অমৃত-দ্বীপ/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
সুন্দরবাবুর সাগর-স্নান
চোখে দূরবীণ লাগিয়ে জয়ন্ত যা দেখলে তা ভয়াবহই বটে!
বোম্বেটেদের জাহাজেরও অনেক পিছনে— বহু দূরে, আকাশ ও সমুদ্রের চেহারা একেবারে বদলে গেছে! নীচে বিপুল মাথা-নাড়া দিয়ে উঠেছে প্রচণ্ড, উন্মুত্ত, বৃহৎ তরঙ্গের পর তরঙ্গ— বলা চলে তাদের পর্ববত-প্রমাণ! তারা লাফিয়ে উপরে উঠছে, ঝাঁপিয়ে নীচে পড়ছে, আবার উঠছে, আবার নামছে এবং ঘুরপাক খেতে খেতে ফেনায় ফেনায় সেখানকার নীলিমাকে যেন খণ্ড খণ্ড ক’রে দিয়ে এগিয়ে আসছে উল্কার মতন তীব্রগতিতে! উপরে আকাশেরও রং হয়ে গেছে কালো মেঘে মেঘে ঘোরা-রাত্রির মতই অন্ধকার! বেশ বোঝা যায়, জেগে উঠেছে সেখানে সর্ব্বধ্বংসী আকস্মিক ঝঞ্চাবায়ু—যার মস্তকান্দোলনে দিকে দিকে ঠিকরে পড়ছে বাঁধন-হার। নিকষ কালো মেঘের জটা এবং ঘন ঘন পদাঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে উথলে উঠছে তরঙ্গাকুল মহাসমুদ্র!
ফিরে দাঁড়িয়ে অভিভুত স্বরে জয়ন্ত বল্লে, “টাইফুন্?”
কুমার খালি-চোখেই সেদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা আন্দাজ ক’রে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ, আমরা যাকে বলি ঘূর্ণাবর্ত্ত।”
মাণিক বল্লে, “কিন্তু আমাদের এখানে তো একটুও বাতাস নেই, অসহ্য উত্তাপে গা যেন পুড়ে যাচ্ছে!”
কুমার বল্লে, “ও-সব টাইফুনের পূর্ব্ব-লক্ষণ। এ অঞ্চলে টাইফুন্ জাগবার সম্ভাবনা ঐ লক্ষণ থেকেই জানা যায়।”,
জয়ন্ত বল্লে, “কুমারবাবু, সমুদ্র যাত্রা আমার এই প্রথম, এর আগে টাইফুন্ কখনো দেখি নি। কিন্তু শুনেছি চীনা-সমুদ্রে টাইফুনের পাল্লায় প’ড়ে ফি বৎসরেই অনেক জাহাজ অতলে তলিয়ে যায়।”
—“সেইজন্যেই তো ওকে আমরা বোম্বেটেদেরও চেয়ে ভয়ানক ব’লে মনে করছি! বোম্বেটেদের সঙ্গে লড়া যায়, কিন্তু টাইফুনের সঙ্গে যুদ্ধ করা অসম্ভব। এখন আমাদের একমাত্র আশা ঐ দ্বীপ। যদি টাইফুনের আগে ওখানে গিয়ে পৌঁছতে পারি! হয়তো পারবও, কারণ আমরা দ্বীপের খুব কাছে এসে পড়েছি। এই দেখুন, আমাদের জাহাজের গতি আরো বেড়ে উঠেছে!”
এতক্ষণ সুন্দরবাবু ছিলেন ভয়ে হতভম্বের মত। এইবারে মুখ খুলে তিনি ব’লে উঠলেন, “হুম্! দুর্গে দুর্গতিনাশিনী!”
জয়ন্ত বল্লে,“কিন্তু বোম্বেটেদের জাহাজ এখনো দূরে রয়েছে, সে কি টাইফুন্কে ফাঁকি দিতে পারবে?”
কুমার বলে, “ওদের নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই।”
মাণিক বল্লে, “কি আশ্চর্য্য দৃশ্য! সমুদ্রের আর সব দিক্ শান্ত, কেবল একদিকেই জেগেছে নটরাজের প্রলয়-নাচন!”
কুমার বল্লে, “সাধারণ ‘সাইক্লোনে’র মত টাইফুন্ বহু দূর ব্যেপে ছোটে না, ঐটেই তার বিশেষত্ব! কিন্তু ছোট হ’লেও তার জোর ঢের বেশী—যেটুকু জায়গা জুড়ে আসে, তার ভিতরে পড়লে আর রক্ষে নেই!”
দূর থেকে ‘মেগাফোনে’ বিমলের উচ্চ কণ্ঠস্বর জাগল—“কুমার, সবাইকে নিয়ে তুমি ডাঙায় নামবার জন্যে প্রস্তুত হও। কেবল নিতান্ত দরকারি জিনিষগুলো গুছিয়ে নাও।”
সবাই কেবিনের দিকে ছুটল। তারপর তাড়াতাড়ি কতকগুলো ব্যাগ ভর্ত্তি ক’রে আবার তারা যখন ডেকের উপরে এসে দাঁড়াল, দ্বীপ তখন একেবারে তাদের সামনে!
মাণিক বিস্মিত কণ্ঠে বললে, “সমুদ্র যে এখানে প্রকাণ্ড এক নদীর মত হয়ে দ্বীপের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে! এ যে এক স্বাভাবিক বন্দর!
জয়ন্ত বলে, “হ্যাঁ, আমাদের জাহাজও এই বন্দরে ঢুকছে।”
সুন্দরবাবু উৎফুল্ল স্বরে বল্লেন, “জয় মা কালী! আমরা বন্দরে আশ্রয় পেয়েছি!”
মাণিক বল্লে, “হ্যাঁ, আরো ভালো ক’রে মা-কালীকে ডাকুন সুন্দরবাবু! কারণ তিনি হচ্ছেন যুদ্ধের দেবী, আর বোম্বেটেরাও এই বন্দরে আসছে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেই।”
সুন্দরবাবু দুই হাত জোড় ক’রে মা-কালীর উদ্দেশে চক্ষু মুদে তিন বার প্রণাম ক’রে বল্লেন, “মাণিক, এ-সময়ে আর ভয় দেখিও না, মা-জগদম্বাকে একবার প্রাণ ভ’রে ডাকতে দাও।”
কুমার ফিরে দেখলে,শত্রুরা দ্বীপ লক্ষ্য ক’রে প্রাণপণে জাহাজ চালিয়েছে এবং দূরে তার দিকে বেগে তাড়া ক’রে আসছে সাগর-তরঙ্গ তোলপাড় ক’রে মূর্ত্তিমান মহাকালের মত সুভীষণ ঘূর্ণাবর্ত্ত!
দ্বীপের ভিতরে ঢুকে সমুদ্রের জল আবার মোড় ফিরে গেছে, কাজেই জাহাজও সঙ্গে সঙ্গে মোড় ফিরলে। তখন দ্বীপের বন-জঙ্গল ঠিক যবনিকার মতই বাহির-সমুদ্র, ঘূর্ণাবর্ত্ত ও বোম্বেটে-জাহাজের সমস্ত দৃশ্য একেবারে ঢেকে দিলে।
এমন সময়ে বিমল দৌড়ে সকলের কাছে এসে বললে, “জয়ন্তবাবু, কাপ্তেন বল্লেন এখানকার জল গভীর নয়, জাহাজ আর চলবে না। নাবিকরা নৌকোগুলো নামাচ্ছে, আমাদেরও জাহাজ থেকে নামতে হবে।”
সুন্দরবাবু বল্লেন, “কেন?”
——“বোম্বেটেরাও এখানে আসছে, তারা আমাদের চেয়ে দলে ঢের ভারি। আমরা ডাঙায় না নামলে তাদের আক্রমণ ঠেকাতে পারব না।”
সুন্দরবাবু আবার মুষড়ে প’ড়ে বল্লেন, “তাহ’লে যুদ্ধ আমাদের করতেই হবে?”
—“নিশ্চয়! টাইফুন আর বোম্বটে—আমাদের এখন যুদ্ধ করতে হবে দুই শত্রুর সঙ্গে! ঐ দেখুন, ‘সেলর’রা এরি মধ্যে ‘লাইফ-বোট’ ভাসিয়ে ফেলেছে! ঐ শুনুন, ‘মেগাফোনে’ কাপ্তেন-সায়েবের গলা! তিনি আমাদের নৌকোয় তাড়াতাড়ি নামতে বলছেন—নইলে ঝোড়ো ঢেউ এখানেও এসে পড়তে পারে! চলুন, আর দেরি নয়। রামহরি, তুমি বাঘাকে সামলাও!”:
লাইফ-বোট যেখানে থামল, সেখানে জলের ধার থেকেই একটি ছোট্ট পাহাড় প্রায় একশো ফুট উঁচু হয়ে উঠেছে।
বিমল বললে, “এইখানেই বন্দুক নিয়ে আমরা সবাই পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করব। বোম্বেটেরা আমাদের বন্দুক এড়িয়ে নিতান্তই “যদি ডাঙায় এসে নামে, তাহ’লে অবস্থা বুঝে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতত এই পাহাড়টাই হবে আমাদের দুর্গ। কি বল কুমার, কি বলেন জয়ন্তবাবু?”
জয়স্তু বল্লে, “সাধু প্রস্তাব। কিন্তু বিমলবাবু, একটা গোলমাল শুনতে পাচ্ছেন?”
—“হুঁ, ঝোড়া বাতাসের গেঁ-গোঁ হু-হু, সমুদ্রের হুঙ্কার!”
কুমার বলে, “কেবল তাই নয়—দূর থেকে যেন অনেক মানুষের কোলাহলও ভেসে আসছে!”
রামহরি বললে, “এতক্ষণ চারিদিক গুমোট্ ক’রে ছিল, এখন জোর হাওয়ায় এখানকার গাছপালাগুলো নুয়ে নুয়ে পড়ছে! ঝড় বোধ হয় এল!”
মাণিক বলে, “ঝড় এল, কিন্তু বোম্বেটে জাহাজ কোথায়?”
সুন্দরবাবু বললেন, “হুম্!” বাঘা বললে, “ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ!”
বিমল বল্লে, “তবে কি বোম্বেটেগুলো ঝড়ের খপ্পরেই পড়ল? দাঁড়াও, দেখে আসি”—ব’লেই সে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের উপরে উঠতে লাগল।
রামহরি উদ্বিগ্ন স্বরে বলে “ওপরে উঠ না খোকাবাবু, ওপরে উঠ না! বেশী ঝড় এলে উড়ে যাবে!”
কিন্তু বিমল মানা মানলে না। পাহাড়ের প্রায় মাঝ বরাবর উঠেই দাঁড়িয়ে প’ড়ে একদিকে তাকিয়ে সে চমৎকৃত স্বরে বল্লে, “আশ্চর্যা, আশ্চর্য্য! কুমার, কুমার, শীগ্গির দেখে যাও।”
বিপুল কৌতূহলে সবাই দ্রুতপদে উপরে উঠতে লাগল—একমাত্র, সুন্দরবাবু ছাড়া। তাঁর বিপুল ভুঁড়ি উর্দ্ধমার্গের উপযোগী নয়।
বাস্তবিকই সে এক আশ্চর্য্য দৃশ্য! যে বিষম টাইফুনের ভয়ে তারা সবাই এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে, সে-ভয়ঙ্কর দ্বীপের দিকে না এসে যেন পাশ কাটিয়েই প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে চলেছে অন্য দিকে হুহু ক’রে। দ্বীপের দিকে এসেছে খানিকটা উদ্দাম হাওয়ার ঝট্কা মাত্র, কিন্তু টাইফুন্ নিজে যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার শূন্যে দুলছে নিরন্ধ, অন্ধকার—নীচে কেবল অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে রুদ্র সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গদলের হিন্দোলা! আর ভেসে ভেসে আসছে প্রমত্ত ঘূর্ণাবর্ত্তের বিকট চীৎকার, গম্ভীর জল-কল্লোল, বহু মানব-কণ্ঠের আর্ত্তনাদ!
কুমার অভিভূত স্বরে বললে, “এমন বিচিত্র ঝড় আর কখনো দেখি নি। কিন্তু বোম্বেটেদের জাহাজখানা কোথায় গেল?”
বিমল বল্লে, “ওখানকার অন্ধকার ভেদ ক’রে কিছুই দেখবার উপায় নেই! তবে মানুষের গোলমাল শুনে বোধ হচ্ছে, ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে সেও কোথায় ছুটে চলেছে, হয়তো সমুদ্র এখনি তাকে গিলে ফেলবে!”
রামহরি সানন্দে বললে, “জয় বাবা পবনদেব! আজ তুমিই আমাদের সহায়!”
খানিকক্ষণ পরেই চারিদিক আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শূন্যে নেই অন্ধ মেঘের কালিমা, সমুদ্রে নেই বিভীষণের তাণ্ডবলীলা। একটু আগে কিছুই যেন হয় নি, এমনি ভাবেই মুখর নীলসাগর আবার বোবা নীলাকাশের কাছে আদিম যুগের জীবহীনা ধরিত্রীর পুরাতন গল্প-বলা সুরু করলে।
সূর্য্য সাগর-স্নানে নেমে অদৃশ্য হ’ল, কিন্তু আকাশ আর পৃথিবীতে এখনো আলো যেন ধরছে না! দূর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে সামুদ্রিক পাখী ফিরে আসছে দ্বীপের দিকে।
পাহাড়ের উপরে ব’সে সবাই বিশ্রাম করছিল। সেখান থেকে দ্বীপটিকে দেখাচ্ছে চমৎকার পরীস্থানের মত। নানা জাতের গাছেরা সেখানে সঙ্গীতময় সবুজ উৎসবে মেতে আছে এবং তাদের মধ্যে বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাম্-জাতীয় গাছেরাই।
কোথাও পাহাড়ের আনন্দাশ্রুধারার মত ঝ’রে পড়ছে ঠিক যেন একটি খেলাঘরের ঝরণা। রূপালী ফিতার মত তার শীর্ণ ধারা সকৌতুকে পাথরে পাথরে নাচতে নাচতে নেমে এসেছে নীচেকার সুন্দরশ্যাম জমির উপরে— যেখানে শ্যামলতাকে সচিত্র ক’রে তুলেছে রং-বেরঙের পুঞ্জ পুঞ্জ ফুলের দল। খানিক পরেই রাত হবে, তারার সভায় চাঁদ হাসবে, আর নতুন জ্যোৎস্নার ঝল্মলে আলো মেখে স্বপ্নবালারা আসবে যেন সেই ফুলদার ঘাস-গালিচার উপরে ব’সে ঝরণার কলগান শুনতে!
বিমল এই-সব দেখতে দেখতে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললে, “সহর আর সভ্যতা ছেড়ে পৃথিবীর যেখানেই যাই সেখানেই দেখি, রেখায় রেখায় লেখা আছে সৌন্দর্য্যের কবিতা। সহরে ব’সে হাজার টাকা খরচ ক’রে যতই ‘ড্রয়িং-রুম্’ সাজাও, কখনোই জাগবে না সেখানে রূপের এমন ঐশ্বর্য্য, লাবণ্যের এত ছন্দ! সহরে ব’সে আমরা যা করি তা হচ্ছে আসল সৌন্দর্য্যের ‘ক্যারিকেচার’ মাত্র, কাগজের ফুলের মতই অসার! তাই তো আমি যখন-তখন কুৎসিত সহর আর কপট সভ্যতাকে পিছনে ফেলে ছুটে যেতে চাই সৌন্দর্যময় অজানা বিজনতার ভিতরে। রামহরি জানে, আমরা দুরন্ত ডানপিটে, খুঁজি খালি অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু তুমি জানো কুমার, এ কথা সত্য নয়! চোখের সামনে রয়েছে এই যে তাপরূপের নাট্যশালা, আমাদের কল্পনা কি এখানে অভিনয় করতে ভালোবাসে না? আমরা কি কেবল ঘুসোঘুসি করতে আর বন্দুক ছুঁড়তেই জানি, কবিতা পড়তে পারি না?”
কুমার বললে, “আমার কি মনে হচ্ছে জানো বিমল? ঐ ফুলের বনে, ঐ ঝরণার ধারে একখানি পাতার কুঁড়েঘর গ’ড়ে সত্যিকার কবির জীবন যাপন করি! চারিদিকে বনের গান, পাখীর তান, বাতাসের ঝঙ্কার, মৌমাছির গুঞ্জন, ফুলের সঙ্গে প্রজাপতির রঙের খেলা, দিনে মাঠে মাঠে রোদের কাঁচা সোনা, রাতে গাছে গাছে চাঁদ্নীর ঝিলি-মিলি, আর এরি মধ্য থেকে সর্ব্বক্ষণ শোনা যায় অনন্ত সমুদ্রের মুখে মহাকাব্যের আবৃত্তি! কল্কাতার পায়রার খোপে আর আমার ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না।”
জয়ন্ত বললে, “পৃথিবীকে আমার যখন বড় ভালো লাগে তখন আমি চাই বাঁশী বাজাতে! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আমার সঙ্গে আছে বাঁশীর বদলে বন্দুক। বন্দুকের নল থেকে তো গান বেরোয় না, বেরোয় কেবল বিষম ধমক।”
মাণিক বললে, “কেন জয়ন্ত, খুসি হ’লেই তো তুমি আর একটি জিনিষ ব্যবহার কর! নস্যির ডিবেটাও কি তুমি সঙ্গে আনো নি?”
জয়ন্ত বললে, “হ্যাঁ মাণিক, নস্যির ডিবেটা আমার পকেটেই আছে। কিন্তু কবিতা কোনদিন ডিবের ভেতরে নস্যির সঙ্গে বাস করে না। আজ আমাদের সামনে দেখছি যে মুর্ত্তিমান সঙ্গীতকে, তার নাচের ছন্দ জাগতে পারে কেবল আমার বাঁশীর মধ্যেই।”
সুন্দরবাবু ধীরে ধীরে অনেক কষ্টে দোদুল্যমান ভুঁড়ির বিদ্রোহিতাকে আমলে না এনেই পাহাড়ের উপরে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের কবিত্ব-চর্চা আর তিনি বর্দাস্ত করতে পারলেন না, বিরক্ত স্বরে বললেন, “হুম্! পাহাড় থেকে ঝরণা করছে, বাতাসের ধাক্কা খেয়ে গাছগুলো ন’ড়ে-চ’ড়ে শব্দ করছে, কতগুলো পাখী চ্যাঁ-চ্যা ক’রে চ্যাঁচাচ্ছে, আর মাঠে ঘাস গজাচ্ছে, এ-সব নিয়ে এত বড় বড় কথার কিছু মানে হয় না। চল হে রামহরি, আমরা স’ড়ে পড়ি।”
জয়ন্ত হাসতে হাসতে বললে, “কিন্তু যাবেন কোথায়? জাহাজে?”
-“না। গরমে ছুটোছুটি ক’রে শরীরটা কেমন এলিয়ে পড়েছে এখানকার পাহাড়ের তলায় সমুদ্রের ঠাণ্ডা জলে বেশী ঢেউ নেই দেখছি। একটু সমুদ্র-স্নান করবার ইচ্ছে হয়েছে। রামহরি, কি বল?”
রামহরি বললে, “বেশ তো, চলুন না! আমিও একবার চান্ ক’রে নিই-গে। আয় রে বাঘা!”
—“কিন্তু তোমার বাঘাকে আগে আগে যেতে বল রামহরি, নইলে ও আবার হয়তো আমার পা শুঁক্তে আসবে!”
রামহরি বললে, “বাঘা, সাবধান! আবার যেন আমাদের সুন্দরবাবুর সঙ্গে গায়ে প’ড়ে ভাব করতে যেও না! যাও, এগিয়ে যাও।”
বাঘার ভাবভঙ্গী দেখে মনে হ’ল না যে, সুন্দরবাবুর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবার জন্যে তার মনে আর কিছুমাত্র বাসনা আছে। কিন্তু সে রামহরির কথা বুঝে ল্যাজ উঁচু ক’রে আগের দিকে দিলে লম্বা এক দৌড়।
রামহরির সঙ্গে সুন্দরবাবু যখন পাহাড় থেকে নেমে জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন আকাশের আলো তার উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলছে ধীরে ধীরে।
রামহরি বললে, “শীগ্গির দুটো ডুব দিয়ে নিন, আলো থাকতে থাকতেই আমাদের আবার জাহাজে গিয়ে উঠতে হবে।”
— “কিছু ভয় নেই রামহরি, আজ পূর্ণিমা। আজ অন্ধকার জব্দ!”
—“ঐ শুনুন, কু দিয়ে জাহাজ আমাদের ডাকছে! ঐ দেখুন, পাহাড়ের ওপর থেকে ওঁরা সবাই নেমে আসছেন!”
সুন্দরবাবু জলের ভিতরে ঝাঁপিয়ে প’ড়ে একটি সুদীর্ঘ “আঃ” উচ্চারণ করলেন। তারপর বললেন, “বাঃ, তোমাদের বাঘা দেখছি যে দিব্যি সাঁতার কাটছে! আমিও একটু সাঁতার দিয়ে নি! কি চমৎকার ঠাণ্ডা জল! দেহ যেন জুড়িয়ে গেল!”
জল কেবল ঠাণ্ডা নয়, নীলিমা—মাখানো সুন্দর, স্বচ্ছ। তলাকার প্রত্যেক বালু-কণাটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—এখানকার জলের মধ্যে কোনই অজানা রহস্য নেই। কাজেই সুন্দরবাবু মনের সুখে নির্ভয়ে সাঁতার কাটতে লাগলেন।
দূর থেকে মাণিক চীৎকার ক’রে বললে, “উঠে আসুন সুন্দরবাবু, অত আর সাঁতার কাটতে হবে না! এখানকার সমুদ্রে হাঙর আছে!”
সুন্দরবাবু আঁৎকে উঠে বললেন, “হুম্, কি বললে? হাঙর? তাই তো হে, এ-কথা তো এতক্ষণ মনে হয় নি! বাব্বাঃ! দরকার নেই আমার সাঁতার কেটে!”—তিনি তীরের দিকে ফিরলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করলেন জলের ভিতর থেকে প্রাণপণে কে তাঁর কোমর জড়িয়ে ধরলে!
—“ওরে বাবা রে, হুম্—হুম্! হাঙর, হাঙর! জয়ন্ত, মাণিক, রমহরি! আমাকে হাঙরে ধরেছে—হু-হু-হু-হু-হুম্!”
রামহরি একটু তফাতে ছিল। কিন্তু সেইখান থেকেই সে স্তম্ভিত নেত্রে বেশ দেখতে পেলে যে, সুন্দরবাবুর দেহের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে রয়েছে, সুদীর্ঘ একটা ছায়ামূর্ত্তি!
সুন্দরবাবু পরিত্রাহি চীৎকার ক’রে বললেন, “বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও! হাঙর নয়, এ যে একটা মানুষ! এ যে মড়া! ওরে বাবা, এ যে ভূত! এ যে আমাকে জলের ভিতরে টানছে—ও জয়ন্ত, ও মাণিক!”
বিমল, কুমার জয়ন্ত ও মাণিক, তীরের মত পাহাড় থেকে নেমে এল। ভুতের নামে রামহরি একবার শিউরে উঠল বটে, কিন্তু তখনি সে দুর্ব্বলতা সাম্লে নিয়ে বেগে সাঁতার কেটে সুন্দরবাবুর দিকে অগ্রসর হ’ল। কিন্তু সর্ব্বাগ্রে সুন্দরবাবুর কাছে গিয়ে পড়ল বাঘা—তার দুই চক্ষু জ্বলছে তখন তীব্র উত্তেজনায়!
—“আর পারছি না, একটা জ্যান্তো মড়া আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে—বাঁচাও!”