আকাশ-প্রদীপ/ময়ূরের দৃষ্টি

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


দক্ষিণায়নের সূর্যোদয় আড়াল ক'রে
                                  সকালে বসি চাতালে ।
                          অনুকূল অবকাশ ;
               তখনো নিরেট হয়ে ওঠে নি কাজের দাবি,
                          ঝুঁকে পড়ে নি লোকের ভিড়
                                   পায়ে পায়ে সময় দলিত করে দিয়ে ।
                                        লিখতে বসি ,
                                  কাটা খেজুরের গুঁড়ির মতো
              ছুটির সকাল কলমের ডগায় চুঁইয়ে দেয় কিছু রস ।

  
                     আমাদের ময়ূর এসে পুচ্ছ নামিয়ে বসে
                                  পাশের রেলিংটির উপর ।
                     আমার এই আশ্রয় তার কাছে নিরাপদ ,
         এখানে আসে না তার বেদরদী শাসনকর্তা বাঁধন হাতে ।
               বাইরে ডালে ডালে কাঁচা আম পড়েছে ঝুলে ,
                     নেবু ধরেছে নেবুর গাছে ,
                          একটা একলা কুড়চিগাছ
               আপনি আশ্চর্য আপন ফুলের বাড়াবাড়িতে ।
                                  প্রাণের নিরর্থক চাঞ্চল্যে
                          ময়ূরটি ঘাড় বাঁকায় এদিকে ওদিকে ।
                                   তার উদাসীন দৃষ্টি
               কিছুমাত্র খেয়াল করে না আমার খাতা-লেখায় ;
         করত , যদি অক্ষরগুলো হত পোকা ;
               তা হলে নগণ্য মনে করত না কবিকে ।
         হাসি পেল ওর ওই গম্ভীর উপেক্ষায় ,
               ওরই দৃষ্টি দিয়ে দেখলুম আমার এই রচনা ।
                     দেখলুম , ময়ূরের চোখের ঔদাসীন্য
                                  সমস্ত নীল আকাশে ,
               কাঁচা-আম-ঝোলা গাছের পাতায় পাতায় ,
                         তেঁতুলগাছের গুঞ্জনমুখর মৌচাকে ।
ভাবলুম , মাহেন্দজারোতে
                      এইরকম চৈত্রশেষের অকেজো সকালে
                          কবি লিখেছিল কবিতা ,
                     বিশ্বপ্রকৃতি তার কোনোই হিসাব রাখে নি ।
               কিন্তু , ময়ূর আজও আছে প্রাণের দেনাপাওনায় ,
                     কাঁচা আম ঝুলে পড়েছে ডালে ।
                নীল আকাশ থেকে শুরু করে সবুজ পৃথিবী পর্যন্ত
                     কোথাও ওদের দাম যাবে না কমে ।
               আর , মাহেন্দজারোর কবিকে গ্রাহ্যই করলে না ।
                    পথের ধারের তৃণ , আঁধার রাত্রের জোনাকি ।

  
                     নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথিবীতে
                          মেলে দিলাম চেতনাকে ,
               টেনে নিলেম প্রকৃতির ধ্যান থেকে বৃহৎ বৈরাগ্য
                                  আপন মনে ;
                     খাতার অক্ষরগুলোকে দেখলুম
                                        মহাকালের দেয়ালিতে
                          পোকার ঝাঁকের মতো ।
                     ভাবলুম , আজ যদি ছিঁড়ে ফেলি পাতাগুলো
               তা হলে পর্শুদিনের অ ন্ত্য সৎকার এগিয়ে রাখব মাত্র ।

  
         এমন সময় আওয়াজ এল কানে ,
               “ দাদামশায় , কিছু লিখেছ না কি । '
                      ওই এসেছে — ময়ূর না ,
                          ঘরে যার নাম সুনয়নী ,
                     আমি যাকে ডাকি শুনায়নী ব ' লে ।
               ওকে আমার কবিতা শোনাবার দাবি সকলের আগে ।
               আমি বললেম , “ সুরসিকে , খুশি হবে না ,
                          এ গদ্যকাব্য । ”
               কপালে ভ্রূকুঞ্চনের ঢেউ খেলিয়ে
                          বললে , “ আচ্ছা , তাই সই । ”
                     সঙ্গে একটু স্তুতিবাক্য দিলে মিলিয়ে ;
 বললে , “ তোমার কণ্ঠস্বরে ,
                                  গদ্যে রঙ ধরে পদ্যের । ”
                     ব ' লে গলা ধরলে জড়িয়ে ।
         আমি বললেম , “ কবিত্বের রঙ লাগিয়ে নিচ্ছ
                     কবিকণ্ঠ থেকে তোমার বাহুতে ?”
         সে বললে , “ অকবির মতো হল তোমার কথাটা ;
               কবিত্বের স্পর্শ লাগিয়ে দিলেম তোমারই কণ্ঠে ,
                      হয়তো জাগিয়ে দিলেম গান । ”

  
               শুনলুম নীরবে , খুশি হলুম নিরুত্তরে ।
         মনে-মনে বললুম , প্রকৃতির ঔদাসীন্য অচল রয়েছে
               অসংখ্য বর্ষকালের চূড়ায় ,
         তারই উপরে একবারমাত্র পা ফেলে চলে যাবে
                           আমার শুনায়নী ,
                     ভোরবেলার শুকতারা ।
         সেই ক্ষণিকের কাছে হার মানবে বিরাটকালের বৈরাগ্য ।
  
               মাহেন্দজারোর কবি , তোমার সন্ধ্যাতারা
                          অস্তাচল পেরিয়ে
                     আজ উঠেছে আমার জীবনের
                           উদয়াচলশিখরে ।