আজকের আমেরিকা/চিকাগোর পথে

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন


চিকাগোর পথে

 স্বদেশে যা শুনা যায়, বিদেশে গিয়ে তা প্রত্যক্ষ করতে ইচ্ছা হয়। স্বদেশে থাকতে প্রায়ই শুনতাম আমেরিকাবাসীরা অনেকেই হিন্দুধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে। স্বামী বিবেকানন্দ নাকি অনেক আমেরিকানকে হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন; বর্তমানেও নাকি অনেক রামকৃষ্ণ মিশনী সন্ন্যাসী সে কাজে ব্যস্ত আছেন। নিউইয়র্ক, বাফেলো এবং ডিট্রয়ে তার কোনরূপ নিদর্শন না পেয়ে ভেবেছিলাম চিকাগোতে গিয়ে হয়ত চিকাগোবাসীদের হিন্দুরূপেই দেখতে পাব, কিন্তু ডিট্রয়ের হিন্দুরা আমার ধারণা একদম ভ্রমাত্মক এবং অমূলক বলেই বলেছিলেন। ডিট্রয়ের হিন্দুদের কথায় আমি কান দেইনি কারণ ১৯৩৬ সালে যখন ইউরোপ হতে দেশে আসছিলাম তখনও বেলুড়ে গিয়ে শুনেছিলাম, কোনও আমেরিকাবাসী নাকি একটি মঠ তৈরী করতে অনেকগুলি টাকা দিয়েছেন সে মঠ কিরূপ হবে তার একটা মডেলও দেখতে পেয়েছিলাম। আমেরিকাতে হিন্দুধর্ম-প্রচার সম্বন্ধে সময় সময় ছোট ছোট বইএর বিলি অথবা বিক্রিও ভারতে হয়ে থাকে। ভারতে এতগুলি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যখন নিউইয়র্কে গিয়ে হিন্দুধর্ম প্রচারের কোন সাড়া পেলাম না। তখন একটু দুঃখিত হয়েছিলাম যদি বলি তবে দোষের হবে না, কারণ আজ পর্যন্তও হিন্দুধর্মের যে সকল ছাপ মনের কোণে জন্ম হতে মেরে দেওয়া হয়েছিল তা মুছতে সক্ষম হইনি। কৌতূহল না থাকলে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশ হয় না। ছোট বেলায় যে সকল কৌতূহল মনের মাঝে গজিয়ে উঠে তা উপলব্ধি করা ভবিষ্যত জীবনের কাম্য হয়ে দাঁড়ায়।

 আজও আমরা স্বামী বিবেকানন্দের কথা বলে তৃপ্তি অনুভব করি। গর্বও করে থাকি। আমাদের গর্ব, আমাদের তৃপ্তি এসবের পেছনে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের চিকাগোর লেকচার। সেই চিকাগো দেখবার একটা প্রবল বাসনা পূর্বেও ছিল তারপর যখন ডিট্রয় আসলাম তখনও সেই ভাবটা আবার ফিরে এল। ডিট্রয় হতে চিকাগোর দিকে সাইকেলে যাবার আর চেষ্টা করলাম না। এরূপ চেষ্টা করা বাতুলতা মাত্র। হাতে টাকা রয়েছে অথচ রাত্রে হোটেলে কেবিনে কোথাও থাকতে পাব না, এরচেয়ে কষ্টের আর কি আছে। তাই চিকাগো যাবার অন্য বন্দোবস্ত হতে লাগল। বৃদ্ধ জগৎবন্ধু দেব মহাশয় আমার চিকাগো যাবার বন্দোবস্ত করতে লাগলেন। আমি নিশ্চিন্ত মনে কংগ্রেস স্ট্রিটের গৃকদের হোটেলে এবং অন্যান্য স্থানে সুখাদ্য খেয়ে দিন কাটাতে লাগলাম।

 মিঃ নাগের কয়েকজন তুরুক ও গৃক বন্ধু ছিল। তারা আমার সংগে কথা বলে সময় কাটাতে ভালবাসত। তুর্কীয়া আমি বেড়িয়ে এসেছি, তুরকাই ভাষার কয়েকটি কথাও আমি বলতে পারতাম। এসব নানা কারণে এদের সংগে আমার কথাবার্তা বেশ জম্‌ত। গৃক ভদ্রলোক ব্যবসা করতেন আর তুরুক ভদ্রলোক নানা বিষয়ে গবেষণা করতেন। যারা নানা বিষয়ে গবেষণা করে তারা প্রায়ই আনমনা হয়ে থাকে। কথা প্রসংগে একদিন গৃক ভদ্রলোককে জিগ্যাসা করেছিলাম কেন তিনি অনেক সময়ই নানারূপ ভুল করে বসেন? আমার কথার জবাব দিতে তিনি মোটেই পছন্দ করেছিলেন না, অনেক বলার পর তিনি আমাকে তুরুক জাতের সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলেছিলেন। সেই কথাগুলি রাষ্ট্রনীতি নিয়েই জড়িত। রাষ্ট্রনীতি সকল সময়ই কূটনীতির অধীন। এসম্বন্ধে যারা বেশি বকে তারাই পথের লোক, কাজের লোক এসম্বন্ধে নীরব থাকতে বাধ্য হন। তাই তুরুক ভদ্রলোক নীরব থাকতেই ভালবাসতেন। এইটুকু বলার পরই ভদ্রলোক মুখ খুললেন এবং বলতে লাগলেন, “আপনি সাইকেলে করে চিকাগোর দিকে যাবেন। পথে কোথাও কোন কেবিনে হোটেলে আপনার স্থান হবে না।” তাঁর মুখ হতে একটি অপ্রত্যাশিত কথা হঠাৎ বেরিয়ে পড়ায় কথাটা বেশ ভালই লেগেছিল। চিকাগোর দিকে মোটরে করে যাব একথা বলায় তিনি সুখী হলেন না। তিনি বললেন সবচেয়ে ভাল হবে যদি আমি গ্রেহাউণ্ড বাস কোম্পানীর বাসে করে চিকাগো যাই। কথাটা আর না বাড়িয়ে এখানেই এবিষয়ে শেষ করলাম। আমি বেশ ভাল করেই বুঝেছিলাম এই ভদ্রলোকের আমেরিকা সম্বন্ধে অনেক অভিগ্যতা আছে।

 ডিট্রয় হতে রওয়ানা হবার বন্দোবস্ত হয়ে গেল। মিঃ মোহিত নামক এক ভদ্রলোক আমাকে তাঁর মোটর কারে করে চিকাগো নিয়ে যাবেন। যদিও মিঃ মোহিত মামুলী মজুরই তবুও তাঁর ছোট্ট একখানা মোটর কার ছিল। তাঁর মোটর কারের দাম হবে আমাদের দেশের পঁচাত্তর টাকা। আমেরিকায় আমাদের দেশের তিনশত টাকায় বেশ ভাল মোটরকার কিনতে পারা যায়।

 ডিট্রয় হতে চিকাগোর পথে এসে আমার চিন্তা হল পথে অনেকগুলি কেবিনে এবং হোটেলে থাকতে হবে। আমি অথবা মোহিতবাবু যদি হোটেল ম্যানেজারদের কাছে রুম ভাড়া নিতে যাই তবে কোন মতেই আমরা রুম ভাড়া পাব না। হরিদাস মজুমদার ফর্সালোক, তিনি সেকাজ করতে সমর্থ হবেন। তাঁকে সেই কাজের ভার দেওয়ায় তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করলেন। কিন্তু প্রথমদিনই একজন কেবিন-ম্যানেজারের কাছে গিয়ে হাস্যাম্পদ হয়ে ফিরে আসলেন। তাঁকে অপমান করায় আমরা ঠিক করলাম পথে কোথাও কোন হোটেলে থাকব না, পথেই রাত কাটাব।

 একদিন এক রাত আমরা ছোট মোটরকারে কোন মতে কাটিয়ে পরের দিন আর কষ্ট সহ্য করতে পারলাম না। একটা স্ট্রীটের এক পাশে মোটর দাঁড়া করে তারই কাছে মাটিতে বসে পরের দিন রাতটা কাটিয়ে দিলাম। একেই বলে কোনমতে রাত কাটান। আমরা কোনমতে রাত কাটাতে অভ্যস্ত। আমাদের সাহিত্যিক, আমাদের কবি অনেক পর্যটনকারীকেই কোনমতে রাত কাটাবার বন্দোবস্ত করে দিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনেন। এদেশে সেটি শোভা পায়, কিন্তু আমি যেদেশের কথা বলছি তা হল আমেরিকা। সেখানে মানুষ কোনমতে রাত কাটাতে ভালবাসে না এবং কোনমতে রাত কাটায়ও না। অনেক সময় শোনা যায় অনেক যুবক অর্থাভাবে হোটেলে না শুতে পেয়ে রোগগ্রস্ত হয়েছে, এবং অনেকে মরেছে, সে জন্য আজ আমেরিকার যুবক বেপরওয়া হয়ে হোটেলে অনধিকার প্রবেশ করে এবং রাতও ভালভাবে কাটিয়ে পরের দিন বহাল তবিয়তে পথে বের হয়। আইন এবং আইনের রক্ষক পুলিশও বেশি কথা বলতে সাহস করে না।

 আমরা ক্রমাগতই চলছিলাম। কোনদিন পথের পাশে আর কোন দিন বা স্ট্রীটের মোড়ে রাত কাটিয়ে যখন হয়রান হয়ে উঠলাম তখন এক দিন কথা প্রসংগে মোহিত বাবু বলেছিলেন এমন সুন্দর দেশে থাকতে হলে এটুকু সহ্য করতে হয়ই। মোহিতবাবুর কথা আমার আর সহ্য হল না, আমি মোহিতবাবুকে বলেছিলাম, “কায়স্থ হাজার শিক্ষিত হলেও ব্রাহ্মণের সেবা করেই চলে। আমার জন্ম হয়েছে ব্রাহ্মণকুলে তাই এসব কষ্ট আমি সহ্য করতে সক্ষম নই। দয়া করে কোনমতে আমাকে কালিফরনিয়ায় পৌঁছে দিন, আমি স্বদেশের দিকে ফিরতে পারলেই বাঁচি।” ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম গ্রহণ করেছিলাম বলেই বর্ণ বৈষম্য ভাল করে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমি সেই পাপ বর্ণ বৈষম্যকে যেমন করে ঘৃণা করি, ভারতের অন্তস্থলের কালোদাগ জাতিভেদকেও তেমনি ঘৃণা করি।

 কয়েকদিন ক্রমাগত অতি কষ্টে কাটিয়ে যখন আমরা চিকাগোর কাছে আসলাম তখন রাত দুটা হয়েছিল। চিকাগোতে যথাস্থানে পৌঁছাতে আরও তিন ঘণ্টা কেটে গেল। চিকাগোের লোক ঘুমিয়ে আছে অথবা জেগে আছে তা বুঝবার শক্তি নাই কারণ তখনও লোক পথে ঘাটে দিনের বেলার মতই চলছিল। আমরা নিগ্রোদের বাসস্থান ছেড়ে এমন একটি স্ট্রীটে আসলাম যার একদিকে নিগ্রোদের বাসস্থানের শেষ এবং শ্বেতকায়দের বাসস্থানের শুরু হয়েছে। রাতের বেলায়ই আমি বুঝতে পেরেছিলাম এই স্থানটিতে লোকের মনের ভাব কত নিকৃষ্ট হয়ে গেছে। পরে এসে সেই এভাবটি কতদূর নীচ স্তরে নেমেছে তা বুঝতে পেরেছিলাম। মানুষ মানুষকে কি রকমে ঘৃণা করতে পারে তা এখানে আসলেই বুঝা যায়।

 শ্বেতকায়দের ওয়াই এর দরজা খোলাই ছিল। শ্রীযুত ঘোষ এবং হরিদাস আমাকে একটি ওয়াই-এর রুম ভাড়া করে দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। তারা বলে গিয়েছিলেন পরের দিন বিকালে চারটার সময় এসে আমার সংগে দেখা করবেন।

 আমি যে রুমটি ভাড়া করেছিলাম তা ছিল ১৩ তলায়। তের সংখ্যা আমেরিকাতে অপয়া সংখ্যা বলে সকলেই এটিকে এড়িয়ে চলতে চায়। আমার কাছে তের নম্বরের কোনও মাহাত্ম্য ছিল না। তাই বিনা দ্বিধায় ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র রেখে ভাবলাম আগে একটু স্নান করি, তারপর সকালের আহার সেরে নিয়ে সকাল বেলার সংবাদপত্র পাঠ করে একটু ঘুমাই।

স্নানের বেশ ভাল বন্দোবস্তই ছিল। স্নানাগারের দিকে যাবার সময় একদল লোকের সংগে দেখা হল। তাদের ভাবগতি দেখে মনে হল, আমার ওয়াই. এম. সি. এ-তে থাকাটা যেন মস্ত অপরাধ হয়ে গেছে। কোন রকমে চোখ বুজে, স্নান করে চলে এলাম। পরে রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসেই গরম ‘হট কেক’ আর এক কাপ কাফির অর্ডার দিলাম। কিন্তু কিছুই যেন আসতে চায় না। অগত্যা বয়কে ডেকে বললাম, “আমাকে নিগ্রো ভাববেন না, আমি একজন হিন্দু, আপনার জাত যাবে না।” লোকটি অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে কি ভাবল, তারপর খাবার এনে দিল।

 আহারের পর তিনখানা সংবাদপত্র কিনে ওয়াই, এম. সি. এ-তে ফিরবার পথে এক ভদ্রলোকের সংগে মুখোমুখী দেখা। পাশ কাটিয়ে পথ ধরে চলেছি, হঠাৎ যেন মনে হল লোকটি আমার পিছন নিয়েছে। তাড়াতাড়ি লিফ্‌টের কাছে এসে উপরে চলে গেলাম, লোকটিও সংগে সংগে এল। লিফ্‌টে সে একটা কথাও আমার সংগে বলল না। ঘরের কাছে গিয়ে লোকটি বলল, “এই ঘরের নম্বরটা অপয়া, তাই এ ঘরে কেউ একা থাকতে সাহস করে না।” তার কথার কোন উত্তর না দিয়ে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলাম। ভিতর থেকে কান পেতে শুনতে পেলাম লোকটি অন্য একজনের সংগে কথা বলে চলে গেল। আমেরিকার পুঁজিবাদীদের উস্কানীতে অনেক দেশের কুৎসা রটিয়ে অনেক বই রচিত হয়েছে, তার পরিচয় আমরা বেশ পেয়েছি। কিন্তু ওয়াই. এম. সি. এ-তে এসে দুশ্চরিত্র লোকদের দুর্নীতির যে চরম দৃষ্টান্ত দেখেছি, আমাদের দেশের লোক বোধ হয় তা ধারণাই করতে পারবে না।

 একটার সময় ঘুম থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই ঠিক করলাম স্বামী বিবেকানন্দ যেখানে দাঁড়িয়ে বেদান্ত দর্শনের কথা বলে আমেরিকার নরনারীকে মোহিত করেছিলেন সেই স্থানটি দেখতে হবে। ওয়াই. এম. সি. এ-এর প্রচার বিভাগের সেক্রেটারীর সংগে সাক্ষাৎ করে সেই স্থানটির সন্ধান চেয়েছিলাম। আমার প্রশ্ন শুনে সেক্রেটারী যেন আকাশ হতে পড়লেন। অনেক ভেবেচিস্তে বললেন, “এটা কি ঐতিহাসিক গৃহ? এ সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না।”

 প্রচার বিভাগের লোকটির কথা শুনে একটু উচ্ছ্বাসের সহিতই বললাম, “ভারতের এতবড় একজন দার্শনিক, যার নাম পৃথিবীর লোকের মুখে মুখে সদা সর্বদা উচ্চারিত হয়, সেই বিবেকানন্দের কোন খোঁজ খবর আপনারা রাখেন না, সেটা সত্যই দুঃখের বিষয়।”

 “আজকাল কজন খৃস্টান যিশুখৃস্টের নাম নেয়, সে সংবাদ রাখেন কি?”

 “আর কেউ না নিক্‌ অন্তত আপনারা নিচ্ছেন, এটুকু বিশ্বাস করি।”

 “হাঁ, মুসোলিনী হিটলার স্ট্যালিন এখন হয়েছেন অবতার, অতএব যিশুর নাম হয়ত আমাদের ভুলতেই হবে।”

 কথা না বাড়িয়ে ফিরে চলে এলাম। নিজের ঘরে ফিরবার সময় ভাবলাম হয়ত আমরা স্বদেশে বিবেকানন্দ সম্বন্ধে যা শুনি তা অনেকটাই প্রোপাগেণ্ডা। স্নান করে ভাল করে পোষাক পরে খেতে বার হলাম। উপযাচক হয়ে দুএকজনের সংগে ভারতীয় ধর্ম এবং খৃস্ট ধর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করলাম। আমার কথা যেন কেউ শুনতে চায় না। সবাই যেন হিটলার আর মুসোলিনীর খবরের জন্য উদ্‌গ্রীব, এ ছাড়া তাদের আর কোন চিন্তাই ছিল না। সুতরাং তর্কবিতর্কের মধ্যে না গিয়ে পথের মানুষ পথেই বেরিয়ে পড়লাম। চলেছি শ্বেতকায়দের পাড়া দিয়ে। আমার মত কালো লোককে নির্ভীকভাবে বেড়াতে দেখে, অনেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার ডাচদের মত মুখভংগি করতে লাগল। তাদের মনের ও মুখের এরকম পরিবর্তন দেখে বিস্মিত ও মর্মাহত হয়েছিলাম। আটচল্লিশ নম্বর স্ট্রিটের মোড়ে যাবার পর অনেকগুলি নিগ্রোকে দেখে মনের অবস্থা অনেকটা সুস্থ হল। এখান থেকেই নিগ্রোদের পাড়া শুরু হয়েছে।

 কাছেই একখানা সংবাদপত্রের স্টল। সেখানে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে সংবাদপত্র বিক্রি করছিল। সে উচ্চৈঃস্বরে বলছিল ডিমক্র্যাসী বিপদে পড়েছে। আমার সে-দিনের সংবাদ বেশ ভালভাবেই জানা ছিল। তাই ছেলেটির কাছে গিয়ে বললাম, “ইউরোপীয় ডিমক্র্যাসী বিপদে পড়ছে বললে ভাল হত।” ছেলেটি আমার কথা কিছুই বুঝল না। দোকানী এসে জিগ্যাসা করল আমি কি বলেছি। তাকে বললাম, “ডিমক্র্যাসীর অর্থ ব্যাপক, অতএব কথাটাকে ছোট করে বলাই ভাল; কারণ ব্রাউন এবং কালো লোক ডিমক্র্যাসীর কোন ধার ধারে না। পোল এবং জার্মান লড়াই করছে; তাতে আমাদের কি? নিগ্রোরা সাদা পাড়ায় হাঁটতে পায় না, সাদা হোটেলে থাকতে পায় না, অতএব পোল অথবা জার্মান জাহান্নামে গেলে নিগ্রোর কিছু আসে যায় না।” দোকানী আমার কথা শুনে একটু ভাবল, তারপর বল্‌ল, “আপনি সত্য কথাই বলছেন, নিগ্রো নিগ্রোই থাকবে।”

 আমেরিকাতে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে―Italians are builders, Irish are rulers and Jews are owners.” দোকানী জাতে জু―বিনয়ী, ব্যবসায়ী এবং স্বল্পভাষী। কিন্তু সে নূতন ধরনের ইহুদী। লিথোনিয়া হতে এসে আমেরিকাতে বসবাস আরম্ভ করেছে। লিথোনিয়ার ইহুদীরা সব সময়েই সোভিয়েট নিয়ম পছন্দ করে আস্‌ছে, কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, যদি তাদের দেশ জার্মানরা দখল করে বসে তবে তাদের অবস্থা ভাল না হয়ে খারাপই হবে। এদিকে লিথোনিয়া যদি রাশিয়ার সংগে মিলে যায় তবে মাতৃভূমি ছেড়ে তাদের পরের দুয়ারে ঘুরে বেড়াতে হবে না এবং ভবিষ্যতের আর্থিক দুরবস্থা এবং বর্তমানের সামাজিক দুর্গতির কথা ভাবতে হবে না। সে জন্যই দোকানী আমাকে কোন রকম বাধা না দিয়ে আমার কথায় সায় দিয়েছিল। আমি যে হিন্দু সে কথা তার কাছে না বলে, তাকে আমার কথার সমর্থন করার জন্য ধন্যবাদ দিতে যাচ্ছি, এমন সময় সে একখানা “মস্কো নিউজ” আমার হাতে দিয়ে বলল, “যদি ডিমক্র্যাসী জান্‌তে হয় তবে এই পত্রিকাখানি পড়ুন, দাম একটি নিকেল মাত্র।” এক নিকেল দিয়ে “মস্কো নিউজ” কিনে পার্কে গিয়ে তাই পাঠ করতে লাগলাম।

 আমেরিকাতে ডিমক্র্যাসীর প্রবল প্রতাপ। ডিমক্র্যাট পার্টির প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। বক্তৃতা দেবার স্বাধীনতা সে দেশে আছে, সংবাদপত্র পাঠ করতে কোন বাধা নাই। আমি জানতাম না পার্কে বসে “মস্কো নিউজ” পাঠ করতে গেলেই গুপ্ত পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। মন দিয়ে সাপ্তাহিক পত্রটা পাঠ করছিলাম, আর ভাবছিলাম ভাষাটা বেশ সুন্দর অথচ তাতে ভাব প্রবণতা মোটেই নাই। মঁশিয়ে বরদিন হলেন পত্রিকাখানার সম্পাদক। তার নাম অনেকদিন অনেক স্থানেই শুনেছি। আজ হঠাৎ তাঁর কথা বিশেষ করে মনে হল। মনে হল তাঁর চীনের কার্যাবলী। তিনিই নাকি একদিন বলেছিলেন যদি মাও এখনই কাজ শুরু করেন তবে চীনের সমূহ ক্ষতি হবে। রুশ বিপ্লবীরা কথা অতি অল্পই বলেন, কি করে তাঁর মুখ হতে এরূপ কথা বের হয়েছিল, তাই আমি ভাবছিলাম।

 কাছেই একজন ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর ফিটফাট সাজগোজ, চেহারার জৌলুস, বসবার কায়দা, এসব দেখেই মনে হয়েছিল তিনি একজন বড়লোক। আমার কাগজ পড়ার ভংগি দেখেই বোধ হয় তিনি কাছে এগিয়ে এসে মস্কো নিউজের বাইরের পাতাটার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিলেন এবং কিছুক্ষণ বাদে একেবারে সটান কাছে এসে বললেন, “বেয়াদবী ক্ষমা করবেন, কাগজটা একটু দেখ্‌তে পারি?”

 “নিশ্চয়ই।”

 “এটা কোথাকার সংবাদপত্র?”

 “আপনাদের দেশেরই, তবে এসেছে রুশিয়া হতে!”

 “আপনার দেশ কোথায়?”

 “ইণ্ডিয়া।”

 “এসব সংবাদপত্র আপনাদের দেশে যায় না?”

 “জানি না।”

 “এখানে কবে এসেছেন?”

 “গত রাত্রে।”

 “কোথায় থাকেন?”

 “ওয়াই. এম. সি. এ-তে।”

 “ওয়াই. এম. সি. এ-এর ঘরের চাবি আপনার কাছে আছে।”

 “আছে বৈকি।”

 “দেখাতে পারেন?”

 “দেখাব না।”

 “তবে দুঃখিত আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করলাম।”

 “তাই হোক, চলুন কোথায় যাবেন; আপনার পরিচয়টা জানতে পারি কি?”

 ভদ্রলোক একখানা ব্যাজ দেখালেন, বুঝলাম তিনি গোয়েন্দা। পকেটে ছোট একটা পিস্তলও রয়েছে। তাকে জিগ্যাসা করলাম, “খবরের কাগজ পড়ার অপরাধেই গ্রেপ্তার করা হল বুঝি?”

 “তা নয়, আপনার হাতে মস্কো নিউজ।”

 “কোথায় আমার হাতে? এ যে আপনারই হাতে দেখছি। চলুন কোথায় যাবেন।”

 গোয়েন্দা একটু হেসে বললেন, “হাঁ। আমারই হাতে, তবে এ পার্কে বসে এসব সাহিত্য পাঠের স্বাধীনতা যে নাই, সে কথা বোধ হয় আপনি জানতেন না, এখন জানিয়ে দিলাম, সুতরাং এইটাকে পকেটে পুরুন।” গোয়েন্দা পার্কের বাইরে এসে আমায় বললেন, “গুডবাই”। আমি বললাম, “একেই বলে আপনাদের দেশের ডিমক্র্যাসি।”

 গোয়েন্দার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, দোকানীর কাছে এসে গোয়েন্দার কথা বললাম। দোকানী বলল “সে জন্যই দেখছেন না, কাগজটা এরকম চুরি করেই বিক্রি করেছি। এদিকে লিথোনিয়ার যত স্টল আছে, সব কটাতেই ‘মস্কো নিউজ’ পাবেন, আমেরিকানরা এসবের ধার ধারে না। এদের রাতারাতি কোটিপতি হবার যে রকম হুজুগ তেমন হুজুগ আর কারো নাই; সে জন্যই এরা এত বিপদে পড়েছে।”

 “বিপদ বলে ত কিছুই দেখছি না?”

 “পূর্বে এরা কথায় কথায় মিলিয়ন ডলারের কথা বলত, এখন এক গ্রাণ্ট (একশত) ডলারকেই বড় মনে করে। এই শহরেই দেখবেন নিকেল, ডায়েম (পাঁচ সেণ্ট, দশ সেণ্ট) নিয়েও লোকে সুখী হয়। এখন আর পূর্বের আমেরিকা নাই। সোনার খনি উজাড় হয়েছে, পেট্রলের মাইন ধনীদের হাতে চলে গেছে, রিয়্যাল এস্টেট অনেক হয়েছে, মজুরী কমেছে, অথচ খরচ পূর্বের মতই রয়েছে। বেকার সমস্যাও কম নয়, কাজ পেলেই লোক যেন বাঁচল।” ঘড়িতে চেয়ে দেখি তিনটা বাজতে পাঁচ মিনিট মাত্র বাকি। বাসে করে ওয়াই. এম. সি. এ-তে এসে দেখলাম, মোহিতবাবু তখনও আসেন নি। রিডিং রুমে ‘মস্কো নিউজ’টা ফেলে দিয়ে একটা চেয়ারে চুপ করে বসে দরজার দিকে চেয়ে রইলাম।

 কতক্ষণ পর একজন পাঠক মস্কো নিউজটা হাতে উঠিয়েই ধপ করে তা টেবিলে ফেলে দিলেন, যেন সাপের গায়ে হাত দিয়েছেন। ভাবলাম এ হেন পদার্থ এখানে আনা উচিত হয় নি। তৎক্ষণাৎ মস্কো নিউজটা নিজের হাতে নিয়ে পাঠ করতে লাগ্‌লাম। যে ভদ্রলোক নামটা দেখেই আঁৎকে উঠেছিলেন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,

 “এটা কি আপনার?”

 “হাঁ।”

 “আপনি কি কমিউনিস্ট্‌ মত পোষণ করেন?”

 “এখনও ঠিক করি নি।”

 “এ সব কাগজ পাঠ করবেন না, ভগবানে ভক্তি থাকে না।”

 “আমাদের দেশে চার্বাক বলে একজন দার্শনিক ছিলেন, তিনি ভগবান বলে কিছু মানতেন না।”

 “সেরূপ দার্শনিকের কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে, রুশরা ডিমক্র্যাট নয়, তারা ডিক্টেটরের নির্দেশ মত চলে।”

 “আপনারা?”

 “আমাদের দেশে ডিমক্র্যাসি পূর্ণমাত্রায় আছে।”

 “সেইজন্যই নিগ্রোরা পথে বার হলে লান্‌ছিত ও অপমানিত হয়, বুভুক্ষুর দল ইমপিরিয়েল ভ্যলীতে মরছে। ডিমক্র্যাসী বলতে আপনি কি তাই বোঝেন?”

 “ওয়াই, এম. সি. এ-র বৈঠকখানায় পাঁচশো লোক বসে আরাম করে কথা বলতে পারে। আমাদের কথার সময় অন্তত পক্ষে শতাধিক লোক সখানে ছিল তারা সবাই আমার কথা শুনবার জন্য কাছে এসে পড়ল। নানা লোক নানা প্রশ্ন তুললেন, তার যথাযথ উত্তর দিতে লাগলাম। মোহিত ঘোষ এসে দেখলেন আমি বেশ আলাপ জমিয়ে তুলেছি। যা হোক্‌, তাঁর সঙ্গে বাইরে আস্‌তে হল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন―

 “এরা আপনার কথা বুঝতে পারে?”

 “পারে বলে ত মনে হয়।”

 “এতদিন আমেরিকায় থেকেও আমরা আমেরিকানদের সংগে মিশবার সুযোগ পাই নি।”

 নিউ ইয়র্ক, লণ্ডন এবং অন্যান্য স্থানে দেখেছি, আমাদের দেশের শিক্ষিত লোক সাদা লোকের সঙ্গে মিশবার সাহস রাখেন না, অথচ আমাদের দেশের যারা খালাসী, তারা ইউরোপীয়ানদের সংগে একবার মিশতে পারলে শ্বেতকায়দের তাদের মতই ভাবে এবং সমানে সমানে ব্যবহারও করে এবং পেয়েও থাকে।

 দুবৎসর আগে আমাদের দেশের কয়েকজন খালাসী ডারবান্ গিয়েছিল। তারা চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়ে যখন দেখল যে চা দেওয়া হচ্ছে না, তখনই তারা চায়ের দোকান ভাংতে লাগল, দোকানীকে প্রহার দিল এবং অনেক টাকার লোকসান করল। বিচারে তাদের কোন শাস্তি হল না, কারণ তারা বুঝিয়ে দিল যে, তাদের অপমান করা হয়েছে। তখন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার রেস্তোরাঁতে লেখা থাকে “অন্‌লি ফর ইউরোপীয়ান”।

 চিকাগোর এক নিগ্রো পাড়ায় আমার থাকার স্থান ঠিক হল। যে ব্লকে আমি থাকতাম, সেখানে আমরা কয়েকজন ছাড়া সকলেই আমেরিকান্‌ শ্বেতকায়। আমাকে যিনি আশ্রয় দিয়েছেন, তিনি একজন

হিন্দু। তাঁর পূর্বপুরুষ আকের চাষ করবার মজুর হয়ে প্রথম ত্রিনিদাদে যান―তাঁরই বংশের শিক্ষা এবং চালচলনে নিজেকে হিন্দু প্রমাণ করতে পেরেছেন বলেই শ্বেতকায়দের ব্লকে স্থান পেয়েছেন।

 অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই হিন্দু পরিবারের সংগে থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল। কারণ এরাও নিগ্রোদের ঘৃণা করে। তাঁদের এই নিগ্রো-বিদ্বেষ যাতে বেশী না দেখতে হয়, সেজন্যে বাইরে বাইরেই সময় কাটাতে লাগলাম। দুপুরে একটার সময় ঘুম থেকে উঠে বের হতাম, রাত চারটার আগে ফিরে আসতাম না। সমস্ত শহরটাকে একবার ঘুরে দেখার ইচ্ছা হল। এই শহর খুন ও ডাকাতির জন্যে বিখ্যাত। এখানে চোর আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, মিউজিয়াম আছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কশাইখানা আছে। এই শহরের বিশেষত্ব হল, এখানে অনেক বৈগ্যানিক ও সাহিত্যিক থাকেন। বৈগ্যানিক এবং সাহিত্যিকেরা এই নগরকেই তাদের প্রধান আস্তানা করে নিয়েছেন, তার একটা কারণ আছে। সাধারণত যাঁরা সাহিত্য এবং বিগ্যান চর্চা করেন, তাঁরা নির্জনতাপ্রিয় এবং দারিদ্র্য তাদের চিরসংগী। এই নগরে অনেক বাড়ি আছে, যেখানে সস্তায় থাকা যায়। সেজন্যই দরিদ্র বৈগ্যানিক এবং সাহিত্যিকদের এখানে এসে থাকতে হয়। এদেশে অনেক সাহিত্যিক সাহিত্যকে পেশা করেন না, সাহিত্য তাঁদের সাধনার বস্তু। তাঁদের পাড়ায় একদিন গিয়েছিলাম।

 বেলা তখন তিনটা। রাস্তায় লোক চলাচল কমে এসেছে। এক দিকের ফুটপাথের ছায়ায় বসে একদল ছেলে জুয়া খেলছে। তাদেরই কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, যেন তাদের জুয়া খেলা দেখতে আমি ভয়ানক ইচ্ছুক। তাদের একজনকে জিগ্যাসা করলাম, এখানকার যিনি সবচেয়ে বড় লেখক, তিনি কোথায় থাকেন বলতে পার?

ছেলেটি বলল, নিশ্চয়ই, তবে তিনি আজ সকালেই লস্‌-এন্‌জেলস্‌ চলে গেছেন, ফিরতে এক সপ্তাহ দেরি।

 আর কোন লেখক কাছাকাছি কোথাও আছেন কিনা জিগ্যাসা করায় ছেলেটি আমাকে একটি বাড়ি দেখিয়ে বলল, “এই বাড়িতে অনেক লেখক আছেন, যাঁদের পেশাই হল বই লেখা।” বাড়িটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চললাম।

 দোতলা বাড়ি। নিচের তলায় বৈঠকখানা। বাইরে থেকেই কাঁচের ভিতর দিয়ে দেখলাম অনেকগুলি লোক বসে বই পড়ছে। ভিতরে ঢুকে সকলকে নমস্কার জানিয়ে জিগ্যাসা করলাম, “এখানে আপনারা কি সকলেই লেখক?”

 একজন বললেন, “হাঁ, আপনার জন্যে কিছু লিখতে হবে কি?” কথাটা শুনেই আমার রাগ হল, কিন্তু সবিনয়ে বললাম, “লেখকদের দর্শন পেতেই এসেছি, কিছু লেখাতে নয়।” আমার কথা শুনে প্রথমে সকলেই হেসে উঠল। আমার পরিচয় দিবার পর কেউ আর বিশ্বাস করল না যে, আমি একজন হিন্দু। একজনকে জিগ্যাসা করলাম, “আমার জাত সম্বন্ধে আপনাদের সন্দেহ এখনও দূর হয়নি বলে মনে হচ্ছে।”

 একজন প্রকাশ্যেই বলে ফেললেন যে, আমি নিগ্রো ছাড়া আর কিছুই হতে পারি না। আমি সেই লোকটিকে লক্ষ্য করে বললাম, হইনা আমি নিগ্রো, তবুও আমাকে পরিব্রাজক বলে আপনাদের বিশ্বাস করতে হবেই।

 জায়গাটি বেশ ভাল লাগল। সকলেই আমাকে অনুরোধ করলেন কিছু বলার জন্যে। দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করে দিলাম। সর্বপ্রথমেই বললাম যে, যারা নিজেদের লেখক বলে পরিচয় দেয়, অথচ একজনের মুখ দেখে বুঝতে পারে না লোকটি কোন্‌দেশের এবং কোন্ জাতের, সেই লেখকরা করুণার পাত্র ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। উপসংহারে বলতে বাধ্য হলাম, যাদের মাঝে নিগ্রোবিদ্বেষ রয়েছে, তারা কি করে লেখক হতে পারে, তাও বিবেচ্য বিষয়। লেখকগণ আমার কথা শুনে আমাকে অপমান করতে প্রবৃত্ত হননি। তাঁরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দুঃখিত হয়েছিলেন। আমার মনে হয়, হয়ত তাঁদের লেখার কিছু খোরাক আমি জুগিয়েছিলাম। লেখকগণ যে দেশের লোক হন না কেন, অন্তত নূতন কিছু জানবার আগ্রহ তাদের থাকেই। কথাটা মনে রেখেই এত কথা বলতে সাহস করেছিলাম।

 চিকাগো আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর, অন্তত পক্ষে তিনমাস যদি থাকতাম, তবে অনেক কিছুই জানতে পারতাম আর অনেক কথাই বলতেও পারতাম। কিন্তু সে সুযোগ আমার হয়ে উঠেনি। যে কয়দিন ছিলাম, বুঝতে চেয়েছিলাম, চিকাগোতে এত দস্যুবৃত্তি হয় কেন। এই সাহসিকদের সম্বন্ধে এখানে অনেক কাহিনী শোনা যায়। অনেকে বলেন, যারা অলস, তারাই এসব দুরন্ত কাজ করে থাকে। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে ঠিক তা নয়।

 এব্রাহাম্ লিন্‌কন প্রচারিত ‘কাজ কর, ভিক্ষা করো না’ নীতিতে কাজের ফল ভোগ করে পুঁজিবাদী, এবং মজুরকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে তারা সামান্য কিছু দিয়ে থাকে মাত্র।

 যারা লিন্‌কনের মত মেনে দরজায় দরজায় ‘কাজ দেও’ বলে ঘুরে বেড়াত, তারা কাজ পেত বটে কিন্তু সে কাজ করে মান ইজ্জত বজায় থাকত না। তা হ’ত অন্য ধরণের কেনা গোলামী। উপযুক্ত গুণ থাকলেও ঠিকমত বেতন পাওয়া যেত না। যারা গোলামী করতে রাজি হ’ত না তারা মনের দুঃখে বনে গিয়ে যিশুগুণগানে সময় কাটাত না, হাড্‌সন নদীতে গিয়ে ঝাঁপ দিত না, নিজকে গুলি করে মারত না। তারা বীরের মত দল বেঁধে ডাকাতি করত। ভাড়াটে লেখক তাই রং ফলিয়ে লেখত আর দেশ বিদেশে সেই গল্পগুচ্ছ চালান দিত। আমাদের দেশেও তা আসত। আমরা তাই পড়তাম আর বলতাম আমেরিকার চিকাগো শহরের লোক প্রায়ই “ক্রিমিনেল”। ছায়াচিত্রে সেই রং ফলানো গল্প লহরী সজীব করে সর্বত্র পাঠানো হ’ত। তা দেখে লোক অবাক হ’ত।

 সময়ের পরিবর্তন হ’ল। মজুর ধর্মঘট করতে শিখল। ডাকাতি বন্ধ হ’ল। মজুরের গোলামী আমেরিকা হ’তে কিছুটা কমল। মজুর দেখল, ডাকাতি করে যা পাওয়া যায় তা সকল সময় ভোগ করা যায় না। রবিন্‌ হুডের মত বিতরণও করা যায় না, সেজন্য বড় বড় ডাকাত, মজুরের সর্দার হ’ল মজুরী যাতে বাড়ে তার চেষ্টা করতে লাগল। আমি যখন চিকাগোতে গেলাম তখন দেখলাম চিকাগোতে ডাকাত নাই, পেশাদার ভিখারী আছে। লোকে বলল চিকাগোর ডাকাতের দল সকলেই কালিফরনিয়ায় চলে গেছে। যখন কালিফরনিয়াতে গেলাম তখন দেখলাম ঐ ডাকাতের দল মজুরে রূপ নিয়ে কটন পিকারর্ম যাতে বেশি রোজনা পায় তারই জন্যে চেষ্টা করছে। যাঁরা পরের জন্য জীবনের যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দেয় তাঁদের পুঁজিবাদীরা ডাকাত বলে আখ্যায়ীত করে।

 চিকাগো থেকে বিদায় নিবার জন্যে আমি উৎসুক হয়ে উঠলাম কারণ নগরের সকলেই যেন আলাদিনের প্রদীপ হাতে করে কি খুঁজে বেড়াচ্ছে, রাতারাতি বড়লোক হবার জন্যে। চিকাগোর সম্বন্ধে আমার একটা বেশ ভাল ধারণা ছিল, কিন্তু চিকাগো দেখবার পর আমার সে ধারণা চুরমার হয়ে গেল। একটা প্রকাণ্ড নগর, বুভুক্ষা রাক্ষসী যেন হাঁ করে আছে।

 চিকাগো আমেরিকার দ্বিতীয় নগর। এখানে পায়ে হেঁটে অলিতে গলিতে বেড়ানো কঠিন কাজ। এক দুমাসে চিকাগোর কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তু চিকাগো হ’তে বিদায় নিবার পূর্বে এখানে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিচিহ্ন কি আছে তা দেখতে ইচ্ছা হল। চিকাগোর একখানা গাইড বই নিয়েছিলাম। তাতে অন্যান্য ধর্ম স্থানের উল্লেখ ছিল। কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশন অথবা বেদান্ত সোসাইটির উল্লেখ ছিল না। এদিকে মোহিত বাবুর সংগেও দেখা হচ্ছিল না। তা বলে আমি বসে থাকিনি। অনেক লোকের সংগে এ সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছিলাম। এমন কি স্থানীর পোল্‌স্‌ এবং গৃকদের সংগে এ সম্বন্ধে অনেক কথা হয়েছিল।

 পোল্‌স্‌ অল্পে তুষ্ট এবং গল্পপ্রিয়। গৃকরা ভারতবর্ষকে সোনার দেশ বলেই মনে করে। সকলেই আমার সংগে প্রাণ দিয়ে কথা বলল কিন্তু কেউ স্বামী বিবেকানন্দ সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারল না। অবশেষে মোহিতবাবু আমাকে চিকাগোর বেদান্ত সোসাইটিতে নিয়ে যান। সেখানের বেদান্ত সোসাইটির সংগে যদি কলকাতার রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রীটের বেদান্ত সোসাইটির তুলনা করা যায় তবে রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রীটের বেদান্ত সোসাইটির অবস্থা দশ গুণ ভাল বলব। চিকাগোর বেদান্ত সোসাইটি দেখার পর ৺ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতি আমার বেশ রাগ হয়েছিল। তাঁরই লেখা প্রথম ভাগ আমার পাঠ্য ছিল। তিনি শিখিয়েছেন “যত কয় তত নয়, সব ভয় কর জয়”। সব ভয় জয় করা যায় এবং তাতে অনেকটা অগ্রসরও হয়েছিলাম বলেই মনে হয়। কিন্তু “যত কয় তত নয়” এই সত্য বাক্যটি তাঁর প্রথম ভাগে লেখা ভাল হয়নি। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মনে কতকগুলি বিচারবুদ্ধি প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। সেই বিচার বুদ্ধি আমার মনে সর্বদাই জাগ্রত। সেই বিচারবুদ্ধির দ্বারাই বলছি, জগতের ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি “যত কয় তত নয়” সত্যটি প্রয়োগ করা চলে। চিকাগোর বেদান্ত সোসাইটি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

 বেদান্ত সোসাইটির দ্বারে গিয়ে মৃদু করাঘাত করলাম। একজন মহিলা এসে দরজা খুলে দিলেন। ঘরে প্রবেশ করলাম। সমস্ত ঘরটা চল্লিশ হাত লম্বা এবং পনর হাত প্রশস্ত। এতেই পার্টিশন দিয়ে রুম করা হয়েছে; স্বামিজীর শারীরিক অবস্থা সেদিন ভাল ছিল না। তিনি সে জন্য বেশি কথা বললেন না। বিদায়ের সময় স্বামিজীকে বললাম, “দেখুন। এখানের আশ্রমটা আরও একটু বড় করুন” স্বামিজী সে কথার উত্তর দিলেন না। আমি এবং মোহিতবাবু দুঃখিত মনেই ফিরে আসলাম। আমি মোহিতবাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আর কোথাও কি এদের কোন প্রতিষ্ঠান আছে?” তিনি বললেন, “বোস্টন, এবং সান্‌ফ্রান্‌সিস্‌কোতেও আছে।” বোস্টন আমি যাইনি, সান্‌ফ্রান্‌সিস্‌কোতে গিয়েছিলাম। হলিউডের আত্মকথায় সান্‌ফ্রান্‌সিস্‌কোর আশ্রম সম্বন্ধে বলা হবে।

 চিকাগোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পৃথিবীতে বেশ প্রসিদ্ধিলাভ করেছে। দুঃখের বিষয় এখানে এসে মাত্র দুজন ভারতীয় ছাত্রের নাম শুনতে পেলাম। একজন হলেন আমাদের সুপ্রসিদ্ধ ডাক্তার তারকনাথ দাস এবং অন্যজন হলেন ডাক্তার শর্মা। উভয়েই পৃথিবীবিখ্যাত নর্থ ওয়েস্টারেণ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাস করেন। ডাক্তার দাস দেশে ফিরে আসেন এবং ডাক্তার শর্মা আমেরিকাতেই চাকুরি জোগাড় করেন। সুখের বিষয় আমেরিকাবাসী ডাক্তার শর্মার গুণের আদর করেছিল। তিনি আমেরিকার একটি প্রথম শ্রেণীর হস্‌পিতালের কার্যনির্বাহক ছিলেন। তার গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে আমেরিকার নগরিক করে নেওয়া হয়।

 চিকাগোর এক দিকের সংবাদ অনেক বলা হয়েছে। আমি শুধু ধনী এবং বিদ্বানদের সংস্পর্শে এসেই সুখী হতাম না। আমার মত লোকও কোথাও আছে কিনা তা জানবার চেষ্টা করতাম। নিগ্রো পাড়াতে চার জন ভারতীয় দন্তচিকিৎসকের সংগে সাক্ষাৎ হয়। এঁরা কেউ কোনরূপ পরীক্ষা পাস না করেই আমেরিকায় যান এবং চিকাগোতে গিয়ে নিজের অধ্যবসায়ে দন্তচিকিৎসা কাজটি শিক্ষা করে ব্যবসা আরম্ভ করেন। যদিও তাঁদের থাকার এবং ব্যবসায়ের স্থান প্রথম শ্রেণীর নয় তবুও তাঁদের অধ্যবসায়কে ধন্যবাদ দিতে হবেই।

 গুড্‌ লাক্‌ (Good Luck) বলে একটা জিনিস চিকাগোতে বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ভারতের ধূপ চিকাগো শহরে গুড্‌লাক্ বলে বিক্রি হয়। যাদের চাকরি চলে যায়, যারা নানা রকমে এসংসারে মাথা উঁচু করতে পারে না তারা আজ আর স্বামী বিবেকানন্দের মত লোকের বাণীর অপেক্ষা করে না, তারা চায় গুড্‌ লাক্। একজন বাংগালী ভদ্রলোক সে গুড্‌লাক্‌ তাঁর নিজের ফেক্টরীতে তৈরী করে শ্বেতকায় এবং নিগ্রো এজেন্টের সাহায্যে বিক্রি করান।

 লোক যখন কাজ পায় না তখনই তাদের নানারকমের দুর্বলতা এসে দেখা দেয়। ভারতীয় গুড্‌ লাক্‌ ব্যবসায়ী দরজায় এসে নক্‌ করে বলে, “ভয়ের কারণ নাই, আপনার জন্য ‘হিন্দু গুড্‌ লাক্‌’ এনেছি, আপনার কাজ সত্বরই হয়ে যাবে। এটা সকাল সন্ধ্যায় জ্বালাবেন, দেখবেন সাতদিনের মাঝেই আপনার কাজ হয়ে যাবে। আমি এখন যাই, সাত দিন পর এসে হিন্দু গুড্‌ লাকের দক্ষিণা অর্দ্ধ ডলার নিয়ে যাব।” এই ব্যবসা করে চিকাগোতে অন্তত পক্ষে দশ হাজার লোক সুখে এবং সচ্ছন্দে প্রতিপালিত হয়। অবশ্য আমাদের জাতভাইএর তাতে কিছুটা যে থাকে না তেমন নয়। আমাদের দেশে আজকাল প্রত্যেক বাংগালী ব্যবসায়ীর ঘরে “গণেশ” এসে ঢুকেছে, পূর্বে এটা মারওয়ারীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। আজকাল গণেশের সংগে উড়ে পৈতাধারী ফুলচন্দন ছিটকিয়ে, খেয়ে দেয়েও বাঁচে। চিকাগোর গুড্‌ লাককে যদি উপহাস করা হয় তবে এসবকে আগে ছাড়তে হবে নতুবা উপহাস করা অন্যায় হবে। আর্থিক দুর্বলতা মানুষকে কত রকমে হীন করে তার প্রমাণ স্বদেশে এবং বিদেশে সর্বত্র সমান।

 সুখের বিষয় আমেরিকার সর্বত্র প্রগতিশীল লেখক এবং প্রগতিশীল লোকের দল গঠন হয়েছে। তাঁরা সকলেই আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যাতে করে আমেরিকার লোক কুসংস্কারে ডুবে না থাকে, আর্থিক গোলামী হতে মুক্ত হয়ে সৎসাহিত্য পাঠ করে গ্যান অর্জন করতে পারে। আমার ইচ্ছা ছিল এই সংগে আমেরিকা সরকারের সম্বন্ধে কিছু লিপিবদ্ধ করি। কিন্তু চিন্তা করে দেখলাম হিপোক্রেসী রূপী ডিমোক্রেসী সর্বত্র সমান। তার রূপ যদি বিষদ্‌ভাবে আলোচনা করা হয় তবে দেখতে পাওয়া যায় কোথাও উনিশ আর কোথাও বিশ। এই ভেবেই আমেরিকা সরকার সম্বন্ধে এখানে কিছুই বলা হ’ল না। তা বলে আমেরিকা সরকারকে ভুল করে যেন কোনও পরাধীন দেশের সংগে তুলনা করা না হয়, একথা সকল সময় মনে রাখতে হবেই। আমি আমেরিকার যত দোষ এবং গুণের কথা বলেছি শুধু গ্রেট বৃটেনের সংগে তুলনা করে। এমন কি জাপান অথবা জার্মানীর সংগেও আমেরিকাকে তুলনা করিনি কারণ এসব দেশ আমেরিকা হতে অনেক নীচস্তরের; পরাধীন দেশের কথা এখানে উঠতেই পারে না।

 আমেরিকার নিগ্রোরা প্রেসিডেণ্ট নির্বাচনেরও ভোট দেয়। যদিও আজ পর্যন্ত কোন নিগ্রোই মেয়র পদবী পায়নি, তবে মেয়র হবার জন্য অনেক সময় কেন্‌ডিডেট দাঁড় করান হয়েছে। পণ্টনে নিগ্রোরা শ্বেতকায়দের সমান মাইনে পায়। নিগ্রোদের মাঝে অনেক লেপ্‌টেনাণ্ট কর্ণেল আমি স্বচক্ষে দেখেছি। সওদাগরী জাহাজের পাচকের কাজ নিগ্রোদের একচেটিয়া বললেও দোষ হয় না। তবে নিগ্রোরা এত চেঁচামেচী করে কেন? চেঁচামেচী করার প্রথম কারণ হ’ল, ফেক্‌টারীতে নিগ্রো মজুর অতি অল্পই নেওয়া হয় এবং তাদের মাইনেও শ্বেতকায়দের চেয়ে কম দেওয়া হয়। এজন্যই তারা এত চেঁচামেচী করে, তারপর বর্ণ-বৈষম্য ত আছেই।

 ইংলণ্ডে দরিদ্র পাড়াতে আমি থেকেছি এবং ধনী পাড়াতে গিয়েও সেখানের অবস্থা বেশ ভাল করেই অনুভব করেছি। ইংলণ্ডের ধনী পাড়ার লোক যে ভাবে থাকে তার চেয়ে অন্তত কুড়িগুণ ভাল ভাবে থাকে আমেরিকার নিগ্রো পাড়ার লোক। আমেরিকার বাড়ি এবং রুমের গঠন প্রণালী সর্বত্র সমান। আলোর জন্য ইলেকট্রিক, কয়লার জন্য গ্যাস, ঠাণ্ডা হতে বাঁচবার জন্য হিটার, স্নানের জন্য গরম এবং ঠাণ্ডা জলের পাইপ, রেস্ট রুম এবং শুইবার জন্য উত্তম বিছানা। বাড়ি হলেই এসব হবে, কেবিন হলেও হবে। যে বাড়িতে এসব নাই, আমেরিকার সেনেটারী বিভাগের লোক এসে তা তিন দিনের মাঝে ভেংগে ফেলবার অধিকার রাখে। ইংলণ্ডের কথা বলে লাভ নেই। স্নান করতে হলে তিন পেনী দিতে হয়, ঠাণ্ডা জল কে গরম করে তাই ব্যবহার করতে হয়, সকল বাড়িতে আবার বিজলি বাতির ব্যবস্থা নাই, গ্যাসের ব্যবস্থা নাই, গ্যাসের আলো ব্যবহার করতে হয়।

 নিগ্রোরা এসব সুবিধা হতে বাদ যায় না। আমেরিকা হতে যেদিন আর্থিক এবং অন্যান্য হিসেবে বর্ণ বৈষম্য লোপ হবে সেদিন আমেরিকা ডিমোক্রেটিক দেশ বলে যদি গর্ব করে তবে সে গর্বের মূল্য হবে।

 চিকাগো শহর ছেড়ে আসার পর আমরা পথে তেমন কোন বড় শহর পাইনি। কিন্তু প্রত্যেক গ্রামে এসেই আমরা দেখতে পেয়েছি, প্রাইভেট হোটেল, ট্রেভেলারস্‌ হোটেল এবং কেবিন রয়েছে কিন্তু সল্ট লেক্‌ সিটি না পৌঁছান পর্যন্ত আমরা কোথাও রাত কাটাবার স্থান পাইনি। পথিকের জন্য এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমাদের কোন সুবিধা হল না, যেহেতু আমাদের রং সাদা নয়। প্রত্যেকটি হোটেল, ইন্, ক্যাবিন্ যেন আমাদের বলছে ‘এস না’। হয়তো আমি একাকী থাকলে কোন কষ্টই হত না, কারণ আমি সাদা লোকের মনাকর্ষণ সহজেই করতে পারতাম। কিন্তু এ যে সোনায় সোহাগা, তিনজনেই হিন্দু এবং তিনজনই একরংগা। একজনের অপমানে তিনজনকেই কষ্ট পেতে হচ্ছে। অপমান একলা নীরবে সহ্য করা যায়। কিন্তু পরিচিত লোকের সামনে তা অসহ্য হয়।

 ক্রমাগত মোটর চালিয়ে আমরা সল্টলেক্‌ সিটিতে এসে বিশ্রাম করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেই বিশ্রামের তুলনা হয় না। একটানা বারঘণ্টা ঘুমিয়েও যেন ঘুমের শেষ হয়নি। ঘুম খেকে উঠে অপমানের কথা ভুলে গিয়ে মরুভূমির উপর হলিউডের ষ্টুডিও দেখতে গিয়েছিলাম। ষ্টুডিও দেখবার জন্যে বেশ লোক সমাগম হয়ে থাকে। ষ্টুডিওগুলিতে মরুভূমির চিত্র উঠাবার মত বন্দোবস্ত যা আছে, তা প্রচুর নয় বলেই মনে হল―তবে দক্ষিণ ক্যালিফোর্ণিয়াতে মরুভূমির ছবি তুলবার আরও ভাল বন্দোবস্ত আছে।

 সল্টলেকের পাশ দিয়ে বেশ সুন্দর পিচ্‌ দেওয়া পথ চলে গেছে। পথের পাশেই স্বচ্ছ জল সে জলের স্বাদ বড়ই তিক্ত। যে কোন লোক গিয়ে সেখানে সাঁতার কাটতে পারে। জলে ডুবে যাবার ভয় মোটেই নাই। লবণ হ্রদের জলে মানুষ ডোবে না শুনেছিলাম, কিন্তু তা দেখবার সুযোগ হয়নি। সল্টলেক্‌ দেখে বুঝলাম, বাস্তবিকই জলে প্রচুর পরিমাণে লবণ রয়েছে, সেখানে লোক জলে ডুবে নীচে যেতে পারে না; আমি তিরিশ হাত জলের নীচ হতে ডুব দিয়ে মাটি উঠাতে পারি, কিন্তু এই হ্রদের জলে তিন হাত নীচে গেলেই দম বন্ধ হয়ে যাবার মত হয়।

 হ্রদের তীরে কোথাও একফুট, কোথাও অর্ধফুট উঁচু হয়ে লবণ পড়ে আছে। কিন্তু আমেরিকার লোক এখনও তত গরীব হয়নি যে, এখান হতে লবণ উঠিয়ে সেই লবণের ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হবে।

 অনেকক্ষণ হ্রদে এবং হ্রদের তীরে অবস্থিত ষ্টুডিওগুলিতে ভ্রমণ করে আমরা সামনের পর্বতমালার দিকে অগ্রসর হলাম। রকি এবং আন্দিজ পর্বতমালার নাম পৃথিবীতে সুপরিচিত। আমরা এই পর্বতমালার উপর দিয়ে চললাম।

 আমেরিকাতে রকি এবং অন্দিজ পর্বতমালা দেখবার জন্য সবাই ব্যগ্র। এই পর্বতমালার ঢালুতে অবস্থিত হলিউড, লস্‌এন্‌জেলস্‌, সানফ্রান্‌সিস্‌কো, সিয়েটেল প্রভৃতি সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর স্থান। পূর্ব দিকের লোক যখন কালিফরনিয়া দেখতে আসে তখন তাদের মস্ত বড় একটা পর্বত পার হতে হয়, সেই পর্বতই রুকি। আমি এবং মোহিতবাবু সেই পর্বতের উপর দিয়ে মোটরে করে চলছিলাম।

 মোটর কারে বসেও কত উঁচুতে চলছি তা বুঝা যায় যদি একটি যন্ত্র থাকে। সেই যন্ত্রটি ছোট একটি ঘড়ির মতই তবে তা আমাদের কাছে ছিল না, তাই মনে হচ্ছিল মামুলী পাহাড়ে পথেই চলেছি। অনেক স্থানে আবার সমতল ভূমি। সেই সমতল ভূমিতে যে সকল উদ্ভিদ জন্মে তা দেখলে মন অপ্রসন্ন হয়। দেখতে মোটেই ইচ্ছা করে না। এরূপ সমতল ভূমি অনেকক্ষণ চলে আবার আমরা একটু পাহাড়ে স্থানে আসলাম। পাহাড়ের দুপাশে ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামগুলিকে কেম্প বললেও চলে। লোকসংখ্যা কত তা গ্রামের বাইরে মস্ত একটা সাইন বোর্ডে লেখা থাকে। গ্রামে যদি দুজন লোকও এসে রাত্রে থাকে তবে বলা হয় গ্রামের লোকসংখ্যা বাড়ল অথবা যদি কোন লোক গ্রাম হতে অন্যত্র যায় তবে বলা হয় গ্রামের লোকসংখ্যা কমল। প্রিমিটিভ ধরনে সেই গ্রামগুলি তৈরী করা হয়েছে। এমন কি কেবিন যাকে হামরা বলি তাও এর চেয়ে ভাল বললে দোষ হয় না।

 আমরা একটি গ্রামে আসলাম। গ্রামের লোকসংখ্যা দুজন। অশা করেছিলাম এদের সংগে সাক্ষাৎ হলে একটু কথা বলব কিন্তু গ্রামের দুই জন বাসিন্দার কেউই তখন গ্রামে উপস্থিত ছিলেন না সেজন্য আমাদের শূন্য গ্রামেই বেড়াতে হয়েছিল। আমি বলেছি গ্রাম আদিম যুগের প্রথামতে প্রস্তুত। তার মানে এমন কিছু নয় যা নিয়ে আমরা বেশ হাসতে পারি। গ্রামে চারটি বাড়ি। দুটি বাড়ি তিন তলা আর একটি দু তলা অন্যটি এক তলা। প্রত্যেক বাড়ি কাঠের তৈরী। কাঠগুলি অর্ডার দিয়ে কেনা হয়নি। কাঠগুলি হয় পথ হতে কুড়িয়ে আনা হয়েছে নয়ত কোন কেবিন ভেংগে পড়েছিল যা হতে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘরের অনেক স্থানে বেনজিনের টিন কেটেও লাগান হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ঘরগুলি দেখলেই মনে হয় কোন ভবঘুরের দল কোন এক সময়ে এখানে আড্ডা গেড়েছিল, তাদের পরিত্যক্ত জিনিষ দিয়ে ঘর কখানা তৈরী হয়েছে; সবচেয়ে বড় ঘরের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ দশ স্কোয়ার ফুটের বেশি নয়; প্রত্যেকটি তলা আবার সাত ফুটের বেশি উঁচু নয়। ঘরগুলি একই লাইনে অবস্থিত এবং চারটা ঘরের লোক যারা এসে বাস করেন তাদের জলের কোন ব্যবস্থা দেখলাম না। প্রত্যেকটি ঘরের পেছনে স্তূপাকৃতি পুরান টায়ার টিউব, দুধ, মাছ, মাংস, মাখন এসবের খালি টিন পড়ে রয়েছিল। আমেরিকার নগরে, শহরে এবং গ্রামে কেউ টিনের দুধ ব্যবহার করে না। কাগজের এক রকম বোতল হয় তাতেই দই, দুধ, ঘোল বিক্রি হয়ে থাকে। দুধের টিন দেখেই মনে হল, অনেক দূর হতে যারা আসে এবং নানা অসুবিধায় পতিত হয় তারাই এই গ্রামে থাকতে বাধা হয়। এরূপ গ্রাম বাস্তবিকই আনন্দদায়ক। চারিদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ, লোকজন নাই, জল নিশ্চয়ই কোথাও আছে নতুবা কেউ এসে এখানে থাকতে পারত না যদি বলি তবে ভুল হবে, কারণ এদিকে যেই আসে তারই সংগে কিছু জল থাকেই। গ্রামের কাছে জল না থাকলেও বৈগ্‌গ্যানিক যুগে জলহীন গ্রামে মানুষ থাকতে পারে না তা নয়। তবে আমি জানতাম রকি পর্বতের উপর দিয়েই আমরা চলেছি। জল নিকটে কোথাও আছেই। আমরা গ্রাম পরিদর্শন করে গাড়িতে এসে বসলাম আর আমি ভাবতে লাগলাম আমেরিকার সিনেমার কথা। অনেকগুলি সিনেমায় দেখেছি এরূপ গ্রামের চিত্র এবং লোকসংখ্যা কমতি এবং বাড়তির সংবাদ।

 দৃশ্যের পর দৃশ্য চোখের সামনে আসছিল আর চলে যাচ্ছিল। তারপর আসছিল কালিফরনিয়ার দৃশ্য। সে দৃশ্য বড়ই সুন্দর। আমরা যেন একটা কচ্ছপের পিঠে ধীরে উঠে হঠাৎ নীচের দিকে নেমে যাচ্ছিলাম! কিন্তু তার পূর্বে একটি ঘটনা ঘটল। সেই ঘটনা হল আমাদের একমাত্র ড্রাইভার মিঃ মোহিত বাবুর ক্রমাগত ঘুম পাচ্ছিল আর হাত দুখানা অবশ হয়ে আসছিল। দুরাত্র দুদিন ক্রমাগত বেচারী মোটর চালিয়েছেন। মানুষের সহ্যেরও একটা সীমা আছে। বুঝে নিন কালার বারের কত শক্তি। কোথাও রাত্র কাটাবার স্থান পাইনি। সেদিন আমার মনে হয়েছিল স্বদেশের একটি ঘটনা। দেশের কথা বলতে মুখে বাধে। মুখে দেশের কথা আটকে যাবার দুটি কারণ। যাদের কথা বলতে যাচ্ছি তারা হয়ত অপমানিত হয়েছে বলে রাগ করবে, আর যাদের অন্যায় আচরণের কথা বলব। তাদেরই স্বধর্মে আমি জন্মেছি। অতএব ভারতের অত্যাচারিত শ্রেণীর লোক তোমাদের কথা তোমরাই বল, আমি তোমাদের কথায় সায় দিব কিন্তু তোমরা যতদিন তোমাদের দুঃখের কথা না বলছ ততদিন আমি মনে করব তোমাদের দুঃখ বলতে কিছুই নাই। মহাত্মাগণ অপরের দুঃখে দুঃখিত হন, কিন্তু তোমরা এমনই স্তরে রয়েছো যে, তোমাদের দুঃখের কথা যদি তোমাদের স্বদেশবাসী বলে তবে তোমরা অপমান বোধ কর। অতএব এক্ষেত্রে আমি নীরব থাকাই পছন্দ করি।

 আমরা একটি সুন্দর স্থানে এসেছি। তথায় একটি গ্রাম অবস্থিত। গ্রামে তিনটি মাত্র স্ট্রীট। দুটি স্ট্রীট সমান্তরাল হয়ে এসে তৃতীয় স্ট্রীটে মিশেছে। গ্রামের স্ট্রীটে এস্‌ফাল্‌ত অথবা সিমেণ্ট করা নাই। গ্রেভেল দেওয়া পথের উপর ইট ভেংগে দেওয়া হয়েছে, ইচ্ছা করলে খালি পায়েও হাঁটা যায়। গ্রামে একখানা ইহুদীর হোটেল ছিল। ইহুদী বড়ই সাহসী। সে এন্‌টিফেসিস্ট এবং কমিউনিষ্ট। কমিউনিষ্ট হলেই লোকগুলি একটু উগ্র, কর্মঠ এবং সাহসী হয়। সে আমাদের অনুরোধ এক কথায় মেনে নিল। সে বলল, মানুষ মানুষই, কালা ধলা বিচার্য নয়। মিঃ হরিদাস মজুমদার হলেন কমিউনিষ্টদ্রোহী, তার এ হোটেলে মন উঠছিল না, কিন্তু যারা তাঁরই মত জাতীয়তাবাদী তারা তাঁকে তাদের হোটেলে স্থান দেয়নি ভবিষ্যতেও দিবে না। তার মতবাদ এখানে আমরা বজায় রাখতে পারলাম না। আমরা শুইতে চাই। তাঁর বিনা অনুমতিতেই হোটেলে গিয়ে উঠলাম এবং রেস্তোরাঁতে খেতে গেলাম। রেস্তোরাঁর লোক খাদ্য বিক্রয় করল বটে কিন্তু একজন বয় বলল, “এরা নিশ্চয়ই কনিউনিষ্ট নতুবা কমিউনিষ্ট হোটেলে যাবে কেন?” মিঃ হরিদাস সে কথার প্রতিবাদ করলেন এবং বেশ উচ্চস্বরেই বললেন তিনি নেশনেলিষ্ট। আমি বললাম, “যারা কালারবার মানে না, শ্বেতকায় হয়ে অশ্বেতকায়দের রুম ভাড়া দেয় তারা বাস্তবিকই সৎ লোক এবং নমস্য। আমি আমেরিকার কমিউনিস্টদের নমস্কার করছি।” মিঃ মজুমদার আমার প্রতি বেশ করে একটা কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। আমি তাকে ইংলিশেই বললাম, ভাগ্যে আজ আমরা কমিউনিষ্টদের হোটেলে উঠেছিলাম, তাই রাত্রে শোব এটা একরূপ নিশ্চয়ই, কিন্তু মিঃ হরিদাস গত দুরাত্রের কথা ভাবুন। একটুও ঘুম হয়নি, পা ব্যথা করছে আর আমাদের বন্ধুর শরীর অবশ হতে চলেছে। আমেরিকার যারা নেশনেলিষ্ট তারাই আমাদের এই দুর্দশার কারণ, এতক্ষণ ঘুরে কোথাও স্থান পাননি সে কথা কি এরই মাঝে ভুলে গেলেন? আর কথা বাড়িয়ে লাভ নাই। কিছু খেয়ে নিন তারপর বিছানাতে গিয়ে শুতে হবে, বিছানা কি আরামের হবে, কেমন হাত পা ছড়িয়ে আমরা শুইতে পারব।” আমি যখন বিছানার কথা বলে লেকচার দিচ্ছিলাম তখন একজন আমেরিকান বললেন, “লোকটা কতই না অত্যাচারিত হয়েছে তাই বিছানার কথায়ই মত্ত, কত পরিশ্রান্ত হলে লোক এমন করে একই কথা বার বার বলে?” আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে আমরা বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।

 সকাল বেলা আমরা নব উদ্যমে পথে আসবার পূর্বে, হোটেলওয়ালাকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে আমি বললাম, বেঁচে থাক, সুখী হও। হোটেলওয়ালা আমাদের প্রত্যেকের সংগে করমর্দন করে বলে উঠল কালারবার ধ্বংস হউক। আমরাও তার কথার প্রতিধ্বনি করলাম। তারপর আমাদের ছোট মোটরকারও যেন কালারবার ধংস হউক কথার প্রতিধ্বনি করে পথে বেড়িয়ে পড়ল।

 আমাদের দুদিকে আংগুরের সুন্দর সাজানো বাগান। উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে আংগুরের বাগান অনেক দূরে চলে গেছে। আমাদের মোটরের তৈলের নলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ এরই মাঝে ঢালু শুরু হয়েছে।

 দুদিকের সুন্দর দৃশ্য ক্রমেই অদৃশ্য হতে লাগল। তারপর এল আঁকাবাঁকা পথ। পথের দুদিকে সুন্দর শহর। শহরের লোক সবাই তখন কাজে ব্যস্ত ছিল। মাঝে মাঝে দুএকটা ঘরের ভিতরের দৃশ্য চোখে এসে পড়ছিল। আমেরিকার স্বাধীন রমণী যেমন স্বামীকে ধমকাতে পারে, কান ধরে ঘর হতে বার করে দিতে পারে তেমনি স্বামীকে সেবাও করতে পারে। স্ত্রী যদি শুধু ঘরের রাণী হয় এবং স্বামীর অন্তরের রাণী না হয় তবে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক ঠিক হয় না। সেরূপ সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে উভয় পক্ষেরই উভয় পক্ষের সুখ দুঃখের অংশীদার হওয়ার দরকার। আমেরিকার স্বাধীন রমণীকে ঘর মুছতে, বৈগ্যানিক প্রথায় কাপড় কাচতে, এবং দরকার হলে পরিশ্রমের কাজও করতে হয়। তারপর যখন ধীরে নীচে নেমে আসছিলাম তখন দেখতে পেলাম নীল সমুদ্র নীল আকাশের গায়ে গিয়ে মিশেছে।

প্রাচ্যের প্রশান্ত সাগর দেখা যাচ্ছে। একথাটি বলেই অনেক অবান্তর কথা টেনে আনতে পারতাম, কিন্তু আমার মত ও পথ পৃথক সেজন্য প্রশান্ত মহাসাগরের কথা বিশেষভাবে বল্‌লাম না। শুধু সেই দৃশ্যটি দেখে একটা আনন্দ মনে এসে দেখা দিয়েছিল। তারপর দেখলাম একটা প্রকাণ্ড সেতু। সেতুটি ট্রেজার আয়লেণ্ডের উপর দিয়ে চলেছে ফ্রিস্কোর দিকে। আমরা যখন সেতুর উপর এসে একটু দাঁড়ালাম তখন বাস্তবিকই এক অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখে আমার মন আনন্দে নেচে উঠেছিল। আমি ভাবছিলাম আজই আমার পৃথিবী ভ্রমণ সমাপ্ত হবে। বাস্তবিক সেইদিনই বিকাল বেলা আমার পৃথিবী ভ্রমণ সমাপ্ত হয়েছিল।

 মিঃ মোহিত ঘোষ আমাকে ক্লে স্ট্রীট-এর কাছে নামিয়ে দিয়ে বললেন, “এবার আপনার হোটেল আপনি ঠিক করে নিন।” কম করে পনেরোটি হোটেলে খোঁজাখুঁজির পরও কোথাও জায়গা পেলাম না। অগত্যা মিঃ মোহিত ঘোষের কাছেই ফিরব বলে স্থির করেছি, এমন সময় একজন লম্বা ধব্‌ধবে সাদা যুবক আমাকে জিগ্‌গাসা করলেন,―

 “কি চাই আপনার?”

 “হোটেলে থাকবার জায়গা, কিন্তু এদেশে যে আমাদের জায়গা পাওয়াই মুস্কিল হয়ে উঠেছে।”

 যুবক আমাকে বিনা বাক্যব্যয়ে একটি হোটেলে নিয়ে গেলেন, নাম তার ইন্‌টারনেশনেল হোটেল। সে হোটেলের মালিক একজন ফরাসী ভদ্রলোক। আমার দেশ ও জাতির পরিচয় না জেনেই তিনি আমাকে একটি ঘর দেখিয়ে দিলেন। মোহিতবাবুর কাছ থেকে আমার যথাসর্বস্ব পুঁটলিটা এনে ঘরে রাখলাম। তারপর তাঁকে গিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম। তিনি যাবেন শান্তিয়াগো।


শেষ