আঙুর/মাণিকলাল
মাণিকলাল।
যখন দশ বছরের বালক মাণিকলাল তাহার পিতার কাঠের গোলায় রাত্রে কেরোসিনের টেঁপিটি জ্বালিয়া সুর করিয়া ধারাপাতের নাম্তা মুখস্থ করিত তখন তাহার পিতা ফকিরচাঁদ দেয়ালে ঠেস্দিয়া চক্ষু মুদিয়া মৃদু মৃদু তামাক টানিত আর ভাবিত করে তাহার মাণিক নিজের নাম সহিটা করিতে ও দোকানের ‘খাতা লিখিতে’ শিখিয়া বড় হইবে—তাহার হাতে দোকানের ভার দিয়া বৃদ্ধ অবসর লইবে!
কিন্তু মাণিকের লেখাপড়ায় আশ্চর্য্য যত্ন দেখিয়া যত না। হক্, স্থানীয় জমিদার হরিমোহনবাবুর জন্য ফকিরকে আপাততঃ সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে হইল। মাণিক যে আর সাত আট বৎসর পরেই লেখাপড়ার কারবার ছাড়িয়া তাহার পিতার কাঠের কারবারের ভার লইবে না, ইহা ভাবিয়া ফকির ততটা সুখী হইল না।
মাণিক যদিও ছোট ঘরে জন্মিয়াছিল কিন্তু কোন অচেনা লোক তাহাকে দেখিলে বলিবে না যে, সে ফকিরের মত একজন কাঠওয়ালার ছেলে। ঐ সময়ে জমিদারবাবু শিক্ষানুরাগ-প্রণোদিত হইয়া স্বগ্রামে একটি মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং অসমর্থ ব্যক্তিগণের পুত্রদিগকে বিনা বেতনে শিক্ষা দিবার ব্যবস্থা করিয়া দেন।
এমন সময়ে একদিন মাণিকলালের কথা হরিমোহনবাবুর কানে পৌঁছিল। সংবাদদাত্রীজমিদার বাবুর চারি বৎসরের কন্যা রাণী।
মাণিকলালের সঙ্গে রাণীর বড় ভাব। সে যখনি তাহাদের চাকরের কোলে উঠিয়া কাঠগোলায় যায় তখনি মাণিকলাল করবী গাছ হইতে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল পাড়িয়া দেয়, কখন বা তাহার পোষা কাঠবিড়ালটিকে লইয়া তাহার সম্মুখে কত খেলায়। রাণী মাণিকলালের এইরূপ ব্যবহারে বড় আপ্যায়িত, বড় কৃতজ্ঞ! সে বাড়িতে গিয়া যখন তখন তার মার কাছে শিশু ভাষায় ‘মাঙিক’এর কথা বলিত।
এইরূপে রাণীর ‘মাঙিক’ রাণীর মার কাছে, ক্রমে হরিমোহনবাবুর ও নিকট পরিচিত হইল। একদিন হরিমোহনবাবু তাঁহার চাকরকে বলিলেন— “রাণীর মাঙিককে ডেকে আনিস্তো।”
ইহার কিছুদিন পরে একদিন রাণী বাহির বাটী হইতে উল্লাসের লহর তুলিতে তুলিতে “মাণিকের হাত ধরিয়া বাপের নিকট আসিয়া বলিল—“বাবা মাঙিক এসেছে!”
মাণিকের পরিধানে একখানি নীলকষ-রঞ্জিত ফুলপেড়ে দেশী ধুতি, গায়ে অর্দ্ধমলিন কামিজ, তদুপরি ‘কোরা’ চাদর, পায়ে লাল ফিতাবদ্ধ বার্ণিস জুতা।
মাণিক আসিয়াই হরিমোহনবাবুকে ঢ়িপ্ করিয়া এক বৃহৎ প্রণাম করিল। বালকের সভ্যতা দেখিয়া তিনি মনে মনে ভারি সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি তাহার নাম, পিতার নাম, অধীত পুস্তকাদির নাম ও মধ্যে মধ্যে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার নিকট হইতে যেরূপ সদুত্তর পাইলেন তাহাতে বুঝিলেন, বালক অত্যন্ত বিনয়ী ও অসাধারণ বুদ্ধিমান। সর্ব্বোপরি তাহার সেই স্নেহ-ঢলঢল নির্ম্মল মুখখানি দেখিয়া তাহাকে আর ‘পর’ বলিয়া ভাবিতে তাঁহার ইচ্ছা হইল না।
এইরূপে মাণিক নিমেষের মধ্যে কর্ত্তা ও গৃহিণীর স্নেহের রাজ্যে আপনার একটা চিরস্থায়ী দাবী স্থাপন করিয়া স্বগৃহে প্রত্যাবৃত্ত হইল। সেইদিনই বিকালে হরিমোহনবাবু ফকিরের ‘গোলায়’ গিয়া ঠিক করিলেন—পরদিন হইতে মাণিক তাঁহার ইস্কুলে বিদ্যা শিক্ষা করিবে।
ফকির প্রথমটা ‘কিন্তু’ ‘কিন্তু’ করিয়াছিল— ভাবিয়াছিল তাহাকেই ইস্কুলের ব্যয় বহন করিতে হইবে। তারপর যখন শুনিল তাহাকে কোন ব্যয় বহন করিতে হইবে না তখন সে আর অসম্মত হয় নাই। কিন্তু জমিদারবাবু চলিয়া গেলে তাহার মনে পড়িল যে ইস্কুলে দিলে সে আর ছেলেকে কারবারে লাগাইতে পারিবে না। তখন সে বিশেষ ক্ষুণ্ণ হইল! —লেখাপড়া শিখিলে কি আর তাহার পুত্রের কাঠের কারবারে মন বসিবে?
মাণিক ইস্কুলে যাইতেছে। এখনও সে পূর্ব্বের মত টিনের টেঁপিটি জ্বালিয়া সেইরূপ দুলিতে-দুলিতে পড়িতে থাকে, আর ফকিরচাঁদ হুঁকা লইয়া দেয়ালে ঠেস্দিয়া তামাকু পোড়ায়। মাণিক যখন ইংরাজী পড়ে, ফকির তখন হুঁকায় মুখ দিয়া এক কল্পনা রাজ্যে প্রবেশ করে—সে ভারিতে থাকে, আর দু’চার বৎসর পরে মাণিক, যখন একটু ইংরাজীতে কথা কহিতে শিখিবে তখন সে জমিদার মহাশয়কে বলিয়া কহিয়া কলিকাতার তাহার একটি চাকরী করাইয়া দিবে—ছেলে মাসে মাসে টাকা আনিবে, এখন সংসারে যে কষ্ট আছে তাহা আর থাকিবেনা। ছেলের মাহিনার টাকা জমাইয়া কিছু 'জমিজিরেৎ', করিবে বাড়ীর সম্মুখে যে জায়গাটা পড়িয়া আছে তাহাতে তরকারির বাগান দিবে, চাষের ধান, বাগানের তরকারী, ছেলের মাহিনার টাকা আর দোকান হইতে যা হ’ক্ কিছু আসিবে—কোন কষ্ট থাকিবেনা।
মাণিক যখন ইংরাজী পড়িতে পড়িতে থানিয়া বাংলা ‘চরিতাবলী’ পড়িতে যায় ফকির অমনি বলিয়া উঠে “থাম্লি যে?—আর একটু ইংরিজী পড়্না!” ফকিরের ইচ্ছা মাণিক শীঘ্র ইংরাজী খানিকটা শিখিয়া ফেলে!
কিন্তু মাণিক যখন তাহার পিতাকে বুঝাইয়া দেয় যে বাংলাও ভাল করিয়া গড়া দরকার, নতুবা তাহাকে ক্লাসে ‘নামিয়া’ যাইতে হইবে, তখন ফকিরচাঁদ দ্বিরুক্তটী না করিয়া পুত্রের ‘চরিতাবলী’পাঠ এক মনে শুনিতে থাকে। তাহাতে যখন সে শুনে যে, অতি দরিদ্রের সন্তানেরা বিদ্যার গুণে কালে পৃথিবীতে ‘বড়লোক’ হইয়াছে, তখন বৃদ্ধের মন আশার নাচিয়া উঠে।
ক্রমে মাণিক বারো বছরে পড়িল! তাহার বহির মধ্যে ছবির সংখ্যা যত বাড়িতে আরম্ভ হইল, দোকানে আসিয়া বাড়ী ফিরিতে রাণীর তত বিলম্ব এদিকে রাণীদের বাড়ী মাণিকের হইতে লাগিল। নিমন্ত্রণ কোন মাস ফাঁক যাইত না।
মাণিক রাণীর মাকে ‘মা’ বলিয়া ডাকে। আর রাণী মাণিককে ‘মাণিক দাদা’ বলে,—এটা হরিমোহন বাবুর শেখান! ছোটয় বড়য় এরূপ সম্বন্ধ হইতে যদিও খুব কম দেখা যায়, কিন্তু দেখিতে বড় ভাল। আকাশে মাটিতে মেশামিশি হইয়াছে বলিয়া সব জায়গায় বোধ হয় না বটে, কিন্তু যেখানে সেরূপ হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়, সেখানটি দেখিতে বড় সুন্দর!
এইরূপে সুখের দিনগুলি শুক্লপক্ষের রাত্রির মত বহিয়া যাইতে লাগিল। একদিন মাণিকলাল শুনিল—জমিদারবাবুর অতিথিশালায় একজন সন্ন্যাসী আসিয়াছেন— তিনি গণনায় পারদর্শী। দলে দলে বিস্তর লোক তাঁহার নিকট গণনা করাইতে যাইতেছে। মাণিকলালেরও বাইবার ইচ্ছা হইল। গিয়া দেখিল—বহু লোকের সমাগম হইয়াছে।
সহসা সন্ন্যাসীর দৃষ্টি মাণিকলালের উপর পড়িল।
নিমেষের জন্য তাঁহার মুখে প্রফুল্লতা প্রকটিত হইল, কিন্তু নিমেষের জন্য! আত্মভাব দমন করিয়া সন্ন্যাসীআপনার কর্ম্মে মনোনিবেশ করিলেন।
ক্রমে দুই একজন করিয়া বহু লোক—কেহ ক্ষুণ্ণ কেহ প্রফুল্ল, কেহ মাঝামাঝি—আপন আপন অদৃষ্টলিপি জানিয়া চলিয়া গেল। মাণিকলাল সন্ন্যাসীকে প্রণাম করিয়া তাঁহার সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইল। তখন সেখানে আর কেহ ছিল না। সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসিলেন, “তোমার কি বাবা?” মাণিক তখন আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করিল। সন্ন্যাসী দীর্ঘকাল ধরিয়া মাণিকের হাত দেখিতে লাগিলেন, কিন্তু সে সম্বন্ধে কিছুই না বলিয়া সংসার কিছুই নয়, বৈরাগ্যই শ্রেষ্ঠ এই সমস্ত বলিতে আরম্ভ করিলেন।
মাণিক একটু বিরক্ত হইয়া বলিল—“কি দেখলেন, অনুগ্রহ করে বলবেন কি?” সন্ন্যাসী বলিলেন, “তোমার সম্বন্ধে গণনা করিতে হইলে একটু স্থিরচিত্ত হওয়া আবশ্যক—কাল আসিও।” মাণিক প্রণাম করিয়া বিদায় গ্রহণ করিল।
পথে যাইতে যাইতে সে ভাবিতে লাগিল—সন্ন্যাসীর সেই এক কথা— ‘সংসার কিছুই না।’ সংসার কিছুই নয়?—এই শোভা-সৌন্দর্য্যময়, এই সুখে দুঃখে মধুর সংসার কিছুই নয়?—এই আকাশ—আকাশের চন্দ্র, সূর্য্য, এ সব কিছু নয়?—বৃক্ষ লতা ফুল ফল, ফুলের সুবাস, জীবজন্তু, পাথী—কিছুই নয়?—মানুষ, মানুষের ভক্তি ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, দয়া-দাক্ষিণ্য—এ সব কিছুই নয়? পিতামাতার স্নেহ, ভাই-বোনের ভালবাসা, বন্ধুর বন্ধুত্ব, রাণী—রাণীর ক্ষুদ্র-বৃহৎ হৃদয়ের অতুল অসীম নির্ম্মল কচি ভালবাসা? তাও কিছু নয়?—এক বৈরাগ্যই যা’ শ্রেষ্ঠ? ধ্যেৎ! মাণিক হাসিল।
মাণিক ত হাসিল, কিন্তু সন্ন্যাসীর সেই কথা—‘সংসার কিছুই নয়’—মন হইতে একেবারে মুছিয়া ফেলিতে পারিল না! সে প্রতিদিন সন্ন্যাসীর নিকট যাইতে আরম্ভ করিল। মাণিক মনে মনে স্থির করে আর কাল যাইবে না, কিন্তু যেমনি বিকালের ছায়াপাত আরম্ভ হয়, অমনি কে যেন তাহাকে ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে আকর্ষণ করিতে থাকে—মাণিক থাকিতে পারে না,—যায়, আর ভাবে কাল আর যাইবে না।
মাণিকের মনের অবস্থা যখন এইরূপ, এমন সময়ে একদিন সকালে জমিদার বাটির ভৃত্য গঙ্গারাম লোক লইরা কাঠ লইতে আসিল-গঙ্গারামের সঙ্গে রাণী নাই। মাণিককে দেখিয়া গঙ্গারাম কাঁদিয়া ফেলিল—মাণিক ভীত হইয়া বলিল—“কি হয়েছে গঙ্গারাম—রাণী—রাণী—” গঙ্গারাম কপালে আঘাত করিয়া বলিল— “হায়! আর কি রাণী মা আমাদের আছে!”
শেষ রাত্রে বিসূচিকা রোগে রাণীর সংসারের খেলা-ধূলা শেষ হইয়া গিয়াছে! এই ‘বুকফাটা’ কথা শুনিয়া মাণিক অনেকক্ষণ আকাশের দিকে চাহিয়া রহিল—কখন যে গঙ্গারাম কাঠ লইয়া চলিয়া গেল, সে জানিতে পারিল না!
এক মাস অতীত হইয়া গিয়াছে। মাণিক এখনও সেইরূপ বসিয়া পড়িতে থাকে, কিন্তু রাণী আর তাহার বইগুলির ছবি দেখিতে আসে না; কাঠবিড়ালটা এখনও দোকান ঘরে তেমনি ঘুরিয়া বেড়ায়, কিন্তু রাণী আর তাহাকে ধরিতে আসে না; করবী গাছের ফুল এখনও তেমনি শোভা ছড়াইয়া ফুটিয়া উঠে, ফুটিয়া ঝরিয়া পড়ে রাণী কিন্তু তাহা কুড়াইতে আসে না!
ক্রমে মাণিক উঁচু ক্লাসে পড়িতে লাগিল—বহির ছবিও কমিয়া কমিয়া বন্ধ হইয়া গেল—মাণিক তাহাতে একটু জুড়াইল! কাঠবিড়ালটা একদিন মরিয়া গেল, মাণিকের প্রথমে দুঃখ হইল, কিন্তু তবু তাহার মধ্যে সে একটু জুড়াইল! করবী গাছটা ও জন অভাবে শুকাইয়া শুকাইয়া মরিয়া গেল—মাণিকের সব আপদ চুকিল—সে বাঁচিল!
মাণিক এখন সন্ন্যাসীর কথা নিষ্ঠার সহিত চিন্তা করে! এইরূপে কিছুদিন না যাইতে মাণিকের হৃদয়ে আর একটি গুরুতর আঘাত আসিয়া পড়িল—সহসা হৃদরোগে তাহার মাতার কাল হইল!
এক মাস অশৌচান্তে একদিন গভীর রাত্রে ফকিরের গোলা হইতে কে একজন নিঃশব্দে বাহির হইল—বাহির হইয়া একটু দাঁড়াইল—একবার পশ্চাৎ ফিরিয়া গোলার দিকে, শুষ্ক করবী বৃক্ষের দিকে চাহিয়া একটি ছোট নিঃশ্বাস ফেলিল, তাহার পর অন্ধকারে কোথায় মিশিয়া গেল!
দুই বৎসর অতীত হইরা গিয়াছে—বৃদ্ধ ফকিরচাঁদ এখনও সন্ধ্যার সময় টেঁপিটি জ্বালিয়া দেয়ালে ঠেস্ দিয়া হুঁকাটি লইয়া বসিয়া থাকে, কিন্তু তাঁহার মাণিকলাল আর সম্মুখে বসিয়া পড়ে না!