বিষয়বস্তুতে চলুন

অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত (প্রথম খণ্ড)/প্রথম সর্গ

উইকিসংকলন থেকে

প্রথম সর্গ

 পরম সম্পদ দান করিয়া যিনি বিধাতাকে জয় করিয়াছেন, তম নিরসিত করিয়া যিনি ভানুকে অভিভূত করিয়াছেন, উত্তাপ অপনোদন করিয়া যিনি চারু চন্দ্রমাকে পরাজিত করিয়াছেন, সেই অনুপম অর্থকে এইস্থানে বন্দনা করিতেছি॥১॥

 মহর্ষি কপিলের আবাসস্থলী কপিলাবস্তু নগরী, মেঘমালার সন্যায় বিশালোন্নত অধিত্যকা-শোভার দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং অভ্রভেদী উচ্চ প্রাসাদসমূহে পূর্ণ ছিল॥২॥

 সেই নগরী নিজ শুভ্রতা এবং উচ্চতার দ্বারা, কৈলাস শৈলের শ্রেষ্ঠ শোভা হরণ করিয়াছিল। এবং ভ্রম-সমাগত মেঘবৃন্দকে বহন করিয়া, বুঝি বা সেই কৈলাস-সম্ভাবনাকে সফলও করিয়াছিল॥৩॥[]

 রত্ন-প্রভোদ্ভাসিনী সেই নগরীতে অন্ধকারের ন্যায় দারিদ্র্যও অবকাশ পাইত না। পরমগুণবান অধিবাসীদিগের সহিত সহবাসবশত সন্তুষ্ট হইয়া লক্ষ্মী সেখানে যেন সহাস্যবদনে বিরাজ করিতেন॥৪॥

 সেই নগরী, প্রতিগৃহে রত্নবিমণ্ডিত বেদিকা, তোরণ ও সিংহকর্ণ দ্বারা শোভিত হইয়া, জগতে আত্মসদৃশ অপর কোনো পুরী দেখিতে না পাইয়াই যেন নিজ গৃহসমূহের মধ্যেই পরস্পরের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিত॥৫॥

 অস্তগমনকালেও কামিনীগণের কমললাঞ্ছন মুখচন্দ্রমাকে অবমাননা (ম্লান) করিতে অক্ষম হইয়া, যেন সন্তাপহেতুুই, সূর্য অবশেষে জলে আত্মবিসর্জনের জন্য সমুদ্র অভিমুখে প্রস্থান করিতেন॥৬॥

 শাক্যদিগের অর্জিত যশের সহিত লোকে চন্দ্রমার উপমা দেয়, এই ভাবিয়া সেই নগরী চঞ্চল সুন্দর পতাকাযুক্ত ধ্বজদণ্ডের দ্বারা চন্দ্রের চিহ্ন পর্যন্ত যেন মার্জন করিয়া ফেলিতে উদ্যত হইত॥৭॥

 সেই নগরী, নিজ রজতালয়ে নিপতিত চন্দ্রকর দ্বারা রাত্রিকালে কুমুদকে প্রফুল্ল করিয়াও, দিবাভাগে নিজ সুবর্ণহর্মগত সূর্যকরঞ্জালে, সরোজের শোভা বিস্তার করিত॥৮॥[]

 মহীপালগণের শীর্ষস্থলাভিষিক্ত সূর্যবংশীয় শুদ্ধোদন নামে উদার নরপতি, সেই সর্বোত্তম নগরীকে বিকশিত পদ্মের ন্যায় অলংকৃত করিয়াছিলেন॥৯॥

 তিনি রাজগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হইয়াও সৈন্য রাখিতেন। সতত দানশীল হইয়াও অহংকারী ছিলেন না। অধীশ্বর হইয়াও সর্বদা সমদৃষ্টিসম্পন্ন এবং সৌম্যস্বভাব হইলেও মহাশক্তিশালী ছিলেন ॥১০॥[]

 তাঁহার বাহুদ্বারা অভিহত হইয়া, সমরাঙ্গনে পতিত শত্রুপক্ষীয় গজরাজগণের মস্তক হইতে বহুল পরিমাণ মুক্তা স্খলিত হওয়ায় মনে হইত, যেন ঐ গজসমূহ পুষ্পাঞ্জলির দ্বারা তাঁহাকে ভক্তিভরে প্রণাম করিতেছে ॥১১॥

 উগ্রতেজা ভানু যেমন প্রবল অন্ধকারকে পরাভূত করে, অতি প্রতাপবশত শত্রুগণকে সেইরূপ বিক্ষিপ্ত করিয়া, তিনি জনগণকে তাহাদের আশ্রয়ণীয় মার্গ প্রদর্শনপূর্বক চতুর্দিক উদ্ভাসিত করিয়াছিলেন॥১২॥

 তাঁহার পরিচালনায় ধর্ম অর্থ ও কাম, পরস্পরের (বিস্তৃত) বিষয় আক্রমণ করিত না। তাহারা সত্বর সিদ্ধিলাভের জন্য, পরস্পরের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতাবশতই যেন নিজ নিজ অধিকারে উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিয়াছিল॥১৩॥

 অসংখ্য বিদ্বান সচিবসংঘের দ্বারা শ্রেষ্ঠতাপ্রাপ্ত, মহাপ্রভাবান্বিত সেই শাক্যেন্দ্ররাজ, সমান প্রভাবিশিষ্ট তারকার দ্বারা শশীর ন্যায়, অধিকতর শোভিত হ‍ইতেন॥১৪॥

 পরমশোভা হইতে নির্গত পরমশোভার ন্যায়, তমঃপ্রভাব হইতে মুক্ত রবিপ্রভার ন্যায়, মহিষীগণের মধ্যে অগ্রমহিষী, মায়া হইতে বিমুক্তা, মায়া নাম্নী তাঁহার এক রাজ্ঞী ছিলেন॥১৫॥

 যিনি মাতার ন্যায় প্রজাগণের মঙ্গলে প্রবৃত্তা, মূর্তিমতী ভক্তির ন্যায় গুরুজনের অনুগতা এবং রাজকুলে লক্ষ্মীর ন্যায় প্রভা বিস্তার করিয়া, জগতের দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইয়াছিলেন ॥১৬॥

 সত্যই স্ত্রীচরিত্র সর্বদা তমসাচ্ছন্ন। তথাপি তাঁহাকে প্রাপ্ত. হইয়া, তাহা (স্ত্রীচরিত্র) অতিশয় উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল। শুভ্র ইন্দুলেখার সহিত যুক্ত হইলে, রাত্রির অন্ধকার কি আর তেমন থাকে॥১৭॥

 “আমি অতীন্দ্রিয় হইয়া থাকিলে এই অবিশ্বাসী জনসমূহ আমার সহিত মিলিত হইতে পারিবে না” এই ভাবিয়া ধর্ম যেন তাঁহার সূক্ষ্ম প্রকৃতি পরিত্যাগ করিয়া (মায়াদেবীরূপে) দেহ ধারণ করিয়াছিলেন॥১৮॥

 অনন্তর তুষিত স্বর্গ হইতে চ্যুত হইয়া, ত্রিলোক উদ্ভাসিত করিতে করিতে, বোধিসত্ত্বোত্তম (সিদ্ধার্থ), স্মরণ করিবামাত্র (তৎক্ষণাৎ) নন্দাগুহামধ্যে নাগরাজের হ্যায়, তাঁহার কুক্ষিমধ্যে প্রবেশ করিলেন॥১৯॥

 হিমাদ্রির ন্যায় ধবল বৃহৎ ষড়-বিষাণযুক্ত, মদবাসিতানন দ্বিরদের রূপ ধারণ করিয়া, তিনি বহুধাধিপতি শুদ্ধোদনমহিষীর কুক্ষিমধ্যে, জগতের দুঃখদুরীকরণের জন্য, প্রবেশ করিয়াছিলেন॥২০॥

 স্বর্গ হইতে লোকপালগণ লোকৈকনাথের রক্ষার জন্য অভিগমন করিলেন। চন্দ্রকিরণ সর্বত্র সমভাবে প্রতিভাত হইলেও কৈলাসগিরিতেই বিশেষভাবে দীপ্তি পায়॥২১॥[]

 জলদাবলী যেমন বিদ্যুৎ-বিলাসকে ধারণ করে, সেইরূপ মায়াদেবীও তাঁহাকে কুক্ষিতে ধারণ করিয়া, দানাভিবর্ষণের দ্বারা চতুর্দিকের জনগণের দারিদ্র্যতাপ প্রশমিত করিয়াছিলেন॥২২॥

 একদা রাজার অনুমতিক্রমে অন্তঃপুরজনের সহিত সেই দেবী উত্তমদোহদা হইয়া লুম্বিনীনামক উপবনে গমন করিলেন॥২৩॥

 দেবী যখন এক পুষ্পভারাবনত শাখা অবলম্বন করিয়া দণ্ডায়মান ছিলেন, তখন বোধিসত্ত্ব তাঁহার কুক্ষিভেদ করিয়া অবিলম্বে বিনির্গত হইলেন॥২৪॥

 সেই সময় পুষ্য নক্ষত্র প্রসন্ন হইল। ব্রতসংস্কৃতা দেবীর পার্শ্বদেশ হইতে, বিনা বেদনায়, নিরাময়ে, এক পুত্র, লোকহিতের জন্য জন্মগ্রহণ করিলেন॥২৫॥

 প্রাতে, পয়োদ হইতে উজ্জ্বল সূর্যের ন্যায়, মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রমণপূর্বক, তেজের দ্বারা তম নিরসিত করিয়া, তিনি জগৎকে স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল করিলেন॥২৬॥

 তাঁহার জন্ম হইবামাত্র সহস্রলোচন ইন্দ্র প্রীত হইয়া, কাঞ্চন যুগের ন্যায় গৌরবর্ণ সেই বোধিসত্ত্বকে অতিযত্নে গ্রহণ করিলেন; আকাশ হইতে তাঁহার (বোধিসত্ত্বের) মস্তকোপরি মন্দারপুষ্পসহ দুইটি নির্মল বারিধারা নিপতিত হইতে লাগিল॥২৭॥

 চতুর্দিক হইতে শ্রেষ্ঠ সুরগণ কর্তৃক ধৃত হইয়া, সেই সুরগণকে নিজ দেহরশ্মির দ্বারা অনুরঞ্জিত করিয়া, সন্ধ্যাকালীন মেঘজালোপরি সন্নিবিষ্ট নবেন্দুকে তিনি সৌন্দর্যে পরাজিত করিলেন॥২৮॥

 যেরূপ ঊরু হইতে ঔর্বের, হস্ত হইতে পৃথুর, মূর্ধা হইতে ইন্দ্রপ্রতিম মান্ধাতার এবং ভুজাংসদেশ হইতে কক্ষীবতের জন্ম হইয়াছিল, তাঁহার জন্মও সেইরূপ অলৌকিকভাবেই হইল॥২৯॥

 ধীরে ধীরে গর্ভ হইতে অভিনিঃসৃত, অলৌকিকজন্মা সেই পুরুষ, যেন স্বর্গ হইতে আগমন করিলেন। যুগযুগান্তরের ধ্যানের দ্বারা পরিপুর্ণহৃদয় সেই বোধিসত্ত্ব, মুঢ়ভাবে নহে, সজ্ঞানে জন্মগ্রহণ করিলেন॥৩০॥

 দীপ্তি ধৈর্য ও কান্তির দ্বারা, সেই বালক ভূমিতে অবতীর্ণ রবির ন্যায় বিরাজ করিতে লাগিলেন। তাদৃশ দিনমণি-সদৃশ অতিশয় উজ্জ্বল হইলেও (অক্লেশে) দর্শনীয় হইয়া, সকলের চক্ষুকে তিনি শশাঙ্কের ন্যায় হরণ করিলেন॥৩১॥

 ভাস্করের ন্যায় নিজদেহের জ্বলন্ত প্রভার দ্বারা, তিনি দীপপ্রভাকে হরণ করিলেন। মহার্হ কাঞ্চনসম চারুবর্ণ সেই বোধিসত্ত্ব বালক, সর্বদিক আলোকিত করিয়া তুলিলেন॥৩২॥

 অনাকুল, আয়ত, ধীর, গুরুগম্ভীর চরণবিক্ষেপের দ্বারা কমল প্রস্ফুটিত করিয়া, তিনি সপ্তর্ষি-নক্ষত্র-সদৃশ সপ্তপদ গমন করিলেন॥৩৩॥

 সিংহগতি সেই বোধিসত্ত্ব, চতুর্দিক নিরীক্ষণপূর্বক “আমি বোধির জন্য ও জগতের হিতকামনায় জন্মগ্রহণ করিয়াছি, ইহাই আমার শেষ উৎপত্তি” এই ভবিষ্যদ্ বাণী উচ্চারণ করিলেন॥৩৪॥

 চন্দ্রকিরণের ন্যায় শুভ্র শীতোষ্ণ গগনপ্রস্তুত দুইটি বারিধারা সেই অনুত্তরের সৌম্য মস্তকোপরি, তাঁহার শরীরমুখার্থে নিপতিত হইল॥৩৫॥

 শোভনীয় বিতানবিশিষ্ট, কনকোজ্জ্বল এবং বৈদুর্যপাদযুক্ত শয্যায় শয়ন করিয়া, নিজ গৌরববশত, কাঞ্চনপদ্মহস্ত যক্ষরাজগণের দ্বারা তিনি পরিবৃত হইলেন॥৩৬॥

 সেই মায়াতনুজের প্রভাবে দেবগণ নতশির হইয়া আকাশে শুভ্র আতপত্র ধারণ করিলেন। এবং তাহার বোধির জন্য পরম আশীর্বচন জপ করিতে লাগিলেন॥৩৭॥

 অতীত বুদ্ধগণকে যাঁহারা সেবা করিয়াছিলেন, সেই ভক্তিপুর্ণনয়ন মহোরগগণ সদ্ধর্মপিপাসায় তাঁহাকে ব্যজন করিতে ও মন্দারপুষ্পরাজি বর্ষণ করিতে লাগিলেন ॥৩৮॥

 তথাগতের উৎপত্তিহেতু তুষ্ট, বিশুদ্ধপ্রকৃতি শুদ্ধাধিবাস[] দেবগণ, অনুরাগশূন্য হইয়াও, দুঃখনিমগ্ন জগতের মঙ্গলের আশায় আনন্দিত হইলেন ॥৩৯॥

 তিনি প্রসূত হইলে, হিমালয়রূপ শঙ্কুযুক্তা ধরণী, বাতাহত নৌকার ন্যায় চঞ্চল হইল এবং অভ্রশূন্য গগনমণ্ডল হইতে উৎপল ও পদ্মের সহিত সচন্দনা বৃষ্টি পতিত হইল॥৪০॥

 মনোজ্ঞ স্পর্শসুখকর সমীরণ, দিব্যবসন সমূহ বর্ষণ করিয়া প্রবাহিত হইল, সেই একই সূর্য: অধিকতর প্রকাশ পাইল এবং অগ্নি অপরের চেষ্টা ব্যতিরেকে স্বতই মনোজ্ঞ সৌম্য শিখা ধারণ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল॥৪১॥

 তাঁহার নিবাসস্থলের পূর্বোত্তর প্রদেশে শুভ্রবারিবিশিষ্ট একটি কূপ স্বতই প্রাদুর্ভূত হইল। অন্তঃপুরিকাগণ বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া, তীর্থের ন্যায় সেই স্থানে, মাঙ্গলিক ক্রিয়ার অনুষ্ঠান করিলেন॥৪২॥

 তাঁহার দর্শন প্রত্যাশায় আগত, ধর্মার্থিজনে ও দিব্যসত্ত্বগণে সেই উপবন পূর্ণ হইল। পাদপগণ যেন কৌতূহলে পূর্ণ হইয়া সুগন্ধি পুষ্পের দ্বারা তাঁহার পূজা করিল॥৪৩॥

 সমীরণবাহিত সুগন্ধে দিক পূর্ণ করিয়া, পুষ্পভ্রমসমূহ কুসুমে ফুল্লরিত হইয়া উঠিল। সেই পুষ্পরাজি উদ্ভান্ত ভূঙ্গবধূদের দ্বারা গুঞ্জরিত এবং ভুজঙ্গবৃন্দ কর্তৃক যেন ছত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত হইল॥৪৪॥

 কোনো কোনো স্থানে (পথের) উভয় পার্শ্বে, চঞ্চলকুণ্ডলভূষিতা নারীগণের শব্দায়মান তূর্য ও মৃদঙ্গানুগত সংগীতে, এবং বীণা মুকুন্দ ও মুরজাদি বাদ্যে, সেই নগর মনোরম হইয়া উঠিল॥৪৫॥

 *[] রাজা শুদ্ধোদন পুত্রের এই অলৌকিক জন্ম দেখিয়া, স্বভাবত ধীরগম্ভীর প্রকৃতি হইলেও অতিশয় ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। তাঁহার স্নেহপ্রবণ হৃদয় দ্রবীভূত হইল। চক্ষু হইতে আনন্দে ও আশঙ্কায় অশ্রুধারা নিপতিত হইল।

 প্রথিতযশা শুদ্ধচরিত বিদ্বান ব্রাহ্মণগণ, কুমারের এই অলৌকিক জন্ম ও অস্বাভাবিক ঘটনাবলীর বিষয় শ্রবণ করিয়া, হর্ষ-বিষাদাচ্ছন্ন রাজা শুদ্ধোদনের নিকট আগমন করিলেন। তাঁহারা আনন্দোৎফুল্ল বদনে রাজাকে উৎসাহিত করিয়া বলিতে লাগিলেন:

 "মহারাজ! আনন্দিত হউন। আজ মহা উৎসবের দিন। হৃদয়ে কোনো উদ্‌বেগ, কোনো আশঙ্কা স্থান দিবেন না। আজ যিনি আপনার পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, জগতের সমস্ত দুঃখ-সন্তপ্ত জনগণের তিনিই হইবেন উদ্ধারকর্তা, পথপ্রদর্শক, অধিনেতা।

 “এই উজ্জ্বলকাঞ্চনবর্ণ অনুত্তর শিশুর যে লক্ষণসমূহ দর্শন করিতেছি— তাহাতে নিঃসন্দেহে বলা যায়, হয় ইনি মহামুনি হইয়া পরমসিদ্ধি লাভ করিবেন, নতুবা সমস্ত জগতের চক্রবর্তী সম্রাট হইবেন।

 “যদি ইনি পার্থিব সম্পদ ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে ইনি ইঁহার অলৌকিক শক্তির দ্বারা, সৌরজগতে সূর্যের ম্যায়, পৃথিবীর সমস্ত রাজগণের মুকুটমণি হইবেন।

 “অথবা যদি ইনি নিঃশ্রেয়স পরমগতি আকাঙ্ক্ষা করিয়া, সংসার পরিত্যাগপূর্বক অরণ্যে গমন করেন, তাহা হইলে ইনি ইঁহার অলৌকিক তপস্যালব্ধ তত্ত্বের দ্বারা জগতের সমস্ত মতবাদ নিরস্ত করিয়া, গিরিগণ মধ্যে মেরুর ন্যায়, সর্বোপরি বিরাজ করিবেন।

 “ধাতুগণের মধ্যে যেমন স্বর্ণ, গিরিগণের মধ্যে যেমন মেরু, জলরাশির মধ্যে যেমন সাগর, গ্রহগণের মধ্যে যেমন চন্দ্র, তেজোরাশির মধ্যে যেমন সূর্য, জগতের সমস্ত জনগণের মধ্যে আপনার পুত্র হইবেন সেইরূপ সর্বোত্তম।”

 রাজা সমস্ত শ্রবণ করিয়া সেই দ্বিজগণকে প্রশ্ন করিলেন: “পূর্বে মহাশক্তিমান্ রাজর্ষিগণের মধ্যেও যে লক্ষণসমূহ দৃষ্ট হয় নাই, তাঁহারাও যাহা করিতে সমর্থ হন নাই, ইনি তাহা সম্পন্ন করিতে সমর্থ হইবেন, ইহা কিরূপে সম্ভব।”

 রাজার এই প্রশ্ন শুনিয়া ব্রাহ্মণগণ উত্তর করিলেন: “পূর্বে কাহারও দ্বারা যে-যশ অর্জিত হয় নাই, যে-কর্ম অনুষ্ঠিত হয় নাই, যে-জ্ঞান উপলব্ধ হয় নাই, তাহা পরে অন্য কাহারও দ্বারা হইবে না, এমন কথা বলা যায় না। এ বিষয়ে পূর্বপর বলিয়া কোনো নিয়ম নাই।*[]

 “গোত্রপ্রতিষ্ঠাতা ঋষি ভৃগু ও অঙ্গিরা যে-রাজশাস্ত্র রচনা করিতে পারেন নাই, হে সৌম্য! কালে তাঁহাদের পুত্রদ্বয় শুক্র ও বৃহস্পতি তাহা করিয়াছিলেন॥৪৬॥

 “যে-বেদ পূর্ব আচার্যগণ দর্শন করেন নাই, সেই নষ্ট বেদ সারস্বতের দ্বারা পুনরায় উক্ত হইয়াছিল। স্বশিষ্ট, যে-বেদকে বিভক্ত করিতে অসমর্থ হইয়াছিলেন, ব্যাস সেই বেদকে বহু ভাগে বিভক্ত করিয়াছিলেন॥৪৭॥

 “মহর্ষি চ্যবন যাহা রচনা করিতে পারেন নাই, বাল্মীকি সেই পদ্য রচনা করিয়াছিলেন। পূর্বে অত্রি যে-চিকিৎসাশাস্ত্র প্রণয়ন করিতে পারেন নাই, আত্রেয় ঋষি পরে তাহা করিয়াছিলেন॥৪৮॥

 “কুশিকের দ্বারা যে-দ্বিজত্ব লব্ধ হয় নাই, হে রাজন! গাধির পুত্রের দ্বারা তাহা সাধিত হইয়াছিল। পূর্বে ইক্ষ্বাকু পুত্রগণ যে-সমুদ্রের বেলা বন্ধনে অসমর্থ হইয়াছিলেন, পরে সগর সেই সমুদ্রের বেলা ধারণ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন॥৪৯॥

 “যোগক্রিয়ায় ব্রাহ্মণগণের যে-আচার্যত্ব অন্য কোনো ক্ষত্রিয় পান নাই, জনক তাহা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। শৌরির দ্বারা যে-কর্ম সমূহ বিখ্যাত হইয়াছে, শূরগণ তাহা সাধন করিতে অসমর্থ ছিলেন॥৫০॥

 “নৃপতি ও ঋষিগণের পূর্বপুরুষগণ যে-হিতকার্যসমূহ সম্পন্ন করেন নাই—তাঁহাদের পুত্র (পৌত্রগণের) দ্বারা তাহা অনুষ্ঠিত হইয়াছে। সুতরাং বয়স ও বংশ এ বিষয়ে প্রামাণ্য নহে; জগতে, যে-কোনো স্থান হইতে যে-কোনো ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ হইতে পারে”॥৫১॥

 বিশ্বাসভাজন সেই দ্বিজগণের দ্বারা এইরূপে আশ্বাসিত ও অভিনন্দিত হইয়া, নরপতি শুদ্ধোদন, চিত্ত হইতে সমস্ত অনিষ্টাশঙ্কা দূর করিয়া, অধিকতর হর্ষলাভ করিলেন॥৫২॥

 “আপনারা যেরূপ বলিলেন এ সেইরূপ সম্রাট হউক ও জরাগ্রস্ত হইলে বানপ্রস্থ অবলম্বন করুক”—এই কথা বলিয়া প্রীত হইয়া, তিনি সেই দ্বিজোত্তমদিগকে সৎকারপূর্বক বহু ধন প্রদান করিলেন॥৫৩॥

 অনন্তর, সেই (অলৌকিক) লক্ষণসমূহের দ্বারা, এবং নিজ তপস্যাবলে, জন্মান্তকরের (বোধিসত্ত্বের) সেই জন্ম বিষয় অবগত হইয়া, সদ্ধর্ম পিপাসায় মহর্ষি অসিত শাক্যেশ্বরের আলয়ে আগমন করিলেন॥৫৪॥

 ব্রাহ্মীশ্রী ও তপঃশ্রীর দ্বারা উজ্জ্বল, ব্রহ্মবিদগণের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ঋষিকে সগৌরবে, সৎকারপুর্বক রাজগুরু রাজসদনে প্রবেশ করাইলেন॥৫৫॥

 কুমারের জন্মহেতু হর্ষবেগপূর্ণ, জরা ও তপঃপ্রকর্ষহেতু ধীর, সেই ঋষি রাজান্তঃপুর-সমীপে প্রবেশ করিলেন। সেই নির্বিকার পুরুষের চিত্তে, রাজান্তঃপুরও অরণ্যের ন্যায় প্রতিভাত হইল॥৫৬॥

 অনন্তর নৃপতি, আসনস্থ মুনিকে পাদ্যার্ঘ্য প্রদানপূর্বক সম্যক পূজা করিয়া, পুরাকালে বশিষ্ঠকে অন্তিদেব যেরূপ নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন, তাঁহাকে সেইরূপ যথোপচারে নিমন্ত্রণ করিলেন॥৫৭॥

 “ভগবান আমাকে দেখিতে আসিয়াছেন— আমি ধন্য হইয়াছি, আমার বংশ আপনার অনুগ্রহভাজন হইয়াছে। হে সৌম্য! কি করিব আজ্ঞা করুন। আমি আপনার শিষ্য, আপনার নির্ভরযোগ্য”॥৫৮॥

 নরপতি কর্তৃক এইরূপে সর্বতোভাবে যথোচিত নিমন্ত্রিত হইয়া, বিস্ময়োৎফুল্ল বিশালনয়ন সেই মুনি, এই ধীর গম্ভীর বাণী উচ্চারণ করিলেন॥৫৯॥

 “তুমি অতিথিপ্রিয়, ত্যাগী, ধর্মাকাঙ্ক্ষী, মহাত্মা। প্রকৃতি, বংশ, জ্ঞান ও বয়সানুরূপ আমার প্রতি তোমার এইরূপ স্নেহাভিষিক্তা মতি, তোমার যোগ্যই হইয়াছে॥৬০॥

 “এইভাবে পূর্বরাজর্ষিগণ পূর্ব জন্মার্জিত পুণ্যের দ্বারা ধনলাভ করিয়া, নিত্য যথাবিধি অধিগণকে বিতরণ করিয়া, বিভবে দরিদ্র হইলেও তপস্যায় ঐশ্বর্যশালী হইয়াছিলেন॥৬১॥

 “এখন আমার আগমনের কথা শ্রবণ করিয়া তুমি প্রীতিলাভ করো। বোধিলাভের জন্য তোমার এক পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছে, আমি আকাশমার্গে এই দিব্যবাণী শ্রবণ করিলাম॥৬২॥

 “সেই বাণী শ্রবণ করিয়া, ধ্যানযোগে এবং (অলৌকিক) লক্ষণসমূহের দ্বারাও অবগত হইয়া, শত্রুধ্বজের ন্যায় সমুন্নত শাক্যকুলধ্বজের দর্শনাভিলাষে এখানে উপস্থিত হইয়াছি”॥৬৩॥

 ইহা শুনিয়া আনন্দে ত্বরিতগতি নরপতি, ধাত্রীক্রোড়স্থিত কুমারকে আনয়ন করিয়া, তপোধনকে দর্শন করাইলেন॥৬৪॥

 মহর্ষি সবিস্ময়ে সেই রাজপুত্রকে দর্শন করিলেন। চরণ তাঁহার চক্রাঙ্কিত, হস্ত ও চরণের অঙ্গুলিসমূহ জালযুক্ত, ভ্রূদ্বয় ঊর্ণাযুক্ত এবং বস্তিকোশ হস্তীর ন্যায়॥৬৫॥

 পার্বতীর ক্রোড়স্থিত কুমারের (কার্তিকের)ন্যায়, ধাত্রীক্রোড়গত কুমারকে দর্শন করিয়া, তাঁহার অক্ষিপল্লবে অশ্রু সঞ্চিত হইল, তিনি দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া, আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিলেন॥৬৬॥

 মহর্ষি অসিতের অক্ষি অশ্রু-প্লাবিত দেখিয়া, অপত্যস্নেহবশত (অমঙ্গল আশঙ্কায়), নরপতি কম্পিত হইয়া উঠিলেন। কৃতাঞ্জলিপুটে নতমস্তকে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে গদগদ স্বরে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন॥৬৭॥

 “দেবগণের দেহের সহিত যাঁহার দেহের প্রভেদ অতি অল্প, যাঁহার জন্ম জ্যোতির্ময় এবং অতি আশ্চর্য; আপনার বাক্য অনুসারে যাঁহার ভবিষ্যৎ অতি উত্তম, তাঁহাকে দেখিয়া আপনার নয়নে তাশ্রু সঞ্চিত হইতেছে কেন।॥৬৮॥

 “হে ভগবন্, কুমার কি স্থিরায়ু হইবেন। নিশ্চয়ই আমার শোকের জন্য তাঁহার জন্ম হয় নাই। আমি কোনোরূপে যেঅঞ্জলিপূর্ণ জলটুকু লাভ করিয়াছি, কাল তাহা এখনি শোষণ করিতে আসিতেছেন, ইহা কখনই হইতে পারে না॥৬৯॥

 “সুপ্ত হইলেও যে-পুত্রের দিকে আমার একটি আঁখি অনিমেষে চাহিয়া থাকে— আমার সেই যশের আধার কি অক্ষয় হইবে। আমার এই কুলপ্রসার কি স্থায়ী হইবে। আমি কি সুখে পরলোকে প্রয়াণ করিতে পারিব।॥৭০॥

 “এই কুলকিসলয় উৎপন্ন হইয়া, অপ্রস্ফুটিত অবস্থায় কখনই পরিশুষ্ক হইবে না। হে বিভো! আমি অশান্ত হইয়াছি। আপনি সত্ত্বর উত্তর দান করুন। আত্মজের প্রতি আত্মীয়ের স্নেহ তো আপনি অবগত আছেন”॥ ৭১॥

 নরপতিকে অমঙ্গল আশঙ্কায় উদবিগ্ন মনে করিয়া, মুনি কহিলেন:— “হে রাজন! তুমি অন্য কিছু আশঙ্কা করিয়ো না। আমি যাহা বলিয়াছি, তাহা নিঃসন্দেহে সত্য॥৭২॥

 “ইহার অন্যরূপ কিছু হইবে বলিয়া যে আমার মন চঞ্চল হইয়াছে, তাহা নহে। আমি স্বয়ং বঞ্চিত হইলাম এই ভাবিয়াই আমার মন বিকল হইয়াছে। আমার পরলোকযাত্রার দিন আগতপ্রায়। হায়, এমন সময় এই দুর্লভ পুনর্জন্মক্ষয়ের উপায়জ্ঞ পুরুষ জন্মগ্রহণ করিলেন॥৭৩॥

 “রাজ্যত্যাগী, বিষয়ে আস্থাশূন্য, তীব্র প্রযত্নের দ্বারা অধিগততত্ত্ব এই জ্ঞানময় সূর্য, মোহান্ধকার দূরীকরণের জন্য জগতে প্রজ্বলিত হইবেন॥৭৪॥

 “হায়!এই সংসার যেন দুঃখের সাগর। ব্যাধি ইহার ফেনস্বরূপ। জরা ইহার তরঙ্গ। মৃত্যু ইহার বেগ উগ্র করিতেছে। সমস্ত জগৎ এই দুঃখের সাগরে ভাসিয়া যাইতেছে। এই মহামানব তাঁহার প্রজ্ঞাতরণী বাহিয়া, এই আর্ত জগৎকে উদ্ধার করিবেন॥৭৫॥

 “ইঁহার প্রবর্তিত ধর্ম, স্রোতস্বিনী নদীর ন্যায় বহিয়া চলিবে। প্রজ্ঞা হইবে তাহার বারি। সমাধি সেই বারিকে শীতল করিবে। স্থির শীল হইবে তাহার তট। ব্রত হইবে চক্রবাক। এই উত্তমা স্রোতস্বিনী হইতে তৃষ্ণার্ত জীবলোক তৃষ্ণা নিবারণ করিবে॥৭৬॥

 “ইনি শোকক্লিষ্ট, বিষয়াবৃত সংসারকাস্তারমার্গস্থিত, পথহারা পথিকের ন্যায় জনগণকে, মোক্ষমার্গ প্রদর্শন করিবেন॥৭৭॥

 “আতপান্তে, বৃষ্টির দ্বারা মহামেঘ যেরূপ জগতের তাপ দূর করে, সেইরূপ ইনিও বিষয়-ইন্ধনান্বিত রাগাগ্নির দ্বারা দহ্যমান জনসমূহকে ধর্ম-বৃষ্টির দ্বারা আনন্দ বিতরণ করিবেন॥৭৮॥

 “ইনি জীবগণের মুক্তির জন্য, তৃষ্ণার্গলসমন্বিত মোহান্ধকারকপাটবিশিষ্ট দ্বার, দুর্লভ ও উৎকৃষ্ট সদ্ধর্মতাড়নের (চাবির) দ্বারা উদ্ঘাটিত করিবেন॥৭৯॥

 “এই ধর্মরাজ বোধিলাভ করিয়া, স্বরচিত মোহপাশে পরিবেষ্টিত, দুঃখাভিভূত, নিরাশ্রয় জনসমূহের বন্ধন মোচন করিবেন॥৮০॥

 “হে সৌম্য, তুমি ইহার জন্য শোক করিয়ো না। মোহে, বিষয়সুখহেতু, বা গর্ববশত, মনুষ্যলোকে যে-ব্যক্তি ইহার পরমধর্ম শ্রবণ করিবে না, সেই ব্যক্তির জন্যই শোক করা উচিত॥৮১॥

 “এই পুণ্য হইতে ভ্রষ্ট হওয়ায়, সমস্ত ধ্যান-সমাধি লাভ করিয়াও আমি অকৃতার্থ রহিলাম। ইহার ধর্ম শ্রবণে বঞ্চিত হওয়ায়, আমি ত্রিদিববাসকেও বিপত্তি বলিয়া মনে করিতেছি”॥৮২॥

 ইহা শুনিয়া নরপতি বিষাদ পরিত্যাগ করিয়া ভার্যা ও সুহৃদগণসহ আনন্দে মগ্ন হইলেন। “পুত্র আমার এইরূপ" এই কথা ভাবিয়া তিনি নিজেকেও সারবান পুরুষ বলিয়া মনে করিলেন॥৮৩॥

 “পুত্র আমার ঋষিমার্গে গমন করিবে”—তিনি এই চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন। যদিও তিনি ধর্মের বিপক্ষে ছিলেন না, তথাপি সস্তানের বিচ্ছেদ ভয়ে উদ্‌বিগ্ন হইলেন ॥৮৪॥

 অনন্তর, পুত্রের জন্য উদ্‌বিগ্ন সেই রাজাকে তাঁহার পুত্রসংক্রান্ত তত্ত্ব নিবেদন করিয়া, অসিতমুনি যে-ভাবে আসিয়া ছিলেন, সকলের দ্বারা সসম্মানে নিরীক্ষ্যমাণ হইয়া, সেইভাবেই পবনপথ দিয়া গমন করিলেন॥৮৫॥[]

 পুত্রের জন্মে আনন্দিত, পুত্রপ্রিয় নরপতি তাঁহার রাজ্যের সমস্ত বন্দীদের বন্ধন মোচন করিয়া, সন্তানের জাতকর্মাদি, নিজবংশানুরূপ যথাবিধি সম্পন্ন করাইলেন ॥৮৬॥

 দশ দিবস অতীত হইলে, সংযতচিত্ত ও পরম আনন্দিত সেই রাজা পুত্রের কল্যাণের জন্য জপ-হোমাদি এবং দেবোদ্দেশে যজ্ঞ করিলেন॥৮৭॥

 পুত্রের কল্যাণের জন্য, তিনি স্বয়ং দ্বিজসমূহকে পূর্ণসংখ্যায় শতসহস্র, বলিষ্ঠ বৎসযুক্ত, শৃঙ্গে স্বর্ণসমন্বিত, জরাবিরহিত, পয়স্বিনী গাভী দান করিলেন॥৮৮॥

 অনন্তর সংযতমনা নরপতি, নানা উদ্দেশ্যে আপনার হৃদয়তোষক বহুক্রিয়া অনুষ্ঠানপূর্বক, হর্ষান্বিত হইয়া, শুভদিবসে শুভমুহূর্তে, পুরপ্রবেশের সংকল্প করিলেন॥৮৯॥

 অতঃপর পুত্রবতী দেবী, কল্যাণ কামনায় দেবগণকে প্রণাম করিয়া, দ্বিরদরদময়ী মহার্হ শ্বেতবর্ণ সিতপুষ্পান্বিত রত্নোজ্জ্বলা শিবিকায় আরোহণ করিলেন॥৯০॥

 স্থবিরজনানুগতা পত্নীকে সন্তানসহ অগ্রে পুরমধ্যে প্রবেশ করাইয়া, অমরগণের দ্বারা অর্চ্যমান মঘবান্ যেরূপ স্বর্গে প্রবেশ করেন, নরপতি শুদ্ধোদনও সেইরূপ পৌরজনের দ্বারা পুজিত হইয়া পুরপ্রবেশ করিলেন॥৯১॥

 অতঃপর ষড়াননের জন্মে সন্তুষ্ট মহাদেবের ন্যায়, সেই মহারাজ প্রাসাদে গমন করিয়া, হর্ষোৎফুল্ল বদনে— নানারূপ নির্দেশদান পূর্বক, বহু উন্নতিজনক ও যশস্কর কর্মের অনুষ্ঠান করিলেন॥৯২॥

 এইরূপে জনপদসহ কপিলের নামে প্রখ্যাত সেই নগরী, নলকুবেরের জন্মে অপ্সরাবিরাজিত অলকার ন্যায়, রাজপুত্রের মহিমাময় জন্মহেতু হর্ষপূর্ণ হইল॥৯৩॥

  1. সেই নগরীর প্রাসাদসমূহ পর্বতের ন্যায় অভ্রভেদী উচ্চ এবং শুভ্র ছিল। পর্বতভ্রমে মেঘরাশি তাহাদের শিরোদেশে পুঞ্জীভূত হইত। সেইজন্য উহা কৈলাস পর্বত বলিয়াও পরিগণিত হইতে পারিত।
  2. চন্দ্র কুমুদকে প্রফুল্ল করে কিন্তু পদ্মের শোভা হরণ করে। সূর্য পদ্মের শোভা বর্ধন করে কিন্তু কুমুদকে ম্লান করে। ইহাদের কেহই কুমুদ ও পদ্ম উভয়কে প্রফুল্ল করিতে পারে না। কিন্তু সেই নগরী (কবি— বর্ণিত উপায়ে) কুমুদকে প্রফুল্ল করিয়া পদ্মের শোভা বিস্তার করিত।
  3. ইহার আক্ষরিক অনুবাদ: “তিনি ভূভৃদ্ গণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হইয়াও পক্ষযুক্ত ছিলেন, তাঁহার দান নিয়ত প্রবৃত্ত হইলেও তিনি মদযুক্ত ছিলেন না। তিনি ঈশ হইয়াও সমদৃষ্টিসম্পন্ন এবং শান্ত প্রকৃতি হইয়াও মহাপ্রতাপশালী ছিলেন।”
     এই শ্লোকের মধ্যে কতকগুলি দ্ব্যর্থযুক্ত শব্দ আছে; যথা ভূভৃদ্ = পর্বত ও রাজা। পক্ষ = পাখা ও সৈন্য, সহায়। দান = মদ (হস্তীর গণ্ড হইতে ক্ষরিত) ও দান। ঈশ = শিব ও ঐশ্বর্যশালী। সমদৃষ্টি = যুগ্মলোচন, সমদর্শী। প্রতাপ = উত্তাপ ও শক্তি। সেইজন্য ইহার আর এক অর্থ হয়:
     "তিনি পর্বতগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইয়াও পক্ষধারী ছিলেন। তাঁহার মদ নিয়ত নির্গত হইলেও তিনি মদযুক্ত ছিলেন না। তিনি শিব হইয়াও যুগ্মচক্ষুসম্পন্ন ছিলেন এবং শান্ত প্রকৃতি হইয়াও অত্যন্ত উত্তাপ দান করিতেন।
     এইভাবে অর্থ করিলে বাক্যগুলির অর্থে বিরোধ বা অসংগতি দৃষ্ট হয়। কিন্তু পূর্বোক্তরূপ অর্থ করিলে বিরোধ বা অসংগতি থাকে না। সংস্কৃতে ইহাকে বলে বিরোধাভাস অলংকার।
  4. লোকপালগণ সমস্ত লোককে সমভাবে রক্ষা করেন, তাঁহাদের কাহারও প্রতি পক্ষপাত নাই। এখানে পাছে তাঁহাদের পক্ষপাত আছে বলিয়া মনে হয়, এই আশঙ্কা করিয়া কবি বলিতেছেন, “চন্দ্রকিরণ সর্বত্র সমভাবে প্রতিভাত হইলেও কৈলাসগিরিতেই বিশেষভাবে দীপ্তি পায়।”
  5. শুদ্ধাবাস বা শুদ্ধাধিবাস—বৌদ্ধশাস্ত্রে নানাপ্রকার স্বর্গের ও নানা শ্রেণীর দেবতার কথা আছে। ইহা এক স্বর্গের, ও সেই স্বর্গস্থ দেবতার নাম।
  6. ৬.০ ৬.১ *••••••* এই অংশ সংস্কৃত পুঁথিতে পাওয়া যায় না। তিব্বতী অনুবাদের মধ্যে পাওয়া যায়।
  7. ৮৫ ও ৮৬ সংখ্যার মধ্যে— একটি শ্লোকের অনুবাদ বাদ দেওয়া হইয়াছে। ওই শ্লোকটি এখানে ঠিক খাপ খায় না। চীনা অনুবাদে (৫ম খ্রী কৃত) এই শ্লোক নাই।