বিষয়বস্তুতে চলুন

আঙুর/কাঙ্গাল

উইকিসংকলন থেকে

কাঙ্গাল।

 বংকু তাহার আফিসের কষ্টের কথা বলিতেছিল। আমি বলিলাম,—“তোমার যদি এত কষ্ট তো চল আমার সঙ্গে কাণপুরে, সেখানে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ টাকার চাকরী একটা করে দিতে পারব।”

 বংকু বলিল,—“আর কিছু দিন যাক্।” আমি বুঝিলাম, বংকুর বাড়ী ছাড়িবার ইচ্ছা নাই। হাসিয়া বলিলাম, “ঐ তো মুস্কিল!-বাড়ী ছাড়তে চাও না!”

 বংকু কহিল, “সে জন্য নয় ভাই!—সত্য বলচি! আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে আর কি জন্য?” বন্ধু বলিল, “আমাদের হেড্‌ জমাদার—লছমন সিংএর জন্য।”

 আমি একটু বিস্মিত হইয়া বলিলাম, “লছমনের জন্য!—দেখো, নাম ভুল করছ না তো?”

 বংকু কহিল, “না;—তবে শোনো।” এই বলিয়া কেরোসিনের ল্যাম্পটা একটু বাড়াইয়া দিয়া বংকু ভাল হইয়া বসিল। বসিয়া বলিতে আরম্ভ করিল, —সে আজ ছ’ বৎসরের কথা। বড় সাহেব একদিন ডাকিয়া বলিলেন, “বাবু! অস্‌লারে’র ওখানে একখানা ‘ফ্যান্‌’ অর্ডার দিলাম, কিন্তু কৈ পাঠাইল না; তুমি না হয় নগদ দাম দিয়া এক খানা কিনিয়া আনো।” হাতে দেড় শ’ টাকা দিলেন। এই বলিয়া সাহেব আমার

 অস্‌লারের ওখানে গিয়া শুনিলাম, তাহারা ফ্যানের জন্য কোনও চিঠি পায় নাই। তখনই তাহারা একখানা চাররেড ফ্যান্ ‘ক্রেডিট্‌ অ্যাকাউণ্টে’ই পাঠাইয়া দিল, নগদ দাম লইল না - পাছে আমাদের সাহেব ভাবেন, টাকার জন্য ফ্যান্ পাঠান হয় নাই।

 আপিসে ফিরিয়া আসিয়া দেখি, সাহেব হঠাৎ পীড়িত হইয়া চলিয়া গিয়াছেন। আমি টাকা সঙ্গে করিয়াই বাড়ী আসিলান।

 পরদিন মহিম এক শত টাকার জন্য ব্যস্ত হইয়া আমার নিকট উপস্থিত হইল।আমি বলিলাম, “মহিম! আমার টাকা কোথায়!”

 মহিম পাগলের মত একবার চারিধারে চাহিয়া বলিল,—“এ্যাঁ—তা জানি— কিন্তু কি করি! তুমি কোনোখান থেকে যোগাড় করে দিতে পারবে না?—আমি চার পাঁচ দিনের মধ্যে শোধ করব।”

 তখন দশটা বাজে। রাস্তায় শিশি-বোতলওয়ালা—সুর করিয়া ‘বিক্‌রী-ই' হাঁকিতেছিল। ‘মুংকা-দাল’ তখনও ক্ষান্ত হয় নাই। বরফওয়ালা আম বেচা শেষ করিয়া ‘আম্‌স-অৎ’ ফেরি করিতে বাহির হইয়াছে। বর্ষা-স্নাত শ্যামল প্রকৃতির উপর ভাদ্রের রৌদ্র পড়িয়া চিক্‌ চিক্ করিতেছে।

 এত বেলায় আপিসের সময় এক শ’ টাকা পাই কোথায়?—কে এখন ধার দিবে?—এক সেই দেড় শ’ টাকা। কিন্তু সে কি দুঃসাহসের কাজ!

 কি করি—মহিমের মুখের ভাব দেখিরা থাকিতে পারিলাম না—অবশেষে দুঃসাহসের কাজই করিয়া বসিলাম। টাকাটা যে কত বিপদ মাথায় লইয়া কোথা হইতে দিলাম, মহিমকে খুলিয়া বলিলাম। মহিম আমায় আশ্বাস দিয়া টাকা লইয়া চলিয়া গেল। মহিম চলিয়া গেলে মাথায় হাত দিয়া ভাবিতে লাগিলাম, কি করিলাম—কাল যদি সাহেব আপিসে আসেন—টাকার কথা জিজ্ঞাসা করেন?

 পরদিন আপিসে গিয়া শুনিলাম— সাহেবের বড় অসুখ।—আঃ! একটু নিশ্চিন্ত হইলাম! ভগবানকে ডাকিতে লাগিলাম—যেন পাঁচ দিনের ভিতর সাহেব না আসেন।

 ভগবান আমার প্রাণের আকুল আবেদন শুনিলেন, কিন্তু মহিম কৈ? সে তো টাকা দিয়া গেল না! মহা ভাবনায় পড়িলাম—টাকা পাওয়া দূরের কথা, মহিমের এখন দেখাই পাই না—যখনই যাই, মহিম বাড়ী নাই!

 টাকাকড়ির বিষয়ে পুরুষের শেষ সম্বল—স্ত্রীর গহনা। তাহাও অনেক দিন খোয়াইয়াছি। বৃথা ভাবনায় দশ দিন কাটিয়া গেল। সাহেব রোগমুক্ত হইয়া আফিসে ‘যয়েন’ করিলেন।

 আমি প্রাণ হাতে করিয়া নিত্য আফিস করিতে লাগিলাম; অপরাধীর মনের অশান্তি যে কি ভয়ানক এ কয় দিনে হাড়ে হাড়ে তাহা বুঝিলাম। সাহেব আমায় ডাকিতেছেন শুনিলেই আমার বুকটা ধড়াস্ উঠিত—ভাবিতাম, সাহেব বুঝি টের করিয়া পাইয়াছেন!

 কিন্তু সাহেব ‘ফ্যানে’র সম্বন্ধে কোন কথাই তুলিলেন না—ক্রমে আমিও টাকার কথা কতকটা যেন ভুলিতে লাগিলাম!

 হঠাৎ একদিন বড় সাহেবের কামরায় আমার ডাক পড়িল। আমি ঢুকিতেই তিনি আমার প্রতি তীব্র দৃষ্টি করিলেন। সাহেবের মুখ লাল হইরা উঠিয়াছে দেখিলাম। আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল।

 সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “ফ্যান্ কিনিবার জন্য তোমায় না নগদ টাকা দিয়াছিলাম?” আমার স্বরটা কাঁপিয়া উঠিল; আমি বলিলাম, “আজ্ঞে —হ্যাঁ।”

 সাহেব অস্‌লার কোম্পানীর ফ্যানের বিলখানি দেখাইয়া বলিলেন,—“তবে কি অস্‌লার কোম্পানী জুয়াচুরী করিয়া আবার বিল পাঠাইয়াছে—বলিতে চাও?”

 আমি তখন যে কারণে টাকা দিয়া আসি নাই বলিলাম, কিন্তু বুঝিলাম, সাহেবের বিশ্বাস হইল না। তিনি বলিলেন—“তবে টাকা ফেরৎ দাও নাই কেন?”

 হঠাৎ দিনের আলো যেন নিবিয়া গেল—অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম—পায়ের নীচে স্থান যেন সরিয়া গেল!—কি বলিব? সত্য কথা? না, তাহা হইলে আর নিষ্কৃতি নাই। আমি মুহূর্ত্তকালের পরিত্রাণের আশায় একটা মিথ্যার আশ্রয় লইলাম, —বলিলাম “টাকা লছমনের কাছে রাখিয়াছি—আনিয়া দিতেছি!”

 সাহেব এবারেও আমার অবিশ্বাস করিলেন,— বলিলেন “তোমায় যাইতে হইবে না—আমি জমাদারকে গেলাম! ডাকাইতেছি।” ভাবিলাম—এবার গেলাম!

 জমাদার ঢুকিতেই সাহেব তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “জমাদার! তোমরা পাশ বংকু বাবু যো রূপেয়ী রাখা, ও হাম্‌কো কাছে নেই দিয়া?”

 জমাদার আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, “হাম্‌রা পাশ রূপেরা?”

 সাহেব জমাদারকে তৎক্ষণাৎ বিদায় দিলেন। যাইবার সময় আমার বিবর্ণ মুখের উপর লছমনের দৃষ্টি পড়িল।

 সাহেব জমাদারকে বিদায় দিয়া আমার দিকে নিতান্ত অবজ্ঞার ভরে চাহিলেন। আমার কপাল দিয়া বিন্ বিন্ করিয়া ঘান বাহির হইতে লাগিল। আমি একটা ঢোক গিলিয়া থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিলাম। সাহেব উত্তেজিত স্বরে ঘৃণার ভরে বলিলেন, “তুমি এত বড় চীট্, লায়ার! আমি এখনি তোমার পুলিসে ‘হ্যাণ্ডওভার’ করিব।”

 ভাবিলাম, ডুবিতে ত বসিয়াছি, সত্য যা ঘটিয়াছে, একবার বলিয়া দেখি—যদি সাহেবের দয়া হয়—রক্ষা পাই!

 এমন সময়ে আবার লছমন আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। বলিল, “হুজুর! একঠো কসূর হো গিয়া!”

 সাহেব্‌ রুক্ষ স্বরে কহিলেন, “কেয়া কসূর?”

 লছমন তখন অপরাধীর স্বরে বলিল, “হামরা খেয়াল নেহীথা—বাবুজী এক মাহিনাকা যাস্তি হো গিয়া হামরা পাস্ দেড় শো রূপেয়া রাখা হ্যায়। একদম্‌সে খেয়াল নেহী থা! রূপেয়া হাম্ লে আয়া হুজুর!”

 লছমন এমন স্বাভাবিক ভাবে অভিনয় করিল যে, আমি স্তম্ভিত হইয়া গেলাম! এবার সাহেবও লছমনের চাতুরী ভেদ করিতে পারিলেন না! তিনি লছমনের কথা বিশ্বাস করিলেন, এবং শান্তভাব ধারণ করিয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “বাবু! কিছু মনে করিও না।”

 আমি সেলাম করিয়া সাহেবের ঘর হইতে বাহির হইলাম। বাহিরে আসিয়া, আমি লছমনের হাত ধরিয়া বলিলাম, “লছমন! আজ তুমি না থাক্‌লে আমার কি হত?”

 লছমন আকাশের দিকে অঙ্গুলিনির্দ্দেশ করিয়া বলিল, “ভগবান তোমায় বাঁচিয়েছেন! নয় ত জামার কি সাধ্য!”

 কি গভীর আস্থা!—কি সুন্দর অহঙ্কারশূন্যতা! ইচ্ছা হইল, লছমনের পায়ের ধুলা লই! কিন্তু পারিলাম না।

 লছমনকে বলিলাম, “লছমন! তুমি ত সাহেবের কাছে আমায় নির্দ্দোষ দেখালে—কিন্তু তুমি নিজে আমায় কি মনে কর?”

 লছমন উত্তর করিল, “বাবু! ব্যাপারটা কি, আমিও ঠিক বুঝে উঠ্‌তে পারিনি!” আমি তখন তাহাকে সমস্ত বৃত্তান্ত কহিলাম। শুনিয়া সে বলিল, “তাই ভগবান তোমায় বাঁচিয়েছেন—”

 আমি লছমনকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “দেড় শ টাকার কথা তুমি কেমন করে জানলে?”

 লছমন বলিল, “আমি দেখলাম, অসলার কোম্পানীর লোক আসবার পরই তোমার ডাক পড়লো। তাতেই ভাবলাম, ঐ টাকা লইয়াই গোল হয়েছে। সাহেবের ঘরে যে একখানা নুতন পাথা এসেছে, তা জানতাম। তাই ভগবানের নাম করে দেড় শ টাকাই বলে ফেলি!”

 কিছু দিন পরে অনেক কষ্টে টাকা যোগাড় করিয়া লছমনের ঋণ শোধ করিলাম। মাহিনা পাইয়া কুড়িটি টাকা লছমনকে বখ্‌শিশ্‌ দিতে গিয়াছিলাম। কিন্তু লছমন তাহা মাথায় ঠেকাইয়া আমায় ফিরাইয়া দিয়া বলিল, “বাবু! আমি টাকার কাঙ্গাল নই।”

 বংকু এই পর্য্যন্ত বলিয়া নীরব হইল দেখিয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “কিন্তু লছমনের জন্য তুমি চাকুরী ছাড়তে পারছ না কেন, তা তো বল্‌লে না।”

 বংকু বলিল—“হাঁ, কিছু দিন পরে এই কেরী সাহেব আসে। কেরীর জ্বালায় চাকরী ছাড়বার সঙ্কল্প করলুম। কিন্তু লছমন কোনও মতে চাক্‌রী ছাড়তে দিলে না। সে বলে, ‘আর তিনটা বছর থাকো—তার পরে যেখানে ইচ্ছা যেয়ো—আমিও তখন দেশে চলে যাব।’ তাই চাক্‌রী ছাড়তে পারছি না। - লছমনের ঋণ ত শোধবার নয়, তবু তার একটা সাধ যদি মেটাতে পারি।”

 বংকু আবার নীরব হইল। তখন রাস্তার অন্ধকার ঘন হইয়া গ্যাসের আলোককে উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। আমি বলিলাম, “আচ্ছা, এখন আসা যাক্—কিন্তু একটা কথা, লছমনের অমন করবার কারণ কি?”

 বংকু বলিল, “তা জানি না; তবে শুনেছি, আমার বয়সী ওর একটি ছেলে ছিল; আমার সঙ্গে তার নাকি সাদৃশ্য ছিল।”

 লছমন যে কিসের কাঙ্গাল, তা এতক্ষণে বুঝিলাম।