আঁধারে আলো (মন্মথমোহন বসু)
আঁধারে আলো
মিনার্ভা থিয়েটারে অভিনীত।
(প্রথম অভিনয় রজনী শনিবার, ২৩শে বৈশাখ ১৩৪০)
শ্রীমন্মথ মোহন বসু, এম্-এ
বরেন্দ্র লাইব্রেরী—পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক।
২০৪ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রকাশক:—
শ্রীবরেন্দ্রনাথ ঘোষ
২০৪, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট্ কলিকাতা।
প্রিণ্টার:—শ্রীমনরঞ্জন দে।
আইডিয়াল্ প্রেস্
১২।১ হেমেন্দ্র সেন ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
ভূমিকা।
সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হইবার উদ্দেশ্যে এই নাটকখানি প্রথমে রচিত হয় নাই। কিন্তু মিনার্ভা থিয়েটারের স্বত্বাধিকারী, আমার আত্মীয় ও বন্ধু শ্রীযুক্ত উপেন্দ্র কুমার মিত্র মহাশয় ছাড়িলেন না। ফলে তাঁহার রঙ্গমঞ্চে নাটকখানি অভিনীত হইল—আমাকেও সাধারণ রঙ্গমঞ্চের উপযোগী করিবার জন্য ইহার কিছু কিছু পরিবর্ত্তন করিতে হইল। ইহার অভিনয় সাফল্যের জন্য প্রধানতঃ দায়ী—ইহার প্রযোজক আমার প্রিয় শিষ্য শ্রীমান কালীপ্রসাদ ঘোষ বি-এস্-সি, এবং ইহার মঞ্চশিল্পী আমার পুত্র শ্রীমান লালমোহন বসু। ইহারা চির দিনই আমার আশীর্ব্বাদভাজন,—নূতন করিয়া ইহাদিগকে আর কি আশীর্ব্বাদ করিব? শ্রীভগবান ইহাদিগকে সুখী ও দীর্ঘজীবী করুন, ইহাই প্রার্থনা।
পাত্র পাত্রীগণ।
| পুরুষ | |
| জ্যোতির্ম্ময় মতিলাল | চিত্রকর। |
| হরেন মল্লিক | ঐ বন্ধু। |
| রাজা রূপচাঁদ রায় | জমিদার; আর্টের উৎসাহদাতা। |
| চন্দ্রপ্রকাশ চম্পটি | “মুন্লাইট্” কোম্পানীর স্বত্বাধিকারী |
| রোহিণীকান্ত শ্রীমানি | “মুন্লাইট্” কোম্পানীর একাধারে ম্যানেজার, কেরানী ও অফিস্-বয়। |
| রামচন্দ্র | জ্যোতির্ম্ময়ের ভৃত্য। |
| চিন্তামণি | জনৈক ভাবুক ভদ্রলোক (আধ্পাগ্লা)। |
| স্ত্রী | |
| মিস্ বিজলী মজুমদার | লাহোরের ভূতপূর্ব্ব এড্ভোকেট্ মিষ্টার মজুমদারের কন্যা। |
| মিস্ কঙ্কাবতী কাঞ্জিলাল, এম, ডি (বার্লিন) | লেডী ডাক্তার; বিজলীর মাসী। |
|
পৃষ্ঠা |
পঙ্ক্তি |
অশুদ্ধ |
শুদ্ধ |
প্রথম অঙ্ক
আঁধারে
অবতরণিকা।
[ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন—মধ্যে মধ্যে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে—ঝড় উঠিয়াছে—
আঁধার-ঘেরা প্রান্তর মধ্যে দিগ্ভ্রান্ত পথিক। ]
আশাদেবীর গীত।
ঐ আস্ছে ধেয়ে কালো মেয়ে—আঁধার কোরে চারিদিক!
জ্বেলে প্রাণের আলো এগিয়ে চলো, পথভোলা পথিক!
হোয়োনাক আপনাহারা,
সংশয়েতে দিশেহারা,
বিজন মাঠে আছাড় খেয়ে পোড়্বে কোথায় নাইকো ঠিক।
আসুক্ বন্যা, উঠুক্ ঝড়,
ডাকুক্ মেঘ কড় কড়,—
এগিয়ে চল সাহস ভরে নির্ভীক পথিক।
ওপারে ঐ হাস্ছে রবি—সোণার ছবি—উজল কোরে দশটি দিক্!
এগিয়ে চল—এগিয়ে চল—দিগ্ভোলা পথিক!
কলিকাতা—
বালিগঞ্জ—“লেক্ সাইড ভিলা।”
[ জ্যোতির্ম্ময়ের ষ্টুডিও। গৃহটি সুসজ্জিত, আসবাবপত্রগুলি বেশ সুরুচিসঙ্গত। Papier mache নির্ম্মিত বাক্স ট্রে, আখরোট কাঠের টেপয় প্রভৃতি কয়েকটি দ্রব্য কাশ্মীর হইতে আনীত; টেবিল-ক্লথটিও কাশ্মীরী গব্বা। কয়েকখানি চিত্র দেওয়ালে টাঙানো রহিয়াছে। কয়েকখানি চিত্র ও চিত্রাঙ্কনের নানা সাজ সরঞ্জাম টেবিল ও অন্যান্য স্থানে রক্ষিত। গৃহের এক কোণে একটি ইজেলের উপর একখানি বস্ত্রাবৃত চিত্র। ]
জ্যোতির্ম্ময়।
(একটি আখরোট কাঠের টেপয়ের উপর একখানি ছবি সাজাইয়া রাখিতে রাখিতে) নাঃ—যেমনভাবেই একে সাজিয়ে রাখি না কেন এর অদৃষ্টে যা ঘটবার তা ঘটবেই—বিক্রী হবার কোন আশাই দেখছি না। মিছে পণ্ডশ্রম! যেখানকার লোকেরা প্রকৃত আর্টের মর্য্যাদা বোঝে না—ভাল landscape painting-এর চেয়ে কালিঘাটের পটকে বেশী আদর করে—সেখানে আমার মত আর্টিষ্টের অনাহারে মরা ছাড়া আর উপায় কি আছে? দূর হোক্ গে—আর ভাব্তে পারি না! (একটা ইজি চেয়ারে অলসভাবে শুইয়া পড়িল।)
[ হরেন মল্লিকের প্রবেশ ]
হরেন।
(নিজের টুপিটা একটা চেয়ারের উপর ফেলিয়া) well, old fellow, how goes the world with you? দুনিয়াটা চল্ছে কেমন?
জ্যোতির্ম্ময়।
হরেন যে! বস, বস। গয়া থেকে কবে এলে? (হরেন উপবেশন করিল) আমার কেমন চল্ছে জিজ্ঞাসা কোরচো? সে কথা আর বোলনা ভাই! couldn’t be worse—একদম যাকে বলে অচল! গয়ায় গেছ্লে, সেখানে প্রেতশীলায় আমার পিণ্ডি দেবার ব্যবস্থাটা কোরে আস্লেই ভাল কোরতে। কারণ যতদূর বুঝ্তে পারচি আমার অপঘাত মৃত্যুর আর বড় বেশী দেরী নাই।
হরেন।
Oh don’t get into a fit of the blues, man! হঠাৎ এমন মুস্ড়ে পড়্চ কেন? তুমি জ্যোতির্ম্ময়, তোমার মুখে কি এ বয়সে “মনে কর শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর” গানটা শোভা পায়? তার চেয়ে গান ধর—“হেসে নাও এ দুদিন বৈত নয়।” Look on the bright side of things, my lad; I always do. দুনিয়াটার এ পিঠে আঁধার, ও পিঠে আলো—সুখী হ’তে চাও ত আঁধারের দিকে চেওনা, আলোর দিকে মুখ ফেরাও।
জ্যেতির্ম্ময়।
সেটা তোমার পক্ষে সহজ, কারণ তোমার একটা bright side—উজ্জ্বল দিক—আছে। কিন্তু আমার? আমার উত্তর দক্ষিণ পূর্ব্ব পশ্চিম উর্দ্ধ অধঃ সবই অন্ধকার! যে দিকে ফিরাই আঁখি সবই তমোময় দেখি—“ঘন তমসাবৃত অম্বর ধরণী!”
হরেন।
কেন তোমার bright side-এর অভাব কি? আমি ভাল ভাল art critic এর মুখে তোমার ছবির অনেক প্রশংসা শুনেছি।
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ, দু’ একটা মিষ্টি কথা মাঝে মাঝে দয়ার্দ্র সমালোচকদের মুখে শুন্তে পাই বটে, কিন্তু তাতে ত আমার মুদীর দেনা শোধ হয় না। লাভের মধ্যে সে কথা গুলো শুনে মাথাটা আরো বিগ্ড়ে যায়—একটা প্রকাণ্ড আত্মমর্য্যাদা-জ্ঞান সজাগ হোয়ে ওঠে—যে রকম ছবি বাজারে বিকোয় সে রকম ছবি আঁকতে আর মন চায় না। ভাবি আমি এত বড় আর্টিষ্ট হোয়ে কলালক্ষ্মীর অপমান কোরবো? ফলে কলালক্ষ্মী অপমানের হাত থেকে নিস্তার পেয়েছেন, কিন্তু আমি লক্ষ্মীছাড়া হোয়ে ‘হা অন্ন জো অন্ন’, কোরে বেড়াচ্ছি!
হরেন।
রাজা রূপচাঁদ ত তোমার একজন সমজদার পেট্রন? তিনি ত তোমার ছবি মাঝে মাঝে কিনে থাকেন শুন্তে পাই।
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ দু’একখান অর্ডিনারি ছবি নিয়েছেন বটে, কিন্তু যে ছবিগুলি আমি আমার masterpiece বোলে মনে করি তার ত খদ্দের দেখ্তে পাই না। (সহসা উত্তেজিত ভাবে উঠিয়া) ছবিগুলি দেখ্বে একবার? এই দেখ―(ছবি দেখাইতে দেখাইতে) দেখ্ছ এই পল্লীচিত্রটা। যার মনে এতটুকু ভাব আছে সেই এখানা দেখে মুগ্ধ না হোয়ে থাকতে পারে না। আর এই study of a beggar girl “কাঙ্গালিনী মেয়ে”—এই “তটিনী তটে”—এসব ছবি দেখে আত্মহারা হয় না এমন কি কেউ আছে? কিন্তু হোলে কি হবে ভাই,—কেউ কিন্তে চায় না। বাঙ্গালী ভাবুক জাতি বোলে একটা চিরন্তন প্রবাদ আছে,—হোতে পারে একথা সত্য—কিন্তু এটা নিশ্চয় যে তার ভাবটা তার বুকের মধ্যে যতই জোর করুক, বাইরে বেরিয়ে এসে তার হাতটা তার পকেটে পৌঁছে দিতে পারে না। ভাবের আতিশয্যে সে বড় জোর পরের পকেট ধরে টানাটানি করে!
হরেন।
তবে এক কাজ করোনা—এ ছাই ছবি আঁকা রোখে রোজগারের অন্য উপায় দেখনা। তোমার মাথায় ভাব আছে, কল্পনাশক্তিরও অভাব নেই, লেখবার ক্ষমতাও অল্পসল্প আছে—একবার সাহিত্যের বাজারটা ঘুরে আস লে হয় না? আমার বিশ্বাস সেখানে তোমার খদ্দেরের অভাব হবে না। আজ কাল নবেল আর ছোট গল্পের খুব কাট্তি শুন্তে পাই।
জ্যোতির্ম্ময়।
সে চেষ্টারও ত্রুটি হয় নি, কারণ অন্ন চিন্তা যে মস্তিষ্ককে উর্ব্বর করে সেটা একটা পরীক্ষিত সত্য—তবে তাতে খাদ্য শস্য যত জন্মাক আর না জন্মাক, আগাছা যে প্রচুর পরিমাণে জন্মায় তা’তে সন্দেহ নাই। ছ’মাস আগে একদিন আমার মনে হোল পাওনাদারদের সঙ্গে নিত্য বচসা এড়াবার একটা প্রকৃষ্ট পন্থা হোচ্চে, সাহিত্য সাধনা অর্থাৎ নবেল লেখা! যেমন ভাবা, অমনই কাজ—লিখে ফেলুন একখানা প্রকাণ্ড নবেল! তুমি ত তখন এখানে ছিলে না—সুতরাং বইখানা আর পাঁচজন বন্ধুকে দেখালুম। তাঁরা বোল লেন চমৎকার হোয়েছে!
হরেন।
বটে, বটে! তারপর?
জ্যোতির্ম্ময়।
তারপর মহা উৎসাহে manuscript খানা নিয়ে একজন নামজাদা publisher-এর কাছে উপস্থিত হোলেম―
হরেন।
তিনি কি বোল্লেন?
জ্যোতির্ম্ময়।
তিনি নির্দ্দয় ভাবে আমার প্রদীপ্ত উৎসাহ বহ্নির উপর প্রচুর পরিমাণ বরফ জল প্রক্ষেপ কোরে সেটাকে একদম নির্ব্বাপিত কোরে দিলেন। পরিষ্কার বললেন, “এই বই বাজারে চোল্তে পারে না—একেবারে unsaleable.”
হরেন।
কেন, কি অপরাধে?
জ্যোতির্ম্ময়।
অপরাধ? অপরাধ এই যে, আমার বই যথেষ্ট পরিমাণে realistic socialistic হয়নি—আমার morality ও psychology সেকেলে মরচে-পড়া type-এর―আর আমার character গুলো যতটা dynamic হওয়া উচিত ছিল তার নাকি অর্দ্ধেকও হয়নি!
হরেন।
অর্থাৎ?
জ্যোতির্ম্ময়।
অর্থ কি আমিই বুঝেছি যে তোমাকে বোঝাব? তা’ বুঝ্লেত এত দিনে অর্থবান হোতে পারতুম! তবে publisher মহাশয়ের সঙ্গে কথাবার্ত্তার পর আমার বেশ হৃদয়ঙ্গম হোল যে, সাহিত্য ব্যবসায়ে সাফল্য লাভ কোর্তে হোলে আমার আরও কিছু দিন সাধনার প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ততদিন আমায় ধারে চাল ডাল যোগাতে মূর্খ মুদিটার বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না। আমারও সে প্রস্তাব তার কাছে কোরতে সাহস হোলনা—সুতরাং “ছেড়ে দিলুম পথটা।”
হরেন।
তাইত!—আচ্ছা,—তা হলে আর এক কাজ করোনা ভাই;―তোমার এই বাড়ীটা ভাড়া দাওনা। তুমি একলা মানুষ—তোমার এত বড় বাড়ীতে দরকার কি? এমন লেকের ধারে এমন সুন্দর হাল ফ্যাসানের বাড়ী—সাহেব সুবোর নজরে সহজেই লেগে যাবে। অন্ততঃ আড়াই শো টাকা যে এর ভাড়া হবে তা’তে সন্দেহ নাই—furniture সুদ্ধ ভাড়া দিলে আরও পাবে। তারপর চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায় তোমার থাকবার মত বাড়ী একটা সহজেই মিল্বে।
জ্যোতির্ম্ময়।
সে চেষ্টারও কি কসুর কোরেছি? তুমি বোধ হয় লক্ষ্য করোনি, আমি সদর দরজার উপর “To let furnished. Enquire within” দিয়ছি। তা’ ছাড়া চন্দরদা’কে বোলে একটা নোটস্ টাঙ্গিয়ে—চন্দরদা’কে মনে আছেত হে?
হরেন।
হাঁ হাঁ—চন্দরদা’ কি কোর্ছে আজকাল?
জ্যোতির্ম্ময়।
সে বৌবাজারে “মুনলাইট্” নাম দিয়ে এক universal information bureau and order supplier-এর firm খুলে বোসেছে—সে সেখানে দালালি ঘটকালি থেকে আরও কোরে হারান গরু খুঁজে দেওয়া পর্য্যন্ত সব কাজই করে। তাকে বোলেছি আমার বাড়ীর জন্য একটা শাঁসাল রকম ভাড়াটে জুটিয়ে দিতে পার্লে তাকে একটা মোটা রকমের কমিশন দেব। কিন্তু “ভাগ্যং ফলতি সর্ব্বত্র”—কেউ এ পর্য্যন্ত একটা enquiryও কোরলে না। ফলে বাড়ীটার tax দিতে দিতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্চে। তারপর কবে যে এটা নিলেমে চোড়্বে তা বোলতে পারি না—কারণ এখানা হুণ্ডীওলাদের কাছে বাঁধা—তাদের মধ্যে দুজন শাসিয়ে গেছে যে শীঘ্রই এটাকে sale-এ চড়াবে। বাস্, তা হোলেই আমি নিশ্চিন্ত হই—একতারা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। street singer-এর আয় painter-এর আয়ের চেয়ে বেশী—কি বল?
হরেন।
তুমি যে একেবারে মরীয়া হয়ে উঠেছ হে’—যাক্—সে resource ত শেষ কালে আছেই। কিন্তু বাড়ীটে নিলেমে চড়াবার আগে নিজেকে একবার বিয়ের বাজারে নিলেমে চড়িয়ে দেখ না। বলত আমি হই তোমার auctioneer। রূপে গুণে এমন সুপাত্র—ডাকবার লোকের অভাব হবে না। অর্দ্ধেক রাজত্ব আর একটা রাজকন্যা না মিলুক—হাতে হাতে প্রচুর কাঞ্চন মূল্য ত মিলবেই, আর তার সঙ্গে একটা ছোট খাট heiress জুটে যাওয়াও অসম্ভব নয়। তা ছাড়া তোমার একজন অভিভাবকেরও বিশেষ প্রয়োজন হোয়েছে। প্রভু রামচন্দ্রের তাঁবে আর কত দিন থাক্বে বল? ওটা হনুমানেরই পোষায়।
জ্যোতির্ম্ময়।
ও দিকটা ভাই আরও অন্ধকার। দুর্ভাগ্যক্রমে ওধারের দরজাটা আমি নিজে স্বহস্তে বন্ধ কোরে দিয়েছি। অর্থাৎ তোমার কাছে স্বীকার কোর্তে লজ্জা নেই—I have fallen in love—ভালবাসার বন্ধনে পোড়েছি—
অ্যাঁ বলো কি! এমন অসময়ে love! না—না-সে কি কখন হোতে পারে? I protest—I object—এতে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে। এ কিছুতেই হোতে পারে না।
জ্যোতির্ম্ময়।
হোতে পারে না কি? হোয়েছে! It is a fact—একেবারে কঠোর সত্য। I have fallen deeply, wildly, madly, hopelessly in love—হরেন, হরেন, সে দেবী, সে স্বর্গীয়া—সে—সে—celestial—
[ রামচন্দ্রের প্রবেশ ]
রামচন্দ্র।
গয়লানী—বাবু, গয়লানী এসেছে।
হরেন!
ও বাবা celestial গয়লানী একেবারে স্মরণমাত্রেই উপস্থিত!
রামচন্দ্র।
আজ্ঞে শিয়াল টিয়াল নয়—শনি গয়লানী। তের টাকা সাড়ে ছ’ আনা তার পাওনা সে তারি হিসেব নিয়ে এসেছে।
জ্যোতির্ম্ময়।
বেশ কোরেছে। তুমি কি বোলতে চাও রামচন্দ্র, সে আস্বে না? বুঝ্লে রামচন্দ্র, গোয়ালিনী মাত্রেই খদ্দের বাড়ীতে আস্তে বিশেষ আনন্দ পায়। সে আনন্দ থেকে ওকে বঞ্চিত কোর্লে নিষ্ঠুরতা হবে। ওকে বল, ও যেন রোজ আসে। আজ যেমন এসেছে, কালও তেমনই আসে।
হরেন।
হাঁ, আর যদি পারত তোমার কমলাকান্তের দপ্তর থেকে দুটো মিষ্টি কথা ওকে শুনিয়ে দিও। তা হোলে আর দুধের দাম চাইবে না।
রামচন্দ্র।
আজ্ঞে ও বোল্চে ওর টাকার বড় দরকার। আজ না দিলেই নয়।
জ্যোতির্ম্ময়।
সে কথা ঠিক। কিন্তু কি জান টাকার দরকার আমারও আছে। আর আমার দরকারটা ওর চেয়েও বেশী। সুতরাং তুমি এখন যেতে পার। ওকি, দাঁড়িয়ে রোইলে যে?
রামচন্দ্র।
আজ্ঞে টেক্সবাবু এসেছিল, এই বিলটা রেখে গিয়েছে—বোলে গেল কাল টেক্স দেবার শেষ দিন।
জ্যোতির্ম্ময়।
ঠিক, ঠিক! শেষ দিনই ত বটে! লোকটির বেশ স্মরণশক্তি ত! তা’ দেখ রামচন্দ্র, এ বিলটি টেবিলের উপর ঐ যে আর কখানা বিল রোয়েচে ঐখানে রেখে সোরে পড়! আর ঘরে যদি চা থাকে ত এঁর জন্য এক কাপ তৈরী কোরে আন।
[ বিল রাখিয়া রামচন্দ্রের প্রস্থান ]
কি ভাই আমার ভবিষ্যৎটা কেমন bright বোলে বোধ হচ্চে? এ নিরেট অন্ধকারের মধ্যে আলো আবার কোন ছিদ্র দেখ্তে পাচ্চ কি?
[ নেপথ্যে মোটর হর্ণের শব্দ ]
জ্যোতির্ম্ময়।
(জানালা দিয়া দেখিয়া) রাজা রূপচাঁদের মোটর। তাইত হঠাৎ এমন সময়ে রাজার শুভাগমন! (তাড়াতাড়ি উঠিয়া ছবিগুলি সাজাইতে লাগিল)
হরেন।—Cheer up জ্যোতি! তোমার অন্ধকারের পর্দ্দার মধ্যে বোধ হয় আলো আস্বার ছিদ্র দেখা যাচ্চে।
[কিছুক্ষণ পরে রাজা রূপচাঁদ প্রবেশ করিলেন। জ্যোতির্ম্ময় একখানা চেয়ার তাঁহাকে আগাইয়া দিল। স্থূলকায় রাজা বাতগ্রস্ত—পায়ে ফ্ল্যানেল জড়ান—হাতে মোটা লাঠি—কষ্টে সেই চেয়ারে উপবেশন করিলেন]
রূপচাঁদ।
কেমন আছ হে জ্যোতির্ম্ময়? চারমাস এখানে ছিলুম না, মফঃস্বলে গেছ্লুম। হপ্তা দুই হোল ফিরেছি। তোমার কোন নতুন ছবি টবি আছে কি না তাই দেখ্তে এলুম।
জ্যোতির্ম্ময়।
আজ্ঞে দেখবেন বৈকি! দেখুন না। দুখানা খুব ভাল landscape সম্প্রতি finish কোরেছি। আপনি দেখ্লেই খুসি হবেন।
রূপচাঁদ।
না—না—আর landscape-এর দরকার নেই। Give me honest flesh and blood—some human face divine—মানুষের চেহারা চাই—বুঝ্লে? মিষ্টার চৌধুরী সেদিন আমায় বোল্ছিলেন যে, তুমি আঁক ভাল, কিন্তু landscape paintingএর দিকে ঝোঁক দিয়েই তুমি নিজেকে মাটি কোরে ফেলেছ। মিঃ চৌধুরীর মত art critic আজকাল আর নেই বোল্লেই হয় তাঁর পরামর্শটা শুনো—বুঝলে? landscape আঁকা ছেড়ে দাও—তোমার উন্নতি হবে। (সহসা গৃহকোণস্থিত বস্ত্রাবৃত ইজেলের দিকে দৃষ্টি পড়িল) ওখানে কি ছবি ঢাকা রোয়েচে?
জ্যোতির্ম্ময়।
(তাড়াতাড়ি) আছে ও কিছু নয়—একটা unfinished study—আরও অনেক কাজ বাকী, আপনাকে দেখাবার উপযুক্ত এখনও হয়নি।
রূপচাঁদ।
(নিজের ছড়ি দিয়া ছবির আবরণ উন্মোচনের জন্য চেষ্টা করিতে করিতে) তা হোক্ গে unfinished—আমি এটা দেখ্তে চাই।
হরেন।
(জ্যোতির্ম্ময়ের প্রতি মৃদুস্বরে) যাওনা জ্যোতি, ছবিটা রাজ বাহাদুরকে দেখাও না।
জ্যোতির্ম্ময়।
(উৎকণ্ঠিত ভাবে) না—এ ছবিখানা বিক্রীর জন্য নয়। আমি ওখানাকে এ অবস্থায় কাউকে দেখাতে ইচ্ছা করি না।
রূপচাঁদ।
কেন আপত্তি কি? unfinished অবস্থাতেও ছবির ভালমন্দ বিচার করবার ক্ষমতা আমার আছে। (পুনরায় লাঠি দিয়া ছবি আবরণ উন্মোচনের চেষ্টার ফলে হঠাৎ আবরণটি খসিয়া পড়িয় গেল ও একটি যুবতীর চিত্র প্রকাশিত হইল।) বাঃ চমৎকার। (দেখিতে দেখিতে) হাঁ, এ একখানা ছবির মত ছবি বটে! যেমন চোখ মুখ—তেমনই ভঙ্গী—exquisite!—Really, this is something like!—জ্যোতির্ম্ময় এ ছবি আমার—এটা আমি নিলুম। আমার গ্যালারিতে যে ‘Beauties’ collection আছে তার মধ্যে এখানা থাক্বে। এ ছবির দাম আমি চারশো টাকা দেব।
জ্যোতির্ময়।
Thanks. কিন্তু আমি ত বোলেছি এ ছবি আমি বিক্রীর জন্য আঁকিনি।
রূপচাঁদ।
(বিরক্তভাবে) সে কি! আমিত মনে কোরেছিলুম, সব ছবিই এখানে বিক্রীর জন্য রোয়েছে।
জ্যোতির্ম্ময়।
এই খানি ছাড়া। আপনি যদি অন্য ছবি গুলি দেখেন তাহোলে হয়ত—
রূপচাঁদ।
(অধীর ভাবে) এ ছবি ছাড়া আর কোনও ছবির আমার দরকার নেই। তুমি কি কারো অর্ডার মত এ ছবি এঁকেছ?
জ্যোতির্ম্ময়।
(ইতস্ততঃ ভাবে) না—ঠিক অর্ডার মত নয়—তবে—
রূপচাঁদ।
“তবে” আবার কি? যদি কারো অর্ডারের জিনিষ না হয়, তা হোলে না বেচবার আর কি কারণ থাক্তে পারে?
জ্যোতির্ম্ময়।
কারণ—কারণ—না, না, ক্ষমা কোরবেন, এর কারণ আমি বোল্তে পার্বো না।
রূপচাঁদ।
(ছবিখানি অভিনিবেশ সহকারে দেখিতে দেখিতে) তাইত! বোধ হচ্চে এ মুখখানা কোথায় দেখিছি। রস, রস, (স্মরণ করিতে চেষ্টা) হাঁ, হাঁ, মনে পোড়েছে! গত সোমবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে একে বেড়াতে দেখিছি। তখন তারাচাঁদ আমার সঙ্গে ছিল, সে বল্লে, মেয়েটি লাহোরের এড্ভোকেট মিঃ মজুমদারের মেয়ে। সে নাকি তার মামার কাছ থেকে অনেক টাকার সম্পত্তি পেয়েছে। কি বল, জ্যোতির্ম্ময়, এখানা সেই মেয়েটির ছবি নয়?
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ—আঁ—কিন্তু মিস মজুমদার ত কোন সম্পত্তি পাননি। সম্পত্তি পাওয়া দূরে থাকুক, অবস্থা ভাল নয় বোলে তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুর পর এক মাসীর আশ্রয়ে থাক্তে বাধ্য হোয়েছেন। আমার বোধ হয় আপনার এ সংবাদ ঠিক নয়।
রূপচাঁদ।
না হে না, তারাচাঁদ কি আর না জেনে বোলেচে? সে হোচ্ছে সহরের গেজেট—দুনিয়ার সব খবর সে রাখে। বিশেষতঃ মিষ্টার মজুমদার তার অপরিচিত নয়—তার শালার সঙ্গে মিষ্টার মজুমদারের কি একটা সম্পর্ক ছিল। তা যাক্,—সে বিষয় পা’ক্ আর না পাক্, বর্ত্তমান বিষয়ের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। আমি এ ছবিটার দাম ছ’শ টাকা দিতে পারি—কেমন রাজী?
জ্যোতির্ম্ময়।
আজ্ঞে না, মাপ কোরবেন—আমি ত বোলেছি এ ছবি আমি বেচ্ব না—আপনি আর যেখানা খুসি নিতে পারেন।
রূপচাঁদ।
আর আমিও ত বোলেছি—আমার আর কোন ছবি চাই না। (উঠিয়া দরজার দিকে অগ্রসর হইলেন; যাইতে যাইতে ফিরিয়া) ন’শ টাকা দেব—দেখ ভেবে দেখ।
জ্যোতির্ম্ময়।
না—হাজার টাকা দিলেও নয়। আমি এ ছবিখানা ম’রে গেলেও বেচ্বোনা। এখানা আমি নিজের তৃপ্তির জন্য এঁকেছি―এ সখের জিনিষ আমি আর কাউকে দিতে পারি না।
রূপচাঁদ।
ওঃ তোমার মাথার ভেতর এমন সব lofty idea ঢুকেছে তা’ত জানতুম না। আমি মনে ক’র্তুম, তুমি কেবল বিক্রীর জন্য ছবি আঁক—সখ মেটাবার জন্য নয়। আচ্ছা, এখন আমি চল্লুম। এ ছবি সম্বন্ধে তোমার মনোভাবের যদি কখন পরিবর্ত্তন হয় আমাকে খবর দিতে ভুলনা। আমার হাজার টাকা পর্য্যন্ত offer রইল। (প্রস্থান)
হরেন।
(রাজার পশ্চাতে দরজা পর্য্যন্ত গেল। তিনি চলিয়া যাইবার পর ফিরিয়া আসিয়া) দেখ জ্যোতি, ঢের ঢের মূর্খ গর্দ্দভ দেখিছি, কিন্তু এই তোমার মত প্রকাণ্ড সোঁদর গাধা বেকুব idiot দুনিয়ায় দেখিনি। তোমার এই অবস্থা—কাল কি খাবে ঠিক নেই—আর তুমি স্বচ্ছন্দে এই handsome offer-টা refuse কোর্লে? রাজা কেবল জেদের বশে এত টাকা দিতে চাইলে বৈ ত নয়! আর কেউ কি এর অর্দ্ধেকও দেবে মনে কোরেচ? তোমার মাথায় এ দুর্ব্বদ্ধি কে ঢোকালে?
জ্যোতির্ম্ময়।
(উত্তেজিত ভাবে) চুপ কর, হরেন। ও সব কথায় কান দেবার সময় এখন আমার নেই। only think, she is here! সে এখানে—এত কাছে! কিন্তু (দীর্ঘ নিঃশ্বাস) এত দূরে!
হরেন।
তোমার ভাব ভঙ্গীটা দেখছি ক্রমেই mysterious রকম হোয়ে দাঁড়াচ্ছে! তুমি কার কথা বোল্চ?
জ্যোতির্ম্ময়।
বিজলী—মিস্ মজুমদার—যাঁর এই ছবি! (ছবির কাছে গিয়া) এই ছবি!—এই ছবি আমি ছাড়্ব? I would as soon part with my soul.
হরেন।
ওঃ তাই বল! ইনিই তোমার সেই celestial গোয়ালিনী—your enchantress! তা ভাল—তুমি উচ্ছাসটা একটু দমন কোরে, ব্যাপারটা কি খুলে বল দেখি! Come to sober facts, my lad.
জ্যোতির্ম্ময়।
গত বৎসর কাশ্মীরে যাই, কতকগুলো landscape আঁকবার চেষ্টায়। সেই সময় বিজলীও লাহোর থেকে সেখানে বেড়াতে গেছ্ল। একদিন আমি ঝিলাম নদীর ধারে একটা ছবি আঁক্ছি, এমন সময় সে বেড়াতে বেড়াতে সেখানে এল, আর একদৃষ্টে আমার ছবি আঁকা দেখ্তে লাগ্ল। এ অবস্থায় বুঝ্তেই পাচ্চ, আমার মনটা ছবির দিকে বেশীক্ষণ লেগে থাক্তে পার্লে না—তার সঙ্গে আলাপ করবার একটা প্রবল বাসনা মনে জেগে উঠ্ল। আর অপর পক্ষ তাতে আপত্তি না করাতে সে ইচ্ছা পূরণেরও বেশী বিলম্ব হোলোনা। কিন্তু সেই সঙ্গে আমি আপনাকে হারিয়ে ফেললুম!
হরেন।
অর্থাৎ নবেল নাটকে যাকে বলে, love at first sight! কিন্তু অপর পক্ষের ভাবটা কি বুঝ্লে?
জ্যোতির্ম্ময়।
তার চোখেও অনুরাগের লক্ষণ দেখেছিলুম, কিন্তু সে অনুরাগটা আমার প্রতি কি রাজা রূপচাঁদের প্রতি—তা ঠিক বোল্তে পারি না।
হরেন।
সে কি রকম! Mystery-টা যে ক্রমেই ঘনীভূত হোয়ে আস্ছে! তাগ কোর্লে হ’রেকে আর লাগ্ল গিয়ে শঙ্করাকে? দেখ্লে তোমায়, আর অনুরাগটা জন্মাল রাজা রূপচাঁদের উপর? এমন ব্যাপারটা আরব্য উপন্যাসেও পড়েছি বোলে ত মনে হচ্চে না! রাজা রূপচাঁদও কি হঠাৎ সেই সময় তাঁর সূক্ষ্ম শরীর নিয়ে সেখানে উপস্থিত হোয়েছিলেন না কি?
জ্যোতির্ম্ময়।
না—সে কখন রাজাকে দেখেনি—তার নাম পর্য্যন্ত পূর্ব্বে শোনে নি। রাজার সঙ্গে যে তার পরিচয় ছিল না, তা’ত রাজার কথাতেই বুঝ্লে!
হরেন।
তথাপি এই অনুরাগ! এ যে দেখ্ছি “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো”রও উপর এক কাটি!
জ্যোতির্ম্ময়।
আহা শোনই না! রাজার এক বন্ধু আমার একখানা ছবি সম্বন্ধে enquiry কোরে রাজাকে চিঠি লেখেন। রাজা খামসুদ্ধ সেই চিঠি কাশ্মীরে আমার কাছে পাঠিয়ে দেন। চিঠিটা আমার ব্যাগের মধ্যেই ছিল, কিন্তু ছবি আঁকবার সময় আমি যখন ব্যাগ থেকে palette ও তুলিটুলি গুলো বার করি সেই সময় চিঠিটা আমার অজ্ঞাতসারে বাইরে পোড়ে যায়। ছবি আঁকবার পর ইজেল ও ব্যাগ নিয়ে আমি আমার houseboat-এর দিকে খানিকটা পথ গিয়েছি, এমন সময় দেখি বিজলী হাঁপাতে হাঁপাতে আমার দিকে ছুটে আস্ছে। তাকে দেখে আমি দাঁড়াতেই সে খামসুদ্ধ সেই চিঠিখানা আমার হাতে দিয়ে বোল্লে, “এখানা বোধ হয় আপনারই চিঠি?” আমি ‘হাঁ’ বোলে ধন্যবাদ দিয়ে তার কাছ থেকে চিঠিখানা নিলুম। সে তাইতেই ঠাউরে নিলে, আমার নাম রাজা রূপচাঁদ রায়। সে খামের উপর অবশ্য রাজারই নাম লেখা ছিল।
হরেন।
তুমি আর বুঝি তখন তার এ ভুলটা ভেঙ্গে দেবার চেষ্টা কোর্লে না?
জ্যোতির্ম্ময়।
না ভাই, তখন আমার কুবুদ্ধি হোয়েছিল—ভাবলুম I would take a rise out of her! অত বড় পরিচয়ে তার কাছ থেকে কেমন খাতির পাওয়া যায় তাই দেখ্বার জন্য একটা দুর্দ্দমনীয় লোভ হ’ল। ফলও হাতে হাতে পাওয়া গেল। যখন সে আমাকে একজন real live রাজা বোলে ঠাউরে নিলে তখন যেন আমি স্পষ্ট দেখ্তে পেলুম যে তার estimation-এ আমি বহু ঊর্দ্ধে স্থান পেয়েছি। তার পরদিনই তাদের বাসাতে নিমন্ত্রণ পেলুম।
হরেন।
এবং তার ফলে তুমি সেই চিরন্তন অতনু দেবতার সূক্ষ্মজালে একেবারে hopelessly জড়িয়ে পোড়্লে?—কেমন?
জ্যোতির্ম্ময়।
Exactly—এমন জড়িয়ে বোধ হয় আর কেউ কখন পড়েনি।
হরেন।
বিজলীর ভুলটা বুঝি বরাবরই বজায় রোয়ে গেল? সেটা শুধ্রে দিতে বুঝি আর তোমার অবসর হোয়ে উঠ্ল না?
জ্যোতির্ম্ময়।
কি করি ভাই? তার পর যতবার তার সঙ্গে দেখা হোয়েছে প্রতিবারই ভেবেছি ভুলটা ভেঙ্গে দি, কিন্তু সাহসে কুলোত না। কোথায় শ্রীল শ্রীযুক্ত রাজা রূপচাঁদ রায় বাহাদুর—আর কোথায় “অদ্য ভক্ষ্যো ধনুর্গুর্ণ” আর্টিষ্ট জ্যোতির্ম্ময়! তার হৃদয় দেবতার এত বড় পতন কি সে সহ্য কোর্তে পারত? না এ মর্ম্মভেদী tragedyর স্রষ্টা আমাকে সে কখন ক্ষমা কোর্ত? আমার কেবলই ভয় হোত যে সত্য কথা জানতে পার্লেই আমার প্রতি তার সেই স্বর্গীয় ভালবাসা মুহূর্ত্ত মধ্যে তীব্র ঘৃণাবিষে পরিণত হবে! সুতরাং—
[ রামচন্দ্রের প্রবেশ ]
রামচন্দ্র।
মুদি এসেছে।
জ্যোতির্ম্ময়।
Oh, bother the মুদি! এখন ওকে চুলোয় যেতে বল—বুঝ্লে রামচন্দ্র, বেশ গরমে ও আরামে থাক্বে।
রামচন্দ্র।
আজ্ঞে ও বোল্চে ও মাসে যে টাকাটা বাকী আছে সেটা আজ ফেলে দিতে। সে বেশী টাকা নয়।
জ্যোতির্ম্ময়।
বেশী টাকা নয়? আচ্ছা বেশ, ওকে জিজ্ঞাসা কর যে একশ’ টাকার নোটের ভাঙ্গানি ওর কাছে আছে কিনা।
[ রামচন্দ্রের প্রস্থান ]
হরেন।
কতদিন দেখা সাক্ষাৎ হোয়েছিল?
জ্যোতির্ম্ময়।
বেশী দিন নয়—দিন পনের মাত্র।
হরেন।
তারপর তাঁরা বুঝি সেখান থেকে চ’লে গেলেন?
জ্যোতির্ম্ময়।
না, আমিই পালিয়ে এলুম।
হরেন।
কারণ?
[ রামচন্দ্রের প্রবেশ ]
রামচন্দ্র।
মুদি বোল্লে, অত বড় নোটের ভাঙ্গানি তার কাছে নেই।
জ্যোতির্ম্ময়।
ভাঙ্গানি সঙ্গে না নিয়ে তাগাদা কোর্তে আসে কেন? যাও বলগে আমার কাছে এখন খুচরো টাকা মোটেই নেই। (স্বগতঃ) কথাটা সত্যি। (প্রকাশ্যে) হাঁ, তোমাকে যে চা আন্তে বোলেছিলুম তার কি হ’ল?
রামচন্দ্র।
আজ্ঞে—
হরেন।
না রামচন্দ্র, তুমি যাও। আমি এখন চা খাবো না।
জ্যোতির্ম্ময়।
অর্থাৎ বুঝ্তে পেরেছ যে আমার ঘরে চা নেই। হাঁ—জিজ্ঞাসা কোর্ছিলে কেন পালিয়ে এলুম? পালাবার ইচ্ছা আমার মোটেই ছিল না, কিন্তু অবস্থাটা ক্রমে অসহ্য হোয়ে পড়াতেই আর থাক্তে পার্লুম না—
হরেন।
কেন নিমন্ত্রণগুলো খেয়ে অসুখ কোরেছিল নাকি? অবশ্য সেটা আশ্চর্য্যের বিষয় নয়—একেবারে genuine জাফরান দিয়ে তৈরী কাশ্মীরী পোলাও!
জ্যোতির্ম্ময়।
ঠাট্টা নয় ভাই, তুমি ভেবে দেখ আমার তখন কি শোচনীয় অবস্থা! আমার উপর বিজলীর আদর যত্ন ভালবাসা যতই বর্ষিত হোতে লাগ্ল, ততই আমার প্রাণটা একদিকে যেমন সুখের সাগরে সাঁতার কাট্তে লাগ্ল, অন্যদিকে তেমনই দারুণ ঈর্ষ্যানলে দগ্ধ হোতে লাগ্ল!―আমার মনে হোত সে ভালবাসা রাজা রূপচাঁদকেই দেওয়া হচ্চে—আমাকে নয়।
হরেন।
বুঝেছি, তোমার অবস্থাটা রবিবাবুর চিত্রাঙ্গদার মত হোয়ে দাঁড়িয়েছিল।
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ অনেকটা সেই রকমই বটে। ছদ্মনামের আবরণে নিজেকে ঢাক্তে গিয়ে আমি যে আমার নিজের মধ্যে এক ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি কোরে ফেলেচি, সেটা আমি মর্ম্মে মর্ম্মে অনুভব কোর্তে লাগ্লুম—বোধ হ’ল যেন সেই নামটা ভূতের মত আমার ঘাড়ে চেপে বিজলীর সব ভালবাসা গ্রাস কোর্চে! Shakespeare বলেন,—What’s in a name? নামে কি আসে যায়? ভুল—মহাভুল! কবি যদি আমার অবস্থায় পোড়্তেন তা হোলে কখন তাঁর মুখ থেকে এ কথা বেরুত না—তখন বৈষ্ণবদের মত নাম-মাহাত্ম্য কীর্ত্তনে তিনি শতমুখ হোতেন!
হরেন।
বিজলী কি একা কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিল?
জ্যোতির্ম্ময়।
না। তার যে অভিভাবিকা মাসীর কথা রাজাকে বোল্ছিলেম, সেই মাসী তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বিজলীর মামার খুড়তুত ভগিনী—নাম কঙ্কাবতী কাঞ্জিলাল। তিনি ডাক্তার—বার্লিনের M. D. এবং সে জন্য কিঞ্চিৎ গর্ব্বিতা। তিনি একটা বাতের ওষুধ আবিষ্কার কোরেচেন, সেইটে আমার উপর প্রয়োগ করবার জন্য বিশেষ চেষ্টিতা ছিলেন—ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছি।
হরেন।
তিনি কি তোমাদের এই প্রণয় ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছিলেন?
জ্যোতির্ম্ময়।
খুব বেশী রকম। শিক্ষিতাই হ’ন্ বা অশিক্ষিতাই হ’ন্—কথামালা পাঠিকাই হ’ন্ বা জার্ম্মান্ এম্, ডিই হ’ন্—রাজার শাশুড়ী হোতে কার অনিচ্ছা বল? সুতরাং তিনি আমাদের পরস্পরের মধ্যে আলাপের যথেষ্ট সুবিধা ক’রে দিয়েছিলেন। সেই সময়ই আমি এই ছবি আঁকি।
হরেন।
তুমি কি তাঁর কাছে বিবাহের প্রস্তাব কোরেছিলে?
জ্যোতির্ম্ময়।
না—সে দোর যে আমি নিজেই বন্ধ কোরে দিয়েছিলুম। বিয়ের প্রস্তাব কোর্তে হোলেই ত আমাকে confess কোর্তে হোত যে, আমি রাজা নই, পরন্তু একজন পথের ভিখারী ছবিওলা মাত্র।
হরেন।
বিজলী যদি সত্যই মামার বিষয় পেয়ে থাকে, তা হোলে টাকার উপর তার লোভ না থাকাই সম্ভব। সে বোধ হয় এখন মনের মত ভিখারী পেলে গলায় মালা দিতে আপত্তি কোর্বে না। আমার বিশ্বাস সে আশা তুমি কোর্তে পার।
জ্যোতির্ম্ময়।
আশা চুলোয় যাক্, তার বিষয় প্রাপ্তির কথা শুনে আমার নৈরাশ্যের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। বোধ হোচ্চে যেন সে এখন আমার নাগাল ছাড়িয়ে বহু উর্দ্ধে চোলে গেছে। সে যেন সুধাকরোজ্জ্বল দেবলোকে, আর আমি যেন ঘোর তমসাচ্ছন্ন প্রেতলোকে! আমার মনে হোচ্চে যেন এই ছবি এখন আমার দিকে চেয়ে বিদ্রূপের হাসি হাস্ছে। কিন্তু তাতেও আমার সুখ! It is all that is left to me of the romance of my life! এই আমার জীবনের শেষ সম্বলটুকু কিনা রাজা রূপচাঁদ কেড়ে নিতে চায়!
হরেন।
না—দেখ্চি তুমি হতাশ প্রণয়ের এক ঘোর কাল পর্দ্দা সৃষ্টি কোরে তোমার জীবনটা সত্যি অন্ধকারময় কোরে তোলবার জন্য কৃতসংকল্প হোয়েচ। এখন চল, একটু বাইরে বেড়িয়ে আসি। এখানে বোসে এই দেবীর ধ্যানে নিযুক্ত থাক্লে অন্ধকার বাড়্বে বৈ কম্বে না। প্রেতও অন্ধকার ভাল বাসে না—মুক্তির জন্য ছুটোছুটি করে।
জ্যোতির্ম্ময়।
বাইরেই বা আলো পাবার প্রত্যাশা কোথায়? সেখানে সব দাঁড়িয়ে আছে “পাওনাদার দুর্দ্দান্ত”। বেরোলেই একেবারে solid phalanx-এ ঘিরে দাঁড়াবে। আলোর সাধ্য কি যে সে বেড়াজাল ভেদ কোরে প্রবেশ করে? আমার ঘরে বাইরে সমান অন্ধকার! মুক্তির পথ বোধ হয় শেষে ঐ লেকের গর্ভে খুঁজতে হবে।
[ নেপথ্যে গীত ]
হরেন।
ও গাইচে কে? চিন্তামণি খুড়ো না? পাগলার গান অনেক দিন শুনিনি। র’স, ডাকি ওকে। (উঠিয়া জানালার কাছে গিয়া চিন্তামণিকে আহ্বান, পরে জ্যোতির্ম্ময়ের দিকে ফিরিয়া) ভবিষ্যতের ভাবনা পরে ভাবা যাবে, এখন চিন্তামণি খুড়োর দু’ একটা গান শুনে অন্ততঃ বর্ত্তমানটা উপভোগ কর।
[ চিন্তামণির প্রবেশ ]
এই যে খুড়ো, আছ কেমন? অনেক দিন তোমায় দেখিনি। যাচ্ছিলে কোথায়?
চিন্তামণি।
বাজারের দিকে।
হরেন।
কেন, বাজারের দিকে কেন?
চিন্তামণি।
খুঁজ্তে।
হরেন।
খুঁজ্তে! কেন কাকে?
চিন্তামণি।
সেইটিই এখনও ঠিক হয় নি।
হরেন।
সে কি রকম?
চিন্তামণি।
ওর আর রকম ফের নেই বাবাজী। সবারই ঐ এক দশা। এই যে তোমরা এত বিদ্যের গরব কোরে থাক, তোমরা কি খোঁজ, তা কি জান? অথচ অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ানর ত কসুর নেই।
হরেন।
খুড়ো, তুমি ফিলসফার! কিন্তু তোমার ফিলসফি এর পরে শুন্ব, এখন একটা গান শুনিয়ে দাও।
চিন্তামণি।
কি গান শুন্বে?
হরেন।
একটা প্রেমের গান। কি বল জ্যোতি? নৈলে তোমার মত প্রেমিকের ভাল লাগ্বে কেন?
চিন্তামণি।
বটে! বাবাজীরও বুঝি আমার মত “খুঁজি খুঁজি নারি” অবস্থা?
জ্যোতির্ম্ময়।
ও কথা শোন কেন, খুড়ো? তোমার যা প্রাণ চায়, গাও।
চিন্তামণি।
প্রাণের আবদার শুন্তে গিয়েই ত গোল লেগে গিয়েছে বাবাজী! সে যা চায় তার ত নাগাল পাই না!
(চিন্তামণির গীত)
ওগো ধরা দিতে এসে দূরে সরে যায়!
যেমন ধরিতে যাই অমনই পালায়!
এই দেখি কাছে আছে—ফিরে দেখি দূরে গেছে—
আড়াল থেকে গোপন সুরে বাঁশিটি বাজায়।
শুনিয়ে তাহার স্বর—ছুটে আসি ছেড়ে ঘর
অমনি সে নিঠুর শঠ কোথায় লুকায়!
ওগো কোথা গেলে পাব তারে বলগো আমায়!
হরেন।
শুন্লে ত জ্যোতি, প্রেমিকের কি কর্ম্ম ভোগ! জানে নাগাল পাবে না, তবু ছুট্বে!
চিন্তামণি।
ঐ ছোটাতেই ত সুখ বাবাজী! পেলেত সবই ফুরিয়ে গেল! বিরহ ছাড়া বৃন্দাবন ত মরুভূমি!—মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই, ছায়া নেই—কেবলই আলো, কেবলই রোদ্দুর! বাপ্! আঁধার আছে বোলেই না আলোর এত কদর! শুন্তে পাই আঁধারেই আলোর জন্ম! (জ্যোতির্ম্ময়ের প্রতি) মুস্ড়ে পোড়োনা বাবাজী,—আলো চাও, আঁধারে ঝাঁপিয়ে পড়।
(চিন্তামণির গীত)
ঐ লুকিয়ে আলো আঁধার পারে।—
দেখ্তে যদি চাওগো তারে, ধুয়ে ফেল নয়ন দুটি তপ্ত অশ্রুধারে।
ঘুচে গিয়ে ময়লা মাটি, প্রাণটা যখন হবে খাঁটি,
সে আস্বে তখন গুটি গুটি তোমার দুয়ারে।
ডোরোনাক দেখে আঁধার
ঝাঁপিয়ে প’ড়ে দাওগো সাঁতার—
বীরের লভ্য পায়না ভীরু জেন এই সংসারে।
দ্বিতীয় অঙ্ক
আলো
অবতরণিকা।
[ পুষ্পোদ্যান মধ্যে অলি ও ফুলকলি; আলোর প্রবেশ। ]
গীত।
আলো।— ফুলকলি তুই ঘোমটা খোল্
আমি এসেছি।
অন্ধকারে বন্ধ কেন
গন্ধ রেখেছিস্?
ফুলকলি।— মধুপের গুঞ্জরণে
বড় ভয় পাই যে মনে
কি জানি কেমন টানে
লুটে নেয় সব পরাণে
অলি।— পথ ভোলা এ পথিকে তুই
ভুল বুঝেছিস্।
আমি ভালবেসেছি
তোরি তরে সবটুকু প্রাণ লুটিয়ে দিয়েছি!
ফুলকলি।— অন্ধকারের ফাঁদে
মোর চিত্ত গুমরি কাঁদে
আলো।— ফেল্ ভেঙে ফেল্ পাতার বাঁধন
দেখ, দেখ্! চোখ মেলে।
অলি।— সখি, আকাশে বাতাসে নূতন আলো
চিত্ত রঙায়ে তোলে।
ফুলকলি।— তুমি কে গো
তুমি কে গো?—এলে—
কোন্ সাগরের উথল হাওয়ায়
কোন্ আকাশের লালিম লীলায়
কোন্ স্বপনের পরশ মায়ায়
চিত্তে দোলা দিলে?
আলো।— আমি আলো—
আমি আলো—
আমার পরশে রাঙায়ে পরাণ
ঘুচাও মনের কালো।
অলি।— সখি, মরম দুয়ার খোলো।
কলিকাতা—বৌবাজার—
“মুন্লাইট্” কোম্পানির আফিস।
[ রাস্তার ধারে দুইটি জানালা ও একটি দ্বার যুক্ত ঘর। ঘরের ভিতর একটি জানালার ধারে একটি ছোট সেক্রেটেরিয়েট্ টেবিল ও দুইখানি চেয়ার। অপর জানালার ধারে একটি ডেস্ক্ ও একটি জীর্ণ বেণ্ট্উড্ চেয়ার। টেবিল ও ডেস্কের উপর খাতা কাগজ পত্র ফাইল ও লিখিবার সাজ সরঞ্জাম। দেওয়ালে নানাবিধ অ্যালম্যানাক্ ঝুলিতেছে, একদিকে একটা হ্যাটপেগ্ আঁটা আছে। বেণ্ট্উড্ চেয়ারে বসিয়া রোহিণী শ্রীমানি লিখিতেছে ও নানাবিধ মুখভঙ্গী করিতেছে। ]
চন্দ্র।
(হ্যাটপেগে হ্যাট রাখিয়া) Well রোহিণী! চিঠি পত্র টেলিগ্রাম কিছু পেয়েছ? নতুন কোন order বা enquiry? (চেয়ারে উপবেশন)
রোহিণী।
আজ্ঞে—না সার্।
চন্দ্র।
ল্যান্স্ডাউন্ রোডের বাড়ীটার জন্য কোন enquiry আসে নি? এ বাড়ীটার একটা ভাড়াটে জুটিয়ে দিতে পার্লে একটা মোটা রকমের কমিশন পাওয়া যাবে। সুতরাং ওটার জন্য একটু বিশেষ চেষ্টার দরকার। (রোহিণীকে অন্যমনস্ক ভাবে লিখিতে ব্যস্ত দেখিয়া) রোহিণী! (উচ্চতর স্বরে) রোহিণী!
রোহিণী।
(চম্কাইয়া উঠিয়া)—ইয়েস্ সার্!
চন্দ্র।
তুমি কালা নাকি?
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্—আজ্ঞে না সার্—এই চিঠিখানা লিখ্তে—
চন্দ্র।
না—না—ওরকম অন্যমনস্ক হোলে চোল্বে না। এখানে নাক কান চোখ্ সর্ব্বদা সজাগ রাখা চাই। লোককে আলো দেওয়া আমাদের কাজ—নিজে চোখ কান বুজে থাক্লে পরের চোখ কান ফোটাবে কি কোরে? আচ্ছা, দেখত আমাদের হাতে এখন কতগুলো বাড়ী আছে?
রোহিণী।
(খাতা দেখিয়া) ইয়েস সার্—৪৯টা ভাড়ার জন্য, আর ২১টা বিক্রীর জন্য।
চন্দ্র।
Dear me! এতগুলো বাড়ীর একটারও ভাড়াটে কি খদ্দের জুট্লনা? Landboom-এর পর থেকে দেখ্চি মার্কেটটা একেবারে dull হোয়ে পোড়েছে। বালিগঞ্জে জ্যোতির্ম্ময়ের বাড়ীটার জন্য একটা ভাড়াটে এই মাসের মধ্যে জোগাড় কোরে দিতে না পার্লে বোধ হয় ওটা সেলে উঠ্বে। কিন্তু কি করি? এ মার্কেটে অত বেশী ভাড়ার বাড়ীর ভাড়াটে যে সহজে জুট্বে এমন ত বোধ হয় না! নাঃ—দেখ্চি house agencyর চেয়ে অন্য লাইনগুলোতে বেশী ঝোঁক দিতে হবে—নৈলে ব্যবসা চলা দুষ্কর হবে। হাঁ—তোমাকে দরজায় আঁট্বার জন্য যে ইংরেজী আর বাংলা প্ল্যাকার্ড্টা লিখে দিয়ে গেছ্লুম তা কপি করা হোয়েছে?
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্—লাল ও কাল কালি দিয়ে যেমন কোরে সাজিয়ে লিখ্তে বোলেছিলেন সেই রকম কোরে লিখে রেখেছি। দেখ্বেন কি?
চন্দ্র।
হাঁ দেখ্চি। যে হ্যাণ্ডবিল আর advertisement গুলো কপি কোর্তে দিয়েছিলুম সে গুলো কপি কোরে আজই প্রেসে দিয়ে আস্বে। সব কাজ ফেলে এ কাজটা আগে করা চাই, কারণ আজ কাল advertisement ছাড়া ব্যবসা এক পা চোল্তে পারে না। Expensive হোলেও it pays in the end—at least it ought to pay। সেক্সপিয়ার লিখেছেন, “sweet are the uses of adversity;” এখন বেঁচে থাকলে তিনি এটা সংশোধন কোরে লিখ্তেন, “sweet are the uses of advertisement”—বিশেষতঃ আমার মত ব্যবসার পক্ষে! আমার capital বল, stock in trade বল, সবই ঐ advertisement.—হাঁ—ভাল কথা—সমুদ্র থেকে চাঁদ ওঠার ছবির ব্লকটা কতদূর হোল?
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্, কাল সেটা দিয়ে যাবার কথা ছিল।
চন্দ্র।
আজও দেয় নি! মিস্ত্রি classটাই ঐ রকম। তুমি বাড়ী ফেবার সময় তাকে একবার তাড়া দিয়ে যাবে—বুঝ্লে? এখন প্ল্যাকার্ড্ দুটো নিয়ে এস, দেখি কেমন হোয়েছে। (রোহিণী প্ল্যাকার্ড আনিল) প্রথমে ইংরেজিটা পড়।
[রোহিণী নিম্নলিখিত ইংরেজী প্ল্যাকার্ড্ সুর করিয়া পড়িতে লাগিল এবং সেই সময় নিজের রচনা কৌশলে বিশেষ মুগ্ধ হইয়াছে এইরূপ ভাব চন্দ্রের মুখে প্রকটিত হইল]
Moonlight.
Gives Light in the Darkest Night!!
None can do without him!!
চন্দ্র।
Excellent! আচ্ছা, এইবার বাংলাটা পড়।
[রোহিণী পূর্ব্বোক্ত ভাবে নিম্নলিখিত বাংলা প্ল্যাকার্ড্ পড়িতে লাগিল। পাঠকালে চন্দ্র নিজ রচনা কৌশলে পূর্ব্ববৎ বিমুগ্ধ]
মুন্লাইট্
পথহারার সাথি, আঁধার ঘরের বাতি
বিষাদ-মাখা হতাশ প্রাণে ফোটায় আশার ভাতি!
কি চান আপনি?
কর্তে চান জীবন বীমা? টাকা ধার? পাওনা আদায়? কিন্তে বেচ্তে?—আসুন এখানে।
চাই ঘর বাড়ী আসবাবপত্র? আসুন এখানে।
দাস দাসী, মাষ্টার মাষ্টার্নী, নার্স্ ধাই, গবর্ণেস্, স্বামী, স্ত্রী, বধু, জামাতা, শ্যালক শ্যালিকা, পোষ্যপুত্র—কি চাই? আসুন এখানে। মুন্লাইট্ জানে সব, বোঝে সব, শোনে সব, পারে সব!
সে জ্ঞানের খনি—শত্রুর শনি—অন্ধের নয়নমণি—বিপদ সিন্ধুর তরণী!!
সে নিরুপায়ের উপায়—তারে ছেড়ে থাকা দায়—অতএব এস যে আছ যথায়—
এই মুন্লাইট্ মন্দিরে!!!
চন্দ্র।
বাঃ—লেখা সুন্দর হোয়েছে। It ought to draw a good many fish into the net! এ বেড়াজাল এড়িয়ে যাবার জো কি! বুঝ্লে, রোহিনী, advertisement লেখা একটা আর্ট! এদেশের লোকেরা এ আর্টটা এখনও ভাল কোরে শেখেনি। Advertisement draft করবার কথাটাও এর সঙ্গে জুড়ে দিলে মন্দ হোতনা। শেষ লাইনে কটা note of admiration দেওয়া হোয়েছে?
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্, তিনটে।
চন্দ্র।
বোধ হয় চার্টে দিলে, আরও বেশী মজবুত হোত। যাক্, এখন আর দেরী কোরে কাজ নেই, তুমি এখনই দরজার দু’ধারে এ দু’খানা এঁটে দিয়ে এস।
[রোহিণী দরজায় প্ল্যাকার্ড্ আঁটিতে গেল। চন্দ্র একখানা খাতা উল্টাইতে লাগিল ও মধ্যে মধ্যে জানালা দিয়া রাস্তার দিকে দেখিতে লাগিল। কিয়ৎক্ষণ পরে রোহিণী ফিরিয়া আসিল]
চন্দ্র।
তুমি যখন প্ল্যাকার্ড্টা আঁট্ছিলে, তখন ও ফুটপাথ থেকে একজন মেম সাহেব এই দিকে চেয়ে দেখ্ছিল। বোধ হয় সে খুব impressed হোয়েছে—কি বল?
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্, দেখিছি। তার কুকুরটা এ ফুটপাথে আমাদের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিল কি না, তাই সে—
চন্দ্র।
(তীব্র ভাবে) কুকুর—কি বোল্চো? তুমি কিচ্ছু দেখনি। ব’স, তোমার কাজ কর।
[রোহিণী অগ্রভিত হইয়া বসিল, কিন্তু একটু পরেই রাস্তার দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িল।]
রোহিণী।
সার্ সার্!
চন্দ্র।
কি? কি?
রোহিণী।
টু—টু—লেডী—one young, one fat—দরজার কাছে দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে প্ল্যাকার্ড্টা প’ড়্ছেন। খুব impressed হায়েছেন নিশ্চয়ই। বোধ হয় এখনই এখানে আস্বেন।
চন্দ্র।
(উঠিয়া দেখিয়া) তাইত! তুমি ব’স— আমি গিয়ে ওঁদের ডেকে আনি, নৈলে হয় ত প্ল্যাকার্ড্ পড়েই চোলে যাবেন। তুমি খুব গম্ভীর ও ব্যস্ত ভাব দেখিও। (দরজার কাছে গিয়া মহিলাদ্বয়ের উদ্দেশ্যে) আপনারা কি অনুগ্রহ কোরে ভেতরে আস্বেন? আপনারা বোধ হয় কোন প্রয়োজনে এখানে এসেছেন?
[মিস্ কঙ্কাবতী কাঞ্জিলাল ও মিস্ বিজলী মজুমদারের প্রবেশ। চন্দ্র তাঁহাদিগকে চেয়ার দু’খানি আগাইয়া দিয়া নিজে দাড়াইয়া রহিল]
চন্দ্র।
বলুন, আপনাদের জন্য আমি কি কোর্তে পারি?
কঙ্কাবতী।
আমরা একটা বাড়ী খুঁজ্চি। বাড়ীটা খুব ভাল ভদ্র quarter-এ হওয়া চাই—যেখানে একজন ভাল lady doctor-এর প্র্যাক্টিসের সুবিধা হোতে পারে। এ ফার্মের প্রোপ্রাইটার্ কে? আমি তাঁর সঙ্গে দেখা কোর্তে চাই।
চন্দ্র।
আজ্ঞে এই অধীনই এখানকার প্রোপ্রাইটার্। আর এই gentlemanটি general manager. [রোহিণী উচ্চপদোচিত গম্ভীরভাব ধারণের চেষ্টা করিল]
কঙ্কাবতী।
ওঃ আপনি প্রোপ্রাইটার? তা এ ফার্মের নাম Moonlight হোল কেন? Sunlight সাবান আছে জানি—আপনি কি তারই imitationএ মুন্লাইট্ নাম দিয়েছেন?
চন্দ্র।
আজ্ঞে, এ নাম কারো নকল নয়—সম্পূর্ণ original—একেবারে আদি ও অকৃত্রিম। এ নামের পেছনে হিস্ট্রি, ফিলসফি, পোইট্রি—সবই আছে। প্রথমতঃ, অধীনের নাম চন্দ্রপ্রকাশ চম্পটি। ‘চন্দ্রপ্রকাশ’ নামটি অবশ্য আমার বাপ মা দিয়েছিলেন, কিন্তু বিধাতার হাত এতে স্পষ্ট দেখা যায়। কারণ, বাবা মা ত আর জান্তেন না যে ভবিষ্যতে আমি এমন একটা ফার্ম খুল্বো যার কাজ হবে পথহারা লোকেদের সাম্নে আলো ধরা। তা ছাড়া ‘মুন্লাইট’ নামটা—‘সান্লাইট’ নামের চেয়ে বেশী appropriate—কারণ রাত্রে যখন সূর্য্যের আলো নিবে যায়, পৃথিবী ঘোর আঁধারে ডুবে যায়, তখন সেই অন্ধকারের পর্দ্দা ভেদ্ কোরে আলো ফোটায় চন্দ্র! তেমনই মানুষের যখন আশাদীপ নিবে যায়, সমস্ত জীবনটা অন্ধকারময় হোয়ে পড়ে, তখন আমাদের মুন্লাইট আবার আশার বাতি জ্বেলে তার মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে। গৃহহীন কে গৃহ, গৃহিণীহীনকে গৃহিণী, স্বামিহীনাকে স্বামী, সন্তানহীনকে সন্তান, জামাতৃহীনকে জামাতা,বধূহীনকে বধূ,শ্যালকহীনকে শ্যালক,শ্যালিকাহীনকে শ্যালিকা অনুসন্ধান কোরে দেওয়া আমাদের অন্যতম কাজ। আর এসব ব্যাপারের সঙ্গে যে love এবং poetry জড়িত থাকে তার সঙ্গে মুন্লাইটের সম্পর্কটা ত সৃষ্টির আদিকাল থেকে স্বীকৃত হোয়ে আস্চে। অতএব আমার ফার্মের নাম যে খুব সার্থক তা সকলেই স্বীকার কোর্বেন।
কঙ্কাবতী।
(সহাস্যে) হাঁ তা মান্তে হবে বৈ কি!
চন্দ্র।
এই নামের সার্থকতা বজায় রাখ্তে আমাদের বিস্তর ত্যাগস্বীকার কোর্তে হোয়েচে। এই ধরুন— আমাদের ম্যানেজার এই gentlemanটির নাম পূর্ব্বে ছিল নলিনী, কিন্তু সে নামটা moon-এর সঙ্গে antagonistic—বিরোধী—হয় বোলে আমি সে নাম বোদ্লে এঁর নাম রেখেছি “রোহিণী।” [রোহিণীর গম্ভীর ভাব ধারণ—যেন সে খুব স্বার্থত্যাগ করিয়াছে] এখন আপনি আমাদের নামের পরিচয় পেলেন, এইবার আমাদের কাজের পরিচয় গ্রহণ করুন। আপনারা কত টাকা ভাড়ার বাড়ী খুঁজ্চেন?
কঙ্কাবতী।
পছন্দ মত বাড়ী হোলে ভাড়ার জন্য আট্কাবেনা। আমি চাই একটা furnished house—কারণ আমরা বাইরে থেকে এসেছি, furniture আমাদের সঙ্গে নেই। বাড়ীটা খুব বড় না হোলেও চোল্বে, কিন্তু ফ্যাসানেব্ল্ হওয়া চাই। আর আস্বাব পত্র সেকেলে ধরণের হোলে চোল্বে না। আর ভাল localityর কথা ত পূর্ব্বেই বোলেছি।
চন্দ্র।
মিষ্টার শ্রীমানি, the house list! (রোহিণী একখানা খাতা দিলে খুব গম্ভীরভাবে তাহা উল্টাইতে উল্টাইতে) ল্যান্স্ডাউন্ রোড—না—হরিশ মুখার্জ্জি রোড—হাঁ—না—রাজা দীনেন্দ্র ষ্ট্রীট্—এইটে বোধ হয়—না—হাঁ হোয়েচে—এইটে ঠিক! (কঙ্কাবতীর প্রতি) দেখুন, আপনি যে রকম description দিলেন তাতে দেখ্ছি বালিগঞ্জের “লেকসাইড্ ভিলা”টাই আপনাকে ঠিক suit কোর্বে। যার বাড়ী তিনি furniture সুদ্ধই ভাড়া দেবেন। এমন artistic furniture সচরাচর দেখা যায় না, কারণ বাড়ীওলা একজন বড়দরের artist. তাঁর taste-এর সঙ্গে আপনাদের taste নিশ্চয়ই মিল্বে। আর localityর কথা? একেবারে যাকে বলে চমৎকার! It is simply delightful—delicious air, charming society, convenient roads, healthy neighbourhood—
কঙ্কাবতী।
কি বোল্লেন? Healthy?
চন্দ্র।
(সোৎসাহে) Most salubrious! এমন স্বাস্থ্যকর স্থান সহরে আর দু’টি নাই!
কঙ্কাবতী।
(উঠিয়া) তবে ও বাড়ী আমাদের একেবারেই চ’ল্বে না। বিজলী, আয়। আমার স্বাস্থ্যকর স্থানের দরকার নেই। আমি চাই এমন একটা জায়গা, where there is a lot of chronic gout and rheumatism flying about—যেখানে বাত ও স্নায়ু রোগের বীজাণুগুলো ছুটোছুটি কোর্ছে। এই সব রোগের জন্য আমি যে মহৌষধ আবিষ্কার কোরেছি, তার ফল আমি আমার প্রতিবেশীদের উপর প্রত্যক্ষ দেখিয়ে আমার প্র্যাক্টিস্ সুরু কোর্তে চাই।
চন্দ্র।
ঠিক ঠিক! আপনি ব্যস্ত হবেন না, বসুন, বসুন! আপনি যা খুঁজ্চেন ঠিক তাই পাবেন। আমার কথাটা এখনও শেষ হয়নি। স্থানটা স্বাস্থ্যকর আর সুবিধাজনক বোলেই মফঃস্বল থেকে অনেক রাজা মহারাজা জমিদার ওখানে এসে বাস কোর্চেন। আর জানেনইত gout rheumatism থেকে আরম্ভ কোরে যত রকম বাত কেতাবে লেখা আছে, সেই সবই ওঁদের পুরুষানুক্রমে chronic—একেবারে মৌরসী পাট্টা নিয়ে ব’সে আছে! কারো কারো রোগটা এত প্রবল যে তাঁরা একেবারেই অকর্ম্মণ্য হোয়ে পোড়েছেন—দুনিয়ার কোন কাজই তাঁরা কোর্তে পারেন না! আপনি ওখানে প্র্যাক্টিস্ আরম্ভ কোর্লেই তাঁরা একেবারে আপনাকে লুফে নেবেন। তারপর আপনার মহৌষধ খেয়ে দু’ একজন খাড়া হোলেই দেখ্বেন একেবারে হুড় হুড় কোরে যত বেতো রোগী ওখানে আমদানী হোতে থাক্বে, দেখ্তে দেখ্তে বালিগঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে একটি beautiful lunatic—I mean―rheumatic asylum আর ম্যাডাম হবেন সেই বিরাট বাতাশ্রমের ফ্লোরেন্স্ নাইটিঙ্গেল্―Lady with the Lamp!
বিজলী।
(সহসা উৎসুক ভাবে) আপনি কি এখানকার রাজা মহারাজাদের চেনেন?
চন্দ্র।
হাঁ, অনেককে জানি। তাঁদের মধ্যে দু’ চারজন আমার client আছেন।
বিজলী।
রাজা রূপচাঁদ রায়কে কি আপনি জানেন?
চন্দ্র।
হাঁ, জানি বৈ কি! তিনি আর্টের একজন মস্ত বড় পেট্রন্। সে দিন মেকেঞ্জি লায়েলের সেল থেকে একখানা পুরোণ ছবি আড়াই শো টাকা দিয়ে কিন্লেন। আমি হোলে তার কুড়ি টাকার বেশী দাম দিতুম না। ছবিখানা কিছুই নয়,—study of a Burmese flowergirl!
বিজলী।
হাঁ, আর্টের দিকে তাঁর খুব ঝোঁক আছে বটে। তিনি এখানে কোথায় থাকেন বোল্তে পারেন?
চন্দ্র।
এখানে ভবানীপুরে তাঁর বাড়ী। কিন্তু সকল সময় তিনি সহরে থাকেন না, মাঝে মাঝে মফঃস্বলে তাঁর জমিদারি দেখ্তে যান। (কঙ্কাবতীর প্রতি) ম্যাডাম, যদি ভবানীপুরে প্র্যাক্টিস্ extend করেন তা হোলে আপনার ওষুধ পরীক্ষার জন্য তাঁর মত উপযুক্ত পাত্র আর পাবেন না।
বিজলী।
(সোদ্বেগে) কেন তাঁর কি হোয়েছে?
চন্দ্র।
তিনি বাতরোগে অনেক দিন ভুগ্ছেন—চব্বিশ ঘণ্টাই তাঁর পায়ে ফ্ল্যানেল জড়ান থাকে। শুন্তে পাই ডাক্তারেরা নাকি বোলেছেন, ও বুড়ো বয়সের বাত আরাম হবার নয়।
বিজলী।
বুড়ো বয়স কি বোল্চেন! তাঁর বয়স ত্রিশের বেশী হোতেই পারে না।
চন্দ্র।
অবশ্য আমি তাঁর বয়স কত তা জানি না। তবে আমার আন্দাজ ছিল, তিনি পঞ্চাশ অনেক দিন পেরিয়েছেন। কিন্তু ম্যাডাম যখন ব’ল্ছেন তাঁর বয়স ত্রিশের বেশী নয়, তখন আমার সে কথার প্রতিবাদ করা উচিত নয়—কারণ বয়স সম্বন্ধে আপনাদের authority আমরা মান্তে বাধ্য। আর তা ছাড়া এত জানা কথা যে, বৎসর গুণে বয়সের হিসাব করা যায় না—সেটা অনুভূতির উপর নির্ভর করে—a man is as old as he feels! তা রাজা রূপচাঁদ কত বয়স অনুভব করেন তা কেমন কোরে জান্ব।
বিজলী।
থাক্, আর তাঁর বয়সের আলোচনায় দরকার নেই। আপনি তাঁর ঠিকানাটা, আর তিনি এখন এখানে আছেন কি না এই খবরটা কি আমাকে দিতে পারেন?
চন্দ্র।
Certainly—আপনি কালই সব খবর পাবেন। মিষ্টার শ্রীমানি, make a note of that!
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্। (একখানি খাতায় লিখিল)
বিজলী।
কিন্তু একটা কথা আছে। আমি যে তাঁর সম্বন্ধে খবর জান্তে চাচ্চি, এ কথা যেন তাঁকে না বলা হয়।
চন্দ্র।
(খুব গম্ভীর ভাবে) নিশ্চয়ই না। Not for the worlds! Professional man হ’য়ে কি আমি কখন বিশ্বাস ভঙ্গ করতে পারি? সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাক্তে পারেন।
বিজলী।
আমার এটা কৌতূহল মাত্র।
চন্দ্র।
ঠিক ঠিক। কৌতূহল ছাড়া আর কি হোতে পারে? I understand perfectly.
কঙ্কাবতী।
ও কথা এখন থাক্। বাড়ীটা কবে কখন দেখা যেতে পারে?
চন্দ্র।
যখনই মনে কোরবেন, তখনই। আজই পারেন।
বিজলী।
বাড়ীটা একজন আর্টিস্টের বোল্লেন না? ও বাড়ীতে কি তাঁর ষ্টুডিও আছে?
চন্দ্র।
এমন সুন্দর ষ্টুডিও অল্পই দেখা যায়! Excellent light, first rate position—
বিজলী।
মাসীমা, এ বাড়ীটা নিতেই হবে। আমার ভারি ইচ্ছে, একটু আর্টের চর্চ্চা করি। এমন ষ্টুডিও হাত ছাড়া করা হবে না।
কঙ্কাবতী।
তুই কি পাগল হলি বিজ্লী? কেবল একটা ষ্টুডিওর খাতিরে বাড়ীটা নিতে হবে? তোর আর্ট study কোর্তে সখ হোয়েছে, ভাল কথা। তার জন্য ষ্টুডিওর ভাবনা কি? সারা জগৎটাই একটা ষ্টুডিও। you can study art anywhere—পাহাড়ে জঙ্গলে নদীতে সমুদ্রে—যেখানে খুসি।
চন্দ্র।
ঠিক, ঠিক!
কঙ্কাবতী।
কিন্তু বাড়ীটা আমার profession-এর পক্ষে উপযুক্ত হবে কি না তা ঠিক কোর্তে হোলে বিস্তর কথা ভাব্তে হবে। এই ধরনা—প্রথমেই দেখ্তে হবে, বাড়ীটার দরজা—সেটা এমনভাবে তৈরী কিনা যাতে আমার নামের door-plateটা তা’তে মানায়। কারণ door-plate-এর attractionই হোচ্ছে প্রথম attraction—সেটা যদি যথার্থ artistic হয় তা হোলে সেইখানেই half the battle is won কি বলেন মিষ্টার চম্পটি? আমার name-plateটা কি সে বাড়ীর দরজায় মানাবে?
চন্দ্র।
চমৎকার মানাবে! বলেন ত আমি আজই একটা বেশ ভাল মানানসই artistic name-plate-এর order দিয়ে দি? মিটার শ্রীমানি, make a note of that. [রোহিণী “ইয়েস্ সার্” বলিয়া লিখিল] কি নাম door-plateএ লেখা থাক্বে?
কঙ্কাবতী।
এই আমার কার্ড (কার্ড্ প্রদান)।
চন্দ্র।
(কার্ড্ পড়িয়া) ডাক্তার মিস্ কঙ্কাবতী কাঞ্জিলাল, এম্, ডি, বার্লিন। বাঃ সুন্দর নাম ত! আপনার father নিশ্চয় একজন poet ছিলেন, নৈলে এমন fairytale জড়ান সুন্দর অনুপ্রাসযুক্ত গালভরা নাম কি যার তার মাথায় আসে? I can assure you, madam, it will create a sensation in a place like Ballygunge একে এই নাম, তার উপর ডিপ্লোমাটা made in খাস জার্ম্মানী! আপনি দেখ্বেন, দরজায় প্লেট্টা লাগাবামাত্র সমস্ত বালিগঞ্জ উত্তপ্ত ও উদ্বেজিত হোয়ে উঠ্বে! (রোহিণীকে কার্ড দিয়া) মিষ্টার শ্রীমানি, make a note of that. [রোহিণী “ইয়েস্ সার্” বলিয়। লিখিল]
কঙ্কাবতী।
হাঁ, আর একটি কথা! (হ্যাণ্ড-ব্যাগ হইতে একটি শিশি বাহির করিয়া) আমি এই ওষুধটার একটা পেটেণ্ট্ নিতে চাই। আমি যে মহৌষধের কথা বোল্ছিলেম এটা সেই ওষুধ। এখন nerve-soothing ওষুধ আর নেই! এটাকে Cure-all—সর্ব্বরোগহর—বোল্লেও অন্যায় হয় না, কারণ nerve ঠিক্ থাকলে কোন রোগই কাছে ঘেঁষ্তে পারে না। আমি এর নাম দিয়েছি Kankabati Sparks, কারণ electric spark-এর মত এর প্রত্যেক বিন্দু রোগীর মর্ম্মস্থলে প্রবেশ ক’রে এমনভাবে আঘাত কোর্তে থাকে যে রোগ একেবারে সমূলে উৎপাটিত হোয়ে যায়, আর সেই সঙ্গে একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ রোগীর সর্ব্বাঙ্গে খেল্তে থাকে এবং তার চোখে মুখে একটা স্বর্গীয় দীপ্তি ফুটে উঠে! সুতরাং এর Kankabati Sparks নামটা যে খুব সার্থক—এমন কি, মাপ কোর্বেন, আপনার ‘মুন্লাইট্’ নামের চেয়েও যে সার্থক হোয়েছে—একথা আপনি না স্বীকার কোর্লেও, প্রত্যেক sensible man স্বীকার কোর্বেন। আমি এই নামেই এটাকে পেটেণ্ট্ কোর্তে চাই।
চন্দ্র।
বেশত, আপনি কিছু ভাববেন না। আমি সব ঠিক কোরে দেব। Taking out patents is quite in my line. আমার চার্জ্জও বেশী নয়—পাঁচ পার্সেণ্ট্ মাত্র। (রোহিণীর স্কন্ধে সজোরে চপেটাঘাত করিয়া) মিষ্টার শ্রীনানি, make a note of that. [রোহিণী যন্ত্রণাব্যঞ্জক অস্ফুট ধ্বনিসহ আদেশ পালন করিল] আর দেখুন, আপনার বোধ হয়—বোধ হয় কেন?—নিশ্চয়—ওষুধটা advertise করা দরকার হবে। কারণ এ যুগে advertisementই হোচ্চে mass-এর হৃদয় কবাট উন্মুক্ত করবার একমাত্র open sesame! আপনি advertisement first, advertisement second, advertisement always—এই মূলমন্ত্র সার কোরে কার্য্যক্ষেত্রে অগ্রসর হোন্, দেখ্বেন আপনার successএ আপনি নিজেই আশ্চর্য্য হোয়ে যাবেন! এ ভারটাও আপনি আমাকে দিতে পারেন, কারণ I can bet আমি যেমন আপনার advertisement লিখে দিতে পারবো এমন আর কেউ পারবে না।
রোহিনী।
ইয়েস্ সার্!
কঙ্কাবতী।
বেশ, তাই হবে।
চন্দ্র।
Thanks. কিন্তু ভাল কোরে advertise কোর্তে হোলে প্রথমে কতকগুলো সার্টিফিকেট্ সংগ্রহ করা দরকার। সেজন্যও আপনাকে কষ্ট স্বীকার কোর্তে হবে না। আমি অনেক রকম দেশী বিলাতী ও নানা ষ্টাইলে লেখা সার্টিফিকেট্ সংগ্রহ কোরে রেখেছি, কেবল নাম ধাম বদ্লে নিলেই হবে। সার্টিফিকেট্ দেবার লোকের অবশ্য অভাব হবে না, কারণ যিনি সার্টিফিকেট্ দেবেন তাঁর নামটা প্রথমতঃ বিজ্ঞাপনপত্রে জাহির হবে, তাছাড়া দু’এক শিশি ঐ অমূল্য ওষুধও তিনি বিনামূল্যে পাবেন—বলুন ত এতে কার না লোভ হবে? এর উপর যদি বেছে বেছে দু’চারজনকার চেহারা ছাপিয়ে দিতে পারেন, তা হোলে দেখ্বেন biggest men― দেশের যাঁরা মাথা—তাঁরাও সার্টিফিকেট্ দেবার জন্য লোলুপ হোয়ে ছুটে আস্বেন! আমার সার্টিফিকেটের collectionটা একবার দেখ্বেন?
[উত্তেজিতভাবে এই কথা বলিয়া চন্দ্রপ্রকাশ সেক্রেটেরিয়েট্ টেবিলের টানাগুলি অনুসন্ধান করিতে লাগিল এবং সেখানে সার্টিফিকেট্-গুলি না পাইয়া তাড়াতাড়ি রোহিণীর ডেস্কে অন্বেষণ করিতে গেল। ফলে রোহিণী চন্দ্রের ধাক্কা খাইয়া তাহার অর্দ্ধভঙ্গ বেণ্টউড্ চেয়ার সহ ভূতলে পতিত হইল। চন্দ্রও নিজের বেগ সাম্লাইতে না পারিয়া রোহিণীর উপর পড়িল। তাহার পর উভয়ে উঠিয়া নিজ নিজ আহত স্থানে হাত বুলাইতে ও গায়ের ধূলা ঝাড়িতে লাগিল।]
চন্দ্র।
(গায়ের ধূলা ঝাড়িতে ঝাড়িতে) মিষ্টার শ্রীমানি, make a note of that. [রোহিণী মুখ বিকৃত করিল]
কঙ্কাবতী।
(চন্দ্রের পতন ও উত্তেজিতভাব লক্ষ্য করিয়া) মিষ্টার মুন্লাইট্, আপনার নার্ভের অবস্থা দেখ্চি খুব খারাপ হোয়ে পড়েছে, চোখেও স্পষ্ট feverish symptom দেখা দিয়েছে—এর ফল সাংঘাতিক হোতে পারে। এখনই আপনার চিকিৎসার দরকার। (হস্তস্থিত শিশিটি দেখাইয়া) you must take a teaspoonful of my Sparks right away—এ ওষুধ এক ডোজ আপনার এখনই খাওয়া দরকার। আর খাবামাত্রই আপনি এর অব্যর্থ গুণ প্রত্যক্ষ কোর্বেন। It will make a new man of you একবারে নতুন মানুষ হোয়ে যাবেন।
চন্দ্র।
(সভয়ে পশ্চাদ্গমন করিয়া) না না thank you—ওষুধের আমার কিছুমাত্র দরকার নেই। আমার শরীর বেশ সুস্থ আছে, আমার কিছু হয় নি। সত্যি কথা বোল্তে কি এর চেয়ে ভাল আমি কোন কালেই থাকিনি।
কঙ্কাবতী।
That is nothing to the purpose, Sir! ওটা কোন কাজের কথাই নয়। এ সব রোগের প্রথম আক্রমণ এমনই অতর্কিতভাবে আসে যে রোগীর সাধ্য থাকে না সে নিজে তা টের পায়! বরং যতই রোগ অগ্রসর হোতে থাকে ততই সে নিজেকে বেশী সুস্থ মনে করে। Specialists ছাড়া এ অবস্থায় রোগটা কেউ ধোর্তে পারে না। দুঃখের বিষয়, এদেশে সে রকম specialist খুব কমই আছেন। আপনার বিশেষ সৌভাগ্য যে, আপনার এই সঙ্কট কালে আমি এখানে এসে উপস্থিত হোয়েছি। এটাকে আপনি Godsend বোলে মনে কোর্বেন। আপনার এখানে tea spoon আছে?
চন্দ্র।
(সোল্লাসে) না!
কঙ্কাবতী।
কিন্তু আমার কাছে আছে। (ব্যাগ হইতে একটি ছোট কাচের চামচ বাহির করিয়া) এই নিন ধরুন।
চন্দ্র।
(নৈরাশ্যজনিত সাহস সঞ্চয় করিয়া) মাপ কোর্বেন ম্যাডাম, এ ওষুধ আমি কিছুতেই খেতে পার্বোনা।
কঙ্কাবতী।
(কঠোরভাবে) খেতে পার্বোনা!! এই অমৃত—যার জন্য একদিন সমস্ত দেশ লালায়িত হবে—তাই আপনি বিনা আয়াসে লাভ কোরেও ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন? এ ত রীতিমত আত্মহত্যা। নিশ্চয় আপনার ব্রেণ্ খারাপ হোয়েছে। [রোহিণী বলিল, “ইয়েস্ সার্”] বিজলী ওঠ্, I’ll have nothing to do with such a crazy fellow! (গমনোদ্যোগ)
চন্দ্র।
(অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া) না-না—যাবেন না—যাবেন না। আমি বুঝ্তে পারচি, আমার ভুল হোয়েছিল। আমায় ওষুধ দিন—আমি এখনই আনন্দে পান করচি।
কঙ্কাবতী।
That’s like a good boy! এই নিন্ (চামচেতে ঔষধ ঢালিয়া চন্দ্রকে প্রদান) দেখ্বেন, বিশেষ সাবধান! এ অমূল্য ওষুধের এক ফোঁটাও যেন নষ্ট না হয়! [চন্দ্রের ঔষধ পান] কেমন ওষুধের effect বোধ হয় already টের পাচ্ছেন?
চন্দ্র।
(রুমাল দিয়া মুখ মুছিতে মুছিতে) ওয়াক্―থুঃ থুঃ—
কঙ্কাবতী।
(ঘোর ঘৃণাব্যঞ্জক স্বরে) ও আবার কি? আপনার মত idiot ত কোথাও দেখিনি!
চন্দ্র।
ওয়াক্! বাপ্!—ম্যাডাম কি এটা হিং, নিম্, কুইনিন্, ক্যাষ্টর্ অয়েল্—সব একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরী কোরেছেন? ওয়াক্—
কঙ্কাবতী।
(অত্যন্ত কঠোর স্বরে) সাবধান! ওষুধে কি আছে না আছে সেটা জান্তে চেষ্টা করা একজন পেসেণ্টের পক্ষে height of impertinence—ঘোর অনধিকার চর্চ্চা! পেসেণ্টের কর্ত্তব্য হোচ্চে ডাক্তার যে ওষুধ prescribe কোর্বে তাই patiently কোন প্রশ্ন না কোরে বিনা বাক্যব্যয়ে খেয়ে ফেলা—
Theirs not to reason why,
Theirs but to do—and die.
চন্দ্র।
(দমিয়া গিরা) আজ্ঞে—
কঙ্কাবতী।
আপনি বুঝ্তে পার্ছেন না—আজ আপনার কি মহোপকার সাধিত হোয়েছে! আপনার দেহের অন্তরতম প্রদেশে আপনার সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে gout-এর যে অঙ্কুর মাথা তুলে উঠ্ছিল তা এই Sparks-এর shock লেগে একেবারে ধ্বংস হোয়ে গেল। আপনার উচিত, এমন silly মুখভঙ্গী না কোরে—আনন্দ করা।
চন্দ্র।
(অপ্রতিভ ভাবে) আজ্ঞে—কিছু মনে কোর্বেন না—এই—এই shockটা একটু বেশী shocking হোয়েছে কি না—তাই সেটা সাম্লে নিতে একটু দেরী হোচ্চে—আপনি ভাব্বেন না—একটু পরেই আমি আনন্দ কর্চি। আর ঐ যে আপনি স্বর্গীয় দীপ্তি না আলোর কথা কি বোল্লেন ওটাও বোধ হয় যেন দেখ্তে পাচ্ছি। সেটার চেহারা কি রকম বলুন দেখি? সর্ষে ফুলের মত কি?
কঙ্কাবতী।
সরষে ফুল!
বিজলী।
(সহসা উঠিয়া) মাসীমা, আর দেরী কোরে কি হবে? তোমার ডোরপ্লেট্, পেটেণ্ট্, সার্টিফিকেট্—সবেরইত ব্যবস্থা হল। এখন চল বাড়ীটা গিয়ে দেখে আসি।
চন্দ্র।
(তাড়াতাড়ি) হাঁ—হা—আর বিলম্ব কোর্বেন না। (বিজলীকে কার্ড্ দিয়া) আপনি এই কার্ড্খানা নিয়ে সেখানে যান। এতে বাড়ীওলার নাম, ঠিকানা লেখা আছে। সেখানে গেলেই বাড়ী দেখ্তে পাবেন। বাড়ীওলা বা তাঁর কোন লোক খুব যত্ন কোরে আপনাদের সব দেখিয়ে দেবেন। আমি পরে গিয়ে সব settle কোরে দেব।
বিজলী।
(কার্ড্ পড়িয়া) মাসীমা! একি!
কঙ্কাবতী!
কি? কি? (বিজলীর হাত হইতে কার্ড্ লইয়া পাঠ) জ্যোতির্ম্ময় মতিলাল। লেক্ ভিলা, বালিগঞ্জ। তাইত, আশ্চর্য্য—perfectly stunning! (চন্দ্রের প্রতি) আপনি বোল্তে পারেন, মিষ্টার মতিলালের father-এর নাম কি? ওঁদের কি বরাবরই বালিগঞ্জে বাস?
চন্দ্র।
তা ঠিক বোল্তে পারি না। তবে এসব খবর আমি আপনাকে কাল বোল্তে পারবো। মিষ্টার শ্রীমানি, make a note of that.
কঙ্কাবতী।
না, তার দরকার নেই। এ খবর আমরা নিজেই নিতে পার্বো। মিষ্টার মতিলালের সঙ্গে আজ বিকালে কিংবা কাল সকালে ও বাড়ীতে দেখা হবে ত?
চন্দ্র।
নিশ্চয়। তিনি ঐ বাড়ীতেই বাস করেন এবং বাড়ী থেকে আজ কাল বড় বেরোন না। তাঁর মানসিক অবস্থা বড় ভাল নয়—দেখ্লে বোধ হয় যেন তাঁর প্রাণের দীপ্তি নিবে গেছে। আমি আশা করি আপনি আপনার Sparks তাঁকেও দু’এক ডোজ খাইয়ে দেবেন। তাতে তাঁর নিশ্চয় উপকার হবে।
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্।
বিজলী।
আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার কাছে আজ আমরা বাস্তবিকই অনেক light পেয়েছি। খুব সম্ভব তার সাহায্যে আমাদের কাজ সকল হবে।
চন্দ্র।
নিশ্চয়! আর যদি কোন গোল হয় ফের এখানে আস্বেন। Moonlight is always at your service.
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্!
কঙ্কাবতী।
Thanks—এখন আমরা চোল্লেম। আশা করি আপনি আমার Sparks-এর কথা ভুল্বেন না।
চন্দ্র।
আজ্ঞে—এ জীবনে নয়।
কঙ্কাবতী।
আর যদি আর এক ডোজ্ চান—
চন্দ্র।
(তাড়াতাড়ি) No, thanks! আপনাদের দেরী হোয়ে যাচ্চে—Good afternoon—নমস্কার!
বিজলী ও কঙ্কাবতী।
নমস্কার।
কঙ্কাবতী।
(যাইবার সময় দরজার কাছ হইতে মুখ ফিরাইয়া) Remember my Sparks!
চন্দ্র।
Oh these silly murderous women! রোহিণী, শিগ্গীর এক গেলাস জল দাও—এখনও গাটা কেমন কোর্চে! (রোহিণী জল দিলে তাহা মুখে চোখে দিতে দিতে) বাপ্ আর একটু হোলেই Moonlight-এর light নিবে অমাবস্যা হ’য়ে গেছ্ল আর কি! নাঃ—এ অত্যাচার আমি সৈবনা—I shall make her pay through the nose for it—রোহিণী! শিগ্গীর ডাক্তার কঙ্কাবতী কাঞ্জিলালের নামে এক বিল কর—item লেখ—মিটার চম্পটির সম্পূর্ণ সুস্থ দেহের উপর ‘কঙ্কাবতী স্পার্ক্স্’ নামে এক মারাত্মক বিষের পরীক্ষা—আর তার চার্জ্জ্ ধর—দু’মোহর!—মিষ্টার শ্রীমানি, make a note of that!
রোহিণী।
ইয়েস্ সার্। (লিখিতে প্রবৃত্ত)
তৃতীয় অঙ্ক
আঁধারে আলো
অবতরণিকা।
[ ঊষার আবির্ভাব। নরনারীগণের নৃত্যগীত। ]
(নারীগণ)
ঐ উঠ্চে হেসে পূব আকাশে
মোহন বেশে ঊষারাণী!
ছড়িয়ে কিরণ সিঁদুর বরণ
(তার) উড়্ছে রাঙা আঁচলখানি!
ছিল তিমির মাঝে ডুবে ধরা
ঘুমে অচেতন পরাণহারা
উঠ্ল জেগে ছুট্ল কাজে
পেয়ে পরশ সঞ্জীবনী!
হরষে মাতোয়ারা গাইছে ধরা
দেবীর শুভ আগমনী।
(নরনারীগণ একত্রে)
নমো নমো জ্যোতির্ম্ময়ী! রবি সোহাগিনী!
নিত্য নব রূপ ধোরে—আলো আনি থরে থরে
বহাও প্রাণের স্রোত জাগাও ধরণী!
স্বাগত! স্বাগত! দেবী—নবীনা পুরাণী!
বালিগঞ্জ—“লেক্সাইড্ ভিলা”।
[জ্যোতির্ম্ময়ের পূর্ব্বোক্ত ষ্টুডিও। কঙ্কাবতী একটি কৌচে উপবিষ্টা। বিজলী ঘরের আসবাবপত্রগুলি দেখিতে ব্যস্ত।]
বিজলী।
(একটি আখ্রোট কাঠের ব্র্যাকেট্ দেখিতে দেখিতে) বাস্তবিক মাসীমা, ভারী সুন্দর! মিষ্টার মতিলাল কেমন জানি না—তবে তাঁর যে artistic taste আছে সেটা এ ঘরের সাজ সজ্জা দেখ্লে বেশ বুঝ্তে পারা যায়। দেখচ এই ব্র্যাকেট্টা আর এই পর্দ্দাগুলি কি সুন্দর! এই আখরোট্ কাঠের জিনিষগুলো আর পাপিয়ে মাশের বাক্স ট্রে গুলো ত দেখ্ছি কাশ্মীর থেকে আমদানী। এই টেবিল ক্লথ্টাও কাশ্মীরী গব্বা। মিষ্টার মতিলাল কি কাশ্মীরে গেছ্লেন? নৈলে এখানে এত কাশ্মীরী আর্টের ছড়াছড়ি কেন? নাঃ—লোকটিকে দেখ্তে ভারী ইচ্ছে হোচ্চে। কিন্তু এখনও ত তাঁর দেখা নেই!
কঙ্কাবতী।
চাকরটি ত বোল্লে আধ ঘণ্টার মধ্যে তিনি আস্বেন। (হাতের রিষ্ট্ ওয়াচ্ দেখিয়া) তা আধ ঘণ্টাও ত প্রায় হোয়ে এল! কিন্তু এখনও ত আসবার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছেন।! নাঃ—এ একেবারেই অসহ্য।
বিজলী।
আচ্ছা মাসীমা তোমার কি মনে হয়? এই মিষ্টার মতিলালই কি মামার মতিলাল? দু’জনের নামে ত আশ্চর্য মিল!
কঙ্কাবতী।
একটু পরেই তা বোঝা যাবে। এখনও আমরা আঁধারেই আছি—মুন্লাইট্ থেকে আলো পাওয়া সত্ত্বেও। মোটের উপর এ বাড়ীটা দেখে বোধ হোচ্ছে এটা আমাদের suit কোর্বে। কি বলিস্ বিজলী?
বিজলী।
(সোৎসাহে) নিশ্চয়! বোল্তে কি মাসীমা, আমি একেবারে মুগ্ধ হোয়ে পড়েছি—এখানকার সবই আমার খুব সুন্দর লাগ্ছে। এ বাড়ীটা নিতেই হবে। কিন্তু ভদ্রলোক ত দেখ্ছি আচ্ছা ভদ্রলোক! এতক্ষণ বোসে আছি দেখা নেই! নাঃ―আমার আর ভাল লাগ্ছে না। (একটা চেয়ারে অলসভাবে বসিয়া পড়িয়া) আচ্ছা মাসীমা, লোকটি দেখ্তে কেমন বোধ হয়? যখন আর্টিষ্ট তখন নিশ্চয়ই লম্বা চুল আছে—আর চোখটা বসা, যেন ঘুম জড়ান—আলুথালু বেশ—এলোমেলো কথাবার্ত্তা—ভাবভঙ্গীটা যেন—
কঙ্কাবতী।
(সহাস্যে) তুই যে না দেখেই তার রূপ বর্ণনা আরম্ভ কোর্লি?
বিজলী।
ও দেখ্তে হয়না, মাসীমা। আমি জানি ওরা সব্বাই এক এক প্যাটার্নের—মাথার চুল থেকে আরম্ভ কোরে পায়ের স্যাণ্ডাল পর্য্যন্ত সব এক ছাঁচে ঢালা। বোধ হয় বিশ্বকর্মার যে কারখানায় আর্টিষ্ট্ তৈরী হয়, সেখানে একটার বেশী দুটো ছাঁচ নেই। যাই হোক, ভদ্রলোক এখন এলে বাঁচা যায়! এ কাজটা চুকিয়ে আবার রাজা রূপচাঁদের সন্ধানে ত যেতে হবে। ভবানীপুর এখান থেকে বেশী দূর নয়।
কঙ্কাবতী।
রাজা রূপচাঁদের কথা আর বলিস্নে বিজলী! আমার বোধ হয় আর তাঁর দেখা পাওয়া যাবেনা। সে রাজা মানুষ—সখ হোয়েছিল তাই আমাদের সঙ্গে দুদিন আলাপ কোরেছিল। এখন আমাদের চিন্তেই পার্বে না। রাজা রাজড়াদের কাণ্ডই ঐ রকম। তা আসল রাজাই হোক্, বা খেতাবী রাজাই হোক! সব দুষ্মন্ত টাইপের! সদ্যঃ সদ্যঃ প্রেমে পড়্তেও যেমন তাদের বাধে না—আবার ভুল্তেও তেম্নি একটা দিনও লাগে না! দেখ্লিনা দু’দিন পরেই পালিয়ে গেল! তুই তার কথা ভুলে যা।
বিজলী।
(উত্তেজিত ভাবে) না মাসীমা, ও কথা বোলো না। তুমি রাজা রূপচাঁদকে তা হোলে চেন নি। আর সব রাজা রাজড়ার কথা বোল্তে পারি না, কিন্তু রাজা রূপচাঁদ যে একেবারেই ও রকম লোক নন তা আমি জোর কোরে বোল্তে পারি। অমন চমৎকার লোক আমি অল্পই দেখেছি—
কঙ্কাবতী।
তুই এখনও ছেলেমানুষ, বিজ্লী—
বিজলী।
(উচ্ছাস ভরে) কি সরল তাঁর চালচলন, কি সুন্দর তাঁর কথাবার্ত্তা, আর কি মধুর তাঁর ব্যবহার! সবই তাঁর এত সুন্দর যে মুগ্ধ না হোয়ে থাকা যায় না! তাঁর ভেতরের মানুষটা যেন বাহিরের রাজাকে ছাপিয়ে উঠেছে! তাঁর ভাব ভঙ্গীতে এমন একটা মহত্ত্ব মনুষ্যত্ব সকল সময় ফুটে থাকে যে দেখে বোধ হয় না যে তাঁর দ্বারা কোন নীচতা হীনতা সম্ভব হোতে পারে। এমন দেবতার মত লোককে কিনা তুমি—
কঙ্কাবতী।
বিজলী, তোর কি বুদ্ধি সুদ্ধি লোপ পেয়েছে? তুই যদি এরকম পাগ্লামি করিস্ ত তোকে এক ডোজ্ Sparks এখনই—
বিজলী।
(সভয়ে) না মাসীমা, তোমার ওষুধের দরকার নেই, আমি চুপ কোর্চি। (ক্ষণকাল পরে) কিন্তু মাসীমা, আমি এ ঘরের জিনিষগুলো যতই দেখ্চি ততই আমার মনে কাশ্মীরের স্মৃতি জেগে উঠ্ছে, আর মনে পড়্ছে রাজা রূপচাঁদকে। দেখ্চ ঐ water-colour sketchটা—ঝিলাম নদীর কি সুন্দর ছবি! ঠিক ঐ রকম একখানা ছবি আমি রাজা রূপচাঁদকে আঁক্তে দেখেছিলুম। সেই দিনই আমার সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ। এ ছবিখানার styleটি পর্য্যন্ত অবিকল সেই রকমের! আরো আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, এ ছবিখানা নদীর সেই একই জায়গার ছবি—সাদিপুরে যেখানে সিন্ধ্ নদী ঝিলাম নদীর সঙ্গে মিশেছে! দু’খানা ছবির এত মিল কি হোতে পারে? আমার বোধ হ’চ্চে এখানা সেই ছবিই। কিন্তু—এখানে এল কেমন কোরে!
কঙ্কাবতী।
তুই ক্ষেপেছিস্ বিজ্লী? এটা একটা দৈবাৎ মিল ছাড়া আর কিছুই নয়। এই দেখেই তুই একেবারে ক্ষেপে উঠ্লি? তোর হোল কি? দেখ্ছি—রোমান্স, প’ড়ে প’ড়ে তোর মাথা একদম খারাপ হোয়ে গেছে! এর remedy হোচ্চে science পড়া—Medical science—
বিজলী।
রক্ষা কর মাসীমা! আর ডাক্তারী প’ড়ে কাজ নেই! একটা ডোরপ্লেটের ভাবনাতেই অস্থির, দু’টো ডোর্প্লেট আবার কোথায় বসাবো জানি না! কিন্তু মাসীমা, তুমি মাথা খারাপই বল আর যাই বল, ঐ কোণে ইজেলের উপর যে ছবিখানা রোয়েচে ওটা দেখ্বার জন্য আমার প্রাণটা বড়ই ব্যাকুল হোয়েচে।
কঙ্কাবতী।
দেখ্ছি দিন্কে দিন তুই বড় দুষ্টু হ’য়ে প’ড়্চিস্, বিজলী! এ রকম কৌতুহল ভয়ানক দুর্ব্বলতার লক্ষণ—একজন শিক্ষিতা মহিলার পক্ষে অত্যন্ত অশোভন! এ রকম দুর্ব্বলতার দরুণই আমাদের দেশের নারীজাতির সর্ব্বনাশ হোয়েচে—তাদের কোন উন্নতি হোতে পাচ্চে না। এই নারীজাগরণের দিনে তোর মত একজন সুশিক্ষিতা ভদ্রমহিলা কোথায় তাদের পথ দেখাবে, না তুই নিজেই অস্থির হোয়ে পড়্লি? তোরা যদি এই সব বাজে কৌতুহল দমন কোর্তে না পারিস্ তা হোলে অশিক্ষিতাদের দোষ কি? জানিস্ কি, এ রকল দুর্ব্বলতা নারী-প্রগতির পক্ষে কতটা বাধা?
বিজলী।
আমি প্রতিজ্ঞা কোর্চি মাসীমা, আমি এর পর নারী-প্রগতির জন্য প্রাণপণে চেষ্টা কোর্ব, কিন্তু এখন (ইজেলের নিকটে গিয়া) আমাকে এই ছবিখানা একবার দেখ্তে দাও।
কঙ্কাবতী।
না, কিছুতেই নয়। আমি কখনই এমন অভদ্র ব্যবহারের প্রশ্রয় দিতে পারি না।
বিজলী।
কেন, অভদ্র কিসে? এ ত একজন প্রোফেসানাল আর্টিষ্টের ষ্টুডিও—এখানকার সকল ছবিই লোককে দেখাবার জন্য এখানে রাখা হোয়েচে। আমি ত এখানা কিন্তেও পারি। তা’ যাই বলো মাসীমা, আমার এ ইচ্ছা আমি কিছুতেই দমন কোর্তে পারবো না—এতে নারী জাতির সর্ব্বনাশ হয় হোক্। এ ছবি না দেখ্লে আজ রাত্রে আমার ঘুম হবে না। (ধীরে ধীরে ছবির আবরণ উন্মোচন করিয়া) মাসীমা! মাসীমা!
কঙ্কাবতী।
কি?—কি?—তুই যে আমাকে সুদ্ধ পাগল কোরে তুল্লি!
বিজলী।
দেখ্চ কি এখানা কার ছবি?
কঙ্কাবতী।
নাঃ—ও সব বাজে ছবি দেখে সময় নষ্ট কর্বার অবসর আমার নেই। ততক্ষণ আমার profession-এর কথা ভাব্লে অনেক কাজ হবে।
বিজলী।
(আবেগভরে) এ ছবি আমার! আমার সেই ছবি! কিন্তু এখানে—এখানে কেমন কোরে এল!
কঙ্কাবতী।
(উঠিয়া) দেখি। (ছবিটি অভিনিবেশ সহকারে দেখিয়া) হাঁ, তোর চেহারার সঙ্গে অনেকটা মিল আছে বটে।
বিজলী।
(উত্তেজিত ভাবে) অনেকটা মিল আছে! কি বোল্ছ তুমি? এ আমারই ছবি। আর এ ছবি রাজা রূপচাঁদ ছাড়া আর কারো হাতের আঁকা নয়।
কঙ্কাবতী।
Nonsense! তুই কি ভুলে যাচ্চিস্ যে আমরা মিষ্টার মতিলালের বাড়ীতে বোসে আছি। রাজা রূপচাঁদের টিকিটি পর্য্যন্ত এ বাড়ীর ত্রিসীমানায় নেই।
বিজলী।
সে কথা ঠিক, কিন্তু মাসীমা রাজা রূপচাঁদ সালিমার বাগে আমাকে ঠিক এই ভাবে দাঁড় ক’রিয়ে ছবি এঁকেছিলেন, আর আমার হাতে তখন এই ফুলগুলিই ছিল!! এই ঝিলাম নদীর ছবি—এই আমার ছবি! আর দেখ্চ (টেবিলের উপর হইতে একখানি বই লইয়া) এই সেই রবিবাবুর “চয়নিকা”! একদিন দাল লেকের ধারে বোসে আমাকে এইখানা পোড়ে শুনিয়েছিলেন। কি সুন্দর সে পড়্বার ভঙ্গী—কি মিষ্টি সে স্বর! এখনও আমার কানে বাজ্চে! (ইজেলের ছবি দেখাইয়া) আর এই ছবিতে আমার হাতে যে ফুলগুলি দেখ্চ, এগুলি তিনিই আমার হাতে তুলে দিয়ে বোলেছিলেন, “বিজলী, এ ফুলের রাজ্যে অনেক ফুলই আমি এঁকেচি, কিন্তু সব চেয়ে সুন্দর ফুলটি আজও আঁক্তে পারি নি—আজ সেইটে আঁক্তে চেষ্টা কোর্ব।” (বলিতে বলিতে ভাবাতিশয্যে বিজলীর চক্ষু জলভারাক্রান্ত হইল—সে আর কিছু বলিতে পারিল না।)
কঙ্কাবতী।
(বিজলীর অবস্থা দেখিয়া তাড়াতাড়ি ব্যাগ হইতে এক শিশি “কঙ্কাবতী স্পার্ক্স্” বাহির করিয়া) নে বিজলী, দেরি ক’রিস্নে শিগ্গীর এক ডোজ খেয়ে ফেল্। ও রকম উত্তেজনা ভয়ের কথা— —এখনই সাংঘাতিক হ’তে পারে। নে ধর্—
বিজলী।
(তাড়াতাড়ি চক্ষু মুছিয়া) না মাসীমা রক্ষা কর—আমি ভাল হোয়েচি।
কঙ্কাবতী।
(ব্যাগে শিশিটি পুনরায় রাখিয়া) আচ্ছা এখন র’ইল, কিন্তু যদি বেশী বাড়াবাড়ি দেখি তা হোলে বাধ্য হোয়ে তোকে ওষুধ খাওয়াতে হবে। তুই এখন ও বইখান যেখানে ছিল সেখানে রেখে ঠাণ্ডা হোয়ে বোস্। এ বাড়ীটা যখন নেওয়াই ঠিক হোল, তখন কন্সাল্টিং রুম্-টুম্গুলো কিরকম হবে সে বিষয়ে পরামর্শ কোর্তে হবে।
[বিজলী বইখানি টেবিলের উপর যথাস্থানে রাখিতে যাইবার সময় এক টুক্রা কাগজ তার ভিতর হইতে পড়িয়া গেল।]
কঙ্কাবতী।
ভারী অসাবধানী মেয়ে! (কাগজখানি তুলিয়া লইয়া) একি! এ যে দেখ্চি কবিতা! (পাঠ) “বিজলীর প্রতি”—
বিজলী।
(কঙ্কাবতীর হাত হইতে কাগজখানি কাড়িয়া লইয়া) এ নিশ্চয় আমার নাম। (কাগজখানি দেখিয়া) এ ত দেখ্চি রাজা রূপচাঁদেরই হাতের লেখা! মাসীমা আমরা কি যাদুর রাজ্যে এসে পোড়েচি! আমি ত কিছুই বুঝতে পার্চি না! যেন সব স্বপ্নের মত বোধ হ’চ্চে!
কঙ্কাবতী।
আচ্ছা, তুই ওটা পড়্। Caseটা কি এখনই তা বোঝা যাবে।
[ বিজলী কর্ত্তৃক কবিতা পাঠ ]
বিজলীর প্রতি।
হে বিজলী! কতই খেলা খেল্তে তুমি জান।
কভু জ্বাল উজল আলো—কভু বজর হান।
সুনীল বরণ গগন তলে
কাল বরণ ঐ মেঘের কোলে
চিক্ মিকিয়ে হেসে উঠে স্বরগ জ্যোতি ঢালো।
(আবার) দিনের আলো নিব্লে পরে—
ঢাক্লে নভঃ আঁধার ঘোরে,
তুমি ছুটে গিয়ে কত ঘরে সাঁজের বাতি জ্বালো!
(কিন্তু) বিতার তটের ’পরে
উঠ্লে ফুটে যে রূপ ধ’রে
জ্বালিয়ে গেল প্রাণের মাঝে কি সে মোহন আলো!
সেই রূপটিই তোমার ওগো বাসি বড়ই ভালো।
আজ আমার এই শূন্য প্রাণে
ভরিয়ে তোল তোমার গানে,
রাঙাও তোমার রঙীন প্রভায়—হৃদয় ছাওয়া কালো।
(আমার) আঁধার ঘেরা চারি ধার, ওগো দেখাও মোরে আলো!
কঙ্কাবতী।
এটাত দেখ্চি, একটা clear পাগ্লামী কেস্। মাথা একদম খারাপ হ’য়ে গেছে! ইলেক্ট্রিসিটির সঙ্গে মানুষকে এমন ভাবে যে confuse কোর্তে পারে, সে যে পাগল তাতে সন্দেহ নেই। লোকটার নার্ভের চিকিৎসা অবিলম্বে করা দরকার—He ought to take a dose of Kankabati Sparks right away—এ ওষুধ এক ডোজ পেটে প’ড়্লেই সব পাগলামী সেরে যাবে।
বিজলী।
(সোদ্বেগে) মাসীমা, আমি বুঝ্তে পার্চিনা রাজার কি হোয়েচে! ‘শূন্য প্রাণ’, “কালো হৃদয়”—এ সব কথার কি অর্থ? রাজা কি কোন বিপদে প’ড়েচেন?
কঙ্কাবতী।
বিপদ নিশ্চয়ই! ব্রেণের ব্যারাম মাত্রই বিপজ্জনক—তা রাজারই হোক বা প্রজারই হোক্।
[ধীরে ধীরে পাশের দরজা দিয়া জ্যোতির্ম্ময় প্রবেশ করিয়া এক পাশে একখানি চেয়ারে বসিল ও দুই হাতে মাথা দিয়া ভাবিতে লাগিল। কঙ্কাবতী বা বিজলীকে সে লক্ষ্য করে নাই। কঙ্কাবতী ও বিজলীও তাহাকে প্রথমে দেখিতে পায় নাই।]
জ্যোতির্ম্ময়।
যাক্—সব শেষ! আশার যে ক্ষীণ রশ্মিটুকু মনের এক কোণে জ্বল্ছিল তাও নিবে গেল! আজ আমি পথের ভিখিরী—তাই বা বলি কেন? তাদেরও বোধ হয় মাথা গোঁজ্বার স্থান আছে—আমার তাও নেই। এই বাড়ী—এতদিন প্রাণ ঢেলে যা’র রূপ সজ্জা কোরেচি—এ বাড়ীও আমাকে ছাড়্তে হবে! পৈতৃক ভদ্রাসনখানাও রাখ্তে পার্লুম না—এমনি বংশোজ্জ্বল সন্তান আমি জন্মেছি!
কঙ্কাবতী।
(জ্যোতির্ম্ময়ের নিকট আসিয়া) রাজা রূপচাঁদ!
জ্যোতির্ম্ময়।
(চম্কাইয়া উঠিয়া) একি! মিস্ কাঞ্জিলাল। মিস্ মজুমদার! আপনারা—আপনারা এখানে কেমন করে এলেন?
কঙ্কাবতী।
আমি কলকাতায় practice কোর্ব বোলে ঠিক কোরেচি এবং সেই জন্য এখানে একটা বাড়ী খুঁজ্ছিলুম। মিষ্টার চম্পটি নামে একজন house agent এই বাড়ীটা দেখ্বার জন্য আমাদের পাঠিয়ে দিলেন। বাড়ীটা আমাদের খুব পছন্দ হোয়চে,আমরা আজই এটা নেব বোলে স্থির কোরেচি। বাড়ীওয়ালার জন্য অনেকক্ষণ এ ঘরে অপেক্ষা ক’র্চি, কিন্তু এখনও তাঁর দেখা নেই! তিনি এলেই terms ঠিক কোরে ফেল্ব।
বিজলী।
(জ্যোতির্ম্ময়ের কাছে আসিয়া) রাজা, আপনাকে এখানে এ অবস্থায় দেখে বোধ হোচ্চে বাড়ীওয়ালা আপনার খুব পরিচিত। তিনি কি আপনার আত্মীয়?
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ—না—আত্মীয় ঠিক বলা যায়না—তবে—(সহসা) আচ্ছা, মিস্ মজুমদার, যদি আমি বলি যে, আমিই জ্যোতির্ম্ময় মতিলাল তা হোলে কি—
বিজলী।
সে কি! কি বোল্চেন আপনি? আপনি মিষ্টার মতিলাল? অসম্ভব! না—আপনি ঠাট্টা কোর্চেন! আর আপনি আমাকে মিস্ মজুমদার বোলে ডাক্চেন কেন? আপনি কি আমার নাম ভুলে গেছেন?
জ্যোতির্ম্ময়।
শোন বিজলী, আর তোমার কাছে আমি গোপন কোর্বোনা—তার জন্য আমি যথেষ্ট শাস্তি পেয়েচি—আর আমি সহা কোর্তে পার্চিনা। শোন, সত্যই আমি জ্যোতির্ম্ময় মতিলাল। যে দিন তুমি আমাকে রাজা রূপচাঁদ বোলে ভুল কোরেছিলে, সেই দিনই তোমার এ ভুল ভেঙ্গে দিতে আমার ইচ্ছা হোয়েছিল, কিন্তু সাহসে কুলোয় নি। আমার ভয় হোয়েছিল, পাছে সত্য বোল্লে তোমার ভালবাসা হারাই! আমি স্বীকার ক’র্চি—নির্ব্বোধ আমি—দুর্ব্বল আমি—কুবুদ্ধি বশে আমি অত্যন্ত অন্যায় কাজ কোরেচি। আমাকে যত পার তিরস্কার কর—আমি সমস্ত ভর্ৎসনা ও শাস্তির উপযুক্ত।
বিজলী।
(ক্ষণেক নিস্তদ্ধ থাকিয়া) আপনি তা হোলে সত্যই রাজা রূপচাঁদ নন?
জ্যোতির্ম্ময়।
না—রাজা রূপচাঁদের সঙ্গে আমার কোন বিষয়েই মিল নেই। তিনি একজন মস্ত ধনী জমিদার, আর আমি একজন দরিদ্র আর্টিষ্ট—দেনার দায়ে সর্ব্বস্বান্ত হোয়ে গাছতলায় আশ্রয় নিতে নিতে চ’লেচি!
কঙ্কাবতী।
শুন্লুম, রাজা রূপচাঁদ rheumatismএ ভুগ্চেন—সে কথা কি সত্য?
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ—
বিজলী।
মাসীমা, একটু চুপ কর। (জ্যোতির্ম্ময়ের প্রতি) এ ষ্টুডিও নিশ্চয় আপনার।
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ।
বিজলী।
এ ঝিলামতটের ছবি অবশ্য আপনারই আঁকা?
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ।
বিজলী।
আর এই কবিতা?
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ, ও আমার একটা পাগ্লামী।
কঙ্কাবতী।
(ঘাড় নাড়িয়া) ঠিক! আমি আগেই তা অনুমান ক’রেছিলুম। আমার diagnosis কখনো ভুল হয় না।
বিজলী।
আর এ ছবি? এটা বোধ হয় সেই ছবি যেখানা আপনি কাশ্মীরে আঁক্তে আরম্ভ করেন—
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ, এ সেই ছবি। কিন্তু এখানা আমার কেবল অক্ষমতাই জ্ঞাপন কোর্চে! Original-এর মাধুর্য্যের কিছুই এতে আমি ফুটিয়ে তুল্তে পারি নি। তবে এই পর্য্যন্ত বোল্তে পারি—it was painted by the hand of love! আমার প্রাণের সবটুকু দরদ এতে মাখান আছে—। এখন সকল কথা শুন্লে বিজলী—আমার মনের ভার অনেকটা লঘু হোয়ে গেল—এখন আমি কতকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেল্তে পার্বো। আমি নিশ্চিন্ত হোয়ে এ বাড়ী ছেড়ে চোল্লুম। তোমরা এখানে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস কর—মিষ্টার চম্পটি তোমাদের যেমন সুবিধা হয়, সেইরকম ভাবেই terms settel কোরে দেবেন। আমি তোমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় গ্রহণ কোর্লুম। (বিজলীর হস্ত ধারণ করিয়া) বিজলী, আমার অনুরোধ আমাকে ভুলে যেও। ভগবান তোমাকে সুখী করুন।
[জ্যেতির্ম্ময় বিজলীর হস্তত্যাগ করিয়া দ্বারের দিকে অগ্রসর হইল। বিজলী অবশ ভাবে একখানা চেয়ারে বসিয়া পড়িল ও হস্ত দ্বারা মুখ আচ্ছাদন করিয়া অশ্রু বিসর্জ্জন করিতে লাগিল।]
কঙ্কাবতী।
(জ্যোতির্ম্ময়ের প্রতি) দাঁড়াও, মিষ্টার মতিলাল, যেওনা।
জ্যোতির্ম্ময়।
(ফিরিয়া) কেন, মিস্ কাঞ্জিলাল? আপনি কি আমাকে তিরস্কার কোর্তে চান? বোল্তে চান যে, আমি নীচ প্রতারক—ছদ্ম নামের সুবিধা গ্রহণ কোরে আপনার nicce-এর সঙ্গে আলাপ কোরেচি— জাল রাজা সেজে তাকে ঠকিয়েচি? এ অপরাধ ত আমি স্বীকার কোরেচি এবং তার জন্য সমস্ত শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি। বলুন, আমার প্রতি কি আদেশ?
কঙ্কাবতী।
অত excited হোয়োনা, ঠাণ্ডা হোয়ে ব’স—এই আমার আদেশ। নৈলে তোমাকে বোধ হয়—[Kankabati Sparks-এর শিশি বাহির করিয়া টেবিলের উপর রাখিলেন; জ্যোতির্ম্ময়ের উপবেশন] That’s like a good boy! এখন আমার দু’একটা question-এর উত্তর দেবে কি?
জ্যোতির্ম্ময়।
বলুন।
কঙ্কাবতী।
তোমার বাবার নাম কি?
জ্যোতির্ম্ময়।
৺মনোরঞ্জন মতিলাল।
কঙ্কাবতী।
তোমাদের কি বরাবরই এই বালিগঞ্জে বাস?
জ্যোতির্ম্ময়।
না। আমার বয়স যখন দশ বৎসর তখন আমার বাবা এখানে এসে বস বাস করেন। আমার পাঁচ বৎসর বয়সে আমার মায়ের মৃত্যু হয়। তারপর বাবা এক রকম বিবাগী হোয়ে পড়েন ও নিজের কারবার তুলে দিয়ে আমাকে নিয়ে নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান। শেষে এই বালিগঞ্জে এসে এস্থানটা একটু নির্জ্জন দেখে এইখানে এই বাড়ী তৈরী কোরে বাস কোর্তে আরম্ভ করেন। এখানেও তিনি বড় কারও সঙ্গে মিশ্তেন না। সাত বৎসরর হোল তাঁর মৃত্যু হোয়েচে।
কঙ্কাবতী।
তোমার বাবা কোথায় কারবার কোর্তেন?
জ্যোতির্ম্ময়।
গৌহাটীতে।
কঙ্কাবতী।
(সোল্লাসে) ঠিক, যা অনুমান কোরেছিলেম! মিষ্টার মতিলাল, তুমি পথের ভিখারী নও! রাজা রূপচাঁদ কেমন ধনী জানি না, কিন্তু আমার বিশ্বাস তুমি তাঁর চেয়ে কম ধনী নও!
জ্যোতির্ম্ময়।
কি বোল্চেন আপনি?
কঙ্কাবতী।
একটা তেলের খনির অর্দ্ধেকের মালিক তুমি।
জ্যোতির্ম্ময়।
(উঠিয়া) মিস্ কাঞ্জিলাল, অবশ্য আমি পরিহাসের যোগ্য। কিন্তু অপরাধ নেবেন না, পরিহাসের একটা সময় অসময়ের বিবেচনা কি আমি আপনার মত শিক্ষিতা মহিলার কাছ থেকে আশা কোর্তে পারি না?
কঙ্কাবতী।
আবার তুমি উত্তেজিত হোচ্চ? (Kankabati Sparks-এর শিশি গ্রহণ করিয়া) ব’স তুমি নৈলে—[জ্যোতির্ম্ময়ের উপবেশন] আমি কিছুমাত্র উপহাস কোরিনি—সমস্তই ধ্রুব সত্য।
জ্যোতির্ম্ময়।
সত্য
কঙ্কাবতী।
হাঁ। সত্য অনেক সময় কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়—শোন তবে। আমার cousin কেশব কিশোর কাঞ্জিলাল বিজলীর আপনার মামা ছিলেন। তিনি প্রথম বয়সে অনেক কষ্ট পান এবং ভাগ্যান্বেষণের চেষ্টায় সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়ান। কিন্তু কোথাও কিছু সুবিধা কোর্তে না পেরে শেষে গৌহাটিতে তোমার বাবার কাছে উপস্থিত হন। তিনি কেশবদাদাকে প্রথম হোতেই খুব সদয় চক্ষে দেখ্তে আরম্ভ করেন এবং তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেন। আবার তাঁরই সাহায্যে কিছু টাকা আর recommendation সংগ্রহ কোরে কেশব দাদা বর্ম্মায় গিয়ে তেলের ব্যবসা আরম্ভ করেন এবং ক্রমে টুইন্জাদের মধ্যে একজন হোয়ে পড়েন।
জ্যোতির্ম্ময়।
টুইন্জা কি?
কঙ্কাবতী।
তেলের খনির মালিক। পাঁচ বৎসর হোল তাঁর মৃত্যু হোয়েচে। তিনি একটু eccentric গোছের লোক ছিলেন—বিবাহ করেন নি। মর্বার সময় তিনি যে উইল কোরে যান, তার মর্ম্ম এই যে,—তাঁর বিষয়ের অর্দ্ধেক পাবে তাঁর এক মাত্র ভাগিনেয়ী শ্রীমতী বিজলী মজুমদার, আর বাকি অর্দ্ধেক পাবেন তাঁর পরম উপকারী বন্ধু শ্রীযুক্ত মনোরঞ্জন মতিলাল অথবা তাঁর অবর্ত্তমানে তাঁর পুত্র। তোমার বাবা গৌহাটি থেকে নিরুদ্দিষ্ট হবার পর কেশব দাদা আর তাঁর কোন সংবাদ পান নি—আর তোমার বাবাও বোধ হয় সংসার বিরাগী হোয়ে তাঁকে আর নিজের কোন খবর দেন নি। আমরা এ কয় বৎসর তোমার বাবার অনেক খোঁজ কোরেচি, কিন্তু কোথাও সন্ধান পাইনি। তোমার নাম যে জ্যোতির্ম্ময় তা কেশব দাদা জান্তেন এবং উইলেও তোমার নামের উল্লেখ আছে। কিন্তু গত বৎসর যখন কাশ্মীরে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তখন দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা তোমার প্রকৃত পরিচয় পাই নি। তুমি জাল রাজা সাজ্তে গিয়ে আসল রাজত্ব হারাতে বোসে ছিলে। যা হোক, ভগবানকে ধন্যবাদ যে শেষে তোমার প্রকৃত পরিচয় আমরা পেয়েচি। যে ভূতের বোঝা—I mean তোমার যে বোঝা—এতদিন বিজলী ঘাড়ে কোরে বেড়াচ্ছিল সেটা এখন তোমার ঘাড়ে ফেলে দিতে পার্লেই ও নিশ্চিন্ত হয়।
জ্যোতির্ম্ময়।
(উচ্ছ্বাস ভরে) মাসীমা—I mean মিস কাঞ্জিলাল—কি বোলে আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাব তা জানি না। আপনি যথার্থ ই—angel—দেবী—এ অন্ধকার প্রেত পূরীতে স্বর্গের আলো নিয়ে এসেচেন! বস্তুতঃই আমি ভূত হোয়েছিলুম, আপনি আমার—
হরেন।
জ্যোতি—(কি বলিতে যাইতেছিল, সম্মুখে কঙ্কাবতীকে দেখিয়া থামিল)।
জ্যোতির্ম্ময়।
হরেন—হরেন—ভাই—(ছুটিয়া গিয়া সজোরে হরেনকে জড়াইয়া ধরিল)।
[হরেন জ্যোতির্ম্ময় কর্ত্তৃক এরূপ অতর্কিত ভাবে আক্রান্ত হইয়া ব্যাপার কিছু বুঝিতে না পারিয়া কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় ভাবে জ্যোতির্ম্ময়ের মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। কঙ্কাবতী টেবিল হইতে Kankabati Sparks-এর শিশিটি লইয়া জ্যোতির্ম্ময়ের দিকে অগ্রসর হইলেন। বিজলী দাঁড়াইয়া দৃশ্যটি উপভোগ করিতে লাগিল।]
কঙ্কাবতী।
মিষ্টার মতিলাল!
জ্যোতির্ম্ময়।
(প্রকৃতিস্থ হইয়া হরেনকে ছাড়িয়া লজ্জিত ভাবে) মাপ কোর্বেন, মিস্ কাঞ্জিলাল, আমি আহ্লাদে আত্মহারা হোয়ে পোড়েছিলুম। Allow me to introduce to you, my friend Mr. Haren Mullick—ইনি আমার বাল্যবন্ধু।
হরেন।
ওঃ আপনি ডাক্তার মিস কাঞ্জিলাল? নমস্কার! আমি আপনার ও আপনার মহৌষধের কথা অনেকবার জ্যোতির মুখে শুনেছি। ঐ শিশিটা বুঝি সেই ওষুধের? ওটা আমাকে আমার বন্ধুর ভীষণ আক্রমণ থেকে যেমন ভাবে রক্ষা কোর্লে তাতে আমি একেবারে আশ্চর্য্য হোয়ে গিয়েচি! আর যদি ভুল না কোরে থাকি, তা হোলে ইনি বোধ হয়—
কঙ্কাবতী।
আমার niece মিস্ বিজলী মজুমদার।
হরেন।
নমস্কার, মিস্ মজুমদার, আপনাকে শত নমস্কার। (বিজলীর চিত্রের প্রতি অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া) আপনার এই নকল মূর্ত্তিখানা দেখা অবধি আপনার আসল মূর্ত্তির সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য প্রাণটা অত্যন্ত ব্যাগ্র হোয়ে উঠেছিল। আমার পরম সৌভাগ্য যে, আপনি ঠিক সন্ধিক্ষণে এসে উপস্থিত হোয়েছেন। এখন আপনি একটা সমস্যার মীমাংসা কোরে দিলেই আমরা—অর্থাৎ আমার বন্ধু ও আমি—নিশ্চিন্ত হই। আমরা নিজে সেটার সমাধান ক’র্তে গিয়ে দু’জনে দু’রকম সিদ্ধান্ত কোরে ব’সেচি—
বিজলী।
(সহাস্যে) সমস্যাটা কি?
হরেন।
সমস্যাটা হোচ্চে এই যে, তরুণীরা কোনটার বেশী পক্ষপাতী?—বাইরের রূপের না ভেতরের জ্যোতির?
বিজলী।
আপনার বন্ধুর সিদ্ধান্ত কি?
হরেন।
সেটা নাই বা শুন্লেন।
বিজলী।
কিন্তু আমি উত্তর দেবার আগে জান্তে চাই যে (ইজেলস্থিত চিত্রের দিকে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া) এই ছবিটা কার ছবি? কাঙ্গালিনীমেয়ের না কুবের কন্যার? হাতে ত দেখ্ছি আর্টিষ্ট মশাই ফুল গুঁজে দিয়েচেন—লক্ষ্মীর কৌটো দেন নি!
জ্যোতির্ম্ময়।
বুঝেচি বিজলী—
বিজলী।
যে জ্যোতি প্রাসাদের দিকে না গিয়ে কাঙ্গালিনীর কুঁড়ে ঘর আলো কোর্তে ছুটে যায়, কাঙ্গালিনী তার মর্য্যাদা—তার আদর—জানে। কি বেশে কোন পথে সে আলো এল’ তা’ দেখ্তে অভাগিনী ব্যস্ত হয় না। সে চায় আলো—লণ্ঠনটা ফুলকাটা কি প্লেন—সে চর্চ্চা কোরে সে মাথা ঘামায় না! এমন কি, যদি সে তরুণীও হয় তা’ হোলেও না—কারণ, তরুণীরাও মানুষ—তাদেরও প্রাণ আছে।
জ্যোতির্ম্ময়।
বিজলী, আর লজ্জা দিও না। নীচমনা আমি, তাই তোমার ঐ শুভ্র পবিত্র হৃদয়ের প্রতি সন্দেহ কোরেছিলুম। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি হোতে পারে জানি না।
হরেন।
আমি জানি, কিন্তু বিধান দেবার আগে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি,—মিস্ মজুমদারের মামার বিষয় প্রাপ্তির কথা কি সত্য?
জ্যোতির্ম্ময়।
হাঁ সত্য। আরও তুমি শুনে আশ্চর্য্য হবে যে, সে অগাধ সম্পত্তির অর্দ্ধেকের মালিক আমি! (কঙ্কাবতীকে দেখাইয়া) এই দেবীই সে সংবাদ বহন কোরে এনে এ আঁধার ঘরে আলো জ্বেলেচেন!
হরেন।
ব্যাপারটা যে ভয়ঙ্কর রকম রোমাণ্টিক ঠেক্চে! এরই মধ্যে তোমার সঙ্গে মিস্ মজুমদারের কোন বিশেষ সম্পর্ক আবিষ্কার কোরে ফেলেচ না কি? মাসতুত ভাই-টাই? কিন্তু তুমি ত উকীল নও—এ বুদ্ধি—
জ্যোতির্ম্ময়।
না ভাই, উনি আমার আরাধ্যা, তা ছাড়া অন্য কোন সম্পর্ক ওঁর সঙ্গে আমার নেই। কিন্তু এ কথা সত্য যে ওঁর মামার বিষয়ের অর্দ্ধেকের মালিক উনি, আর অর্দ্ধেকের মালিক আমি! কেমন কোরে এই অসম্ভব ব্যাপার ঘোট্ল তা পরে শুন্বে।
হরেন।
কিন্তু এ অবস্থাটা ত’ আমি একেবারেই সুবিধাজনক বোলে বিবেচনা করি না। এ রকম ভগ্নাংশকে ইংরেজ অঙ্কশাস্ত্রবিদেরা নাম দিয়েচেন vulgar অর্থাৎ ইতরজনোচিত—বোধ হয় এ অবস্থায় অনেক রকম দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় বোলে! কিন্তু আমাদের লক্ষ্মী ঠাক্রুণ ত এমন vulgarityর মধ্যে বাস কোর্তে পারেন না। সুতরাং আমি প্রস্তাব কর্চি যে এই ভগ্নাংশ দুটো যোগ কোরে একটা পূর্ণ সংখ্যা কোরে নেওয়া হোক্।
কঙ্কাবতী।
হিয়ার—হিয়ার! আমি এ প্রস্তাব সর্ব্বতোভাবে সমর্থন ক’র্চি।
রামচন্দ্র।
গয়লানী এসেচে।
হরেন।
হাঁ, রামচন্দ্র, এবার গোয়ালিনী সত্যই এসেচে—কিন্তু শনি নয়, লক্ষ্মী! কাঁকে তাঁর এক পোয়ায় তিনপো-জল মিশান দুধের কেঁড়ে নয়—স্বর্গের সুধাভরা সোনার কলসী! গড় কর রামচন্দ্র, গড় কর।
[ রামচন্দ্র কিছুই না বুঝিতে পারিয়া সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিল ]
(চন্দ্র প্রকাশের প্রবেশ)
চন্দ্র।
এই যে এখনও আপনারা এখানে রোয়েচেন! আমার একটু বিলম্ব হোয়ে গেচে। কেমন, বাড়ী পছন্দ হোয়েচে ত?
কঙ্কাবতী।
(সহাস্যে) অত্যন্ত।
চন্দ্র।
তবে আর কি? ভাড়ার terms এখনই settle কোরে ফেলুন।
হরেন।
তুমি এখানে আসবার আগেই ওঁরা বাড়ীওয়ালার সঙ্গে একেবারে মৌরসী বন্দোবস্ত কোরে ফেলেচেন।
চন্দ্র।
চমৎকার কথা! অবশ্য এতে কমিশন কিছু বেশী পোড়্বে, কিন্তু তাহোলেও এতে দুপক্ষেরই সুবিধা হবে। মিষ্টার শ্রীমানি, make a note of that. [সোৎসাহে রোহিনীর উদ্দেশ্যে চন্দ্রের কর সঞ্চালন। কিন্তু রোহিণী অনুপস্থিত; ফলে চন্দ্রের সজোর চপেটাঘাত পার্শ্বে দণ্ডায়মান রামচন্দ্রের স্কন্ধের উপর পড়িল! রামচন্দ্র হতভম্ব!]
চন্দ্র।
(অপ্রস্তুত হইয়া রামচন্দ্রের স্কন্ধে হাত বুলাইতে বুলাইতে) Oh, excuse me!
কঙ্কাবতী।
(হাস্য সম্বরণ করিয়া) বোধ হয় শিগ্গীর আর একটা ব্যাপারে আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হবে। সেটাতে সম্পূর্ণভাবে মুন্লাইটেরই অধিকার।
চন্দ্র।
কি? কি? Moonlight is always at your service. আদেশ করুন কি কোর্তে হবে?
কঙ্কাবতী।
আস্ছে মাসে এ বাড়ীতে একটা বিয়ে হবে—
চন্দ্র।
O, my hearty congratulations! তা’ ম্যাডাম কি একজন partner নিয়ে medical profession চালাবেন স্থির কোরেচেন? এ অত্যন্ত সুখের কথা! প্রজাপতির আশীর্ব্বাদে—
কঙ্কাবতী।
No, you idiot! I see you want another dose of my Sparks. (টেবিল হইতে শিশি লইলেন)
চন্দ্র।
(সভয়ে মুখে হাত দিয়া) দোহাই, রক্ষা করুন, আর না! I beg your pardon—বিবাহ তবে কার?
হরেন।
(কঙ্কাবতীর প্রতি) আপনার ও অমুল্য ওষুধ আর অপাত্রে ন্যস্ত কোরবেন না। ওটা রাজা রূপচাঁদের জন্যই রেখে দিন। তিনিই আপনার যোগ্য পাত্র—I mean আপনার ওষুধের—(চন্দ্রের প্রতি) চন্দরদা’, জিজ্ঞাসা কোর্ছিলে কার বিবাহ? পাত্র পাত্রী তোমার সম্মুখেই উপস্থিত! পাত্র আমাদের পুরাতন বন্ধু জ্যোতির্ম্ময় মতিলাল, আর পাত্রী তার আঁধার ঘরের বিজ্লী বাতি এই শ্রীমতী বিজলী মজুমদার!
চন্দ্র।
O my most cordial felicitations! (জ্যোতির্ম্ময়ের হাত ধরিয়া সেক্হ্যাণ্ড করিল)
হরেন।
এই বিয়ের ঘট্কালিতে আমার দাবী বেশী হোলেও তোমার দাবী আমি অস্বীকার করিতে পারি না—কারণ তোমার ওখান থেকে moonstruck না হোয়ে আস্লে আমি এতটা কৃতকার্য্য হোতে পার্তুম কিনা সন্দেহ!
চন্দ্র।
নিশ্চয়—নিশ্চয়! মিষ্টার শ্রীমানি—ওঃ (হাত তুলিয়া নামাইয়া লইল)
হরেন।
কিন্তু মিস্ মজুমদার, আমার কমিশনটা আমি এখনই নগদ চাই।
বিজলী।
(সহাস্যে) কি কমিশন দিতে হবে। আপনাকে refuse করা আমার অসাধ্য।
হরেন।
প্রথমে ভেবেছিলুম bridegroom-এর কাছ থেকে এই ছবিখানা কমিশন স্বরূপ আদায় কোর্ব, কারণ সে যখন আসলটির অধিকারী হোচ্চে তখন নকলটি ছাড়্তে তার আপত্তি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু তার পরেই মনে প’ড়ল ওর সেই একগুঁয়েমির কথা। বুড়ো রাজা রূপচাঁদ ঐ ছবিখানার জন্য যখন এক হাজার টাকা পর্য্যন্ত দিতে চাইলে তখন অনাহার-মৃত্যুর প্রত্যক্ষ মূর্ত্তি সম্মুখে দেখেও কিনা ও স্বচ্ছন্দে বোলে ফেল্লে, প্রাণ দেবো তবু এটা ছাড়বোনা—
[ প্রেম ও কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চক্ষে জ্যোতির্ম্ময়ের প্রতি বিজলীর দৃষ্টিক্ষেপ ]
চন্দ্র।
(স্বগত) The fool! আহম্মক আর কাকে বলে!
হরেন
সুতরাং ও ছবিখানা চাওয়াও যা, আর বন্ধুবরের প্রাণটা ধোৱে টানাটানি করাও তা! সেটা আর এখন কোর্তে সাহস হয় না, কারণ ওর প্রাণটা এখন আর ওর নিজস্ব নয়। অতএব আপনার নামে বিল করা ছাড়া উপায় নেই। আমার দাবী খুব বেশী নয়—কেবল bride-এর স্বমুখের একটি গান!
জ্যোতির্ম্ময়।
Bridegroom এ বিল heartily accept কোর্চে।
কঙ্কাবতী।
আর bride ত আগে থাক্তেই blank bill accept কোরেচে।
[ বিজলী ঈষৎ হাসিয়া গাহিতে আরম্ভ করিল ]
গীত।
হে, কবি, হে সুন্দর, হে চিত্রকর!
তুমি কতই রূপে কতই ছবি আঁক্ছ নিরন্তর!
আমি বিভোর হোয়ে দেখি—আমি অবাক্ হোয়ে যাই!
তুমি আঁধারে ঢালো রবির আলো—
আর সাঁজ সকালে রাঙিয়ে তোল রক্তরাগে গগনতল!
আবার নিশীথ রাতে সেই পটেতে—
কতই মাণিক কতই হীরে করে ঝলমল!
অপরূপ সে রূপটি দেখে আমি মুগ্ধ হোয়ে চাই—
আমি অবাক্ হোয়ে যাই!
সবুজ ক্ষেতে নীল সাগরে—
ফুলের বনে গিরি শিয়রে—
কি কাগুনে কি আষাঢ়ে—আঁক্ছ তুমি কতই ছবি—অন্ত ত তা’র নাই!
নিতুই নব সেরূপ দেখে আমি অবাক্ হোয়ে যাই!—
ওগো কোন্ তুলিতে এমন যাদু ভেবে নাহি পাই!
যবনিকা।
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।