বিষয়বস্তুতে চলুন

অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/১০

উইকিসংকলন থেকে
◄  
১১  ►

১০

 কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ খানসামার পিছনে পিছনে নীচে নামিয়া আসিল। অক্টেভ আপনাকে বাড়ীর মালিক মনে করিলেও, বাড়ীর মধ্যে খাবার-ঘরটা কোথায়, সে জানিত না। খাবার-ঘরটা খুব বড়—একতালায় অবস্থিত। সেখান হইতে প্রাঙ্গণ দেখা যাইতেছে। দেয়ালে সুন্দর ঘর-কাটা-কাটা কাঠের কাজ। দেয়ালের গায়ে ঋতুর পয্যায়-অনুসারে প্রত্যেক ঋতু-সুলভ শিকার-লব্ধ হত জীব-জন্তুর দেহাবশেষের নিদর্শন সকল রক্ষিত হইয়াছে। ভোজন-শালার দুই প্রান্তে বড় বড় কাষ্ঠমঞ্চ, তাহার উপর লাবিন্‌স্কি-বংশের পুরাতন রূপার বাসনকোসন সাজান রহিয়াছে। দেয়ালের দুই ধারে সারি সারি সবুজ মরক্কো চর্ম্মে মণ্ডিত কেদারা। ঘরের মাঝখানে খোদাই-কাজ-করা পায়া-বিশিষ্ট খাবার-টেবিল। মাথার উপরে একটা বৃহৎ বেলোয়ারি ঝাড় ঝুলিতেছে।

 টেবিলের উপর, রুশীয় পরিবেশনের ধরণ-অনুসারে একটা নীল রজ্জুঘেরের মধ্যে নানাবিধ ফল পূর্ব্ব হইতেই স্থাপিত এবং মাংসাদি সমস্ত রান্না ঢাক্‌নি-ঢাকা বাসনের মধ্যে রক্ষিত হইয়াছে। পালিস-করা ধাতব ঢাকাগুলা ঝিক্‌মিক্‌ করিতেছে। টেবিলের মুখামুখী দুই আরাম-কেদারা; —তাহার পিছনে দুইজন খানসামা নিশ্চল ও নিস্তব্ধভাবে দণ্ডায়মান— ঠিক্‌ যেন সাক্ষাৎ গার্হস্থ্যের দুই পাষাণ-মূর্ত্তি।

 অক্টেভ ঘরের সমস্ত খুঁটিনাটি এক নজরে দেখিয়া লইল; পাছে এই সব অপরিচিত নূতন সামগ্রী দেখিয়া তাহার মুখে কখন অনিচ্ছাক্রমেও বিস্ময়ের ভাব প্রকাশ পায়। এমন সময় পাথরের মেঝের উপর হইতে একটা সর্ সর্ শব্দ,—রেশমি-কাপড়ের একটা খস্‌খস্‌ শব্দ উঠিল। অক্টেভ পিছন ফিরিয়া দেখিলেন,—কৌণ্টেস আসিতেছেন। অক্টেভ বসিলে পর, বন্ধুভাবে অভিবাদনস্বরূপ ছোট-খাটো ইঙ্গিত করিয়া, তিনিও বসিলেন। কৌণ্টেস একটা রেশমী পরিচ্ছদ পরিয়াছিলেন। কপালের দুই পাশে রাশীকৃত কেশগুচ্ছ, একটা বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া জরি-জড়ান বেণীর আকারে গ্রীবাদেশে লুটাইয়া পড়িয়াছে। তাঁহার মুখের স্বাভাবিক গোলাপী রং, গত রাত্রির মনের আবেগে ও নিদ্রার ব্যাঘাতে একটু ফ্যাঁকাশে হইয়া গিয়াছে, তাঁহার যে চোখ সচরাচর কেমন শান্ত ও নির্ম্মল —সেই চোখের চারিদিকে ঈষৎ কালিম রেখা পড়িয়াছে। তাঁহার মুখে একটা শ্রান্ত-ক্লান্ত অবসন্ন ঢুলু ঢুলু ভাব লক্ষিত হইতেছে। এইরূপ স্নান আকার ধারণ করায় তাঁর সৌন্দয্যচ্ছটা যেন আরও মর্ম্মভেদী হইয়াছিল; তাহাতে যেন একটু মানবী ভাব আসিয়াছিল; এখন যেন সামান্য রমণী হইয়া পড়িয়াছেন; স্বর্গের পরী পাখা গুটাইয়া উড্ডয়নে বিরত হইয়াছেন।

 অক্টেড এইবার একটু সাবধান হইয়াছে, সে তাহার চোখের আগুনকে ঢাকিয়া ও মনের উচ্ছ্বাসকে প্রচ্ছন্ন রাখিয়া একটা ঔদাসীন্যের ভাব ধারণ করিল। জ্বরের ঈষৎ কম্পনের ন্যায় স্কন্ধদেশ একটু নাড়াইয়া কৌণ্টেস তাঁহার স্বামীর উপর স্থিরদৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেন। এখন তিনি অক্টেভকে আপন স্বামী বলিয়াই মানিয়া লইয়াছেন। কেন না রাত্রে যে সর ভয়-ভাবনা, পূর্ব্বসূচনা, বিভীষিকা তাঁহার মনে জাগিয়া উঠিয়াছিল, দিবালোকে সে সব অন্তর্হিত হইয়াছে। কৌণ্টেস কোমল মধুর স্বরে সতী স্ত্রীর সমুচিত একটু ‘আদুরে-পনা’ করিয়া পোলাণ্ড দেশের ভাষায় অক্টেভকে কি একটা কথা বলিলেন!

 মন-খোলাখুলি মধুর ঘনিষ্ঠতার সময়, বিশেষতঃ ফরাসী ভৃত্যদের সন্নিধানে কৌণ্টেস অনেক সময় কৌণ্টের মাতৃভাষায় কৌণ্টের সহিত কথা কহিতেন। ফরাসী ভৃত্যেরা পোলোনী ভাষা জানিত না।

 প্যারিস নগরবাসী অক্টেভ, লাটিন ভাষা, স্পেনীয় ভাষা ও ইংরেজী ভাষার কতকগুলি শব্দ জানিত; কিন্তু ‘শ্লোভ’-জাতির ভাষা মোটেই জানিত না। পোলোনী ভাষায় স্বরবর্ণের বিরলতা ও ব্যঞ্জনবর্ণের প্রাচুর্য্য থাকায়, ইচ্ছা করিলেও তাহাতে দন্তস্ফুট করিতে পারিত না। ফ্লরেন্স নগরে কৌণ্টেস অক্টেভের সহিত বরাবর ফরাসী কিংবা ইটালীয় ভাষাতেই কথা কহিতেন।

 ঐ পোলীয় ভাষায় কথিত বাক্য, কৌণ্ট-দেহ অক্টেভের মস্তিষ্কের ভিতরে গিয়া এক অদ্ভুত কাণ্ড করিয়া বসিল:—প্যারিসবাসী ফরাসীর অপরিচিত ও অশ্রুতপূর্ব্ব ধ্বনিসমূহ ‘শ্লাভ’-জাতীয় কাণের মধ্য দিয়া মস্তিষ্কের এমন জায়গায় পৌঁছিল, যেখানে ওলাফের আত্মা উহা গ্রহণ করিয়া চিন্তার আকারে অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হইল, এবং একপ্রকার ভৌতিক ধরণে স্মৃতি জাগাইয়া তুলিল, ঐ সকল ধ্বনির অর্থ গোলমেলেভাবে অক্টেভের মাথায় আসিল; শব্দগুলা মস্তিষ্কের পাকচক্রের ভিতর দিয়া স্মৃতির গুপ্ত দেরাজের মধ্যে আসিয়া গুন্ গুন্ করিতে লাগিল— যেন উত্তর দিবার জন্য প্রস্তুত; কিন্তু সাক্ষাৎ আত্মার সহিত ঐ সকল অস্পষ্ট পূর্ব্বস্মৃতির যোগাযোগ না হওয়ায় উহা শীঘ্রই অন্তর্হিত হইল।

 আবার সমস্ত অস্বচ্ছ হইয়া পড়িল। প্রেমিক বেচারা ভয়ানক মুস্কিলে পড়িল। কৌণ্ট ওলাফ-লাবিন্‌স্কির শরীর গ্রহণ করিবার সময় অক্টেভ এই সব গোলযোগের কথা ভাবে নাই। এখন বুঝিতে পারিল, অন্যের শরীর ধারণ করায় অনেক বিপদ আছে।

 কৌণ্টেস অক্টেভের নীরবতায় বিস্মিত হইলেন। ভাবিলেন, আর কোন চিন্তায় মন বিক্ষিপ্ত হওয়ায়, হয় ত অক্টেভ তাঁর কথা শুনিতে পায় নাই; এই মনে করিয়া কৌণ্টেস সেই বাক্যটা আবার খুব ধীরে ধীরে ও উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন।

 ঐ শব্দগুলার ধ্বনি শুনিতে পাইলেও, অক্টেভ এখনো উহার অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিল না। উহার অর্থটা ধরিবার জন্য সে প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিল, কিন্তু পারিল না। কোন ফরাসী, ইটালীয় ভাষার কথা আন্দাজে কিছু কিছু বুঝিতেও পারে, কিন্তু নিরেট ধরণের পোলীয় ভাষার সম্বন্ধে সে একেবারেই বধির। —অনিচ্ছাসত্ত্বেও, তাহার গাল লাল হইয়া উঠিল, নিজের ওষ্ঠ দংশন করিতে লাগিল, এবং মুখ রক্ষার জন্য তাড়াতাড়ি ছুরি দিয়া প্রচণ্ডভাবে প্লেটের মাংসখণ্ড কাটিতে আরম্ভ করিল।

 কৌণ্টেস বলিলেন—(এইবার ফরাসী ভাষায়):— “ওগো! তুমি দেখ্ছি আমার কথা শুন্চ না, কিংবা কিছুই বুঝতে পার্‌চ না, হ’ল কি তোমার?..,”

 কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ কি বলিবে ঠিক্ করিতে না পারিয়া আম্ত‌আম্‌তা করিয়া বলিল:—এই লক্ষ্মীছাড়া ভাষাটা এমন শক্ত!

 —শক্ত! হাঁ, বিদেশীর কাছে শক্ত ঠক্‌তে পারে, কিন্তু ঐ ভাষা যাকে মায়ের কোলে আনন্দ দিয়েছে, প্রাণ-বায়ুর মত, প্রবাহের মত যার মুখ দিয়ে আজন্ম নিঃসৃত হয়েছে, তার পক্ষে এই ভাষা শক্ত নয়।

 — হাঁ, সে কথা সত্যি, কিন্তু এমন এক এক মুহূর্ত্ত আসে, যখন আমার মনে হয় ঐ ভাষা আমি কিছুই জানি না।

 —তুমি কি বল্‌চ ওলাফ? কি! তোমার পিতৃ-পিতামহের ভাষা, তোমার পবিত্র জন্ম-ভূমির ভাষা, যে ভাষায় তোমরা স্বজাতীয় ভাইদের চিন্‌তে পার, যে ভাষায় সর্ব্বপ্রথমে আমাকে বলেছিলে—“আমি তোমায় ভালবাসি,” সেই ভাষা তুমি ভুলে যাবে, এ কি সম্ভব?

 কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ আর কোন সঙ্গত উত্তর খুঁজিয়া না পাইয়া বলিল,—“আর এক ভাষা ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়ায়”...

 এবার ভুর্ৎসনার স্বরে কৌণ্টেস বলিলেন—“ওলাফ, আমি দেখ্ছি প্যারিস্ তোমাকে বিগ্ড়ে দিয়েছে; সেই জন্যেই তখন প্যারিসে আস্‌তে আমার ইচ্ছে ছিল না। তখন কে জান্‌ত, যে মহামহিম কৌণ্ট লাবিন্‌স্কি যখন স্বরাজ্যে ফিরে যাবেন, তখন তাঁর প্রজাদের অভিনন্দনে তিনি নিজ ভাষায় উত্তর দিতে পারবেন না,”

 কৌণ্টেসের সুন্দর মুখখানি একটু বিষন্ন ভাব ধারণ করিল। দেবীপ্রতিম নির্ম্মল ললাটে এই সর্ব্বপ্রথম একটা দুঃখের ছায়া পড়িল। এই অদ্ভুত বিস্তৃতি, তাঁহার আত্মার মর্ম্মস্থল স্পর্শ করিল; ইহাকে তিনি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা বলিয়া মনে করিলেন।

 আহারের অবশিষ্ট সময়টা নিস্তব্ধভাবে অতিবাহিত হইল; কৌণ্টেস, থাকে কৌণ্ট মনে করিয়াছিলেন, সেই অক্টেভের উপর অভিমান করিলেন। অক্টেভের মনে এখন একটা বিষম যন্ত্রণা হইতেছিল; তার ভয় হইতেছিল, পাছে তার উত্তর দিতে না পারে।

কৌণ্টেস গাত্রোত্থান করিয়া আপন মহলে চলিয়া গেলেন।

 অক্টেভ এখন এ্ক্‌লা,—একটা ছুরির বাঁট লইয়া ক্রীড়াচ্ছলে নাড়াচাড়া করিতেছিল; এক-একবার ইচ্ছা হইতেছিল, ঐ ছু্রি নিজের বুকে বসাইয়া দেয়;—তার অবস্থাটা এতই অসহ্য হ‍ইয়া উঠিয়াছিল। সে মনে করিয়াছিল, হঠাৎ এক নূতন জীবন-ক্ষেত্রে সে প্রবেশ করিবে; কিন্তু এখন দেখিল, এই অজ্ঞাত জীবনের অন্ধিসন্ধি তার জানা নাই; কৌণ্ট ওলাফের শরীর ধারণ করিতে গেলে, পূর্ব্ববর্ত্তী সমস্ত ধারণা ও সংস্কার, নিজের ভাষা, শৈশবের সমস্ত স্মৃতি, মানুষের ‘আমি’ জিনিসটা যেসকল অসংখ্য খুঁটিনাটি দিয়া গঠিত, নিজের অস্তিত্ব যাহা অন্যান্য অস্তিত্বের সহিত বিশেষ সম্বন্ধ-সূত্রে আবদ্ধ—এই সমস্ত বিসর্জ্জন করা আবশ্যক; এবং এই সমস্তের জন্য ডাক্তার বালথাজার শেরবোনোর বুজ্রুগি যথেষ্ট নহে। এ কি বিড়ম্বনা! এই স্বর্গের ভিতর প্রবেশ করিলাম, অথচ উহার দ্বারদেশ দূর হইতেও দেখা আমার পক্ষে এক প্রকার ধৃষ্টতা! কৌণ্টেসের সহিত এক গৃহে বাস করিব, তাঁহাকে দেখিব, তাঁহার সহিত কথা কহিব, অথচ তাঁর সতীত্বের লজ্জা ভাঙ্গিতে পারিব না, এবং প্রতি মুহূর্ত্তে এক-একটা মুঢ়তার কাজ করিয়া নিজমূর্ত্তি প্রকাশ করিয়া ফেলিব! কৌণ্টেস আমাকে কখনই ভালবাসিবে না—ইহা আমার অখণ্ডনীয় অদৃষ্টের লিপি! তথাপি মানবগর্ব্বকে ধূলায় লুণ্ঠিত করিয়া আমি যার-পর-নাই ত্যাগ-স্বীকার করিয়াছি। আমি নিজের ‘আমি’কে বিসর্জ্জন দিয়া, অপরের শরীর ধারণ করিয়া অন্যের প্রাপ্য আদর-যত্ন দাবী করিতে সম্মত হইয়াছি।”

 অক্টেভের মনে-মনে এইরূপ স্বগতোক্তি চলিতেছিল। এমন সময় একজন সহিস্ আসিয়া মাথা নোয়াইয়া গভীর ভক্তিসহকারে জিজ্ঞাসা করিল:—“আজ কোন্ ঘোড়াটা হুজুরকে এনে দেখাব?” প্রভু উত্তর করিতেছেন না দেখিয়া, পাছে ধৃষ্টতা প্রকাশ পায়, ভয়ে—ভয়ে—অতি মৃদুস্বরে গুজ্গুজ্ করিয়া সহিস্ আবার বলিল—‘ভুল্‌টুর’কে আন্‌ব না ‘রোস্তম’কে আন্‌ব? আট দিন ওদের সোয়ারি হয় নি,”

 এইবার অক্টেভ উত্তর করিলেন—‘রোস্তম’কে।

 অক্টেভ, স্নায়ুর উত্তেজনা মুক্ত-বায়ু সেবনে প্রশমিত করিবার জন্য ঘোড়ায় চড়িয়া বোয়া-দে-বুলং-এ বেড়াইতে গেলেন।

 রোস্তম উচ্চকুলোদ্ভব প্রকাণ্ড ঝাঁকালে ঘোড়া; তাকে কাঁটার আঘাতে উত্তেজিত করিবার কোন আবশ্যকতা ছিল না। সে সোয়ারের মনোভাব বুঝিতে পারিয়া বাড়ী হইতে বাহির হইবামাত্র তীরের মত ছুটিল। দুই ঘণ্টা প্রচণ্ড বেগে ছুটাছুটি করিয়া, অশ্ব ও অশ্বারোহী প্রাসাদে ফিরিয়া আসিল। বেড়াইয়া আসিয়া অক্টেভের মস্তিষ্ক একটু ঠাণ্ডা হইল। ঘোড়ার নাসাদেশ রক্তিম হইয়াছে ও গাত্র হইতে বাষ্পধ্ম ঊথিত হইতেছে।

 তথা-কথিত কৌণ্ট কৌণ্টেসের গৃহে প্রবেশ করিয়া দেখিল, কৌণ্টেস তাঁর বৈঠকখানায় আছেন। একটা সাদা রেশমের পরিচ্ছদ পরিধান করিয়াছেন। আজ কিনা বৃহস্পতিবার; তাই আজ অভ্যাগত লোকদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য গৃহেই আছেন।

 একটু মধুর হাসি হাসিয়া—(অমন সুন্দর ওষ্ঠাধরে অভিমানের ভাব বেশীক্ষণ থাকিতে পারে না) কৌণ্টেস বলিলেনঃ— “বোয়ার উপবন-পথে চুটাছুটি করে তোমার স্মৃতি কি আবার ফিরে পেলে?”

 অক্টেভ উত্তর করিল—“না, লাবিন্‌স্কি: একটা গোপনীয় কথা তোমার কাছে প্রকাশ করা আবশ্যক।”

 —“আমি তোমার গোপনীয় মনের কথা পূর্ব্ব হতেই কি সব জানিনে? আমাদের মধ্যে এখনো কি কিছু ঢাকাঢাকি আছে?”

 —“যে ডাক্তারের কথা লোকের মুখে এত শোনা যায়, কাল আমি সেই ডাক্তারের বাড়ী গিয়েছিলাম।”

 —“হাঁ, সেই ডাক্তার বাল্থাজার শেরবোনে, যে অনেকদিন ভারতবর্ষে ছিল। সে নাকি ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে খুব আশ্চর্য্য গুপ্তবিদ্যা শিখে এসেছে। তুমি তাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে আস্‌তেও চেয়েছিলে। কিন্তু ও বিষয়ে আমার কোন কৌতূহল নেই; কেন না আমি বেশ জানি, তুমি আমাকে ভালবাস। এই বিজ্ঞানই আমার পক্ষে যথেষ্ট।”

 —“তিনি আমার সামনে যে সব ব্যাপার পরীক্ষা প্রয়োগ করে’ দেখিয়েছিলেন, আশ্চর্য্য কাণ্ড করেছিলেন, তাতে আমার মন এখনো বিচলিত হয়ে আছে। এই অদ্ভুত ডাক্তার কি একটা অনিবার্য্য শক্তি প্রয়োগ করে’ এমন এক গভীর চৌম্বক-নিদ্রায় আমাকে নিমজ্জিত কর্‌লেন যে, যখন আমি জেগে উঠলাম, তখন দেখি আমার সমস্ত মনোবৃত্তি লোপ পেয়েছে। অনেক জিনিসের স্মৃতি আমার নষ্ট হয়েছে। আমার অতীতটা যেন একটা গোলমেলে কোয়াসার ভিতর ভাস্চে। কেবল, তোমার উপর আমার যে ভালবাসা—সেইটিই অক্ষুণ্ণ রয়েছে।”

 —“ওলাফ! তোমার ভারী ভুল হয়েছিল,—ঐ ডাক্তারের হাতের মধ্যে কি যেতে আছে? ঈশ্বর, যিনি আত্মাকে সৃষ্টি করেছেন, আত্মাকে স্পর্শ করবার অধিকার একমাত্র তাঁরই আছে। মানুষের এইরকম চেষ্টা করা মহাপাপ; আশা করি, তুমি আর কখনও সেখানে যাবে না। আর, যখন আমি পোলীয় ভাষায় কোন ভালবাসার কথা বল্‌ব, তখন আশা করি, তুমি আবার পূর্ব্বেকার মত তা বুঝতে পারবে,”

 অক্টেভ যখন ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়াইতেছিল, তখনই সে এই মৎলব আঁটিয়াছিল যে, ডাক্তারের চৌম্বক-শক্তির দোহাই দিয়া তাহার এই সমস্ত ভ্রম-প্রমাদ-জনিত বিপদ হইতে সে আপনাকে উদ্ধার করিবে। কিন্তু এই খানেই বিপদের শেষ হইল না।—একজন ভৃত্য, দ্বার উদ্ঘাটন করিয়া খবর দিল:—

 “সাভিলের সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ অক্টেভ।”

 কোন-না-কোন দিন এইরূপ সাক্ষাৎকার ঘটিবে মনে মনে জানিলেও, ঐ সাদাসিধা শব্দগুলি শুনিবামাত্র প্রকৃত অক্টেভের মুখ পাণ্ডুবর্ণ হইয়া গেল; মনে হইল তাহার কাণের কাছে, হঠাৎ যেন “অন্তিম-বিচারের” তূরী-নিনাদ হইল। সাহসের উপর খুব ভর করিয়া, মনে মনে ভাবিল, এখনো এমন অবস্থা দাঁড়ায় নাই, যাহাতে আপনাকে একেবারে নিরুপায় বলিয়া মনে হইতে পারে। অতর্কিতভাবে অক্টেভ একটা কৌচের পৃষ্ঠদেশ ধরিয়া ফেলিল, এবং তাহার উপর ভর দিয়া দাঁড়াইয়া বাহ্যতঃ মুখে একটা শান্ত ও দৃঢ়তার ভাব রক্ষা করিতে সমর্থ হইল।

 অক্টেভ-দেহধারী প্রকৃত কৌণ্ট ওলাফ্‌ কৌণ্টেসের দিকে অগ্রসর হ‍ইয়া তাঁহাকে খুব নত হইয়া অভিবাদন করিল।

 অক্টেভ-দেহ কৌণ্ট ও কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ ইহাঁদের পরস্পরের মধ্যে পরিচয় করিয়া দিয়া, কৌণ্টেস বলিলেন;—

 “ইনি নাবিন্‌স্কির কৌণ্ট—ইনি সাভিলের অক্টেভ—।”

 এই দুই ব্যক্তি পরস্পরকে ঠাণ্ডা ভাবে অভিবাদন করিয়া লৌকিক ভদ্রতার মুখসের ভিতর হইতে পরস্পরের প্রতি একটা চোরা কটাক্ষ হানিল।

 চির-পরিচিত বন্ধুর ভাবে কোণ্টেস বলিলেন:—

 “দেখ অক্টেভ, আমি যখন ফ্লরেন্সে ছিলাম, তখন হতেই আমার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব। তোমার সেই বন্ধুত্বের বন্ধন এখনো পর্য্যন্ত একটুও শিথিল হয় নি। তুমি আমার সেই বাগান—বাড়ীতে তখন নিত্য যাতায়াত করতে। তুমি আপনাকে আমার বন্ধুবর্গের একজন বলে’ মনে করতে”

 অলীক অক্টেভ ও প্রকৃত কৌণ্ট একটু বাধর—বাধো স্বরে উত্তর করিলেন:—

 —“দেখুন, কৌণ্টেস, আমি অনেক ভ্রমণ করেছি, অনেক কষ্ট সহ্য করেছি, এমন কি পীড়িতও হয়েছিলাম— আপনার সদয় নিমন্ত্রণ-পত্র পেয়ে মনে করলাম, এই সুযোগ ছাড়ব কি না। কিন্তু আমার একটু আশঙ্কাও হ’ল, পাছে স্বার্থপর বলে আমার মত উদাসচিত্ত ব্যক্তি আপনার নিকট গিয়ে আপনার অনুগ্রহের অপব্যবহার করে।”

 কৌণ্টেস উত্তর করিলেন:—

 —“উদাসচিত্ত? হ’তে পারে। না, না, উদাসচিত্ত নয়। তুমি তখন বিষাদ-রোগগ্রস্ত ছিলে। কিন্তু তোমাদের একজন কবি এই কথা বলেন নি কি?:—

 “আলস্যের পরে ইহাই সব-চেয়ে মারাত্মক ব্যাধি।”

 অক্টেভ-দেহধারী কৌণ্ট বলিলেন:—

 “অন্যের দুঃখকষ্টে পাছে মমতা করতে হয় এইজন্যই সুখী লোকেরা এই গুজব রটিয়েছে।”

 কৌণ্টেস অনিচ্ছাক্রমে তার মনে যে প্রেমের উদ্রেক করিয়াছিলেন, তজ্জন্য যেন ক্ষমা চাহিতেছেন—এইভাবে কৌণ্টেস অক্টেভ-দেহধারী কৌণ্টের উপর একটি অতীব মধুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন। তারপর বলিলেন:—

 “তুমি যে রকম মনে কর, আমি ততটা মমতা-শূন্য লঘুচিত্ত নই। প্রকৃত দুঃখ দেখলে আমার দয়া হয়, আর সে দুঃখকষ্টের লাঘব না কর্‌তে পার্‌লেও অন্তত তার জন্য সমবেদনা দেখাতে পারি। দেখ অক্টেভ, তুমি সুখী হও—এই ইচ্ছা আমি করতে পারতাম; কিন্তু কেন বল দেখি, তুমি নিজের বিষণ্ণতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে একগুঁয়ের মত জীবনের সমস্ত সুখ, জীবনের সমস্ত মাধুর্য্য, জীবনের সমস্ত কর্ত্তব্য বিসর্জ্জন দিলে ও আমার বন্ধুত্বই বা কেন তুমি প্রত্যাখ্যান করলে?”

 এই সাদাসিধা সরল-ভাবের কথাগুলি দুই শ্রোতা বিভিন্নভাবে গ্রহণ করিল।

 —অক্টেভ বুঝিল,—বাগান—বাড়ীতে কৌণ্টেস তার উপর যে দণ্ডাজ্ঞা জারী করিয়াছিলেন, ইহা তাহারই দৃঢ় সমর্থন মাত্র। কেন না, ঐ সুন্দর ওঠাধর মিথ্যাবাদে কখনও কলুষিত হয় নাই।

 এ দিকে কৌণ্ট ওলাফ ঐ কথাগুলির মধ্যে কৌণ্টেসের অপরিবর্ত্তনীয় সতীত্বের আর একটা প্রমাণ পাইলেন। ভাবিলেন, কোন সয়তানি চক্রান্ত ব্যতীত, সে সতীত্বের কখনই পতন হইতে পারে না। এই কথা মনে হইবামাত্র তিনি ক্রোধে উন্মত্ত হইলেন। আর এক আত্মার দ্বারা অধিকৃত নিজের মূর্ত্তিকে দেখিয়া এবং সেই অলীক ব্যক্তি নিজের বাড়ীতে অধিষ্ঠিত হইয়াছে দেখিয়া, তিনি ছুটিয়া গিয়া ঐ অলীক কৌণ্টের টুটি চাপিয়া ধরিলেন।

 “চোর, ডাকাত, পাজি,—ফিরে দে আমার শরীর!”

 এই আশ্চর্য্য কাণ্ড দেখিয়া কৌণ্টেস ঘণ্টা বাজাইয়া দিলেন; কতকগুলি ভৃত্য ছুটিয়া আসিয়া কৌণ্টকে ধরিয়া লইয়া গেল।

 কৌণ্টেস বলিলেন:—

 “অক্টেভ বেচারা পাগল হয়ে গেছে!”

 প্রকৃত অক্টেভ উত্তর করিল:—

 “হাঁ, প্রেমে পাগল! কৌণ্টেস, তোমার রূপলাবণ্য নিশ্চয়‍ই অসাধারণ!”