।”
—“যথা?”
—“সেই ভাঙা কাচের গেলাসের ওপরে আঙুলের ছাপ পাওয়া গিয়েছে।”
—“হু, সুখবর বটে।”
—“আমাদের পুরানো দপ্তর থেকে এক আসামীর আঙুলের ছাপ বেরিয়েছে। দুই ছাপই এক আঙুলের।”
সাগ্রহে আমাদের দিকে ঝুঁকে প'ড়ে হেমন্ত বললে, “কে সেই আসামী?”
—“একে একে সব বলছি। বিশ বছর আগে জাল নোট চালাবার চেষ্টা ক'রে হরিহর নামে একটা লোক ধরা প’ড়েছিল। কিন্তু মামলা যখন বিচারাধীন, সেই সময়েই একদিন সে হাজত থেকে স’রে প’ড়েছিল পুলিসকে ফাকি দিয়ে। তারই আঙুলের ছাপের সঙ্গে গেলাসের আঙুলের ছাপ মিলে গেছে অবিকল।”
—“সেই হরিহর এখন কোথায়?”
—“কেউ তা জানে না। হয়তো তার আসল নাম হরিহরই নয়। যখন সে হাজতে ছিল তখন অনেক চেষ্টা করেও পুলিস তার যথার্থ পরিচয় আদায় করতে পারে নি। তবে তার কথাবার্তা হাব-ভাব ব্যবহারে এইটুকু অনুমান করা গিয়েছিল যে, সে ভালো ঘরের ছেলে আর সুশিক্ষিত।পুলিস যার-পর-নাই খোঁজ নিয়েও আর হরিহরের কোন পাত্তাই পায় নি। আজ বিশ বৎসর পরে হরিহরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ভাঙা গেলাসের কাঁচে। জালিয়াত অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে এসে হয়েছে হত্যাকারী। কিন্তু আবার সে অদৃশ্য হয়েছে।”
—“হরিহরের ছবি আপনাদের কাছে নেই? সে নাম বদলাতে পারে, চেহারা বদলাতে পারবে না তো?”
—“ছবি নিশ্চয়ই আছে। এই নিন্ তার লিপি।”
সতীশবাবু একখানা ফোটো বার ক'রে টেবিলের উপরে রাখলেন। আমি ঝুঁকে প'ড়ে দেখলুম, একটি অত্যন্ত শান্তশিষ্ট যুবকের চেহারা। চোখ বড় বড়, নাক টিকলো, দাড়ী-গোঁফ কামানো, মাথায় লম্বা চুল।
ছবিখানা খানিকক্ষণ মন দিয়ে দেখে হেমন্ত বললে, “বিশ বছর আগে হরিহরের বয়স ছিল কত?”
—“বাইশ-চব্বিশের বেশী নয়।”
—“তাহ'লে আজ তার বয়স হবে বিয়াল্লিশ কি চুয়াল্লিশ। এতদিনে তার চেহারার যথেষ্ট পরিবর্ত্তন হওযা সম্ভব। আচ্ছা, ছবিখানা আজ আমার কাছে থাক্।”
আমি বললুম, “মতিবাবুকে খুন করতে এসেছিল দুজন লোক। বোঝা যাচ্ছে তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে হরিহর। কিন্তু আর একজন কে?”
সতীশবাবু ম্লান হাসি হেসে বললেন, “সেটাও আমরা আন্দাজ করতে পেরেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেও পুলিসের হাত ছাড়িয়ে লম্বা দিয়েছে।”
হেমন্ত সবিস্ময়ে বললে, “পালিয়েছে। কে পালিয়েছে?”
—“শুনুন। মতিবাবুর চোরাই নোটের নম্বরগুলো আপনি কি উপায়ে সংগ্রহ করেছেন জানি না, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কারেন্সি থেকে আজই কেউ এমন দশখানা হাজার টাকার নোট ভাঙিয়ে নিয়ে গেছে, যার নম্বরগুলো আছে আপনারই দেওয়া কাগজে।”
—“বলেন কি মশাই?”
—“হ্যাঁ। তারপরেই খবর পেলুম, আজ সকালে বিনোদলালকেও কারেন্সি আপিস থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে।”
—“বিনোদবাবু কি বলেন?”
—“আপাতত বিনোদের মতামত জানবার কোন উপায়ই আর নেই।”
—“মানে?”
—“বিনোদ পালিয়ে গেছে!”
—“পালিয়ে গেছে! বিনোদ পালিয়ে গেছে?” উত্তেজিত ভাবে হেমন্ত চেয়ারের উপরে সিধে হয়ে বসল।
—“একেবারে নিরুদ্দেশ। কারেন্সি আপিস থেকে বাড়ীতে ফিরে এসে, আবার কখন্ যে কোন্ পথ দিয়ে সে অদৃশ্য হয়েছে কেউ তা দেখতে পায় নি! বিনোদের নামে ওয়ারেণ্ট আমি তৈরি ক'রেই রেখেছিলুম, কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে দেখি খাঁচার ভেতরে পাখী আর নেই!”
হেমন্ত অর্দ্ধ-স্বগত স্বরে বললে, “বিনোদ পলাতক! বিনোদকে দেখা গেছে কারেন্সিতে!”
অনুতাপ-ভরা কণ্ঠে সতীশবাবু বললেন, “কি অন্যায়ই করেছি! গোড়া থেকেই ওর ওপরে আমার সন্দেহ হয়েছিল। তখনি যদি গ্রেপ্তার করতুম!”
আমি মনে মনে ভাবতে লাগলুম যে, পালিয়ে গিয়ে বিনোদ নিজেই নিজের অপরাধটা ভালো ক'রে প্রমাণিত করলে। কিন্তু এই বীভৎস ব্যাপারে তার হাত ছিল কতখানি? সে কি হরিহরেরই হুকুম তামিল করেছিল? হরিহরও কি তার সঙ্গেই দেশছাড়া হয়েছে?”
হেমন্ত হঠাৎ দৃঢ়স্বরে বললে, “নিশ্চিন্ত হ’ন সতীশবাবু। আমাকে আরো দিন-তিনেক সময় দিন! তার ভেতরেই বোধ হয় এ মামলাটার একটা কিনারা ক’রে ফেলতে পারব!”
সতীশবাবু বললেন, “এ মামলার একরকম কিনারা তো ক’রে এনেছিই, পাজী বিনোদ গা-ঢাকা দিয়েই তো যত মুস্কিলে ফেললে!”
হেমন্ত বললে, “কিছু ভাববেন না সতীশবাবু, বিনোদলালকে আবার আপনার হাতের কাছে পাবেন খুব শীঘ্রই। পালিয়ে সে যাবে কোথায়? তাকে আপনার মুঠোর ভেতর এনে দেব—এই আমার পণ।”
আরো কিছুক্ষণ কথা ক’য়ে সতীশবাবু নিলেন বিদায়। হেমন্ত চিন্তিত মুখে চুপ ক’রে ব’সে রইল।
আমি বাড়ী যাবার জন্যে যখন গাত্রোত্থান করলুম তখন সে বললে, “রবীন, আজ সন্ধ্যায় তোমার সঙ্গে আর সিনেমায় যেতে পারব না। আমার হাতে আজ অনেক কাজ আছে।”