বিষয়বস্তুতে চলুন

আঙুর/হার-জিত

উইকিসংকলন থেকে

(পৃ. ১৯-৩২)

হার-জিত।

 নন্দলাল মাতুলের মুখের উপরই বলিয়া বসিল,“সেই বেশ! আমি কালই চলে যাচ্ছি!”

 এ পর্য্যন্ত পরাণবাবুর মুখের উপর এমনভাবে কেহ কখনও জবাব দিতে সাহস করে নাই। রোষে ও বিস্ময়ে তিনি ক্ষণকাল নির্ব্বাক হইয়া রহিলেন। মুহূর্ত্ত পরে গর্জ্জিয়া বলিলেন, “এখনি বেরোও!”

 নন্দলাল স্থির ও পরিষ্কার কণ্ঠে উত্তর দিল, “বেশ! টাকা-কড়িগুলো ফেলে দিন—যাচ্ছি!”

 পরাণবাবু যেন আকাশ হইতে পড়িলেন বলিলেন, “টাকাকড়ি!”

 নন্দলাল কহিল, “আজ্ঞে হাঁ!—মার তিন হাজার টাকার গহনা, আর বাবার বিষয় বিক্রীর টাকা।”

 একটু বিদ্রূপের হাসি হাসিয়া পরাণবাবু বলিলেন, “ওঃ!—তোমার বাবার জমিদারী ছিল!—তাই বুঝি তুমি ছোট বেলা থেকে নামার অন্নে মানুষ হয়ে আসছ?”

 নন্দলালের মুখ শুকাইয়া গেল সে বিকৃত কণ্ঠে বলিল, “অ্যাঁ!—কু-অভিসন্ধি!”

 এক অনুচরের দিকে চাহিয়া পরাণবাবু বলিলেন, “শুন্‌ছ শ্যামলাল!”

 সমস্ত স্তাবকের দল বলিয়া উঠিল, “ছিঃছিঃ —একি অসম্মানের কথা!”

 পরাণবাবু আল্‌বোলার নল টানিতে টানিতে মোটা গলায় বলিলেন, “কলিকালে উপকার করার ফল, এই!”

 সকলে বলিল, “যা বলেছেন!”

 পরাণবাবু নন্দলালের দিকে চাহিয়া ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন, “যাও!—নালিস করে নাও-গে!”

 নন্দলাল একবার উর্দ্ধপানে চাহিয়া বলিল, “এর বিচার তিনিই করবেন।” বলিয়া সে তথা হইতে দ্রুত চলিয়া গেল।

 পরাণবাবু একবার স্তাবকমণ্ডলীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, “এ হ’ল কি?—এত আস্পর্দ্ধা কিসের?”

 এক ব্যক্তি বলিল, “ও বালামের গুণ!”

 পরাণবাবু একটু কপার হাসি হাসিয়া বলিলেন, “তাই দেখচি!”

 নন্দলাল শৈশবেই পিতৃহীন হয়। তাহার পিতা পশ্চিম অঞ্চলে বহুদিন চাকুরী করিতে করিতে অবশেষে সেই দেশেই বসবাস স্থাপন করিয়াছিলেন। তাঁহার আরও কয়েকটি সন্তান হইয়াছিল; কিন্তু দুইএক বৎসরের হইতে না হইতে সবগুলিরই জীবন-মুকুল অকালে ঝরিয়া পড়ে। ইহাতে অর্থসঞ্চয়ের দিকে নন্দলালের পিতার তেমন দৃষ্টি ছিল না— উপার্জ্জিত অর্থের অধিকাংশই তিনি লোক-হিতে ব্যয় করিতেন। কিন্তু দশ বৎসর পরে বিধাতা সেই নিরানন্দ সংসারে আবার একটি স্নেহের ধন সন্তান পাঠাইয়া পিতামাতার শোক-দগ্ধ প্রাণে আনন্দরস সঞ্চারিত করিয়া তুলিলেন।

 শোকজীর্ণ প্রৌঢ় কাশীনাথ কিন্তু ভাঙিয়া পড়িয়াছিলেন। নন্দলালকে বেশী দিন জুড়াইবার তিনি অবসর পাইলেন না! স্নিগ্ধ রাত্রে তাঁহার ডাক পড়িল। বুকে করিয়া পূর্ণিমার এক অন্তিম কালে অতৃপ্ত পিতৃস্নেহ মায়ার শৃঙ্খলটি আরও জটিলতর করিয়া তুলিয়াছিল! মৃত্যুকালে পত্নীর হাতখানি ধরিয়া দুই চক্ষে ধারা বহাইয়া কাশীনাথ বলিলেন, “তুলসি! ছেলে বুকে ধরে সুখ ভোগ করার কপাল আমার নয়!—তবু একে যে রেখে যেতে পারলুম, এই ঢের!”

 নন্দলাল তখন পাঁচ বৎসরের। পিতৃকুলে তাহার তেমন কোন আত্মীয় ছিল না। যাঁহারা ছিলেন, তাঁহারা যে অনাথ শিশুর রক্ষক হইবেন, এমন সম্ভাবনা ছিল না। সুতরাং তুলসী সহোদর পরাণ বাবুর শরণাপন্ন হইলেন—হাজার হউক তিনি ‘মার পেটের’ ভাই!

 পরাণবাবু লোকটি খুব পাকা। তিনি কলিকাতায় বাস করেন। পৈতৃক বিষয়-সম্পত্তি যৎকিঞ্চিৎ আছে বটে, কিন্তু তাহাতে কলিকাতার বিলাস-ব্যয় সঙ্কুলান হয় না। অথচ পরাণ বাবুর সাংসারিক অবস্থা বেশ স্বচ্ছল, —বরং স্বচ্ছনেরও বেশী। ইহাতে পাঁচজনে পাঁচ কথা বলিলেও বাহিরে তাঁহার প্রতিপত্তি অটুট!

 পাঁচ বছরের ছেলে লইয়া তুলসী ভাইয়ের সংসারে আসিয়া আশ্রয় লইলেন। এই আশ্রয় গ্রহণের মূলে দৈন্যের দংশন জ্বালা যে এতটুকু ছিল না, এবং অভিভাবকের একমাত্র অভাবই যে তাঁহাকে ভ্রাতৃ-সংসারে টানিয়া আনিয়াছে, এ কথা তুলসী কাহাকেও কোন দিন বুঝাইতে চান নাই। তিনি আশ্রিতের মতই কুণ্ঠিতভাবে জীবনের অবশিষ্ট কালটুকু পূজা-অর্চ্চনায় কাটাইয়া দিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন! তিনি ভাবিতেন, বৈধব্যের অপেক্ষা নারীর অদৃষ্টে অধিক দুর্ভাগ্য দীনতার বিষয় আর কি থাকিতে পারে!

 পরাণবাবু ভগিনীকে মর্য্যাদার সহিতই গৃহে স্থান দিলেন। ভাগিনেয়ের যাহাতে মঙ্গল হয়, সে বিষয়ে প্রাণপণ যত্ন করিতে ত্রুটি হইবে না, বলিরা আশ্বাস প্রদান করিলেন। ভগিনীর বিষয় কর্ম্ম পর্যবেক্ষণ করিতে গিয়া পরাণবাবু অনেক সময় নিজের ক্ষতিও স্বীকার করিতেন!

 এইরূপে এক বৎসরের উপর অতিবাহিত হইয়া গেল। একদিন পরাণবাবু ভগিনীকে কহিলেন, “এত দূরে থেকে বিষয়-রক্ষা করা বড়ই শক্ত ব্যাপার! আমার দ্বারা দেখচি আর হয়ে ওঠে না— আর সে সম্ভবও নয়! অথচ বিশ্বাসী লোকও পাওয়া দুষ্কর!”

 তুলসী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তবে কি করলে ভাল হয়?”

 পরাণবাবু কিয়ৎকাল চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আমার মতে বিদেশের বিষয়-সম্পত্তি সব বিক্রী করে সেই টাকা সুদে খাটানো ভাল! তা’তে কিছু কম লাভ হয়, সেও বরং ভাল, বিষয়-আশয়ের ঝঞ্ঝাট ঢের! এই দেখতেই তো পাচ্চো!”

 কথাটা বিধবার নিকট কতকটা সমীচীন বলিয়া বোধ হইল, তিনি বলিলেন, “তুমি যা ভাল বোঝ, তাই কর—তুমি তো আর নন্দর পর নও!”

 পরাণবাবুর চোখের পাতা ভিজিয়া উঠিল— তিনি আর্দ্রস্বরে কহিলেন, “দিদি, নন্দ যে আমার পরা নয়, তা কি আর বলে বোঝাতে হয়! ভাগ্‌নে আর ছেলেতে তফাৎ কি?—বিশেষ যখন অমন সোণার চাঁদ ছেলে! যে দেখে, তারই বুকে তুলে নিতে ইচ্ছা করে! কথাটা বলিয়া পরাণবাবু একটা দীর্ঘ-নিশ্বাস ফেলিলেন।

 ইহার কিছু দিন পরে পরাণবাবু পশ্চিম যাত্রা করিলেন। ভগিনীপতির মৃত্যুর পর এই চতুর্থবার তাহার পশ্চিম যাত্রা। বাহিরে প্রকাশ—তাঁহার শরীর খারাপ।

 বিষয় বিক্রয় হইল, কিন্তু তেমন দর উঠিল না—পরাণবাবু যে টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিলেন। ভগিনীর অলঙ্কারাদি ইতিপূর্ব্বেই তিনি আপনার লৌহ সিন্ধুকের নিরাপদ গহ্বরে নিক্ষেপ করিয়া রাখিয়াছিলেন। সুদের টাকাটাও পরাণবাবুর ক্যাশবাক্সে আশ্রয় লাভ করিত, তবে, ভগিনীর প্রয়োজন হইলে পরাণবাবু টাকা লইয়া প্রস্তুত!

 তুলসী নিশ্চিন্ত, তাঁহার শিশুপুত্র নন্দলালও নিশ্চিন্ত! একজন নিশ্চিন্ত—গভীর বিশ্বাসে; আর একজন নিশ্চিন্ত—শৈশব-সরলতায়! শুধু নিশ্চিন্ত নহেন—পরাণবাবু!

 এইরূপে পাঁচ বৎসর কাটিয়া গেল। সেই সঙ্গে তুলসীর বৈধব্য-জানারও অবসান হইল! মৃত্যুকালে তুলসী পুত্রকে ভ্রাতার হস্তে জন্মের মত সঁপিয়া দিয়া গেলেন!

 তুলসীর মৃত্যুর পর হইতে পরাণবাবুর চক্ষু খুলিয়া গেল—তিনি ভাগিনেয়টীতে অনেক ত্রুটি দেখিতে লাগিলেন; সে দুরন্ত—উদ্ধত—অসহিষ্ণু—বুদ্ধিহীন—মিথ্যাবাদী—লোভী—বিলাসপ্রিয়, এবং উত্তরকালে যে সে একজন দারুণ দুর্দ্দান্ত লোক হইবে, পরাণবাবু যেন তাহা ভবিষ্যতের দর্পণে প্রতিবিম্বিত দেখিতে পাইলেন! পরাণবাবু যখন দেখিতে পাইলেন, তখন তাঁহার ‘উপগ্রহ’রাও যে না দেখিতে পাইবেন ইহা কোন মতে হইতেই পারে না।

 পরাণবাবুর পত্নী রাজলক্ষ্মী কেবল স্বামীর মত সূক্ষ্ম-দৃষ্টি-লাভে বঞ্চিতা হইলেন। তিনি পূর্ব্বের মতই নন্দলালকে স্নেহ ও শাসন করিতেন।

 শাসন করা হয় হউক, পরাণবাবুর তাহাতে আপত্তি নাই, কিন্তু এত স্নেহ দেখাইয়া অমন আব্দারে করিয়া তুলিবার কি প্রয়োজন! দুধ না হইলে খাওয়া হয়না,— ডালের সঙ্গে ‘ভাজি’ দরকার, —সকালে-বিকালে জলখাবার,—এত কেন?—কিসের জন্য?

 রাজলক্ষ্মী যদি বলিতেন, “আহা চিরকাল ও ভাল খেয়ে ভাল পরে, এসেছে!” পরাণবাবু অমনি আঁখি রক্তবর্ণ করিয়া বলিতেন, “পরের বাড়িতে এসে আর ও সব আব্দার করলে চলে না!"

 রাজলক্ষ্মী আশ্চর্য্য হইয়। গালে হাত দিয়া বলিতেন, “ওমা! সে কি গো! ‘পরের বাড়ি’ কি!”

 পরাণবাবু বিরক্ত হইরা বলিতেন, “হাঁ—হাঁ, আর ‘আপনার’ হয়ে কাজ নেই! কে কার?”

 এই কথায় পত্নী মর্ম্মাহত ও বিরক্ত হইয়া একদিন বলিলেন, “তা না হয়, এর খোরাকীর দাম ধরে নিও—ওর বাপের টাকা ত তোমার হাতে আছে!”

 পরাণবাবু অগ্নিশর্ম্মা হইয়া বলিলেন— “কি? বাপের টাকা! বাপ কত ‘নশপঞ্চাশ’ রেখে গেছলো যে, আজও তাই আছে?”

 শুনিয়া রাজলক্ষ্মী বজ্রাহতের ন্যায় ক্ষণকাল নিশ্চল হইয়া দাঁড়াইয়া স্বামীর মুখের পানে চাহিয়া লিলেন, “ও—!”

 অতি অল্প দিনের মধ্যেই নন্দলাল পরাণবাবুর চক্ষুশূল’ হইয়া উঠিল। লাঞ্ছনায় ও অপমানে সে আরও কিছুকাল কিছুকাল কাটাইয়া দিল! পরাণবাবুর অমনোযোগে ও কু-শাসনে নন্দলালের লেখাপড়াও তেমন হইল না। শেষে একদিন তিনি নন্দকে চাকরীর চেষ্টা দেখিতে বলিলেন। নন্দ কহিল, নিজে চাকরীর যোগাড় করে নেওয়া বড় কঠিন বিশেষত—এই কলকেতায়।”

 পরাণবাবু একটু রুক্ষ স্বরে কহিলেন, “চাকরী করবার ইচ্ছা থাকলে তার চেষ্টা করতে, সে ইচ্ছা তো নেই!”

 নন্দলাল বলিল, “আজ্ঞে, চাকরী পেলে তার করি না!”

 “নাঃ—চাকরী আর কলকেতা সহরে মেলেনা! —এই তো সেদিন ট্রামোয়ের কণ্ডাক্টারী চাকরী কতকগুলো খালি ছিল, একবার তার চেষ্টা করেছিলে?”

 নন্দলালের মুখথানা অভিমানে ও অপমানে লাল হইয়া উঠিল! তাহার অধর বারেকের জন্য স্ফুরিত হইয়া উঠিল, সে একটা ঢোক গিলিয়া যথাসম্ভব আত্মভাব সংযত করিয়া বলিল, “খেতে না পাই সেও ভাল, তবু আমি ও চাকরী করছি না!”

 সুবিধা পাইয়া পরাণবাবু স্পষ্টই বলিলেন, “তা তুমি তোমার বাসা ঠিক কর, আমি আর তোমায় বসিয়ে খাওয়াতে পারব না!”

 নন্দলালও রাগের মাথায় বলিয়া ফেলিল, “তাই বেশ!—আমি কালই যাচ্ছি!”


 সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া রাজলক্ষ্মী নন্দলালকে বলিলেন, “সত্যি! এত লাঞ্ছনায় আর এখানে থাকা তোমার উচিত নয়—তা’ তোমার টাকা উনি না দেন, আমি দেব! আমার তো যা হোক দু-দশ-খানা গহনা আছে! অবিশ্যি তাতে তোমার সব টাকা হবে না—তবু যতটা হয়।”

 নন্দলালের বুকটা দুর-দুর করিয়া উঠিল—সে বলিল, “আপনার... গহনা!”

 রাজলক্ষ্মী বলিলেন, “হ্যাঁ—তাতে কি? আমার গহনা—সেত ওঁরই পয়সায়!”

 নন্দলাল ভাবিল, সে কথা সত্য! সে কেন অনর্থক ফাঁকীতে পড়িবে! তবু যতটা পাওয়া যায় তাহাই লাভ!

 গহনার বাক্স রাজলক্ষ্মীর কাছেই থাকিত। গহনা প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার টাকার হইবে। রাত্রে কর্ত্তা নিদ্রা যাইবার পর রাজলক্ষ্মী নন্দকে তাহা দিয়া গেলেন। হাতে রহিল, শুধু দুইগাছি রুলী।

 নন্দলাল রাজলক্ষ্মীকে দেখিয়া বলিল, মামিমা, আপনাকে বড় বিশ্রী দেখাচ্চে! না, আমি গহনা চাইনে—আমার কপালে যা আছে, তাই হবে।”

 রাজলক্ষ্মী গম্ভীরস্বরে কহিলেন, “না, তোমায় নিতে হবে—নইলে আমার সংসারে দোষ লাগবে— আমার ছেলের অমঙ্গল হবে।” বলিয়া তিনি গহনার বাক্স নন্দলালের নিকট রাখিয়া চলিয়া গেলেন। পরমুহূর্ত্তে আবার রাজলক্ষ্মী ফিরিয়া আসিলেন, বলিলেন, “নন্দ! শুধু একটী অনুরোধ করতে এসেছি—রাখতে হবে!—কাল খুব সকালে বেরিয়ে যেয়ো—উনি ওঠবার আগে—”

 নন্দলাল কঠিনদৃষ্টিতে মামীর মুখের পানে চাহিয়া বলিল, “চোরের মত, চুপি চুপি?”

 রাজলক্ষ্মী বুঝিলেন—কথাটা নন্দলালের কোথায় বাজিয়াছে! তখনই তিনি মায়ের মত স্নেহের ভাবে বলিলেন,—“দূর পাগল! তা কেন? বলছিলুম এই জন্যে,—তুমি যাচ্ছো জানতে পারলে, উনি যেতে না দিতে পারেন, কিন্তু এই রকম বারবার অপমান সহ্য করে যে তুমি এখানে থাক আমার তা মোটেই ইচ্ছা নয়!”

 নন্দলালের মনে কিন্তু কেমন একটা খট্‌কা লাগিয়া রহিল। সে ভাবিতে লাগিল,—মামা আমার যথাসর্ব্বস্ব ঠকাইয়া লইতে উত্থত হইয়াছে!—মার গহনাগুলি পর্য্যন্ত! আমার মরা-না! যিনি মরিবার সময় তাঁর ভাইয়ের হাতে আমাকে সঁপিয়া দিয়া গিয়াছিলেন! আর সেই ভাই—তার এই কাজ!—চোর তস্করের মুখ হইতে যদি কিছু ছিনাইয়া লইতে পারা যায়, তাহাতে কি দোষ? কিসের সঙ্কোচ?

 ভাবিতে ভাবিতে নন্দলাল অস্থির হইয়া উঠিল— তাহার কপালে বিন্ বিন্ করিয়া যান বাহির হইতে লাগিল—সে অস্থির চিত্তে গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া পড়িল। পথে কেরোসিনের একটা টিন পড়িয়াছিল, সেটা সশব্দে সিঁড়িতে গড়াইয়া পড়িল। কুকুরটা সতর্কতা অপেক্ষা ভীরুতার বশে চীৎকার করিয়া উঠিল।—নন্দলাল কোনদিকে দৃক্‌পাত না করিয়া বহির্দ্বার উন্মুক্ত করিয়া একেবারে রাস্তায় গিয়া পড়িল ভৃত্য জনার্দ্দনের নিদ্রা তখন ‘পরিপক্ক’ হইয়া আসিয়া ছিল, জাগিয়া সে “চোর চোর” বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। কর্ত্তা-গৃহিণী উভয়েই জাগিয়া উঠিলেন এবং বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, নন্দর ঘরের দ্বার উন্মুক্ত—আলো জ্বলিতেছে। পরাণবাবু ‘নন্দ, নন্দ’ বলিয়া ডাকিতে ডাকিতে সেই ঘরে প্রবেশ করিলেন। নন্দ সেখানে নাই! তখন হঠাৎ পরাণবাবুর দৃষ্টি নন্দর টেবিলের উপর পড়িল, তিনি চীৎকার করিয়া উঠিলেন,—“সর্ব্বনাশ হয়েছে— গহনার বাক্স এখানে!—একি?—আঁ!” কথাটা বলিয়া তিনি পশ্চাদনুগামিনী স্ত্রীর পানে চাহিয়া একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন! তাঁহার স্ত্রী একরূপ নিরাভরণা!

 বিস্ময়ে উদ্বেগে রাজলক্ষ্মীর কণ্ঠরোধ হইবার উপক্রম হইল—তিনি নির্ব্বাক নিশ্চল ভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। পরাণবাবু ছুটিয়া টেবিলের নিকট গেলেন দেখিলেন, গহনার বাক্স অলঙ্কারপূর্ণ, আর তাহার মধ্যে একখানা চিঠি! এ যে নন্দরই হাতের লেখা!

 নন্দ লিখিয়াছে, “মামিমা! গহনা নিতে পারলুম না- আমার সর্ব্বস্ব গেলেও যা আমার আজও আছে, তা আমি হারাতে বসেছিলুম!—এই রইলো আপনার গহনা—এর বড় নেশা!—আমি পালালুম। দেখেচি, পাগল হব!

প্রণত নন্দ।”

 জীবনে এই প্রথম পরাণবাবুর চোখের পুরু আবরণ সরিয়া গেল! চকিতে তিনি দেখিলেন,—তিনি কত নীচে, আর হৃতসর্ব্বস্ব পলাতক অনাথ নন্দলাল—কত উচ্চে!

 কিন্তু এ ভাব মুহূর্ত্তের জন্য মাত্র! ইহার পর পরাণবাবুর সংসার যেমন চলিতেছিল তেমনই চলিতে লাগিল! নন্দলালের কথা কেহই তুলিত না! বরং তুলিলে, পরাণবাবু বিরক্ত হইতেন! কেবল একটী স্নেহকোমল নারীহৃদয় সেই মাতৃহীন অনাথ সন্তানের জন্য মাঝে মাঝে ব্যথিত হইয়া উঠিত!