আঙুর/এপ্রিল্-ফুল
এপ্রিল্ -ফুল্।
১
নীহারিকা একদিন তাহার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা, আমি যদি এখন মরি, তুমি কি কর?”
সুকুমার গভীর ব্যথার ব্যঙ্গভাব প্রকাশ করিয়া বলিল, “ওঃ! তাহলে?—একটা মস্ত কবিতা লিখে ফেলি!”
নীহারিকা কহিল, “না—ঠাট্টা নয়! সত্যি বল—তুমি ফের বে কর?”
“তুমি আমায় এত অধম ভাব?”
নীহারিকা হাসিয়া বলিল, “দেখা যাবে!”
“কি দেখবে?”
“এই, ফের বে কর কিনা।”
সুকুমার একটু বিরক্ত-ব্যথিত হইয়া বলিল, “যদি বে-ই করি, তুমি আর দেখবে কোত্থেকে?”
নীহারিকা মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিল, “সে তখন বুঝবে!”
ইহার কিছু দিন পরে নীহারিকা তাহার পিতার কর্ম্মস্থল—হাজারিবাগে গেল। বড় বোন প্রভাতকুমারীও স্বামীর সহিত তখন পিত্রালয়ে আসিয়াছিল। অরুণ বাবুর শরীর খারাপ, ছুটি লইয়াছেন—এখন হাজারিবাগেই থাকিবেন। লোকনাথবাবু, জামাতাকে পৃথক বাটী ভাড়া করিতে দেন নাই।
২
এপ্রিল মাসের আর বেশী দেরী নাই। প্রভাত বলিল, “নীহার, আয়, সুকুমারবাবুকে ‘এপ্রিল ফুল্’ করি।”
নীহারিকা সাহ্লাদে বলিয়া উঠিল, “বেশ ত! আমার একটা প্ল্যানও তৈরি আছে।”
“সত্যি নাকি? কি, বল্ দেখি! যাতে ঠকে, এমন করতে হবে!”
“নিশ্চয়ই ঠক্বেন, তা ছাড়া সেই সঙ্গে বেশ একটা রীতিমত একজামিনও করা হবে!”
“তা হলেত খুব মজা!—কি প্ল্যান করেচিস্?”
নীহারিকা বলিল, “একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস্ কল্লুম— ‘আমি যদি মরে যাই, তুমি কি কর’—”
প্রভাত খুব হাসিয়া উঠিয়া বলিল, “ও হরি! সকলেরই দেখচি এক রোগ!”
নীহারিকা বলিল, “ওমা! তুমিও বুঝি ঐ কথা জিজ্ঞেস্ কর?—তা, কি উত্তর পাও?”
“তিনি অম্নি চোখদুটো কপালে তুলে বলেন, ‘তা হলে ঘন ঘন মূর্চ্ছা যাব, আর কবিতা লিখব’!”
নীহারিকা গালে হাত দিয়া বলিল— “সকলের দেখ্চি এক প্রেস্কৃপশান!”
“তা যাক্, এখন তোর প্ল্যানটা কি শুনি।”
“অরুণবাবুকে দিয়ে একখানা চিঠি তাঁকে লেখান যাক যে, হঠাৎ হার্টফেল হয়ে মরে গেছি! দেখি, কি করেন।”
প্ল্যানটা প্রভাতের মনে তত সুবিধার বলিয়া বোধ হইল না। নীহারিকার দিকে চাহিয়া সে বলিল, “দূর! সেকি ভাল? —”
নীহার বলিল, “তোমার ভয় নেই, দিদি, আমি মরবো না!”
“দূর, তা কেন?”
“তবে কি?”
“যদি আবার বে করে বসে!”
নীহারিকার মুখ একটু লাল হইয়া উঠিল, সে বলিল, “সেটুকু বিশ্বাস আছে।”
প্রভাত কহিল, “তবে আবার একজামিন, কেন?”
“ভাল ছেলেকেও ত একজামিন দিতে হয়!”
প্রভাত কৃত্রিম দুঃখে বলিল, “আহা, বেচারা সেই ছেলে বেলা থেকে একজামিন দিতে দিতে জ্বালাতন হয়ে গেচে—আবার তোর কাছে একজামিন!”
নীহারিকা হাসিয়া বলিল, “পুরুষের সারাজীবনই ত একজামিন।”
এমন সময়ে অরুণচন্দ্র সেখানে আসিয়া বলিলেন, “আর মশায়রা বুঝি বসে বসে প্রাইজ দেবেন!”
অরুণবাবুর দিকে না চাহিয়াই নীহার হাসিয়া বলিল, “সেই রকম ত মনে হয়!”
৩
‘এপ্রিল-ফুলের' প্ল্যান শুনিয়া অরুণচন্দ্র প্রথমটা রাজি হইলেন না, কিন্তু হঠাৎ আর একটা মতলব তাঁহার মাথার আসিল। তিনি বলিলেন, “বেশ, আমি রাজী!”
নীহারিকা ও প্রভাত সকৌতুক ব্যগ্রতার সহিত সুকুমারের পত্রের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল।
পাঁচ দিনের দিন সুকুমারের নিকট হইতে পত্র আসিল। অরুণ বলিলেন, “নীহার, দেখ, সুকুমার ‘মাই ডিয়ার অরুণবাবু’—লিখেই তোমার শোকে চোখের জলে ভেসে গেছে—এই দেখ, কাগজ চুপ্সে গেছে!”
স্বামীর সুগভীর স্নেহ স্মরণ করিয়া নীহারিকার ডাগর চক্ষু দুইটী অশ্রুসজল হইয়া উঠিল!
কিছু দিন পরে প্রভাতের নিকট সুকুমারের সম্পাদিত ‘মলয়া’র চৈত্র সংখ্যা আসিল। নীহারিকা দেখিল, কাগজের প্রথমেই আর একখানি ‘উদ্ভ্রান্ত প্রেমে’র সৃষ্টি হইয়াছে! প্রবন্ধের নীচে লেখা, “অভাগা”।
দুই ভগিনীতে খুব খানিকটা হাসিলেও প্রিয়জনকে কৌতুকের খাতিরে বেদনা দেওয়ায় নীহারিকা অন্তরে অন্তরে ব্যথা অনুভব করিল। নীহারিকা বলিল, না, “ভাই, আর বেচারাকে কষ্ট দিয়ে কাজ নেই, এবার বহরমপুর যাওয়া যাক্!”
প্রভাত রাজী হইল না, বলিল, “আচ্ছা, আর একটু দেরী করনা, বেদনা ও বিরহ আর একটু পেকে আসুক।”
বৈশাখের “মলয়ায়” নীহারিকা দেখিল, তাহার ছবি বাহির হইয়াছে— চারি ধারে মোটা কালো ‘বর্ডার’, মধ্যে একটী করুণ মর্ম্মস্পর্শী সনেট! নীহারের ব্যথিত প্রাণ বহরমপুর যাইবার জন্য আবার অস্থির হইয়া উঠিল! প্রভাত বাধা দিল। আরও চারি মাস কাটিয়া গেল—ইহার মধ্যে “মলয়াতে” নীহারিকার শোকে অনেকগুলি কবিতা প্রকাশিত হইরাছে! সেই সঙ্গে সম্পাদকের ব্যঙ্গরসাত্মক কয়েকটী ক্ষুদ্র গল্পও আছে।
নীহার একটু আশ্চর্য্য হইয়া প্রভাতকে একদিন বলিল, “আচ্ছা! তাঁর যদি মন খারাপ, তা হলে এমন হাসির লেখা বেরুচ্চে কেমন করে?”
প্রভাত হাসিয়া বলিল, “ঐটি পুরুষদের বিশেষত লেখক-জাতের বাহাদুরী! আরও এরকম কাণ্ড আমি অনেক দেখেছি!”
নীহারিকা বলিল, “তবে কি পুরুষের হাসাও মিছে কাঁদাও মিছে?”
“ভাদ্রের রোদ-বিষ্টি কি মিছে?”
“মিছে নয় বটে, কিন্তু কোন কাজেরও নয়—সে জলে মাটিও তেমন ভেজেনা, সে রোদে কাপড়ও শুখোয় না!”
৪
আশ্বিন মাস। ছুটির আগেই ‘মলয়া’ বাহির হইবার কথা। নীহারিকা ভাবিতেছিল, এবার সে পূজার সংখ্যার ছদ্মাবরণে প্রিয়তমের ব্যথিত প্রাণের আর একটু ভাবতরঙ্গ পাইবে—না জানি পূজার ‘মলয়া'র ছত্রে ছত্রে বর্ণে-বর্ণে তাঁহার কত মর্ম্মপীড়া কত অশ্রুসিক্ত ভালবাসা নিহিত আছে! সে ভাবিল, সত্যই সে নিষ্ঠুর—বড় নিষ্ঠুর—একজনের প্রাণের ব্যথা লইরা এমন আমোদ-কৌতুক!
এমন সময় প্রভাত পিছন হইতে বলিল, “নীহার! নাঃ! সুকুমারটা শেষে ফেল্-ই হ’ল।” কথাটা বলিয়া আশ্বিনের ‘মলয়া’খানা তাহার সম্মুখে ফেলিয়া দিয়া সে চলিয়া গেল!
“সুকুমার ফেল্!” নীহারিকার মুখের রংটা পাঁশের মত হইয়া গেল। সে কম্পিত হৃদয়ে, ‘মলয়ার’ পাতা খুলিয়া দেখিল, সুকুমারের নবপরিণীতা স্ত্রীর ছবি—এমন সুন্দর অথচ এমন কুৎসিত চিত্র বুঝি নীহারিকা জীবনে কখনও দেখে নাই! আবার ছবির তলে চারি লাইন কবিতা—
“ক্ষমা কর তুমি দেবী।—অতীত প্রতিমা!
তুমিই এসেছ ফিরে নব প্রতিমায়
ধুইয়া স্বর্ণদী-নীরে মৃত্যুর কালিমা,
এই জ্ঞানে স্থাপিয়াছি এ চারু বালায়!”
নীহারিকার চক্ষু ফাটিয়া যেন আগুনের হল্কা বাহির হইল। নীহারিকার মৃত্যুসংবাদ তাহার স্বামীকে ব্যথা দেয় নাই—শুধু কবিতার উপাদান যোগাইয়াছে! যে নারী স্বামীর স্মৃতি হৃদয়ে আমরণ জাগাইয়া রাখে, সেই স্বামী স্ত্রীর চিতার আগুণ না জুড়াইতে আবার ঘটকের দ্বারস্থ হয়! নীহারিকা যতই ভাবিতে লাগিল, ততই যেন তাহার বুকটা ফাটিয়া যাইবার উপক্রম করিল।
এমন সময় পশ্চাৎ হইতে পরিচিত কণ্ঠে কে বলিল,—“এ কি! · নীহার, তুমি বেঁচে!”
নীহার চমকিয়া উঠিল—ফিরিয়া দেখিল, তাহার স্বামী!
সুকুমার হাসিয়া বলিল, “সতীনের হাতে স্বামীটিকে দিয়ে স্বর্গে বুঝি মন টিঁক্ল না? এখন সতীনটিকে আদর করে ডেকে আন! গাড়ীতে সে বসে আছে।”
নীহার গলাটা পরিষ্কার করিয়া লইয়া বলিল, “বেশ ত চল না!”
সুকুমার বলিল, “ইস্—আর থাক্ না! এখনই আবার স্মেলিং সণ্টের দরকার হবে!”
নীহারিকা বলিল, “তুমি ত আচ্ছা লোক! কাগজে ছাপালে কেমন করে?”
এমন সময় প্রভাত ও অরুণচন্দ্র সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নীহার অরুণের দিকে ফিরিয়া বলিল, “অরুণবাবু, শেষে আপনার এই বিশ্বাসঘাতকতা!”
অরুণবাবু সহাস্যে বলিলেন, “কি করি বল! পাখোয়াজের দুদিকেই ঘা দিতে হয়, নইলে যে বেসুরো বাজবে! তোমরা দুই বোনে এককাট্টা হয়ে বেচারাকে জব্দ করতে গেছলে, আমি একটু তাঁর পক্ষ নিয়েছিলুম—আবার কোন্ দিন আমারও তো অমন করতে পারো! তখন কে সহায় হবে, বল!”
নীহারিকা বলিল, “নাঃ, আপনার জন্যই আমাদের এই হারটা হল!”
প্রভাত বলিল “আচ্ছা সে যেন হোল—কিন্তু সেই সঙ্গে ‘মলয়া’র এতগুলি নিরীহ পাঠক কি অপরাধ করেছিল যে তারাও ঠক্ল!”
সুকুমার হাসিয়া বলিল “ওহো ও ক’খানা আপনাদের জন্য স্পেশাল কাপি!”