অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/২
২
১৮৪—সালে, গ্রীষ্মের শেষভাগে, ফ্লরেন্স-নগরে আসিয়া পড়িলাম। আমার হাতে কিছু সময় ছিল, কিছু অর্থ ছিল, আর কতকগুলি সুপারিস-পত্র ছিল। আমি তখন খোয-মেজাজী যুবাপুরুষ; আমোদ ভিন্ন আর কিছুই চাইতাম না। আমি এক পান্থশালায় আড্ডা করিলাম, একটা ফিটেন গাড়ী ভাড়া করিলাম। বিদেশীর কাছে যার একটা মোহ আছে, আকর্ষণ আছে—এখানকার সেই নাগরিক জীবন যাপন করিতে লাগিলাম। প্রাতঃকালে দেখিতে যাইতাম কোন এক গির্জ্জা, কোন রাজপ্রাসাদ, কোন চিত্রশালা বেশ ধীরে-সুস্থে,—কিছু মাত্র ত্বরা না করিয়া। আর্টের অতিভোজনে, আমার ভিতরে আর্টের অগ্নিমান্দ্য আনিতে দিই নাই। যে-সব ভ্রমণকারীরা ওস্তাদের হাতের সমস্ত শ্রেষ্ঠ রচনা তাড়াতাড়ি দেখিতে চায়, তাদের প্রায়ই শেষে আর্টে অরুচি ও বিতৃষ্ণা জন্মে। আমি কখন এটা, কখন ওটা দেখিতে যাইতাম। কিন্তু একদিনে একটার বেশী দেখিতাম না। তারপর কোন হোটেলে আসিয়া, প্রাতভোজনস্বরূপ এক পেয়ালা বরফে—জমানো কাফি খাইতাম, চুরোট্ ফুঁকিতাম, খবরের কাগজগুলায় চোখ বুলাইয়া যাইতাম, এবং পাশের দোকানে সুন্দরী ফুল—ওয়ালীর হাতের রচিত একটি ছোট পুষ্পগুচ্ছ ক্রয় করিয়া কোর্ত্তার বোদামের ছিদ্রে তাহা গুঁজিয়া, দিবানিদ্রা সেবনের জন্য বাড়ী ফিরিতাম। “ক্যাসিনে”তে আমাকে লইয়া যাইবার জন্য বেলা ৩টার সময় আমার গাড়ী আসিয়া হাজির হইত। আমি “ক্যাসিনে”তে যাইতাম। প্যারিস্-নগরে যেরূপ সৌখীন বেড়াইবার স্থান “বোয়া-দেবুলং”, ফ্লরেন্স নগরে সেইরূপ “ক্যাসিনে”। শুধু তফাৎ এই, এখানে সকলেই পরস্পরকে চেনে। সেইখানে একটা গোলাকার পরিসরের মধ্যে অনাবৃত আকাশ-তলে, একটা যেন বড় রকমের বৈঠকখানা গড়িয়া উঠিয়াছে, এবং আরাম-কেদারার বদলে কেবল বহুতর গাড়ী রহিয়াছে। গাড়ীগুলা সেখানে দাঁড়াইয়া থাকে অর্দ্ধ-চক্রাকারে। জাঁকালো বেশভূষায় ভূষিতা মহিলাগণ গাড়ীর গদির উপর অর্দ্ধশায়িত থাকিয়া স্বকীয় প্রণয়াদিগকে, প্রণয়-প্রার্থীদিগকে, ফুল-বাবুদিগকে, বিদেশী রাজদূতদিগকে আদর অভ্যর্থনা করেন। এবং ঐ সকল লোক গাড়ীর পায়-দানীতে টুপি রাখিয়া দাঁড়াইয়া থাকে। আপনিও ত একথা জানেন যে,—সায়াহ্নে যেরূপ আমোদ-প্রমোদ হইবে, তাহার মংলব ঐখানেই আঁটা হয়, ঐখানেই সঙ্কেত স্থানের নির্ণয় হয়, ঐখানেই পরস্পরের মধ্যে উত্তরপ্রত্যুত্তর চলে, পরস্পরের মধ্যে নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণ হয়। এ একরকম প্রমোদ-বাজার বলিলেও হয়। সুন্দর বৃক্ষচ্ছায়ায়, অতীব রমণীয় আকাশ-তলে, বেলা ৩টা হইতে ৫টা পর্যান্ত এই বাজার বসে। যার একটু অবস্থা ভাল, তার এখানে প্রতিদিন একবার না আসিলেই নয়—আসিতে যেন সে বাধা। আমিও এই নিয়মের অন্যথা করিতাম না। তারপর সায়াহ্নে, ভোজনের পর, কোন বিদুষী নারীর বৈঠকখানায়, কিংবা কোন ভাল গায়িকার গান শুনিবার জন্য “পেগোলা” নাট্যশালায় যাইতাম।
এইরূপে আমার জীবনের কয়েক মাস অতি সুখে কাটিয়াছিল; কিন্তু এই সুখের দিন স্থায়ী হইল না। একদিন একটা খুব জাঁকালো খোলা গাড়া “ক্যাসিনে“তে আসিয়া দাঁড়াইল; গাড়ীটা বার্ণিসে ঝিক্মিক্ করিতেছে, উহার গায়ে কুলমর্য্যাদাসূচক চিহ্ন অঙ্কিত; গাড়ীতে দুই তেজী ঘোড়া যোতা। অশ্বযুগলের তাঁবার সাজ। সহিস্-কোচম্যানের জাঁকালো উর্দ্দিপোষাক; গাড়ী-দরজার হাতল হইতে যেন বিজলি ছুটিতেছে। সকলেরই দৃষ্টি ঐ জাঁকালো গাড়ীটার উপর নিবদ্ধ। বালু-ভূমির উপর একটা সুবক্র রেখা কাটিয়া গাড়ীটা অন্য গাড়ীর পাশে আসিয়া দাঁড়াইল। বুঝিতেই পারিতেছেন, গাড়ীটা খালি ছিল না; কিন্তু গতির দ্রুততা বশতঃ আর কিছুই ঠিক লক্ষ্য হইতেছিল না—কেবল, সাম্নের গদির উপর একযোড়া ক্ষুদ্র বুট্-জুতা প্রসারিত,— শালের একটা বৃহৎ ভাঁজ, এবং মাথার উপর সাদা রেশমের ঝালোর-ওয়ালা একটা ছাতা—ইহাই কেবল দেখা যাইতেছিল। ছাতাটা এইবার বন্ধ হইল, আর অমনি, একটি অনুপমা রূপবতী নারী চারিদিকে সৌন্দর্য্যচ্ছটা বিকীর্ণ করিয়া লোকের নয়নপথে পতিত হইল। আমি অশ্বারূঢ় ছিলাম। তাই বিধাতার এই শ্রেষ্ঠ নারী-রচনার কোন খুঁটিনাটিই আমার চোখ এড়ায় নাই। রূপালি সবুজশাড়ী, সবুজ হইলেও ধব্ধবে, মুখের রং এর পাশে কালো বলিয়া মনে হইতেছিল। জরির ফুল-কাটা সাদা রেশমের একটা বড় ওড়নার ছোট ছোট ভাঁজে ভিতরের পরিচ্ছদ আবৃত্ত রহিয়াছে। অলঙ্কারের মধ্যে হাতে একটি সোনার বালা: এবং সেই হাতে রমণী ছাতার হস্তিদন্তের হাতলটি ধরিয়া আছে।
“কাপুড়ে-দোকানদারের মত আমি যে বেশভূষার খুঁটিনাটি বর্ণনা করিতেছি, ডাক্তার-মশায়, তজ্জন্ত আমাকে মার্জ্জনা করবেন; কেননা প্রেমিকের চোখে এই সব ছোটখাটো স্মৃতির গুরুত্ব খুবই বেশী। তার ললাটদেশ তুষার-শুভ্র; তার নেত্রপল্লবের দীর্ঘ পদ্মরাজিতে তার নীলাভ চক্ষু অর্দ্ধ আচ্ছন্ন।—যে গোলাপ কোকিলের প্রেমালাপে বা প্রজাপতির চুম্বনে লজ্জায় রক্তিম হইয়া উঠে, সেই সঙ্কোচ-নম্র সুকুমার সাদা গোলাপের ন্যায় তার পেলব গালদুটি। কোন মানব চিত্রকরের পক্ষে তার মুখবর্ণের নকল করা অসম্ভব; তার মাধুর্য্য, তার অপার্থিব স্বচ্ছতা— তার সুকোমল আভা আমাদের স্থূল শরীরের রক্ত হইতে কখনই উৎপন্ন হইতে পারে না, এবং যা কিছু আভাস পাওয়া যায় সে কেবল তরুণ অরুণ-রাগের মধ্যে, কিংবা কোন স্বচ্ছ গোলাপী বস্ত্রাবৃত অমল-ধবল পাষাণ-প্রতিমা হইতে বিচ্ছুরিত রমণীয় বর্ণের আভায়।
“রোমিও যেমন জুলিয়েটকে দেখিয়া রোজালিণ্ডকে ভুলিয়াছিল, সেইরূপ আমি, সৌন্দর্য্যের চরম-উৎকর্ষ এই নারীমূর্ত্তি দেখিয়া আমার পূর্ব্বকার সমস্ত প্রেম-ভালবাসা বিস্তৃত হইলাম। আমার হৃদয় গ্রন্থের পৃষ্ঠাগুলিতে পূর্ব্বমুদ্রিত সমস্ত অক্ষর বিলুপ্ত হইয়া যেন একেবারে সাদা হইয়া গেল। সচরাচর লঘুহৃদয় যুবাদিগের ন্যায় কেমন করিয়া আমি পূর্ব্বে ইতর নারীদিগের রূপে আক্বষ্ট হইয়াছিলাম, এখন তাহা বুঝিতেই পারিতেছি না। আমার মনে হইতে লাগিল, আমার অন্তর্দেবতার যেন আমি অবমাননা করিয়াছি। এই প্রাণঘাতী সাক্ষাৎকার হইতে আমার জীবনে নূতন দিনের আরম্ভ হইল।
“দাপ্তিময়ী নারী-মূর্ত্তিকে লইয়া গাড়ীখানা “ক্যাসিনে” ছাড়িয়া, আবার সহরের রাস্তা ধরিল। আমার ঘোড়া লইয়া আমি এক তরুণ বয়স্ক রুস্ ভদ্রলোকের পাশে আসিয়া দাঁড়াইলাম। ইনি একজন সৌখীন ভ্রমণকারী, য়ুরোপের সমস্ত নগরের সৌখীন মজলিসে ইঁহার খুব গতিবিধি আছে—বড় ঘরের লোকদের ইতিহাস ইনি সমস্তই অবগত আছেন। ইঁহার নিকটে আমি এই বিদেশিনীর কথা পাড়িলাম। কথায় কথা জানিলাম ইনি কৌণ্টেস্ প্রাস্কোভি লাবিন্ঙ্কা; ইনি লুথানিয়া-বাসিনী, মহদ্বংশোদ্ভবা ও অতুল ঐশ্বর্য্যশালিনী। ইঁহার স্বামী কাকেশিয়া প্রদেশে দুই বৎসর হইতে যুদ্ধকার্য্যে ব্যাপৃত রহিয়াছেন।
আপনাকে বলা বাহুল্য, কৌণ্টেসের দর্শন লাভের জন্য আমার অনেক কৌশল অবলম্বন করিতে হইয়াছিল; কেননা স্বামী প্রবাসে থাকায় তিনি কাহারও সহিত বড় একটা দেখা সাক্ষাৎ করিতেন না। যাহা হউক আমি অবশেষে সাক্ষাৎকারের অনুমতি পাইলাম। রাজপরিবারের দুই চারজন বৃদ্ধা বিধবা ও চারজন বৃদ্ধা ব্যারন্-পত্নী আমার হইয়া জবাবদিহী গ্রহণ করিলেন।
“কৌণ্টেস্ লাবিন্স্কা একটা জম্কালো বাগান বাড়ী ভাড়া করিয়া ছিলেন—প্রাচীন প্রাসাদ,—ফ্লরেন্স হইতে তিন মাইল দূরে। প্রাচীন প্রাসাদের কঠোর গাম্ভীর্যের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করিয়া, কৌণ্টেস্ আরামপ্রদ সমস্ত আধুনিক সাজসজ্জা ও আসবাবে বাড়াটিকে সজ্জিত করিয়াছিলেন। সেকালের লোহার পতর-মারা বড় বড় দরজা একালের সূচাগ্র খিলানের সহিত বেশ মানানসইভাবে সন্নিবদ্ধ হইয়াছে; আরামকেদারা ও সেকেলে ধরণের আসবাব সকল, কাঠের কারুকার্য্যে কিংবা ম্লানাভ ‘ফ্রেসকো’-চিত্রে আচ্ছন্ন দেওয়ালের সহিত বেশ সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়া স্থাপিত হইয়াছে। কোন নূতন-টাটকা বা উজ্জ্বল রঙে চক্ষু পীড়িত হয় না; এক কথায় বর্ত্তমান, অতীতের সহিত মিলিত হইরা একটুও বেসুরো বাজিতেছে না।
“যেমন আমি কৌণ্টেসের দীপ্তিময়ী সৌন্দর্য্যচ্ছটায় মুগ্ধ হইয়াছিলাম, তেমনি আবার কয়েকবার দর্শনলাভের পর তাঁহার বুদ্ধির পরিচয় পাইয়া আরও বিস্ময়স্তম্ভিত হইলাম। ওরূপ সূক্ষ্ম ও সর্ব্বতঃ-প্রসারিণী বুদ্ধি সচরাচর দেখা যায় না। যখন তিনি কোন চিত্তাকর্ষক বিষয় সম্বন্ধে কথা কহিতে থাকেন, তখন যেন তাঁর সমস্ত আত্মা ভিতর হইতে বাহিরে আসিয়া দেখা দেয়। অন্তঃপ্রভ কোন দীপের আলোকে আলোকিত অমল-ধবল মর্ম্মর-প্রস্তরের ন্যায় তার বর্ণের শুভ্রতা। কবি দান্তে স্বর্গের শোভাসৌন্দর্য্য বর্ণনা করিবার সময় যেরূপ বর্ণনা করিয়াছিলেন, সেইরূপ তাঁর বর্ণের আভায় . ‘ফস্ফরিক’ স্ফুলিঙ্গচ্ছটা ও আলোক-কম্পন যেন পরিলক্ষিত হয়। মনে হয় যেন কোন দেবী স্বর্গলোক হইতে মর্ত্তে নামিয়া আসিয়াছেন। আমার চোখ ঝলসাইয়া গেল; আমি আত্মহারা ও হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলাম। তাহার সৌন্দর্য্য-ধ্যানে নিমগ্ন হইয়া, তাঁর মুখনিঃসৃত বাক্যের মধুর সঙ্গীতে বিমুগ্ধ হইয়া, উত্তর দেওয়া যখন নিতান্ত আবশ্যক হইত, তখন আমি থতমত খাইয়া আম্তা-আম্তা করিতে করিতে কতকগুলি অসংলগ্ন কথা বলিয়া ফেলিতাম, তাহাতে আমার বুদ্ধি-সম্বন্ধে তাঁর খুব হীন ধারণাই হইত সন্দেহ নাই। কখন কখন আমার থতমত ভাব ও নির্ব্বুদ্ধিতার কথা শুনিয়া একটি গোলাপ-রক্তিম আলোকরশ্মির ন্যায় তাঁর সুন্দর ওষ্ঠাধরের উপর সুহৃৎ-সুলভ সদয় উপহাসরঞ্জিত মৃদুমধুর একটু হাসির রেখা অলক্ষিতে দেখা দিত।
“আমার প্রেমের কথা এখনও পর্য্যন্ত আমি বলি নাই; তাঁহার সম্মুখে আমি চিন্তাহীন, বলহীন, সাহসহীন হইয়া পড়িতাম; আমার বুক ধড়াস ধড়াস করিত, যেন হৃৎপিণ্ডটা আমার বক্ষ হইতে বাহির হইয়া আমার হৃদয়রাণীর পদতলে গিয়া লুটাইয়া পড়িবে। কতবার উহার নিকট আমার মনোভাব প্রকাশ করিব বলিয়া সঙ্কল্প করিলাম, কিন্তু একটা অনিবার্য্য ভীরুতা আসিরা আমাকে আটকাইয়া রাখিল। তাঁহার মুখে আমার প্রতি একটু ঔদাস্য বা অপ্রসন্নভাব কিংবা একটু ঢাকাঢাকির ভাব লক্ষ্য করিলে আমার মুখ লজ্জায় লাল হইয়া যাইত, অথবা পাণ্ডুবর্ণ হইয়া যাইত। কিছুই না বলিয়া আমি বাহির হইয়া পড়িতাম; বাহির হইবার সময় দরজা যেন হাতড়াইয়া পাইতাম না, মাতালের মত টলিতে টলিতে সিঁড়ি দিয়া নামিতাম।
“বাহির হইয়া আসিবার পর আমার বুদ্ধি-বৃত্তি যেন আবার ফিরিয়া আসিত এবং তখন প্রজ্জ্বলন্ত প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করিয়া আকাশ ফাটাইয়া দিতাম, খুব আবেগের সহিত আমার অনুপস্থিত হৃদয়-পুত্তলীর নিকট আমার শত শত প্রেমের নিবেদন জানাইতাম। এই সব হৃদয়উচ্ছ্বাস প্রকাশ করিবার পর মনে হইত, এইবার বুঝি আমার রাণী স্বর্গ হইতে আমার নিকটে আসিয়া আবির্ভূত হইয়াছেন; তখন দুই বাহু দিয়া কতবার তাঁকে আমার বক্ষের উপর আটকাইয়া রাখিতে চেষ্টা করিয়াছি।
“কৌণ্টেস্ আমার মনকে এতটা অধিকার করিয়া বসিয়াছিলেন যে, ‘প্রাস্কোভি লাবিন্স্কা’ এই নামটি আমি মন্ত্রের মত দিবারাত্র জপ করিতাম। এই নামে যে কি অপূর্ব্ব সুধা আছে, তাহা বাক্যে বর্ণনা করা যায় না। জপ করিবার সময় ‘প্রাস্কোভি লাবিন্ঙ্কা’ এই নামটি কখন বা মুক্তা দিয়া, কখনও বা ধীরে ধীরে পুষ্পমালার আকারে গাথিতাম, কখন বা ভক্তসুলভ বাক্য-প্রচুর অসংযত ভাষায় ঐ নাম তাড়াতাড়ি উচ্চারণ করিতাম। আবার কখন কখন উৎকৃষ্ট কাগজের উপর, নানাপ্রকার ছাঁদের বর্ণের রেখা অলঙ্কারে ভূষিত করিয়া তাঁহার নাম সুন্দর করিয়া লিখিতাম, তারপর ঐ লিখিত নামের উপর বার বার আমার লেখনী বুলাইতাম। কৌণ্টেসের সহিত আবার যতক্ষণ না সাক্ষাৎ হইত, ততক্ষণ এই সুদীর্ঘ বিরহ-কাল এইরূপেই কাটাইতাম। আমি পুস্তকপাঠে কিংবা কোন কাজে মনোনিবেশ করিতে পারিতাম না। প্রাঙ্কোভি ছাড়া আর আমার কোন বিষয়েই ঔৎসুক্য ছিল না, এমন কি দেশ হইতে যে চিঠি পত্র আসিত, তাহা না খুলিয়াই ফেলিয়া রাখিতাম। অনেকবার এই অবস্থা হইতে বাহির হইবার জন্য চেষ্টা করিয়াছি, কিন্তু পারি নাই। আমি সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলাম, ভালবাসিয়াই তুষ্ট ছিলাম, ভালবাসার কোন প্রতিদান চাহি নাই, শুধু তাঁর গোলাপ-রক্তিম অঙ্গুলিপ্রাস্ত, আমার ওষ্ঠযুগল আল্গোচে যদি একটিবার চুম্বন করিতে পারে, ইহাই আমার চূড়ান্ত বাসনা ও স্বপ্নের জিনিস ছিল, ইহার অধিক আশা করিতে আমি সাহসী হই নাই। মধ্যযুগে ভক্তের ‘ম্যাডোনার’ নিকট নতজানু হইয়া যেরূপ একান্তমনে ভক্তিভরে পূজা করিত, তাহা অপেক্ষা আমার এই পূজা-অর্চ্চনা কোন অংশেই কম ছিল না।”
ডাক্তার শের্বোনো, অক্টেভের কথা খুব মনোযোগের সহিত শুনিতেছিলেন। কেন না, তাঁর নিকট অক্টেভের এই আত্ম-কাহিনী শুধু একটা রোম্যাণ্টিক গল্প নহে। অক্টেভের কথার বিরাম হইলে, ডাক্তার মনে মনে এইরূপ ভাবিতে ছিলেন, “যা দেখ্ছি, এ-তো স্পষ্ট প্রেম-বিকারের লক্ষণ; এ এক অদ্ভুত রোগ, কেবল একবার মাত্র এই রকম রোগ আমার হাতে এসেছিল; চন্দননগরে এক ডোম-রমণী কোন ব্রাহ্মণের প্রেমে পড়ে, বেচারী সেই প্রেম-রোগেই মারা যায়; কিন্তু সে ছিল অসভ্য বুনো, আর ইনি হচ্ছেন সভ্যজাতীয় লোক, আমি নিশ্চয়ই একে ভাল করতে পারব।” এই অবান্তর চিন্তাটা থামিয়া গেলে, ডাক্তার হাতের ইসারায় অক্টেভকে আবার আত্ম-কাহিনী আরম্ভ করিতে আদেশ করিলেন। তার পর পা ও হাঁটু দুম্ড়াইয়া, হাঁটুর উপর চিবুক রাখিয়া, ফড়িং-এর মত পা মেলিয়া ডাক্তার অবহিত হইয়া শুনিতে লাগিলেন। যদিও এই ভাবে বসা আমাদের পক্ষে অসাধ্য, কিন্তু মনে হয়, বসিবার এই ভঙ্গীই ডাক্তারের বেশ অভ্যস্ত।
অক্টেভ আবার বলিতে আরম্ভ করিল: “আমার এই গুপ্ত মনোবেদনার খুঁটিনাটি বর্ণনা করিয়া আর আপনাকে বিরক্ত করিব না। একদিন, কৌণ্টেসের সহিত সাক্ষাৎ করিবার অদম্য বাসনা দমন করিতে না পারিয়া, আমি যে সময়ে সচরাচর তাঁহার সহিত দেখা করিতে যাইতাম, তাহার কিছু আগেই গেলাম; সে সময়ে দিনটা ঝোড়ো ও বাষ্পভারাক্রান্ত ছিল। আমি রাণীকে তাঁর বৈঠকখানায় দেখিতে পাইলাম না। পাতলা পাতলা থামে পরিধৃত দ্বার-প্রকোষ্ঠে তিনি উপবিষ্ট ছিলেন, উহার সম্মুখেই একটা অলিন্দ; এই অলিন্দের উপর দিয়া উদ্যানে নামিতে হয়। তিনি তাঁর পিয়ানো, একটা কৌচ ও গানকয়েক বেতের চৌকি ঐখানে আনাইয়াছিলেন। থামের মাঝে মাঝে গঠিত ইষ্টক-বেদিকার উপর সুরভি-কুসুমে পূর্ণ কতকগুলি জম্কালো ফুলদানী রহিয়াছে এবং মধ্যে মধ্যে পর্ব্বত-প্রদেশ হইতে দম্কা বাতাস আসিয়া সৌরভে পরিসিক্ত হইয়া চারিদিক আমোদিত করিতেছে। তাঁহার সম্মুখে স্তম্ভশ্রেণী ফাঁকের মধ্য দিয়া উদ্যানের কাটা-ছাঁটা ঝোপের বেড়া দেখা যাইতেছে। শতবর্ষবয়স্ক কতকগুলা ঝাউ মাথা তুলিয়া রহিয়াছে; ইতস্ততঃ সুগঠিত পাষাণ-প্রতিমা উদ্যানের শোভা সম্পাদন করিতেছে।
“রাণী বেতের কৌচে অর্দ্ধশায়িত অবস্থায় একাকী ছিলেন। কি সুন্দর দেখাচ্ছিল! এমন সুন্দরী এর পূর্ব্বে আমি এঁকে কখনই দেখি নি; শরীরে একটা এলানো ভাব, গরমে যেন অবসন্ন। ভারতের শুভ্র স্বচ্ছ মসলিন বস্ত্রে আবৃত—যেন সাগরের অপ্সরা সাগরের ফেনপুঞ্জে পরিস্নাত; পরিচ্ছদের কিনারায় যেন তরঙ্গের রজত-ঝালর দীপ্তি পাইতেছে। একটি ইস্পাতের ব্রোচে এই স্বচ্ছ লঘু পরিচ্ছদ বক্ষের উপর আটকানো রহিয়াছে, এবং এই পরিচ্ছদ পদতল পর্য্যন্ত লুটিয়া পরিয়াছে। স্কুলের পাপ্ড়ীর ভিতর হইতে ফুলের মত, অমল ধবল বাহুযুগল জামার আস্তিন হইতে বাহির হইয়াছে। কটিদেশ একটি কালো ফিতায় বদ্ধ— ফিতার প্রান্ত নীচে ঝুলিয়া পড়িয়াছে—পায়ে বিচিত্র রেখায় অঙ্কিত নীল চর্ম্মের একযোড়া ছোট চটিজুতা;—পদতলের পরিচ্ছদের ভাজ হইতে উহার ছুঁচালো বক্র মুখ বাহির হইয়া রহিয়াছে।
“রাণী বই পড়ছিলেন, আমাকে দেখে পাঠ বন্ধ করলেন, এবং একটু মাথা নাড়িয়া ইসারায় আমাকে বস্তে বল্লেন। রাণী একাকী ছিলেন; এইরূপ অনুকুল অবস্থা বড়ই দুর্লভ। তাঁর সম্মুখেই একটা আসনে আমি বস্লাম। কয়েক মিনিটকাল ধরিয়া আমাদের মধ্যে একটা গভীর নিস্তব্ধতা ছিল। এই নিস্তব্ধতার দীর্ঘ মুহূর্ত্তগুলি বড়ই কষ্টকর। কথোপকথন-সুলভ সাদামাটা কথাও আমার মুখে যোগাইল না; আমার মাথা যেন ঘুলিয়ে গেল; আমার হৃৎপিণ্ড থেকে অগ্নিশিখা বেরিয়ে যেন আমার চোখে এসে দেখা দিল। তখন আমার প্রেমিক হৃদয় আমাকে বল্লে, ‘দেখো, এই পরম সুযোগ হারিয়ো না।’
“কি করেছিলাম আমি জানি না—হঠাৎ দেখি রাণী আমার কষ্টের কারণ বুঝ্তে পেরে কৌচের উপর একটু উঠে বসে, তাঁর সুন্দর হাতটি বাড়িয়ে ইঙ্গিতে যেন আমার মুখ বন্ধ করতে বল্লেন।”
“একটি কথাও বোলো না অক্টেভ; তুমি আমাকে ভালবাস—আমি জানি, আমি বেশ অনুভব করি, আমি বিশ্বাস করি; কিন্তু আমি তা চাই না, কারণ ভালবাসা ইচ্ছাধীন নয়। অন্য রমণী যারা আমা অপেক্ষা কঠোর, তোমার উপর হয়ত রাগ করবে; কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাস্তে পারিনে বলে, আমার কেবল দুঃখ হয়, এইমাত্র। আমি তোমার দুর্ভাগ্যের কারণ হয়েছি—এইটিই আমার দুঃখ। আমার সঙ্গে তোমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে বলে আমি দুঃখিত—না দেখা হলেই ভাল হত। কি কুক্ষণেই আমি ভেনিস্ ত্যাগ করে ফ্লরেন্সে এসেছিলাম। প্রথমে আমি আশা করেছিলাম, তোমাকে ক্রমাগত উপেক্ষার ভাব দেখালে, যদি তুমি দূরে চলে যাও। কিন্তু আমি জানি প্রকৃত ভালবাসা—যার সমস্ত চিহ্ন আমি তোমার চোখে দেখতে পাই—সেই প্রকৃত ভালবাসা কোন বাধাই মানে না, কিছুতেই দমে না। কিন্তু আমার অন্তঃকরণ এই কোমল ভাব, তোমার মনে যেন কোন বিভ্রম উৎপন্ন না করে, কোনও স্বপ্ন জাগিয়ে না তোলে। তোমার প্রতি অনুকম্পা করচি বলে মনে কোরো না, তোমার প্রেমে আমি উৎসাহ দিচ্ছি। এক জ্যোতির্ম্ময় দেবদূত, আমাকে সমস্ত প্রলোভন থেকে সর্ব্বদাই রক্ষা করচেন—তিনি ধর্ম্ম হতেও শ্রেষ্ঠ, কর্ত্তব্য হতেও শ্রেষ্ঠ, পূণ্য হতেও শ্রেষ্ঠ,—আর সেই দেবদূতই আমার প্রাণেশ্বর— কৌণ্ট লাবিন্স্কাকে আমি দেবতার মত পূজা করি। আমার সৌভাগ্য এই যে, যিনি আমার হৃদয়-মন্দিরের দেবতা, তাঁর সঙ্গেই আমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ।”
“এই অকপট আন্তরিক পতি-ভক্তির কথা শুনে আমার চোখে জল এল; আর সেইসঙ্গে আমার জীবনের মর্মগ্রন্থিটিও যেন ছিন্ন হয়ে গেল।
“রাণী প্রাস্কোভি আমার কষ্টে বিচলিত হয়ে, নারীজনসুলভ স্নেহমমতার বশে নিজের সুরভি রুমালখানি আমার চোখের উপর বুলিয়ে দিলেন। আর বল্লেন—“ছি, কেঁদো না। আর কোন বিষয় ভাবতে চেষ্টা কর, মনে কর, আমি চিরকালের মত বিদায় নিয়েছি, আমি মরে গেছি। আমাকে ভুলে যাও। দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বেড়াও, কাজ কর, লোকের উপকার কর, সচেষ্টভাবে বিশ্বমানবের কাজে যোগ দাও —লোকের সঙ্গে মেশামেশি কর— আর্টের চর্চ্চা কর, কিংবা আর কাউকে ভালবেসে মনকে শান্ত কর।”
“আমি অস্বীকারের ভঙ্গী করলাম।” রাণী আবার বলতে লাগলেন:—
“তুমি কি মনে কর, আমার সঙ্গে বরাবর এইরূপ দেবাসাক্ষাৎ করলেই তোমার কষ্টের লাঘব হবে? আচ্ছা বেশ, তুই এসো, আমি তোমার সঙ্গে সর্ব্বদাই দেখা করব। ভগবান বলেছেন, শত্রুকেও ক্ষমা করবে। তবে, যারা আমাদের ভালবাসে তাদের সঙ্গে কি খারাপ ব্যবহার করা ঠিক?—কখনই না। কিন্তু তবু আমার মনে হয়, বিচ্ছেদই এর অমোঘ ঔষধ। দুই বৎসর কাল পরে, আমরা সহজভাবে, বিনা সঙ্কটে পরস্পরের হস্ত-মর্দ্দন করতে পারর—তারপর একটু হাসবার চেষ্টা করে বললেন—“অবশ্য বিনা সঙ্কটে তোমার পক্ষে “তার পর দিনই আমি ফ্লরেন্স্ ছাড়লাম, কিন্তু কি জ্ঞান-চর্চ্চা, কি দেশ-ভ্রমণ, কি কালের দীর্ঘতা কিছুতেই আমার কষ্টের লাঘব হল না। আমি বেশ অনুভব করচি, আমার মরণ নিকটে। না, ডাক্তার মশায়, আমার মৃত্যুতে আপনি বাধা দেবেন না।”
ডাক্তার বলিলেন—“তারপর রাণীর সঙ্গে আর কি দেখা হয়েছে?” এই কথা বলিবার সময় ডাক্তারের নীলচক্ষু হইতে অদ্ভুত রকমের স্ফুলিঙ্গ বাহির হইতেছিল। অক্টেভ উত্তর করিলেন—“না, তিনি এখন প্যারিসে আছেন।” এই কথা বলিয়া অক্টেভ ডাক্তারের দিকে হাত বাড়াইয়া একটা নিমন্ত্রণ-পত্র দিলেন। নেই পত্রের উপর লেখা ছিল:—
“আগামী বৃহস্পতিবার প্রাস্কোভি কৌণ্টেস লাবিন্স্কা বন্ধুজনের অভ্যর্থনার্থ গৃহে থাকিবেন।”