আঙুর/পূর্ণা
পূর্ণা।
সে ভাবিত—কেন এমন হ’ল? সে কি পাপ করিয়াছিল যে তার জীবনের প্রথম বসন্তে বিধাতা এমন নিদারুণ অভিশাপ ঢালিয়া দিলেন? কেমন করিয়া সে বিধবার জীবন বহিবে? শূন্যে মানুষ কেমন করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে?
নিজের উপর কমলার ঘৃণা হইত—বিধবা হইয়া সে আজো তো বেশ বাঁচিয়া আছে? তার স্বামীর দেহ চিতার আগুনে ছাই হইয়া গিয়াছে কিন্তু তার অঙ্গের লাবণ্যে এতটুকু দাগ পড়ে নাই;—চাঁদ ডুবিলে আকাশে জ্যোৎস্নাও থাকে?
কমলা অহোরাত্রি মৃত্যু কামনা করিত! স্বামী বলিয়াছিলেন—“কমলা কেঁদ না—ননী রইল ওর মুখ দেখে জুড়োবার চেষ্টা কোরো!” হায়, চিতায় ছন্দনের ছিটা!
প্রাণের কামনা নাকি বিফল হইতে জানে না? মিথ্যা কথা! কমলা বিধবা হইয়া এই তিন মাস স্মরণ ভিন্ন আর তো কাহাকেও ডাকে নাই—ভাবে নাই, কিন্তু মরণ আসিল কই?
মরণ আসিবে না?—তবে, আত্মহত্যা? কিন্তু সে মরণ তো তাহাকে সেখানে লইয়া যাইবে না—যেখানে গেলে সে স্বামীকে পাইবে!
তবে কাজ নাই আত্মহত্যায়!
ওগো মৃত্যু তুমি এস!—ওগো সহজ মৃত্যু দুঃখহরা—শান্তি ভরা-লাঞ্ছিতের বাঞ্ছিত-ধন তুমি এস!—ওগো মৃত্যু ভবনদীর খেয়াতরী—পরপারের মহাজ্ঞানী—হতাশের শেষ আশা—হৃদয় ক্ষতের অমোঘ শীতল প্রলেপ—তুমি এস!
ওগো বিধবার চিরপ্রিয়!—ওগো অনাথার পরম আত্মীয়!—তুমি এস! তুমি ছাড়া কে আর দুঃখিনীকে তার স্বামীর পায় বহিয়া দেবে?—তুমি এসো!
এইরূপ মরণের আহ্বান-মন্ত্রে দিন গেল,—মাস গেল,—বর্ষও গতপ্রায় মরণ, কিন্তু কমলাকে দেখা দিল না।
তারপর শ্রাবণের এক সমেঘ নৈশ-আকাশে প্রলয়ের আভাস দেখা দিল! সৃষ্টির বিচিত্রতা লুপ্ত হইয়া গেল—শুধু জমাট অন্ধকার! বায়ুর সোঁ সোঁ শব্দে, বৃষ্টির ঝম্ ঝম্ রবে মৃত্যুর মহা আহ্বান-গীতি যেন বাজিয়া উঠিল! আর মাঝে-মাঝে বিদ্যুদ্দীপ্তি!—সে যেন সহমৃতা নারীর শেষ হাসিটি!
কমলা তার শিশু সন্তানটির পাশে বসিয়া উন্মুক্ত বাতায়নের পানে স্থির-দৃষ্টি!—যেন ধ্যাননিরতা! একটি বৎসর সে আজ যার প্রতীক্ষায় বসিয়া আছে, সে যেন আজ আর না আসিয়া থাকিতে পারিবে না—এমনি মন বলিতেছে! প্রকৃতির এ ভৈরব দৃশ্য দেখিয়া আজ কমলার মনে হইতেছে এত দিনে বুঝি আজ নিখিল বিশ্বের বৈধব্য বেদনারাশি এ শুভ মুহূর্ত্তে সম্মিলিত হইয়া জমাট বাঁধিয়া উঠিয়াছে—ওই অন্ধকার তারই ছায়া!
দেখিতে দেখিতে কমলার দৃষ্টি নিস্তেজ হইয়া আসিল—অঙ্গ শিথিল হইয়া পড়িল—শেষে পৃথিবীর কথা সে ভুলিয়া গেল—সে যেন মহাশূন্যে!
সহসা সে মহাশূন্য আলোকে ভরিয়া উঠিল! কমলা দেখিল তাহার সন্মুখে এক জ্যোতির্ম্ময় দিব্য পুরুষ। তিনি বলিলেন—“তুমি আমায় বড়ই ব্যস্ত করে তুলেছিলে!—এখন এস! - তোমার স্বামীর কাছে!”
হঠাৎ কাহাকে কমলার মনে পড়িল— সে যেন পুলক-কম্পিত-কণ্ঠে বলিল—“প্রভু! তবে দয়া করে একটু অপেক্ষা করুন—আমি এখনি আস্চি!”
সেই জ্যোতির্ম্ময় পুরুষ কহিলেন—“কোথায় বাবে?—কেন?”
কমলা বলিল—“আমার ছেলেটিকে আনি!”
“না তাকে নিতে পাবে না! সে কেন যাবে?”
কমলার শিরায় শোণিত স্রোত যেন ক্ষণেকের জন্য স্থির হইয়া গেল—সে বিস্ফারিত নয়নে চাহিয়া রহিল—তার পর অস্ফুট-ভাষে বলিল—“না প্রভু!— তবে থাক্।—আমি যাব না।”,
“নারী মাতৃরূপেই তুমি পূর্ণা”—বলিয়া সেই জ্যোতির্ম্ময় পুরুষ আলোক তরঙ্গে অকস্মাৎ বিলীন হইয়া গেলেন।
কমলা যেন মূর্চ্ছিত হইয়া পড়িল।
* * *
স্বপ্ন হইতে জাগিয়া কমলা যখন তাহার ঘুমম্ভ শিশুটির পানে চাহিয়া দেখিল, তখনও তার কানের কাছে কে যেন বলিতেছিল— “নারী মাতৃরূপেই তুমি পূর্ণা।”