বিষয়বস্তুতে চলুন

অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/৭

উইকিসংকলন থেকে
◄  
  ►

 অক্টেভের শরীরে এখন ওলাফ-লাবিন্‌স্কির আত্মা বাস করিতেছে। সঙ্গে আছেন একাকী ডাক্তার বালথাজার শেরবোনো। এখন এই জড়পিণ্ড দেহটাকে ডাক্তার আবার সচেতন করিতে উদ্যত হইলেন। নিশ্চেষ্ট ও আড়ষ্টভাবে অক্টেভ-দেহধারী ওলাফ পালঙ্কের এককোণে আবদ্ধ ছিলেন কতকগুলা ‘ঝাড়া’ দিবার পর ওলাফ-অক্টেভ (পরস্পরের শরীরে পরস্পরের আত্মার বিনিময় হইয়াছে বলিয়া এক্ষণে এইরূপ নামকরণ করিতে হইল) নরকস্থ প্রেত-ছায়ার ন্যায় তাঁহার গভীর নিদ্রা হইতে, অথবা মৃগীরোগের মূর্চ্ছা-মোহ হইতে যন্ত্রের মত উঠিয়া দাঁড়াইলেন, কিন্তু এখনো ইচ্ছা-শক্তির দ্বারা তাঁর গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হইতেছিল না; এখনো ‘মাথাঘোরা’টা সম্পূর্ণরূপে কাটিয়া যায় নাই; এখনো পা টলিতেছিল। তাঁর চারিদিকে পদার্থ সকলের মধ্যে একটা যেন চাঞ্চল্য উপলব্ধি করিতেছিলেন, বরাবর দেওয়ালের ধারে ধারে বিষ্ণু অবতারদিগের যেন তাণ্ডব নৃত্য চলিতেছিল। ডাক্তার শেরবোনো সেই এলিফ্যাণ্টা সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিয়াছেন, দুই হাতে পাখীর ডানা-ঝাড়ার মত হাতঝাড়া দিতেছেন। চসমার চক্ররেখার ন্যায় শ্যামল বলি-রেখা-বিশিষ্ট নেত্র-মণ্ডলের মধ্যস্থিত নীলবর্ণ দুই তারা ঘুরিতেছে—ডাক্তারের সম্মোহন-প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ চৈতন্য-লোপের পূর্ব্বে ওলাফ এই যে সব অপূর্ব্ব দৃশ্য দেখিয়াছিলেন, ঐ সব দৃশ্য আবার তাঁহার বুদ্ধিবৃত্তির উপর কাজ করিতে লাগিল; ক্রমে আস্তে আস্তে বাস্তব পদার্থ সকল তাঁহার উপলব্ধি হইল। বুক-চাপা দুঃস্বপ্ন হইতে স্বপ্নদর্শী হঠাৎ জাগিয়া উঠিলে যেরূপ হয়, আসবার-পত্রের উপর ছড়ানো কাপড়-চোপড়কে প্রেতের উপছায়া এবং দীপালোকে উদ্‌ভাসিত পর্দ্দার তাঁবার আংটা-কড়াগুলাকে দৈত্যের জ্বলন্ত চোখ বলিয়া তাঁহার ভ্রম হইতেছিল।

 ক্রমশঃ এই ছায়াবাজির দৃশ্য অন্তর্হিত হইল। আবার সমস্তই স্বাভাবিক আকার ধারণ করিল। ডাক্তার শেরবোনো এখন আর ভারতবর্ষের তাপস সন্ন্যাসী নহেন, এখন তিনি চিকিৎসক ডাক্তার মাত্র; তিনি সাদামাটা ভদ্রতার হাসি মুখে আনিয়া ওলাফকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন: “কৌণ্ট-মহাশয়, আমি আপনার সম্মুখে যে পরীক্ষাগুলি দেখিয়ে ধন্য হয়েছি, সেই পরীক্ষাগুলি দেখে আপনি কি পরিতুষ্ট হয়েছেন?” —এই অতি-নম্র কথার মধ্যে যে একটু বিদ্রূপের ভাব ছিল না এ কথা বলা যায় না। তারপর আবার বলিতে লাগিলেন: “ভরসা করি আমার সান্ধ্য-বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে’ আপনি পরিতাপ করবেন না, আর বোধ হয় এখন আপনার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, দস্তুরমোতাবেক বিজ্ঞান যাকে গাল-গল্প ও বাজিকরের খেলা বলে’ উড়িয়ে দেয়, সেই সম্মোহন-প্রক্রিয়ার কথা সমস্তই গাল-গল্প ও বাজিকরের হাতের চালাকি নয়।” ডাক্তারের কথায় সায় দিবার ভাবে, অক্টেভ-দেহধারী কৌণ্ট ওলাফ মাথা নাড়িয়া ইসারায় উত্তর করিলেন, এবং ডাক্তার শেরবোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন; ডাক্তার প্রত্যেক দরজার কাছে আসিয়া খুব মাথা হেঁট করিয়া কৌণ্টকে নমস্কার করিতে লাগিলেন।

 ব্রুহাম গাড়ী অগ্রসর হইয়া একেবারে সোপান ধাপ ঘেঁসিয়া দাড়াইল। কৌণ্টেস্-লাবিন্‌স্কার পতি, অক্টেভ দেহধারী কৌণ্ট ওলাফ, সহিস কোচম্যানের উর্দ্দি-পোষাক বা গাড়ীর গঠনের প্রতি বড় একটা লক্ষ্য না করিয়াই গাড়ীতে উঠিয়া পড়িলেন।

 কোচ্‌ম্যান জিজ্ঞাসা করিল—“কোথায় যাইবেন?” সবুজ-পোষাকপর তাঁর কোচ্ম্যান সচরাচর যে স্বরে তাঁকে এই কথা জিজ্ঞাসা করিত, সেই স্বর শুনিতে না পাইয়া তাঁর গোলমাল ঠেকিল,—তিনি বিস্মিত হইয়া উত্তর করিলেন:—

 “আমার বাড়ী—আবার কোথায়?

 এখন এই ব্রুহাম গাড়িতে উঠিয়া দেখিলেন, গাড়ীটা ঘোর নীল রঙের ফুল-কাটা পশমি কাপড়ে মণ্ডিত; সাটিন-মোড়া বোদামে বিভূষিত। এই সব প্রভেদ সত্ত্বেও তিনি উহা নিজের গাড়ী বলিয়া মানিয়া লইলেন। যেরূপ স্বপ্নে, সচরাচর দৃষ্ট পদার্থ অন্ত আকারে দেখা দিলেও সেই পদার্থ বলিয়াই মনে হয়, ইহাও কতকটা সেইরূপ। ইহাও তাঁহার মনে হইল, তিনি আসলে যাহা, তাহা অপেক্ষাও যেন খাটো; তা’ ছাড়া তাঁর মনে হইল, তিনি ডাক্তারের বাড়ী কোট পরিয়া গিয়াছিলেন এবং সেই পরিচ্ছদ তিনি যে পরিবর্ত্তন করিয়াছিলেন, তাত ত তাঁর স্মরণ হয় না—এখন দেখিলেন, একটা পাতলা কাপডের আলখাল্লা পরিয়া আছেন; এ পরিচ্ছদ তাঁর কাপড়ের আলমারি হইতে ত কখনই বাহির হয় নাই! তিনি অননুভূতপূর্ব্ব একটা সঙ্কোচ অনুভব করিতে লাগিলেন, প্রাতঃকালে তাঁর চিন্তাপ্রবাহ এমন স্বচ্ছ ছিল, এখন যেন সমস্তই কুয়াসাচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে। সেই সান্ধ্য বৈঠকের অপূর্ব্ব অদ্ভুত দৃগুগুলার উপর তিনি এই অবস্থাটা আরোপ করিয়া ঐ বিষয়ের চিন্তায় মন দিলেন না; গাড়ীর কোণে মাথা রাখিয়া একটা এলোমেলো চিন্তাপ্রবাহে না-নিদ্রা না-জাগরণ এইরূপ একটা তন্দ্রাবস্থার মধ্যে আপনাকে ছাড়িয়া দিলেন।

 ঘোড়া এক জায়গায় আসিয়া থামিয়া পড়ায় এবং কোচ্‌ম্যান উচ্চৈঃস্বরে “ফাটক”, বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠায়, তিনি আপনাতে ফিরিয়া আসিলেন; শার্শি নামাইয়া দিয়া, গাড়ীর জান্লা হইতে মাথা বাহির করিলেন, এবং রাস্তার গ্যাসের আলোয় দেখিতে পাইলেন, এ একটা অপরিচিত রাস্তা, বাড়ীটাও তাঁর বাড়ী নয়। তিনি বলিয়া উঠিলেন:—

 “আমাকে কোথায় নিয়ে এলি? এই কি তবে লাবিন্‌স্কির হোটেল?”

 —“হুজুর, মাপ করবেন, আমি তা’হলে বুঝতে পারি নি” কোচ্ম্যান এই কথা গুন্ গুনস্বরে বলিয়া, কথিত স্থানের অভিমুখে অশ্বযুগলকে আবার চালাইয়া দিল।

 যাত্রা-পথে রূপান্তরিত কৌণ্ট, মনে মনে অনেক প্রশ্ন করিলেন, কিন্তু তাহার উত্তর দিতে পারিলেন না। “আমাকে না লইয়া আমার গাড়ী কেন চলিয়া গেল, আমি ত আমার জন্য অপেক্ষা করিতে হুকুম দিয়াছিলাম!” “আর একজনের গাড়ীতে আমি কেন উঠিলাম?” তিনি অনুমান করিলেন, হয় ত একটু জ্বরভাব হওয়ায়, তাঁর জ্ঞান অস্পষ্ট হইয়া পড়িয়াছিল; হয় ত সেই “মনের” ডাক্তার, তাঁর বিশ্বাস— প্রবণতা আরও বাড়াইবার জন্য, তাঁর নিদ্রিত অবস্থায় “হাশিশ্” কিংবা উহারই মত কোন প্রকার বিভ্রম-উৎপাদক মাদক দ্রব্য খাওয়াইয়া দিয়াছিলেন। একরাত্রি বিশ্রাম করিলেই এই সব বিভ্রম নিশ্চয় চলিয়া যাইবে।

 লাবিন্‌স্কির হোটেলে গাড়ী আসিয়া পৌঁছিল।

 দরোয়ানকে ফাটক খুলিতে বলায় দরোয়ান ফাটক খুলিতে অস্বীকৃত হইয়া বলিল, “আজ রাত্রে লোক অভ্যর্থনা হবে না; কেননা হুজুর দুই—এক ঘণ্টার উপর হ’ল বাড়ী এসেছেন— আর রাণী বিশ্রামের জন্য নিজের মহলে চলে গেছেন।”

 ভ্রমণকারী অশ্বারোহী পুরুষদিগকে যাদুকরা রাজ— প্রাসাদে প্রবেশ নিষেধ করিবার জন্য, আরবদেশের কাহিনীতে প্রকাণ্ড তাম্রমূর্ত্তিসকল যেরূপ দ্বার আগলাইয়া থাকে, সেইরূপ প্রকাণ্ড ভীমকায় যে দরোয়ান খুব জাঁকজমক ভাবে অর্দ্ধ-উন্মুক্ত ফাটকের সম্মুখে খাড়া হইয়াছিল, তাহাকে অক্টেভ-দেহ-ওলাফ এক ঠেলা দিয়া বলিলেন:—

 “আরে বেটা, তুই মাতাল না পাগল?”

 এই কথা শুনিয়া দরোয়ানের লাল মুখ রাগে নীল হইয়া উঠিল—সে উত্তর করিল:—

 “মশাই, আপনিই মাতাল কিংবা পাগল।”

 অক্টেভ-দেহ-ওলাফের মুখ লাল হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন “হতভাগা, যদি আমার আত্মমর্যাদা না থাকত......”

 বারোয়ারীর সং ভীমের প্রকাণ্ড এক হাত বাহির করিয়া সেই প্রকাণ্ডকায় দরোয়ান উত্তর করিল:—

 “চুপ কর! নৈলে আমার এই হাঁটুর তলায় তোর মাথাটা গুঁড়োগুঁড়ো করে’, রাস্তার উপর ছুড়ে ফেলব। বাছাধন, আমার সঙ্গে চালাকি না,——দুই-এক বোতল শ্যাম্পেন বেশী মাত্রায় খেয়েছ বলে’ এ সব চালাকি আমার কাছে চলবে না।”

 এই কথা অক্টেভ-দেহ-ওলাফ আর বরদাস্ত করিতে না পারিয়া তাহাকে এমন এক ঠেলা দিলেন যে, সেই ঠেলায় সে গাড়ীবারাণ্ডার তলায় গিয়া পড়িল। যে সব ভৃত্য তখনও শুইতে যায় নাই, তাহারা একটা গোলমাল শুনিয়া দৌড়িয়া আসিল।

 “হতভাগা, পাজি, নচ্ছার! তোকে আমি জবাব দিলাম। আজ এই রাত্তিরটাও তুই এই বাড়ীতে থাকিস্ আমার ইচ্ছা নয়; দূর হ এখান থেকে —নৈলে হর্নে কুকুরের মত তোকে এখনি হত্যা করব। একজন নীচ ভূত্যের রক্তে আমার হাতকে কলঙ্কিত করতে আমাকে বাধ্য করিস্‌নে বল্‌চি।”

 তাহার পর স্বদেহ হইতে বেদখল কৌণ্ট ঐ অতিকায় দরোয়ানের দিকে ছুটিয়া আসিলেন—তাঁহার চোখ দুইটা ক্রোধে বিস্ফারিত, ঠোঁটের উপর ফেনপুঞ্জ, হাতের মুঠা কুঞ্চিত। দরোয়ান কৌণ্টের দুই হাত তাহার এক হাতের ভিতর লইয়া মধ্যযুগের যন্ত্রণা দিবার পাক-সাঁড়াশী যন্ত্রের মত তাহার হেড়ো গাঁঠওয়ালা খাটো মোটামোটা আঙ্গুলের মধ্যে চাপিয়া ধরিয়া, পিষিয়া ফেলিবার যোত্র করিয়াছিল। এই অতিকায় পুরুষটা আসলে লোক ভাল—উহার কোন বিদ্বেষবুদ্ধি ছিল না। আগন্তুককে শুধু একটু শিক্ষা দিবার জন্য দুই-চারিটি মর্ম্মান্তিক টিপুনি দিয়াছিল। তারপর আগন্তুককে সম্বোধন করিয়া বলিল:—

 “দেখ, একটু ঠাণ্ডা হও। ভদ্রলোকের মত কাপড় চোপড়—তোমার এইরকম ব্যবহার করা, রাত্রে একজন ভদ্রলোকের বাড়ীতে এসে এইরকম গোলমাল করা কি সুবুদ্ধির কাজ? বেশ দেখছি, এ কাজ নেশার ঝোঁকে করেছ—কে নাজানি তোমাকে মদ খাইয়ে মাতাল করে ছেড়েছে! এইজন্যই তোমার উপর আমি মারপীঠ করব না, তোমাকে শুধু আস্তে আস্তে রাস্তার উপর রেখে দিয়ে আসব, সেখানেও যদি গোলমাল কর,—রোদ্ ফেরবার সময় পাহারাওয়ালা তোমাকে তুলে নিয়ে যাবে; এস, একটু তোমাকে বেহালা শোনাই— বেহালার একটা গৎ শুনলে তোমার মাথা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”

 অক্টেভ-দেহ-ওলাফ সমবেত ভৃত্যদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন:—

 —“নির্লজ্জ বেহায়া,—এই একটা নীচ অলীক কথা বলে তোদের মনিবকে—লাবিন্‌স্কির কৌণ্ট-মহোদয়কে অপমান করচে—আর তোরা স্বচক্ষে দেখেও কিছু বলচিস নে!”

 এই নাম উচ্চারণ করিবামাত্র ভৃত্যবর্গের মধ্যে খুব একটা হৈ চৈ পড়িয়া গেল। একটা অট্টহাস্যে, উহাদের জরির ফিতায় বিভূষিত বুকগুলা ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল:— “দেখ ভাই, এই লোকটা আপনাকে কৌণ্ট লাবিন্‌স্কি বলে মনে করচে! হা! হা! হি! হি! বেশ যা হোক!”

 অক্টেভ-দেহ-গুলাফের ললাট কণ্ঠ শীতল ঘর্ম্ম-বিন্দুতে আর্দ্র হইল। ছোরার ফলার মত তীক্ষ্ণ একটা কথা যেন তাঁর মস্তিষ্কের ভিতর দিয়া চলিয়া গেল। “সমারা” দরোয়ানটা সত্যই কি আমার বুকের উপর হাঁটু গেড়ে বসেছিল? তখনকার সে জীবনটা কি আমার বাস্তব জীবন? আমার বুদ্ধিটা কি চুম্বক—আকর্ষণের প্রক্রিয়ায় একেবারে ঘুলিয়ে গিয়েছিল? ' অথবা কেউ একটা ভীষণ ষড়যন্ত্র করে’ আমাকে এই রকম নাকাল করেছে? এই সব ভৃত্য, যারা আমার কাছে থর্ থর্ করে’ কাপত, আমার পদানত হয়ে থাক্‌ত, তারা কিনা আমাকে চিন্‌তেই পারলে না! আমায় যেমন কাপড় বদ্লে দিয়েছে, গাড়ী বদ্লে দিয়েছে, সেইরকম কি আমার শরীরও বদ্লে দিয়েছে? ঐ ভৃত্যবর্গের মধ্যে যে সবচেয়ে দুর্বিনীত, সে বলিল:—

 “দেখ তুমি যে কৌণ্ট লাবিন্‌স্কি নও, এইবার ঠিক জানতে পারবে। তুমি যে রকম অপমানের কথা বল্ছি‌লে তাই শুনে স্বয়ং কৌণ্ট ঐ দেখ সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন।”

 দরোয়ানের বন্দী, প্রাঙ্গনের শেষ—প্রান্তের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, মাটিতে-পোঁতা তাঁবুর মত একটা বৃহৎ ছত্রের চাঁদোয়ার তলে একটি যুবক দণ্ডায়মান। শোভন ছিপ্‌ছিপে গঠন, মুখমণ্ডল ডিম্বাকৃতি, কালো কালো চোখ, শুকসদৃশ নাসা, সরু গোঁফ,—এ ত তিনিই, তিনি ভিন্ন আর কেহ নয়। অথবা সাদৃশ্যে বিভ্রম উৎপাদন করিবার উদ্দেশে সয়তান নিজে বোধ হয় তাঁর প্রেতচ্ছায়ামূর্ত্তি গড়িয়াছেন।

 দরোয়ান, কয়েদীকে দৃঢ় মুষ্টিতে ধরিয়া রাখিয়াছিল, সেই মুষ্টি শিথিল করিল। দৃষ্টি অবনত, হস্ত পার্শ্বে লম্বিত, নিস্পন্দ, নিশ্চল ভৃত্যবর্গ, বাদশার আগমনে গোলামদিগের ন্যায় দেয়ালের গায়ে ভক্তিভাবে সারি দিয়া দাঁড়াইল। যে সম্মান তাহারা আসল কৌণ্টকে প্রদর্শন করে নাই, সেই সম্মান তাহারা তাঁহার উপছায়াকে প্রদর্শন করিল।

 রাণী প্রাস্কোভির পতি, খুব সাহসী হইলেও স্বকীয় দ্বিতীয় মূর্ত্তির আগমনে, তাঁহার মনে কেমন একটা ভীতির সঞ্চার হইল।

 তাঁহাদের বংশগত একটা প্রাচীন কাহিনী তাঁহার মনে পড়িয়া গেল, তাহাতে এই ভয় আরও বর্দ্ধিত হইল। প্রতিবার লাবিন্‌স্কি-বংশের কোন ব্যক্তির যখন মৃত্যু হয়, ঠিক তাঁহার মত দেখিতে এক উপছায়া আসিয়া ঐ সংবাদ তাঁহাকে পূর্ব্বেই জানাইয়া দেয়। য়ূরোপের উত্তর খণ্ডের লোকের মধ্যে, স্বপ্নেও নিজের দ্বিতীয় মূর্ত্তি দেখাটা মৃত্যুর পূর্ব্বসূচনা বলিয়া চিরদিন গৃহীত হইয়া আসিতেছে। সুতরাং কাকেশশের এই নির্ভীক যোদ্ধা পুরুষ, আপনার বাহিরে আপনার ছায়ামূর্ত্তি দর্শন করিয়া, একটা অন্ধ-সংস্কারমূলক দুরতিক্রম্য আতঙ্কে আক্রান্ত হইলেন; কামান হইতে গোলা বাহির হইতে যখন উদ্যত, এমন সময়ে যিনি নির্ভয়ে কামানের মুখে হাত ঢুকাইয়া দিয়াছিলেন, সেই তিনি এখন কিনা নিজেরই সম্মুখ হইতে ভয়ে পিছু হটিলেন।

 কৌণ্ট লাবিন্‌স্কি-ওলাফ দেহধারী অক্টেভ, স্বকীয় পুরাতন শরীরের অভিমুখে অগ্রসর হইলেন। ঐ শরীরের মধ্যে কৌণ্টের আত্মা কখন যুঝাযুঝি করিতেছিল, কখন ক্রোধে প্রজ্বলিত হইতেছিল, কখন বা ভয়ে কাঁপিতেছিল। লাবিন্‌স্কি-দেহ অক্টেভ, অক্টেভ-দেহ লাবিন্‌স্কিকে উদ্ধত ও প্রাণহীন ভদ্রতার স্বরে বলিলেন:—

 “মহাশয়, এই ভূতাদের সঙ্গে বিবাদ করে’ অনর্থক আপনার মান হানি করবেন না। যদি আপনি কৌণ্ট লাবিন্‌স্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান, তা’হলে জান্‌বেন, তিনি দুফুর দুটোর পূর্ব্বে আগন্তুকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন না। আর কৌণ্টেস্-মহোদয়ার সঙ্গে যাঁদের সাক্ষাৎকারের অধিকার আছে, কৌণ্টেস্-মহোদয়া বৃহস্পতিবারে তাঁদের অভ্যর্থনা করেন।”

 এই কথাগুলি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করিয়া এবং প্রত্যেক শব্দের গুরুত্ব দেখাইবার জন্য, প্রত্যেক শব্দের উপর সজোরে ঝোঁক দিয়া এই অলীক কৌণ্ট ধীর-পদক্ষেপে প্রস্থান করিলেন, আর তাঁর পশ্চাতে দ্বারও রুদ্ধ হইল। অক্টেভ-দেহ ওলাফ-লাবিন্‌স্কি মুচ্ছিত হওয়ায় তাঁহাকে তুলিয়া লইয়া তাঁহার গাড়ীতে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইল। যখন তাঁহার চৈতন্য হইল, তখন তিনি দেখিলেন, এমন একটা শয্যায় তিনি শুইয়া আছেন, যেখানে তিনি পূর্ব্বে কখন শয়ন করেন নাই, এমন একটা ঘরে রহিয়াছেন, যে ঘরে তিনি কখন প্রবেশ করিয়াছেন বলিয়া তাঁহার স্মরণ হয় না। তাঁহার নিকটে একজন অপরিচিত চাকর দাঁড়াইয়াছিল। সে, তাঁহার মাথাটা উঠাইয়া, নাকের কাছে ঈথরের শিশি ধরিল। চাকর অক্টেভ-দেহ কৌণ্টকে আপনার মনিব মনে করিয়া জিজ্ঞাসা করিল:—

 “এখন আপনার একটু ভালো বোধ হচ্চে?” কৌণ্ট উত্তর করিলেন:—

 —“হাঁ; ও একটা ক্ষণিক দুর্ব্বলতা মাত্র।”

 —“আমি কি এখন যেতে পারি?—না আপনার কাছে আপনাকে দেখ্বার-শোন্‌বার জন্য আমাকে এখানে থাকতে হবে?”  —“না, আমাকে একলা থাক্‌তে দেও; কিন্তু চলে যাবার আগে,— বড় আয়নার কাছে যে সব লোহার মশাল-বাতি আছে সেগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে যেও।”

 —“কিন্তু এত বেশী আলোতে আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে’ আপনার মনে হচ্চে না কি?”

 —“কিছুমাত্র না; তা’ছাড়া এখনো আমার ঘুম পায় নি।”

 —“আমি শুতে যাব না, যদি আপনার কিছু দরকার হয়, ঘণ্টা বাজালেই আমি ছুটে আসব।”

 চাকর, কৌণ্টের পাণ্ডুবর্ণ ও বিশ্লিষ্ট মুখশ্রী দেখিয়া মনে মনে ভীত হইয়াছিল।

 চাকর বাতিগুলা জ্বালাইয়া প্রস্থান করিলে, কৌণ্ট আয়নার কাছে ছুটিয়া আসিলেন এবং আলোক-উদ্ভাসিত এই পুরু ও বিশুদ্ধ আর্শীর ভিতর দিয়া দেখিলেন:—একটি তরুণ মুখ, মৃদু ও বিষণ্ণ, মাথায় প্রচুর কালো চুল, নীলবর্ণ চোখের তারা রেশমের মত মোলায়েম শ্যামল শ্মশ্রু—তখন বিস্মিত হইয়া বলিয়া উঠিলেন,—“একি! এ মুণ্ডুটা ত আমার নয়!” তিনি প্রথমে বিশ্বাস করিতে চেষ্টা করিলেন, হয়তো কোন দুষ্ট তামাসাবাজ লোক তাম্র ও ঝিনুক-খচিত আয়নার তির্য্যক্ কিনারার পিছনে তাঁর একটা মুখস্ রাখিয়া দিয়াছে। তিনি পিছনে হাত দিয়া দেখিলেন, হাতে কিছুই ঠোকল না। সেখানে কেহই ছিল না।

 আপনার হাত টিপিয়া টিপিয়া দেখিলেন—তাঁহার হাত অপেক্ষা সরু, লম্বা, ও শিরাসমন্বিত; অনামিকা অঙ্গুলিতে একটা বড় সোণার আংটি, আংটির মণির উপর কুলচিহ্ন খোদিত। কৌণ্ট এই আংটির অধিকারী কখনই ছিলেন না। তাঁহার পকেট হাতড়াইয়া একটা ছোট পত্র-পেটিকা পাইলেন,— তাহার ভিতর কতকগুলি সাক্ষাৎ করিবার তাস-পত্র (card) ছিল—তাস-পত্রের উপর এই নামটি লেখা ছিল;—“অক্টেভ”।

 লাবিন্‌স্কি-প্রাসাদে ভৃত্যদের অট্টহাস্য, তাঁহার দ্বিতীয় মূর্ত্তির আবির্ভাব, আয়নার ভিতরে নিজের মূর্ত্তির বদলে ভিন্ন লোকের মূর্ত্তির ছায়া দর্শন—এ সব বিকৃত মস্তিষ্কের বিভ্রম হইলেও হইতে পারে। কিন্তু এই সব অন্যের পরিচ্ছদ, এই আংটি যাহা তিনি আঙ্গুল হতে খুলিয়া ফেলিয়াছেন—এই সব সারালো প্রত্যক্ষ প্রমাণের প্রতিবাদ করা, এই সব সাক্ষ্যের বিরুদ্ধে কিছু বলা অসম্ভব। তাঁহার অজ্ঞাতসারে তাঁহার সম্পূর্ণ রূপান্তর সাধিত হইয়াছে; নিশ্চয়ই কোন যাদুকর, সম্ভবতঃ কোন দানব তাঁহার আকৃতি, তাঁহার আভিজাত্য, তাঁহার নাম, তাঁহার সমস্ত ব্যক্তিত্ব তাঁহার নিকট হইতে হরণ করিয়াছে, কেবল তাঁহার আত্মাকে তাঁহার নিকট রাখিয়া দিয়াছে, অথচ সেই আত্মাকে বাহিরে আপনাকে অভিব্যক্ত করিবার কোন উপায় রাখিয়া দেয় নাই।

 তাঁহার অবস্থা অন্য প্রকারেও শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছে। এক্ষণে তিনি যে শরীরের মধ্যে বন্দী হইয়া আছেন, সে শরীর ধারণ করিয়া তিনি লাবিন্‌স্কি কৌণ্টের পদবী কখনই আর দাবী করিতে পারিবেন না। সকলেই তাঁহাকে প্রবঞ্চক,—নিদান পক্ষে,—পাগল বলিয়া ঠাওরাইবে। একটা মিথ্যা আকারে আবৃত তিনি—এখন তাঁর স্ত্রীও তাঁহাকে চিনিতে পারিবে না—তাঁকে কে সনাক্ত করিবে? কি করিয়া তিনি তাঁহার তাদাত্ম্য প্রমাণ করিবেন? অবশ্য অনেক ঘনিষ্ঠ রকমের ঘটনা আছে, অনেক রহস্যময় খুঁটিনাটি কথা আছে, যা অন্যের অপরিজ্ঞাত হইলেও, কৌণ্টেস্ প্রাঙ্কোভির মনে পড়িতে পারে এবং সেই সব কথা মনে করিয়া তাঁহার ছদ্মবেশী স্বামীর আত্মাকে তিনি খুব সম্ভব চিনিতে পারিবেন। কিন্তু একা তাঁহার বিশ্বাসে কি হইবে? সমস্ত লোকের মতের বিরুদ্ধে কি তাঁহার বিশ্বাস স্থির রাখিতে পারিবেন? সত্যই তাঁহার “আমি” সম্পূর্ণরূপে তাঁর বেদখল হইয়া গিয়াছে। তাঁর এই রূপান্তরীকরণ শুধু কি বাহিরের আকার ও মুখশ্রীর পরিবর্ত্তন মাত্র অথবা বাস্তবিকই তিনি অন্য কাহারো শরীরে বাস করিতেছেন। তা যদি হয়, তবে তাঁর নিজের শরীরটা কোথায় গেল? কোনও চুলার মধ্যে পড়িয়া কি ছাই হইয়া গিয়াছে, অথবা কোন সাহসী চোরের অধিকারে আসিয়াছে? লাবিন্‌স্কি প্রাসাদে তাঁহার অনুরূপ যে দ্বিতীয় মূর্ত্তি দেখিয়াছিলেন তাহা প্রেত-মূর্ত্তি হইতে পারে, কোন অলৌকিক দর্শন হইতে পারে; কিংবা কোন শরীরী জীবন্ত জীবও হইতে পারে, সেই আমির আকৃতি ডাক্তার হয়ত আমার গাত্রচর্ম্ম খুলিয়া লইয়া তাহার ভিতর দারুণ নিপুণতার সহিত ঐ লোকটাকে স্থাপন করিয়াছে।

 বিষাক্ত সর্পের হ্যায় এই চিন্তাটা তাঁর হৃদয়কে দংশন করিতে লাগিল। —কিন্তু এই অলীক কৌণ্ট লাবিন্‌স্কি, কোন দানব যাহাকে আমার আকারে পরিণত করিয়াছে, সেই রক্তপিপাসু হিংস্র পশু, যে এখন আমার বাড়ীতে বাস করিতেছে, ভৃত্যেরা এখন যাহার আজ্ঞাবহ হইয়াছে, হয়ত সে এই সময়ে আমার শয়ন—কক্ষে প্রবেশ করিয়াছে, সেই কক্ষ যেখানে প্রথম রাত্রির ন্যায় যখনই আমি প্রবেশ করিতাম, আমার হৃদয় একটা অনির্ব্বচনীয় আবেগে ভরিয়া উঠিত। হয়ত এখন কৌণ্টেস্‌ প্রাস্কোভি সেই হতভাগার ঘুণিত স্কন্ধের উপর আপনার স্বর্গীয় রক্তিম রাগে রঞ্জিত সুন্দর মুখখানি আনত করিয়া রহিয়াছেন এবং এই মিথ্যুককে, প্রবঞ্চককে, নারকীকে আমি বলিয়া বিশ্বাস করিতেছেন। এখন যদি ছুটিয়া আমার প্রাসাদে যাই আর উচ্চকণ্ঠে কৌণ্টেস্‌কে বলি:—“তোমাকে ও প্রতারণা করচে, ও তোমার হৃদয়েশ্বর ওলাফ নয়! তুমি না জেনে নির্দোষভাবে এমন একটা জঘন্য কর্ম্ম করতে উদ্যত হয়েছ, যা আমার হতাশ আত্মা চিরকাল—অনন্তকাল স্মরণ করবে!”

 কৌণ্টের মস্তিষ্ক অগ্নিময় আবেগ-তরঙ্গে আলোড়িত হইতে লাগিল। কখন বা অস্পষ্ট রাগের কথা মুখ দিয়া বাহির হইল, কখন বা মুষ্টিকণ্ডূয়ন অনুভব করিতে লাগিলেন, ঘরের মধ্যে হিংস্র পশুর মত অস্থির ভাবে পায়চালি করিতে লাগিলেন। তাঁহার অস্পষ্ট অহংজ্ঞান, যেন উন্মাদে আচ্ছন্ন হইবার মত হইল। তিনি ছুটিয়া অক্টেভের প্রসাধনকক্ষে গেলেন, জলের বাসনে জল ভরিয়া, তাহার মধ্যে মাথা ডুবাইলেন। যখন মাথা উঠাইলেন, তখন সেই কন্কনে তুষার-শীতল জলে সিক্ত মাথা হইতে বাষ্প-ধূম উত্থিত হইতেছিল। তাঁহার রক্ত আবার ঠাণ্ডা হইয়া আসিল। তিনি মনে মনে ভাবিলেন, যাদুগিরি ও ডাইনীমন্ত্রতন্ত্রের দিন ত চলিয়া গিয়াছে। মৃত্যুই কেবল আত্মাকে শরীর হইতে বিযুক্ত করিতে পারে। একজন পোলাণ্ডের কৌণ্ট, যে প্যারিসে বাস করে, রথচাইল্ডের কাছে যাহার লক্ষ লক্ষ টাকা ধার আছে, যে বড় বড় বংশের সহিত সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ, একজন সৌখীন রূপসী যাকে পতিত্বে বরণ করেছে, প্রথম শ্রেণীর রাজ-সম্মানে যে বিভূষিত, তা’কে কি কোন বাজিকর এই রকম করে চোখে ধূলো দিতে পারে? এ নিশ্চয়ই সেই বালথাজার শেরবোনোর কাজ—আমাকে লইয়া সে একটু মজা করিয়াছে; কিন্তু ইহাতে তার কুরুচিরই পরিচয় পাওয়া যায়। এখন এই সমস্তের ব্যাখ্যা একমাত্র সেই করিতে পারে।

 তিনি শ্রান্ত ক্লান্ত হইয়া তাড়াতাড়ি অক্টেভের শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িলেন। শুইবামাত্র গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন হইলেন। ঘুম ভাঙ্গিয়াছে মনে করিয়া তাঁহার চাকর এক সময়ে আসিয়া, তাঁহার চিঠিপত্র ও খবরের কাগজাদি টেবিলের উপর রাখিয়া গেল।