আত্মচরিত (প্রফুল্লচন্দ্র রায়)/একবিংশ পরিচ্ছেদ
একবিংশ পরিচ্ছেদ
দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান
বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যাণ্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কসের উৎপত্তি সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ অন্যত্র দেওয়া হইয়াছে। আমি এখন আরও কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস বিবৃত করিব। এগুলির সঙ্গেও আমি ঘনিষ্ঠ ভাবে সংসৃষ্ট। এই দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে কিরূপে বাধাবিঘ্ন ও অসুবিধার মধ্য দিয়া কাজ করিতে হইয়াছে, তাহাও আমি দেখাইতে চেষ্টা করিব।
(১) কলিকাতা পটারী ওয়ার্কস্ ও তাহার ইতিহাস
কলিকাতা পটারী ওয়ার্কসের উৎপত্তি ও ইতিহাস কৌতূহলোদ্দীপক। ১৯০১ সালে জনৈক ভদ্রলোক সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত রাজমহলের মধ্যে মঙ্গলহাট নামক স্থানে পোর্সিলেন ও মৃৎ-শিল্পের উপযোগী চীনামাটী আবিষ্কার করেন। ইহার ফলে, কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বৈকুণ্ঠনাথ সেন এবং হেমেন্দ্রনাথ সেন একটি প্রাইভেট কোম্পানী গঠন করেন। হেমেন্দ্রবাবু যখন কলিকাতায় আসিয়া হাইকোর্টে ওকালতী ব্যবসায় সুরু করেন, তখন কলিকাতাতেই কলিকাতা পটারী ওয়ার্কসের কাজ আরম্ভ হয়। একটি পুকুরের ধারে কয়েকটি কুটীর লইয়া সামান্য আকারে ইহার পত্তন হয়। কয়েক জন কুম্ভকারকে এই কার্যে নিযুক্ত করা হয়।
সেই সময়ে মৃৎ-শিল্পে বিশেষজ্ঞ কাহাকেও পাওয়া যায় নাই। শ্রীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নামক একজন ভদ্রলোক মৃৎ-শিল্পের কাজ কিছু কিছু জানিতেন, তিনিই নূতন শিল্প প্রতিষ্ঠান চালাইবার ভার গ্রহণ করেন। নারায়ণবাবু অনেকগুলি চুল্লী নির্মাণ করেন এবং কৃষ্ণনগরের কয়েকজন কারিগরের সাহায্যে মাটীর খেলনা ও পুতুল তৈরী করিতে থাকেন। কিন্তু তাঁহার কোন বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল না, সুতরাং তাঁহার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাজারে বিক্রয়ের উপযোগী কোন জিনিষ তিনি তৈরী করিতে পারেন নাই। এইরূপ নিষ্ফল পরীক্ষায় প্রায় ২৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
এই শিল্পের প্রধান কাঁচা মাল চীনা মাটী। সেইজন্য কোম্পানীর মালিকগণ পাহাড় অঞ্চল হইতে প্রচুর পরিমাণ চীনামাটী উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিলেন। ঐ উদ্দেশ্যে মঙ্গলহাটে যন্ত্রপাতিও বসানো হইল। ২০ অশ্বশক্তি বয়লারটি পাহাড়ের উপরে লইয়া যাইতে বিশেষ বেগ পাইতে হইয়াছিল। অবশেষে ইঞ্জিন ও বয়লার বসানো হইল এবং প্রচুর পরিমাণে চীনামাটী তৈরীর ব্যবস্থা হইল। ইতিপূর্বে শ্রীযুত সত্যসন্দর দেবকে জাপানে পাঠানো হয়। তিনি টোকিও এবং কিওটোর শিল্পবিদ্যালয়ে মৃৎ-শিল্প শিক্ষা করিয়া ১৯০৬ সালের আরম্ভে দেশে ফিরেন। তাঁহার উপরেই কাজের ভার দেওয়া হয়।
তিনি কিছুকাল কাজ করেন। তখন দেখা গেল যে, ব্যবসায়টির ভবিষ্যৎ প্রসারের আশা আছে, কিন্তু জায়গাটি তাহার তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র। সুতরাং মালিকেরা স্থির করেন যে ব্যবসায় বাড়াইতে হইবে এবং আরও বেশী পরিমাণ পোর্সিলেনের দ্রব্য তৈরী করিতে হইবে। এই উদ্দেশ্যে বেলেঘাটা রেলওয়ে ষ্টেশনের নিকটে ৪৫নং ট্যাংরা রোডে তিন একর জমি ইজারা লওয়া হয়। এইস্থানে প্রয়োজনীয় কলকব্জা বসানো এবং কারখানা গৃহ নির্মিত হয়। চুল্লী তৈরী হইলে ১৯০৭ সালে উন্নততর বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে কাজ আরম্ভ হয়। কিন্তু সুদক্ষ কারিগর না থাকাতে কাজের কোন উন্নতি দেখা যায় না। জাপান হইতে দুইজন ভাল কারিগর আনিবার জন্য শ্রীযুত দেবকে জাপানে পাঠানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল যে, জাপানী করিগরেরা এখানকার লোকদের কাজ শিখাইয়া যাইবে। ১৯০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাপানী কারিগরেরা এদেশে আসে এবং এক বৎসর সন্তোষজনকভাবে কাজ করে। তারপর তাহাদের দেশে পাঠান হয়। এই কারিগরদের বেতন, যাওয়া আসার খরচ ইত্যাদি বাবদ মালিকদিগকে প্রায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করিতে হয়। ব্যবসায়ে ক্রমে উন্নতি হইতে লাগিল এবং মালিকেরা আরও মূলধন দিতে লাগিলেন।
কিন্তু বাজারে সস্তা জাপানী ও জার্মান মাল আমদানী হওয়ার দরুণ, তাহাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশী মাল চালান কঠিন হইয়া উঠিল। সুতরাং ১৯১৩ সালে শ্রীযুত দেবকে আধুনিকতম পোর্সিলেন ও মৃৎ-শিল্প প্রস্তুত প্রণালী শিক্ষা করিবার জন্য জার্মানীতে প্রেরণ করা সমীচীন মনে হইল। এরপও স্থির হইল যে, শ্রীযুত দেব উন্নত ধরণের কলকব্জা ক্রয় করিবেন এবং ইংলণ্ড ও ইয়োরোপে বিবিধ মৃৎ শিল্পের কারখানাও দেখিয়া আসিবেন। শ্রীযুত দেব এদেশে প্রাপ্তব্য কাঁচা মালের নমুনা সঙ্গে লইয়াছিলেন। তিনি ইয়োরোপের কয়েকটি লেবরেটরী ও কারখানাতে এই দেশীয় কাঁচা মাল পোর্সিলেন ও মৃৎ-শিল্প নির্মাণের পক্ষে কতদূর উপযোগী, তাহা পরীক্ষা করিয়া দেখেন। তিনি প্রয়োজনীয় কলকব্জা এবং উন্নত ধরণের চুল্লী তৈরীর জন্য মালমশলার অর্ডার দিয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। এই সমস্ত জিনিষ মহাযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বেই এদেশে পৌছিয়াছিল। জার্মান ড্রেসডেন মডেলের নূতন চুল্লীও নির্মিত হইল। সমস্ত প্রয়োজনীয় কলকব্জা বসানো হইল, যে জমির উপর কারখানা স্থাপিত, মালিকেরা তাহা ক্রয় করিলেন এবং পূর্ণোদ্যমে কাজ আরম্ভ হইল।
১৯০৬ হইতে ১৯১৬ পর্যন্ত দশ বৎসরের বিবরণীতে দেখা যায় যে, ২,০২,৯৫২৲ টাকা মূল্যের জিনিষ উৎপন্ন হইয়াছিল। এবং তন্মধ্যে ১,৯২,৮২৭৲ টাকা মূল্যের জিনিষ বিক্রয় হইয়াছিল, ঐ সময় পর্যন্ত মালিকেরা ব্যবসায়ের জন্য প্রায় তিন লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়াছিলেন। ১৯১৬—১৭ সালের জন্য যে বাজেট প্রস্তুত হয়, তাহাতে ম্যানেজার মিঃ দেব আরও কাজ বাড়াইবার প্রস্তাব করেন এবং তদুদ্দেশ্যে ব্যয় নির্বাহের উদ্দেশ্যে আরও ২ ১/২ লক্ষ টাকা দিবার জন্য মালিকদিগকে অনুরোধ করেন। কিন্তু মালিকেরা কতকটা নৈরাশ্য বোধ করিতেছিলেন। তাঁহারা বহু অর্থ ব্যয় করিয়াও দীর্ঘ কালের মধ্যে কোন ফল পান নাই। সুতরাং তাঁহারা ব্যবসায়টিকে লিমিটেড কোম্পানীতে পরিণত করিতে মনস্থ করিলেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁহারা একটি ইয়োরোপীয় কোম্পানীর নিকট প্রস্তাব করিলেন এবং উক্ত কোম্পানীও ঐ প্রস্তাব গ্রহণে সম্মত হইলেন। মিঃ এইচ, এন, সেন এবং ফার্মের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরিয়া সর্ত্তাদি লইয়া আলোচনা চলিল, কিন্তু কোন কারণে শেষ পর্যন্ত কিছুই স্থির হইল না।
তারপর, ১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে, কলিকাতা পটারী ওয়ার্কসের ব্যবসায়টিকে “বেঙ্গল পটারিজ লিমিটেড” এই নাম দিয়া দশ লক্ষ টাকা মূলধনসহ লিমিটেড কোম্পানীতে পরিণত করা হইল।
নূতন কোম্পানী ড্রেসডেন টাইপের আরও তিনটি চুল্লী বসাইবার প্রস্তাব করিলেন। তাঁহাদের আশা ছিল যে, ইহার ফলে ৪,২০,০০০ টাকা মূল্যের জিনিষ উৎপন্ন হইবে। এইরূপে ৮ লক্ষ টাকার আদায়ী মূলধনে বৎসরে ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা লাভ হইবে এবং কোম্পানী বৎসরে শতকরা ২০ টাকা লভ্যাংশ দিতে পারিবেন।
তদনুসারে কোম্পানী নূতন চুল্লী ও যন্ত্রপাতি বসাইতে লাগিলেন, কারখানা বড় করা হইল। কিন্তু যখন এই সমস্ত কাজ শেষ হইল, তখন দেখা গেল যে, কাজ চালাইবার মত মূলধন কিছুই অবশিষ্ট নাই। ১৯২০ হইতে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত কোম্পানীকে ভীষণ অর্থসঙ্কট ভোগ করিতে হয়। কোম্পানীর ম্যানেজিং এজেণ্টদের ব্যবসায়ক্ষেত্রে সুনাম ছিল। তাঁহারা যেরূপ বৃহৎ আকারে আড়ম্বরের সঙ্গে ব্যবসায় চালাইতে লাগিলেন, যে কোন প্রথম শ্রেণীর ইয়োরোপীয় ফার্মের কাজের সঙ্গে উহার তুলনা করা যাইতে পারে। মিঃ দেবের উপরই পূর্ববৎ সমস্ত কাজের ভার ছিল। তিনি কেবল কারখানা এবং শিল্প উৎপাদনের দায়িত্বই গ্রহণ করেন নাই, কোম্পানীর সেক্রেটারীর কাজের ভারও তাঁহার উপরে ন্যস্ত ছিল। সুতরাং ব্যবসায়টির ভারই তাঁহার উপরে ছিল, বলিতে হইবে। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম করিয়াও তিনি কোম্পানীর লাভ দেখাইতে পারিলেন না। নানা প্রতিকূল অবস্থা তাঁহার বিরুদ্ধে কার্য করিতেছিল।
কোম্পানীর দুর্ভাগ্যক্রমে এই সময়ে ম্যানেজিং এজেণ্টস মেসার্স পি, এন, দত্ত অ্যাণ্ড কোম্পানীর নানা কারণে আর্থিক দুর্গতি হইল এবং ডিরেক্টরগণ উক্ত কোম্পানীর নিকট হইতে ম্যানেজিং এজেন্সি প্রত্যাহার করাই সমীচীন মনে করিলেন। তদনুসারে ডিরেক্টরেরা নিজেরাই কার্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। মূল ডিরেক্টরদের অনেকেই ইহলোক ত্যাগ করিয়াছিলেন বা বোর্ড হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছিলেন। সতরাং নূতন ডিরেক্টরদের নির্বাচিত করা হইল।
ব্যয় অত্যন্ত বেশী পড়িত, এবং মাসিক যে আয় হইত তাহাতে প্রয়োজনীয় ব্যয়াদি নির্বাহ করাই কঠিন হইত, লাভ তো দূরের কথা। ডিরেক্টরদের মনে আশঙ্কা হইল, তাঁহারা দেখিলেন সমস্ত ব্যবসায়ের ভার একই ব্যক্তির হাতে রাখা উচিত নহে। ডিরেক্টরেরা সমস্ত বিষয় তদন্ত করিবার জন্য একটি কমিটি নিযুক্ত করিলেন। দীর্ঘকাল ধরিয়া তদন্ত চলিল এবং কমিটির চেয়ারম্যান ডি, সি, ব্যানার্জি ডিরেক্টরদের নিকট রিপোর্ট দাখিল করিলেন। কোম্পানীর কার্য পরিচালনা এবং শিল্পজাত উৎপাদনে যে সমস্ত ত্রুটি ছিল, তাহা এই রিপোর্টে প্রদর্শিত হইয়াছিল।
কোন দেশীয় শিল্প ব্যবসায় চালাইবার পক্ষে সর্বাপেক্ষা প্রধান বাধা এই যে, সমস্ত দেশীয় শিল্পকে বাজারে আমদানী বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতে হয়। কেবলমাত্র ভাবানুভূতির উপর একটা শিল্প গড়িয়া উঠিতে পারে না এবং এরূপ কখনই আশা করা যায় না যে—ভারতীয়দের প্রস্তুত শিল্পদ্রব্য কেবলমাত্র ‘স্বদেশী’ বলিয়াই অধিক মূল্য দিয়া লোকে চিরকাল কিনিতে থাকিবে। তাহারা দেখিতেছে, ঐরূপ বিদেশী দ্রব্য অনেক কম মূল্যে বাজারে পাওয়া যাইতেছে। সুতরাং ভারতীয় শিল্পনির্মাতাকে তাহার খরচার দিকে লক্ষ্য না রাখিয়া বাজার মূল্যে জিনিষ বিক্রয় করিতে হইবে। ইহার ফলে তাহাকে লোকসান দিয়াও ব্যবসায় চালাইতে হইবে। যতদিন পর্যন্ত সে অতি কম খরচায় জিনিষ বিক্রী করিয়া লাভ করিতে না পারিবে, ততদিন তাহাকে এই উভয় সঙ্কটের মধ্যে থাকিতে হইবে। ভারতীয় শিল্পনির্মাতাকে বৎসরের পর বৎসর লোকসান দিয়া নিজেই বাজার তৈরী করিয়া লইতে হইবে—এই কথাটা অংশীদারগণকে বিশেষভাবে মনে রাখিতে হইবে। অংশীদারগণ যদি দেখেন যে তাঁহাদের টাকা বহু বৎসর ধরিয়া ব্যবসায়ে পড়িয়া আছে, কোনই লাভ হইতেছে না, এবং সেজন্য তাঁহারা হতাশ হইয়া পড়েন, তবে তাঁহাদের দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু তাঁহাদিগকে মনে রাখিতে হইবে যে শিল্প সম্বন্ধে ভারতের এখনও শৈশব অবস্থা এবং পাশ্চাত্যের দেশগুলি যাহা বহু শত বৎসরের চেষ্টায় সম্পন্ন করিয়াছে, ভারত বর্তমানে তাহা করিতে পারে না। এই কারণেই ইয়োরোপীয় মহাযুদ্ধের পর যে সব দেশীয় শিল্প ব্যবসার আরম্ভ হইয়াছিল, তাহার অনেকগুলিই উঠিয়া গিয়াছে। যে সামান্য কয়েকটি আছে, সেগুলিকেও অতি কষ্টে অস্তিত্ব রক্ষা করিতে হইতেছে। এই অবস্থা অতিক্রম করিয়া শেষ পর্যন্ত কয়টি টিকিয়া থাকিবে, তাহা বলা যায় না। বিদেশী শিল্পনির্মাতারা প্রভূত মূলধন খাটাইতেছে, সুতরাং তাহাদের উৎপাদনের খরচা যতদূর সম্ভব কম। ভারতকে শিল্প ও ব্যবসায়ক্ষেত্রে এখন সংগ্রাম করিতে হইতেছে। যদি এদেশী শিল্পনির্মাতা উৎপাদনের ব্যয় যথাসম্ভব কম করিয়া লাভ না দেখাইতে পারে, তবে বিদেশী শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাহারা টিকিতে পারিবে না।
পূর্বোক্ত বিবরণ শ্রীযুত সেনের রিপোর্ট হইতে হুবহু গৃহীত। লেখক এখন ইহলোকে নাই, একথা স্মরণ করিয়া মন দুঃখভারাক্লান্ত হইয়া উঠে। শ্রীযুত সেন তাঁহার মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে আমার অনুরোধে এই বিবৃতি লিখিয়াছিলেন।
উক্ত বিবরণ হইতে বুঝা যায়, কাশিমবাজারের মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী এবং হেমেন্দ্রনাথ সেন এই শিশু শিল্পকে প্রায় ৩০ বৎসর যাবৎ পোষণ করিয়াছিলেন। ব্যবসায়ে মহারাজা এবং মেসার্স বি, এন, সেন এবং এইচ, এন, সেন ভ্রাতৃদ্বয়ের অংশই শতকরা ৫০ ভাগ।
এই কোম্পানী এবং আরও কয়েকটি কোম্পানীর সঙ্গে আমি সংসৃষ্ট। এই সব কোম্পানীর অংশীদারগণ আমাকে প্রায়ই লভ্যাংশ না দিবার জন্য নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া পত্র লিখেন।[১] কিন্তু পূর্বোক্ত বিবরণ হইতে পাঠকরা বুঝিতে পারিবেন, শিল্প প্রবর্তকদের পথে কি প্রবল বাধা বিপত্তি ছিল। জাপানের জাতীয় গবর্ণমেণ্ট নানা শিশু শিল্প প্রবর্তন ও ঐ গুলিকে রক্ষা করিবার জন্য যে সাহায্য করিয়াছিল, তাহাই এই সব প্রশ্নের সমুচিত উত্তর।
“জাপানে নূতন শিল্প প্রবর্তনের দায়িত্ব গবর্ণমেণ্টই গ্রহণ করিয়াছিলেন। যে সব স্থলে গবর্ণমেণ্ট প্রত্যক্ষ ভাবে কোন নূতন শিল্প প্রচেষ্টাকে মূলধন দিয়া সাহায্য করেন নাই, সে স্থলে তাঁহারা সংরক্ষণশুল্ক অথবা বৃত্তি দ্বারা শিল্পনির্মাতাকে সাহায্য করিয়াছেন অথবা সরকারী ব্যাঙ্ক হইতে তাঁহাকে ঋণ দিয়াছেন।” Allen: Modern Japan and its Problems, p. 103.
একথা স্মরণ রাখিতে হইবে যে, জাপানের শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের দায়িত্ব ১৮৭০ খৃঃ হইতে ১৮৮৩ খৃঃ পর্যন্ত মোটের উপর গবর্ণমেণ্টই গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই সময়ে গবর্ণমেণ্টই জাপানের প্রধান কারখানাগুলির মালিক ছিলেন এবং তাঁহারাই ঐগুলি পরিচালনা করিতেন, কেন না আধুনিক ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা বিষয়ে জাপানের লোকেরা অনভিজ্ঞ ছিল। জনসাধারণকে শিল্প ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষিত করিবার জন্য গবর্ণমেণ্টকেই এই সব কারখানা স্থাপন করিয়া কাজ চালাইতে হইয়াছিল। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায়—গবর্ণমেণ্টই রেলওয়ে, কয়লার খনি এবং অন্যান্য খনি, পোতশিল্পের কারখানা, বয়নশিল্পের কারখানা, সিল্কের কারখানা, তুলা, পশম প্রভৃতির বয়ন শিল্পের কারখানা, এবং কাচ ও কাগজের কারখানার মালিক ছিলেন।
“মেইজিদের সিংহাসন পুনঃ প্রাপ্তির পর তের বৎসর অর্থাৎ ১৮৬৮—১৮৯৩ এই সময়ের প্রথমার্ধে জাপানী শিল্পের শৈশবাবস্থায় গবর্ণমেণ্টই উহার পরিচালক ছিলেন। ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দের কোঠায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগগুলি ক্রমে গবর্ণমেণ্ট বেসরকারী পরিচালকদের হাতে দিতে থাকেন; ঐ সময় প্রধান প্রধান শিল্পগুলি সরকারী পরিচালনাধীনে তাঁহাদেরই সাহায্যে পুষ্ট ছিল। এইরূপে সরকারী পরিচালনার স্থলে বেসরকারী কর্তৃত্বের প্রথা প্রবর্তিত হইল। ১৮৯৪ খৃঃ অর্থাৎ চীন জাপান যুদ্ধের সময় পর্যন্ত শিল্প-বাণিজ্যে এই বেসরকারী কর্তৃত্ব ছিল। তারপরে ব্যাপক ভাবে দেশের শিল্পোন্নতির জন্য আয়োজন হইতে থাকে।” Uyehara: Industry and Trade of Japan.
“প্রায় সকল দেশের গবর্ণমেণ্টই বৃত্তি, সংরক্ষণ শুল্ক অথবা সরকারী ব্যাঙ্ক হইতে ঋণ সাহায্য দ্বারা শিল্পোন্নতিতে উৎসাহ দিবার চেষ্টা করিয়াছেন। প্রত্যেক দেশেই অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে, সরকারী বিধি ব্যবস্থা, শিল্প নির্মাতাদের পরস্পরের সহযোগিতা এবং সঙ্ঘবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রথা ক্রমশঃ প্রবর্তিত হইয়াছে। অবাধ বাণিজ্যের দিকে ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও গ্রেট ব্রিটেন পর্যন্ত অবস্থার চাপে পড়িয়া, এই সব নূতন প্রথা কিয়ৎ পরিমাণে মানিয়া লইতে বাধ্য হইয়াছিল।”—Allen: Modern Japan and its Problems.
জাপানে প্রিন্স ইটো গবর্ণমেণ্টের পৃষ্ঠপোষকতায় বাধ্যতামূলক ভাবে শিল্পবাণিজ্যের উন্নতি সাধনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন।
মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী এবং হেমেন্দ্রনাথ সেনের মৃত্যুতে বেঙ্গল পটারিজ লিমিটেডের বিশেষ ক্ষতি হইল। এই কোম্পানী যে প্রবল বিঘ্ন বিপদের মধ্যে অশেষ ক্ষতি স্বীকার করিয়াও, মাথা তুলিয়া থাকিতে পারিয়াছে, সে কেবল শ্রীযুত দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ উদ্যম ও স্বার্থত্যাগের ফলে। সাত বৎসর পূর্বে তিনি কোম্পানীর অন্যতম ডিরেক্টর নির্বাচিত হন। সেই সময় হইতে তিনি কোম্পানীকে রক্ষা করিবার জন্য অক্লান্ত ভাবে সময় ও শক্তি ব্যয় করিয়াছেন। শ্রীযুত বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বড় অ্যাটর্নী কোম্পানীর অংশীদার, তাঁহার প্রত্যেক মিনিট ও ঘণ্টার মূল্য আছে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও তিনি নিজের ব্যবসায়ের জন্য গুরুতর পরিশ্রম করিবার পরও প্রত্যহ দুই এক ঘণ্টা বেঙ্গল পটারিজ লিমিটেডের কাজ কর্ম দেখেন, ছুটীর দিন তিনি কোম্পানীর হিসাবপত্র প্রভৃতি ভালরূপে পরীক্ষা করেন। তিনি ইতিহাসে প্রথম শ্রেণীর এম, এ, উপাধিধারী, কিন্তু তিনি মৃৎশিল্প সম্বন্ধে গ্রন্থাদি ভালরূপে অধ্যয়ন করিয়াছেন এবং বিশেষজ্ঞগণের সঙ্গে সর্বদা আলোচনা ও পরামর্শের ফলে ঐ শিল্পের ব্যবহারিক জ্ঞানও লাভ করিয়াছেন। আমি তাঁহাকে একাদিক্রমে ১২ ঘণ্টা কাজ করিতে দেখিয়াছি। কোম্পানীকে আর্থিক সঙ্কট হইতে রক্ষা করিবার জন্য ঋণ করিয়া নিজের সুনাম বিপন্ন করিতেও তিনি দ্বিধা করেন নাই।
তিনি একটি স্বদেশী শিল্পের সেবায় আত্মনিয়োগ করিয়াছেন, এই ভাবই তাঁহার মনো সর্বদা জাগ্রত এবং ইহারই বলে কোন অবস্থাতেই তিনি নিরাশ হন নাই। বস্তুতঃ, দেশের এই শিল্পোন্নতি প্রচেষ্টা তাঁহার অত্যন্ত প্রিয় কার্য এবং ইহার জন্য তিনি অক্লান্ত ভাবে কাজ করিয়াছেন। আমি এই সব কথা লিখিতে সঙ্কোচ বোধ করিতেছি, কেন না, আমি জানি যে, শ্রীযুত বন্দ্যোপাধ্যায় নীরব কর্মী, সাধারণে নাম জাহির করিতে তিনি চাহেন না। তাঁহার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত কথা প্রকাশ করিবার অধিকার আমার নাই। তবে এই পর্যন্ত আমি বলিতে পারি যে, দেশের শিল্পোন্নতি সাধনের জন্য তিনি এপর্যন্ত ৪।৫ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়াছেন এবং সেজন্য তিনি কিছুমাত্র দুঃখিত নহেন। এই সুযোগে আমি আমার আর একজন বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতেছি। তিনি অন্য একটি কোম্পানীর ডিরেক্টর রূপে আমার সহকর্মী। তাঁহার বয়স ৭০ বৎসরের কাছাকাছি এবং তিনি ধনী লোকও নহেন। পারিবারিক দায়িত্বও তাঁহার যথেষ্টই আছে,—তৎসত্ত্বেও এই কোম্পানীকে রক্ষা করিবার জন্য তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা দিয়া নিজে দরিদ্র হইয়া পড়িয়াছেন। তিনি বেশ জানেন যে, এই টাকা ফিরিয়া পাইবার আশা নাই।
(২) বেঙ্গল এনামেল ওয়ার্কস লিমিটেড
১৯২১ সালে নারকেলডাঙ্গায় এক ছোট কারখানা লইয়া দি বেঙ্গল এনামেল ওয়ার্কস লিমিটেডের কাজ আরম্ভ হয়। এই শিল্প সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাবে, প্রথমে খুবেই বাধা-বিঘ্ন উপস্থিত হইয়াছিল। একজন বাঙালী ভদ্রলোককে প্রথমে কাজের ভার দিবার প্রস্তাব হয়। কোম্পানীর প্রবর্তকেরা তাঁহার সঙ্গে এই সর্ত করিতে চাহিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে কয়েক জন বিজ্ঞানের গ্রাজুয়েট ভারতীয় যুবককে এই কাজে শিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইবে, কেন না ইহার দ্বারা কাজের প্রসারের পক্ষে সুবিধা হইবে। কিন্তু বাঙালী ভদ্রলোকটি এই সর্ত গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন না এবং কোম্পানীর অত্যন্ত সঙ্কট সময়ে কার্য ত্যাগ করিলেন। কোম্পানীর কাজ বন্ধ হইবার উপক্রম হইল।
কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে কোম্পানীর একজন ডিরেক্টর শ্রীযুত দ্বিজেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (কলিকাতার কোন কলেজে ইংরাজী সাহিত্যের অধ্যাপক) এই কার্যে সম্পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করিলেন এবং সমস্ত বাধাবিঘ্ন অগ্রাহ্য করিয়া এনামেল শিল্প সম্বন্ধে নানারূপে পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ইংলণ্ড, জার্মানী ও আমেরিকা হইতে বহু গ্রন্থ আনাইয়াছিলেন। তাঁহার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে কাজ আরম্ভ করা সম্ভবপর হইল। কারখানায় তখন মাত্র ছোট একটি চুল্লী ছিল এবং গৃহস্থের ব্যবহার্য ছোট খাট বাসন পত্র, দরজার নম্বর প্লেট প্রভৃতি প্রস্তুত হইত।
দ্বিজেন্দ্র বাবর ভ্রাতা আমার ভূতপূর্ব ছাত্র দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সেই সময়ে জাপানে ছিলেন। তিনি সেখানে এনামেল শিল্প শিক্ষা করিতে লাগিলেন এবং জাপানের কারখানা এবং জাপানের কারখানা সমূহে লব্ধ অভিজ্ঞতাবলে ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রবাবুকে নানা মূল্যবান্ পরামর্শ দিয়া সাহায্য করিতে লাগিলেন।
শ্রীযুত দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ইহার পর জাপানে এনামেল শিল্পের উপযোগী আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করেন এবং ১৯২৩ সালে কলিকাতায় ঐগুলি লইয়া আসেন। কলিকাতা হইতে ১৫ ১/২ মাইল দূরে পল্তাতে একখণ্ড প্রশস্ত জমি ক্রয় করা হয় এবং তাহার উপরে দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে কারখানা নির্মিত হয়। ভট্টাচার্য ভ্রাতৃদ্বয়ের, বিশেষতঃ দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্মোৎসাহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পরিশ্রমের ফলে দেবেন্দ্রবাবুর স্বাস্থ্যভঙ্গ হইয়া গিয়াছিল বলিলেই হয়।
যাঁহারা বাংলা দেশে শিল্প ব্যবসায়ের সঙ্গে সংসৃষ্ট আছেন, তাঁহারাই এই কার্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে পারিবেন। সিমলার সামরিক কনট্রাক্ট বিভাগের তদানীন্তন ডিরেক্টর কর্ণেল ডানলপ ১৯২৭ সালে এই কোম্পানীর কারখানা পরিদর্শন করেন এবং ভারতের পক্ষে এই নূতন শিল্পে নানা বাধাবিঘ্নের মধ্য দিয়া পাঁচ বৎসরে যে উন্নতি হইয়াছে, তাহার বিশেষ প্রশংসা করেন।
ভারতে প্রাপ্ত কাঁচা মাল লইয়া বহু পরীক্ষার পর এখানেই এনামেলের উজ্জ্বল রং করা সম্ভব হয়। কারখানাতে যে সব এনামেলের জিনিষ হইত, তাহা আমদানী ব্রিটিশ পণ্যের চেয়ে কোন অংশে নিকৃষ্ট ছিল না।
ইতিমধ্যে ধীরে ধীরে দক্ষ কারিগরের সংখ্যা বাড়িতে লাগিল, উৎপন্ন জিনিষের পরিমাণও বাড়িতে লাগিল। পূর্বে যেখানে একটি ছোট চুল্লী ছিল, সেস্থলে এখন কোম্পানীর চারটি বড় ‘মাফ্ল’ চুল্লী হইয়াছে। এনামেলের রং করিবার জন্যও অনেকগুলি ‘স্মেলটিং’ চুল্লী স্থাপিত হইয়াছে।
বাঙালী যুবকেরা যাহাতে এই এনামেল শিল্পের কাজ গ্রহণ করে এবং উহাতে লাগিয়া থাকে, সে চেষ্টায় বহু বেগ পাইতে হইয়াছে। চুল্লীতে যে প্রচণ্ড তাপের মধ্যে কাজ করিতে হয় তাহা মধ্যবিত্ত বাঙালী ভদ্র যুবকেরা সহ্য করিতে পারে না এবং এই জন্য বহু যুবক কাজ করিতে আসিয়া কিছুদিন পরেই চলিয়া যায়। অবশেষে নোয়াখালির কর্মঠ মুসলমান এবং পূর্ববঙ্গ হইতে তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের কাজে লইতে হয়। উহাদের সঙ্গে উচ্চবর্ণীয় কয়েকজন ‘অশিক্ষিত’ হিন্দু যুবকও কাজ করিতে থাকে। শিক্ষিত বাঙালী যুবকরা এই শ্রেণীর পরিশ্রমের কাজ করিতে প্রবল অনিচ্ছা প্রকাশই করিয়াছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষিত যুবককে এনামেল শিল্পের কাজ শিখাইবার চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সেই একই দুঃখের কাহিনী—বাঙালী যুবকদের শিথিল প্রকৃতি এবং কঠোর পরিশ্রমে অনিচ্ছা। এখনও পরিশ্রমী দৃঢ়চিত্ত বাঙালী যুবকদিগকে এই শিল্পে প্রবৃত্ত করাইবার জন্য চেষ্টা চলিতেছে—কেন না, অনেকেরই বিশ্বাস, এই চেষ্টার সাফল্যের উপরেই এদেশের এনামেল শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করিতেছে।
এখানে বলা যাইতে পারে যে, শিল্পপ্রধান ইংলণ্ডেও এনামেল শিল্পের সংরক্ষণ জন্য শতকরা ২৫% শুল্কের ব্যবস্থা আছে। এদেশে এই শিশু শিল্পেকে শক্তিশালী জার্মান ও জাপানী শিল্পের সঙ্গে প্রবল প্রতিযোগিতা করিতে হয় অথচ কোন প্রকার সরকারী বা ব্যাঙ্কের সাহায্যই সে পায় না।[২]
অবশ্য, টাটার লোহার কারখানা বা টিটাগড় কাগজের কল প্রভৃতির মত বড় বড় ব্যবসায় সোরগোল করিয়া অতিরিক্ত সংরক্ষণ শুল্কের ব্যবস্থা করিয়া লইতে পারে; কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্পগুলিকে বিদেশী প্রতিযোগিতার অত্যাচার নীরবে সহ্য করিয়া লুপ্ত হইতে হইবে। আমাদের ‘মা-বাপ’ সরকার এদেশের শিল্পোন্নতির জন্য কতদূর আগ্রহান্বিত ইহাই তাহার নিদর্শন।
(৩) বাংলায় বাণিজ্যপোত-অতীত ও বর্তমান
অনেকেরই বিশ্বাস যে, বাঙালী বাণিজ্যপ্রচেষ্টা এবং সমুদ্রযাত্রার প্রতি স্বভাবতঃই বিমুখ। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ হইতে দেখা যায় যে, এককালে বাঙালীরা দেশের অন্তবাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্যে প্রধান অংশ গ্রহণ করিয়াছিল।
“বাঙালীরা যে এককালে সমুদ্রযাত্রা এবং বাণিজ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল, তাহার প্রমাণ তাহাদের সাহিত্যে লিপিবদ্ধ আছে। চণ্ডীমঙ্গল ও মনসা-মঙ্গল সাহিত্য বাংলাদেশে সমধিক জনপ্রিয়। ঐ সব সাহিত্যে ধনপতি, শ্রীমন্ত, চাঁদ সদাগর প্রভৃতির বাণিজ্য ব্যপদেশে সমুদ্র-যাত্রার বিবরণ আছে।”[৩]
৩৯৯—৪১৪ খৃষ্টাব্দে চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়ান তাম্রলিপ্তকে বাংলার প্রধান সমুদ্রবন্দররূপে দেখিতে পান। ভারত ভ্রমণ করিয়া স্বদেশে ফিরিবার সময় তিনি এই তাম্রলিপ্ত বন্দর হইতেই জাহাজে যাত্রা করিয়াছিলেন। মিঃ ওকাকুরাও বলেন, মুসলমান- বিজয়ের সময় পর্যন্ত বাংলার উপকূলের সাহসী নাবিকগণ সিংহল, জাভা, সুমাত্রা প্রভৃতি স্থানে উপনিবেশ স্থাপন এবং চীন ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্বন্ধ গড়িয়া তুলিতেছিল। বাংলার ‘বারভুঁইঞা’দের সময়ে এবং ঢাকার মোগল রাজপ্রতিনিধিদের আমলে শ্রীপুর, বাকলা বা চন্দ্রদ্বীপ হিন্দুদের প্রধান নৌবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। ঐ দুই স্থান বর্তমান বাখরগঞ্জ এবং চণ্ডীকানের (সাগরদ্বীপ) দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। শ্রীপুরের অধিপতি কেদার রায় নৌশক্তিতে খুব প্রবল ছিলেন এবং আরাকানের রাজা ১৫০ খানি রণতরীসহ যখন সন্দ্বীপ আক্রমণ করেন, তখন কেদার রায় নৌযুদ্ধে তাঁহাকে পরাস্ত করেন। রামচন্দ্র রায় এবং তাঁহার পুত্র কীর্তিনারায়ণের নেতৃত্বে বাকলা আর একটি প্রধান নৌকেন্দ্র হইয়া উঠে। কীর্তিনারায়ণ ফিরিঙ্গীদিগকে মেঘনা নদীর মোহনার সন্নিকটস্থ উপনিবেশ হইতে বিতাড়িত করিয়া ঐ স্থান দখল করেন। তৎকালে হিন্দুদের নৌশক্তির সর্বপ্রধান কেন্দ্র স্থাপিত হইয়াছিল চণ্ডীকানে। বিখ্যাত যশোরাধিপতি প্রতাপাদিত্য এবং তাঁহার পুত্র উদয়াদিত্য এই নৌকেন্দ্র স্থাপিত করেন।[৪]
মুসলমান শাসকদেরও শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল। মিরজুমলা একটি বৃহৎ নৌবহর লইয়া আসাম অভিযান করেন। ১৬৬৪ সালে সায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবেদার হন। তাঁহার রাজধানী ছিল ঢাকায়। মগদিগকে দমন করিবার জন্য তিনি একটি নৌবাহিনী গঠন করেন। উহাতে ৩০০টি রণতরী ছিল এবং ঐ সমস্ত রণতরী হুগলী, বালেশ্বর, মুরাং, চিলমারী, যশোর এবং কালীবাড়ীতে নির্মিত হইয়াছিল।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম আমলেও তাঁহারা বাংলার পোতশিল্প গঠনে সহায়তা করেন। এ বিষয়ে তাঁহারা বলিতে গেলে ঢাকায় মোগল রাজপ্রতিনিধিদের দৃষ্টান্তই অনুসরণ করিয়াছিলেন। “১৭৮১—১৮০০ খৃঃ পর্যন্ত মোট ১৭,০২০ টনের ৩৮৫ খানি জাহাজ হুগলী নদীর বন্দরেই নির্মিত হইয়াছিল। ১৮০১—১৮২১ খৃঃ পর্যন্ত হুগলী বন্দরে মোট ১০৫,৬৯৩ টনের ২৩৭ খানি জাহাজ নির্মিত হয়।
ভারতের বড়লাট লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ খৃষ্টাব্দে এইরূপ মন্তব্য প্রকাশ করেন যে, পোতশিল্পের কেন্দ্র রূপে ভবিষ্যতে কলিকাতা সহর গড়িয়া উঠিবে, এরূপ সম্ভাবনা আছে। তাঁহার মন্তব্য নিম্নে উধৃত হইল:—
“কলিকাতা বন্দরে ১০,০০০ টন জাহাজ আছে। ঐ সমস্ত জাহাজ মাল বহন করিবার জন্য ভারতেই নির্মিত। কলিকাতা বন্দরে বর্তমানে যত টন জাহাজ আছে এবং বাংলা দেশে পোতশিল্প যেরূপে উন্নতি লাভ করিয়াছে (এবং ভবিষ্যতে আরও দ্রুত উন্নতি করিবে), সেই সমস্ত বিবেচনা করিয়া নিশ্চিতরূপে বলা যায় যে বাংলার ব্রিটিশ বণিকদের পণ্য লণ্ডন বন্দরে চালান দিবার জন্য যত টন জাহাজের প্রয়োজন হইবে, কলিকাতা বন্দর তাহা সমস্তই যোগাইতে পারিবে।”
বোম্বাইও এবিষয়ে কলিকাতা অপেক্ষা পশ্চাৎপদ ছিল না। বরং কোন কোন দিক দিয়া উন্নত ছিল। পার্শী জাহাজ নির্মাতাদের সুদক্ষ পরিচালনায় বোম্বাইয়ের সরকারী ডকইয়ার্ড তৎকালে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল। ১৭৭৫ খৃষ্টাব্দে জনৈক পর্যটক বোম্বাই ডকের বর্ণনা করিয়া বলিয়াছেন,—“এই ডকইয়ার্ডটি সুপ্রশস্ত, এখানে জাহাজী মালপত্র রাখার জন্য উপযুক্ত গুদাম ঘর আছে। এখানকার ‘ড্রাই-ডক’ এমন প্রশস্ত এবং সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত যে ইয়োরোপে তাহার তুলনা মিলে না।”[৫]
কিন্তু কলিকাতা বন্দরের শ্রীবৃদ্ধি সম্বন্ধে লর্ড ওয়েলেসলির ভবিষ্যৎ বাণী সফল হইল না। “লণ্ডন বন্দরে যখন ভারতের নির্মিত জাহাজ ভারতীয় পণ্য বহন করিয়া উপস্থিত হইল, সেখানকার একছত্রী ব্যবসায়ীদের মধ্যে তখন একটা হুলুস্থূল পড়িয়া গেল। টেমস নদীতে যদি কোন শত্রু পক্ষের জাহাজ উপস্থিত হইত, তাহা হইলেও বোধ হয় এত চাঞ্চল্য হইত না। লণ্ডন বন্দরের জাহাজ নির্মাতারা আতঙ্কসূচক চীৎকার সুরু করিয়া দিল; তাহারা প্রচার করিতে লাগিল যে, তাহাদের ব্যবসা ধ্বংস হইবার উপক্রম এবং লণ্ডনের যত জাহাজ ব্যবসায়ীদের পরিবারবর্গ না খাইয়া মরিবে।” (Taylor: History of India); লর্ড ওয়েলেসলির অভিপ্রায় ছিল যে, ভারতীয় জাহাজ পণ্য বহন করিয়া ইংলণ্ডের বন্দরে প্রবেশ করিতে পারিবে এবং এইরূপে ব্রিটিশ জাহাজগুলির সঙ্গে সমানাধিকারে বাণিজ্য করিতে পারিবে। কিন্তু ভারতীয় জাহাজ শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার এই উদার ও সঙ্গত নীতি, ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের চীৎকারে রহিত হইল। বোর্ড অব ডিরেক্টর এবং কোম্পানীর মালিকগণ বড়লাটের এই উদার নীতির তীব্র নিন্দা করিয়া কড়া প্রস্তাব গ্রহণ করিলেন।
বর্তমান সময়েও আমরা দেখিতেছি, যখনই বাংলা কিম্বা বোম্বাইয়ে স্বদেশী ষ্টীমার লাইন চালাইবার চেষ্টা হইয়াছে, তখনই একাধিপত্য-ভোগকারী শক্তিশালী ব্রিটিশ কোম্পানীগুলি প্রাণপণে এই সব স্বদেশী ব্যবসায়ীকে প্রারম্ভেই গলা টিপিয়া মারিতে চেষ্টা করিয়াছে। কলিকাতার ‘ইষ্ট বেঙ্গল রিভার ষ্টীমার সার্ভিস লিমিটেডের’ প্রতিনিধিরূপে, ভারতীয় পোত শিল্প কমিটির সম্মুখে শ্রীযুত যোগেন্দ্রনাথ রায় যে সাক্ষ্য প্রদান করেন, আমার কথার প্রমাণ স্বরূপ তাহা হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিতেছি:—
“মূলধনের অভাব অথবা দক্ষ পরিচালনার অভাবে এই কোম্পানীর উন্নতি ব্যাহত হয় না। ইয়োরোপীয় ব্যবসায়ীরা সকলে মিলিয়া একজোট হইয়া অবৈধভাবে এই ভারতীয় ব্যবসায়কে ধ্বংস করিতে চেষ্টা করিয়াছিল বলিয়াই ইহার অবস্থা শোচনীয় হইয়াছে। যখন এই কোম্পানী প্রথম কাজ সুরু করে, তখন অধিকাংশ পাটের কল এই কোম্পানীর জাহাজে আনীত মাল লইত এবং মালের চালানী কাগজের অগ্রিম টাকাও দিত। কিন্তু কয়েক বৎসর পরে, ইয়োরোপীয় কোম্পানীগুলি দেখিল যে এই ভারতীয় কোম্পানী জাহাজের সংখ্যা বাড়াইতেছে ও ভাল ব্যবসা করিতেছে, এবং তাহার দৃষ্টান্তে আরও নূতন নূতন ভারতীয় কোম্পানী গঠিত হইতেছে। তখন তাহারা পাটের কলের মালিকদের সঙ্গে এইরূপ চুক্তি করিল যে ভারতীয় কোম্পানীর জাহাজে আনীত মাল তাহারা গ্রহণ করিতে পারিবে না।”
সিন্ধিয়া ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর অভিজ্ঞতা এর চেয়েও শোচনীয়। এই কোম্পানীর উপকূল বাণিজ্যের জন্য অনেকগুলি জাহাজ আছে। এই কোম্পানীর চেয়ারম্যান শ্রীযুত বালচাঁদ হীরাচাঁদ ১৯২৯ সালের ২৫শে নভেম্বর যে বক্তৃতা করেন, তাহাতে অনেক স্পষ্ট কথা আছে: “এই কোম্পানীর জাহাজগুলি যে পথে চলাচল করে, সেখানে বিদেশী কোম্পানীগুলি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বহু জাহাজ চালাইয়া থাকে। ইহার উপর উহারা এমন ভাবে মালের ভাড়া হ্রাস করিয়াছে যে কোন ভারতীয় কোম্পানীর পক্ষে প্রতিযোগিতায় আত্মরক্ষা করা কঠিন।” ব্রিটিশ রাজের অধীনস্থ ভারত গবর্ণমেণ্ট ইচ্ছাপূর্বকই ভারতীয় জাহাজ শিল্প ও ব্যবসায়ের প্রতি বিরুদ্ধভাব অবলম্বন করিয়াছেন। শ্রীযুত বালচাঁদ হীরাচাঁদ এই সম্পর্কে বলিয়াছেন—“ভারতের জাহাজ নির্মাণের কারখানাগুলিই কেবল একে একে লুপ্ত হয় নাই, পরন্তু ভারতে যাহাতে সরকারী প্রয়োজনেও জাহাজ নির্মিত না হইতে পারে, তাহার জন্য গবর্ণমেণ্ট কার্যকরী ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছেন। ইহার ফলে বোম্বাইয়ের প্রসিদ্ধ ডকইয়ার্ড বহু বর্ষ ধরিয়া ইংলণ্ড ও ভারতের প্রয়োজনে প্রভূত কার্য করিয়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এইরূপে ভারতীয় পোতশিল্পের ধ্বংসযজ্ঞ সমাপ্ত হইল। যেদিন লণ্ডনে ভারতে নির্মিত জাহাজ ভারতীয় পণ্য বহন করিয়া উপস্থিত হইয়াছিল সেই দিন হইতেই ইংলণ্ডের জাহাজ নির্মাতাদের মনে ঈর্ষার অনল জ্বলিয়া উঠে, এবং তাহারা ভারতীয় পোত-শিল্পের ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করিতে থাকে। এতদিনে তাহাদের অভিলাষ পূর্ণ হইয়াছে।
“এইরূপে ৫০ বৎসরের মধ্যে, ভারতের পোত শিল্প ও সমুদ্র বাণিজ্য যাহা প্রায় সহস্র বৎসরেরও অধিক কাল ধরিয়া প্রচলিত ছিল,—তাহা একেবারে লুপ্ত হইয়া গেল। ভারতীয় পোত শিল্প এককালে পৃথিবীর সমুদ্র বাণিজ্য পথে যে অসীম প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল, তাহার কোন নিদর্শন এখন আর নাই। গবর্ণমেণ্ট যে ভাবে ভারতীয় পোতশিল্প ধ্বংস করিয়াছেন এবং ভারতের উপকূল বাণিজ্যে ব্রিটিশ প্রাধান্যের প্রতিষ্ঠায় যে ভাবে সাহায্য করিয়াছেন, তাহা ব্রিটিশ স্বার্থরক্ষার জন্য ভারতের আর্থিক ধ্বংস সাধন প্রচেষ্টার শোচনীয় দৃষ্টান্ত এবং ভারতের গত ৭০ বৎসরের আর্থিক ইতিহাসে, পোতশিল্পের ব্যাপারেই ইহা সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানীগুলিকে আয়-করের দায় হইতে মুক্ত করা, ভারতের উপকূলে বাণিজ্যে তাহাদের একাধিপত্য স্থাপনের জন্য নানা উপায় উদ্ভাবন করা, এবং সাধারণভাবে ভারতীয় পোতশিল্পের প্রতি বিরূদ্ধ ভাব—এই সমস্ত হইতেই বুঝা যায় যে, ব্রিটিশ আর্থিক নীতির উদ্দেশ্য, ভারতীয় স্বার্থের ক্ষতি করিয়া ব্রিটিশ স্বার্থরক্ষার পন্থা অনুসরণ করা।”
ভারতীয় ব্যবস্থা পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবের ফলে গবর্ণমেণ্ট যে ভারতীয় বাণিজ্য-পোত কমিটি নিযুক্ত করিয়াছিলেন, তাঁহারা তাঁহাদের রিপোর্টে এইরূপ প্রস্তাব করেন: “যে সমস্ত জাহাজের মালিক ভারতবাসীরা এবং যাহাতে প্রধানতঃ তাঁহাদেরই স্বার্থ ও পরিচালন ক্ষমতা আছে, সেই সমস্ত জাহাজের জন্যই ভারতের উপকূল বাণিজ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করিতে হইবে।” কিন্তু এদেশের আমলাতন্ত্র (ব্যুরোক্রেসি) ব্রিটিশ বণিকদের সঙ্গে স্বার্থসূত্রে আবদ্ধ, সুতরাং তাহারা এই প্রস্তাব ব্যর্থ করিয়া দিবার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছে। মিঃ হাজীর ‘উপকূল বাণিজ্য বিলের’ ভবিষ্যৎও অন্ধকারময়।
এই শোচনীয় দৃশ্যের সঙ্গে জাপানের জাতীয় গবর্ণমেণ্ট জাপানী পোত শিল্প ও সমুদ্র-বাণিজ্যের জন্য কি করিয়াছেন, তাহার তুলনা করুন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে জাপান যে কেবল বাণিজ্যপোতই গড়িয়া তুলিয়াছে, তাহা নহে, নৌ-বিভাগেও সে প্রধান স্থান গ্রহণ করিয়াছে। এই অপূর্ব সাফল্যের কারণ, রাষ্ট্রের সমর্থন ও প্রেরণা; জাপানী গবর্ণমেণ্টই বৃত্তি দিয়া এবং ব্যাঙ্ক হইতে ঋণ গ্রহণের সুবিধা করিয়া দিয়া দেশের শিল্প গঠনে সহায়তা করিয়াছেন। ১৮৫৫ খৃঃ কমোডোর পেরী যখন জাপানে উপস্থিত হইল, তখন যে নূতন বিপদের মুখে তাহাকে পড়িতে হইবে, সেজন্য সে প্রস্তুত ছিল না। প্রায় দুই শত বৎসর ধরিয়া ‘শোগুণ’দের সঙ্কীর্ণ নীতির ফলে দেশের সমুদ্র-বাণিজ্য লুপ্তপ্রায় হইয়াছিল। ‘পুনরুত্থানের’ আরম্ভে প্রবীণ রাজনীতিকগণ আধুনিক প্রণালীতে বাণিজ্যপোত এবং নৌ-বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিলেন এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁহারা প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন।
অ্যালেন তাঁহার “বর্তমান জাপান ও তাহার সমস্যা” নামক গ্রন্থে লিখিয়াছেন:—“সেই সময়ে (১৮৭২ খৃঃ) গবর্ণমেণ্ট শিল্প ও বাণিজ্য বিদ্যালয় এবং বর্তমান ব্যবহারিক শিল্প শিক্ষা প্রণালী প্রবর্তন করিয়াছিলেন। আধুনিক বাণিজ্যপোতও নির্মিত হইয়াছিল এবং যে সমস্ত বড় বড় ব্যবসায়ী কোম্পানী জাপানের বহির্বাণিজ্যে বর্তমান যুগে এমন প্রভাব বিস্তার করিয়াছে, সেগুলি গবর্ণমেণ্টের সহায়তায় ও উৎসাহে ঐ সময়েই স্থাপিত হইয়াছিল। ১৮৯৪ সালে যে সমস্ত শিল্প গবর্ণমেণ্ট কর্তৃক প্রবর্তিত হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে বয়ন শিল্প এবং পোত-শিল্পই প্রধান।”
পরবর্তীকালে সংরক্ষণ শুল্ক ও বৃত্তি দ্বারা জনসাধারণের মধ্যে শিল্প প্রচেষ্টায় উৎসাহ দেওয়া হয় এবং গবর্ণমেণ্ট যে সমস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, সেগুলির পরিচালনা ভার ক্রমে ক্রমে দেশবাসীর উপর অর্পিত হয়।
“গবর্ণমেণ্ট যদিও কতকগুলি শিল্পের পরিচালনা-ভার ছাড়িয়া দিয়াছিলেন, তথাপি এগুলিকে গবর্ণমেণ্ট সাহায্য করিতেন। ১৮৯৯ সালে জাপান শিল্প সংরক্ষণ সম্বন্ধে স্বাতন্ত্র্য নীতি অবলম্বন করে এবং প্রধান প্রধান শিল্পগুলিকে সংরক্ষণ শুল্ক দ্বারা রক্ষা করিবার ব্যবস্থা করে। ১৮৯৬ সালে পোত-শিল্প ও বাণিজ্যপোতগুলিকে সরকারী বৃত্তি দিবার ব্যবস্থা অবলম্বিত হয়। ১৯১০ সালে এই ব্যবস্থা কিয়ৎপরিমাণে সংশোধিত হয় বটে, কিন্তু এখনও উহা বলবৎ আছে।” গত ইয়োরোপীয় যুদ্ধের সময়, “পৃথিবীতে বাণিজ্যপোতের সংখ্যা হ্রাস হয় এবং জাপান এই সুযোগে নিজেদের বাণিজ্যপোতের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এইরূপে যে জাপানকে ২০ বৎসর পূর্বেও বিদেশী জাহাজের সাহায্যে বহির্বাণিজ্য চালাইতে হইত, সেই জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলস্থ সমস্ত দেশে বাণিজ্যব্যাপারে প্রধান স্থান অধিকার করে।” ৫০ বৎসর পূর্বে জাপানে কতকগুলি ছোট ছোট জাহাজ মাত্র তৈরী হইত। কিন্তু বর্তমানে জাপানের কারখানায় প্রথম শ্রেণীর সমুদ্রগামী জাহাজ, ড্রেডনট এবং রণতরী তৈরী হইতেছে।[৬] জাপানের পোত-শিল্প গঠনের পক্ষে অনেক প্রাকৃতিক বাধাবিপত্তি আছে। তাহার খনিতে উৎপন্ন লৌহ ও কয়লা নিকৃষ্ট শ্রেণীর, সে তাহার পিণ্ড লৌহ আমেরিকা এবং ভারতবর্ষের টাটা কোম্পানী ও ইণ্ডিয়ান আয়রন ও ষ্টীল কোম্পানী (আসানসোল) হইতে আমদানী করে এবং তাহা হইতে নিজেদের জাহাজ তৈরীর উপযোগী ইস্পাত নির্মাণ করে। এই বিষয়ে জাপানের অপেক্ষা ভারতের অবস্থা অনেক ভাল, কিন্তু তাহার দুর্ভাগ্য এই যে, তাহার নিজের স্বার্থের সঙ্গে তাহার বিদেশী প্রভুদের স্বার্থের সংঘাত হয় এবং তজ্জন্য তাহার স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হয়।
জাপানের তুলনায় আমেরিকা বর্তমান জগতের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে অনেক বেশী উন্নতিশীল। তৎসত্ত্বেও আমেরিকা তাহার পোত-শিল্পের প্রসারের জন্য কিরূপ চেষ্টা করিতেছে, তাহা লক্ষ্য করিবার বিষয়। এ সম্বন্ধে স্যার আর্কিবাল্ড্ হার্ডের মন্তব্য আমরা নিম্নে উধৃত করিতেছি:—
“নৌ-বিভাগ যে দশটি নূতন ক্রুজারের জন্য ফরমাইজ দিয়াছেন, আমেরিকার কংগ্রেস তাহা এখনও মঞ্জুর করে নাই বটে; কিন্তু কংগ্রেস এমন সব ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছে, যাহার ফলে আমেরিকা পোত-শিল্পে আবার তাহার পূর্ব গৌরবের অধিকারী হইবে। নূতন আইনের প্রধান প্রধান ব্যবস্থাগুলি এই:—
“জাহাজ নির্মাণ ফাণ্ডে ২৫ কোটী ডলার রাখা হইয়াছে। এই টাকা হইতে শিপিং বোর্ড কোন জাহাজের মালিককে জাহাজ নির্মাণের জন্য সামান্য সুদে ব্যয়ের তিন চতুর্থাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারেন। বিশ বৎসরে এই ঋণ শোধ করিতে হইবে। পুরাতন জাহাজের সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্যও এইরূপ ঋণ দেওয়া যাইতে পারিবে।
“সরকারী কর্মচারীদের সরকারী কাজের জন্য বিদেশী জাহাজের পরিবর্তে আমেরিকার জাহাজই ব্যবহার করিতে হইবে।”
ইহা হইতে স্পষ্টই বুঝা যাইবে যে, এই নূতন আইনে আমেরিকার জাহাজ নির্মাতাদের লাভ হইবে। কেন না বাজার প্রচলিত সুদ অপেক্ষা অল্প সুদে ঋণ পাওয়ার দরুণ তাহারা সস্তায় জাহাজ তৈরী করিবার এ সুযোগ ত্যাগ করিবে না। বিশেষজ্ঞেরা বলেন, আগামী ১০ বৎসরের মধ্যে আমেরিকা তাহার বাণিজ্যপোতের সংখ্যা বৃদ্ধি করিবার জন্য ৫০০ কোটী ডলার ব্যয় করিবে।
মিঃ ভি, জে, প্যাটেল সিন্ধিয়া ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর একখানি নূতন জাহাজের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে যে মন্তব্য প্রকাশ করেন, তাহা এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য:—
“এমন এক সময় ছিল, যখন ভারতবাসী কর্তৃক নির্মিত ও পরিচালিত, প্রথম শ্রেণীর ভারতীয় জাহাজ মূল্যবান্ ভারতীয় পণ্য দূরদূরান্তরে বিদেশে বহন করিয়া লইয়া যাইত। সকলেই জানেন কতকগুলি ঘটনার সমবায়ে ভারতের সেই পোতশিল্প ধ্বংস হইয়াছে এবং ভারতের পক্ষে এখন বাণিজ্যপোত বিষয়ে তাহার পূর্ব গৌরব পুনরধিকার করা অত্যন্ত কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। ইহাও লক্ষ্য করিবার বিষয় যে, গত ৫০ বৎসরের মধ্যে ভারতে কয়েকটি ভারতীয় জাহাজ কোম্পানী স্থাপিত হইয়াছিল,—কিন্তু সেগুলির অস্তিত্ব লোপ হইয়াছে। এ সম্বন্ধে বর্তমানে কিছু না বলাই ভাল।”
মিঃ প্যাটেল অতঃপর সিন্ধিয়া ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর ইতিহাস বিবৃত করেন এবং বিদেশী কোম্পানীরা কিরূপে ভাড়া হ্রাস করিয়া উহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিল, তাহাও বলেন। “কোম্পানী ছয় খানি আধুনিক মালবাহী জাহাজ তৈরী করিতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু এই ইচ্ছা তাঁহাদের ত্যাগ করিতে হইল। ষ্টীমার তৈরীর জন্য কোম্পানী অর্ডার দিতে পারিলেন না, কেন না ‘ট্রেড ফ্যাসিলিটিজ কমিটি’ তাঁহাদের ‘গ্যারাণ্টি’ দিবার দরখাস্ত অগ্রাহ্য করিলেন। যাঁহারা ইংলণ্ড ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্য কামনা করেন, তাঁহাদের পক্ষে এই ব্যাপারটি বড়ই দুঃখদায়ক। ‘ট্রেড ফ্যাসিলিটিজ কমিটি’ তাঁহাদের ২ কোটী ১০ লক্ষ পাউণ্ডের ফাণ্ড হইতে বিদেশী জাহাজ কোম্পানীগুলিকে ২২ ১/৪ লক্ষ পাউণ্ড দিতে পারিলেন, কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেরই অন্তর্ভুক্ত ভারতের একটি জাহাজ কোম্পানীর জন্য মাত্র ২ ১/২ লক্ষ পাউণ্ডও দিতে পারিলেন না, অথচ ভারত ইংলণ্ডকে গত মহাযুদ্ধে জয়লাভে অশেষ প্রকারে সহায়তা করিয়াছে।
“সমুদ্রতীরবর্তী প্রত্যেক দেশের গবর্ণমেণ্ট যখন নিজেদের জাতির বাণিজ্যপোত গড়িয়া তুলিবার জন্য সর্বপ্রকারে সহায়তা করিতেছেন, তখন ভারতবাসীরা কি আশা করিতে পারে না যে, তাহাদের গবর্ণমেণ্টও এই মহান শিল্পটি প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য সহায়তা করিবেন? ভারত গবর্ণমেণ্ট কর্তৃক নিযুক্ত বাণিজ্যপোত কমিটি প্রস্তাব করিয়াছেন যে, অন্যান্য দেশের উপকূল বাণিজ্য যেমন তাহাদের নিজেদের জাহাজের জন্যই সংরক্ষিত, ভারতের উপকূল বাণিজ্যও তেমনি ভারতীয় জাহাজের জন্যই সংরক্ষিত থাকিবে। কিন্তু ভারত গবর্ণমেণ্ট এই সামান্য প্রস্তাবটিও এ পর্যন্ত কার্যে পরিণত করিলেন না। সুতরাং গবর্ণমেণ্টের এই ভাবগতিক দেখিয়া এদেশের লোকেরা যে হতাশ হইবে, তাহা আর বিচিত্র কি? সমুদ্রপথে ভারতের বিপুল বাহির্বাণিজ্যের কথা আমি এস্থলে বলিতেছি না, উহার সঙ্গে ভারতীয় জাহাজের কোন সম্বন্ধ নাই বলিলেও চলে।
“পোতবাহী পণ্যের জন্য ভারত যে ভাড়া দেয় তাহার পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ৩ ১/২ কোটা ৪ কোটী পাউণ্ড হইবে। ইহার প্রধান অংশই বিদেশী জাহাজ কোম্পানীগুলি পায়। ভারতবাসীরা যে এই অর্থের যতটা সম্ভব নিজেদের দেশেই রাখিয়া দেশবাসীর আর্থিক দুর্দশার কিয়ৎ পরিমাণ লাঘব করিতে চেষ্টা করিবে, ইহা স্বাভাবিক।”
‘দি মুসলমান’ পত্রিকা (২১শে অক্টোবর, ১৯২৮) হইতে উদ্ধৃত নিম্নলিখিত বিবৃতি হইতে এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট হইবে:—
“ব্যবস্থা পরিষদে মিঃ এম, এন, হাজীর ‘উপকূল বাণিজ্য বিলের’ যখন আলোচনা হইতেছিল, তখন রেঙ্গুনের ‘বেঙ্গল মহামেডান এসোসিয়েশান’ ঐ বিলকে সমর্থন করিয়া তার করিয়াছিলেন। এই আইনের প্রয়োজনীয়তা বুঝাইতে গিয়া তাঁহারা কয়েকটি দৃষ্টান্তও প্রদর্শন করিয়াছিলেন। নবগঠিত স্বদেশী কোম্পানী ‘বেঙ্গল বর্মা ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানী লিমিটেডের’ জাহাজ চট্টগ্রাম ও রেঙ্গুনের মধ্যে যাতায়াত করিতেছিল। কিন্তু বিদেশী জাহাজ কোম্পানীগুলি অত্যধিক ভাড়া কমাইয়া এই দেশীয় জাহাজ কোম্পানীর সঙ্গে অবৈধ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ১৯০৫-৬ সালের স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোং লিমিটেড বিদেশী জাহাজ কোম্পানীর এইরূপে অবৈধ প্রতিযোগিতায় কিভাবে উঠিয়া যায়, তাহাও সকলেই জানেন। ভারতের উপকূল বাণিজ্য ভারতীয় জাহাজের জন্য সংরক্ষিত করা একান্ত প্রয়োজন হইয়া পড়িতেছে। আমাদের পাঠকেরা জানেন যে, বিদেশী জাহাজ কোম্পানীগুলি বেঙ্গল বর্মা ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীকে পরাজিত করিবার জন্য চট্টগ্রাম ও রেঙ্গুনের মধ্যে তাহাদের যাত্রী ভাড়ার হার ১৪৲ টাকা হইতে ৪৲ টাকাতে নামাইয়াছিল,—এই নূতন স্বদেশী শিল্পকে ধ্বংস করিবার জন্য তাহারা এরূপ ভয়ও দেখাইয়াছিল যে, যাত্রীভাড়া তাহারা একেবারেই তুলিয়া দিবে। আর একটি বিদেশী জাহাজ কোম্পানী বেঙ্গল বর্মা ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মৌলবী আবদুল বারি চৌধুরীর সঙ্গে আর এক দিক দিয়া অবৈধ প্রতিযোগিতা করিতেছে। চৌধুরী সাহেবের লঞ্চ এতদিন যে সব নদীতে যাতায়াত করিত, ঐ বিদেশী কোম্পানী সেই সব স্থানে তাহাদের লঞ্চ চালাইতে আরম্ভ করিয়াছে। উহার উদ্দেশ্য, বেঙ্গল বর্মা ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর প্রধান কর্মকর্তার আর্থিক ক্ষতি যদি করা যায়, তবে তাহার ফলে, কোম্পানীটিও ফেল পড়িয়া যাইবে।”
আমি নিজে আর একটি দেশীয় ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর সহিত যুক্ত আছি। এই কোম্পানীটি ছোট। আমাদেরও ঠিক পূর্বোক্ত রূপ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। গত ২২ বৎসরে এই কোম্পানীর প্রায় ২ লক্ষ টাকা লোকসান হইয়াছে। এই কোম্পানীর লাইনের ভাড়া ছিল এক টাকা। কিন্তু একটি শক্তিশালী ব্রিটিশ কোম্পানী আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়া ঐ লাইনেই ষ্টীমার চালাইতে লাগিল এবং ভাড়া কমাইয়া মাত্র এক আনা করিল। কিন্তু কোম্পানীর ২।৩ জন ডিরেক্টর স্বদেশী শিল্পের প্রতি অনুরাগ বশতঃ সমস্ত ক্ষতি অকাতরে সহ্য করিয়াছিলেন, নতুবা কোম্পানীটি বহুদিন পূর্বেই উঠিয়া যাইত।
হিসাব করিয়া দেখা যাইতেছে যে, গত ২৫ বৎসরে, ২০টির অধিক ভারতীয় জাহাজ কোম্পানী, একুনে প্রায় দশ কোটী টাকা মূলধন লইয়া ভারতের উপকূলে ব্যবসা চালাইতে চেষ্টা করিয়াছে। কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই ব্রিটিশ কোম্পানীগগুলির ভাড়া হ্রাসের প্রতিযোগিতায় কারবার গুটাইতে বাধ্য হইয়াছে।
ইহা হইতে দেখা যাইবে যে, ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্ট এই স্বদেশী শিল্পের ধ্বংস সাধনে যথাশক্তি সহায়তা করিয়াছেন। নিম্নোধৃত বিবৃতিগুলি হইতে এবিষয়ে আরও অনেক কথা জানা যাইবে।
“কোর্টের চক্ষে সর্বাপেক্ষা গুরুতর অপরাধ হইয়াছিল, লর্ড ওয়েলেসলির ভারতীয় ব্যবসা বাণিজ্যকে উৎসাহ প্রদানের নীতি। এই নীতির ফলে ভারতীয় বাণিজ্যপোত গড়িয়া উঠিতেছিল এবং ভারতীয় বাণিজ্যও সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাইতেছিল। কিন্তু ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী তাঁহাদের অদূরদর্শী সঙ্কীর্ণ নীতির দ্বারা চালিত হইয়া গবর্ণর জেনারেলের এই উদার নীতির মর্ম বুঝিতে পারেন নাই। এবং যদিও ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের মন্ত্রিমণ্ডল তাঁহাকে সমর্থন করিয়াছিলেন, তথাপি কোম্পানীর কোর্ট অব ডিরেক্টরস এবং মালিকগণ তাঁহার বিরদ্ধে তীব্র নিন্দা সূচক প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছিলেন। Meadows Taylor: History of India.
“ব্রিটিশ ভারত উপকূল বাণিজ্য গড়িয়া তুলিতেছিল, কিন্তু সুয়েজ খাল খোলা হইলে, জাহাজী ডাকের ঠিকাদার পি অ্যাণ্ড ও কোম্পানীকে খালের ভিতর দিয়া ষ্টীমার লইয়া ইয়োরোপীয় সমুদ্রে চালাইতে হইল। এরূপ ব্যবস্থায় লিডেনহল স্ট্রীটের ডিরেক্টরগণ সিদ্ধান্ত করিলেন যে, তাঁহাদের জাহাজ অতঃপর ইয়োরোপীয় নাবিকগণ দ্বারা চালিত হইবে। ভারত হইতে চীন এবং চীন হইতে জাপান—কেবল এই সব স্থানে ভারতীয় লস্করগণ জাহাজ চালাইতে পারিবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে ঘোর অনিষ্ট হইল,—ব্রিটিশ নাবিকগণের দুর্বিনীত বিদ্রোহী ভাব এবং মাতলামি প্রকট হইয়া পড়িল এবং নূতন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ঘটিতে লাগিল।......এক বৎসরের অভিজ্ঞতার ফলে, এই ব্যবস্থা পরিত্যক্ত হইল।”—The Imperial and Asiatic Quarterly Review and Oriental & Colonial Record, third series—July—Oct., 1910.
স্বদেশী পোত-শিল্প
এক শতাব্দী পূর্বে গবর্ণমেণ্ট কি ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছিলেন
বিদেশী গবর্ণমেণ্টের জন্যই আমাদের দেশের পোত-শিল্প ধ্বংস হইয়াছে, এরূপ কথা বলা হইয়া থাকে।
“ফোর্ট উইলিয়াম,
রাজস্ব বিভাগ, ১৪ই জানুয়ারী, ১৭৮৯
“এতদ্বারা বিজ্ঞপ্তি করা যাইতেছে যে কোন ব্যক্তি (জেলা ম্যাজিস্ট্রেটগণ ব্যতীত) নিম্নলিখিত রূপ আকার ও আয়তনের বোটগুলি আগামী ১লা মার্চের পর তৈরী করিতে বা ব্যবহার করিতে পারিবে না।
‘লুখা’ (Luckha)—৪০—৫০ হাত লম্বা ও ২ ১/২—৪ হাত চওড়া,
‘জেল্কিয়া’ (Zelkia)—৩০—৭০ হাত লম্বা ও ৩ ১/২—৫ হাত চওড়া।
চাঁদপুরের ‘পঞ্চওয়েস’ যাহাতে দশ দাঁড়ের বেশী আছে।
“যশোর, ঢাকা, জালালপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, ২৪ পরগণা, হিজলী, তমলুক, বর্ধমান ও নদীয়ার ম্যাজিষ্ট্রেটগণকে আদেশ দেওয়া হইয়াছে যে, ১লা মার্চের পর তাঁহাদের এলাকার মধ্যে পূর্ব বর্ণিত রূপ যে সমস্ত বোট তাঁহারা দেখিতে পাইবেন, সেগুলি দখল ও বাজেয়াপ্ত করিবেন। যদি কোন জমিদার তাঁহার এলাকার মধ্যে পূর্ববর্ণিত রূপ কোন বোট তৈরী করিতে বা মেরামত করিতে দেন (জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত আদেশ ব্যতীত), তবে তাহা গবর্ণমেণ্ট বাজেয়াপ্ত করিতে পারিবেন।
“যদি কোন সূত্রধর, কর্মকার বা অন্য কোন প্রকার শিল্পী এইরূপে বোট নির্মাণ বা মেরামত কার্যে নিযুক্ত থাকে (জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত), তবে তাহাকে একমাস পর্যন্ত ফৌজদারী জেলে অবরুদ্ধ করা হইবে অথবা ২০ ঘা পর্যন্ত বেত্রদণ্ড দেওয়া যাইতে পারিবে।
“সপরিষৎ গবর্ণর জেনারেলের আদেশ অনুসারে।”
এই সরকারী বিজ্ঞপ্তির অর্থ সুস্পষ্ট।
বশংবদ,
জনৈক পাঠক।”
এইরূপ লোমহর্ষণ আদেশ বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্তি হয় না, কিন্তু ইহা ঐতিহাসিক সত্য। কোন সভ্য দেশের গবর্ণমেণ্টের ইতিহাসে এরূপ নিষ্ঠুর আদেশের তুলনা নাই।
ইহার অর্থ সুম্পষ্ট। “যতদিন ব্রিটিশ শাসন ও ব্রিটিশ বণিকদের মধ্যে অসাধু স্বার্থের বন্ধন ছিন্ন না হইবে, যতদিন গবর্ণমেণ্টের নীতি পরিবর্তিত না হইবে এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের ইঙ্গিতে তাঁহারা ভারতের অনিষ্টসাধন হইতে বিরত না হইবেন, ততদিন ভারতীয় বাণিজ্যপোত পুনর্গঠনের কোন আশা নাই।”—আবদুল বারি চৌধুরী।
অবৈধ বিদেশী প্রতিযোগিতা এবং বিদেশী শাসকদের সহানভূতি-শূন্য ব্যবহার ব্যতীত আমাদের স্বদেশী শিল্পের বিফলতার আর একটি কারণ, নিজেদের মধ্যেই অনিষ্টকর প্রতিযোগিতা। আমি নিজের অভিজ্ঞতায় দেখিয়াছি যে, যখনই কোন স্বদেশী শিল্প প্রবর্তিত হয় এবং নানা বাধা বিঘ্নের সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া বাঁচিতে চেষ্টা করে, তখনই আমাদের দেশের লোকেরা উহার অনুকরণ করিয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে রাতারাতি ঐ শ্রেণীর বহু ব্যবসা ফাঁদিয়া বসে। ফলে পরস্পর জিনিষের দর কমাইয়া পাল্লা দিতে থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, বঙ্গীয় ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীকে বহু দেশীয় মোটর লঞ্চ এবং ষ্টীমারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতে হইয়াছে। ঐ সব মোটর লঞ্চ ও ষ্টীমার অন্য অনেক নদীতে ব্যবসা চালাইতে পারিত এবং তাহাতে লাভও হইত; কিন্তু তাহা তাহারা করে নাই। ফলে ঐ সব ব্যবসা ফেল পড়িয়া গিয়াছে এবং আমাদের কোম্পানীরও বহু লোকসান করিয়াছে। বাঙালীর প্রতি বিধাতার যেন চির অভিশাপ আছে, উপযুক্ত কর্মশক্তি, বুদ্ধি ও প্রেরণার অভাবে, তাহারা পুরাতন ছাড়িয়া নূতন কোন পথ অবলম্বন করিতে পারে না, এবং তাহার ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাঙালীই বাংলার প্রধান শত্রু হইয়া দাঁড়ায়।
- ↑ কোম্পানীর জনৈক বড় অংশীদার (তাঁহার অংশের মূল্য প্রায় ৮০ হাজার টাকা) একজন ইংরাজ ভদ্রলোক ডিরেক্টর বোর্ডের জনৈক সদস্যকে লিখিয়াছেন— “L.—আমাকে অনুগ্রহ পূর্বক লিখিয়াছেন, কোম্পানীর জন্য আপনাদিগকে কিরূপ বিপদের মধ্যে পড়িতে হইয়াছে এবং আপনারা কিরূপে তাহার সম্মুখীন হইয়াছেন। আমরা, অংশীদারেরা দূর হইতে আপনাদের কৃতকার্যের জন্য নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিব। আমি নিজে আপনাদিগকে অশেষ ধন্যবাদ দিতেছি। আপনারা যে শেষ পর্যন্ত সাফল্য লাভ করিবেন, এই দৃঢ় বিশ্বাস আমার আছে। আমাদের বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয় যে, আমরা আপনাকে পাইয়াছি। এমন আর একজন ব্যক্তিও নাই যাঁহার বুদ্ধি ও মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আছে। আপনারা যদি ব্যবসায়ের অবস্থা ভাল না করিতে পারেন, তবে তাহা আশ্চর্যের বিষয় হইবে।
এই ইংরাজ অংশীদার সরকারী কাজ হইতে অবসর গ্রহণের পর ব্যবসায়টির উন্নতির জন্য সমস্ত সময় ও শক্তি ব্যয় করিতেছেন। অ-ব্যবসায়ী হইলেও তিনি এই শিল্পটির সম্বন্ধে সমস্ত বিষয় শিক্ষা করিয়াছেন। গত দেড় বৎসর হইল, তিনি প্রত্যহ নিয়মিত ভাবে ১০টা হইতে ৬টা পর্যন্ত বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিতেছেন। পটারীর ব্যবসায়টিকে সফল করিয়া তোলাই তাঁহার একমাত্র চিন্তা। একজন অংশীদারের পক্ষে এরূপ নিঃস্বার্থভাবে কাজ করিবার দৃষ্টান্ত দুর্লভ এবং সকলেরই অনুকরণযোগ্য। - ↑ ব্রিটিশ সরকারী বেতারবার্তার ৯ই জুন, ১৯২৯ তারিখের সংবাদে প্রকাশ:—“পার্লামেণ্টের কমন্সসভা গতকল্য এনামেল শিল্প সংরক্ষণের জন্য শতকরা ২৫% শুল্ক বসাইবার জন্য একটি প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছেন।”
বোর্ড অফ ট্রেডের প্রেসিডেণ্ট স্যার ফিলিপ কানলিফ লিস্টার বলেন যে, ১৯২২ সালে লয়েড জর্জের গবর্ণমেণ্ট প্রথম এই শুল্ক স্থাপন করেন। ১৯২৪ সালে এই শুল্কের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইলে দেখা গেল, বিদেশী পণ্যের আমদানী বাড়িয়াছে। কিন্তু ১৯২৬ সালে শিল্প সংরক্ষণ কমিটির বিবেচনার এই আমদানী বৃদ্ধির পরিমাণ পুনরায় শুল্ক বসাইবার পক্ষে যথেষ্ট বিবেচিত হইল না। কিন্তু—ঐ কমিটিই বর্তমানে শুল্ক বসাইবার দাবী গ্রাহ্য করিয়াছেন, কেননা তাঁহাদের সম্মুখে বিদেশী পণ্যের আমদানী সম্বন্ধে বহু নূতন তথ্য উপস্থিত করা হইয়াছিল। ইহা হইতে দেখা যায় যে এদেশের ১৮টি এনামেলের কারখানার মধ্যে ৬টিতেই লোকসান হইবার ফলে কাজ বন্ধ করিতে হইয়াছে।” একথা সত্য যে এনামেলের উপর শতকরা ১৫% আমদানী শুল্ক আছে। কিন্তু ইহাতে কোন ফল হয় না, কেননা এই শিল্প সংক্রান্ত যে সমস্ত রাসায়নিক দ্রব্য বিদেশ হইতে আমদানী করিতে হয়, তাহার উপরেও ঐ শুল্ক বসে। টাটার ইস্পাতের পাত এই শিল্পের একটি প্রধান উপকরণ। কিন্তু বিদেশ হইতে আমদানী ইস্পাতের পাতের চেয়ে টাটার ইস্পাতের মূল্য কম নয়। - ↑ রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়: Indian Shipping.
- ↑ উদয়াদিত্য ও মোগল সেনাপতির মধ্যে নৌযুদ্ধের বিবরণ সতীশচন্দ্র মিত্র কৃত যশোর খুলনার ইতিহাসে দ্রষ্টব্য।
- ↑ ১৭৩৬ খৃঃ হইতে ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত নিম্নলিখিত পার্শিগণ বোম্বাই সরকারী ডকইয়ার্ডে প্রধান জাহাজনির্মাতার কাজ করেন:—১৭৩৬—১৭৭৪ খৃঃ লাউজী, ১৭৭৪-— ১৭৮৩ খৃঃ মানিকজী ও বোমেনজী; ১৭৮৩—১৮০৫ খৃঃ ফ্র্যামজী ও জামসেঠজী; ১৮০৫—১৮১১ খৃঃ জামসেঠজী ও রতনজী; ১৮১১—১৮২১ খৃঃ জামসেঠজী ও নৌরজী; ১৮২১—১৮৩৭ খৃঃ— নৌরজী ও কারসেঠজী।
সিন্ধিয়া ষ্টীম ন্যাভিগেশান কোম্পানীর জাহাজ ‘জলবীরের’ উদ্বোধন উপলক্ষে কিছু দিন পূর্বে ডাঃ পরাঞ্জপে বলেন:—“এই উপলক্ষে যে সময়ে ভারত পোত শিল্পে প্রসিদ্ধ ছিল, সেই অতীতের গৌরব কাহিনী স্মরণ না করিয়া থাকিতে পারিতেছি না। সেই সব দিনের কথা লোকে বিস্মৃত হইয়াছে। কিন্তু একশত বৎসর পূর্বেও ভারতের নানা স্থানে বিলাতের চেয়েও ভাল জাহাজ নির্মিত হইত। ১৮০২ খৃষ্টাব্দে ইংলণ্ডের সরকারী নৌবিভাগ বোম্বাই বন্দরে একখানি যুদ্ধ জাহাজ তৈরী করিবার ফরমাইজ দিয়াছিলেন। ব্রিটিশ নৌবিভাগের কর্তারা ইয়োরোপীয় জাহাজ নির্মাতাগণকে পাঠাইতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু বোম্বাইয়ের জাহাজ নির্মাতা জামসেঠজী ওয়াদিয়ার কৃতিত্ব জানা থাকাতে তাঁহারা তাঁহাকেই প্রধান নির্মাতা রূপে মনোনীত করেন। প্রায় এক শত বৎসরকাল ওয়াদিয়া বংশের নাম জাহাজ শিল্পের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে পোতশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র রূপে বোম্বাই বন্দরের নাম লুপ্ত হইল।” - ↑ উইহারা: Industry and Trade of Japan.