অলৌকিক নয়, লৌকিক (চতুর্থ খণ্ড)/প্রথম পর্ব/অধ্যায়: এক
অধ্যায় : এক
যুক্তি কেন জাতিস্মর মানে না
নিত্য আত্মা ছাড়া জাতিস্মর হয় না
চাল ছাড়া ভাত হয় না
আটা ছাড়া রুটি
নিত্য আত্মা ছাড়া জাতিস্মর হয় না
এ’কথাটা খাঁটি।
এই ছড়াটি রামকৃষ্ণ মিশনের এক ছাত্র আমাকে পাঠিয়ে ছড়ার তলায় লিখেছিলেন, “জাতিস্মরের অস্তিত্বই প্রমাণ করে আত্মা নিত্য, শাশ্বত, অমর”।
হ্যাঁ, সত্যি! খুব প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান কথাটি লিখে পাঠিয়ে ছিলেন পত্রলেখক। জাতিস্মরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে যেমন আত্মার অমরত্ব প্রমাণিত হয়; তেমনই আত্মা অমর নয় প্রমাণিত হলেও জাতিস্মরের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়।
আত্মা সম্বন্ধে গীতায় বলা হয়েছে:
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ
নায়ং ভুত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঃয়েং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥
অর্থাৎ, ইনি (আত্মা) কখনও জন্মান না বা মরেন না, অথবা একবার জন্মগ্রহণ করে আবার জন্মাবেন না,—এমনও নয়; ইনি জন্মহীন, নিত্য, অক্ষয়, অনাদি; শরীর হত হলেও আত্মা হত হয় না।
এই অবস্থায় জাতিস্মরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়ে মাথা ঘামানোর আগে আত্মা বলতে বিভিন্ন ধর্মমত কি বলছে, আত্মাকে কি সংজ্ঞায় বাঁধা হয়েছে, আত্মার একাধিক জন্মের বিশ্বাস অর্থাৎ ‘জন্মান্তর’ প্রসঙ্গে অন্যান্য ধর্মমতগুলোই বা কি বলে, এ’গুলো জেনে নেওয়া খুবই জরুরি। জরুরি ভাবার কারণ কী? সেটা একটু তলিয়ে দেখা যাক।
ঈশ্বরে বিশ্বাস, আত্মায় বিশ্বাস : সত্যের চেয়ে অনেক দূর
ধর্মগুরু, আধ্যত্মবাদী দার্শনিক এবং ঈশ্বর-বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ যুক্তিবাদীদের বিরুদ্ধে একটা গুরুতর অভিযোগ তোলেন। অভিযোগগুলোর মূল সুর এই ধরনের:—
গরুর গাড়ির চাকা থেকে মহাকাশ বিজয়—বিজ্ঞানের প্রতিটি জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের চিন্তা—যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেচনা ও প্রয়োগ। প্রয়োগ মানেই সফলতা নয়। প্রয়োগে ব্যর্থতা আসতে পারে। আবার ব্যর্থতা মানে অনেক সময়ই সাফল্যের ধাপও; এটাও মনে রাখতে হবে।
আদিম মানুষ গতি বাড়াতে চাকা বানিয়েছে। এই চাকা বানাবার আগে একটি কল্পিত বিশ্বাস নিয়ে চিন্তার জগতে কাজ শুরু করেছিল। একটা কাঠামোর সঙ্গে দুটো বা চারটে চাকা জুড়ে দিলে কেমন হয়? একটা গৃহপালিত পশু তার পিঠে বোঝা চাপালে যতটা বোঝা বইতে পারে, চাকা লাগানো কাঠামোটা পশুর পিঠে জুতে দিলে তার চেয়ে অনেক বেশি বইবে। এই চাকার গড়নটা যে গোল করলে সুবিধে হবে, সেই ভাবনাটা, বিশ্বাসটা আগে চিন্তায় এসেছে, তার পর প্রয়োগে। চাকা থেকে মারণ রোগের ওষুধ, মহাকাশ গবেষণা—প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আগে গবেষকদের মাথায় চিন্তা এসেছে, একটা কল্পিত বিশ্বাস এসেছে। তারপর তার প্রয়োগ এসেছে। অর্থাৎ বিজ্ঞানের কল্পিত পরীক্ষার শুরু হয় কোনও বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই।
যুক্তিবাদীরা বিজ্ঞানের এই বিশ্বাস নির্ভরতাকে দোষণীয় মনে করেন না; আর আমাদের ঈশ্বর বিশ্বাসের বেলায় যত দোষ! এ’হল যুক্তিবাদীদের কোনও পরীক্ষা না চালিয়েই বলে দেওয়া—ঈশ্বর নেই। এও তো তাঁদের বিশ্বাসের কথা।
প্রকল্প (Hypothesis)
বিজ্ঞানের ‘বিশ্বাস’ ব্যাপারটা একেবারেই অন্যরকম। বিজ্ঞানের জগতে এই ধরনের বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে কোনও কাজই হয় না। ‘বিজ্ঞান’ বলতে ‘পরীক্ষা’ পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্ত’ নামের যে অতি সরলীকৃত একটি সংজ্ঞা চালু আছে, সেটাও পুরোপুরি ঠিক নয়। বিজ্ঞানে তত্ত্ব আছে, অঙ্ক আছে, আবার পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণও আছে। বিজ্ঞানের পরীক্ষা বলতে শুধুমাত্র গবেষণাগারে যন্ত্রপাতির সাহায্যে পরীক্ষা বোঝায় না। বিজ্ঞানের পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে একটি কল্পিত প্রস্তাবনা বা যে প্রস্তাবনা যাচাই শেষে একটা বিশেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছবার সম্ভাবনা থাকে। এই প্রস্তাবনায় পৌঁছতে অঙ্কের সাহায্য নিয়ে পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি রয়েছে যে বিষয় নিয়ে গবেষণা হবে, সেই বিষয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত যে-সব গবেষণা ইতিপূর্বে হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলো জানা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের সঙ্গে সেগুলোর সঙ্গতির পরীক্ষা। প্রস্তাবনার সঙ্গতি পরীক্ষা। প্রয়োজনমতো কল্পিত প্রস্তাবনার পরিবর্তন করা। এরপর আসে কল্পিত প্রস্তাবনা বা তত্ত্বটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করে ফলাফলের পরীক্ষা।
খুব সংক্ষেপে ‘পরীক্ষা’ শব্দটিকে আমরা ব্যবহার করেছি। বাস্তবে অসংখ্য পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানে তত্ত্বকে যাচাই করা হয়, তারপর আসে সিদ্ধান্তে পৌঁছবার প্রশ্ন। এভাবে যাচাই করার আগে বিশ্ব বিখ্যাত বিভিন্ন গৃহীত তত্ত্বও ছিল প্রস্তাবনা মাত্র।
বিজ্ঞানের কল্পিত প্রস্তাবনার সঙ্গে জড়িত বিশ্বাসগুলো এসেছে পূর্বসূরী বিজ্ঞানীদের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ও নানা গবেষণা থেকে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে সত্যের একটা সম্পর্ক থাকে।
ঈশ্বরকে নিয়ে বা পক্ষিরাজ ঘোড়ার অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞান কেন গবেষণার প্রথম পর্যায়—কল্পিত পরীক্ষায় যাবে না, তার পিছনে অবশ্যই জোরালো কারণ আছে। ঈশ্বর বা পক্ষিরাজ ঘোড়ার অস্তিত্ব শুধু বইয়ের লেখা আর আঁকা ছবিতে পাওয়া গেছে। তেমন লেখা ও ছবি তো হাঁসজারু, বকচ্ছপ থেকে রাক্ষস অনেক বইতেই পাওয়া যায়। কল্পনার ওপর ভিত্তি করে আর যাই হোক বিজ্ঞানের কল্পিত প্রস্তাবনায় নামতে পারে না। কারণ, বিজ্ঞানেরই একটি শাখা মনোবিজ্ঞানের কাছে ঈশ্বর-দর্শনের কার্য-কারণ সম্পর্ক খুবই স্পষ্ট। মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের অস্বাভাবিকতা থেকেই মানুষ অলীক দেখে। অলীক দর্শনে ঈশ্বর এলে মানুষটি পুজো পায়, আর অভিনেত্রী করিশমা এলে পাগল বলে গাল খায়।
যদি কোনও ঐশ্বরিক ক্ষমতার দাবিদার প্রকাশ্যে, নিরপক্ষেভাবে তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রমাণ বিভিন্ন বিজ্ঞান সংস্থার কাছে হাজির করতে পারতেন, শুধু তবেই বিজ্ঞানীদের ঈশ্বর নিয়ে কল্পিত পরীক্ষায় নামার প্রশ্ন আসত।
ঈশ্বর নিয়ে বিজ্ঞানের কল্পিত পরীক্ষায় যাওয়ার বড় বাধা হল বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো। মুসলিমরা যদি বলেন, ঈশ্বর নিরাকার; তো হিন্দুরা কয়েক হাজার দেব-দেবীর মূর্তি পুজো করে বুঝিয়ে দেন ঈশ্বরের আকার আছে। আবার জৈনরা মনে করেন, মানুষ জৈন ধর্মের নিয়ম-নীতি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে দেবতা হতে পারেন।
এ তো যত ধর্ম মত, তত বিভাজন। ঈশ্বর নিয়ে উপাসনা-ধর্মগুলোর মধ্যেকার বিরোধিতা আমাদের কাছে তাদের বিশ্বাসের বিভেদ স্পষ্ট করে দেয়। ধর্মমতগুলো নিজেদের মধ্যে বসে ‘ঈশ্বর’-এর একটা সর্বধর্মমত-গ্রাহ্য সংজ্ঞা তৈরি করার প্রাথমিক কাজটুকু আগে শেষ করে ফেলুক।
তারপর ধর্মগুরুরা নামবেন পরবর্তী বাধাগুলো অতিক্রম করতে। খুঁজে হাজির করবেন এমন ধর্মগুরু, যিনি প্রতারণার আশ্রয় না নিয়ে ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখাবেন। তখন বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ ঈশ্বর নিয়ে কল্পিত পরীক্ষায় নামার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারেন।
এ’সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিয়ে বোকা বোকা চেঁচাবেন না যে—যুক্তিবাদীরা কোনও পরীক্ষা না চালিয়েই বলে ঈশ্বর নেই।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্পষ্ট হয়েছে যে ‘ঈশ্বরে বিশ্বাস’, ‘আত্মার অমরত্বে বিশ্বাস’ এর পার্থক্য কোথায়।
এখন প্রিয় পাঠকরা নিশ্চয় মানবেন,
আত্মার অবিনশ্বরতার সপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ না পাওয়া গেলেও
জাতিস্মর নিয়ে গবেষণা চালানো, আর ‘কাকে কান
নিয়ে গেল’ শুনেই কানে হাত না দিয়ে কাকের
পিছনে ছোটা একই ব্যাপার।
এবার আসুন, আমরা দেখি আত্মার অমরত্বের সপক্ষে কী কী যুক্তি আছে।