বিষয়বস্তুতে চলুন

অবতার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর)/৯

উইকিসংকলন থেকে
◄  
১০  ►

 যে সময়ে লাবিন্‌স্কি-প্রাসাদের ভৃত্যেরা প্রকৃত কৌণ্ট লাবিন্‌স্কিকে, গাড়ীতে উঠাইয়া দেয় এবং কৌণ্ট নিজের ভূস্বর্গ হইতে তাড়িত হইয়া অক্টেভের বাসা-বাড়ীতে আসিয়া উপনীত হন—সেই সময় রূপান্তরিত অক্টেভ ধব্‌ধবে—সাদা একটি ক্ষুদ্র বৈঠকখানা ঘরে গিয়া—কখন্‌ কৌণ্টেসের ফু্র্‌সত হয়, তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিলেন।

 চিমনীর আগ্নেয়স্থানটা ফুলে ভরা; সেই চিমনীর সাদা মর্ব্বেল পাথরে ঠেস্ দিয়া, কৌণ্ট-দেহধারী অক্টেভ আপনার প্রতিবিম্ব দেখিতে পাইল। আয়নাটা সোনালি পায়া-ওয়ালা দেয়ালে-মারা একটা ব্র্যাকেটের উপ মানানসই রকমে বসানো। যদিও অক্টেভ দেহ-পরিবর্ত্তনের ভিতরকার গুপ্ত কথাটা জানিত, তথাপি, তাহার নিজের আকৃতি হইতে এই প্রতিবিম্ব এত তফাৎ যে, সে সহসা যেন বিশ্বাস করিতে পারিতেছিল না, আয়নার এই প্রতিবিম্ব তাহারই মুখের প্রতিবিম্ব কি না। অক্টেভ এই অপরিচিত ছায়া-মূর্ত্তিটা একদৃষ্টে দেখিতে লাগিল, উহা হইতে চোখ ফিরাইতে পারিতেছিল না।

 সে দেখিল উহা আর একজনের ছায়া-মূর্ত্তি। ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে সে একবার খোঁজ করিয়া দেখিল, কৌণ্ট ওলাক চিমনীর কাছে তাহার পাশে দাঁড়াইয়া আছেন কি না, এবং তাঁহারই ছায়া পড়িয়াছে কি না। কিন্তু কাহাকেই দেখিতে পাইল না। দেখিল—সে একলাই আছে। নিশ্চয়ই এই সমস্ত ডাক্তার শেরবোনোর কাণ্ড।

 কয়েক মিনিট পরে, কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ,—প্রাস্কোভির স্বামীর শরীরের মধ্যে তার আত্মা যে প্রবেশ করিয়াছে, এই চিন্তা হইতে বিরত হইয়া তাহার চিন্তার গতিকে বর্ত্তমান অবস্থার কতকটা অনুযায়ী করিয়া তুলিল। সমস্ত সম্ভাবনার বহির্ভূত এই অবিশ্বাস্ত্য ঘটনা, যাহা স্বপ্নেও কখন ভাবা যায় না, তাই কি না ঘটিল! এখনই সেই বহুদিনের আরাধা দেবীর সম্মুখে আমি উপস্থিত হইব, তিনি আর আমাকে প্রত্যাখ্যান করিবেন না! সেই অকলঙ্ক অনিন্দিতা রূপসীর সংসর্গে আমার চির-অভিলাষ পূর্ণ হইবে!

 সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত্ত যতই কাছাকাছি হইতে লাগিল, ততই তাহার মনের উদ্বেগ বাড়িতে লাগিল। প্রকৃত প্রেমের যে সঙ্কোচ ও ভীরুতা, তাই আসিয়া আবার দেখা দিল—যেন ঐ প্রেম এখনো অক্টেভের অনাদৃত, হীন দেহের মধ্যেই অবস্থিতি করিতেছে।

 রাণীর পরিচারিকার আগমনে, এই সমস্ত চিন্তা ও উদ্বেগ অপসারিত হইল। যখন পরিচারিকা নিকটে আসিল, তখন কৌণ্ট-দেহ অক্টেভের বুক ধড়াস্ ধড়াস্ করিতে লাগিল, তাহার দেহের সমস্ত রক্ত যেন হৃৎপিণ্ডে আসিয়া জমা হইল। পরিচারিকা বলিল:—

 “রাণীঠাকুরাণী আপনার অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত আছেন।”

 কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ পরিচারিকার পিছনে পিছনে চলিল, কেননা সে এই প্রাসাদের অন্ধিসন্ধি কিছুই জানিত না। পদচালনায় ইতস্ততঃ-ভাব দেখিয়া পাছে তার অজ্ঞতা প্রকাশ হইয়া পড়ে, এইজন্য সে পরিচারিকার অনুসরণ করাই শ্রেয়ঃ বিবেচনা করিল। পরিচারিকা তাহাকে একটা ঘরে লইয়া গেল। ঘরটা বেশ একটু বড় রকমের। এটি রাণীর প্রসাধন-কক্ষ। প্রসাধন-টেবিল সমস্ত সুকুমার বিলাস সামগ্রীতে বিভূষিত। উৎকৃষ্ট খোদাই কাজ-করা কতকগুলা আলমরী; আলমারীগুলা সার্টিন, মখমল, মলমল, জরি প্রভৃতি নানা—প্রকার সৌখীন পরিচ্ছদে ঠাসা। ঘরের দেয়াল সবুজ সার্টিন দিয়া মোড়া। মেজের তক্তা বিচিত্র মোলায়েম রঙে রঞ্জিত এক পুব কোমল গালিচায় আচ্ছাদিত। প্রসাধন-টেবিলে সুগন্ধ-নির্য্যাসের স্ফটিক শিশিগুলা বাতির আলোয় ঝিকমিক্ করিতেছে।

 ঘরে মধ্যস্থলে একটা সবুজ মখমল-পা-দানের উপর অদ্ভুত গঠনের ইস্পাতের কাজ-করা একটা বৃহৎ ভূষণ- পেটিকা—তাহাতে বিবিধ রত্নালঙ্কার সজ্জিত রহিয়াছে। কিন্তু এই সব অলঙ্কার পেটিকাতেই প্রায় বদ্ধ থাকিত;—কৌণ্টেস্ ক্বচিৎ কখন তাহা ব্যবহার করিতেন। নারীসুলভ অশিক্ষিত সুরুচি তাঁকে বলিয়া দিত—রত্ন-অলঙ্কারে রূপসীর প্রয়োজন হয় না। রূপের ছটার কাছে ঐশ্বর্য্যের ঘটা অতীব তুচ্ছ।

 জান্‌লা হইতে পর্দ্দা ভাঁজে ভাঁজে নীচে লুটাইয়া পড়িয়াছে—সেই জান্লার কাছে, একটা বড় আয়না ও প্রসাধন-টেবিলের দুই-ডেলে বৈঠকী ঝাড়ের ছয় বাতির আলোয় উদ্ভাসিত। তাহারই সম্মুখে কৌণ্টেস্ প্রাঙ্কোভি লাবিন্‌স্কা রূপলাবণ্যের ছটা বিকীর্ণ করিয়া উপবিষ্টা। এক লঘু স্বচ্ছ বহিরাচ্ছাদনের নীচে কার্পাসের একটা শিথিল বন্ধনহীন নৈশ পরিচ্ছদ। তুষার—শুভ্র সুশোভন সুভঙ্গিম মরাল-কণ্ঠ বহিরাচ্ছাদনের ভিতর হইতে দেখা যাইতেছে। দুই দাসীতে মিলিয়া তাঁহার প্রচুর কেশগুচ্ছ ভাগ করিতেছিল, মসৃণ করিতেছিল, কুঞ্চিত করিতেছিল, কাণের ঘর্ষণ না লাগে,—এই ভাবে সাবধানে কেশরাশি কুঞ্চিত—আকারে গুছাইয়া রাখিতেছিল।

 যখন এই কেশ-বিন্যাসের কাজ চলিতেছিল, রাণী জরির কাজ-করা সাদা মখ্মলের একটা ছোট চটিজুতার অগ্রভাগ মৃদু মৃদু নাচাইতে ছিলেন। কখন কখন বহিরাবরণ-বস্ত্রের ভাঁজ একটু সরিরা গিয়া, তুষার—শুভ্র নিটোল বাহু বাহির হইতেছিল, এবং কোন কেশগুচ্ছ স্থানচ্যুত হইলে অতি শোভন ভঙ্গীতে হাত দিয়া তাহা সরাইয়া দিতেছিলেন।

 তাঁহার সমস্ত শরীরে যেরূপ একটা শোভন এলানো ভাবভঙ্গী ছিল, তাহা কেবল প্রাচীন গ্রীক্ পাষাণ-মূর্ত্তিতেই লক্ষিত হয়। এরূপ লগ ধরণের তরুণ সৌন্দর্য্য, সুন্দর গঠন আর কুত্রাপি দেখা যায় না। ফ্লরেন্সের বাগান—বাড়ীতে অক্টেভ কৌণ্টেসকে যখন দেখিয়াছিল, তাাহা অপেক্ষা এখন কৌণ্টেস আরও চিত্ত-মোহিনী হইয়াছেন। যদি অক্টেভ পূর্ব্বেই ইহার রূপে মুগ্ধ না হইতেন, তাহা হইলে তাঁহাকে এখন দেখিয়া নিশ্চয়ই মুগ্ধ হইতেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রনে আরও কিছু যোগ করিয়া অসীমের বৃদ্ধি করা যায় না।

 কোন একটা ভীষণ দৃশ্য দেখিলে যেরূপ হয়, কৌণ্টেসকে এইরূপ মূর্ত্তিতে দেখিয়া, কৌণ্ট-দেহধারী অক্টেভের হাঁটুতে হাঁটুতে ঠেকাঠেকি হইতে লাগিল,—সে একেবারে যেন আত্মহারা হইয়া পড়িল; মুখ শুকাইয়া গেল। মনে হইতে লাগিল, কে যেন হাত দিয়া তার গলা টিপিয়া ধরিয়াছে। লোহিতবর্ণ অগ্নিশিখা যেন তাহার চক্ষের চারিধারে তরঙ্গিত হইতে লাগিল। এই রূপসী তাহাকে মুগ্ধ করিয়াছে।

 এই আত্মহারা ভাব, এই মৃঢ়তার ভাব কোন প্রত্যাখ্যাত প্রণয়ীর পক্ষেই সাজে, কিন্তু কোন স্বামীর পক্ষে নিতান্তই হাস্যজনক—এই মনে করিয়া কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ সাহস করিয়া দৃঢ়পদক্ষেপে কৌণ্টেসের অভিমুখে অগ্রসর হইল। দাসীরা তখন তাঁহার বেণী রচনা করিতেছিল; তাই কৌণ্টেস মুখ না ফিরাইয়া বলিলেন, “আঃ! তুমি ওলাফ! কি দেরী করেই এসেছ আজ!” তারপর, বহিরাবরণ-বস্ত্রের ভাঁজ হইতে তাঁর সুন্দর একটি হাত বাহির করিয়া, অক্টেভের দিকে বাড়াইয়া দিলেন।

 কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ কুসুম-কোমল এই হাতখানি লইয়া জ্বলন্ত আগ্রহের সহিত দীর্ঘ টানে চুম্বন করিল—যেন তাহার সমস্ত অন্তঃকরণ তাহার ওষ্ঠাধরে আসিয়া তখন কেন্দ্রীভূত হইয়াছিল।

 আমরা জানিনা, কি এক সূক্ষ্ম বোধশক্তি হইতে, কি এক স্বর্গীয় লজ্জাশীলতা হইতে, হৃদয়ের কি এক যুক্তিহীন যুক্তি হইতে, কৌণ্টেস যেন পূর্ব্ব হইতেই সমস্ত ব্যাপার জানিতে পারিয়াছিলেন; লোহিতবর্ণ উচ্চ গিরিশিখরস্থ তুষাররাশি ঊষার প্রথম চুম্বনে যেরুপ হয়, সেইরূপ তাঁহার মুখ, তাঁহার কণ্ঠ, তাঁহার বাহু সহসা রক্তিম রাগে রঞ্জিত হইল। অর্দ্ধ অভিমানের ভাবে, অর্দ্ধলজ্জার ভাবে, কাঁপিতে কাঁপিতে তাঁহার হাতখানি ধীরে ধীরে সরাইয়া লইলেন। অক্টেভের ওষ্ঠাধর স্পর্শে তাঁহার মনে হইল, তাঁহার হাতের উপর কে যেন অগ্নি-তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা দিল। তথাপি তিনি চিত্তকে সংযত করিয়া, তাঁর সেই শিশুবৎ মধুর হাসিটি মুখে আনিলেন।

 “ওলাফ, তুমি কোন উত্তর দিচ্চ না কেন? আমি যে ছয় ঘণ্টার উপরেও তোমাকে আজ দেখ্তে পাইনি।” পরে ভৎসনা-স্বরে বলিলেন—“তুমি আমাকে এখন বড়ই অবহেলা কর, পূর্ব্বে ত তুমি অনেক রাত্রি পর্য্যন্ত আমাকে এই রকম করে’ এক্‌লা ফেলে থাক্‌তে পারতে না। তুমি কি আমাকেই শুধু ভাব্‌ছিলে?”

 কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ উত্তর করিল:—

 —“তোমাকেই। তোমা ভিন্ন আর কাউকে না।”

 “না, না, সব সময় আমাকে ভাবনি; যে সময়ে তুমি আমার কথা ভাব, আমি দূরে থাক্‌লেও তা জান্‌তে পারি। এই মনে কর, আজ রাত্রে আমি একলা ছিলাম, সময় কাটাবার জন্য পিয়ানোয় বসে একটা সুর বাজাচ্ছিলাম। যখন সুরগুলো খুব জমে উঠেছিল, তোমার আত্মা কয়েক মিনিট ধরে’ আমার চারিদিকে একবার ঘুর-পাক দিয়েছিল; তারপর কোথায় যে উড়ে গেল, কিছুই জানতে পারলাম না —তারপর সে আর ফিরে আসেনি। মিথ্যে কথা বোলো না। আমি যা তোমাকে বল্‌চি—সে বিষয়ে আমি খুব নিশ্চিত।”

 বস্তুতঃ প্রাস্কোভির ভুল হয় নাই; এই সেই মূহূর্ত্ত, যে মুহূর্ত্তে ডাক্তার শেরবোনোর বাড়ীতে, কৌণ্টওলাফ মন্ত্রপূত জলপাত্রের উপর নত হয়ে একাগ্রচিত্তে তাঁহার আরাধ্য দেবীর মূর্ত্তিকে আহ্বান করেছিলেন—তার পরেই তিনি সম্মোহন-নিদ্রার অতল সমুদ্রের মধ্যে নিমজ্জিত হইয়া পড়েন। তখন তাঁর জ্ঞান, তাঁর ভাব, তাঁর ইচ্ছা—সব বিলুপ্ত হইয়া যায়।

 দাসীরা কৌণ্টেসের নৈশ প্রসাধন সমাপন করিয়া চলিয়া গিয়াছিল। কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ সেইখানে বরাবর সমান দাঁড়াইয়া থাকিয়া কৌণ্টেস প্রাস্কোভির উপর জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছিল। এই লালসা-দীপ্ত দৃষ্টি সহ্য করিতে না পারিয়া, কৌণ্টেস তাঁর সর্ব্বাঙ্গ আলখাল্লায় বেশ করিয়া আচ্ছাদন করিলেন, কেবল মাথাটা খোলা রহিল। ব্রহ্মলোগম্‌ নামে সেই সন্ন্যাসীর মন্ত্র-বলে ডাক্তার শেরবোনো দুই আত্মাকে স্থানচ্যুত করিয়াছেন—একথা শুধু প্রাস্কোভি কেন—কোনও মানুষের অনুমান করা অসম্ভব। কিন্তু প্রাস্কোভি, কৌণ্ট-দেহ অক্টেভের চোখে, ওলাফের সচরাচর চোখের ভাব, সেই দেবোপম বিশুদ্ধ প্রশান্ত ধ্রুব নিত্য প্রেমের ভাব দেখিতে পাইলেন না। কৌণ্ট-দেহ অক্টেভের ঐ দৃষ্টিতে একটা পার্থিব লালসার আগুন জ্বলিতেছিল। তাই ঐ দৃষ্টিতে কৌণ্টেস ব্যথিত ও লজ্জিত হইয়া পড়িয়াছিলেন। ঠিক্ কি ঘটিয়াছে বুঝিতে না পারিলেও, তাঁর মনে হইল একটা কিছু নিশ্চয়ই ঘটিয়াছে। নানাপ্রকার অনুমান করিতে লাগিলেন; তবে আমি কি এখন ওলাফের চোখে শুধু একটা ইতর রমণী, একজন নীচ বারাঙ্গনা মাত্র —যার রূপের লালসায় তিনি উন্মত্ত হয়েছেন। আমাদের আত্মায় আত্মায় কেমন একটি সুন্দর মিল ছিল—দুই হৃদয়-বীণা কেমন মধুর ভাবে এক সুরে বাজ্ত‌, না জানি কিসে এই মিলটি, এই ঐক্যতানটি ভেঙ্গে গেল। কিন্তু ওলাক কি আর কাউকে ভালবাসত? প্যারিসের পঙ্কিল মলিনতা ঐ অকলঙ্ক হৃদয়কে কি কখন কলঙ্কিত করেছিল?” এই প্রশ্নগুলি তাঁর মনের মধ্য দিয়া দ্রুতভাবে চলিয়া গেল, কিন্তু কোন সন্তোষজনক উত্তর তিনি দিতে পারিলেন না। ভাবিলেন, হয়ত আমি উন্মাদগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু তবু ভিতরে ভিতরে যেন অনুভব করিতে লাগিলেন যে, তাঁর বুদ্ধি লোপ পায় নাই। কি একটা অজ্ঞাত বিপদ তাঁর সম্মুখে উপস্থিত—এইরূপ ভাবিয়া তাঁর অত্যন্ত ভয় হইল। মনে করিলেন আত্মার এই “দ্বিতীয় দর্শনের” প্রভাবে যাহা অনুমান হইতেছে, তাহা অগ্রাহ্য করা ঠিক্ নহে।

 তিনি বিচলিত ও আকুল-ব্যাকুল হইয়া উঠিয়া পড়িলেন এবং উঠিয়া তাঁহার শয়ন-কক্ষের দিকে অগ্রসর হইলেন। অলীক কৌণ্টও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলিল। কৌণ্টেস দরজার কাছে আসিয়া আবার ফিরিলেন। মুহূর্ত্তের জন্য থামিলেন। তারপর প্রস্তর-মূর্ত্তির মত সাদা ও শীতলকায় কৌণ্টেস, ঐ যুবকের প্রতি ভীতি-বিস্ফারিত কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন, এবং ঝপ্ করিয়া দরজাটা বন্ধ করিয়া, খিল লাগাইয়া দিলেন।

 “ও যে অক্টেভের দৃষ্টি!” এই কথা বলিয়া অর্দ্ধ-মূর্চ্ছিত হইয়া একটা কৌচের উপর শুইয়া পড়িলেন। চৈতন্য ফিরিয়া আসিলে মনে-মনে বলিলেন:—আচ্ছা, এ কেমন করে’ হ’ল, সেই দৃষ্টি—যে দৃষ্টির ভাবটা আমি কখনই ভুলব না—সেই দৃষ্টি ওলাফের চোখে কেন আজ রাত্রে দেখতে পেলাম?” সেই বিষন্ন হতাশ হৃদয়ের অগ্নিশিখা আমার স্বামীর চোখের উপর জ্বলে উঠ্ল কি করে’? অক্টেভের কি মৃত্যু হয়েছে? আমার কাছে চিরবিদায় নেবার জন্য তাঁর আত্মা কি মুহূর্ত্তের জন্য আমার সম্মুখে দপ্, করে’ একবার জ্বলে উঠল! ওলাফ; ওলাফ! যদি আমি ভুল করে থাকি, যদি পাগলের মত মিথ্যা ভয়ে আকুল হয়ে থাকি, তবে আমাকে তুমি ক্ষমা কর। কিন্তু দেখ, যদি আমি আজ রাত্রে তোমাকে আলিঙ্গন করতাম, তা’হলে আমার মনে হ’ত আমি আর একজনকে আলিঙ্গন করচি।”

 খিল্‌টা ভাল করিয়া লাগানো হইয়াছে কিনা, দৃঢ়-নিশ্চয় হইয়া, মাথার উপর যে লণ্ঠন ঝুলিতেছিল, সেই লণ্ঠনটা জ্বালাইয়া, কৌণ্টেস ভীত শিশুর মত গুঁড়ি-সুঁড়ি মারিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলেন। কি এক অনির্দেশ্য বেদনা তাঁর বুকে চাপিয়া রহিল। সমস্ত রাত্রি নিদ্রা হইল না। ভোরের দিকে ঘুমাইয়া পড়িলেন। কত অসংলগ্ন অদ্ভুত স্বপ্ন আসিয়া তাঁর গভীর নিদ্রায় ব্যাঘাত করিল। আগুনের মত জ্বলন্ত সেই অক্টেভের চোখ—কুয়াসার ভিতর হইতে—তাঁহার উপর একদৃষ্টে চাহিয়া আছে এবং তাঁহার উপর আগুনের হল্‌কা নিক্ষেপ করিতেছে। আর সেই সময় তাঁহার খাটের নীচে একটা কালোমুর্ত্তি—মুখ বলি-রেখায় আচ্ছন্ন,—উবু হইয়া বসিয়া আছে, অপরিচিত ভাষায় বিড়বিড় করিয়া কি বলিতেছে; এই অদ্ভুত স্বপ্নের মধ্যে ওলাফও আছেন—কিন্তু তাঁর নিজের আকৃতিতে নয়—অন্য আকৃতি ধরিয়া।

 অক্টেভ যখন দেখিল, তার সম্মুখেই দরজা বন্ধ হইল, ভিতরকার অর্গলের ক্যাঁচ-কোঁচ শব্দ শুনা গেল, তখন সে কিরূপ হতাশ হইয়া পড়িল, তাহা আমরা আর বর্ণনা করিব না। তাহার সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত্তের চরম আশা অন্তর্হিত হইল। মনে মনে বলিলঃ— “আমি কি করিলাম! এক নারীর হৃদয় জয় করবার জন্য, এক যাদুকরের হাতে আত্ম-সমর্পণ করে আমার ইহকাল পরকাল সমস্তই নষ্ট করলাম— ভারতবর্ষের ডাইনীমন্ত্রে সেই নারী অসহায় ভাবে আমার কাছে ধরা দিয়েছিল—কিন্তু আবার পালিয়ে গেল। আমি পূর্ব্বে প্রেমিক হয়ে প্রত্যাখাত হয়েছিলাম, এখন আবার স্বামী হয়ে প্রত্যাখ্যাত হলাম। প্রাস্কোভির অজেয় সতীত্ব যাদুকরের সমস্ত নারকী কুমন্ত্রনা—জাল ছিন্ন করে দিয়েছে। শয়ন—কক্ষের দ্বারদেশে এক দেবীমূর্ত্তি আবির্ভূত হয়ে যেন কলুষিত-চিত্ত কোন দুরাত্মাকে দূর করে দিলেন!

 অক্টেভ সমস্ত রাত্রি এই অদ্ভুত অবস্থায় আর থাকিতে পারিল না। সে কৌণ্টের মহলটা খুঁজিতে লাগিল। সারি সারি অনেক ঘর পার হইয়া অবশেষে দেখিতে পাইল,—কাঠের খুঁটি-বিশিষ্ট একটা উচ্চ পালঙ্ক—তাহাতে সংলগ্ন বুটিদার চিত্র, বিচিত্র পর্দ্দা। কায়িক শ্রমে ও মনের আবেগে শ্রান্ত ক্লান্ত হইয়া কৌণ্ট-দেহ অক্টেভ সেই পালঙ্কের উপর ওইয়া পড়িল,—শেরবোনোর উপর অভিশাপ বর্ষণ করিতে করিতে ঘুমাইয়া পড়িল। সৌভাগ্যক্রমে, সূর্য্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনের অবস্থা একটু ভাল হইয়া উঠিল। সে প্রতিজ্ঞা করিল,—“এখন হইতে আমি একটু সংযত হয়ে চল্‌ব; ওরূপ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তার মুখের পানে চেয়ে থাক্‌ব না; স্বামীর ধরণ-ধারণ অবলম্বন করব। কৌণ্টের পরিচারকের সাহায্যে অক্টেভ একটু গম্ভীর ধরণের সাজসজ্জা করিয়া, ধীরপাদবিক্ষেপে খাবার ঘরে প্রবেশ করিল। সেইখানে কৌণ্টেস প্রাতর্ভোজনে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন।”