অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/১২
১২
যাত্রাকালে, অক্টেভ ডাক্তারকে বলিল:—
“দেখুন, ডাক্তার মশায়, আমি আর একবার আপনার বৈজ্ঞানিক শক্তির পরীক্ষা করতে চাই; আমাদের দুজনের আত্মা আবার আমাদের নিজের নিজের শরীরে আপনাকে প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে। এ কাজটা করা আপনার পক্ষে শক্ত হবে না; আশা করি, কৌণ্ট লাবিন্স্কি তাঁর প্রাসাদের বদলে এই দীনের কুটীরে থাকতে চাবেন না; আর, তাঁর বহুগুণালঙ্কৃত আত্মা আমার এই সামান্য দেহের মধ্যে বাস করতেও রাজি হবে না। তা’ ছাড়া আপনার যেরূপ শক্তি, তাতে আপনার কোন প্রকার প্রতিশোধের ভয় নেই।”
এই কথায় সায় দিবার ভাবে একটা ইঙ্গিত করিয়া ডাক্তার বলিলেন, “এইবার প্রক্রিয়াটা গতবারের চেয়ে আরো সহজ হবে। যে সব অদৃশ্য সূত্রে আত্মা শরীরের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে, সেগুলি তোমার মধ্যে ছিন্ন হয়ে গেছে; আবার যুড়ে যেতে এখনো সময় পায়নি। আর, সম্মোহনের পাত্র সম্মোহনকারীর চেষ্টাকে স্বতই যেরূপ প্রতিরোধ করে, তোমার ইচ্ছাশক্তি সেরূপ বাধা দিতে পারবে না। আমার মত বুড়ো বৈজ্ঞানিক যে এইরূপ পরীক্ষার প্রলোভন ত্যাগ করতে পারে নি, তজ্জন্য কৌণ্ট মহাশয় আমাকে মার্জ্জনা করবেন—কারণ এইরূপ পরীক্ষার পাত্র খুব কমই জোটে, তা’ছাড়া এইরূপ পরীক্ষা করতে করতে মনের এমন একটা সূক্ষ্ম অবস্থা হয় যে, তখন সেই পরীক্ষাকারী ভবিষ্যৎ ঘটনা বল্তে পারে; যেখানে আর সবাই হার মানে, সে সেখানে জয়লাভ করে। আপনি এই ক্ষণিক রূপান্তরের ব্যাপারকে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন বলে ভাবতে পারেন: আর কিছুকাল পরে, এই অননুভূতপূর্ব্ব অনুভূতি আপনার হয়েছিল বলে আপনি বোধ হয় দুঃখিত হবেন না; কেন না, দুই শরীরে বাস করবার অনুভূতি খুব কম লোকেরই হয়েছে।দেহান্তরগ্রহণ একটা নূতন মতবাদ নয়। কিন্তু দেহান্তর গ্রহণের পূর্ব্বে আত্মাদের বিস্মৃতি-মোহ-মদিরা পান করতে হয়। তবে, ট্রয়ের যুদ্ধে ছিলেন বলে পিথাগোরাসের স্মরণ ছিল,—কিন্তু সেরূপ জাতিস্মর সবাই হতে পারে না”
কৌণ্ট ভদ্রভাবে উত্তর করিলেন, “আমার ব্যক্তিত্ব আবার ফিরে পেলে আমার যে লাভ হবে, তা’তে অধিকারচ্যুত হওয়া প্রভৃতি সমস্ত অসুবিধারই ক্ষতিপূরণ হবে। অক্টেভ মহাশয় কিছু যেন মনে না করেন, আমি কোন কুমৎলবে এ কথাটা বলচি নে। আমিই ত এখন অক্টেভ,—একটু পরে আর আমি অক্টেভ থাকব না!”
এই কথায়, কৌণ্ট লাবিন্স্কির ওষ্ঠাধরে অক্টেভের হাসির রেখা দেখ দিল; কেননা এই,বাক্যটা এক ভিন্ন দেহরূপ আবরণের মধ্য দিয়া, অক্টেভের নিকটে আসিয়া পৌঁছিল। এখন এই তিনজনের মধ্যে একটা নিস্তব্ধতা প্রতিষ্ঠিত হইল। এই অসাধারণ অস্বাভাবিক অবস্থার দরুণ পরস্পরের মধ্যে কথাবার্ত্তা চলা কঠিন হইযা উঠিল।
বেচারা অক্টেভের সমস্ত আশা অন্তর্হিত হইয়াছে, সুতরাং তার মন যে গোলাপ ফুলটির মত উৎফুল্ল নয়, এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে। প্রত্যাখ্যাত সমস্ত প্রেমিকের হ্যায়, সে মনে মনে এখনো ভাবিতেছিল, কৌণ্টেসের ভালবাসা সে কেন পাইল না—যেন ভালবাসার কোন ‘কেন’ আছে! যাই হোক, সে বুঝিল সে পরাভূত হইয়াছে। ডাক্তার শেরবোনো ক্ষণেকের জন্য তার জীবনের কল-কাঠিটা ঠিক্ঠাক কবিয়া বসাইয়া দিয়াছিলেন, কিন্তু ভূতলে নিক্ষিপ্ত হাত—ঘড়ির ন্যায় আবার তাহা ভাঙ্গিয়া চূরমার হইয়া গেল। আত্মহত্যা করিয়া তার মার মনে কষ্ট দিতে তার ইচ্ছা ছিল না; সে মনে করিয়াছিল, কোন একটা বিজন স্থানে গিয়া নিস্তব্ধভাবে তার দুঃখানল নির্ব্বাপিত করিবে এবং এই অজ্ঞাত দুঃখের একটা বৈজ্ঞানিক নাম দিয়া লোকের নিকট একটা রোগ বলিয়া প্রচার করিবে। অক্টেভ যদি চিত্রকর হইত, কবি হইত কিংবা সঙ্গীতগুণী হইত, তাহা হইলে তার দুঃখকষ্ট তার একটা উৎকৃষ্ট রচনার মধ্যে জমাট করিয়া রাখিতে পারিত; তাহা হইলে প্রাস্কোভি ধবলবাসে সজ্জিত ও তারকা-মুকুট ভূষিত হইয়া, দান্তের বেয়াত্রিসের হ্যায়, ভাস্বরদেহ এঞ্জেলের মত তাহার কবিত্ব-উচ্ছ্বাসের উপর উড়িয়া উড়িয়া বেড়াইতেন। কিন্তু আমরা এই ইতিহাসের গোড়াতেই বলিয়াছি, সুশিক্ষিত ও বিশিষ্ট লোক হইলেও অক্টেভ সেই সব শ্রেষ্ঠ বাছা-লোকের অন্তর্ভূত ছিল না, যাঁহারা ধরাতলে তাঁহাদের পদচিহ্ন রাখিয়া যান। অক্টেভের একনিষ্ঠ দীন আত্মা ভালবাসা ছাড়া ও ভালবেসে মরা ছাড়া আর কিছুই জানিত না!
গাড়ী ডাক্তারের গৃহাঙ্গনে প্রবেশ করিল। পাথরে—বাঁধা অঙ্গনে সবুজ ঘাস বসানো; সাক্ষাৎকার প্রার্থী লোকদিগের অবিরাম পদবিক্ষেপে সেই ঘাসের উপর দিয়া একটা রাস্তা হইয়া গিয়াছে এবং অঙ্গনের ধূসরবর্ণ উচ্চ প্রাচীরের বিপুল ছায়ায় ভূতল পরিপ্লাবিত হইয়াছে। পণ্ডিতের ধ্যান-প্রবাহে বাধা না হয় এইজন্য অদৃশ্য প্রস্তর-মূর্ত্তির ন্যায় নিস্তব্ধতা ও নিশ্চলতা প্রহরীরূপে দ্বারদেশ আগ্লাইয়া রহিয়াছে।
অক্টেভ ও কৌণ্ট গাড়ী হইতে নামিলেন; ডাক্তার টপ্ করিয়া পা-দানির উপর পা দিয়া সহিসের হস্তাবলম্বন না করিয়াই নামিয়া পড়িলেন—এরূপ ক্ষিপ্রতা তাঁহার বয়সে কেহ প্রত্যাশা করে নাই।
তাঁরা গৃহে প্রবেশ করিবামাত্র দ্বার রুদ্ধ হইল। ওলাফ ও অক্টেভের অনুভব হইল, যেন হঠাৎ একটা গরম বাতাসের আবরণে তাঁরা আবৃত হইয়াছেন। এই গরম বাতাসে ডাক্তারের ভারতবর্ষ মনে পড়িল; এবং তিনি বেশ সহজে ও আরামে নিশ্বাস গ্রহণ করিতে লাগিলেন। ডাক্তারের ন্যায় কৌণ্ট ও অক্টেভ ত ত্রিশ বৎসর ধরিয়া গ্রীষ্মমণ্ডলের প্রচণ্ড সূর্য্যের উত্তাপে অভ্যস্ত হন নাই, সুতরাং তাঁদের প্রায় শ্বাসরোধ হইবার উপক্রম হইল। বিষ্ণুর অবতারেরা স্বীয় ফ্রেমের মধ্যে দত্তবিকাশ করিয়া হাসিতেছেন, নীলকণ্ঠ শিব তাঁর পাদ-বেদিকার উপরে দণ্ডায়মান হইয়া অট্টহাস্য করিতেছেন। কালী তাঁর শোণিতাক্ত রসনা বাহির করিয়া আছেন। নূমুণ্ডমালার আন্দোলনে যেন ঠকাঠক্ শব্দ শুনা যাইতেছে। ডাক্তারের এই আবাস-গৃহ একটা রহস্যময় ঐন্দ্রজালিক ভাব ধারণ করিয়াছিল। প্রথম রূপান্তর-প্রক্রিয়া যে ঘরে হইয়াছিল, ডাক্তার শেরবোনো সেই ঘরে সম্মোহন-পাত্রদ্বয়কে লইয়া গেলেন। তিনি তাড়িৎযন্ত্রের কাচের চাক্তিটা ঘুরাইলেন, সম্মোহন-বাল্তির লোহার হাতল নাড়িলেন; গরম বাভাসের মুখ খুলিয়া দিলেন, তাহাতে ঘরের উত্তাপ শীঘ্রই বাড়িয়া গেল। ভৃর্জ্জপত্রে লেখা দুই তিনটা মন্ত্র পাঠ করিলেন; এবং কিয়ৎক্ষণ পরে, কৌণ্ট ও অক্টেভকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন:—
“এখন আমি তোমাদের কাজের জন্য প্রস্তুত। কি বল, আরম্ভ করব কি?” ডাক্তার যখন এই কথা বলিতেছিলেন, কৌণ্ট উৎকণ্ঠিত হইয়া এইরূপ ভাবিতেছিলেন:—
“আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ব, এই বুড়া যাদুকর না জানি আমার আত্মাকে নিয়ে কি করবে। বানর-মুখো এই ডাক্তারটা সাক্ষাৎ শয়তান হতে পারে না কি? আমার আত্মাকে আমার শরীরে ফিরিয়ে দেবে,—না, ওর সঙ্গে আমাকে নরকে নিয়ে যাবে? আমার ব্যক্তিত্ব ফিরিয়ে দেওয়া——এটাও একটা নূতন ফাঁদ নয় ত? কি ওর উদ্দেশ্য জানি না, কিন্তু কোন বুজরুগি করবার জন্য এই সব শয়তানি আয়োজন হচ্চে না ত? যাই হোক, আমার এখন যে অবস্থা তার চেয়ে আর কি খারাপ হতে পারে? অক্টেভ আমার শরীর অধিকার করে আছে; আর সে আজ সকাল বেলায় ঠিক্ কথাই ত বলেছিল যে, আমার বর্ত্তমান শরীরে থেকে যদি আমি আমার কৌণ্ট নামের দাবি করি, তা’হলে লোকে আমাকে পাগল ঠাওরাবে। যদি আমাকে একেবারে সরিয়ে ফেলবার তার ইচ্ছা থাক্ত, তা’হলে আমার বুকে তার অসি বিঁধিয়ে দিলেই ত হ’ত। আমি নিরস্ত্র ছিলাম, আমার মরণ বাঁচন তারই হাতে ছিল। কোন রকম অন্যায় আচরণও হয় নি! দ্বন্দ্বযুদ্ধের পদ্ধতি ঠিক রক্ষিত হয়েছিল, সবই দস্তুর মত হয়েছিল। যাক্! এখন প্রাস্কোভির কথাই ভাবা যাক্, ছেলেমানুষের মত মিছে কেন ভর কর্চি? তার ভালবাসা ফিরে পাবার এই একমাত্র উপায়; এই উপায়টা একবার পরোখ করে দেখ্তে হবে।
ডাক্তার শেরবোনো এখন সেই লোহার হাতলটা দুইজনকে ধরিতে বলিলেন, কৌণ্ট ও অক্টেভ দুজনেই হাতলটা ধরিল। চৌম্বক তরল-পদার্থে ঐ হাতলটা পূর্ণমাত্রায় ভরা ছিল,—ধরিবামাত্র দুজনেই অচেতন হইয়া পড়িল—দেখিলে মনে হয় যেন উহাদের মৃত্যু হইয়াছে। ডাক্তার হাতের ‘ঝাড়া’ দিতে লাগিলেন, নির্দিষ্ট ক্রিয়াকলাপের অনুষ্ঠান করিলেন, প্রথম বারের মত মন্ত্র উচ্চারণ করিলেন; উচ্চারণ করিয়াই তাঁর সেই পিট্পিটে জ্বলজ্বলে চোখের দৃষ্টি দুইজনের উপর নিক্ষেপ করিলেন; তারপর ডাক্তার, কৌণ্ট ওলাফের আত্মাকে আবার তার নিজ আবাস দেহে লইয়া গেলেন; এই সময় ওলাফ, সম্মোহনকারীর অঙ্গভঙ্গিগুলা খুব আগ্রহের সহিত আড়চোখে দেখিতেছিলেন।
এদিকে, অক্টেভের আত্মা আস্তে আস্তে ওলাফের শরীর হইতে দূরে চলিয়া গেল; এবং নিজের শরীরে ফিরিয়া না গিয়া, মুক্তির আনন্দে উর্দ্ধে উঠিতে লাগিল; মনে হইল যেন তার আত্মা শরীর-পিঞ্জরে আর বদ্ধ হইতে চাহে না। এই আত্মা-পাখীটি ডানা নাড়িতেছে আর ভাবিতেছে—আবার তাহার পুরাতন দুঃখের আবাসে ফিরিয়া যাওয়া বাঞ্ছনীয় কি না—এইরূপ ইতস্ততঃ করিতে করিতে ক্রমাগত উদ্ধে উঠিতে লাগিল। শেরবোনো এই স্থলে কিংকর্ত্তব্য স্মরণ করিয়া, সেই সর্ব্ববিজয়ী দুর্নিবার মহামন্ত্র উচ্চারণ করিয়া, ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগপূর্ব্বক একটা বৈদ্যুতিক ‘ঝাড়া’ দিলেন; আত্মারূপ সেই কম্পমান ক্ষুদ্র আলোকটি ইতিপূর্ব্বেই আকর্ষণ মণ্ডলের বাহিরে গিয়া, জানলা-শার্শির স্বচ্ছ কাচের মধ্য দিয়া অন্তর্হিত হইয়াছিল।
ডাক্তার, বাহুল্য মনে করিয়া অন্য চেষ্টা হইতে বিরত হইলেন এব কৌণ্টকে নিদ্রা হইতে জাগাইয়া তুলিলেন। কৌণ্ট একটা আয়নায় নিজের পূর্ব্বমুখশ্রী দেখিতে পাইয়া একটা আনন্দধ্বনি করিয়া উঠিলেন। তাহার পর ডাক্তারের হস্তমর্দ্দন করিয়া, অক্টেভের দেহাবরণ হইতে বিমুক্ত হইয়াছেন কি না- এই বিষয়ে নিঃসংশয় হইবার জন্য কৌণ্ট অক্টেভের নিশ্চল দেহের উপর একটা কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া ছুটিয়া বাহির হইয়া পড়িলেন।
কিয়ৎ মুহূর্ত্ত পরে, থিলান-মণ্ডলের নীচে গাড়ীর একটা চাপা ঘর্ঘর শব্দ শুনা গেল; এখন ডাক্তার শেরবোনো একাকী অক্টেভের মৃতদেহের সম্মুখে। কৌণ্ট প্রস্থান করিলে, এলিফ্যাণ্টা-ব্রাহ্মণের শিষ্য শেরবোনো বলিয়া উঠিলেন, “রাম বল! এ যে এক মুস্কিলের ব্যাপার; আমি খাঁচার দরজা খুলে দিয়েছি, পাখী উড়ে গেছে; এর মধ্যেই পৃথিবীর আকর্ষণ-মণ্ডলের বাহিরে এত দূরে চলে গেছে যে, এখন সন্ন্যাসী ব্রহ্মলোগমও তাকে ধরতে পারবে না। আমি একটা মৃত শরীর কোলে নিয়ে বসে আছি। আমি খুব একটা কড়া দ্রাবক-রসে ডুবিয়ে শরীর টাকে গলিয়ে দিতে পারি কিংবা ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে প্রাচীন মিসরের মমির মত আরকে জারিয়ে রাখ্তে পারি; কিন্তু তা’হলে খোঁজ হবে, খানাতল্লাসি হবে, আমার বাক্স সিন্দুক খোলা হবে, আর কত কি বিরক্তিকর প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞাসা করবে।” এইখানে ডাক্তারের মাথায় বেশ একটা মৎলব আসিয়া জুটিল; অমনি তিনি একটা কলম লইয়া তাড়াতাড়ি এক-তক্তা কাগজের উপর কয়েক ছত্র লিখিয়া ফেলিলেন। তাতে এই কথাগুলি ছিল:—
“আমার কোন আত্মীয় না থাকায়, কোন উত্তরাধিকারী না থাকায়, আমার সমস্ত সম্পত্তি আমি সার্ভিলের অক্টেভকে দিয়া যাইতেছি; আমি তা’কে বিশেষরূপে স্নেহ করি। নিম্নলিখিত টাকা শোধ করিয়া যাহা থাকিবে সমস্তই তাহার প্রাপ্য:—এক লক্ষ টাকা সিংহলের ব্রাহ্মণ—হাসপাতালে, শ্রান্ত বা পীড়িত বৃদ্ধ জীবজন্তুদের আতুরাশ্রমে দিলাম। আমার ভারতীয় ভৃত্যকে ও আমার ইংরেজ ভৃত্যকে বারো হাজার টাকা দিলাম। আর এক কথা, মনুর মানব ধর্ম্মের পুঁথিটা মাজারীণ পুস্তকালয়ে যেন ফেরৎ দেওয়া হয়।”
একজন জীবিত ব্যক্তি মৃতব্যক্তিকে উইলসূত্রে দানপত্র লিখিয়া দিতেছে, আমাদের এই বিস্ময়জনক অথচ বাস্তব ইতিহাসের মধ্যে ইহাও একটা কম অদ্ভুত ব্যাপার নহে; কিন্তু এই অদ্ভুত ব্যাপারের রহস্য এখনি উদ্ভাসিত হইবে।
অক্টেভের পরিত্যক্ত দেহে প্রাণের উত্তাপ এখনো ছিল। ডাক্তার অক্টেভের এই দেহ স্পর্শ করিলেন—স্পর্শ করিয়া অতীব ঘৃণার সহিত আয়নায় আপনার মুখ দেখিলেন; দেখিলেন, মুখ বলি-রেখায় আচ্ছন্ন, এবং কষ-লাগানো হাঙ্গর—চামড়ার মত শুষ্ক ও কর্কশ। দর্জি নূতন পরিচ্ছদ আনিয়া দিলে পুরাতন পরিচ্ছদ পরিত্যাগের সময় মনের যে ভাব হয়, সেই ভাবে ডাক্তার আপন মুখ দেখিয়া একটা মুখভঙ্গী করিলেন। তাহার পর, সন্ন্যাসী ব্রহ্মলোগমের মন্ত্রটা আওড়াইলেন।
অমনি, ডাক্তার বালথাজার শেরবোনোর শরীর বজ্রাহতের ন্যায় কার্পেটের উপর গড়াইয়া পড়িল; আর অক্টেভের শরীর সবল হইয়া, সজাগ হইয়া, জীবন্ত হইয়া আবার খাড়া হইয়া উঠিল।
অক্টেভ-দেহধারী শেরবোনো তাঁহার নিজের শীর্ণ, অস্থিময় ও নীলাভ পরিত্যক্ত নির্ম্মোকের সম্মুখে কয়েক মিনিট দাঁড়াইয়া রহিলেন। তাঁহার এই পরিত্যক্ত দেহের মধ্যে শক্তিশালী আত্মা না থাকায়, সেই দেহে প্রায় তখনই জরার লক্ষণ প্রকাশ পাইল এবং অচিরাৎ ঐ দেহ শব আকার ধারণ করিল।
“বিদায়! ওরে অপদার্থ মাংসখণ্ড! বিদায়; ওরে আমার শতছিদ্র চিরবস্ত্রখানি। এই ৭০ বৎসর তোকে টেনে-টেনে পৃথিবীময় নিয়ে বেড়িয়েছি! তুই আমার অনেক সেবা করেছিস্, তাই তোকে ছেড়ে যেতে আমার একটু দুঃখ হচ্চে। কত দিন থেকে একসঙ্গে থাকা অভ্যাস আমাদের! কিন্তু এই যুবার দেহাবরণ ধারণ করে আমি এখন বিজ্ঞানের উন্নতি সাধন করতে পারব, শাস্ত্রানুশীলন করতে পারব, যথোচিত পরিশ্রম করতে পারব, সেই বৃহৎ পুঁথির আরও কতকগুলি মন্ত্র পাঠ করতে পারব; যে জায়গাটা খুব ভাল লাগবে সেই জায়গাটা পড়বার সময় মৃত্যু এসে সহসা বল্তে পারবে না—“আর না, যথেষ্ট হয়েছে, পড়া বন্ধ কর্।”
আপনার কাছে আপনি এই অন্ত্যেষ্টি বক্তৃতা করিয়া, শেরবোনো তাঁহার নূতন অস্তিত্ব অধিকার করিবার জন্য ধীর পদক্ষেপে বাহির হইয়া আসিলেন।
এদিকে কৌণ্ট ওলাফ তাঁহার প্রাসাদে প্রত্যাগত হইয়াই জিজ্ঞাসা করিলেন, কৌণ্টেসের সহিত সাক্ষাৎ হইবে কি না।
ওলাফ দেখিলেন,—কৌণ্টেস উদ্ভিদ্-গৃহে শৈবাল— বেঞ্চের উপর বসিয়া আছেন। শৈবাল-গৃহের পার্শ্বদেশের স্ফটিকের চৌকা শার্শিগুলা একটু উপরে উঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহার মধ্য দিয়া কবোষ্ণ জ্যোতির্ম্ময় বায়ু প্রবেশ করিতেছে—শৈবাল-গৃহের মধ্যস্থল বিদেশী ও গ্রীষ্মমণ্ডলের উদ্ভিজ্জে আচ্ছন্ন হইয়া যেন অরণ্যে পরিণত হইয়াছে। কৌণ্টেস, নোভালিসের গ্রন্থ পাঠ করিতে ছিলেন। যে সকল জর্ম্মাণ গ্রন্থকার প্রেতাত্মবাদ সম্বন্ধে অতীব সূক্ষ্ম, অতীন্দ্রিয় তত্ত্বের আলোচনা করিয়াছেন, তন্মধ্যে নোভালিস একজন। যে সকল গ্রন্থে খুব গাঢ় রং ঢালিয়া বাস্তব জীবন চিত্রিত হইয়াছে, কৌণ্টেস সেই সব গ্রন্থ পড়িতে ভাল বাসিতেন না। সৌখীনতা, প্রেম ও কবিতার জগতে চিরদিন বাস করিয়া আসায় জীবনটা তাঁর একটু স্থূল বলিয়া মনে হইত।
তিনি পুস্তকটা ফেলিয়া দিয়া আস্তে আস্তে চোখ তুলিয়া কৌণ্টের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন। কৌণ্টেস ভয় পাইতে ছিলেন, পাছে এখনো তাঁহার স্বামীর কালো চোখের তারার মধ্যে সেই আগ্রহপূর্ণ, গুহ্যভাবেভরা, ঝোড়ো-রকমের দৃষ্টি দেখিতে পান, যাহা দেখিয়া ইতিপূর্ব্বে তাঁর খুবই কষ্ট হইয়াছিল—এমন কি যা দেখিয়া (এটা মনে করা নিতান্ত আজ্গুবি যদিও) আর একজনের দৃষ্টি বলিয়া মনে হইয়াছিল!
ওলাফের নেত্র হইতে একটা প্রশান্ত আনন্দ ফুটিয়া বাহির হইতেছিল, এবং সেই চোখে একটা বিশুদ্ধ নির্ম্মল প্রেমের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলিতেছিল। যে অপরিচিত আত্মা তাঁর মুখের ভাব বদলাইয়া দিয়া ছিল, সেই আত্মা এখন চিরকালের মত অন্তর্হিত হইয়াছে; প্রাস্কোভি এখন তাঁর হৃদয়ের আরাধ্য প্রিয়তমকে চিনিতে পারিলেন এবং তখনি তাঁহার স্বচ্ছ কপোলে একটা সুখের লালিমা ফুটিয়া উঠিল; যদিও ডাক্তার শেরবোনো-কৃত রূপান্তরের ব্যাপারটা তিনি জানিতেন না, তথাপি এক প্রকার অন্তগূঢ় সূক্ষ্ম অনুভূতি হইতে এই সকল পরিবর্ত্তন তিনি উপলব্ধি করিয়াছিলেন—যদিও তাহার প্রকৃত কারণ বুঝিতে পারেন নাই। ওলাফ নীল মলাটের পুস্তকখানি শৈবাল-ভূমি হইতে কুড়াইয়া লইয়া বলিলেন:—
“তুমি কি বই পড়ছিলে প্রাঙ্কোভি?—আ! এ যে দেখ্ছি হেন্বি অফ্টর ডিঞ্জেনের ইতিহাস—এ যে সেই বইখানা, যা তুমি একদিন দেখে কিন্তে ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলে। সেই দিনই ঘোড়া ছুটিয়ে একজনের বাড়ীর টেবিলের উপর দুপুর রাত্রে ঐ বই তোমায় ল্যাম্পের পাশে এনে হাজির করে দিয়েছিলাম।—ঘোড়াটার দম বেরিয়ে যাবার যৌত্র হয়েছিল।”
“তাই ত তোমাকে বলেছিলাম, আর কখনও আমার মনের কোন সাধ বা খেয়াল তোমার কাছে প্রকাশ করব না। তোমার চরিত্রটা কিরকম জান?—স্পেনদেশের সেই বড় লোকের মত, যে তার প্রেয়সীকে বলেছিল,—“আকাশের তারার দিকে তাকিও না—কেননা তোমাকে তা’ এনে দিতে পারব না।”
কৌণ্ট উত্তর করিলেন:—
“তুমি যদি কোন তারার দিকে তাকাও, প্রাস্কোভি, তা’ হলে আমি আকাশে উঠ্বার চেষ্টা করব, আর ঈশ্বরের কাছে গিয়ে তারাটা চেয়ে নেব।”
যখন প্রাঙ্কোভি স্বামীর এই কথাগুলি শুনিতেছিলেন, সেই সময় তাঁর কেশ-বন্ধনের একটা ফিতা বিদ্রোহী হওয়ায়, সেই ফিতাটি ঠিক করিবার জন্য হাত উঠাইলেন,—তাঁহার জামার আস্তিনটা একটু সরিয়া গেল; আর অমনি তাঁর সুন্দর নগ্ন বাহু বাহির হইয়া পড়িল। তাঁর হস্ত-প্রকোষ্ঠে নীলা পাথর-বসানো একটা গির্গিটি কুণ্ডলী পাকাইয়া ছিল। “কেসিনর”তে তাঁহাকে দেখিয়া যেদিন অক্টেভের মুণ্ড ঘুরিয়া গিয়াছিল, সেই দিন তিনি এই অলঙ্কারটি হাতে পরিয়াছিলেন। কৌণ্ট বলিলেন:—
“তোমাকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করায় তুমি যেদিন প্রথমবার বাগানে নেমেছিলে, তখন একটা ছোট গির্গিটি দেখে তোমার কি ভয়ই হয়েছিল; গির্গিটিটাকে আমার ছড়ির এক ঘায়ে মেরে ফেল্লাম; তারপর, তার থেকে সোনার ছাঁচ তুলে কতকগুলি রত্ন দিয়ে সেই সোনার ছাঁচটাকে ভূষিত করলাম। কিন্তু গির্গিটিটা অলঙ্কারে পরিণত হলেও, তুমি দেখে ভয় পেতে; কিছু কাল পরে, যখন তোমার ভয় ভেঙ্গে গেল, তখন তুমি অলঙ্কারটা পরতে রাজি হলে।”
—“ওঃ! এখন আমার বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে; সকল গহনার চেয়ে এই গহনাটাই আমি এখন পছন্দ করি; কারণ এর সঙ্গে আমার একটা সুখের স্মৃতি জড়ানো রয়েছে।”
কৌণ্ট বলিলেন:—“সেই দিনই আমরা ঠিক করেছিলাম, তুমি তোমার খুড়ীর কাছে আমাদের বিবাহ সম্বন্ধে রীতিমত প্রস্তাব করবে।”
কৌণ্টেস প্রকৃত ওলাফের পূর্ব্বেকার দৃষ্টি আবার দেখিতে পাইয়া, তাঁহার কণ্ঠস্বর আবার শুনিতে পাইয়া, উঠিয়া দাঁড়াইলেন, এবং স্মিতমুখে তাঁহার পানে চাহিয়া, তাঁহার বাহু ধারণ করিয়া, উদ্ভিজ্জ-গৃহে দুই চার বার ঘোর-পাক দিলেন। বেড়াইতে বেড়াইতে,—যে হাতটি মুক্ত ছিল, সেই হাত দিয়া একটি ফুল ছিঁড়িয়া লইয়া তার পাপ্ড়িগুলা দাঁত দিয়া কাটিতে লাগিলেন। মুক্তা-দন্তে যে ফুলটি কাটিতেছিলেন, সেই ফুলটি ফেলিয়া দিয়া তিনি বলিলেন:—
“আজ তোমার স্মরণশক্তির যে রকম পরিচয় পাচ্চি, তাতে বোধ হয় তোমার মাতৃভাষাও তোমার আবার মনে পড়েছে, মাতৃভাষায় তুমি বোধ হয় এখন আবার কথা কইতে পার—কাল ত তোমার মাতৃভাষা একেবারেই ভুলে গিয়েছিলে।”
কৌণ্ট পোলীয় ভাষায় উত্তর করিলেন:— “ওঃ! যদি প্রেতাত্মারা স্বর্গের জন্য কোন এক মানব-ভাষা স্থির করে থাকেন, তাহলে আমি সেখানে গিয়ে পোলীয় ভাষাতেই তোমাকে বল্ব—“আমি তোমাকে ভালবাসি।”
প্রাস্কোভি চলিতে চলিতে, ওলাফের কাঁধের উপর আস্তে আস্তে তাঁহার মাথা নোয়াইলেন এবং গুন্ গুন্ স্বরে বলিলেন:—
“প্রাণেশ্বর; এইত সেই তুমি—যাকে আমি প্রাণের সহিত ভালবাসি। কাল আমাকে বড় ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে; অপরিচিত লোক ভেবে তোমার কাছ থেকে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম।”
তার পরদিন, অক্টেভের দেহে বুড়া ডাক্তারের আত্মা প্রবেশ করায অক্টেভ সজীব হইয়া উঠিল এবং একটু পরে কালো রেখার ঘেরদেওয়া একখানি পত্র পাইল। উঠাতে বালথাজার শেরবোনো মহাশয়ের অন্তোষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিবার জন্য অক্টেভকে অনুরোধ করা হইয়াছে।
ডাক্তার তাহার নূতন দেহ ধারণ করিয়া তাঁহার পরিত্যক্ত পুরাতন দেহের সঙ্গে সঙ্গে সমাধি-ভূমিতে গমন করিলেন, ঐ দেহ কবরস্থ হইল; গোর দিবার সময় যে বক্তৃতা হইল তাহা তিনি শোকগ্রস্থের ন্যায় দুঃখের ভাব ধারণ করিয়া মনোযোগপূর্ব্বক শ্রবণ করিলেন। তাঁহার মৃত্যুতে বিজ্ঞানের যে ক্ষতি হইল, সে ক্ষতিপূরণ হওয়া অসম্ভব ইত্যাদি সেই বক্তৃতায় অনেক কথা ছিল।
ঐ দিনই সায়াহ্ন-সংবাদপত্রের “বিবিধ সংবাদ” এর কোঠায় এই সংবাদটি প্রকাশিত হইল:—
“ডাক্তার বালথাজার শেরবোনো—যিনি দীর্ঘকাল ভারতে বাস করিবার জন্য, শব্দবিদ্যায় পারদর্শিতার জন্য, রোগ আরোগ্য করিবার অদ্ভুত ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত, গতকল্য নিজ কর্ম্ম-কক্ষে তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। মৃত দেহ তন্ন তন্ন পরীক্ষা করিয়া যাহা জানা গিয়াছে, তাহাতে সপ্রমাণ হইয়াছে, কোন আততায়ীকৃত সাঙ্ঘাতিক অপরাধ অনুমান করিবার কোনও হেতু নাই। অতিরিক্ত মানসিক শ্রমে কিংবা কোন অসমসাহসিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করিতে গিয়াই তাঁহার মৃত্যু ঘটিয়াছে, সন্দেহ নাই। শুনা যায়, ডাক্তারের দফ্তরখানায় তাঁর অন্তিমদানপত্রখানি পাওয়া গিয়াছে। তাহাতে তিনি তাঁহার বহুমূল্য পুঁথিগুলি মাজারীণ-পুস্তকালয়ে দান করিয়াছেন এবং সেভিলের অক্টেভ মহাশয়কে তাঁহার উত্তরাধিকারী মনোনীত করিয়াছেন।”
সমাপ্ত