অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/৮
৮
কৌণ্ট চক্ষু উন্মীলিত করিয়া তাঁহার চারিদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন; দেখিলেন, শয়ন-কক্ষটি বেশ আরামের কিন্তু খুব সাদাসিদা; চিতাচর্ম্মের অনুকরণে তৈয়ারি একটা গালিচায় ঘরের মেজে আচ্ছাদিত; বুটিদার পরদায় জানলা-দরজা ঢাকা, কাপড়ের মত দেখিতে সমান-চোস্ত সবুজ কাগজে ঘরের দেয়াল মণ্ডিত। কালো মার্ব্বেলে গঠিত একটা ঘড়ি—তাহার উপরে একটা রূপার পুত্তলিকা—তাহার সহিত দুইটা রূপার প্রাচীন পেয়ালা—এই সমস্ত জিনিসে সাদা মার্ব্বেল-গঠিত চিমনী-স্থান বিভূষিত ছিল। একটা পুরাতন ভিনিশিয়ান আর্শি যাহা কৌণ্ট গতরাত্রে আবিষ্কার করিয়াছিলেন, এক বৃদ্ধার চিত্র—সম্ভবতঃ অক্টেভের জননী—ইহাই এই ঘরের একমাত্র অলঙ্কার; ঘরটি বিষন্ন ও কঠোর-দর্শন; আসবাবের মধ্যে একটা পালঙ্ক, চিমনীর নিকটে স্থাপিত একটা আরাম-কেদারা, পুস্তক ও কাগজ-পত্রে আচ্ছাদিত একটা দেরাজ-ওয়ালা টেবিল। এই সকল আসবাব আরামপ্রদ হইলেও লাবিন্স্কি—প্রাসাদের জমকালো আসবাবের কাছ দিয়াও যায় না।
চাকর মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করিল:—
“মহাশয় উঠেছেন কি?” এই কথা বলিয়া, তাহার মনিবের প্রাতঃকালের পরিচ্ছদ—একটা রঙ্গিন কামিজ, একটা ফ্ল্যানেলের প্যাণ্টালুন, একটা আলখাল্লা—কৌণ্টকে দিল। পরের কাপড় পরিতে তাঁর নিতান্ত অনিচ্ছা হইলেও, অগত্যা ঐ কাপড় তাঁকে পরিতে হইল; কেননা, না পরিলে উলঙ্গ হইয়া থাকিতে হয়। শয্যা হইতে নামিবার সুময় একটা কালো ভল্লুকের চাম্ড়ার পা-পোষের উপর পা রাখিলেন। তাঁহার সাজসজ্জা শীঘ্রই হইয়া গেল। কৌণ্ট অক্টেভ নহে— এই বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ না করিয়া চাকর কৌণ্টের বস্ত্র পরিধানে সাহায্য করিল। তাহার পর জিজ্ঞাসা করিল,—“কোন্ সময় মহাশয় প্রাতর্ভোজন করতে ইচ্ছা করেন?” কৌণ্ট উত্তর করিলেন!—
“নিত্য-নিয়মিত সময়ে”। তাঁহার ব্যক্তিত্ব ফিরিয়া পাইবার চেষ্টায় পাছে কোন বাধা ঘটে, এই মনে করিয়া তাঁহার এই দৈহিক পরিবর্ত্তনটা আপাততঃ মানিয়া লইবেন বলিয়া সঙ্কল্প করিলেন।
চাকর প্রস্থান করিলে, অক্টেভ-দেহ-ওলাফ, সংবাদ-পত্রাদির সহিত যে দুইখানা চিঠি তাঁর জন্য আনা হইয়াছিল, সেই দুইখানা চিঠি খুলিলেন; আশা করিয়াছিলেন, তাহার মধ্যে, তাঁহার রূপান্তর সম্বন্ধে কোন খোঁজখবর পাইবেন। প্রথম চিঠিতে কতকগুলি প্রণয় ভর্ৎসনা আছে—লেখিকা আক্ষেপ করিয়াছেন, কেন বিনা কারণে তার বন্ধুত্ব প্রত্যাখ্যান করা হইল। দ্বিতীয় পত্রে, অক্টেভের উকিল অক্টেভকে পীড়াপীড়ি করিয়া লিখিয়াছেন, ভাড়ার হিসাবে তিনি যে টাকা পাইবেন, তাহার চতুর্থাংশ যেন কোন লভ্যজনক কাজে খাটান হয়। কৌণ্ট মনে মনে ভাবিলেন:—
“তাই নাকি, তবে ত দেখছি যার শরীরে আমি বাস করছ—েসেই অক্টেভ নামে একজন লোক বাস্তবিকই আছে; সে তা হ’লে একটা কাল্পনিক জীব নয়। তার ঘর-বাড়ী আছে, তার বন্ধুবান্ধব আছে. তার উকীল আছে, টাকা খাটাবার মূলধন আছে—একজন ভদ্রলোক গৃহস্থের যা থাকা উচিত সবই আছে, কিন্তু আমার ত বেশ মনে হচ্চে—আমিই কৌণ্ট ওলাফ-লাবিন্স্কি।”
কিন্তু আর্শিতে একবার কটাক্ষপাত করিবামাত্র তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হইল তাঁহার এই মতের সঙ্গে কাহারও মিল হইবে না- কেহই ইহাতে সায় দিবে না। কি উজ্জ্বল দিবালোকে, কি অস্পষ্ট দীপালোকে, ঐ আর্শিতে ত একই মূর্ত্তি প্রতিবিম্বিত হইতেছে!
বাড়ীর কোথায় কি আছে কৌণ্ট দেখিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। তারপর টেবিলের দেরাজ খুলিলেন। একটা দেরাজের মধ্যে দেখিতে পাইলেন,—ভূসম্পত্তির কতকগুলা দলিল, দশ হাজার টাকার কোম্পানীর কাগজ; আর এক দেরাজের মধ্যে রুষীয় চামড়ার পত্র-পেটিকা—একটা সাঙ্কেতিক তালা দিয়া তাহা বন্ধ রহিয়াছে।
চাকর ঘরে প্রবেশ করিয়া জানাইয়া দিল য়্যাল্ফ্রেড সাহেব আসিয়াছেন। চাকরের উত্তর আনিবার অপেক্ষা না করিয়াই অক্টেভের পুরাতন বন্ধু, ঘনিষ্ঠতার ভাবে ঘরের ভিতর হুড়মুড় করিয়া প্রবেশ করিল। আগন্তুক যুবাপুরুষ, মুখে একটা সরল দিল্-খোলা ভাব। যুবক কৌণ্টকে বলিল:—
“এই যে অক্টেভ, আজকাল কি করচ বলদিকি? তোমার হ’ল কি? তুমি বেঁচে আছ না মরেছ? কোথাও তোমাকে ত আর দেখা যায় না; তোমাকে লিখ্লেও ত উত্তর পাওয়া যায় না। দেখ, আমার অভিমান করাই উচিত। তবে কিনা, বন্ধুত্বে আমি মানঅভিমানের বড় একটা ধার ধারিনে, তাই তোমাকে দেখতে এলাম। বল কি হে! এক কালেজের সহপাঠী তুমি, তোমাকে কিনা এই অন্ধকার ঘরে বিষণ্ণ হয়ে মরতে দেব! তুমি পীড়িত—তোমার কিছুই ভাল লাগে না—এ সমস্তই তোমার ভাই কল্পনা। তোমার মন ভাল করবার জন্য, তোমাকে একটু আমোদ দেবার জন্য, তোমাকে জোর করে’ একটা ভোজের নেমন্তন্নে নিয়ে যাব। সেখানে আজ খুব আমোদ-প্রমোেদ হবে। আমাদের বন্ধু “রাম্বো”ও আসবে।”
অর্দ্ধ দুঃখ প্রকাশ ও অর্দ্ধ পরিহাসের স্বরে অক্টেভের বন্ধু অক্টেভ-দেহ কৌণ্টের নিকট এইরূপ বাক্য-বিন্যাস করিয়া ইংরেজের ধরণে কৌণ্টের হাত ধরিয়া সজোরে এক ঝাঁকানি দিল। কৌণ্ট তাঁহার জীবন-নাটো এখন যে ভূমিকাটি তাঁর অভিনয় করিতে হইবে, তাহার মর্ম্ম-ভাবটী ঠিক ধরিয়া লইয়া উত্তর করিলেন:—
“না ভাই, অন্য দিনের চেয়েও আমার যন্ত্রণা বৃদ্ধি হয়েছে। সেখানে যাবার মত আমার মনের অবস্থা নয়। আমি গিয়ে তোমাদেরও বিষণ্ণ করে’ তুলব,—তোমাদের আমোদের ব্যাঘাত হবে।”
য়্যাল্ফ্রেড দরজার দিকে অগ্রসর হইয়া বলিল,—“বাস্তবিক তোমাকে খুব ফ্যাঁকাশে দেখাচ্চে, মুখে ভয়ানক একটা ক্লান্তির ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। আচ্ছা, তা হ’লে একটু ভাল হও—আর এক সময়ে দেখা যাবে। আমি তবে পালাই। বড় দেরি হয়ে গেছে। এতক্ষণে হয়ত তিন ডজন কাঁচা “অয়স্টার” ও এক বোতল শোতের্ন্ সুরা পার হয়ে গেছে। “রাম্বো” তোমাকে না দেখতে পেয়ে খুবই দুঃখিত হবে।”
এই আগন্তকের আগমনে কৌণ্টের বিষণ্নতা আরও বৃদ্ধি পাইল;—চাকরটা তাঁকেই মনিব ঠাওরাইয়াছে। য়্যাল্ফ্রেড তাঁকেই বন্ধু ভাবিয়াছে। এখন কেবল একটা প্রমাণ বাকি। এই চূড়ান্ত প্রমাণ। দ্বার উদ্ঘাটিত হইল। একটি মহিলা—মাথায় বাঁধা ফিতায় জরির সূতা মিশ্রিত এবং দেয়ালে যে ছবিখানি ঝুলিতেছে সেই ছবির সঙ্গে অশ্চর্য্য সাদৃশ্য —ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন এবং পালঙ্কে উপবিষ্ট হইয়া কৌণ্টকে বলিলেন:—
“কেমন আছিস্রে অক্টেভ! চাকর বলছিল, কাল তুই খুব দেরিতে বাড়ী এসেছিস্; আর ভয়ানক দুর্ব্বল অবস্থায়। বাছা, তোর শরীরের একটু যত্ন করিস্। কেন তুই এত বিষণ্ন হয়ে থাকিস্, আমার কাছে ত কিছুই খুলে বলিস্নে, তোকে দেখলে আমার বুক ফেটে যায়।” অক্টেভ দেহ ওলাফ্ উত্তর করিলেন:—
“ভয় নেই মা, ও কিছুই গুরুতর নয়; আজ আমি অনেকটা ভাল আছি।”
এই কথায় অক্টেভ-জননী আশ্বস্ত হইলেন। তিনি জানিতেন তাঁর পুত্র একাকী থাকিতে ভালবাসে। বেশীক্ষণ কেহ তাহার নিকট থাকিয়া তার নির্জ্জনতা ভঙ্গ করিলে তাহার ভাল লাগে না। তাই তিনি তাড়াতাড়ি উঠিয়া প্রস্থান করিলেন।
বৃদ্ধা প্রস্থান করিলে, কৌণ্ট বলিয়া উঠিলেন, “আমি তবে নিশ্চয়ই অক্টেভ; অক্টেভের মা আমাকে চিন্তে পারলেন। তাঁর পুত্রের শরীরে এক অপরিচিত আত্মা বাস করচে—এটা ত তিনি মনে করলেন না। সম্ভবতঃ চিরদিনের মত আমাকে এই আবরণের মধ্যে বদ্ধ থাক্তে হবে, অন্যের শরীরে আত্মা আবদ্ধ—আত্মার এ কি অদ্ভূত কারাগার! তথাপি কৌণ্ট-ওলাফ-লাবিন্স্কির অস্তিত্বকে, তাঁর কুলচিহ্নকে, তাঁর স্ত্রীকে, তাঁর ঐশ্বর্যাকে জলাঞ্জলি দেওয়া, আর সামান্য এক গৃহস্থের অবস্থায় পরিণত হওয়া—এ বড়ই কঠিন। যে চামড়াটা এখন আমার গায়ে লগ্ন হয়ে আছে, সে চামড়াটা ছিঁড়ে একটি একটি করে, ওর প্রথম-অধিকারীকে আমি প্রত্যর্পণ করব। যদি আমি প্রাসাদে ফিরে যাই? না!—তা’হলে অনর্থক একটা কেলেঙ্কারি হবে, দরোয়ান আমাকে দরজায় ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে। আমি ত এখন রুগ্ন লোকের বস্ত্র পরে আছি। আমার দেহে এখন আর সে বল নাই। দেখা যাক্, অনুসন্ধান করা যাক্, এই অক্টেভ কি রকম করে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করত, আমার একটু জানা দরকার।” এইরূপ ভাবিয়া তিনি সেই পোর্টফোলিওটা খুলিতে চেষ্টা করিলেন। ছুঁইবামাত্র হঠাৎ স্প্রিংটা খুলিয়া গেল; কৌণ্ট উহার চামড়ার পকেট হইতে প্রথমে কতকগুলা কাগজ টানিয়া বাহির করিলেন, উহা ঘন-নিবদ্ধ ও সূক্ষ্ম লেখায় কালো হইয়া গিয়াছে—তাহার পর একটা চৌকো চর্ম্ম-কাগজের উপর তত নিপুণ হাতের না হইলেও, কৌণ্টেস্ প্রাঙ্কোভি লাবিন্ষ্কার একটা পেন্সিলে আঁকা ছবি রহিয়াছে—ছবিটা অবিকল তাঁর মত—দেখিলেই চেনা যায়।
এই আবিষ্কারে কৌণ্ট একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। বিস্ময়ের পরেই একটা ভীষণ ঈর্ষার আবেগে তাঁহার সর্ব্বশরীর কাঁপিয়া উঠিল। কৌণ্টেসের ছবি কেমন করিয়া এই অপরিচিত যুবকের গুপ্ত পত্রপেটিকার মধ্যে আসিল? কোথা হইতে আসিল? কে চিত্র করিল? কে ইহাকে দিল? প্রাস্কোভি—যাকে তিনি দেবীর মত পূজা করেন, তিনি কিনা তাঁর স্বর্গ হইতে নামিয়া আসিয়া এই জঘন্য গুপ্ত-প্রেমে লিপ্ত হবেন? যে রমণীকে এতদিন তিনি নিষ্কলঙ্ক ভাবিয়া আসিয়াছেন, সেই রমণীর প্রণয়ীর শরীরের মধ্যে তার স্বামী কি না এখন কয়েদী? না-জানি এ করি নিষ্ঠুর পরিহাস! পতি হইয়া শেষে কি আবার তাঁকে প্রণয়ী তইতে হইবে! এ কি ভীষণ দশা-বিপর্য্যয়! এ কি হাস্যজনক ওলটপালট! পতি ও প্রণয়ী একাধারে!
এই সকল কথা তাঁর মাথার ভিতর গুন্ গুন্ করিতে লাগিল; তাঁহার মনে হইল, যেন তাঁর বুদ্ধি লোপ পাইবার উপক্রম হইয়াছে, তিনি খুব জোর করিয়া আপনাকে শান্ত করিবার চেষ্টা করিলেন। চাকর খবর দিল, আহার প্রস্তুত; তিনি সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া, থর থর কাঁপিতে কাঁপিতে ঐ গুপ্ত পত্র-পেটিকাটা তন্ন তন্ন করিয়া দেখিতে লাগিলেন।
পত্রগুলা এক প্রকার মনস্তত্বঘটিত দৈনিক-লিপি বলিলেও হয়—বিভিন্ন কালের লেখা। কখন বা লেখা হইয়াছে—কখন বা লেখা বন্ধ করা হইয়াছে। ইহার কতকগুলি টুক্রা নিম্নে দেওয়া যাইতেছে—কৌণ্ট উদ্বেগপূর্ণ কৌতূহলের সহিত এইগুলা যেন গিলিতে লাগিলেন:—
“সে কখনই আমাকে ভালবাসবে না—কখনই না, কখনই না!
তার চোখের দৃষ্টি এমন কোমল, কিন্তু ঐ কোমল দৃষ্টির মধ্যে সেই নিষ্ঠুর কথাটি আমি পাঠ করেছি—যার চেয়ে কঠোর কথা আর নাই—যে কথাটি কবি দান্তে তাঁর বিষাদপুরের তোরণ-দ্বারের উপর লিখে রেখেছেন—“সব আশা ত্যাগ কর।” আমি কি করেছি যে ভগবান জীবন্ত অবস্থাতেই আমাকে নরক ভোগ করালেন? কাল, পরশু, চিরদিন এই একই ভাবে চলবে! তারকামণ্ডলের মধ্যে পরস্পর পথ কাটাকাটি হতে পারে, নক্ষত্রে নক্ষত্রে যোগ হয়ে পুটলি পাকিয়ে যেতে পারে, তবু আমার অবস্থার কোন পরিবর্ত্তন হবে না।
সেই রমণী আমার স্বপ্ন শূন্যে বিলীন করে দিয়েছে; এক ইঙ্গিতে আমার কল্পনার ডানা ভেঙ্গে দিয়েছে। যত মিথ্যা অসম্ভব সব একত্র হয়েও আমাকে একটা সুযোগ করে দিচ্ছে না; ভাগ্যপাশায় কত লোকের কত ভাল ভাল দান পড়ছে— হায়! আমার অদৃষ্টে একটিও পড়ল না!”
“আমি হতভাগ্য, আমি বেশ জানি স্বর্গের দ্বারদেশে আমি মুঢ়ের মত বসে আছি, আমি নীরবে অশ্রুপাত করচি—উৎসের সহজ ধারার মত অবিরত চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। আমার সে সাহস নেই যে এখান থেকে উঠে গিয়ে কোন গভীর অরণ্যে প্রবেশ করি।”
“কখন কখন রাত্রে যখন নিদ্রা হয় না, আমি প্রাস্কোভিকে ধ্যান করি; যদি নিদ্রা আসে,—প্রাস্কোভিকেই স্বপ্নে দেখি; আহা, ফ্লরেন্স নগরে সেই বাগান—বাড়ীতে তাকে কি সুন্দরই দেখাচ্ছিল! সেই শুভ্র পরিচ্ছদ, সেই সব কালো ফিতা—একাধারে চিত্তবিমোহন ও মরণশোক-সূচক! শুভ্রতা তাঁর জন্য, শোকের বর্ণটা আমার জন্য! কখন কখন ফিতাগুলা বাতাসে নড়ে গিয়ে ও একত্র মিলিত হয়ে সেই সাদা জমির উপর ‘ক্রস্’ আকারে গড়ে উঠছিল; কোন অদৃশ্য আত্মা আমার হৃদয়ের মৃত্যু উপলক্ষে যেন খুব আস্তে আস্তে আমার অন্ত্যেষ্টি মন্ত্র গান করছিলেন।”
“কি অদৃষ্টের ফের! আমি ইস্তাম্বুলে খাব মনে করেছিলাম, যদি যেতাম তা’হলে তাঁর সঙ্গে দেখা হত না। আমি ফ্লেরেন্সে থেকে গেলাম—তাঁকে দেখলাম,—আর সেই দেখাই আমার কাল হল।”
“আমার মরণ হলেই ভাল। কিন্তু জীবিত থাক্তে থাক্তেই তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমার নিঃশ্বাস যদি একটিবার মেশাতে পারি— তবে সে কি অনির্ব্বচনীয় আনন্দ! না, না, তা’হলে আমি যে নরকস্ত হব পরলোকে গিয়ে তাঁর ভালবাসা পাব—সে সম্ভাবনাও তা’হলে আর থাক্বে না। তা’হলে সেখানে আমাদের পৃথক হয়ে থাক্তে হবে। তিনি থাক্বেন স্বর্গে—আমি থাক্ব নরকে। একথা মনে হলে, একেবারে অভিভূত হয়ে পড়তে হয়,”
“যে রমণী আমাকে ভালবাসে না, সেই রমণীকেই আমায় ভালবাসতে হবে, এ কেমন কথা? কত কত রূপসী এর আগে তাদের মধুর মুখের মধুরতম হাসি ঢেলে আমার হৃদয় হরণ করবার চেষ্টা করেচে, কিন্তু তবুও আমার হৃদয় হারাই নি। আর এখন? আহা! সে কি ভাগ্যবান। যে তার পূর্ব্ব জন্মের সুকৃতি ফলে এই নিরুপমা ললনার প্রেম লাভ করে ধন্য হয়েছে।”
আর বেশী পাঠ করা অনাবশ্যক। প্রাস্কোভির পেন্সিলে আকা ছবিখানি প্রথম দেখিয়া কৌণ্টের মনে যে সন্দেহের উদ্রেক হইয়াছিল, এই গোপনীয় লেখাগুরার প্রথম দুই ছত্র পড়িবামাত্র সে সন্দেহ দূর হইল। তিনি বুঝিতে পারিলেন, প্রেমাসক্ত যুবক তাঁর ছবি আঁকিয়া নিরাশ প্রেমের অক্লান্ত ধৈর্য্যসহকারে আসলের অভাবে এই নকলকেই তার প্রেমাঞ্জলি অর্পণ করিতেছে। এই ক্ষুদ্র গুহ্য দেবালয়টিতে ‘ম্যাডোনা’কে স্থাপনা করিয়া, নতজানু হইয়া, নিরাশ হৃদয়ে তাঁহারই পূজা-অর্চ্চনায় নিযুক্ত রহিয়াছে।
“কিন্তু যদি এই অক্টেভ, আমার শরীর অপহরণ করিবার জন্য, এবৎ আমার শরীর ধারণ করিয়া প্রাস্কোভির প্রেম আকর্ষণ করিবার জন্য সয়তানের সঙ্গে চুক্তি করিয়া থাকে?”
কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে এইরূপ অনুমান অসম্ভব মনে করিয়া, এই অনুমানটিকে কৌণ্ট শীঘ্রই মন হইতে দূর করিয়া দিলেন।
এমন অসম্ভব কথা বিশ্বাস করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন, মনে করিয়া তিনি একটু হাসিলেন। তাঁর চাকর যে খাবার রাথিয়া গিয়াছিল, ঠাণ্ডা হইয়া গেলেও তাহাই আহার করিলেন। আহারান্তে পরিচ্ছদ পরিধান করিয়া গাড়ী আনিতে বলিলেন। গাড়ীতে উঠিয়া ডাক্তার বালখাজার শেরবোনোর গৃহে উপনীত হইলেন। গৃহে প্রবেশ করিয়া সেই সব কক্ষের মধ্য দিয়া চলিতে লাগিলেন, যেখানে গত রাত্রে কৌণ্ট ওলাফ-লাবিন্স্কির নামেই প্রবেশ করিয়াছিলেন, কিন্তু সেখান হইতে যখন বাহির হইয়া আসেন, তখন সকলেই তাঁকে অক্টেভের নামে অভিবাদন করিয়াছিল। ডাক্তার তাঁর দস্তুরমত, পিছন দিকের শেষকামরার পালঙ্কে উপবিষ্ট ছিলেন। হাতের মধ্যে পা-টা রাখিয়া গভীর চিন্তায় যেন নিমগ্ন।
কৌণ্টের পদশব্দ শুনিয়া ডাক্তার মাথা উঠাইলেন।
“আঃ! অক্টেভ, তুমি? আমি তোমার ওখানেই যাচ্ছিলাম; কিন্তু রোগী আপনা হতেই ডাক্তারকে দেখতে এল—এটা শুভ লক্ষণ বল্তে হবে।” কৌণ্ট বলিলেন—
——“অক্টেভ, অক্টেভ, অক্টেভ—ক্রমাগতই অক্টেভ! আমার এমন রাগ ধরচে—আমি দেখছি পাগল হয়ে যাব!” তাহার পর বাহুর উপর বাহু রাখিয়া ডাক্তারের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন, এবং ভীষণভাবে এক দৃষ্টিতে তাঁহাকে দেখিতে লাগিলেন।
“বালথাজার শেরবোনো, আপনি ত বেশ জানেন আমি অক্টেভ নই, আমি কৌণ্ট ওলাফ-লাবিন্স্কি। আপনিই গত রাত্রে এইখানেই যাদুমন্ত্রে আমার শরীর অপহরণ করেছিলেন।”
এই কথা শুনিয়া ডাক্তার উচ্চৈঃস্বরে হাঃ হাঃ করিয়া হাসিয়া উঠিলেন; হাসিতে হাসিতে বালিসের উপর উল্টিয়া পড়িলেন এবং হাস্যবেগ থামাইতে পারিতেছেন না এইভাবে দুইহাতে পার্শ্বদেশ ধরিয়া রহিলেন।
“ডাক্তার, তোমার এই আনন্দের উচ্ছ্বাসটা একটু কমিয়ে আন, নৈলে পরে হয় ত অনুতাপ করতে হবে। আমি সত্য বলচি, পরিহাস করচি নে।”
—“তা’হলে ত আরো খারাপ, আরো খারাপ! ওর দ্বারা প্রমাণ হচ্চে, আমি যে তোমার চেতনশক্তি-হীনতা ও অকারণ-বিষণ্নতার চিকিৎসা করছিলাম, সেটা ঠিক নয়। আর কিছু না, এখন কেবল চিকিৎসাটা বদ্লাতে হবে, এইমাত্র।”
কৌণ্ট, শেরবোনোর দিকে অগ্রসর হইয়া বলিয়া উঠিলেন—“তোমার গলা টিপে কেন যে তোমাকে এখনো মারি নি, আশ্চর্য্য!”
কৌণ্টের এই ভয়-প্রদর্শনে ডাক্তার ঈষৎ হাস্য করিলেন; তারপর, একটা ছোট ইস্পাতের ছড়ির প্রান্তভাগ কৌণ্টের হাতে ছোঁয়াইলেন;—কৌণ্টের শরীরে একটা ভয়ানক ঝাঁকানি লাগিল, মনে হইল যেন তাঁর হাতটা ভাঙ্গিয়া গেছে। ডাক্তার মাথায় ঠাণ্ডা জল ঢালিবার মত একটা ঠাণ্ডা রকমের স্থির দৃষ্টি কৌণ্টের উপর নিক্ষেপ করিলেন,—সে দৃষ্টিতে পাগলরা বশীভূত হয়, সে দৃষ্টিতে সিংহ একেবারেই ধরাশায়ী হইয়া পড়ে। এইরূপ দৃষ্টিনিক্ষেপ করিরা ডাক্তার তাঁকে বলিলেন:—
“দেখ, রোগী অবাধ্য হয়ে বেঁকে দাঁড়ালে, তা’কে সিধা করবার উপায়ও আমাদের হাতে আছে। বাড়ী ফিরে যাও, বাড়ী গিয়ে স্নান কর,—অতি উত্তেজনায় মাথা গরম হয়েছে,—ঠাণ্ডা হবে।”
কৌণ্ট বৈদ্যুতিক আঘাতে বিহ্বল হইয়া ডাক্তারের গৃহ হইতে বাহির হইলেন। তাঁর সংশয় ও ভাবনা আরো বাড়িল।
এই বিষয়ে পরামর্শ করিবার জন্য, ডাক্তার B......এর বাড়ী গিয়া উপনীত হইলেন, এবং ঐ প্রসিদ্ধ ডাক্তারকে বলিলেন:—
“আমি এক অদ্ভুত বিভ্রম-বিকারে আক্রান্ত হয়েছি, আমি যখন আয়নার মুখ দেখি, তখন আমার মুখের স্বাভাবিক অবয়বগুলো তাতে দেখতে পাই না। আমি যে সব পদার্থে বেষ্টিত থাকতাম, সে সব পদার্থ বদ্লে গেছে। এখন আমার ঘরের দেয়ালগুলোও আমি চিন্তে পারি না, আসবাবগুলোও চিন্তে পারি না! আমার মনে হয়, আমি যেন সে মামি নই— আমি যেন অন্য লোক,”
ডাক্তার জিজ্ঞাসা করিলেন:—
“তুমি আপনাকে কি রকম দেখ, বল দেখি? ভ্রমটা চোখ থেকেও উৎপন্ন হতে পারে, মস্তিষ্ক থেকেও উৎপন্ন হতে পারে।”
—“আমি দেখতে পাই, আমার চুল কালো, চোখ নীল, মুখ ফ্যাঁকাশে,—আর দাঁড়িতে ঘেরা!”
—“ছাড়-পত্রে যে রকম কোন লোকের মুখের বর্ণনা থাকে, তোমার বর্ণনাটা তার চেয়ে সঠিক দেখ্চি। তোমার বুদ্ধি-বিভ্রমও হয় নি, দৃষ্টি-বিভ্রমও হয় নি। তুমি আসলে যা,—ঠিক তাই আছ।”
“কিন্তু না,—তা’নয়! আমার আসলে কটা চুল, চোখ কালো, রং রৌদ্র-দগ্ধ আর আমার গোঁফ হঙ্গারী দেশের লোকের মত সব করে’ ছাঁটা।”
ডাক্তার উত্তর করিলেন:—“এইখানেই বুদ্ধি-বৃত্তির একটু বদল দেখছি।”
—“যাই হোক্ ডাক্তার, আমি পাগল নই, বেশ জেনো; একটুও না।”
ডাক্তার উত্তর করিলেন —“নিশ্চয়ই। যাদের বুদ্ধি-বিবেচনা আছে, তারাই কেবল আমার এখানে আসে। একটু দৈহিক শ্রান্তি, একটু অতিরিক্ত পড়াশুনা, কিংবা অতিরিক্ত আমোদ-প্রমোদ থেকে এই অসুখটা ঘটেছে। তুমি ভুল করচ, —আসলে তুমি যা চোখে দেখছ তাই বাস্তব, আর না মনে ভাবচ—সেইটেই কাল্পনিক। ফর্সা রঙের দেশে তুমি আপনাকে শামলা দেখছ; কিন্তু তুমি আসলে শামলা, কল্পনা করচ তুমি ফর্সা।”
“—সে যাই হোক্, আমি যে লাবিন্স্কির কৌণ্ট ওলাফ, সে বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই—কিন্তু কাল—থেকে সবাই আমাকে সাবিলের অক্টেভ বলচে।”
ডাক্তার উত্তর করিলেন:—
“—আমি ত ঠিক্ তাই বলেছিলাম। তুমি আসলে সাবিলের অক্টেভ, কিন্তু মনে করচ তুমি লাবিন্স্কির কৌণ্ট। আমার স্মরণ হচ্চে, আমি কৌণ্টকে দেখেছি;—তাঁর রং ত ফর্সা। আয়নায় সে তুমি অন্য মুখ দেখ্তে পাও, তার কারণ ত বেশ বোঝা যাচ্চে। তোমার এই আসল মুখের সঙ্গে, তোমার মনোগত কাল্পনিক মুখের মিল হচ্চে না বলেই তুমি বিস্মিত হয়েছ।—এই কথাটা বিবেচনা করে দেখ না, সবাই তোমাকে অক্টেভ বল্চে; সুতরাং তোমার নিজের বিশ্বাসের কথায় ভুলো না। দিন পনেরো আমার এইখানে থাক: স্নান, বিশ্রাম, বড় বড় গাছের তলায় পায়চালি করলেই তোমার এই মনের বিকারটা কেটে যাবে।”
কৌণ্ট মস্তক অবনত করিয়া, অঙ্গীকার করিলেন, আবার তিনি আসিবেন।
ডাক্তারের কথায় অগত্যা বিশ্বাস করিলেন।
কৌণ্ট তাঁর আবাস-গৃহে ফিরিয়া গিয়া হঠাৎ দেখিলেন, টেবিলের উপর, কৌণ্টেস্ লাবিন্স্কার নিমন্ত্রণ-পত্র রহিয়াছে- ঐ পত্রখানাই পূর্ব্বে অক্টেভ ডাক্তার শেরবোনোকে দেখাইয়াছিল। কৌণ্ট বলিয়া উঠিলেন:—
“এই যাদু-কবচটা সঙ্গে নিলেই, তাঁর সঙ্গে দেখা হতে পারবে!”