বিষয়বস্তুতে চলুন

আঙুর/স্বর্ণ-শয্যা

উইকিসংকলন থেকে

স্বর্ণ-শয্যা।

 নটু দত্ত সুদে টাকা খাটাইত। এই ব্যবসা তাহার বাপ-পিতামহ করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের কেহ কখনো সুদের একটী পয়সাও ছাড়েন নাই— নটুও ছাড়িত না। কিন্তু নটুর বাপ পিতামহের যে একটু ‘দান-ধ্যান’ করা অভ্যাস ছিল, নটুর তাহা ছিল না।

 নটু এ সংসারে ভালবাসিত এক টাকা আর তার সুদের হিসাব করিতে। তা ছাড়া তার আর অন্য চিন্তা ছিল না। তেজারতি করিয়া বিস্তর টাকা করিলেও তার মনে তেমন সুখ ছিল না! নটু জীবনে একটী মস্ত ভুল করিয়া বসিয়াছিল—সেটি বিবাহ!

 ইতিপূর্ব্বে নটুর বংশে পরিবারের সংখ্যা পাঁচ জনের অধিক হইতে কেহ কখন দেখে নাই। কিন্তু নটুর পরিণীতা স্ত্রীটি ফেন স্বামীর সঙ্গে, ‘আড়ি’ করিয়া বছর-বছর এক একটী নূতন নূতন নাছোড় বান্দা অতিথির আমদানি করিতে আরম্ভ করিল!— নটুর বুকের রক্ত অর্দ্ধেক শুকাইয়া আসিতে লাগিল! সে ভাবিত এই রকম যদি কিছুদিন চলিতে থাকে তা’হলেই—!

 এক বৎসর শিশুর মড়ক হইল—কত সোণার পুতুল মায়ের কোল আঁধার করিয়া শ্মশানে ছাই হইয়া গেল! দেখিয়া শুনিয়া নটুর একটু ভরসা হইয়াছিল, কিন্তু ভগবান নটুর পত্নীর বুক ঠাণ্ডা রাখিলেন। ইহাতে নটু স্ত্রীর নিকট আক্ষেপ করিয়া বলিত—“আমার কি তেমন বরাৎ! যে এক আধটা—!”

 নটুর স্ত্রী স্বামীর কথায় শিহরিয়া উঠিয়া বলিত “বালাই—ষাট্—ও কথা বল্‌তে আছে?—যাও!”

 নটু বড় জ্বালাতনে পড়িল!—একে একে তাহার পাঁচ পুত্র তিন কন্যা জন্মগ্রহণ করিল! খরচ বাড়িয়া গেল—নটু কি করে!—খরচ জোগাইতে হয়, নহিলে গৃহিণীর গঞ্জনায় ঘরে তিষ্ঠানো দায়!

 কিন্তু এই অপরিণামদর্শী নবাগতগুলির আহারের ব্যয় না হয় কোন মতে নটু বহন করিল, কিন্তু তাহার উপর যদি আবার তাহাদের ঔষধের খরচ পত্র যোগাইতে হয়, তাহা হইলেই ত সর্ব্বনাশ! গৃহিণী তো স্বামীর মুখের দিকে চাহিবে না—স্বামীর যে কত কষ্টের পয়সা তাহা তো সে ভাবিবে না! অনর্থক ডাক্তার আনাইয়া ঔষধ কিনাইয়া অর্থাৎ এক কথায় স্বামীর কতকগুলা পরসার শ্রাদ্ধ করিয়া তবে তাহার সোয়াস্তি!

 নটু ভাবে পোড়া ব্যামো তো হচ্ছে—কিন্তু একটা আধটা কমে কৈ?—হায়! এমন কপাল করিয়া ও সে আসিয়াছিল!—কত কষ্টের সুদের টাকাগুলো জলের মত খরচ হইয়া যাইতেছে!

 যাহা হউক বিধাতার আশীর্ব্বাদে ক্রমে ক্রমে নটুর ছেলে মেয়েগুলি মায়ের নিরাপদ স্নেহ-নীড়ের মাঝে বড় হইয়া উঠিতে লাগিল ও সেই সঙ্গে নটু দত্তকে এক রকম পাগল করিয়া তুলিবার যোগাড় করিল!

 নটু একদিন খরচের হিসাব মিলাইয়া দেখিল ব্যয় চারিগুণ বাড়িয়া গিয়াছে! নটু মনে মনে আক্ষেপ করিল—হায়! আজ যদি এই পঙ্গপালের দলে ঘর না ভরিয়া যাইত তাহা হইলে এই কয় বছরে কত টাকা জমিত! কি কুগ্রহে পড়িয়াই সে বিবাহ করিয়াছিল!—মানুষের কি ভুল এই বিবাহ করাটা! খরচ বাড়াইয়া তুলিতে এমন আর দ্বিতীয় নাই—এই স্ত্রীর মত!

 ছেলেপুলের উপদ্রবই কি কম?—রাস্তায় ফেরিওয়ালা দেখিলেই তাহাকে ডাকিয়া হাজির করাইবেই! দু’এক পয়সার করিয়া সামগ্রী কিনিয়া দিতে হইলেও যে অনেকগুলি পয়সা বাজে খরচ করিতে হয়—ছেলেপুলে ত আর একটি আধটি নয়! আর ফেরিওয়ালা গুলোও কি কম দুষ্ট! নটুর বাড়ীর সম্মুখে না হইলে কি আর ফেরি করিয়া মরিবার যায়গা নাই? নটু এক একবার ভাবে এ হতভাগা কলিকাতা ত্যাগ না করিলে আর নিস্তার নাই— একে জিনিষ পত্রের দাম—আগুন, তাহার উপর নিত্য বাজে খরচের হাঙ্গামা! এক পয়সার দুটা ‘অবাক্‌ জলপান’ খাইয়া ছেলেগুলা যে কি সুখ পায় তাহা ত নটু ভাবিয়াই স্থির করিতে পারে না!—অথচ একটা একটা পয়সা খরচ! কিন্তু কলিকাতা ছাড়িলে নটুর চলিবে কেমন করিয়া? তেজারতির ব্যবসা—সে তো আর পল্লীগ্রামে বসিরা করা চলে না! তাহা হইলে তো ভাবনাই ছিল না!

 হঠাৎ নটুর বরাৎ ফিরিবার লক্ষণ দেখা দিল—তাহার ছোট মেয়েটি দুই দিনের জ্বরেই বাপের একটু সুবিধা করিয়া দিয়া গেল! নটু খাতা খুলিয়া হিসাব করিয়া দেখিল এখন হইতে প্রতি মাসে তাহার কতটা কম খরচ হইবে!

 তার পর একে একে নটুর তিন মেরে ও বড় ছেলেটা মারা গেল—নটুও পূর্ব্বের মত খাতা খুলিয়া দেখিয়া রাখিল- আবার তার খরচ কত কমিল! নটু স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিত— ‘জন্মিলেই মরিতে হয়—দুঃখ করিয়া ফল কি’? সান্ত্বনা লাভ দূরে থাক ইহাতে সঘ শোকার্ত্ত নারীহৃদয়ে শোকের আগুন দ্বিগুণ জলিয়া উঠিত! নটুর পত্নী স্বামীকে বলিত “তোমার জন্যেই তো বাছারা আমার রইল না!— যে করতে!”

 নটু পাষাণের মত অবিচলিত চিত্তে বলিত “সাধে কি আর বল্‌তুম যারে ভুগ্‌তে হয় সেই বলে—ছেলেপুলের খরচ, কি কম?”

 শুনিয়া নটুর স্ত্রী নটুর ও নটুর টাকার মুখে অগ্নি সংযোগের ব্যবস্থা না করিয়া থাকিতে পারিত না—নটু কিন্তু তাহাতে চটিত না - তার টাকা খরচ না হইলেই হইল!

* * *

 নটু হতবুদ্ধি!—দুই বৎসরের মধ্যে এমন সুবিধা হইয়া যাবে, এ যে সে একদিন স্বপ্নেও ভাবে নাই!—

 নটুর ছেলে কয়টি সব মারা গিয়াছে, আজ নটু তার স্ত্রীর সৎকার করিয়া ঘরে ফিরিয়া অনেক দিনের পর নিশ্চিন্ত মনে খাতা খুলিয়া সুদের হিসাব করিতে বসিল! পাড়ার লোকে এবার অবাক হইয়া গেল। তখন বেলা গিয়াছে—‘ঘুগণীদানাওয়ালা’ নটুর বাড়ীর সম্মুখ দিয়া হাঁকিয়া গেল।—নটুর বুকটা অভ্যাসের বশে অমনি ছাঁৎ করিয়া উঠিল—কিন্তু তার মনে পড়িল আজ সে একা!—নিশ্চিত্ত! নটু হাপ ছাড়িয়া বাঁচিল। সে রাত্রে নটু চক্ষু মুদিল না—রাত দুইটা! শয্যা ত্যাগ করিয়া সে ঘরে আলো জ্বালিল। ভিতরদিক হইতে দ্বারে বড় বড় দুইটা তালা লাগাইল। জানালাগুলি বন্ধ করিয়া দিল। তারপর তার তিন পুরুষের সঞ্চিত অর্থরাশি লোহার সিন্দুক হইতে বাহির করিয়া শয্যার উপর রাখিতে লাগিল—কেবল মোহর আর বন্ধকী গহনা —টক্‌টকে সোণার স্তূপ! শয্যার দুই পার্শ্বে দুইটা আলো জ্বালাইয়া দিল—বিছানা ঝকঝক করিয়া উঠিল। নটু দুই হাত বক্ষে চাপিয়া আনন্দে উন্মত্তের ন্যায় কিছুক্ষণ অপলক নেত্রে সেই সোণার স্তূপের পানে চাহিয়া রহিল। তার পর একটা বিকট হাসি হাসিয়া স্ত্রীর নাম ধরিয়া সে ডাকিল-স্ত্রীর নাম করিয়াই সে চমকিয়া উঠিল। ভাবিল-পাগল হলুম নাকি?—সে যে মরেগেছে!—তাকে ডাক্‌চি? নটু একবার চারিদিকে চাহিয়া দেখিল—সব জিনিস তো সে ঠিকই দেখিতেছে—ঐ লোহার সিন্দুক—ঐ হিসাবের খাতা—ঐ সিঁদুর মাথা গণেশ—তারি পাশে রাধার নিত্য পাঠের মহাভারত—সব তো সে ঠিকই দেখিতেছে! নটু ভাবিল—না পাগল হব কেন?

 হঠাৎ বাহিরে একটা কুকুর ডাকিয়া উঠিল, আর ঠিক সেই সময়ে কে যেন দ্বারে ঘা দিল, নটু তাড়াতাড়ি আলো নিভাইয়া দিয়া সেই মোহরের উপর বুক পাতিরা শয্যা আঁকড়াইয়া ধরিয়া রহিল—তার বুকের ভিতর কে যেন মুগুর মারিতেছিল। নটু বেশ বুঝিতে পারিল, কে যেন ঘরে লোহার সিন্দুকটার কাছে খস্ খস্ করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। কি যেন খুঁজিতেছে। অবশেষে কন্‌কনে ঠাণ্ডা হাতে কে যেন নটুর পা ঠেলিয়া বলিল “এমন করে আঁকড়ে থাকলে চল্‌বে না—ওঠো! ছেড়ে দাও, তোমার পেতে শোবার জন্য মোহর হয়নি!


 নটু একবার ‘বাপ’ বলিয়া উঠিল, তার পর সব ঠাণ্ডা!

 সকালে নটু দ্বার খুলিল না। সমস্ত দিন গেল—তবু দ্বার বন্ধ—প্রতিবেশীদের একটু সন্দেহ হইল— বিস্তর ডাকাডাকি করিয়াও নটুর উত্তর পাইল না। তখন পুলিসে খবর দেওয়া হইল।

 দ্বার ভাঙ্গিয়া ঘরে ঢুকিয়াই সকলে দেখে, বিছানার উপর মোহরের রাশি ঢালা আর তাহার উপর নটু আড়ষ্ট ও কঠিন হইয়া মুখ গুঁজিয়া শুইয়া রহিয়াছে, তার গা বরফের মত ঠাণ্ডা আর মুখের কাছে খানিকটা রক্ত শুকাইয়া জমিয়া গিয়াছে।