অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/৪
৪
পাঠকের বোধ হয় মনে আছে, অক্টেভ লাবিন্ষ্কাকে ভালবাসে, এই কথা লাবিন্ষ্কাকে সে বলিতে উদ্যত হওয়ায় লাবিন্ঙ্কা তাহাকে থামাইয়া দেন, সে কথা তার মুখ হইতে বাহির করিতে দেন নাই; সে কথা তিনি শুনিতে চান নাই। তখন হইতে দুই বৎসর চলিয়া গিয়াছে। সুখস্বপ্নের উচ্চ শিখর হইতে এইরূপ দারুণ পতন হওয়ায়, অক্টেভের চিত্ত নৈরাশ্য ও বিষাদের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয় এবং অক্টেভ, লাবিন্স্কাকে কোন সংবাদ না দিয়া দূর দেশে চলিয়া যায়।
যে একটি মাত্র কথা অক্টেভ লাবিন্স্কাকে লিখিতে পারিত, সেই কথাটিই মুখ দিয়া বাহির করিতে অক্টেভকে নিষেধ করা হইয়াছে। কাজেই লাবিন্স্কা অক্টেভের কোন সংবাদ পান নাই। অক্টেভের এই নিস্তব্ধতাতে ভীত হইয়া, লাবিন্স্কা বিষণ্নচিত্তে স্বকীয় ভক্ত উপাসক বেচারী অক্টেভের কথা মধ্যে মধ্যে চিন্তা করেন—সে কি আমাকে ভুলিয়া গেছে? লাবিন্স্কা চাহিতেন যে সে তাহাকে ভুলিয়া যায়— কিন্তু তাহা বিশ্বাস করিতেন না। কেন না, অক্টেভের চোখে তিনি যে প্রেমের আগুন জ্বলিতে দেখিয়াছেন, তাহা নির্ব্বাণ হইবার নহে; কৌণ্টেস তাহার হৃদয়ের অবস্থা বিলক্ষণ অবগত ছিলেন। প্রেম ও দেবতাদের মধ্যে বেশ একটা চেনা পরিচয় আছে—ইঁহারা পরস্পরকে দেখিবামাত্র চিনিতে পারেন। তাই এই প্রেমের কথাটা মনে হওয়ায় তাঁহার সুখের স্বচ্ছ আকাশের উপর দিয়া যেন একটি ক্ষুদ্র মেঘ চলিয়া গেল, পৃথিবীর দুঃখ-কষ্টে স্বর্গের দেবতাদের যেরূপ দুঃখ হয়, সেইরূপ লঘু ধরণের একটু দুঃখ তাঁর মনকে অধিকার করিল। তাঁহার জন্য কোন হতভাগ্য কষ্ট পাইতেছে মনে করিয়া সেই মমতাময়ী দেবীর অন্তঃকরণ একটু দ্রবীভূত হইল। কিন্তু আকাশের কোন উজ্জ্বল তারকার প্রেমে মুগ্ধ হইয়া যদি কোন সামান্য মেষপালক উদ্বাহু হইয়া হাত বাড়ায়, তাহা হইলে সেই তারকা তাহার জন্য কি করিতে পারে?
প্যারিসে আসিয়া, কৌণ্টেস্ লাবিন্ঙ্কা অক্টেভের নামে লৌকিক ধরণের একটা সাদামাটা নিমন্ত্রণ-পত্র পাঠাইয়াছিলেন। ঐ পত্রখানিই ডাক্তার বাল থাজার শেরবোনো অন্যমনস্কভাবে এক্ষণে আঙ্গুলের মধ্যে নাড়াচাড়া করিতেছিলেন। কৌণ্টেসের ইচ্ছা সত্ত্বেও যখন কৌণ্টেস্ দেখিলেন, অক্টেভ আসিল না, তখন তাঁর মনে হইল, সে এখনো তাহাকে ভালবাসে, তবে হয়ত কোন বিশেষ কারণে আসিতে পারে নাই। এই মনে করিয়া কৌণ্টেসের হৃদয় উৎফুল্ল হইল; তবু তো এই রমণী স্বর্গের দেবতার মত বিশুদ্ধ-চরিত্র ও হিমালয়ের উচ্চতম শিখরস্থ তুষারের মত শুভ্র নিষ্কলঙ্ক। ডাক্তার অক্টেভকে বলিলেন: “তোমার বর্ণিত সমস্ত কথা আমি বেশ মন দিয়ে শুনেছি, আমার মনে হয়, এখন কোনপ্রকার আশা করা তোমার পক্ষে নিতান্তই পাগলামী। কৌণ্টেস্ কখনই তোমার ভালবাসা গ্রহণ করবেন না।”
—“দেখুন ডাক্তার, এইজন্যই আমার প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করবার কোন হেতু দেখ্তে পাই নে।”
ডাক্তার বলিলেন:—“আমি ত পূর্ব্বেই বলেছি, সচরাচর উপায়ে প্রাণ বাঁচাবার কোন আশা নাই। কিন্তু এমন সব গুহ্য তত্ত্ব ও নিগূঢ শক্তি আছে যার সম্বন্ধে আধুনিক বিজ্ঞান একেবারে অনভিজ্ঞ। মূর্খ সভ্যতা যে সব দেশকে অসভ্য বলে, সেই সব বিদেশভূমিতেই এই গুহ্য বিদ্যার চর্চ্চা বংশ-পরম্পরায় চলে আস্চে। সেইখানেই জগতের আদিমকালে, মানবজাতি প্রাকৃতিক শক্তির সহিত অব্যবহিত সংস্রবে আসায় তার গুহ্য তত্ত্ব জানতে পেরেছিল। লোকের বিশ্বাস—সে সব তত্ত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সাধারণ লোকে তার কিছুই জানে না। ঐ সব গুহ্য তত্ত্বের জ্ঞান প্রথমে মন্দির দেবালয়ের রহস্য়ময় নিবিড় অন্ধকারের মধ্যে শিষ্য-পরম্পরায় প্রচারিত হয়; তার পর, ইতর লোকের অবোধ্য পবিত্র ভাষায় উহা লিপিবদ্ধ হয়, ইলোরার ভূগর্ভস্থ প্রাচীরের গায়ে খোদিত হয়। তুমি এখনও দেখ্তে পাবে, যেখান থেকে গঙ্গা নিঃসৃত হচ্ছে সেই উচ্চতম মেরু-শিখরে, পুণ্যনগরী বারাণসীর প্রস্তর-সোপানের তলদেশে, সিংহলের ভগ্নদশাগ্রস্ত ডাগোবার গভীরদেশে কতকগুলি শতায়ুস্ক ব্রাহ্মণ অপরিজ্ঞাত পুঁথির পাঠোদ্ধার করচেন, কতকগুলি যোগী অনির্ব্বচনীয় ওঁ-শব্দের জপে ব্যাপৃত রয়েছেন—ইতিমধ্যে আকাশের পাখী তাঁদের জটার মধ্যে বাসা বাঁধ্চে—সেদিকে তাঁদের লক্ষ্যই নাই; কতকগুলি সন্ন্যাসী যাঁদের স্কন্ধদেশ ত্রিশূলবিদ্ধ ক্ষতের চিহ্নে অঙ্কিত—তাঁরা নষ্ট গুহ্য বিদ্যা আয়ত্ত করেছেন এবং তা-থেকে আশ্চর্য্য ফল লাভ ক’রে, তা কাজে প্রয়োগ করচেন। আমাদের য়ুরোপ ভৌতিক স্বার্থে নিমগ্ন হয়ে, কল্পনাও করতে পারে না—ভারতের তপস্বীরা আধ্যাত্মিকতার কত উচ্চ ধাপে আরোহণ করেছেন, তাঁদের নিরম্বু উপবাস, তাঁদের ধ্যানধারণার ভীষণ একাগ্রতা, কত কত বৎসর ধরে’, দুঃসাধ্য আসন রচনা করে’ একভাবে উপবিষ্ট থাকা, প্রখর সূর্য্যের নীচে জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মাঝে বসে শরীরকে শোষণ করা,—এ-সব য়ুরোপের সাধ্যাতীত। তাঁদের হাতের নখ বর্দ্ধিত হয়ে তাঁদের হাতের তেলোতে বিদ্ধ হয়ে আছে—দেখ্লে মনে হয় যেন “ইজিপ্সান মমি” তাদের সিন্দুক থেকে সদ্য বের হয়ে এসেছে। তাঁদের দেহের বহিরাবরণটা যেন প্রজাপতির খোলস; প্রজাপতিরূপ অমর আত্মা ঐ খোলস ইচ্ছামত ত্যাগ করতে পারে কিংবা আবার গ্রহণ করতে পারে। যখন উহাদের ভীষণ-দর্শন জীর্ণ-শীর্ণ জড়বৎ দেহপিণ্ডটা একস্থানে পড়ে থাকে, তখন ওঁদের আত্মা, সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে খেয়ালের ডানায় ভর করে’ গণনাতীত উচ্চ প্রদেশে অলৌকিক জগতে উড়ে যায়। তথন তাঁরা অদ্ভূত দৃশ্য অদ্ভুত স্বপ্ন দেখ্তে থাকেন। অনন্তের সাগর-বক্ষে বিলীন যুগযুগান্তের যে সব তরঙ্গ ওঠে, তাঁরা যোগানন্দের উচ্ছ্বাসে সেই সব তরঙ্গ অনুসরণ করেন; তাঁরা বিধাতার সৃষ্টিকার্য্যে সাহায্য করেন, দেবতাদের জন্মগ্রহণ ও যোনিভ্রমণে সাহায্য করেন, সর্ব্বতোভাবে অসীমের মধ্যে তাঁরা বিচরণ করেন। প্রলয়কাণ্ডের দরুণ যে সব বিজ্ঞান বিলুপ্ত হয়েছে, সেই সব বিজ্ঞান এবং আদিম মানব ও পঞ্চভূতের বিবরণ তাঁদের স্মরণে আসে; এই উদ্ভট অবস্থার মধ্যে, তাঁরা এমন এক ভাষার শব্দ বিড়বিড় করে’ উচ্চারণ করেন, যে ভাষায় বহুকাল যাবৎ কোন জাতিই আর কথা কয় না। সেই আদিম শব্দ-ব্রহ্মকে তাঁরা আবার পেয়েছেন,—যে শব্দব্রহ্ম পুরাতন অন্ধকারের মধ্য হতে, আলোকের উৎস ধারা ছুটিয়ে দিয়েছিল। লোকে তাঁদের পাগল মনে করে, আসলে তাঁরা দেবতা।”
এই অদ্ভুত গৌরচন্দ্রিকায় অক্টেভের উদ্দীপ্ত কৌতূহল শেষ সীমায় আসিয়া পৌঁছিল, ডাক্তারের কথার গতি কোন্দিকে বুঝিতে না পারিয়া, চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া, জিজ্ঞাসার ভাবে একদৃষ্টে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিল। অক্টেভের ভালবাসার সহিত ভারতের সাধু-সন্ন্যাসীর কি সম্বন্ধ থাকিতে পারে, অক্টেভ তাহা কিছুই অনুমান করিতে পারিল না।
ডাক্তার অক্টেভের মনোগতভাব বুঝিতে পারিয়া, কোন প্রশ্ন করিতে মানা করিবার ভাবে হাতের একটা ইসারা করিয়া বলিলেন:— বাপু, একটু ধৈর্য্য ধর; এখনি তুমি বুঝিতে পারিবে—আমি যা বল্লুম, এসব অনাবশ্যক অপ্রাসঙ্গিক কথা নয়—মূল বিষয়ের সঙ্গে তার বিলক্ষণ যোগ আছে।
পরীক্ষাগারের মার্বেল-মেঝের উপর বসে’, শব-দেহের উপর ছুরি চালিয়ে পরীক্ষা করে’ করে’ ক্লান্ত হয়েছি, তার থেকে কোন সাড়া পাই নি, জীবনকে খুঁজ্তে গিয়ে কেবল মৃত্যুকেই দেখ্তে পেয়েছি! তখন একটা মৎলব আমার মনে হল। মৎলবটা খুব দুঃসাহসীর মত বল্তে হবে। এ দুঃসাহস অগ্নিহরণ-উদ্দেশে প্রমেথিউসের স্বর্গ-আক্রমণের মত দুঃসাহস। মনে করলাম, আমি আত্মাকে হঠাৎ পাক্ড়াও করব, তার পর তাকে বিশ্লেষণ করব, শবচ্ছেদের মত খণ্ড খণ্ড করে দেখ্ব। আমি কারণের উদ্দেশে কার্য্যকে ত্যাগ করলাম। জড়বিজ্ঞানের উপর আমার গভীর অবজ্ঞা হল—কেন না, তার থেকে কেবল মৃত্যুরই প্রমাণ পাওয়া যায়। আমার মনে হল, কতকগুলো আকারের উপর পরীক্ষা করা, কতকগুলো বিচ্ছিন্ন উৎপন্ন পরমাণু-রাশির উপর পরীক্ষা করা—এ তো স্থুলপ্রত্যক্ষবাদের কাজ। যে সকল বন্ধনে দেহাবরণটা আত্মার সঙ্গে আবদ্ধ রয়েছে, চুম্বকশক্তির যোগে সেই সব বন্ধন শিথিল করবার জন্য আমি চেষ্টা করতে লাগলাম। এই পরীক্ষাকার্য্যে ‘মেস্মের’ প্রভৃতি মোহিনীশক্তির আবিষ্কারকদেরও ছাড়িয়ে উঠ্লাম। খুব আশ্চর্য্য ফল পেলাম। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট হলাম না। মৃগীরোগ, সশরীরে স্বপ্নভ্রমণ, দূরদর্শন, “দশা-পাওয়া” অবস্থায় চিত্তের উজ্জ্বলতা,—এই সব ব্যাপার আমি স্বেচ্ছাক্রমে উৎপাদন করতে পারতাম। এই সব ব্যাপার ইতর লোকের বুদ্ধির অগম্য—কিন্তু আমার কাছে খুবই সোজা। আমি আরও উচ্চে উঠলাম। য়ুরোপীয় মঠের যে সব মহাপুরুষ ধ্যান-ধারণা সমাধির দ্বারা আশ্চর্য্য বিভূতি অর্জ্জন করে’, তার দ্বারা নানাপ্রকার অলৌকিক কাণ্ড করতেন, আমি তাও করতে সমর্থ হলাম। কিন্তু তবু আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল না। আত্মাকে আমি কিছুতেই ধর্তে পারলাম না। আমি আত্মাকে অনুভব করতে পারতাম, বুঝতে পারতাম, আত্মার উপর কার্য্যফল উৎপাদন করতে পারতাম। আমি আত্মার বৃত্তিগুলিকে জড়ীভূত কিংবা উত্তেজিত করতে পারতাম। কিন্তু আত্মা ও আমার মধ্যে যে মাংসের আবরণ আছে সেটাকে কিছুতেই অপসারিত করতে পারতাম না—পাছে আত্মাটা উড়ে পালায়। ব্যাধ যেমন জালে পার্থী ধরে’ জালটা তুলতে সাহস করে না—পাছে পাখীটা আকাশে উড়ে যায়-এ সেই রকম।
শেষে আমি ভারতবর্ষে যাত্রা করলাম—এই আশা করে’ যে, সেই পুরাতন জ্ঞানের দেশে আমার দুর্জ্ঞেয় সমস্যার মন্ত্রটি আমি পাব। আমি সংস্কৃত ও প্রাকৃত শিখ্লাম। আমি পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কথা কইতে সমর্থ হলাম; যেখানে থাবা পেতে বসে’ বাঘরা গর্জ্জন করে, সেই সব জঙ্গলে ঘুরে বেড়ালাম। যে সব পবিত্র সরোবরে কুমীরের বাস, সেই সব সরোবরের ধার দিয়ে চল্তে লাগলাম। লতাগুল্মে আচ্ছন্ন দুর্লঙ্ঘ্য অরণ্য পার হয়ে গেলাম। আমার পায়ের শব্দে বাদুড়ের ঝাঁক উড়ে গেল, বানরের পাল পালিয়ে গেল। যে পথে হরিণরা বিচরণ করে, সেই পথের বাঁক নেবার সময় একেবারে হাতীর মুখামুখী এসে পড়লাম। এইরকম করে’ অবশেষে একজন প্রসিদ্ধ যোগীর কুটীরে এসে পৌঁছিলাম। আমি তাঁর মৃগচর্ম্মের একপাশে বসে’, যোগানন্দের উচ্ছ্বাসে দশা—পাওয়া অবস্থায় তাঁর মুখ দিয়ে যে সব অস্পষ্ট মন্ত্র নিঃসৃত হচ্ছিল তাই খুব মন দিয়ে শুনতে লাগলাম; এইরকম করে কতদিন কেটে গেল। তার মধ্য থেকে বেছে যে শব্দগুলা খুব শক্তিমান সেই সব শব্দ, যে মন্ত্রে প্রেতাত্মাদের আবাহন করা যায়, সেই সব মন্ত্র, তারপর শব্দ-ব্রহ্মের মন্ত্র আমি মনে করে রাখ্লাম; দেবমন্দিরের অভ্যন্তরস্থ কক্ষে যে সব খোদাই কাজের বিগ্রহ আছে সেই সব বিগ্রহের তত্ত্বালোচনা করতে লাগলাম। এই সব গুপ্ত বিগ্রহ অদীক্ষিত লোকের অদর্শনীয়। কিন্তু আমার ব্রাহ্মণের বেশ ছিল বলে’ আমি সেই গুপ্ত কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করতে পেরেছিলাম; সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য, লুপ্ত সভ্যতার অনেক কাহিনী আমি পড়তে পারলাম; দেব-দেবীরা তাঁদের বহু হস্তে যে সব জিনিস ধারণ করেন, তার রূপক-অর্থ আমি আবিষ্কার করলাম।
ব্রহ্মার চক্রের উপর, বিষ্ণুর পদ্মের উপর, নীলকণ্ঠ শিবের সর্পের উপর আমি ধ্যান করতে লাগলাম। গণেশ তাঁর স্থূলচর্ম্ম শুণ্ড নড়িতে নাড়তে দীর্ঘপক্ষ্মবিশিষ্ট ছোট ছোট পিট-পিটে চোখ মেলে, একটু মৃদু হেসে যেন আমার এই সব গবেষণার চেষ্টায় উৎসাহ দিচ্ছিলেন। এই সব বিকট মূর্ত্তি তাদের প্রস্তর-ভাষায় আমাকে যেন বল্তে লাগলঃ—আমরা কতকগুলি আকার বই আর কিছুই নয়, আসলে আত্মাই জড়পিণ্ডের পরিচালক।”
“তিরুণামলয়”-মন্দিরের পুরোহিতের কাছে আমার সঙ্কল্পের কথা খুলে বলায়, তিনি একজন সিদ্ধ পুরুষের ঠিকানা আমাকে বলে দিলেন। সেই সিদ্ধ পুরুষ যোগী এলিফ্যাণ্টার গুহায় বাস করেন। আমি সেখানে গেলাম, গিয়ে দেখলাম—গুহার দেয়ালে ঠেসান দিয়ে, বাকল বস্ত্রে আচ্ছাদিত হয়ে, হাঁটু চিবুকে ঠেকিয়ে, হাতের আঙ্গুলগুলা পায়ের উপর আড়াআড়ি ভাবে রেখে একেবারে নিশ্চল হয়ে বসে’ আছেন। চোখের তারা ওল্টান—কেবল চোখের সাদা দেখা যাচ্ছে— ঠোট অনাবৃত দাঁতকে চেপে আছে। গায়ের চামড়ায় কষ ধরেছে;— চর্ম্ম অস্থিলগ্ন। চুল জটা পাকিয়ে পিছনে ঝুলে আছে। তাঁর দাড়ি দুইভাগে বিভক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েছে; গৃধ্রের নখের মত তাঁর নখ বেঁকে ঘুরে গেছে।
ভারতবাসীর মত তাঁর গায়ের রং স্বভাবতঃ শ্যামবর্ণ, কিন্তু প্রখর সূর্য্যের তাপে কালো পাথরের মত কৃষ্ণবর্ণ হয়ে গেছে। প্রথম দৃষ্টিতে আমার মনে হ’ল, লোকটা মৃত; বাহু ধরে নাড়া দিতে লাগলাম—মৃগীরোগে যে-রকম হয়—বাহুদুটো শক্ত ও আড়ষ্ট হয়ে গেছে। আমাকে যাতে দীক্ষিত বলে জান্তে পারেন, তাই আমার দীক্ষা-মন্ত্র তাঁর কাণের কাছে উচ্চৈঃস্বরে বল্তে লাগলাম; কিন্তু তবুও নড়ন—চড়ন নেই, চোখের পাতা একেবারে স্থির নিশ্চল। আমি তাঁকে জাগিয়ে তুলতে না পেরে চলে যাচ্ছিলাম, এমন সময় একটা অদ্ভুত ফট্ ফট্ শব্দ শুন্তে পেলুম; বিদ্যুৎ-আলোর মত একটা নীলাভ স্ফুলিঙ্গ চকিতের ন্যায় আমার চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল; সেই স্ফুলিঙ্গ যোগের আধ-খোলা ঠোটের উপর মুহূর্ত্তকাল সঞ্চরণ করে’ একেবারেই অন্তর্হিত হল।
ব্রহ্মলোগম্ (এই তাপসের নাম) মনে হল যেন নিদ্রাবস্থা থেকে জেগে উঠলেন। তাঁর চোখের তারা আবার যথাস্থানে এল; তিনি সদয়ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন।
“দেখ্, তোর বাসনা পূর্ণ হয়েছে; তুই একটি আত্মাকে দেখতে পেয়েছিস্। আমার ইচ্ছামত আমার আত্মাকে শরীর থেকে আমি বিযুক্ত করতে পারি। জ্যোতির্ম্ময় ভ্রমরের মত এই আত্মা শরীর থেকে বাহির হয়, আবার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে, তা’ কেবল সিদ্ধ পুরুষেরই দৃষ্টিগোচর হয়। আর কেউ দেখ্তে পায় না। আমি কত উপবাস করেছি, কত আরাধনা করেছি, কত ধ্যান-ধারণা করেছি, কি কঠোর ভাবেই দেহকে দীর্ণ করেছি—তবে আমি আমার আত্মাকে পার্থিব বন্ধন থেকে মুক্ত কর্তে পেরেছি এবং অবতার-মূর্ত্তি-গ্রহণের সময় যে রহস্যময় মহামন্ত্র বিষ্ণ—অবতারকে পথপ্রদর্শন করেছিল, সেই মহামন্ত্র বিষ্ণুদেব স্বয়ং আমার নিকট প্রকাশ করেছেন। যদি নির্দ্দিষ্ট মুদ্রাভঙ্গীসহকারে আমি সেই মন্ত্র উচ্চারণ করি, তাহা হইলে, পশু কিংবা মানুষ, যার শরীরে তোমার আত্মাকে আমি প্রবেশ করতে বল্ব, তার শরীরেই তোমার আত্মা প্রবেশ করে’ তাকে সজীব ক’রে তুলবে। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া এই মন্ত্র আর কেহই জানে না—এই গুপ্তমন্ত্রটি তোমাকেই দিয়ে যাচ্চি—কারণ, বুদ্বুদ্ যেমন সাগরে মিশিয়ে যায়, আমি সেইরূপ এখন অকৃত অমৃত ব্রহ্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে চাই।” তারপর এই যোগী সিদ্ধপুরুষ, মুমূর্ষর অস্তিম-শ্বাসের ন্যায় অতি ক্ষীণ স্বরে কতকগুলি শব্দ আবৃত্তি করলেন—সেই শব্দের উচ্চারণে আমার পিঠের উপর দিয়ে যেন একটা মৃদু কম্পনের তরঙ্গ চলে গেল।
অক্টেভ বলিয়া উঠিলেন:—
—এখন আপনি কি বলতে চান ডাক্তার মশায়? আপনার মৎলবটা কি? আমি ত কিছুই বুঝতে পারচি নে।
ডাক্তার বালথাজার শেরবোনো শান্তভাবে উত্তর করিলেনঃ-আমি তোমাকে এই কথা বলতে চাই—
আমার বন্ধু ব্রহ্মলোগমের মায়া-মন্ত্রটি আমি এখনো ভুলি নাই। কৌণ্ট ওলাফ্-লাবিন্স্কির শরীরের মধ্যে প্রবিষ্ট অক্টেভের আত্মাকে যদি কৌণ্টেস্ লাবিনস্কা চিন্তে পারেন তা’হলে বুঝব, কৌণ্টেস লাবিন্স্কার মত সুহ্মবুদ্ধি এ জগতে আর কেহই নাই।