বিষয়বস্তুতে চলুন

অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/৫

উইকিসংকলন থেকে
◄  
  ►

 চিকিৎসা ও বুজ্‌রুগি শক্তির জন্য, পারী নগরে ডাক্তার বাল্থাজার শেরবোনোর খুব পসার হইয়াছে; সত্যই হোক্, মিথ্যাই হোক্ তাঁর এই সব আজগুবি কাণ্ডের দরুণ, সর্ব্বত্রই তাঁর এখন আদর সম্মান। কিন্তু রোগী পাইবার চেষ্টা দূরে থাক্, তাঁর নিকট রোগী আসিলে, দরজা বন্ধ করিয়া উহাদিগকে ভাগাইয়া দেন, অথবা এরূপ ঔষধ-পত্র লিখিয়া দেন যাহা অতি অদ্ভুত এবং এরূপ নিয়ম ব্যবস্থার কথা বলেন, যাহা পালন করা অসম্ভব। ‘নিউমোনিয়া’, ‘এণ্টেরাইটিস’, ‘টাইফয়েড’—এই সব চলিত সাদামাটা, সাধারণ ইতর জনোচিত রোগে আক্রান্ত রোগীদিগকে অত্যন্ত অবজ্ঞার সহিত তাহাদের আগেকার ডাক্তারদের নিকট ফিরাইয়া পাঠাইয়া দেন। দুরারোগ্য উৎকট সৌখীন রোগে আক্রান্ত রোগীরই তিনি চিকিৎসা করেন; এবং তাঁর চিকিৎসায় রোগী অভাবনীয়রূপে আরোগ্য লাভ করে। রোগ-শয্যার পার্শ্বে দাড়াইয়া, তিনি এক পেয়ালা জলে ফুঁ দিয়া মায়া-মন্ত্র উচ্চারণ করিতে করিতে নানাপ্রকার মুদ্রাভঙ্গী করেন। মুমূর্ষুর অঙ্গ-প্রতঙ্গ শক্ত, আড়ষ্ট ও ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে, উহাকে সমাধি— ভূমিতে লইয়া যাইবার উদ্যোগ চলিতেছে;—সেই সময় উহার যন্ত্রণায় আড়ষ্ট দৃঢ়বদ্ধ চিবুক শিথিল করিয়া দিয়া ঐ মন্ত্রপূত জলের কয়েক ফোঁটা উহাকে গিলাইয়া দেওয়া হয়; তাহার পরেই রোগীর দেহের স্বাভাবিক নমনীয়তা, স্বাস্থ্যের রং আবার ফিরিয়া আসে। রোগী শয্যার উপর উঠিয়া বসিয়া বিস্মিতভাবে চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। তাই শেরবোনোকে সবাই মৃত্যুর ডাক্তার বলে, মৃতসঞ্জীবনের ডাক্তার বলে। এখনো ডাক্তার শেরবোনো সব সময়ে এই সব রোগের চিকিৎসা করিতে সম্মত হন না; অনেক সময় ধনী মুমূর্ষু রোগীদিগের নিকট হইতে প্রভূত অর্থের অঙ্গীকার পাইলেও উহাদিগকে প্রত্যাখ্যান করেন। যদি কোন জননী তার একমাত্র সন্তানের জীবনের জন্য তাঁহাকে কাতর অনুনয় করে, কোন প্রেমিক তার প্রাণ-প্রিয়ার প্রেমলাভে হতাশ হইয়া তাঁহার সাহায্য চাহে, অথবা যদি তিনি মনে করেন, যে ব্যক্তির জীবন সঙ্কটাপন্ন তাহার জীবন কাব্যের পক্ষে, বিজ্ঞানের পক্ষে, বিশ্বমানবের উন্নতির পক্ষে, বিশেষ প্রয়োজনীয়, তবেই তিনি তার মৃত্যুর সহিত যুঝাযুঝি করিতে সম্মত হন।

 এইরুপে তিনি ‘স্ক্রপ’—রোগে রুদ্ধ-শ্বাস একটি কোলের শিশুকে, যক্ষার শেষ-অবস্থায় উপনীত একটী রূপসী ললনাকে, সুরা বিকার গ্রস্ত একজন কবিকে, মস্তিষ্কের রক্ত-জমাটরোগে আক্রান্ত একজন যন্ত্র উদ্‌ভাবককে বাঁচাইয়া দিয়াছেন। তাঁর আবিষ্কারের হদিশটি তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্তিকার গর্ভে নিহিত হইবে, তাঁহার আচরণে এইরূপ মনে হয়। আবার তিনি এরূপ কথাও বলেন যে, প্রকৃতিকে উল্টাইবার চেষ্টা করা উচিত নহে, কতকগুলি লোকের মরাই উচিত—তাহাদের মৃত্যুর যুক্তিসঙ্গত হেতু আছে; তাহাদের মৃত্যুতে যদি বাধা দেওয়া যায় তাহা হইলে সমস্ত বিশ্বযন্ত্রে একটা বিশৃঙ্খলা ঘটিতে পারে। এখন স্পষ্টই দেখিতে পাইতেছ, ডাক্তার শেরবোনো একজন সৃষ্টিছাড়া লোক, বাতিকগ্রস্ত লোক; তাঁর এই বাতিকটা তিনি পূরাপূরি ভারতবর্ষ হইতে উর্জ্জন করিয়া আনিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাব সম্মোহনকারীর খ্যাতিটা চিকিৎসকের খ্যাতিকেও অতিক্রম করিয়াছিল। অল্পসংখ্যক বাছাবাছা লোকের সম্মুখে তিনি কয়েকবার বৈঠক দিয়াছিলেন, সেই বৈঠকে এমন সব অদ্ভুত ব্যাপার প্রদর্শন করিয়াছিলেন, যাহাতে করিয়া লোকের সম্ভব-অসম্ভবের সমস্ত সংস্কার ওলট-পালট হইয়া গিয়াছিল, এবং প্রসিদ্ধ যাদুকর ক্যাগ্‌লিয়ষ্ট্রার অদ্ভুত ঐন্দ্রজালিক ব্যাপারকেও অতিক্রম করিয়াছিল।

 ডাক্তার একটা পুরাতন হোটেলের একতলায় বাস করিতেন। আগেকার দস্তুরমত তাঁর ঘরগুলা সারি-সারি একলাইনে অবস্থিত। সেই সব ঘরের উঁচু জান্লা হইতে নীচের বাগান দেখা যায়। বাগানে বড়বড় গাছ; গাছের গুঁড়িগুলা কালো,—লম্বা লম্বা সবুজ পাতায় ঢাকা। শক্তিমান কতকগুলা তাপ-প্রবাহ যন্ত্রের মুখ হইতে তাপের জ্বলন্ত প্রবাহ বাহির হইয়া বড় বড় ঘরগুলাকে গরম রাখিয়াছে। এখন ঘরের তাপমান ৩৫ হইতে ৪০ ডিগ্রী। ভারতবর্ষের প্রখর গ্রীষ্মের উভাগে অভ্যস্ত ডাক্তার শেরবোনো, আমাদের দেশে ফ্যাঁকাসে সূর্য্যকিরণে, থরথর করিয়া কাঁপিতেন—ঠিক সেই ভ্রমণকারীদের মত, যাহারা নীল-নদীর সূত্রস্থান মধ্য-আফ্রিকা হইতে ‘কেরো’তে ফিরিয়া আসিয়া শীতে কাঁপিতে থাকে। তিনি গাড়ী বন্ধ-সন্ধ না করিয়া গৃহের বাহির হইতেন না; এবং শীত-কাতরের ন্যায় সর্ব্বশরীর পশু-লোমের আলখাল্লায় আচ্ছাদন করিয়া গরম—জলে—ভরা একটা টিনের চোঙ্গার উপর পা রাখিতেন।

 তাঁর এই ঘরগুলিতে কতকগুলা অনুচ্চ পালঙ্ক ছাড়া আর কোন আস্‌বাব ছিল না। পালঙ্কগুলা মালাবার দেশের ছিট—কাপড়ে আচ্ছাদিত,—তার উপর অদ্ভুত-আকৃতি হস্তী ও কাল্পনিক বিহঙ্গাদির চিত্র অঙ্কিত, ও সিংহলের আদিমবাসীদিগের দ্বারা রূঢ় ধরণে রং-করা ও সোনার গিল্টি করা; বিদেশী ফুলে-ভরা কতকগুলা জাপানী ফুলদানী এবং মেজের তক্তার উপর, ঘরের একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত, শতরঞ্জি বিছানো রহিয়াছে। কালো-সাদা ফুল-কাটা এই বিষাদময় শতরঞ্জি কারাগারের মধ্যে ঠগেরা বুনিয়াছে। তাহারা যে শোণের রসিতে গলায় ফাঁস লাগাইত, সেই শোণের সূতা দিয়া ইহার বুনানি হইয়াছে। পাথরের ও কাঁসার কতকগুলা হিন্দু-দেবদেবীর মূর্ত্তি রহিয়াছে; বাদামি আকারের দীর্ঘ চোখ—নাকে মাক্ড়ি—হাস্যময় স্থূল ওষ্ঠাধর, মুক্তার মালা নাভি পর্য্যন্ত ঝুলিয়া রহিয়াছে; উহাদের স্বরূপলক্ষণ অদ্ভুত ও রহস্যময়; মূর্ত্তিগুলা তলদেশস্থ বেদিকার উপর আসনপিঁড়ি হইয়া বসিয়া আছে। দেবালয়ের গায়ে গায়ে জল-রঙের চিত্র-পট ঝুলিতেছে; এই সকল চিত্র কলিকাতা কিংবা লক্ষ্ণৌর পটুয়াদের হাতের আঁকা। মৎস্য, কূর্ম্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন, রাম, কৃষ্ণ (যাকে কোন কোন স্বপ্ন-দর্শক হিন্দুখৃষ্ট মনে করেন) বুদ্ধ, কলি এই নয় অবতারের চিত্র। সর্ব্বশেষে নারায়ণের মূর্ত্তি— ক্ষীর-সমুদ্রের মধ্যে সুবক্র পঞ্চশীর্ষসর্প-বেদিকার উপর নিদ্রিত—কোন এক সময়ে শ্বেত-অশ্বের উপর আরোহণ করিয়া, শেষ-অবতার কলির মূর্ত্তি ধারণ করিয়া জগতের প্রলয়সাধন করিবেন তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছেন।

 সব-ঘরের পিছনে যে ঘর—সেই ঘরটি আরও বেশী করিয়া গরম করা; সেই ঘরে পাশাপাশি সংস্কৃত পুঁথিতে বেষ্টিত হইয়া বালথাজার শেরবোনো বাস করেন। পুঁথির অক্ষরগুলা পাত্লা পাত্লা কাষ্ঠফলকের উপর, লোহার লেখনীর দ্বারা উৎকীর্ণ; কাষ্ঠ-ফলকে ছিদ্র আছে, সেই ছিদ্রের মধ্যে দড়ি চালাইয়া, ফলকগুলা একত্র গ্রথিত হইয়াছে।

 আমরা য়ুরোপে যাহাকে পুস্তক বলি, এ সেরূপ ধরণের নহে। একটা বৈদ্যুতিক যন্ত্র—তাহা সোনালি ফুল-কাটা কতকগুলা বোতলে ভরা; বোতলের কাচের মুধে হাতল লাগান আছে—ঐ হাতলের দ্বারা উহা ঘুরান যায়। এই চঞ্চল ও জটিল যন্ত্রটার ছায়ামূর্ত্তি ঘরের মাঝখানে মাথা তুলিয়া রহিয়াছে। পাশে সম্মোহন কার্য্য-সংক্রান্ত একটা ছোট কাঠের টব; তাহার মধ্যে একটা ধাতুময় বল্লম ডোবান আছে এবং উহা হইতে অনেকগুলা লৌহ-শলাকা বাহির হইয়াছে। শেরবোনো একজন হাতুড়ে ছাড়া আর কিছুই নহে; সেইজন্য শেরবোনোর প্রকৃত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় কোন উদ্যোগ ছিল না। কিন্তু তবু পূর্ব্বেকার ‘আল্‌কিমি’-রাসায়নিকের পরীক্ষাগারে প্রবেশ করিলে মনের যে রকম ভাব হইত, তাঁর এই আজগুবি ধরণের পরীক্ষাগারে প্রবেশ করিলে মনে সেইরূপ একটা ভাব না হইয়া যায় না।

 কৌণ্ট ওলাফ্‌-লাবিন্‌স্কি লোক-মুখে শুনিয়াছিলেন, এই ডাক্তারের অনেক অলৌকিক চেষ্টা সফল হইয়াছে; তাই তাঁর অতি-বিশ্বাস-প্রবণ কৌতূহল উদ্দীপ্ত হইল। তিনি ডাক্তারের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলেন।

 যখন কৌণ্ট ডাক্তারের গৃহে প্রবেশ করিলেন, তখন তাঁর অনুভব হইল যেন একটা অস্পষ্ট অগ্নিশিখা তাঁহাকে ঘিরিয়া আছে; তাঁহার সমস্ত শরীরের রক্ত মাথার দিকে প্রবাহিত হইল, তাঁহার রগের শিরাগুলা দব্‌দব্‌ করিতে লাগিল; ঘরের দুঃসহ উত্তাপে তাঁর যেন শ্বাসরোধ হইল। প্রদীপে যে তেল পুড়িতেছিল, কুলদানীতে যাভাদ্বীপের যে সব মসলাদার বৃহৎ পুষ্প দুলিতেছিল—সেই তেল ও পুষ্পের তীব্র গন্ধে তাঁর মাথা ধরিয়া গেল। মাতালের মত টলিতে টলিতে, ডাক্তারের অভিমুখে কৌণ্ট কিয়ৎপদ অগ্রসর হইলেন। ডাক্তার শেরবোনো সন্ন্যাসীদিগের মত আসনপিঁড়ি হইয়া পালঙ্কে বসিয়াছিলেন। পরিচ্ছদে আচ্ছাদিত ডাক্তারের শীর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যে ভাবে দেখা যাইতেছিল, দেখিলে মনে হয় যেন একটা মাকড়শা জালের মধ্যে থাকিয়া তাহার শিকারের উদ্দেশ্যে নিশ্চলভাবে বসিয়া আছে। কৌণ্টকে দেখিবামাত্র তাঁহার ফস্‌ফরস-দীপ্ত চোখ—দুইটা সহসা জ্বলিয়া উঠিল। কিন্তু পরক্ষণেই ইচ্ছা করিয়া উহা নিভাইয়া দিলেন। তাহার পর ডাক্তার, ওলাফের দিকে হাত বাড়াইয়া দিলেন। ওলাফ অসোয়ান্তি অনুভব করিতেছেন, ডাক্তার বুঝিতে পারিয়াছিলেন —তাই, দুই-তিনবার হাতের ‘ঝাড়া’ দিয়া তাঁহার চারিদিকে বসন্তের আব—হাওয়া উৎপাদন করিলেন,—এই উত্তপ্ত জ্বালাময় নরকের মধ্যে সুশীতল স্বর্গের আবির্ভাব ঘটাইলেন।

 “এখন ত আপনি ভাল বোধ কর্‌চেন? আপনি বাল্টিকের তুষারশীতল হাওয়ায় অভ্যন্ত, তাই ঘরের এই উত্তপ্ত হাওয়া, কামারের কারখানায় হাপরের জ্বলন্ত হাওয়ার মত আপনার মনে হচ্চিল—কিন্তু ভারতের প্রখর সূর্য্যকিরণে দগ্ধ-বিদগ্ধ যে আমি, এই উত্তাপেও আমি শীতে কাঁপছিলাম।”

 কৌণ্ট ওলাফ একটা ইঙ্গিত করিয়া প্রকাশ করিলেন যে এখন আর তাঁহার গরমে কষ্ট হইতেছে না।

 ডাক্তার অতি সরলভাবে বলিলেন,—“আপনি অবশ্য আমার ‘ঝাড়া দেওয়া’র কথা, আমার সম্মোহন বিদ্যার কথা শুনেছেন? তবে কি একটা নমুনা এখন দেখতে ইচ্ছা করেন?”

 কৌণ্ট উত্তর করিলেন:— “আমার কৌতুহল ওরূপ ছেলে-মান্‌ষি ধরণের নয়। যিনি একজন বিজ্ঞানের সম্রাট, তাঁর উপর আমার শ্রদ্ধা-ভক্তি উহা অপেক্ষা অনেকটা বেশী।”

 —“বৈজ্ঞানিক বল্লে যে অর্থ বোঝায় আমি সে অর্থে একজন বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত নই; বরং বিজ্ঞান যে সকল জিনিসকে অবজ্ঞা করে, সেই সকল জিনিসের অনুশীলন করে’ আমি অপ্রযুক্ত কতকগুলি গূঢ় শক্তিকে আয়ত্ত করেছি, এবং তার থেকে এমন সব ব্যাপার দেখাতে পারি, যা প্রাকৃতিক হ’লেও অত্যন্ত বিস্ময়জনক বলে মনে হয়। বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরবার জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকে, আমিও তেমনি অপেক্ষা করে থেকে সময় বুঝে তীক্ষ্ণ দৃষ্টির প্রভাবে কোন আত্মার রহস্য ঝট্ করে ধরে ফেল্তে পারি; সেই আত্মাটি তথন সব কথা খুলে আমাকে বলে,—তাতেই আমার কাজ হাসিল হয়, আমি তার কতকগুলি কথা মনে করে’ রাখি। আত্মাই সব, জড়জগৎ শুধু একটা বাহ্য আবির্ভাব। বিশ্বজগৎ সম্ভবত ঈশ্বরের একটা স্বপ্নমাত্র অথবা অসীমের মধ্যে, শব্দ-ব্রহ্ম হতে নিঃসৃত একটা বহির্বিকাশ মাত্র। আমি ইচ্ছামত শরীরকে চীরবস্ত্রের মত সঙ্কুচিত করতে পারি, জীবনীশক্তিকে আটকাতে পারি বা দ্রুত চালিয়ে দিতে পারি, আমি আকাশকে বিলাপ করতে পারি, ক্লোরোফ্র্ম্ প্রভৃতির সাহায্য না নিয়েও কষ্টকে নষ্ট করতে পারি। মানসিক তড়িৎ এই যে ইচ্ছাশক্তিতে সজ্জিত হয়ে আমি জীবন দান করি, কাউকে বা বজ্রাঘাতে ধরাশায়ী করি। আমার চক্ষের সমক্ষে কোনও জিনিসই অস্বচ্ছ নয়; আমি চিন্তার রশ্মিগুলি স্পষ্ট দেখতে পাই। যেমন বেলোয়ারি কাচের কলমের মধ্য দিয়ে বিশ্লিষ্ট সূর্য্যালোকের বর্ণচ্ছটা পর্দ্দার উপর প্রক্ষিপ্ত হয়, সেইরূপ আমার অদৃশ্য বেলোয়ারি কলম দিয়ে আমি ঐ চিন্তা-রশ্মিগুলি আমার সাদা মস্তিষ্ক-পটের উপর ইচ্ছাশক্তির বলে প্রতিফলিত করিতে পারি। কিন্তু ভারতের সিদ্ধপুরুষ যোগীরা যাহা করেন তাহার কাছে এ সব কিছুই নয়। আমরা য়ুরোপের লোক,— আমরা অত্যন্ত লঘুপ্রকৃতি, অত্যন্ত বিক্ষিপ্তচিত্ত, অত্যন্ত অসার; আমাদের কাদা-মাটির কারাগারটি আমাদের নিকট এতই প্রিয় যে, আমরা অনন্ত ও অসীমের বৃহৎ জানলাগুলো খুল্তে পারি নে। তথাপি আমার পরীক্ষা হতে আমি কতকগুলি আশ্চর্যা ফল পেয়েছি, তা দেখ্লে আপনি নিজেই বিচার করতে পারবেন।”

 এই কথা বলিয়া ডাক্তার শেরবোনো একটা বড় দরজায় টাঙ্গানো একটা পর্দ্দার শিকের উপর দিয়া কতকগুলা আঙ্টা সরাইয়া দিবামাত্র ঘরের পশ্চাদ্ভাগের একটা প্রচ্ছন্ন কুঠরী বাহির হইয়া পড়িল। তাঁবার টেপাইয়ের উপর সুরাসারের অগ্নিশিখা জ্বলিতেছিল, তাহার আলোকে কৌণ্ট ওলাফ্ যে দৃশ্য দেখিলেন তাহা অতি ভীষণ, তাহা দেখিয়া এমন যে সাহসী পুরুষ কৌণ্ট, তাঁহারও সর্ব্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। একটা কালো টেবিলের উপর কটিদেশ পর্য্যন্ত নগ্ন একটি যুবাপুরুষ শয়ান—শবের মত নিশ্চল। শরশয্যাশায়ী ভীষ্মের মত তাহার দেহে কতকগুলো শলাকা বিদ্ধ হইয়া রহিয়াছে, কিন্তু তাহা হইতে একবিন্দুও রক্ত ঝরিতেছে না। দেখিলে মনে হয় যেন কোন ধর্ম্মবীর ‘মার্টারের’ মূর্ত্তি, কেবল ক্ষতস্থানে চিত্রকর যেন লাল রং দিতে ভুলিয়া গিয়াছে।

 ওলাফ্ মনে মনে ভাবিলেন, এই ডাক্তার বোধহয় শিবের একজন ভক্ত উপাসক—এই লোকটিকে বোধ হয় শিবের নিকট বলি দিবার মতলব করিয়াছে।

 “ওর কিছুই কষ্ট হচ্চে না; ওর গায়ে চিম্টি কেটে দেখুন, ওর মুখের একটি পেশিও নড়বে না।” এই কথা বলিয়া আলপিনের গদি হইতে আল্‌পিন বাহির করিবার মত ডাক্তার উহার গাত্র হইতে শলাকাগুলো বাহির করিয়া লইলেন। উহার উপর তাড়াতাড়ি কয়বার হস্ত-সঞ্চালনের পর বা ‘ঝাড়া’ দিবার পর, উহার ওষ্ঠাধরে যোগানন্দের একটি মৃদু-মধুর হাসির রেখা দেখা দিল—যেন সে একটা সুখস্বপ্ন হইতে জাগিয়া উঠিয়াছে। একটা ইঙ্গিত করিয়া ডাক্তার শেরবোনো তাকে ছুটি দিলেন। কাঠের কারুকার্য্য-ভূষিত ঐ প্রচ্ছন্ন প্রকোষ্ঠের কাষ্ঠকাঠামের মধ্যস্থিত একটা কাটা দরজা দিয়া সে প্রস্থান করিল। মৃদু হাসির ছলে ডাক্তার মুখের বলি-রেখাগুলা বেণী পাকাইয়া বলিলেন—

 “আমি ওর একটা পা কিংবা হাত কেটে ফেল্তে পারতাম,—ও টেরও পেত না। আমি তা করলাম না, কেন না, আমি এখনো সৃষ্টি করতে পারি নে। এ বিষয়ে মানুষ টিক্‌টিকি হতেও অধম, মানুষের এতটা শক্তিবিশিষ্ট জীবন-রস নেই যে কাটা অঙ্গ আবার নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। আমি সৃষ্টি করতে পারিনে বটে, কিন্তু আমি নবযৌবন এনে দিতে পারি।” এই কথা বলিয়া তিনি এক বৃদ্ধা রমণীর অবগুণ্ঠন উঠাইয়া লইলেন; কালো মার্ব্বেল টেবিলের অনতিদূরে, সেই বৃদ্ধা এক আরাম-কেদারায় চৌম্বক নিদ্রায় নিদ্রিত ছিল; তাহার মুখশ্রী, মনে হয়, এক সময়ে সুন্দর ছিল, এখন শুষ্ক ম্লান হইয়া গিয়াছে, এবং তাঁহার বাহুর, তাহার স্কন্ধের, তাহার বক্ষের শীর্ণ গঠনের উপর কালের উপদ্রব স্পষ্ট লক্ষিত হয়। ডাক্তার স্বীয় নীল তারার প্রখর স্থির দৃষ্টি খুব আগ্রহের সহিত, কয়েক মিনিট ধরিয়া তাহার উপর নিবদ্ধ করিলেন; ক্ষীণরেখাগুলি আবার পূর্ব্ববৎ সরল হইয়া উঠিল; কুমারী-সুলভ বক্ষের সুগোলগঠন আবার ফিরিয়া আসিল। কণ্ঠের শীর্ণতা আবার শুভ্রবর্ণ সার্টিন্আভ মাংসে ভরিয়া গেল। গাল বেশ সুগোল হইল, এবং পিচ্ফলের ন্যায় ঈষৎ গোল ও পেলব হইয়া যৌবনের তাজাভাব ধারণ করিল; উন্মীলিত নেত্রযুগল, একপ্রকার সজীব তরল রসে ভরিয়া গিয়া ঝিক্‌মিক্‌ করিতে লাগিল। যেন যাদুমন্ত্রে বার্দ্ধক্যের মুখটা থসিয়া গেল, এবং বহুকাল-অন্তর্হিতা সেই সুন্দরী যুবতীকে আবার দেখিতে পাওয়া গেল। এই রূপান্তর-দর্শনে কৌণ্ট হতবুদ্ধি হইয়া পড়িয়াছিলেন; ডাক্তার তাঁহাকে বলিলেন:—

 “আপনি কি বিশ্বাস করেন, এই স্থুল যৌবনের উৎস হইতে নিঃসৃত অলৌকিক জল-ধারার কতকটা জলে এই রূপান্তর ঘটিয়াছে? আমি বিশ্বাস করি, কেননা, মানুষ নূতন কিছুই উদ্‌ভাবন করতে পারে না; মানুষের প্রত্যেক স্বপ্নই একটা ভবিষ্যৎ দর্শন কিংবা একটা অতীতের স্মৃতি।—কিন্তু আমার ইচ্ছা বলে এই মূর্তিটিকে প্রস্তরে পরিণত করেছিলাম, এখন মুহূর্ত্তের জন্য ওকে ছেড়ে দেওয়া যাক্। আর ঐ কোণে যে মেয়েটি শান্তভাবে নিদ্রা যাচ্চে, এখন ওর সঙ্গে একটু পরামর্শ করা যাক্। ঐ মেয়েটির ডল্‌ফির পুরোহিতের চেয়েও দূর-দৃষ্টি। বোহিমিয়া প্রদেশে আপনার যে ৭টি দুর্গ-প্রসাদ আছে, তারই কোন একটি প্রাসাদে ওকে আপনি পাঠিয়ে দিতে পারেন; আপনার দেরাজে সব-চেয়ে গোপনীয় জিনিস কি আছে, ওকে জিজ্ঞাসা করুন—ও বলে দেবে। সেখানে পৌঁছাতে ওর আত্মার এক-সেকেণ্ডেরও বেশি লাগবে না। যাই হোক্‌, ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্য্য বটে; কেন না ঐ একই সময়ের মধ্যে তাড়িৎ ৭০ মাইল লীগ্ অতিক্রম করে; আর, রেল-গাড়ীর কাছে ঘোড়ার গাড়ী যে রকম, চিন্তার কাছে তাড়িৎশক্তিও সেই রকম। আপনার সঙ্গে ওর সম্বন্ধ নিবদ্ধ করবার জন্য আপনি ওর হাতে হাত দিন; আপনার প্রশ্নটি সম্বন্ধে ওকে জিজ্ঞাসা করাও আবশ্যক হবে না। ও আপনার মনোগত প্রশ্ন এম্‌নিই জানতে পারবে।”

 কৌণ্ট মনে মনে যে প্রশ্ন করিলেন, ঐ মেয়েটি অতি ক্ষীণ স্বরে তাহার উত্তর দিল:—

 “সিডার কাঠের সিন্দুকের ভিতর, অতিসূক্ষ্ম বালির গুঁড়ার মত এক টুক্‌রা মাটি আছে তার উপর একটা ছোট পায়ের ছা্প্ দেখা যায়।”

 ডাক্তার তাঁর স্বপ্নদর্শী মেয়েটির অভ্রান্ততায় যেন দৃঢ়নিশ্চয় এই ভাবে কোন দ্বিধা না করিয়াই বলিলেন:—

 —“মেয়েটি ঠিক বলেছে কি না?”

 কৌণ্টের গাল লাল হইয়া উঠিল। বস্তুতঃ তাঁহাদের ভালবাসার প্রথম অবস্থায়, একটা উপবনের বালুময় গলিপথে তরুণী প্রাঙ্কোভির গায়ের যে ছাপ্ পড়িয়াছিল; বালুময় মাটিসমেত সেই ছাপ্‌টি কৌণ্ট উঠাইয়া লইয়া ঝিনুক ও রূপা-খচিত একটা বাক্‌সোর ভিতর, সেই ছাপ্-সমেত মৃত্তিকাখণ্ড স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ সযত্নে রাখিয়া দিয়াছিলেন। এবং উহার অতি ক্ষুদ্র চাবিটি একটি খুব সরু চেনে বদ্ধ হইয়া তাঁহার গলায় ঝুলিত।

 শিষ্টাচারে অভ্যস্ত ডাক্তার, কৌণ্টের লজ্জা-সঙ্কোচ লক্ষ্য করিয়া আর পীড়াপীড়ি করিলেন না, এবং তাঁহাকে একটা টেবিলের অভিমুখে লইয়া গেলেন। ঐ টেবিলের উপর হীরকের ন্যায় স্বচ্ছ খানিকটা জল রাখা হইয়াছিল।

 “যে ঐন্দ্রজালিক আর্শিতে, মেফিস্টোফেলিস্ ফৌষ্টকে হেলেনের মূর্ত্তি দেখিয়েছিল, সেই আর্শির কথা বোধ হয় আপনি শুনেছেন; আমার রেশমী মোজার মধ্যে ঘোড়ার খুর ও আমার টুপিতে দুইটা কুঁকড়োর পালক না থাক্‌লেও একটা আশ্চর্য্য কাণ্ড দেখিয়ে আপনাকে নির্দ্দোষ আমোদ দিতে পারি। এই জল-পাত্রের উপর আপনি ঝুঁকে থাকুন, আর যে রমণীকে আপনি এখানে আন্‌তে চান, একাগ্রচিত্তে তাঁকে চিন্তা করুন। জীবিত হোক্, বা মৃত হোক্, দূরে থাকুক বা নিকটে থাকুক—জগতের শেষ-প্রান্ত থেকে, ইতিহাসের গহন রসাতল থেকে সে আপনার ডাকে এখানে এসে উপস্থিত হবে।”

 ডাক্তারের কথামত কৌণ্ট জল-পাত্রের উপর ঝুঁকিয়া রহিলেন। একটু পরেই তাঁহার দৃষ্টির প্রভাবে, পাত্রের জল বিক্ষুব্ধ হইয়া ‘ওপ্যাল’মণির বর্ণ ধারণ করিল; জল-পাত্রের কিনারাটা বেলোয়ারি কলমে বিশ্লিষ্ট বিচিত্র বর্ণচ্ছটায় বিভূষিত হইল। ইহা যেন একটা ছবির ফ্রেমের মত হইল। ছবি আগেই আঁকা হইয়া গিয়াছে—কিন্তু উহা সাদাটে মেঘে আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে।

 ক্রমে কুয়াসাটা মিলাইয়া গেল। অম্‌নি স্বচ্ছ জলের উপর এক তরুণীর ছবি ফুটিয়া উঠিল। পরিধানে আলখাল্লার ন্যায় একটা শিথিল পরিচ্ছদ; নেত্রযুগলের বর্ণ সমুদ্র-হরিৎ, কুঞ্চিত স্বর্ণ-কুণ্ডল, পিয়ানোর পর্দ্দাগুলোর উপর চঞ্চল সুন্দর হাতদুটি ছুটিয়া বেড়াইতেছে। ছবিখানি এমন চমৎকার আঁকা যে, তাহা দেখিলে গুণী চিত্রকরেরাও ঈর্ষায় মরির যাইত।—

 ইনিই রাণী প্রাস্কোভি লাবিন্‌স্কা; আবেগময় আহ্বান শুনিয়া আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। ডাক্তার, কৌণ্ট—ওলাফের হস্ত গ্রহণ করিয়া সম্মোহন-জল-পাত্রের একটা পায়ার উপরে উহা স্থাপিত করিলেন। বৈদ্যুতিক চুম্বক-শক্তিতে ভরা ঐ ধাতুখণ্ড একটু স্পর্শ করিবামাত্র কৌণ্ট যেন বজাহত হইয়া ভূতলে পড়িয়া গেলেন।

 ডাক্তার উহাকে বাহুর দ্বারা জড়াইয়া ধরিলেন, এবং হাল্‌কা পালকের মত উঠাইয়া লইয়া একটা পালঙ্কের উপর শুয়াইয়া দিলেন। তারপর ঘণ্টা বাজাইয়া ভূত্যকে ডাকিলেন। ভূত্য দরজার চৌকাঠে আসিয়া দাঁড়াইল। ডাক্তার বলিলেন—

 “অক্টেভকে এথানে নিয়ে আয়।”