বিষয়বস্তুতে চলুন

আঙুর/আদেশ পালন

উইকিসংকলন থেকে

আদেশ পালন।

 পরীক্ষায়, বহুবার ফেল্ হইলে ছাত্র যেমন সিদ্ধিলাভে হতাশ হইয়া পড়ে, আমার বিবাহের বিস্তর সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় উহাতে সিদ্ধিলাভ সম্বন্ধে আমিও সেইরূপ সন্দিহান্‌ হইয়াছিলাম। যাহা হউক বহুকাল পরে হঠাৎ একদিন একটি নূতন সম্বন্ধ আসিয়া উপস্থিত। ঘট্‌কী রূপবর্ণনা করিবার পূর্ব্বেই আমি মনে-মনে পাত্রীর ছবি আঁকিয়া ফেলিলাম— ত্রয়োদশ বর্ষীয়া বালিকা—রঙটুকু চাঁপা ফুলের মত—এক পিঠ কালো চুল, তাহার কতকগুলি গণ্ড বহিয়া বক্ষে পড়িয়া বাতাসে সর্পশিশুর মত খেলা করিতেছে-সুন্দর নিটোল ললাট, যেন আধখানি চাঁদ ফুটিয়া আছে-তুলিটানা বঙ্কিম ভ্রূরেখার নিম্নে দুইটি ডাগর চক্ষু-মধ্যভাগে “শুকচঞ্চুজিনি নাসা”— তাহার নীচে দুইখানি গোলাপের পাপড়ি—কিন্তু, হায়! আমার কল্পনার ছবিখানি শেষ না করিতেই ঘটক-ঠাকুরাণী তাঁহার ব্যবসা-ধর্ম্মের বিরুদ্ধাচরণ করিয়া বলিলেন, “পাত্রীটি সুশ্রী নয়, তবে, দেবে-থোবে ঢের, জামাইকে বিলেত পাঠাবে।” আমার বুক্‌টা যেন ‘ধড়াস্‌’ করিয়া উঠিল! সুশ্রী নয়, অর্থাৎ তবে রীতিমত কুৎসিত!

 ‘দেবে-থোবে ঢের, জামাইকে বিলেত পাঠাবে’ এই কথাটা কিন্তু আমার অভিভাবকের কাণে বড় মিষ্ট লাগিল। বধূর রূপ লইয়া বাড়ির সকলে কি ধুইয়া খাইবে? টাকা! অল্প-স্বল্প নয়—‘বিলেত পাঠাবে জামাইকে! অন্ততঃ দশ বারো হাজার টাকা! শুধু তাই? আবার এক খানা বাড়ি!

 তাহার পর সে এক শুভ দিনে, শুভ লগ্নে, আমার বিবাহ হইয়া গেল— সেই কাল-কুৎসিত মেয়েটার সহিত। একটি জীবন্ত অন্ধকারকে আমি বিবাহ করিয়া আনিয়া ঘর কালো করিয়া তুলিলাম।

 আকাশের অন্ধকারে তারার শোভা আছে, আমার “অন্ধকারে” গহনার শোভা ছিল। অন্ধকার রাত্রে লোকে আকাশের দিকে চাহে অন্ধকার দেখিতে নয়, তারা দেখিতে, আমাদের বাড়িতেও যে মেয়ের গাঁদি লাগিত, তাহারাও, সত্য বলিতে গেলে, গহনা দেখিতেই আসিত।

 বিবাহের আট দিন এক রকমে ত, কাটিয়া গেল। দাম্পত্য প্রেমের প্রথম আলাপ শুনিবার উৎকট ইচ্ছায় অনেককে কক্ষের আশে-পাশে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া, আঁধারে মশক-দংশন সহ্য করিয়া অবশেষে নিরাশ হইতে হইয়াছিল।

 যখন আমার বাম দিকটা অন্ধকার করিয়া তিনি শয়ন করিতেন, তখন আমার মনে হইত, ‘আমি’ রূপ চন্দ্রে ‘তিনি’-রূপ ‘গ্রহণ’ লাগিয়াছেন!

 নয় দিনের দিন আমি ‘গ্রহণ’ মুক্ত হইলাম। এ কয়দিন তাঁহার সঙ্গে আমার বাক্যালাপ—তোমরা যদি বিশ্বাস কর—একটু ও হয় নাই। তবে একদিন হইবার উপক্রম হইয়াছিল। সেদিন বড় গরম পড়িয়াছিল। শয্যার একাংশে পড়িয়া আমি ছট্‌ফট্ করিতেছিলাম, আর ভাবিতেছিলাম—“কোথা থেকে উড়ে এসে (অর্থাৎ শয্যার অর্দ্ধেকটা) জুড়ে বসেছেন”—সেই সময় আমার হৃদয়ের “অন্ধকার” অতি মৃদু—আর, আর, তোমরা যদি ঠাট্টা না কর—অতি মধুর স্বরে বলিলেন, “বাতাস করব?”

 কিন্তু সে মধুরতায় আমার রূপতৃষ্ণা মিটিল না; সুতরাং মনও নরম হইল না। কোন উত্তর না দিয়া আমি বিছানায় পড়িয়া রহিলাম। একটু পরেই চুড়ীর মৃদু আওয়াজের সহিত পাখার বাতাস সুরু হইল! আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম। প্রত্যূষে জাগিয়া দেখি দেবী “অমাবস্যা” আমার পদপ্রান্তে অন্ধকার ছড়াইয়া নিদ্রা যাইতেছেন।

 এক মাস অতীত হইলে আমার বিলাত যাইবার আয়োজন হইতে লাগিল। বিলাত গমনের পূর্ব্বে একবার আমাকে শ্বশুরালয়ে যাইতে হইয়াছিল! যাইবার ইচ্ছা ছিল না—কিন্তু নেহাৎ খারাপ দেখায়, সেই জন্য গিয়াছিলাম, কিন্তু বড় ভয়ে ভয়ে! যদি আবার আমার “অন্ধকার” দেখা দিয়া সম্ভাষণ করিতে আসেন? তাহাকে দেখিলেই আমি যে তাহার স্বামী এই কথাটা আমার মনে আসিয়া পড়িত—আমার তাহাতে লড় লজ্জা ও অপমান বোধ হইত! ছিঃ ছিঃ আমি এই বিশ্বকুৎসিতাটার স্বামী!

 শ্বশুরবাড়ীতে গিয়া দেখি সেখানে রাটিয়া গিয়াছে ‘অন্ধকার’কে আমার পছন্দ হইয়াছে। আমি অতি “সুবোধ” “সুশীল” ইত্যাদি নানাবিধ প্রশংসা-বাণী আমার উপর বর্ষণ করিয়া শ্বশুর বাড়ীর লোকেরা জানাইলেন যে, তাঁহাদের অন্ধকার মেয়েটিকে আমি হাসি মুখে গ্রহণ করিয়াছি শুনিয়া তাঁহারা পরম সুখী! আমি ত শুনিয়া অবাক! তাঁহারা যে আমাকে এইরূপ সৌন্দর্য্যজ্ঞানহীন ভাবিয়াছেন ইহাতে আমি মনে মনে বড়ই চটিয়াছিলাম—কিন্তু হাজার হোক্‌ তবু শ্বশুরবাড়ী!

 সেদিন সেখানেই রাত্রিটা কাটাইতে হইল। ‘অন্ধকার’ আসিয়া আমার প্রণাম করিলেন। আনাকে নীরব দেখিয়া ‘তিনি’ একটি ছোট্ট নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “আমি তোমার কি করেছি?”

 আমি নীরব। এবার যেন একটু অভিমানভরে তিনি বলিলেন, “আমি কালো কুৎসিত, তা তুমি কেন আবার বিবাহ কর না!”

* * *

 শ্বশুরের অর্থে বিলাত যাত্রা করিলাম। যাত্রী করিবার পূর্ব্বে যেরূপ আনন্দ হইয়াছিল, আত্মীয় স্বজনকে ছাড়িয়া যাইবার সময় তাহা রহিল না। বন্দর হইতে জাহাজ যতই সমুদ্রের দিকে যাইতে লাগিল আমার হৃদয়ের স্নেহে ততই টান পড়িতে লাগিল! দেশের প্রতি, দেশের দশ জনের প্রতি যে ভালবাসা এতদিন আমার অজ্ঞাতসারে অন্তরে বিলীন হইয়াছিল আজ সহসা যেন সে আমার সম্মুখে আসিয়া আত্মপরিচয় দিয়া দাঁড়াইল। সঙ্গে যে কয়জন বাঙালী ছিলেন তাঁহারাই যেন আমার একান্ত আত্মীয় হইয়া উঠিলেন। বাঙ্‌লা দেশ ছাড়িয়া প্রথম বুঝিলাম, বাঙলা দেশকে কতখানি ভালবাসি—তখন বাঙ্‌লা দেশে, বাঙালীর মধ্যে সকলকেই আমার প্রিয়জন বলিয়া মনে হইল। আর আমার “অন্ধকার”? আহা, সে-ও তো বাঙ্‌লাদেশের মাটিতে জন্মিয়াছে!

 মনে করিলাম, বিলাত পৌঁছিয়া তাহাকে পত্র দিব। কিন্তু সেখানে গিয়া তাহাকে পত্র দেওয়া দূরে থাক, জন্মভূমির প্রতি আমার যে মনের ভাব ছিল, তাহারো পরিবর্ত্তন হইয়া গেল! পোষ্যপুত্র যেমন পালিকা মাতার বাহিরের বিভব দেখিয়া তাহাতেই আব্বষ্ট হইয়া আপনার স্নেহময়ী দুঃখিনী মাতাকে অবজ্ঞার চোখে দেখিতে থাকে, আমার দশাও কতকটা সেইরূপ দাঁড়াইয়াছিল। ইংলণ্ড আর ভারতবর্ষ! স্বর্গ আর মর্ত্ত্য! তখন ভুলিয়া গিয়াছিলাম, ইংলণ্ডে এ স্বর্গের সৃষ্টি কাহার ধনরত্নে হইয়াছিল!

 পড়াশুনায়, আমোদ-আহ্লাদে, বিলাস-বিভ্রমে তিন বৎসর কাটাইয়া দিলাম। বিলাতে থাকিবার সময় আমার দুই কুল (পিতৃ ও শ্বশুর) হইতে চিঠিপত্র আসিত। আমিও নিয়মমত উত্তর দিতে ক্রটী করিতাম না। আমার “অন্ধকার” ও আমায় দুইখানি চিঠি লিখিয়া তাহার উত্তর না পাইয়া আর আমায় চিঠি লিখিয়া অনুগৃহীত করেন নাই! আমিও তাহাতে তখন বিশেষ দুঃখিত হইয়াছিলাম বলিয়া ত মনে হয় না। তাঁহার পত্রের এক স্থানে লেখা ছিল, “বাড়ী ফিরিবার আগে আমায় খবর দিয়ো।” আমি কিন্তু কথা মত কাজ করি নাই—আর করিলেই কি হইত!

 ব্যারিষ্টার হইয়া দেশে ফিরিলাম। ফ্লোরা সঙ্গে আসিবার জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়াছিল, নানা কারণে তাহার ইচ্ছা পূর্ণ করিতে পারিলাম না। আমার মনে হইয়াছিল যেন প্রাণের আধখানা সেই শ্বেতদ্বীপে রাখিয়া আমি স্বদেশে ফিরিতেছিলাম। ফ্লোরা আমার কে? আজ সে আমার কেহ নয়!

 প্রবাস হইতে যেদিন বাঙালী বাঙ্‌লা দেশের কোলে ফিরিয়া আসে, সেদিন তাহার কি আনন্দ! কিন্তু আমার মত দুর্ভাগ্যের কপালে সে আনন্দলাভ ঘটে নাই! বিদেশের লতাকে প্রাণে জড়াইয়া বিদেশেই ফেলিয়া আসিত হইলে, বুঝি, মানুষের কপালে স্বদেশের স্নেহলাভ তেমন ঘটে না!

 কলিকাতায় পৌঁছিয়া দেখি, আত্মীয়-স্বজনেরা আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। দেখিয়া ভাবিলাম বাড়িতে অবরোধের মধ্যে কতগুলি হৃদয় আমার আগমন প্রতীক্ষার বসিয়া আছে। সেই সঙ্গে আমার ‘অন্ধকার’ও হয় ত পথ চাহিয়া আছে! আবার মনে হইল, কেন সে থাকিতে যাইবে? আমার দ্বারা সে কতটুকু সুখী হইয়াছে?

 ফ্লোরাকে ভালবাসি আর যাই করি ‘অন্ধকারকে’ আর ব্যথা দিব না এইটা একরকম ঠিক করিয়াছিলাম। কিন্তু বাড়ি আসিয়া তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। রাত্রি আসিল, কিন্তু আমার অন্ধকার কৈ! আমার নিকট আসিল না ত! ভাবিলাম একবার শ্বশুরবাড়ী যাই! কিন্তু মনে একটু অভিমান হইল! তিন বৎসর পরে বিদেশ হইতে আসিলাম, এখন কি না ‘তিনি’ বাপের বাড়ি বসিয়া রহিলেন! কিন্তু আমি ত, তাহার প্রার্থনা মত তাহাকে জানাই নাই যে আমি বাটি যাইতেছি! ইচ্ছা করিলে সে কি জানিতে পারিত না, আমি কবে আসিব? আমার রাগ-অভিমান হইতে পারে তাহারি কি হইতে পারে না? তবু কেমন রাগ হইল—শ্বশুরবাড়ী যাওয়া স্থগিত রাখিলাম।

 তাহার পর এক সপ্তাহ কাটিয়া গেল। বাটীর কাহারও নিকট তাহার সম্বদ্ধে কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না—কেহ উপযাচক হইরাও আমাকে কিছু বলিতে আসিল না।

 ইহার কিছুদিন পরেই ঘটকঠাকরুণ দশহাজার টাকার এক সম্বন্ধ লইয়া উপস্থিত! আবার আমার বিবাহ! এবার মেয়ে নিখুঁত সুন্দরী! বাড়ীর মেয়েদের বড় আহলাদ। এবার তাঁহারা কালোকুৎসিত বউ ফেলিয়া আলো করা বউ ঘরে তুলিবেন! আর আমি!

 শুভসংবাদ যেমন আগ্রহে মানুষ মানুষকে জানায়, বাড়ীর মেয়েরা তেমনি আগ্রহভরে আমাকে জানাইলেন যে, সেই ‘কালো বৌ’ আজ দু’মাস হইল, মারা গিয়াছে!

 তাঁহারা ভাবিয়াছিলেন এ সংবাদে আমি সুখী বই অসুখী হইব না—নিজেও আমি তাহা মনে করিতাম—কিন্তু কই সুখী হইতে পারিলাম না তো! আমার মর্ম্মে মর্ম্মে একটা আঘাত বেদনা জাগিল; তাহার প্রতি আমার নিষ্ঠুর ব্যবহার স্মরণ করিয়া আমি এক মুহূর্ত্তে জাগরিত, সন্তপ্ত, অনুতপ্ত হইয়া উঠিলায়। তাহার প্রতি নিমেষের জন্য আমার যে করুণা জাগিয়া উঠিয়াছিল এই মৃত্যুসংবাদে তাহা জ্বলন্ত প্রেমরূপে হৃদয় দগ্ধ করিয়া তুলিল। জীবনে আমার জন্য যে সতত লালায়িত হইয়া থাকিত মৃত্যুতে তাহারি জন্য আমার হৃদয় চির লালায়িত হইয়া উঠিল। একদিন যে আমার নয়নে অসুন্দর, ধ্যানে অপ্রিয়, জীবনে অভিসম্পাত স্বরূপ ছিল, মৃত্যু আজ তাহাকে আমার অন্তরনয়নে চিরসুন্দর, ধ্যানে চিরপ্রিয়, পরজন্মের আকাঙ্খিত বস্তু করিয়া তুলিল! কেন এমন হইল? জানিনা!

 একমাস পরে অনেক ডাকঘরের ছাপ-পড়া একটী পার্শেল আমার নিকট পৌঁছিল। দেখিলাম, পার্শেলটি কলিকাতা হইতে পাঠান হইয়াছিল। তাহারপর স্বদেশে ফিরিবার সময় আমি যে যে দেশ ভ্রমণ করিতে গিয়াছিলাম পার্শেলটিও সেই সেই দেশ ঘুরিয়া শেষে এখানে আসিয়াছে। কিন্তু উহার ভিতর জিনিষটা কি? কে উহা এখান হইতে পাঠাইয়াছিল? বুঝিতে পারিলাম না। পার্শেলটা খুলিয়া ফেলিলাম।

 দেখিলাম, একখানি ফটো—তাহার তলে লেখা, “তুমি আসিয়া আবার বিবাহ করো, আর এখানা পুড়াইয়া ফেলো।”

 এই আদেশের দুইটিই আমি পালন করিব প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। একটি ইহারি মধ্যে পালন করিয়াছি—আবার আমি বিবাহ করিয়াছি! কাহাকে? সেই ফোটোখানিকে!

 ফোটোখানি পুড়াইয়া ফেলিবারও আদেশ আছে। সে আদেশও পালন করিব, যেদিন পুড়িয়া ছাই হইব, সেইদিন!