বিষয়বস্তুতে চলুন

অমৃত-দ্বীপ/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

​

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন

 যে দল এগিয়ে আসছে তার ভিতরকার প্রত্যেক মুর্ত্তিটাই যেন মানুষের মতন দেখতে কলের পুতুলের মতন। কেবল চলছে তাদের পাগুলো, কিন্তু উপর-দেহের অংশ একেবারেই কাঠের মত আড়ষ্ট! তাদের হাত দুলছে না, মাথাগুলোও এদিকে-ওদিকে কোনদিকেই ফিরছে না! আশ্চর্য্য!

 দূর থেকে কেবল এইটুকুই বোঝা গেল, আর দেখা গেল খালি শত শত চোখে স্থির আগুনের মতন উজ্জ্বল দৃষ্টি!

 কিন্তু অগ্নি-উজ্জ্বল এই-সব দৃষ্টি এবং এই-সব আড়ষ্ট দেহের চলন্ত পদের চেয়েও অস্বাভাবিক কেমন একটা অজানা-অজানা ভাব মূর্ত্তিগুলোর চারিদিকে কি যেন এক ভুতুড়ে রহস্য সৃষ্টি করেছে!

 কুমার শিউরে উঠে তাড়াতাড়ি নিজের বন্দুক তুল্‌লে।

 বিমল বল্‌লে, “বন্ধু, অকারণে নরহত্যা ক’রে লাভ নেই।”

 কুমার বললে, “নরহত্যা নয় বিমল, আমি প্রেতহত্যা করব। রামহরি ঠিক বলেছে, এ হচ্ছে পিশাচদের দ্বীপ, এখানে মানুষ থাকে না।”

 —“কুমার, পাগ্‌লামি কোরো না।”

 —“পাগ্‌লামি? ওরা কারা? এই মাত্র দেখে এলুম নদীর ধারে জনপ্রাণী নেই, তবু ওরা কোত্থেকে আবির্ভূত হ’ল? ওরা ​মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে উঠল, না আকাশ থেকে খ’সে পড়ল? ওদের আর কাছে আসতে দেওয়া উচিত নয়, বন্দুক ছোঁড়ো বিমল, বন্দুক ছোঁড়ো।”

 বিমল ঘাড় নেড়ে বল্‌লে, “কি হবে বন্দুক ছুঁড়ে? ওরা যদি এক সঙ্গে আক্রমণ করে তা হ’লে বন্দুক ছুঁড়েও আমরা আত্মরক্ষা করতে পারব না, উল্টে বন্দুকের শব্দে সজাগ হয়ে দ্বীপের সমস্ত বাসিন্দা এদিকে ছুটে আসতে পারে।”

 জয়ন্ত চমৎকৃত স্বরে বল্‌লে, “বিমলবাবু, এ কি আশ্চর্য্য ব্যাপার! প্রায় পাঁচশো লোক মাটির উপরে একসঙ্গে পা ফেলে এগিয়ে আসছে, তবু কোনরকম পায়ের আওয়াজই শোনা যাচ্ছে না? এও কি সম্ভব? না, আমরা কি কালা হয়ে গেছি?”

 কুমার বললে, “বিমল, বিমল! তবে কি বিনা বাধায় আমাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে? না বন্ধু, এতে আমি রাজি নই।”

 বিমল বলে, “না, আত্মসমর্পণ করব কেন? আমরা ছুটে ঐ বনের ভিতরে গিয়ে ঢুকব।”

 —“তবে ছোটো! ওরা যে এসে পড়ল!”

 জয়ন্ত বললে, “কিন্তু যারা গান গাইছে তারা ঐ বনের ভিতরেই আছে। শেষ-কালে যদি আমরা দু’দিক থেকে আক্রান্ত হই?”

 বিমল চট্‌পট্‌ চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বল্‌লে, “মূর্ত্তিগুলো আসছে পশ্চিম দিক্ থেকে, আর গানের আওয়াজ আসছে পূর্ব্বদিক্‌ থেকে। পূর্ব্ব-দক্ষিণ কোণেও রয়েছে বন। চলুন, আমরা ঐ দিকেই দৌড় দি।”

​ পূর্ব্ব-দক্ষিণ কোণ লক্ষ্য ক’রে তিনজনেই বেগে দৌড়তে লাগল। খানিকক্ষণ পরে বন ও মাঠের সীমারেখায় এসে দাঁড়িয়ে প’ড়ে তারা আর একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলে।

 সেই বিচিত্র মূর্ত্তির বৃহৎ দল দ্রুতবেগে তাদের অনুসরণ করে নি, তাদের গতি একটুও বাড়ে নি! তারা যেমন ভাবে অগ্রসর হচ্ছিল এখনো ঠিক সেই ভাবেই এগিয়ে আসছে—যেন তাদের কোনই তাড়া নেই! তফাতের মধ্যে খালি এই, এখন তারাও আসছে পূর্ব্ব-দক্ষিণ দিকে।

 বিমল আশ্চর্য্য হয়ে বল্‌লে, “ওরা যে আমাদের পিছনে পিছনে আসছে সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু ব্যাপার কি বল দেখি কুমার? ওরা তো একটুও তাড়াহুড়ো করছে না,—রাহু যেমন নিশ্চয়ই চাঁদকে গ্রাস করতে পারবে জেনে এগুতে থাকে ধীরে ধীরে, ওরাও অগ্রসর হচ্ছে সেই ভাবেই! যেন ওরা জানে, যত জোরেই পা চালাই ওদের কবল থেকে কিছুতেই আমরা পালাতে পারব না!”

 কুমার বল্‌লে, “ওদের ধরণ-ধারণ দেখলে মনে হয় যেন নিশ্চিত মৃত্যুর দল মূর্ত্তি ধারণ ক’রে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে!”

 জয়ন্ত বল্‌লে, “ওরা কারা তা জানি না, কিন্তু আমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়।”

 বিমল বল্‌লে, “এখন দেখছি সঙ্গীদের জাহাজে রেখে এসে ভালো কাজ করি নি। এই রহস্যময় দ্বীপে অদৃষ্টে কি আছে জানি না, কিন্তু চলুন, আমরা বনের ভিতরে গিয়ে ঢুকি।”

​ আর এক দৌড়ে তারা মাঠ ছেড়ে বনের ভিতরে গিয়ে পড়ল।

 বন সেখানে খুব ঘন নয়, গাছগুলোর তলায় তলায় ও ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে খানিক কালো আর খানিক আলোর খেলা। ঝোপঝাপের মাঝখান দিয়েও ফুটে উঠেছে আলো-কালো মাখা পথের রেখা।

 এবং দূর থেকে তখনো ভেসে আসছিল সেই বিচিত্র সঙ্গীতের তান।

 কুমার বল্‌লে, “এখন আমরা কোন দিকে যাব?”

 বিমল বল্‌লে, “পূর্ব্ব-দক্ষিণ দিকে আরো খানিক এগিয়ে তার পর আবার আমরা নদীর দিকে ফেরবার চেষ্টা করব।”

 বিমলের মুখের কথা শেষ হ’তেই সারা অরণ্য যেন চম্‌কে উঠল কি এক পৈশাচিক হো-হো অট্টহাস্যে! তাদের আশ-পাশ, সুমুখ পিছন থেকে ছুটল হাসির হর্‌রার পর হাসির হর্‌রা! যে বিকট হাসির স্রোত বইছে যেন পায়ের তলা দিয়ে, সে হাসি যেন ঝ’রে ঝ’রে পড়ছে শূন্যতল থেকে, সে হাসির ধাক্কায় যেন চঞ্চল হয়ে উঠল বনব্যাপী আলোর লেখা, কালোর রেখা!

 বিমল, কুমার ও জয়ন্ত বিভ্রান্তের মত চতুর্দ্দিকে ঘুরে-ফিরে তাকাতে লাগল, কিন্তু কোনদিকেই দেখা গেল না জনপ্রাণীকে।

 জয়ন্ত বললে, “কারা হাসে? কোথা থেকে হাসে? কেন হাসে?”

 কুমার ও বিমল কখনো পাগলের মত এ-গাছের ও-গাছের দিকে ছুটে যায়—কখনো ডাইনের কখনো বাঁয়ের ঝোপঝাপের উপরে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে বারবার আঘাত করে, কিন্তু কোথাও কেউ নেই, —অথচ অট্ট-অট্ট হাসির তরঙ্গের পর তরঙ্গ আসছে প্রতি ঝোপের ​ভিতর থেকে, প্রতি গাছের আড়াল থেকে। এ অদ্ভুত হাসির জন্ম যেন সর্ব্বত্রই।

 যেমন আচম্বিতে জেগেছিল, তেমনি হঠাৎ আবার থেমে গেল হাসির হুল্লোড়! কেবল শোনা যেতে লাগল সুদূরের সঙ্গীতলহরী।

 বিমল কাণ পেতে শুনে বল্‌লে, “জয়ন্তবাবু এবারে কেবল গান নয়, আর একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?”

 জয়ন্ত বল্‌লে, “হু। বনময় ছড়ানো শুক্‌নো পাতার উপরে পড়ছে যেন তালে তালে শত শত পা! বোধ হয় মাঠের বন্ধুরা বনে ঢুকেছে, কিন্তু এবারে তারা আর নিঃশব্দে আসছে না।”

 বিমল বললে, “ছোটো কুমার, যত জোরে পারো ছোটো।”

 আবার জাগ্রত হ’ল বহুকণ্ঠে সেই ভীষণ অট্টহাস্য!

 কুমার বলে, “কিন্তু কোন্ দিকে ছুটব বিমল? দূরে শত্রুদের পদশব্দ, আশেপাশে শত্রুদের পাগ্‌লা হাসির ধূম! চারিদিকে অদৃশ্য শত্রু, কোন্ দিকে যাব ভাই?”

 —“সামনের দিকে— সামনের দিকে। শত্রুরা দৃশ্যমান হ’লেই বন্দুক ছুঁড়বে।”

 তিন জনে আবার উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে লাগল এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গেই ছুটতে লাগল যেন সেই বেয়াড়া হাসির আওয়াজ! এইটুকুই কেবল বোঝা গেল যে, তাদের এপাশে ওপাশে পিছনে জাগ্রত অট্টহাসি থাকলেও সামনের দিকে হাসি এখন একেবারেই নীরব। সেই অপার্থিব হাসি তাদের সুমুখের পথ রোধ করতে চায় না! যেন কারা তাদের ঐদিকেই তাড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়!

​ প্রায় বারো-তেরো মিনিট ধ’রে তারা ছুটে চল্‌ল এই ভাবেই এবং এর মধ্যে সেই হাসির স্রোত বন্ধ হ’ল না একবারও।

 তার পরেই থেমে গেল হাসি, শেষ হয়ে গেল বনের পথ এবং সামনেই দেখা গেল পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে খুব-উঁচু একটা প্রাচীর।

 কুমার হতাশ ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, “সামনের পথ বন্ধ! এখন আমরা কি করব?”

 বিমল ও জয়ন্ত উপায়হীনের মত এদিকে-ওদিকে তাকাতে লাগল।

 হঠাৎ বনের ভিতরে জাগল আবার শত শত পায়ের আঘাতে শুরুনো পাতার আর্ত্তনাদ।

 জয়ন্ত বল্‌লে, “এবারে পায়ের শব্দ আসছে আমাদের দু-পাশ আর পিছন থেকে। আমাদের সুমুখে রয়েছে খাড়া দেওয়াল। আর আমাদের পালাবার উপায় নেই।”

 বিমল ম্লান হাসি হেসে বল্‌লে, “আমরা পালাচ্ছি না—রিট্রিট্‌ করছি।”

 জয়ন্তও হাসবার চেষ্টা ক’রে বল্‌লে, “বেশ, মানলুম এ-সব হচ্ছে আমাদের ট্যাক্‌টিক্যাল্‌ মুভ্‌মেণ্টস্; কিন্তু এবারে আমরা কোন্ দিকে যাত্রা করব?”

 বিমল বল্‌লে, “সামনের দিকে ভালো ক’রে চেয়ে দেখুন, আমাদের সুমুখের দেওয়ালের গায়ে রয়েছে একটা ছোট দরজা। ওর পাল্লাও বন্ধ নেই।”

 জয়ন্ত দুই পা এগিয়ে ভালো ক’রে দেখে বুঝলে, বিমলের কথা সত্য! তার পর বললে, “দেখছি, অন্ধকারে আপনার চোখ আমাদের ​চেয়ে ভালো চলে! কিন্তু ওর ভেতরে ঢুকলে কি আর আমরা বেরিয়ে আসতে পারব? বেশ বোঝা যাচ্ছে, দুই পাশের আর পিছনের অদৃশ্য শত্রুরা অট্টহাস্য আর পায়ের শব্দ ক’রে আমাদের এই দিকেই তাড়িয়ে আনতে চায়। শিকারীরা বাঘ-সিংহকে যেমন ভাবে নির্দ্দিষ্ট পথে চালনা ক’রে ফাঁদে ফেলে, শত্রুরাও সেই কৌশল অবলম্বন করেছে।”

 বিমল বল্‌লে, “ঠিক। তাদের উদ্দেশ্য আমিও বুঝতে পেরেছি। আর আমাদের ঢোকবার সুবিধা হবে ব’লে দয়া ক’রে তারা দরজার পাল্লা-দুখানাও খুলে রেখেছে! অতএব তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের এখন দরজার ফাঁকেই মাথা গলাতে হবে, কারণ পায়ের শব্দ আর দূরে নেই!”

 কুমার বল্‌লে, “দরজার ওপাশে যদি নতুন বিপদ্ থাকে?”

 —“অকুতোভয়ে সেই বিপদ্‌কে আমরা বরণ করব”- ব’লেই বিমল বন্দুক উদ্যত ক’রে সর্ব্বাগ্রে দরজার ভিতরে গিয়ে ঢুকল। তার পিছনে পিছনে গেল কুমার ও জয়ন্ত!

 ভিতরে ঢুকে তারা অবাক হয়ে দেখলে, একটা বৃক্ষহীন, তৃণহীন ছোটখাটো ময়দানের মতন জায়গা এবং তার চারিদিকেই প্রায় চারতালার সমান উঁচু প্রাচীর। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, যেন সর্ব্বহারা মরুভূমির খাঁ-খাঁ-করা ভয়াল স্তব্ধতাকে সেখানে কেউ প্রাচীর তুলে কয়েদ ক’রে রেখেছে!

 জয়ন্ত বললে, “এর মানে কি? একটা মাঠকে এমন উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে কেন?”

​ বিমল অল্পক্ষণ চুপ ক’রে থেকে বললে, “অনেকদিন আগে আমরা গিয়েছিলুম চম্পাদ্বীপে। কুমার, আজকের এই গর্জন শুনে কি সেখানকার কোন কোন জীবের কথা মনে পড়ে না?”

 কুমার বল্‌লে, “এরা কি এখানে আমাদের বন্দী করে রাখতে চায়?”

 যেন তার জিজ্ঞাসার উত্তরেই তাদের পিছনকার দরজার পাল্লা দু’খানা বন্ধ হয়ে গেল সশব্দে।

 বিমল দৌড়ে গিয়ে দরজা ধ’রে টানাটানি ক’রে বল্‌লে, “হ্যাঁ কুমার, অমৃত-দ্বীপে এসে আমাদের ভাগ্যে উঠবে বোধ হয় নিছক গরলই। এ দরজা এমন মজবুৎ যে মত্ত হস্তীও এর কিছুই করতে পারবে না! এতক্ষণ লক্ষ্য ক’রে দেখি নি, কিন্তু এ হচ্ছে পুরু লোহার দরজা; আর এই পাঁচিল হচ্ছে পাথরের। এই দরজা আর পাঁচিল ভাঙতে হ’লে কামানের দরকার!”

 অকস্মাৎ চারিদিকের নিস্তব্ধতা খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল ভয়াবহ গর্জ্জনের পর গর্জ্জনে! সে যে কি বিকট, কি বীভৎস, কি ভৈরব হুঙ্কার, ভাষায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব। পৃথিবীর মাটি, আকাশের চাঁদ-তারা, নিশীথ-রাতের বুক সে হুঙ্কার শুনে যেন কেঁপে কেঁপে কেঁপে উঠল! যেন বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধায় ছট্‌ফট্‌ করতে করতে বহু দিনের উপবাসী কোন অতিকায় দানব হিংস্র, বিষাক্ত চীৎকারের পর চীৎকার ক’রে হঠাৎ আবার স্তব্ধ হয়ে পড়ল!

 বিমল, কুমার ও জয়ন্ত খানিকক্ষণ স্তম্ভিত ও বোবার মতন দাঁড়িয়ে রইল ​ সর্ব্বপ্রথমে কথা কইলে জয়ন্ত; কম্পিতস্বরে সে বল্‌লে, “এ কোন্ জীবের গর্জ্জন বিমলবাবু? চল্লিশ-পঞ্চাশটা সিংহও যে একসঙ্গে এত জোরে গর্জ্জন করতে পারে না! এ-রকম ভয়ানক গর্জ্জন করবার শক্তি কি পৃথিবীর কোন জীবের আছে?”

 কুমার বল্‌লে, “মনে মনে আমিও সেই কথাই ভাবছিলুম!”

 বিমল বল্‌লে, “কিন্তু আন্দাজ করতে পারছ কি এ-জীবটা কোত্থেকে গর্জ্জন করছে? মনে হচ্ছে যেন সে আছে আমাদের খুব কাছেই। তাথচ এই পাঁচিল ঘেরা জায়গাটার মধ্যে চাঁদের আলোয় কোন জীবের ছায়া পর্য্যন্ত দেখা যাচ্ছে না!”

 জয়ন্ত বল্‌লে, “কিন্তু পূর্ব্বদিকে খানিক দূরে তাকিয়ে দেখুন। ওখানে চাঁদের আলোয় জলের মতন কি চক্‌চক্‌ করছে না?”

 বিমল খানিকক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থেকে বল্‌লে, “হ্যাঁ জয়ন্ত বাবু, ওখানে একটা জলাশয়ের মতন কিছু আছে ব’লেই মনে হচ্ছে!”

 কুমার বললে, “একটু এগিয়ে দেখব নাকি?”

 বিমল খপ্‌ ক’রে কুমারের হাত চেপে ধরে বল্‌লে, “খবর্দ্দার কুমার, ওদিকে যাবার নামও কোরো না।”

 —“কেন বিমল, ওদিকে তো কেউ নেই?”

 —“হ্যাঁ, চোখে কারুকে দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু আগে এখানকার ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝে দেখ। প্রথমে ধর, রীতিমত মাঠের মতন এমন একটা জায়গা অকারণে কেউ এত-উঁচু পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখে না। এখানটা ঘিরে রাখবার কারণ কি? দ্বিতীয়ত, পাঁচিলের ঐ দরজা পুরু লোহা দিয়ে তৈরি কেন? এই ফর্দ্দা ​জায়গায় এমন কি বিভীষিকা আছে যাকে এখানে ধ’রে রাখবার জন্যে অমন মজবুৎ দরজার দরকার হয়? তৃতীয়ত, পাঁচিল-ঘেরা এতখানি জায়গার ভিতরে দ্রষ্টব্য আর কিছুই নেই—না গাছপালা, না ঘর-বাড়ী, না জীবনের চিহ্ন! আছে কেবল একটা জলাশয়! কেন ওখানে জলাশয় খোঁড়া হয়েছে, ওর ভিতরে কি আছে? আমাদের খুব কাছে এখনি যে দানব-জানোয়ারটা বিষম গর্জ্জন করলে, কে বলতে পারে সে ঐ জলাশয়ে বাস করে কিনা? হয়তো সে উভচর—জলে-স্থলে তার অবাধ গতি! ওদিকে যাওয়া নিরাপদ নয় কুমার, ওদিকে যাওয়া নিরাপদ নয়।”

 জয়ন্ত শিউরে উঠে বল্‌লে, “তবে কি ঐ দানবের খোরাক হবার জন্যেই আমাদের তাড়িয়ে এইখানে নিয়ে আসা হয়েছে?”

 —“আমার তো তাই বিশ্বাস।”

 কুমার বল্‌লে, “ঐ বিভীষিকা যদি স্থলচর হয়, তা হ’লে আমরা তো এখানে থেকেও বাঁচতে পারব না! সে তো আমাদের দেখতে পেলেই আক্রমণ করবে! তখন কি হবে?”

 —“তখন ভরসা আমাদের এই তিনটে ‘অটোমেটিক’ বন্দুক! কিন্তু এই বন্দুক তিনটে যে নিশ্চয়ই আমাদের প্রাণ রক্ষা করতে পারবে এ কথা জোর ক’রে বলা যায় না! চম্পাদ্বীপে আমরা এমন সব জীবও স্বচক্ষে দেখেছি যাদের কাছে বন্দুকও হচ্ছে তুচ্ছ অস্ত্র।”

 জয়ন্ত কিছু না ব’লে প্রাচীরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার পর প্রাচীরের গায়ে হাত বুলিয়ে বল্‌লে, “দেখছি পাঁচিলের গা তেলা নয়, রীতিমত এব্‌ড়ো-খেব্‌ড়ো। ভালো লক্ষণ।”

​ বিমল বল্‌লে, “পাঁচিলের গা অসমতল হ’লে আমাদের কি সুবিধা হবে জয়ন্তবাবু?”

 জয়ন্ত সে-কথার জবাব না দিয়ে বল্‌লে, “বিমলবাবু, যদি একগাছা হাত-চল্লিশ-পঞ্চাশ লম্বা দড়ী পেতুম, তা হ’লে আমাদের আর কোনই ভাবনা ছিল না।”

 বিমল বিস্মিত স্বরে বললে, “দড়ী? দড়ী নিয়ে কি করবেন? দড়ী তো আমার কাছেই আছে! জয়ন্তবাবু, আমি আর কুমার হচ্ছি পয়লা নম্বরের ভবঘুরে, পথে পা বাড়ালেই সব-কিছুর জন্যেই প্রস্তুত হয়ে থাকি। আমাদের দু’জনের পাশে ঝুলছে এই যে দুটো ব্যাগ, এর মধ্যে আছে দস্তুরমত সংসারের এক-একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। আমার ব্যাগে আছে ষাট হাত ম্যানিলা দড়ী। জানেন তো, দেখতে সরু হলেও ম্যানিলা দড়ী দিয়ে সিংহকেও বেঁধে রাখা যায়?”

 জয়ন্ত বল্‌লে, উত্তম। আর চাই একটা হাতুড়ি আর একগাছা হুক।”

 —“ও দু’টি জিনিষ আছে কুমারের ব্যাগে।”

 —“চমৎকার! তা হ’লে আমার সঙ্গে আসুন। আমি চাই চার পাঁচিলের একটা কোণ বেছে নিতে, যেখানে গেলে হাত বাড়িয়ে পাব দু-দিকের দেওয়াল।”

 জয়ন্ত পায়ে পায়ে এগুলো। কিছুই বুঝতে না পেরে বিমল ও কুমারও চল্‌ল তার পিছনে পিছনে।

 প্রাচীরের পূর্ব্ব-উত্তর কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে জয়ন্ত বল্‌লে, “এইবারে দড়ী আর হুক্ আর হাতুড়ি নিয়ে আমি উঠব পাঁচিলের ওপরে। তার ​পর টঙে গিয়ে দু-খানা পাথরের জোড়ের মুখে হুক্ বসিয়ে তার সঙ্গে দড়ী বেঁধে নীচে ঝুলিয়ে দেব। তার পর আপনারা দু’জনেও একে একে দড়ী ধ’রে ওপরে গিয়ে উঠবেন। তার পর সেই দড়ী বে’য়েই পাঁচিলের ওপারে পৃথিবীর মাটিতে অবতীর্ণ হ’তে বেশীক্ষণ লাগবে না।”

 বিমল খিল্‌-খিল্‌ ক’রে হেসে উঠে বল্‌লে, “বাঃ, সবই তো জলের মতন বেশ বোঝা গেল! কিন্তু জয়ন্তবাবু, প্রথমেই বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? অর্থাৎ পাঁচিলের টঙে গিয়ে চড়বে কে? আপনি, না আমি, না কুমার? দুঃখের বিষয় আমরা কেউই টিক্‌টিকির মূর্ত্তি ধারণ করতে পারি না!”

 জয়ন্ত বল্‌লে, “বিমলবাবু, আমি ঠাট্টা বা আকাশ-কুসুম চয়ন করছি না। কিছুকাল আগে “নিউইয়র্ক টাইম্‌সে” আমি কারাগার থেকে পলায়নের এক আশ্চর্য্য খবর প’ড়েছিলুম। কাল্পনিক নয়, সম্পূর্ণ সত্য-কাহিনী। ‘আমেরিকার এক নামজাদা খুনে ডাকাতকে সেখানকার সব-চেয়ে সুরক্ষিত জেলখানায় বন্দী ক’রে রাখা হয়। সে জেল ভেঙে কোন বন্দী কখনো পালাতে পারে নি, তার চারিদিকে ছিল অত্যন্ত উঁচু পাঁচিল। কিন্তু ঐ ডাকাটা এক অদ্ভুত উপায়ে সেই পাঁচিলও পার হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। উপায়টা যে কি, মুখে বলে আপনারা তা অসম্ভব বলে মনে করবেন— আর খবরটা প্রথমে প’ড়ে আমিও অসম্ভব ব’লেই ভেবেছিলুম। কিন্তু কিছুদিন ধরে অভ্যাস করবার পর আমিও দেখলুম, উপায়টা দুঃসাধ্য হ’লেও অসাধ্য নয়। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে এ উপায়টা চিরদিনই অসম্ভব হয়ে থাকবে ​বটে, কারণ এ উপায় যে অবলম্বন করবে তার তার পক্ষে দরকার কেবল হাত-পায়ের কৌশল নয়—আসাধারণ দেহের শক্তিও।”

 বিমল কৌতূহলে প্রদীপ্ত হয়ে বল্‌লে, “জয়ন্তবাবু, শীগ্‌গির বলুন, সে উপায়টা কি?”

 জয়ন্ত বল্‌লে, “উপায়টা এমন ধারণাতীত যে মুখে বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না। তার চেয়ে এই দেখুন, আপনাদের চোখের সুমুখে আমি নিজেই সেই উপায়টা অবলম্বন করছি”— ব’লেই সে দুই দিকের প্রাচীর যেখানে মিলেছে সেই কোণে গিয়ে দাঁড়াল।

 তার পর বিমল ও কুমার যে অবাক করা ব্যাপারটা দেখলে কোনদিনই সেটা তারা সম্ভবপর ব’লে মনে করে নি! জয়ন্ত কোণে গিয়ে দুই দিকের প্রাচীরে দুই হাত ও দুই পা রেখে কেবল হাত ও পায়ের উপরে প্রবল চাপ দিয়ে উপর-দিকে উঠে যেতে লাগল, প্রায় অনায়াসেই! বিপুল বিস্ময়ে নির্ব্বাক্ ও রুদ্ধশ্বাস হয়ে তারা বিস্ফারিত চোখে উপর-পানে তাকিয়ে রইল।

 জয়ন্ত যখন প্রাচীরের উপর পর্যন্ত পৌঁছলো, বিমল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তারিফ ক’রে বল্‌লে, “সাধু জয়ন্তবাবু, সাধু! আপনি আজ সত্য ক’রে তুল্‌লেন ধারণাতীত স্বপ্নকে!”

 ঠিক সেই সময়েই জাগল আবার চারিদিক্ কাঁপিয়ে ও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত ক’রে কোন্ অজ্ঞাত দানবের বিভীষণ হুহুঙ্কার। সে যেন সমস্ত জীবজগতের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদ—সে যেন বিরাট বিশ্বের বিরুদ্ধে স্পর্দ্ধিত যুদ্ধ ঘোষণা!

 জয়ন্ত তখন প্রাচীরের উপরে উঠে বসে হাঁপ নিচ্ছে, কিন্তু এমন ​ভয়ানক সেই চীৎকার যে, চম্‌কে উঠে সে আর একটু হ’লেই ট’লে নীচে প’ড়ে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি দুই হাতে প্রাচীর চেপে ধ’রে সরোবরের দিকে সভয়ে তাকিয়ে দেখলে।... ... ...হ্যাঁ, বিমলের অনুমানই ঠিক। একটু আগে যারা আজগুবি হাসি হাসছিল তারা দেখা দেয় নি বটে, কিন্তু এখন যে হুঙ্কারের পর হুঙ্কার ছাড়ছে সে আর অদৃশ্য হয়ে নেই!

 চাঁদ তখন পশ্চিম আকাশে। এবং পশ্চিম দিকের উঁচু প্রাচীরের কালো ছায়া এসে প’ড়ে সরোবরের আধাআধি অংশ ক’রে তুলেছে অন্ধকারময়। এবং সেই অন্ধকারের ভিতর থেকে বেরিয়ে প’ড়ে অন্ধকারেরই একটা জীবন্ত অংশের মত কী যে সে কিম্ভুতকিমাকার বিপুল মূর্ত্তির খানিকটা আত্মপ্রকাশ ক’রেছে, দূর হ’তে স্পষ্ট ক’রে তা বোঝা গেল না। কিন্তু তার প্রকাণ্ড দেহটা সরোবরের জ্যোৎস্না-উজ্জ্বল অংশের উপরে ক্রমেই আরো প্রকাণ্ড হয়ে উঠতে লাগল!... ... ... তবে কি সে তাদের দেখতে পেয়েছে? সে কি এগিয়ে আসছে জল ছেড়ে ডাঙায় ওঠবার জন্যে?

 জয়ন্ত অত্যন্ত ব্যস্ত ভাবে প্রাচীরের পাথরের ফাঁকে হুক্ বসিয়ে ঠকাঠক্ হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল।

 নীচে থেকে বিমল অধীর স্বরে চীৎকার ক’রে বললে, “ও আমাদের দেখতে পেয়েছে—ও আমাদের দেখতে পেয়েছে! জয়ন্তবাবু, দড়ী— দড়ী!”

 কুমার ফিরে সচকিত চোখে দেখলে, প্রায় আশী ফুট লম্বা ও পঁইত্রিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু একটা বিরাট কালি-কালো দেহ মূর্ত্তিমান্ ​দুঃস্বপ্নের মত সরোবরের তীরে উঠে ব’সে সশব্দে প্রচণ্ড গা-ঝাড়া দিচ্ছে!

 উপর থেকে ঝপাং ক’রে একগাছা দড়ী নীচে এসে পড়ল।

 কুমার ত্রস্ত স্বরে বল্‌লে, “লাউৎ-জুর ভক্তরা কি একেই ড্রাগন ব’লে ডাকে?”

 বিমল দড়ী চেপে ধ’রে বল্‌লে, “চুলোয় যাক্ লাউৎ-জুর ভক্তরা! এখন নিজের প্রাণ বাঁচাও। তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গেই দড়ী ধ’রে ওপরে উঠে এস।”

 তারা একে একে প্রাচীরের ওপারে মাটির উপরে গিয়ে নেমে আড়ষ্ট ভাবে শুনলে, ওধার থেকে ঘন ঘন জাগছে মহাক্রুদ্ধ দানবের হতাশ হুহুঙ্কার! সে নিশ্চয়ই চারিদিকে মুখের গ্রাস খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেননা তার বিপুল দেহের বিষম দাপাদাপির চোটে প্রাচীরের এপাশের মাটিও কেঁপে উঠছে থরথর ক’রে।

 কুমার শ্রান্তের মতন কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বল্‌লে, “উঃ, দানবটা আর এক মিনিট আগে আমাদের দেখতে পেলে আর আমরা বাঁচতুম না!”

 বিমল গম্ভীর স্বরে বলে “এখনো আমাদের বাঁচবার সম্ভাবনা নেই কুমার! ডাইনে বাঁয়ে সামনের দিকে চেয়ে দেখ!”

​ সর্ব্বনাশ! আবার সেই অপার্থিব দৃশ্য! তারা দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তরের মতন একটা স্থানে এবং সেই প্রান্তরের যেদিকে তাকানো যায় সেই দিকেই চোখে পড়ে, কলে-চলা পুতুলের মতন দলে দলে মানুষ-মূর্ত্তি অর্দ্ধচন্দ্রাকারে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে, এগিয়ে আসছে! নীরব, নিঃশব্দ, নিষ্ঠুর সব মূর্ত্তি!

 পিছনে প্রাচীর এবং সামনে ও দুই পাশে রয়েছে এই অমানুষিক মানুষের দল। এবারে আর পালাবার কোন পথই খোলা নেই।

 জয়ন্ত অবসন্নের মত ব’সে প’ড়ে বল্‌লে, “আর কোন চেষ্টা করা বৃথা।”