বিষয়বস্তুতে চলুন

আঙুর/মনের দাগ

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. -১৮)

আঙুর


মনের দাগ।

 সংবাদপত্রে অজীর্ণ রোগের অব্যর্থ ঔষধগুলির বিজ্ঞাপন যখন একে একে সব পরীক্ষা করিয়া হায়রান হইয়া পড়িলাম, তখন একবার চেঞ্জ যাইব মনস্থ করিলাম। মধুপুর যাওয়াটাই প্রথমে স্থির করিয়াছিলাম। ইতিমধ্যে এটোয়া হইতে অনুকূলের এক পত্র আসিয়া উপস্থিত হইল। অনুকূল লিখিয়াছে, “আমি এটোয়া থাকিতে তুমি চেঞ্জের জন্য আর কোথাও গেলে অতিশয় দুঃখিত হইব। এখানকার জল হাওয়া খুব ভাল, তুমি আসিলে তোমার তো নিশ্চয়ই উপকার হইবে, সেই সঙ্গে আমারও প্রবাসের কয়েকটা দিন একটু সুখে কাটিবে। এখানে, বাঙালীর মুখ দেখিতে পাওয়া যায় না—শুধু পাগড়ী আর লাহাঙ্গা (হিন্দুস্থানী স্ত্রীলোকের ঘাগ্‌রা বিশেষ)—প্রাণ অস্থির হইয়া উঠিয়াছে! আর একটি বাঙালী আছেন বটে, কিন্তু তাঁর দেখা পাওয়া দুস্কর—ঘরে দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী! বলিতে কি, আমিও বন্ধু ছাড়া হইয়া দিন দিন ন্ত্রৈণ হইয়া পড়িতেছি। এ সময় তুমি আসিলে শুধরাইয়া যাইতে পারি—এখনো রোগ ‘ক্রনিক’ হইয়া দাঁড়ায় নাই।

 “আমার ছোট বোন্ প্রিয়বালাটি বড় হইয়া উঠিতেছে। তার জন্য একটি সম্বন্ধ দেখিতে পার? —তোমার বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে কাহারও যদি চিরকুমারব্রত ভঙ্গ হইবার সময় উপস্থিত হইয়া থাকে বোধ কর, তাহা হইলে তাঁহার ব্রতটি যাহাতে এই এটোয়াতে ভঙ্গ করাইতে পার, তার চেষ্টা দেখিয়ো! কবে আসিতেছ? দেরী করিয়ো না।”

 এটোয়া যাওয়াই স্থির করিলাম। ডেপুটি হইলেও আমি থার্ড ক্লাশে ‘ট্র্যাভল্‌’ করিয়া থাকি। এ বিষয়ে গ্ল্যাডস্টোন্ আমার আদর্শ, কিন্তু সত্য কহিতে হইলে, উদ্দেশ্যটা অবশ্যই ব্যয়-সংক্ষেপ। কথাটা আজ এই নূতন প্রকাশ করিলাম!

 এই আমার প্রথম পশ্চিম-যাত্রা। যথারীতি সাহেব সাজিয়া ‘ষ্টার্ট’ করিলাম। শুনা ছিল, হ্যাটকোট দেখিলে ‘খোট্টা’র ভিড় সরিয়া যায়— · কথাটা ঠিক! আমাকে দেখিয়া হিন্দুস্থানীর দল জড়সড় হইয়া বসিল। কেবল একটা লোক— চেহারাটা তার অতি বদখৎ—দুষমনের মত—বাঁ গালে লোমযুক্ত একটা মস্ত জড়ুল—আমায় দেখিয়া সে বলিল—“সাবলোক্‌ তো হিয়া কাহে?”

 লোকটার কথাবার্ত্তায় বুঝিলাম, সে অনেক দিন কলিকাতায় কাটাইয়াছে। তাহার উপর কেমন ভারি রাগ হইতে লাগিল,—ভাবিলাম—দুষমনটা নামিয়া গেলে বাঁচি!

 কিন্তু সে যেরূপ পরিপাটী আয়োজন করিয়া শয়ন করিয়াছিল, তাহাতে যে শীঘ্র তাহার নামিবার সম্ভাবনা আছে, এমন ত বোধ হইল না! আমি জিজ্ঞাসা করিলাম —“তোম্ কাঁহা যাওগে?”

 লোকটা যেমন শুইয়াছিল, তেমন অবস্থায় থাকিয়াই আমার দিকে শুধু একবার বক্রদৃষ্টিতে চাহিয়া রুক্ষ স্বরে কহিল— “শিকোয়াবাদ।”

 শিকোয়াবাদ! এই দুষমনের সহিত এটোয়া পর্য্যন্ত সাতশো কুড়ি মাইল যাইতে হইবে! আমার অন্তরাত্মা শিহরিয়া উঠিল। গাড়ি আসানসোলে পৌঁছিতেই আমি অন্য কামরায় চলিয়া গেলাম!

 আমি যাইতেছি দেখিয়া সেই লোকটা তাহার সঙ্গীকে বলিল—“সাব্‌ ভাগ্‌তা!” আমি চোখ রাঙাইয়া একবার তাহার প্রতি কটাক্ষ করিলাম। লোকটা হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। হাসিটি কিন্তু বড় সরল—সে হাসি সেই দুষমনের মুখে বড় বিসদৃশ দেখাইতে লাগিল।


 রাত্রি তখন প্রায় বারোটা—এটোয়া পৌঁছিলাম। মাঘ মাস—কন্‌কনে শীত। তাহার উপর টিপ্ টিপ্ বৃষ্টি পড়িতেছিল। ষ্টেশনে অনুকূলের আসিবার কথা ছিল, কিন্তু তাহাকে দেখিতে পাইলাম না। একে অচেনা দেশ, তার ঘোর অন্ধকার—একটু চিন্তিত হইলাম। অনুকূল লিখিয়াছিল— চুঙ্গীকা বাবু বলিলেই গাড়োয়ান বাসা চিনিবে। কিন্তু পশ্চিম খারাপ দেশ, মারিয়া কাড়িয়া নেয় যদি? —ভাবিলাম পাঁড়েকে সঙ্গে আনিলে ভাল হইত। হঠাৎ আমার সাহস ফিরিয়া আসিল—সঙ্গে ত বন্দুক আছে!

 মালপত্রগুলা কুলিকে দিয়া গুছাইয়া রাখিয়া গাড়ির উদ্দেশে যাইব, এমন সময় পশ্চাৎ হইতে কে আমাকে স্পর্শ করিল। একটু চম্‌কাইয়া ফিরিয়া দেখি—এক দীর্ঘাকার যুবা পুরুষ—গালভরা দাড়ি, মাথার আসমানী রঙের এক প্রকাণ্ড পাগড়ী— চুড়িদার পাজামা—পায়ে নাগরা জুতা, গায়ে একখানা লালের উপর কালোচেক্ কাশমিরী র‍্যাপার, হাতে এক মোটা লাঠি!

 আমি স্তম্ভিত হইয়া আগন্তুকের দিকে ক্ষণেকের নিমিত্ত চাহিয়া রহিলাম—আগন্তুক হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। কণ্ঠস্বরের পরিচয় পাইয়া, বুঝিতে আর বাকী রহিল না। আমি বলিলাম—“বাই জোভ্‌! তুমি যে একেবারে পূরো হিন্দুস্থানী সেজেছ!”

 অনুকুল আমার সাহেবী পোষাকটার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলিল— “আমার এ পোষাকটাকে ‘বাঙলা’ তবু আপনার বল্‌তে পারে!”

 আমি হাসিয়া বলিলাম—“সাবধান! সিডিশনের গন্ধ বেরুচ্চে!”

 অনুকূল শ্মশ্রুরাজির মধ্যে অঙ্গুলি সঞ্চালন করিতে করিতে বলিল—“ওঃ ভুলে গেছি—তুমি ডেপুটি!”

 বন্ধুর অজস্র-জাত নিবিড় কৃষ্ণ শ্মশ্রুরাজির উপর হঠাৎ আমার দৃষ্টি পতিত হইল, বলিলাম—“এটোয়ার জল হাওয়ার দাড়িটিরও দেখ্‌চি হেল্‌থ ফিরে গেছে!”

 অনুকূল হাসিয়া বলিল—“ওহে এটা ইকনমির চিহ্ন!”

 আমার জঠরে রীতিমত ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছিল, বলিলাম—“ষ্টেশনে যে রাত কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করচ—এটাও ঐ ইকনমির উদ্দেশ্যে নাকি?”

 অনুকূল হারিবার পাত্র নহে, বলিল—“পশ্চিমে ত হাওয়া খেতে এসেচ- তার ত আর দাম লাগে না!”

 গাড়িতে যাইতে যাইতে অনুকূলকে জিজ্ঞাসা করিলাম—“আমার জন্যে যে বাঙলোটা ঠিক করেচ সেটা কোন দিকে?”

 অনুকূল কৃত্রিম বিস্ময়ের সহিত বলিল— ‘বাঙলা’! —‘বাঙলা’ আবার কোন দিকে হয়? সেত চিরকালই পশ্চিমের পূব দিকে!”

 আমি বলিলাম—“তোমার ও ইয়ারকি রাখ!”

 অনুকূল মুখখানা গম্ভীর করিয়া বলিল— “তবে না হয় সিরিয়াস্‌লি বলচি- হে আমার স্বদেশের প্রিয় পাখি! তোমার জন্য আমি হৃদয়-কুঞ্জে নিবিড় প্রেমের নবীন নীড় রচনা করিয়া রাখিয়াছি, তাহাতে অবস্থান করিয়া তুমি আমার প্রবাসের ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’ নিবিড় ভাবে অমৃত-সিক্ত করিয়া তোল।”


 অনুকূলের বাসাতে আসিয়াই উঠিলাম। শয়ন করিতে রাত্রি অধিক হইয়া গেল। পর দিবস উঠিতে বেলা হইল। নিদ্রাভঙ্গে দেখি ছোট ছোট হিন্দুস্থানী বালক বালিকারা আমার ঘরে উকিঝুঁকি মারিতেছে, তাহাদের ইচ্ছা আমি একবার তাহাদের ডাকি! অনুকূলের ছোট ভাই—সেটি একটু তোত্‌লা— বলিল—“সব্‌ ভাঃ—ভাঃ—ভাগ্‌তা কাহে? ই—ই—ই—ধার আও!”

 অমরনাথ যতক্ষণে এই কয়টি কথা উচ্চারণ করিতেছিল, আমি সেই সময়ে একটি বালিকাকে ইঙ্গিত করিয়া ডাকিলাম—তাহারা ছুটিয়া পলাইল। এইরূপ বারকতক লুকাচুরি খেলার পর একে একে বালিকার দলটি ধূলি-মলিন পদ লইয়া আমার ফরাসে আসিয়া অধিষ্ঠান করিল। এমন সময় দরজার নিকট একটি বালিকা আসিয়া বলিল—“গরম জল দেওয়া হয়েছে।”

 আমি অমরকে জিজ্ঞাসা করিলাম—“এটি তোমার কোন বোন?”

 অমর বলিল—“ও—ও—ও যে—পি-পি প্রিয়!” আমি মনে মনে বলিলাম—“এই প্রিয়! এত সুন্দর!”

 রবিবার। অনুকূলের আপিস্ নাই। ভোজনের সময় অনুকুল জিজ্ঞাসা করিল -“কিহে কেমন বোধ করচ?”

 আমি কহিলাম—“বড় ভাল ঠেক্‌চে না!”

 অনুকূল আশ্চর্য্য হইয়া বলিল—“সেকি হে!”

 আমি বলিলাম—“হুঁ! আর কিছু দিন থাক্‌লেই হয়েচে আর কি!—একটি আস্ত পেটুক হয়ে দাঁড়াব।”

 অনুকূল বলিল—“তাই ভাল!—আমি ভাবলুম্ এটোয়ার জল হাওয়া ভাল নয় বলচো!”

 আমি ললাট কুঞ্চিত করিয়া বলিলাম—“এটোয়ার জল হাওয়ায় বুঝি ভেবে পেটুক হয়ে পড়বার ভয় করচি?”

 অনুকূল জিজ্ঞাসা করিল— “তবে কি জন্যে?”

 আমি চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া বলিলাম- “তোমার গৃহিণীর দ্রৌপদীত্বে!”

 অনুকূল হাসিয়া বলিল—“ওহে! স্ত্রীর সম্বন্ধে ও উপমাটা আধুনিক স্বামীর পক্ষে মোটেই Compli mentary নয়।

 সেই সময় অনুকূলের মাতা আসিয়া আমাদের নিকট বসিলেন। তিনি প্রিয়র বিবাহের কথা পাড়িলেন—বলিলেন- “বাবা! পিয়র একটি সম্বন্ধ দেখো, তোমার তো ঢের বন্ধুবান্ধব আছে!”

 প্রিয়র বিবাহ!—আমার উপর সম্বন্ধ ঠিক করিয়া দিবার ভার! বুকের ভিতর রক্তটা তোলপাড় করিয়া উঠিল। আমি ঘাড় হেঁট করিয়া আহারেই অধিকতর মনোনিবেশ করিলাম।

 প্রিয়র মাতা বলিলেন- “তুমি ত বাবা আমার অবস্থা জান!” আমি সহানুভূতির একটি ছোটখাটো নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া তাঁহার উক্তি সমর্থন করিলাম।

 কিছুক্ষণ আমরা তিন জনেই নীরব। রন্ধনশালা হইতে প্রিয় মাতাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল— “মা, মাছের চপ আর দুখানা নিয়ে যাই?”

 আমার হৃদয়টা কি জানি কেন হঠাৎ চঞ্চল হইয়া প্রিয়র মাতা কন্যাকে বলিলেন—“হ্যাঁ, নিয়ে আসবে বৈ কি।” পরে আমাকে বলিলেন— “কি বাবা, ব্যান্ননে ঝাল হয়েছে?”

 আমি বুঝিলাম, আমার কর্ণের প্রতি বিধবার দৃষ্টি পড়িয়াছে! আমি বাধ্য হইয়া বলিলাম—“একটু।” প্রিয়র মাতা সেইখান হইতে বধূকে উদ্দেশ করিয়া বলিলেন—“ও বৌমা! একটু ঝাল কম দিয়ো, বাছা? সুধীর ঝাল খেতে পারে না!”

 বেয়াদব অনুকূলটা অমনি বলিয়া উঠিল—“কেন আগে ত সুধীর খুব ঝাল খেত!”

 প্রিয়র মাতা আমার পক্ষ লইয়া বলিলেন— “চিরকাল কি আর এক অভ্যেস্ থাকে?”

 আমি বলিলাম—“ঠিক বলেচেন—মানুষের কি এক ভাব চিরকাল থাকে?”

 এমন সময় প্রিয় একখানা রেকাবী করিয়া গরম গরম চপ্‌ লইয়া উপস্থিত—একটু জড়সড় ভাব! ছড়ানো চুলের মাঝে, পাতার আড়ালে ফুলের মত মুখখানি!

 সহসা অনুকূলের মাতা বলিলেন—“হ্যাঁ বাবা সুধী, তুমি কি বিয়ে-টিয়ে করবে না? এখন ত যা হোক্‌ দু’পয়সা বেশ রোজগার কচ্চ?”

 সেই সময় প্রিয়র হাত হইতে একখানা চপ্‌ মাটিতে পড়িয়া গেল! দেখিয়া প্রিয়র মাতা কহিলেন —“আস্তে আস্তে দাও মা!—তাড়াতাড়ি করো না!”

 অপরাহ্ণে প্রিয়র বিবাহ লইয়া অনুকূলের সহিত কথা হইতেছিল। অনুকূল বলিল—“আচ্ছা! রমেনকে তোমার কেমন বোধ হয়?”


 “রমেন ছেলে ভাল বটে, তবে এদিকে কিছু নেই! তা’ছাড়া শুন্‌তে পাই, রমেনের মা বড় রাগী মেজাজের।”

 অনুকূল বলিল—“না ভাই, কাজ নেই—প্রিয় আমাদের বড় অভিমানী! আচ্ছা, সতীশ?”

 “হুঁ! টাকা কড়ি আছে বটে, তবে হেল্থ বড় খারাপ!”

 “মনোমোহন?”

 “উঃ, ভয়ানক ম্যালেরিয়ার দেশ!”

 “যতীশ?”

 “রংটা একটু ময়লা!”

 এইবার অনুকূল হাসিয়া উঠিল। বলিল— “এখন তোমার মত নিখুঁত পাত্র পাই কোথা, বল?”

 আর ধৈর্য্য রহিল না— বলিলাম—“আমার নততে আর দরকার কি? একেবারে আসলটিই না হয়—”

 অনুকূল আমার হাতখানী চাপিয়া ধরিয়া বলিল—— “অ্যাঁ!—সত্যি বলচ?”

 আমি বলিলাম—“তোমার সঙ্গে কবে মিথ্যে কয়েচি?” অনুকূল, গাঢ়স্বরে বলিল—“আজ কি সুখী করলে আমাদের!”

 অনুকূল তৎক্ষণাৎ ‘মা—মা’ করিতে করিতে অন্দরের দিকে গেল। আমি আনন্দ-বিহ্বল নেত্রে বৈঠকখানার মুক্ত দ্বারের দিকে চাহিয়া রহিলাম।

 কিছুক্ষণ পরে দেখি একটি ছোট হিন্দুস্থানী বালিকা আসিয়া দ্বারের নিকট দাঁড়াইল। এই তাহাকে প্রথম দেখিলাম। তাহাকে ডাকিতে সে নিকটে আসিল। নাম জিজ্ঞাসা করিলাম, সে বলিল —“সুখদেবী।” মুখখানি কিন্তু কষ্টে মাথা! —সংসারে স্নেহের স্বাদ যেন সে জীবনে পায় নাই! সে যখন তাহার সুরমাটানা চোখের স্নান দৃষ্টি আমার উপর ফেলিয়া বলিল—“হাম্ সুখ্‌ দেবী”, তখন যেন তাহার হৃদয়খানি আমার হৃদয়কে জানাইতেছিল, “হাম্ জনম দুখী।”

 ক্রমে সুখদেবী তাহার জীবনের পাতাগুলি একে একে উল্টাইয়া আমায় দেখাইতে লাগিল। তাহার মা নাই,—বাপ আগ্রায় কাজ করে,—সৎমা তাহাকে ভালবাসে না,—বাপও ভালবাসে না, সে বাপের জন্য কত কাঁদে,—ঠাকুরদাদা বলে, বাপ শীঘ্রই আসিবে, কিন্তু কত দিন কাটিয়া গেল আসিল না, সে বাপের একখানা চিঠি পাইবার জন্য কত লালায়িত—পিয়ন দড়ির জালে বাঁধা পার্সেল ঘাড়ে করিয়া যখন তাহাদের বাড়ীতে আসিয়া “বিটিয়া খৎ লিজিয়ে” বলিয়া হাঁকে, তখন সে বাপের চিঠির আশায় ছুটিয়া আসে, কিন্তু আসিয়া দেখে চিঠি নাই, তখন তাহার কত কান্না পায়!—বলিতে বলিতে তাহার চোখ দিয়া তাহার বাপের টস্‌ টস্‌ করিয়া জল পড়িতে লাগিল! বেদনায় আমার হৃদয় ভরিয়া উঠিল, অতি কষ্টে চোখের জল চাপিয়া ভাবিতে লাগিলাম—আহা! অনাথা স্বামিপ্রেমে যদি একদিন সুখী হয়!


8

 অতি অল্প দিনের মধ্যেই আমার প্রতি শিশুদলের যে একটা কৌতূহল ছিল, তাহা মিটিয়া গেল! আর তাহারা বড় একটা আমার পাশে জড় হয় না। তবে, এখনও আমার ‘সাইক্লের’ ঘণ্টা বাজাইবার লোভটি তাহারা একেবারে পরিত্যাগ করিতে পারে নাই। এখন আমার সঙ্গে তাহাদের শুধু ঐটুকু সম্বন্ধ!

 শুধু সেই মাতৃহীনা উপেক্ষিতা অনাদৃতা বালিকাটি এই মাতৃহীন যুবককে দিন দিন তাহার বুভুক্ষু হৃদয়ের নিকট বিপুল আবেগে টানিয়া লইয়া যেন আপনার করিতে লাগিল!

 মধ্যাহ্নে যখন অনুকূল আপিসে, অমরনাথ স্কুলে, প্রিয়বালা মাতৃপরিচর্য্যায়, তখন এই নিঃসঙ্গ প্রবাসীর অন্য বিধাতা সেই মাতৃহীনা অনাথা বালিকাটিকে যেন একান্ত আত্মীয় করিয়া পাঠাইয়া দিতেন! সুখদেবী কোন কোন দিন তাহার ছোট ঢোলকটি লইয়া সুর করিয়া দুলিতে দুলিতে গীত আরম্ভ করিয়া দিত— “চারো যুগমে নাম শুনায়ে কিষণে কানাইয়া তুমিহিতো হো—।”

 সে একদিন আমার বন্দুকটি দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল—“ইমে কেয়া হোতা?”

 আমি বলিলাম—“চিড়িয়া মারনা হোতা।” শুনিয়া তাহার মুখখানি এতটুকু হইয়া গেল! তাহারও একটি ছোট পাখী আছে! সে জিজ্ঞাসা করিল—“বাবুজি! চিড়িয়া মারনেসে তোমারা আপ্‌সোষ্‌ নেহি হোতা?” হঠাৎ কে যেন আমার হৃদয়ের সুপ্ত তারে ঘা দিল!—ভাবিলাম—সত্য! পাখী মারা—কি নিষ্ঠুর আমোদ!

 আমি সুখদেবীর চিবুকটি ধরিয়া বলিলাম— “সুখদেবী! হাম্ আউর কভি চিড়িয়া নেহি মারেগা!”

 বালিকার দুই চোখে আনন্দ ফুটিয়া উঠিল!

 একদিন শুনিলাম, সুখদেবীর বিবাহের সম্বন্ধ হইতেছে—পাত্র কলিকাতার এক ‘হৌসে’ কাজ করে, বাড়ী শিকোয়াবাদে।

 শিকোয়াবাদ! হঠাৎ সেই দুফানকে মনে পড়িল।

 সুখদেবী একদিন হাসিতে হাসিতে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল—“বাবুজি! পিয়ারীকো আপ্ সাদি করেগা?”

 আমি জিজ্ঞাসা করিলাম—“কোন্ বোলা?

 সুখদেবী আনন্দে হেলিতে দুলিতে বলিল, “খুদ্‌ পিয়ারীনে কহা!”

 আমি সুখদেবীর ছোট নখটি ধরিয়া নাড়িয়া দিলাম। “বাবুজী পিয়ারীকা দুলাহা (স্বামী)” বলিতে বলিতে সে দৌড়িয়া পলাইল।

 হিন্দুস্থানীরা প্রিয়কে পিয়ারী বলিত।

 এটোয়ার চেঞ্জে গিয়াছিলাম—সে আজ দুই বৎসর। সুখদেবীর বিবাহ হইয়া গিয়াছে—সেই শিকোয়াবাদে। আমারও চিরকুমারব্রত নষ্ট হইয়াছে,—সেজন্য দায়ী, অবশ্য, প্রিয়বালা!

 ইহার কিছু কাল পরে সেই শিকোরাবাদের জড়ুল-চিহ্নিত দুষমন যুবা—নাম মাধব দেও আমার এজলাসে একদিন অভিযুক্ত হইয়া আসিল!

 আমি নবীন ডেপুটি—অভিযোগ গুরুতর, কেমন একটা রাগও ছিল—দুষমনকে চূড়ান্ত শাস্তি দিলাম। এমন রায় দিলাম যে উপর কোর্টেও তাহা বাহাল রহিয়া গেল!


 দুই বৎসর পরে আবার এটোয়ায় আসিয়াছি— প্রিয়কে লইতে। সুখদেবীর বিবাহের সময় কোন কারণে ব্যস্ত থাকায় তাহার বিবাহ-বাসরে তাহাকে কিছু উপহার দিতে পারি নাই। এবার আসিবার সময় দুই গাছি ব্রেস্‌লেট্‌ তৈয়ার করাইয়া আনিয়াছি। প্রিয়কে বলিলাম—“সুখদেবী কি এখানে?”

 প্রিয় একটা নিশ্বাস ফেলিল। আমি বলিলাম- “অমন করলে যে?—তার জন্যে দুগাছি ব্রেস্‌লেট্‌ এনেচি।”

 প্রিয়র চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। আমি বলিলাম “কি হয়েছে, প্রিয়?”

 প্রিয় একটা ঢোক গিলিয়া বলিল—“সে বিধবা হয়ে—।”

 আমি আহত হইয়া তাহার অসমাপ্ত কথায় বাধা দিয়া বলিয়া উঠিলাম- “য়্যা! কত দিন?”

 “বিয়ের আট মাস পরে।”

 “কৈ আমায় তো কিছু লেখ নি! কি হয়েছিল?”

 “জেলে মারা গেছে!”

 “জে—লে!”

 “হাঁ—কিন্তু সে নির্দ্দোষী!”

 “তার নাম?”

 “মাধব দেও।”

 “মাধব দেও!—তার বাঁ গালে কি একটা জড়ুল ছিল?”

 প্রিয় আশ্চর্য্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল— “হ্যাঁ—তুমি কেমন করে জান্‌লে?”

 আমি বলিলাম—“প্রিয়! আমিই নির্দ্দোষ মাধব দেওকে রাগের বশে অন্যার শাস্তি দিয়েছিলুম— আমিই সুখদেবীকে বিধবা করেছি!”

 প্রিয়র মুখখানা সাদা হইয়া গেল—একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া সে বলিল— “সেও বেঁচে নেই—বিষ খেয়েছে!”

 কে যেন তথ লৌহ-শলাকা দিয়া আমার হৃদ্‌পিণ্ডটাকে বিদ্ধ করিতে লাগিল!—হায়, প্রবৃত্তির দাস মানুষ কি বলিয়া অপরের বিচারের ভার লয়!

 কলিকাতায় আসিয়াই কাজে ইস্তফা দিলাম! মনের দাগ কিন্তু মুছিল না!