আত্মশক্তি/দেশীয় রাজ্য

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

అను রবীন্দ্র-রচনাবলী নিত্রার সহায়তা কেহ করিয়ো না— আরাম আমাদের জন্য নহে, পরবশতার অহিফেনের মাত্রা প্রতিদিন আর বাড়িতে দিয়ে না— বিধাতার রুদ্রমূর্তিই আজ আমাদের পরিত্রাণ ! জগতে জড়কে সচেতন করিয়া তুলিবার এইমাত্র উপায় আছে— আঘাত, অপমান ও অভাব ; সমাদর নহে, সহায়তা নহে, স্বভিক্ষা নহে। ব্ৰত ধারণ কোনো স্ত্রীসমাজে জনৈক মহিল-কতৃক পঠিত আজ এই স্ত্রীসমাজে আমি যে উপদেশ দিতে উঠিয়াছি বা আমার কোনো নূতন কথা বলিবার আছে, এমন অভিমান আমার নাই । আমার কথা নূতন নহে বলিয়াই, কাহাকেও উপদেশ দিতে হইবে না বলিয়াই, আমি আজ সমস্ত সংকোচ পরিহার করিয়া আপনাদের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়াছি। যে-কথাটি আজ দেশের অস্তরে অস্তরে সর্বত্র জাগ্রত হইয়াছে, তাহাকেই নারীসমাজের নিকট সুস্পষ্টরূপে গোচর করিয়া তুলিবার জন্যই আমাদের অন্তকার এই উদযোগ । আমাদের দেশে সম্প্রতি একটি বিশেষ সময় উপস্থিত হইয়াছে, তাহা আমর। সকলেই অনুভব করিতেছি । অল্পদিনের মধ্যে আমাদের দেশ আঘাতের পর আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছে । হঠাৎ বুঝিতে পারিয়াছি যে, আমাদের যাত্রাপথের দিকৃপরিবর্তন করিতে হইবে । যে-সময়ে এইরূপ দেশব্যাপী আঘাতের তাড়না উপস্থিত হইয়াছে, যে-সময়ে আমাদের সকলেরই হৃদয় কিছু না কিছু চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, সেই সময়কে যদি আমরা উপেক্ষা করি তবে বিধাতার প্রেরণাকে অবজ্ঞা করা হইবে । # ইহাকে দুৰ্যোগ বলিব কি। এই-যে দিগ দিগন্তে ঘন মেঘ করিয়া শ্রাবণের অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল, এই-ষে বিদ্যুতের আলোক এবং বঞ্জের গর্জন আমাদের হৃৎপিণ্ডকে চকিত করিয়া তুলিতেছে, এই-যে জলধারাবর্ষণে পৃথিবী ভাসিয়া গেল— এই দুৰ্যোগকেই যাহারা স্থযোগ করিয়া তুলিয়াছে তাহারাই পৃথিবীর অন্ন জোগাইবে । এখনই স্কন্ধে হল লইয়া কৃষককে কোমর বাধিতে হইবে । এই সময়টুকু যদি অতিক্রম করিতে দেওয়া হয় তবে সমস্ত বৎসর দুভিক্ষ এবং হাহাকার । আমাদের দেশেও সম্প্রতি ঈশ্বর দুর্যোগের বেশে যে-স্থযোগকে প্রেরণ করিয়াছেন তাহাকে নষ্ট হইতে দিব না বলিয়াই আজ আমাদের সামান্ত শক্তিকেও যথাসম্ভব সচেষ্ট অাত্মশক্তি \9 S করিয়া তুলিয়াছি । যে এক বেদনার উত্তেজনায় আমাদের সকলের চেতনাকে উংস্থক করিয়া তুলিয়াছে, আজ সেই বিধাতার প্রেরিত বেদনাদূতকে প্রশ্ন করিয়া আদেশ জানিতে হইবে, কর্তব্য স্থির করিতে হুইবে । নিজেকে ভুলাইয়া রাখিবার দিন আর আমাদের নাই । বড়ো দুঃখে আজ আমাদিগকে বুঝিতে হইয়াছে যে, আমাদের নিজের সহায় আমরা নিজেরা ছাড়া আর কেহ নাই। এই সহজ কথা যাহারা সহজেই না বুঝে, অপমান তাহাদিগকে বুঝায়, নৈরাপ্ত তাহাদিগকে বুঝায় । তাই আজ দায়ে পড়িয়া আমাদিগকে বুঝিতে হইয়াছে যে, ভিক্ষায়াং নৈৰ নৈব চ’। আজ আসন্নবিচ্ছেদশঙ্কিত বঙ্গভূমিতে দাড়াইয়া বাঙালি এ-কথা স্বম্পষ্ট বুঝিয়াছে যে, যেখানে স্বার্থের অনৈক্য, যেখানে শ্রদ্ধার অভাব, যেখানে রিক্ত ভিক্ষার ঝুলি ছাড়া আর কোনোই বল বা সম্বল নাই, সেখানে ফললাভের আশা কেবল যে বিড়ম্বনা তাহা নহে, তাহা লাঞ্ছনার একশেষ । এই আঘাত আবার একদিন হয়তো সহ হইয়া যাইবে— অপমানে যাহা শিখিয়াছি তাহা হয়তো আবার ভুলিয়া গিয়া আবার গুরুতর অপমানের জন্য প্রস্তুত হইব। যে দুর্বল, নিশ্চেষ্ট, তাহার ইহাই দুর্ভাগ্য— দুঃখ তাহাকে দুঃখই দেয়, শিক্ষা দেয় না । আজ সেই শঙ্কায় ব্যাকুল হইয়া সময় থাকিতে এই দুঃসময়ের দান গ্রহণ করিবার জন্য আমরা একত্র হইয়াছি । কোথায় আমরা আপনারা আছি, কোথায় আমাদের শক্তি এবং কোন দিকে আমাদের অসম্মান ও প্রতিকূলতা, আজ দৈবকৃপায় যদি তাহা আমাদের ধারণা হইয়া থাকে, তবে কেবল তাহাকে ক্ষীণ ধারণার মধ্যে রাথিয়া দিলে চলিবে না । কারণ, শুদ্ধমাত্র ইহাকে মনের মধ্যে রাখিলে ক্রমে ইহা কেবল কথার কথা এবং অবশেষে একদিন ইহা বিস্মৃত ও তিরোহিত হইয়া যাইবে । ইহাকে চিরদিনের মতো আমাদিগকে মনে গাঁথিতে এবং কাজে খাটাইতে হইবে । ইহাকে ভুলিলে আমাদের কোনোমতেই চলিবে না— তাহা হইলে আমরা মরিব । কাজে খাটাইতে হইবে । কিন্তু আমরা স্ত্রীলোক— পুরুষের মতো আমাদের কার্যক্ষেত্র বাহিরে বিস্তৃত নহে । জানি না, আজিকার দুদিনে আমাদের পুরুষেরা কী কাজ করিতে উদ্যত হইয়াছেন । জানি না, এখনো তাহারা যথার্থ মনের সঙ্গে বলিতে পারিয়াছেন কি না যে,— অশোর ছলনে ভুলি কি ফল লভিক্ষু, ছায়, एछाई लांबि भरन ! لاچ۱ ----وی\ ७३१ রবীন্দ্র-রচনাবলী ষে নিৰ্জীৰ, যে সহজ পথ খুজিয়া আপনাকে ভুলাইয়া রাখিতেই চায়, তাহাকে জুলাইবার জন্ত আশাকে অধিক বেশি ছলনা বিস্তার করিতে হয় না। সে হয়তো এখনো মনে করিতেছে, যদি এখানকার রাজার হইতে ভিক্ষুককে তাড়া খাইতে হয়, তৰে ভিক্ষার ঝুলি ঘাড়ে করিয়া সমুদ্রপারে যাইতে হইবে । সমুদ্রের এ-পারেই কি আর ও-পারেই কি, অনন্যশরণ কাঙাল সেই একই চরণ আশ্রয় করিয়াছে । কিন্তু এ-দশা আমাদের পুরুষদের মধ্যে সকলের নহে— তাহাজের বহুদিনের বিশ্বাসক্ষেত্রে ভূমিকম্প উপস্থিত হইয়াছে, তাহদের ভক্তি টলিয়াছে, তাহাদের আশা খিলালে-খিলানে ফাটিয়া ফাক হইয়া গেছে— এখন তাহারা ভাৰিতেছেন, ইহার চেয়ে নিজের দীনহীন কুটির আশ্রয় করাও নিরাপদ। এখন তাই সমস্ত দেশের মধ্যে নিজের শক্তিকে অবলম্বন করিবার জন্য একটা মৰ্মভেদী আহবান উঠিয়াছে । এই আহবানে যে পুরুষেরা কী ভাবে সাড়া দিবেন তাহা জানি না— কিন্তু আমাদের অস্তঃপুরেও কি এই আহবান প্রবেশ করে নাই । আমরা কি আমাদের মাতৃভূমির কস্তা নহি । দেশের অপমান কি আমাদের অপমান নহে। দেশের দুঃখ কি আমাদের গৃহপ্রাচীরের পাষাণ ভেদ করিতে পারিবে না । ভগিনীগণ, আপনারা হয়তো কেহ কেহ জিজ্ঞাসা করিবেন, আমরা স্ত্রীলোক, আমরা কী করিতে পারি— দুঃখের দিনে নীরবে অশ্রুবর্ষণ করাই আমাদের সম্বল । এ-কথা আমি স্বীকার করিতে পারিব না। আমরা যে কী না করিতেছি, তাই দেখুন। আমরা পরনের শাড়ি কিনিতেছি বিলাত হইতে, আমাদের অনেকের ভূষণ জোগাইতেছে হামিণ্টন, আমাদের গৃহসজ্জা বিলাতি দোকানের, আমরা শয়নে স্বপনে বিলাতের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া আছি । আমরা এতদিন আমাদের জননীর অন্ন কাড়িয়া তাহার ভূষণ ছিনাইয়া বিলাত-দেবতার পায়ে রাশি রাশি অর্ঘ্য জোগাইতেছি । আমরা লড়াই করিতে যাইব না, আমরা ভিক্ষা করিতেও ফিরিব না, কিন্তু আমরা কি এ-কথা বলিতে পারিব না যে, “না, আর নয়— আমাদের এই অপমানিত উপবাসক্লিষ্ট মাতৃভূমির অল্পের গ্রাস বিদেশের পাতে তুলিয়া দিয়া তাহার পরিবর্তে আমাদের বেশভূষার শখ মিটাইব না ? আমরা ভালো হউক, মন্দ হউক, দেশের কাপড় পরিব, দেশের জিনিস ব্যবহার করিব।” ভগিনীগণ, সৌন্দর্যচর্চার দোহাই দিবেন না ! সৌন্দর্যবোধ অতি উত্তম পদার্থ, কিন্তু তাহার চেয়েও উচ্চ জিনিস আছে । আমি এ-কথা স্বীকার করিব না, যে, দেশী জিনিসে আমাদের সৌন্দর্যবোধ ক্লিষ্ট হইবে ; কিন্তু যদি শিক্ষা ও অভ্যাসক্রমে আমাদের সেই রূপই ধারণা হয়, তবে এই কথা বলিব, সৌন্দর্যবোধকেই সকলের চেয়ে বড়ো আত্মশক্তি ఆసిరి করিবার দিন আজ নহে— সন্তান যখন দীর্ঘকাল রোগশয্যায় শায়িত তখন জননী বেনারসি শাড়িখানা বেচিয়া তাহার চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে কুষ্ঠিত হন না— তখন কোথায় থাকে সৌন্দর্যবোধের দাবি ? জানি, আমাকে অনেকে বলিবেন, কথাটা বলিতে যত সহজ করিতে তত সহজ নহে । আমাদের অভ্যাস, আমাদের সংস্কার, আমাদের আরামস্থহ, আমাদের সৌন্দর্যবোধ— ইহাদিগকে ঠেলিয়া নড়ানো বড়ো কম কথা নহে। নিশ্চয়ই তাহা নহে। ইহা সহজ নহে, ইহার চেয়ে একদিনের মতো চাদার খাতায় সহি দেওয়া সহজ । কিন্তু বড়ো কাজ সহজে হয় না। যখন সময় আসে তখন ধর্মের শঙ্খ বাজিয়া উঠে, তখন যাহা কঠিন তাহাকেই বরণ করিয়া লইতে হয় । বস্তুত, তাহাতেই আনন্দ,—সহজ নহে বলিয়াই আনন্দ, দুঃসাধ্য বলিয়াই মুখ । আমরা ইতিহাসে পড়িয়াছি, যুদ্ধের সময় রাজপুত মহিলারা অঙ্গের ভূষণ, মাথার কেশ দান করিয়াছে ; তখন স্থবিধা বা সৌন্দর্যচর্চার কথা ভাবে নাই—ইহা হইতে আমরা এই শিখিয়াছি যে, জগতে স্ত্রীলোক যদি বা যুদ্ধ না করিয়া থাকে, ত্যাগ করিয়াছে ; সময় উপস্থিত হইলে ভূষণ হইতে প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে কুষ্ঠিত হয় নাই। কর্মের বীর্ষ অপেক্ষা ত্যাগের বীর্ষ কোনো অংশেই নূ্যন নহে। ইহা যখন ভাবি তখন মনে এই গৌরব জন্মে যে, এই বিচিত্রশক্তিচালিত সংসারে স্ত্রীলোককে লজ্জিত হইতে হয় নাই ; স্ত্রীলোক কেবল সৌন্দর্য দ্বারা মনোহরণ করে নাই, ত্যাগের দ্বারা শক্তি দেখাইয়াছে । আজ আমাদের বঙ্গদেশ রাজশক্তির নির্দয় আঘাতে বিক্ষত হইয়াছে, আজ বঙ্গরমণীদের ত্যাগের দিন। আজ আমরা ব্রতগ্রহণ করিব। আজ আমরা কোনো ক্লেশকে ডরিব না, উপহাসকে অগ্রাহ করিব, আজ আমরা পীড়িত জননীর রোগশয্যায় বিলাতের সাজ পরিয়া শৌখিনতা করিতে যাইব না। দেশের জিনিসকে রক্ষা করা, এও তো রমণীর একটা বিশেষ কাজ । আমরা ভালোবাসিতে জানি । ভালোবাসা চাকচিক্যে ভুলিয়া নূতনের কুহকে চারিদিকে ধাবমান হয় না। আমাদের যাহা অাপন, সে স্বত্র হউক আর কুত্ৰ হউক, নারীর কাছে অনাদর পায় না— সংসার তাই রক্ষা পাইতেছে । একবার ভাবিয়া দেখুন, আজ যে বঙ্গসাহিত্য বলিষ্ঠভাবে অসংকোচে মাথা তুলিতে পারিয়াছে, একদিন শিক্ষিত পুরুষসমাজে ইহার অবজ্ঞার সীমা ছিল না। তখন পুরুষের বাংলা বই কিনিয়া লজ্জার সহিত কৈফিয়ত দিতেন যে, আমরা পড়িব না, বাড়ির ভিতরে মেয়েরা পড়িবে। আচ্ছা আচ্ছ, তাহাদের সে-লজার ভার আমরাই বহন ७२8 রবীন্দ্র-রচনাবলী করিয়াছি, কিন্তু ত্যাগ করি নাই। আজ তো সে-লজ্জার দিন ঘুচিয়াছে ! মে বাড়ির ভিতরে মেয়েদের কোলে বাংলাদেশের শিশুসস্তানেরা— তাহার কালোই হউক আর ধলোই হউক— পরম আদরে মানুষ হইয়া উঠিতেছে, বঙ্গসাহিত্যও সেই বাড়ির ভিতরে মেয়েদের কোলেই তাহার উপেক্ষিত শিশু-অবস্থা যাপন করিয়াছে, অল্পবস্ত্রের দুঃখ পায় নাই । একবার ভাবিয়া দেখুন, যেখানে বাঙালি পুরুষ বিলাতি কাপড় পরিয়া সর্বত্র নিঃসংকোচে আপনাকে প্রচার করিতেছেন সেখানে তাহার স্ত্রীকস্তাগণ বিদেশী বেশ ধারণ করিতে পারেন নাই। স্ত্রীলোক যে উৎকট বিজাতীয় বেশে আপনাকে সজ্জিত করিয়া বাহির হইবে, ইহা আমাদের স্ত্রীপ্রকৃতির সঙ্গে এতই একান্ত অসংগত যে, বিলাতের মোহে আপাদমস্তক বিকাইয়াছেন যে-পুরুষ তিনিও আপন স্ত্রীকন্যাকে এই ঘোরতর লজ্জা হইতে রক্ষা করিয়াছেন । এই রক্ষণপালনের শক্তি স্ত্রীলোকের অন্তরতম শক্তি বলিয়াই দেশের দেশীয়ত্ব স্ত্রীলোকের মাতৃক্রোড়েই রক্ষা পায়। নূতনত্বের বস্তায় দেশের অনেক জিনিস, ষাহ পুরুষ-সমাজ হইতে ভাসিয়া গেছে, তাহ আজও অন্তঃপুরের নিভৃত কক্ষে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আছে। এই বন্যার উপদ্রব একদিন যখন দূর হইবে তখন নিশ্চয়ই তাহাদের খোজ পড়িবে এবং দেশ রক্ষণপটু স্নেহশীল নারীদের নিকট কৃতজ্ঞ হইবে । । অতএব, আজ আমরা যদি আর-সমস্ত বিচার ত্যাগ করিয়া দেশের শিল্প, দেশের সামগ্রীকে অবিচলিত নিষ্ঠার সহিত রক্ষা করি, তবে তাহাতে নারীর কর্তব্যপালন করা হইবে । আমার মনে এ-আশঙ্কা আছে যে, আমাদের মধ্যেও অনেকে অবজ্ঞাপূর্ণ উপহাসের সহিত বলিবেন, “তোমরা কয়জনে দেশী জিনিস ব্যবহার করিবে প্রতিজ্ঞা করিলেই অমনি নাকি ম্যাঞ্চেস্টর ফতুর হইয়া যাইবে এবং লিভারপুর বাসায় গিয়া মরিয়া থাকিবে ।” সে-কথা জানি । ম্যাঞ্চেস্টরের কল চিরদিন ফুলিতে থাক, রাবণের চিতার ন্যায় লিভারপুলের এঞ্জিনের আগুন না নিভুক ! আমাদের অনেকে আজকাল যে বিলাতির পরিবর্তে দেশী জিনিস ব্যবহার করিতে ব্যগ্র হইয়াছেন, তাহার কারণ এ নয় যে, র্তাহারা বিলাতকে দেউলে করিয়া দিতে চান। বস্তুত, আমাদের এই-বে চেষ্টা ইহা কেবল আমাদের মনের ভাবকে বাহিরে মূর্তিমান করিয়া রাখিবার চেষ্টা। আমরা সহজে না হউক, অন্তত বারংবার আঘাতে ও অপমানে পরের বিরুদ্ধে নিজেকে যে বিশেষভাবে আপন বলিয়া জানিতে উৎসুক হইয়া উঠিয়াছি, সেই ঔৎসুক্যকে যে কায়েমনে-বাক্যে প্রকাশ করিতে হইবে— নতুবা দুই দিনেই তাহা যে বিশ্বত ও ব্যর্থ হইয়া আত্মশক্তি ૭૨૯ ধাইবে । আমাদের মন্ত্রও চাই, চিহ্নও চাই । আমরা অস্তরে স্বদেশকে বরণ করিব এবং বাহিরে স্বদেশের চিহ্ন ধারণ করিব । বিদেশীয় রাজশক্তির সহিত আমাদের স্বাভাবিক পার্থক্য ও বিরোধ ক্রমশই স্বম্পষ্টরূপে পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। আজ আর ইহাকে ঢাকিয়া রাখিবে কে । রাজাও পারিলেন না, আমরাও পারিলাম না। এই বিরোধ ষে ঈশ্বরের প্রেরিত । এই বিরোধ ব্যতীত আমরা প্রবলরূপে, যথার্থরূপে আপনাকে লাভ করিতে পারিতাম না। আমরা যতদিন প্রসাদভিক্ষার আশে একান্তভাবে এই-সকল বিদেশীর মুখ চাহিয়া থাকিতাম ততদিন আমরা উত্তরোত্তর আপনাকে নিঃশেষভাবে হারাইতেই থাকিতাম । আজ বিরোধের আঘাতে বেদনা পাইতেছি, অস্ববিধা ভোগ করিতেছি, সকলই সত্য, কিন্তু নিজেকে বিশেষভাবে উপলব্ধি করিবার পথে দাড়াইয়াছি। যতদিন পর্যন্ত এই লাভ সম্পূর্ণ না হইবে ততদিন পর্যন্ত এই বিরোধ ঘুচিবে না ; যতদিন পর্যন্ত আমরা নিজশক্তিকে আবিষ্কার না করিব, ততদিন পর্যন্ত পরশক্তির সহিত আমাদের সংঘর্ষ চলিতে থাকিবেই। যে আপনার শক্তিকে খুজিয়া পায় নাই, যাহাকে নিরুপায়ভাবে পরের পশ্চাতে ফিরিতে হয়, ঈশ্বর করুন, সে যেন আরাম ভোগ না করে— সে যেন অহংকার অনুভব না করে ! অপমান ও ক্লেশ তাহাকে সর্বদা যেন এই কথা স্মরণ করাইতে থাকে যে, “তোমার নিজের শক্তি নাই, তোমাকে ধিক্ !” আমরা যে অপমানিত হইতেছি, ইহাতে বুঝিতে হইবে, ঈশ্বর এখনো আমাদিগকে ত্যাগ করেন নাই । কিন্তু আমরা আর বিলম্ব যেন না করি। আমরা নিজেকে ঈশ্বরের এই অভিপ্রায়ের অমুকুল যেন করিতে পারি। আমরা যেন পরের অনুকরণে আরাম এবং পরের বাজারে কেনা জিনিসে গৌরববোধ না করি। বিলাতি আসবাব পরিত্যাগ করিয়া আমাদের যদি কিছু কষ্ট হয়, তবে সে কষ্টই আমাদের মন্ত্রকে ভুলিতে দিবে না। সেই মন্ত্রটি এই— সৰ্বং পরবশং দুঃখং সর্বমাত্মবশং মুখম্। - 噸 যাহা-কিছু পরবশ, তাহাই দুঃখ , বাহা-কিছু আত্মবশ, তাহাই সুখ । আমাদের দেশের নারীগণ আত্মীয়স্বজনের আরোগ্যকামনা করিয়া দীর্ঘকালের জন্য কৃচ্ছত্রত গ্রহণ করিয়া আসিয়াছেন। নারীদের সেই তপঃসাধন বাঙালির সংসারে যে নিষ্ফল হইয়াছে, তাহা আমি মনে করি না। আজ আমরা দেশের নারীগণ দেশের জন্য যদি সেইরূপ ব্রত গ্রহণ করি, যদি বিদেশের বিলাস দৃঢ় নিষ্ঠার সহিত পরিত্যাগ করি, তবে আমাদের এই তপস্তায় দেশের মঙ্গল হইবে— তবে এই স্বস্ত্যয়নে আমরা পুণ্যলাভ করিব এবং আমাদের পুরুষগণ শক্তি লাভ করিবেন। ब्ररौटण-ब्रळ्नांबलौ ولاډول দেশীয় রাজ্য দেশভেদে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক অবস্থার প্রভেদ হইয়া থাকে, এ-কথা সকলেই জানেন । সেই ভেদকে স্বীকার না করিলে কাজ চলে না। যাহারা বিলখালের মধ্যে থাকে তাহারা মৎসব্যবসায়ী হইয়া উঠে ; যাহারা সমুদ্রতীরের বন্দরে থাকে তাহারা দেশবিদেশের সহিত বাণিজ্যে প্রবৃত্ত হয় ; যাহারা সমতল উর্বরা ভূমিতে বাস করে তাহারা কৃষিকে উপজীবিকা করিয়া তোলে। মরুপ্রায় দেশে যে আরব বাস করে তাহাকে যদি অন্তদেশবাসীর ইতিহাস শুনাইয়া বলা যায় যে, কৃষির সাহায্য ব্যতীত উন্নতিলাভ করা যায় না, তবে সে-উপদেশ ব্যর্থ হয় এবং কৃষিযোগ্য স্থানের অধিবাসীর নিকট ঘদি প্রমাণ করিতে বসা যায় যে, মৃগয়া এবং পশুপালনেই সাহস ও বীর্ষের চর্চা হইতে পারে, কৃষিতে তাহা নষ্টই হয়, তবে সেইরূপ নিস্ফল উত্তেজনা ८कदल अनिहेझे घüांग्न । বস্তুত, ভিন্ন পথ দিয়া ভিন্ন জাতি ভিন্ন শ্রেণীর উৎকর্ষ লাভ করে এবং সমগ্র মানুষের সর্বাঙ্গীণ উন্নতিলাভের এই একমাত্র উপায় । যুরোপ কতকগুলি প্রাকৃতিক স্থবিধাবশত যে বিশেষপ্রকারের উন্নতির অধিকারী হইয়াছে, আমরা যদি ঠিক সেই প্রকার উন্নতির জন্য ব্যাকুল হইয়া উঠি তবে নিজেকে ব্যর্থ ও বিশ্বমানবকে বঞ্চিত করিব। কারণ, আমাদের দেশের বিশেষ প্রকৃতি-অনুসারে আমরা মচুন্যত্বের যে-উৎকর্ষ লাভ করিতে পারি, পরের বৃথা অমুকরণ-চেষ্টায় তাহাকে নষ্ট করিলে এমন একটা জিনিসকে নষ্ট করা হয় যাহা মানুষ অন্য কোনো স্থান হইতে পাইতে পারে না। স্বতরাং, বিশ্বমানব সেই ংশে দরিদ্র হয়। চাষের জমিকে খনির মতো ব্যবহার করিলে ও খনিজের জমিকে কৃষিক্ষেত্রের কাজে লাগাইলে মানব-সভ্যতাকে ফাকি দেওয়া হয় । যে কারণেই হউক, যুরোপের সঙ্গে ভারতবর্ষের কতকগুলি গুরুতর প্রভেদ আছে । উৎকট অনুকরণের দ্বারা সেই প্রভেদকে দূর করিয়া দেওয়া যে কেবল অসম্ভব তাহ নহে, দিলে তাহাতে বিশ্বমানবের ক্ষতি হইবে। আমরা যখন বিদেশের ইতিহাস পড়ি বা বিদেশের প্রতাপকে প্রত্যক্ষ চক্ষে দেখি তখন নিজেদের প্রতি ধিক্কার জন্মে—তখন বিদেশীর সঙ্গে আমাদের ষে যে বিষয়ে পার্থক্য দেখিতে পাই সমস্তই আমাদের অনর্থের হেতু বলিয়া মনে হয়। কোনো অধ্যাপকের অর্বাচীন বালক-পুত্র যখন সার্কাস দেখিতে যায়, তাহার মনে হইতে পারে যে, এমনি করিয়া ঘোড়ার পিঠের উপরে দাড়াইয়া লাফালাফি করিতে যদি শিখি এবং আত্মশক্তি ৬২৭ मर्थकनालव्र दांश्यां त्रfई, डट्रुझे खौदन मॉर्षक झग्न । डांशंद्र निऊांद्र लांख्रिभग्न कांज তাহার কাছে অত্যন্ত নিজাব ও নিরর্থক বলিয়া মনে হয় । বিশেষ স্থলে পিতাকে ধিক্কার দিবার কারণ থাকিতেও পারে । সার্কাসের খেলোয়াড় যেরূপ অক্লান্ত সাধনা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা নিজের ব্যবসায়ে উৎকর্ষ লাভ করিয়াছে, সেইরূপ উদ্যম ও উদযোগের অভাবে অধ্যাপক যদি নিজের কর্মে উন্নতি লাভ না করিয়া থাকেন, তবেই তাহাকে লজ্জা দেওয়া চলে । যুরোপের সঙ্গে ভারতের পার্থক্য অনুভব করিয়া যদি আমাদের লজ্জা পাইতে হয়, তবে লজ্জার কারণটা ভালো করিয়া বিচার করিতে হয়, নতুবা যথার্থ লজ্জার মূল কখনোই উৎপাটিত হইবে না। যদি বলি ষে, ইংলণ্ডের পার্লামেণ্ট আছে, ইংলণ্ডের যৌথ কারবার আছে, ইংলণ্ডে প্রায় প্রত্যেক লোকই রাষ্ট্রচালনায় কিছু না কিছু অধিকারী, এইজন্য তাহারা বড়ো, সেইগুলি নাই বলিয়াই আমরা ছোটো, তবে গোড়ার কথাটা বলা হয় না। আমরা কোনো কৌতুকপ্রিয় দেবতার বরে যদি কয়েক দিনের জন্য মূঢ় আৰুহোসেনের মতো ইংরেজি মাহাক্সোর বাহ অধিকারী হই, আমাদের বন্দরে বাণিজ্যতরীর আবির্ভাব হয়, পার্লামেন্টের গৃহচূড়া আকাশ ভেদ করিয়া উঠে, তবে প্রথম অঙ্কের প্রহসন পঞ্চম অঙ্কে কী মৰ্মভেদী অশ্রপাতেই অবসিত হয় ! আমরা এ-কথা যেন কোনোমতেই না মনে করি যে পার্লামেণ্ট মানুষ গড়ে—বস্তুত মানুষই পালামেণ্ট গড়ে । মাটি সর্বত্রই সমান ; সেই মাটি লইয়া কেহ বা শিব গড়ে, কেহ বা বানর গড়ে ; যদি কিছু পরিবর্তন করিতে হয় তবে মাটির পরিবর্তন নহে,— যে ব্যক্তি গড়ে তাহার শিক্ষা ও সাধনা, চেষ্টা ও চিন্তার পরিবর্তন করিতে হইবে । এই ত্রিপুররাজ্যের রাজচিহ্নের মধ্যে একটি সংস্কৃতবাক্য অঙ্কিত দেখিয়াছি— কিল বিস্তুবীরতাং সারমেকং—বীর্ধকেই সার বলিয়া জানিবে । এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্য । পালামেণ্ট সার নহে, বাণিজ্যতরী সার নহে, বীর্ষই সার । এই বীর্ষ দেশকালপাত্রভেদে নানা আকারে প্রকাশিত হয়— কেহ বা শস্ত্রে বীর, কেহ বা শাস্ত্রে বীর, কেহ বা ত্যাগে বীর, কেহ বা ভোগে বীর, কেহ বা ধর্মে বীর, কেহ বা কর্মে বীর । বর্তমানে আমাদের ভারতবর্ষীয় প্রতিভাকে আমরা পূর্ণ উৎকর্ষের দিকে লইয়া যাইতে পারিতেছি না, তাহার কতকগুলি কারণ আছে, কিন্তু সর্বপ্রধান কারণ বীর্যের অভাব । এই বীর্ষের দারিদ্র্যবশত যদি নিজের প্রকৃতিকেই ব্যর্থ করিয়া থাকি তবে বিদেশের অনুকৃতিকে সার্থক করিয়া তুলিব কিসের জোরে ? : আমাদের আমবাগানে আজকাল অাম ফলে না, বিলাতের আপেলবাগানে প্রচুর আপেল ফলিয়া থাকে। আমরা কি তাই বলিয়া মনে করিব যে, আমগাছগুলা ઇરપ્ન. রবীন্দ্র-রচনাবলী কাটিয়া ফেলিয়া আপেল-গাছ রোপণ করিলে তবেই আমরা আশাতুরূপ ফললাভ করিব । এই কথা নিশ্চয় জানিতে হইবে, আপেল-গাছে যে বেশি ফল ফলিতেছে তাহার কারণ তাহার গোড়ায়, তাহার মাটিতে সার অাছে— আমাদের আমবাগানের खभिव्र नांब्र दहकांण रुहेल निःालविङ झ्झेब्रा ८१८छ् । श्रांप्नल शाहे ना, झेशहे আমাদের মূল দুর্ভাগ্য নহে ; মাটিতে সার নাই, ইহাই আক্ষেপের বিষয়। সেই সার যদি যথেষ্ট পরিমাণে থাকিত তবে আপেল ফলিত না, কিন্তু আম প্রচুর পরিমাণে ফলিত এবং তখন সেই আস্ত্রের সফলতায় আপেলের অভাব লইয়া বিলাপ করিবার কথা আমাদের মনেই হইত না । তখন দেশের আম বেচিয়া অনায়াসে বিদেশের আপেল হাটে কিনিতে পারিতাম, ভিক্ষার ঝুলি সম্বল করিয়া একরাত্রে পরের প্রসাদে বড়োলোক হইবার চুরাশা মনের মধ্যে বহন করিতে হইত না । আসল কথা, দেশের মাটিতে সার ফেলিতে হইবে । সেই সার আর কিছুই নহে— ‘কিল বিছুীরতাং সারমেকং, বীরতাকেই একমাত্র সার বলিয়া জানিবে। ঋষির বলিয়াছেন, ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ”— এই ষে আত্মা, ইনি বলহীনের দ্বারা লভ্য নহেন । বিশ্বাত্মা-পরমাত্মার কথা ছাড়িয়া দেওয়া যাক – যে-ব্যক্তি দুর্বল সে নিজের আত্মাকে পায় না, নিজের আত্মাকে যে-ব্যক্তি সম্পূর্ণ উপলব্ধি না করিয়াছে সে অপর কিছুকেই লাভ করিতে পারে না । যুরোপ নিজের আত্মাকে যে-পথ দিয়া লাভ করিতেছে সে-পথ আমাদের সম্মুখে নাই ; কিন্তু যে-মূল্য দিয়া লাভ করিতেছে তাহ আমাদের পক্ষেও অত্যাবশ্বক— তাহা বল, তাহা বীর্য । য়ুরোপ যে-কর্মের দ্বারা যে-অবস্থার মধ্যে আত্মাকে উপলব্ধি করিতেছে আমরা সেকর্মের দ্বারা সে-অবস্থার মধ্যে আত্মাকে উপলব্ধি করিব না— আমাদের সম্মুখে অন্য পথ, আমাদের চতুর্দিকে অন্যরূপ পরিবেষ, আমাদের অতীতের ইতিহাস অন্তরূপ, আমাদের শক্তির মূলসঞ্চয় অন্যত্র— কিন্তু আমাদের সেই বীর্ষ আবখ্যক যাহা থাকিলে পথকে ব্যবহার করিতে পারিব, পরিবেষকে অমুকুল করিতে পারিব, অতীতের ইতিহাসকে বর্তমানে সফল করিতে পারিব এবং শক্তির গৃঢ় সঞ্চয়কে আবিষ্কৃত-উদঘাটিত করিয়া তাহার অধিকারী হইতে পারিব। ‘নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যঃ”— আত্মা তো আছেই, কিন্তু বল নাই বলিয়া তাহাকে লাভ করিতে পারি না। ত্যাগ করিতে শক্তি নাই, দুঃখ পাইতে সাহস নাই, লক্ষ্য অনুসরণ করিতে নিষ্ঠা নাই ; রুশ সংকল্পের দৌর্বল্য, ক্ষীণ শক্তির আত্মবঞ্চনা, স্থখবিলাসের ভীরুতা, লোকলজ্জা, লোকভয় আমাদিগকে মুহুর্তে মুহূর্তে যথার্থভাবে আত্মপরিচয় আত্মলাভ আত্মপ্রতিষ্ঠা হইতে দূরে রাখিতেছে । সেইজন্যই ভিক্ষুকের মতো আমরা অপরের মাহায্যের প্রতি ঈর্ষ। আত্মশক্তি ૭૨૭ করিতেছি এবং মনে করিতেছি, বাহ অবস্থা যদি দৈবক্রমে অন্তের মতো হয় তৰেই আমাদের সকল অভাব, সকল লঙ্গ দূর হইতে পারে। বিদেশের ইতিহাস যদি আমরা ভালো করিয়া পড়িয়া দেখি তবে দেখিতে পাইব, মহত্ব কত বিচিত্র প্রকারের— গ্রীসের মহত্ব এবং রোমের মহত্ব একজাতীয় নহে— গ্রীস বিস্তা ও বিজ্ঞানে বড়ো, রোম কর্মে ও বিধিতে বড়ো। রোম তাহার বিজয়-পতাকা লইয়া যখন গ্রীসের সংস্রবে আসিল তখন বাহুবলে ও কর্মবিধিতে জয়ী হইয়াও বিদ্যাবুদ্ধিতে গ্রীসের কাছে হার মানিল, গ্রীসের কলাবিদ্যা ও সাহিত্য-বিজ্ঞানের অল্পকরণে প্রবৃত্ত হইল, কিন্তু তবু সে রোমই রহিল, গ্রীস হইল না— সে আত্মপ্রকৃতিতেই সফল হইল, অমুকুতিতে নহে— সে লোকসংস্থানকার্বে জগতের আদর্শ হইল, সাহিত্যবিজ্ঞান-কলাবিদ্যায় হইল না । i. ইহা হইতে বুঝিতে হইবে, উৎকর্ষের একমাত্র আকার ও একমাত্র উপায় জগতে নাই। আজ যুরোপীয় প্রতাপের যে-আদর্শ আমাদের চক্ষের সমক্ষে অভ্ৰভেদী হইয়া উঠিয়াছে, উন্নতি তাহা ছাড়াও সম্পূর্ণ অন্য আকারে হইতে পারে— আমাদের ভারতীয় উৎকর্ষের যে-অাদর্শ আমরা দেখিয়াছি তাহার মধ্যে প্রাণসঞ্চার বলসঞ্চার করিলে জগতের মধ্যে আমাদিগকে লজ্জিত থাকিতে হইবে না। একদিন ভারতবর্ষ জ্ঞানের দ্বারা ধর্মের দ্বারা চীন-জাপান, ব্রহ্মদেশ-শু্যামদেশ, তিববত-মঙ্গোলিয়া, এশিয়া মহাদেশের অধিকাংশই জয় করিয়াছিল ; আজ যুরোপ অস্ত্রের দ্বারা বাণিজ্যের দ্বারা পৃথিবী জয় করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে— আমরা ইস্কুলে পড়িয়া এই আধুনিক যুরোপের প্রণালীকেই যেন একমাত্র গৌরবের কারণ বলিয়া মনে না করি । কিন্তু ইংরেজের বাহুবল নহে– ইংরেজের ইস্কুল ঘরে-বাইরে, দেহে-মনে, আচারে বিচারে সর্বত্র আমাদিগকে আক্রমণ করিয়াছে । আমাদিগকে যে-সকল বিজাতীয় ংস্কারের দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছে তাহাতে অস্তত কিছুকালের জন্তও আমাদের আত্মপরিচয়ের পথ লোপ করিতেছে । সে-আত্মপরিচয় ব্যতীত আমাদের কখনোই আত্মোন্নতি হইতে পারে না । ভারতবর্ষের দেশীয় রাজ্যগুলির যথার্থ উপযোগিতা কী, তাহা এইবার বলিবার সময় উপস্থিত হইল । দেশবিদেশের লোক বলিতেছে, ভারতবর্ষের দেশীয় রাজ্যগুলি পিছাইয়া পড়িতেছে । জগতের উন্নতির যাত্রাপথে পিছাইয়া পড়া ভালো নহে, এ-কথা সকলেই স্বীকার করিবে, কিন্তু অগ্রসর হইবার সকল উপায়ই সমান মঙ্গলকর নহে। নিজের শক্তির দ্বারাই অগ্রসর হওয়াই যথার্থ অগ্রসর হওয়া— তাহাতে যদি মন্দগতিতে \ՉաԵ e &Oe রবীন্দ্র-রচনাবলা যাওয়া যায় তবে সেও ভালো । অপর ব্যক্তির কোলে-পিঠে চড়িয়া অগ্রসর হওয়ার কোনো মাহাত্ম্য নাই— কারণ, চলিবার শক্তিলাভই যথার্থ লাভ, অগ্রসর হওয়ামাত্রই লাভ নহে। ব্রিটিশ-রাজ্যে আমরা যেটুকু অগ্রসর হইতে পারিয়াছি তাহাতে আমাদের কৃতকাৰ্ধতা কতটুকু ! সেখানকার শাসনরক্ষণ-বিধিব্যবস্থা যত ভালোই হউক না কেন, তাহা তো বস্তুত আমাদের নহে। মানুষ ভুলত্রুটি-ক্ষতিক্লেশের মধ্য দিয়াই পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়। কিন্তু আমাদিগকে ভুল করিতে দিবার ধৈর্ষ যে ব্রিটিশ-রাজের নাই । স্বতরাং তাহারা আমাদিগকে ভিক্ষণ দিতে পারেন, শিক্ষণ দিতে পারেন না। র্তাহীদের নিজের যাহা অাছে তাহার সুবিধা আমাদিগকে দিতে পারেন, কিন্তু তাহার স্বত্ব দিতে পারেন না । মনে করা যাক, কলিকাতা মুনিসিপ্যালিটির পূর্ববর্তী কমিশনারগণ পৌরকার্ষে স্বাধীনতা পাইয়া যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখাইতে পারেন নাই, সেই অপরাধে অধীর হইয়া কতৃপক্ষ তাহাদের স্বাধীনতা হরণ করিলেন । হইতে পারে এখন কলিকাতার পৌরকার্ব পূর্বের চেয়ে ভালোই চলিতেছে, কিন্তু এরূপ ভালো চলাই যে সর্বাপেক্ষ ভালো, তাহা বলিতে পারি না । আমাদের নিজের শক্তিতে ইহা অপেক্ষা খারাপ চলাও আমাদের পক্ষে ইহার চেয়ে ভালো । আমরা গরিব এবং নানা বিষয়ে অক্ষম ; আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্য ধনী জ্ঞানী বিলাতের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত তুলনীয় নহে বলিয়া শিক্ষাবিভাগে দেশীয় লোকের কতৃত্ব খর্ব করিয়া রাজা যদি নিজের জোরে কেমব্রিজঅক্সফোর্ডের নকল প্রতিমা গড়িয়া তোলেন, তবে তাহাতে আমাদের কতটুকুই বা শ্ৰেয় আছে— আমরা গরিবের যোগ্য বিদ্যালয় যদি নিজে গড়িয়া তুলিতে পারি তবে সেই আমাদের সম্পদ। যে-ভালো আমার আয়ত্ত ভালো নহে সে-ভালোকে আমার মনে করাই মানুষের পক্ষে বিষম বিপদ । অল্পদিন হইল একজন বাঙালি ডেপুটিম্যাজিস্টেট দেশীয় রাজ্যশাসনের প্রতি নিতান্ত অবজ্ঞা প্রকাশ করিতেছিলেন– তখন স্পষ্টই দেখিতে পাইলাম, তিনি মনে করিতেছেন, ব্রিটিশ-রাজ্যের স্থব্যবস্থা সমস্তই যেন তাহাদেরই স্থব্যবস্থা ; তিনি যে ভারবাহীমাত্র, তিনি যে যন্ত্ৰী নহেন, যন্ত্রের একটা সামান্ত অঙ্গমাত্র, এ-কথা যদি তাহার মনে থাকিত তবে দেশীয় রাজ্যব্যবস্থার প্রতি এমন স্পর্ধার সহিত অবজ্ঞা প্রকাশ করিতে পারিতেন না। ব্রিটিশ-রাজ্যে আমরা যাহা পাইতেছি তাহা যে আমাদের নহে, এই সত্যটি ঠিকমতো বুঝিয়া উঠা আমাদের পক্ষে কঠিন হইয়াছে, এই কারণেই আমরা রাজার নিকট হইতে ক্রমাগত্তই নূতন নূতন অধিকার প্রার্থনা করিতেছি এবং ভুলিয়া যাইতেছি— অধিকার পাওয়া এবং অধিকারী হওয়া একই কথা নহে । च्यांग्रुअखि \ نعاجي ( দেশীয় রাজ্যের ভুলক্রটি-মন্দগতির মধ্যেও আমাদের সানার বিষয় এই যে, তাহাতে যেটুকু লাভ আছে তাহা বস্তুতই আমাদের নিজের লাভ । তাহ পরের স্কন্ধে চড়িবার লাভ নহে, তাহা নিজের পায়ে চলিবার লাভ । এই কারণেই আমাদের বাংলাদেশের এই ক্ষুদ্র ত্রিপুররাজ্যের প্রতি উংস্থক দৃষ্টি না মেলিয়া আমি থাকিতে পারি না । এই কারণেই এখানকার রাজ্যব্যবস্থার মধ্যে যে-সকল অভাব ও বিল্প দেখিতে পাই তাহাকে আমাদের সমস্ত বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য বলিয়া জ্ঞান করি। এই কারণেই এখানকার রাজ্যশাসনের মধ্যে যদি কোনো অসম্পূর্ণতা বা শৃঙ্খলতার অভাব দেথি তবে তাহা লইয়া স্পর্ধাপূর্বক আলোচনা করিতে আমার উৎসাহ হয় না— আমার মাথা হেঁট হইয়া যায়। এই কারণে, যদি জানিতে পাই, তুচ্ছ স্বার্থপরতা আপনার সামান্ত লাভের জন্য, উপস্থিত ক্ষুদ্র স্থবিধার জন্য, রাজত্রীর মন্দিরভিত্তিকে শিথিল করিয়া দিতে কুষ্ঠিত হইতেছে না, তবে সেই অপরাধকে আমি ক্ষুদ্র রাজ্যের একটি ক্ষুদ্র ঘটনা বলিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারি না। এই দেশীয় রাজ্যের লজ্জাকেই যদি যথার্থরূপে আমাদের লজ্জা এবং ইহার গৌরবকেই যদি যথার্থরূপে আমাদের গৌরব বলিয়া না বুঝি, তবে দেশের সম্বন্ধে আমরা ভুল বুঝিয়াছি। পূর্বেই বলিয়াছি, ভারতীয় প্রকৃতিকেই বীর্ষের দ্বারা সবল করিয়া তুলিলে তবেই আমরা যথার্থ উৎকর্ষলাভের আশা করিতে পারিব । ব্রিটিশ-রাজ ইচ্ছা করিলেও এ-সম্বন্ধে আমাদিগকে সাহায্য করিতে পারেন না। র্তাহারা নিজের মহিমাকেই একমাত্র মহিমা বলিয়া জানেন— এই কারণে, ভালোমনেও তাহারা আমাদিগকে যে-শিক্ষা দিতেছেন তাহাতে আমরা স্বদেশকে অবজ্ঞা করিতে শিখিতেছি । আমাদের মধ্যে যাহার পেটিয়ট বলিয়া বিখ্যাত র্তাহাদের অনেকেই এই অবজ্ঞাকারীদের মধ্যে অগ্রগণ্য। এইরূপে র্যাহারা ভারতকে অস্তরের সহিত অবজ্ঞা করেন তাহারাই ভারতকে বিলাত করিবার জন্য উৎসুক— সৌভাগ্যক্রমে র্তাহাদের এই অসম্ভব আশা কখনোই সফল হইতে পারিবে না। আমাদের দেশীয় রাজ্যগুলি পিছাইয়া পড়িয়া থাকুক আর যাহাই হউক, এইখানেই স্বদেশের যথার্থ স্বরূপকে আমরা দেখিতে চাই । বিকৃতি-অনুকৃতির মহামারী এখানে প্রবেশলাভ করিতে না পারুক, এই আমাদের একান্ত আশা । ব্রিটিশ-রাজ আমাদের উন্নতি চান, কিন্তু সে-উন্নতি ব্রিটিশ মতে হওয়া চাই । সে-অবস্থায় জলপদ্মের উন্নতিপ্রণালী স্থলপদ্মে আরোপ করা হয় । কিন্তু দেশীয় রাজ্যে স্বভাবের অব্যাহত নিয়মে দেশ উন্নতিলাভের উপায় নিধর্ণরণ করিবে, ইহাই আমাদের কামনা। * ইহার কারণ এ নয় যে, ভারতের সভ্যতাই সকল সভ্যতার শ্রেষ্ঠ । যুরোপের છ૦ রবীন্দ্র-রচনাবলী সভ্যতা মানবজাতিকে যে-সম্পত্তি দিতেছে তাহা যে মহামূল্য, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ कद्रां धुडेङ । অতএব, যুরোপীয় সভ্যতাকে নিকৃষ্ট বলিয়া বর্জন করিতে হইবে, এ-কথা আমার বক্তব্য নহে— তাহা আমাদের পক্ষে অস্বাভাবিক বলিয়াই, অসাধ্য বলিয়াই স্বদেশী আদর্শের প্রতি আমাদের মন দিতে হইবে— উভয় আদর্শের তুলনা করিয়া বিবাদ করিতে আমার প্রবৃত্তি নাই, তবে এ-কথা বলিতেই হইবে, যে, উভয় আদৰ্শই মানবের পক্ষে অত্যাবশুক । সেদিন এখানকার কোনো ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন যে, গবর্মেন্ট আর্ট স্কুলের গ্যালারি হইতে বিলাতি ছবি বিক্রয় করিয়া ফেলা কি ভালো হইয়াছে । আমি তাহাতে উত্তর করিয়াছিলাম যে, ভালোই হইয়াছে । তাহার কারণ এ নয় যে, বিলাতি চিত্রকলা উৎকৃষ্ট সামগ্ৰী নহে। কিন্তু সেই চিত্রকলাকে এত সস্তায় আয়ত্ত করা চলে না। আমাদের দেশে সেই চিত্রকলার যথার্থ আদর্শ পাইব কোথায় । দুটো লঙ্কে-ঠুংরি ও হিলিমিলি পনিয়া শুনিয়া যদি কোনো বিলাতবাসী ইংরেজ ভারতীয়সংগীতবিদ্যা আয়ত্ত করিতে ইচ্ছা করে, তবে বন্ধুর কর্তব্য তাহাকে নিরস্ত করা। বিলাতি বাজারের কতকগুলি স্থলভ আবর্জনা এবং সেই সঙ্গে দুটি একটি ভালো ছবি চোখের সামনে রাখিয়া আমরা চিত্রবিদ্যার যথার্থ আদর্শ কেমন করিয়া পাইব । এই উপায়ে আমরা যেটুকু শিখি তাহা যে কত নিরুষ্ট, তাহাও ঠিকমতো বুঝিবার উপায় আমাদের দেশে নাই । যেখানে একটা জিনিসের আগাগোড়া নাই, কেবল কতকগুলা খাপছাড়া দৃষ্টাস্ত আছে মাত্র, সেখানে সে-জিনিসের পরিচয়লাভের চেষ্টা করা বিড়ম্বনা। এই অসম্পূর্ণ শিক্ষায় আমাদের দৃষ্টি নষ্ট করিয়া দেয়— পরের দেশের ভালোটা তো শিখিতেই পারি না, নিজের দেশের ভালোটা দেখিবার শক্তি চলিয়া • यांग्र । আর্ট স্কুলে ভর্তি হইয়াছি, কিন্তু আমাদের দেশে শিল্পকলার আদর্শ ষে কী তাহ আমরা জানিই না। যদি শিক্ষার দ্বারা ইহার পরিচয় পাইতাম তবে যথার্থ একটা শক্তিলাভ করিবার স্থবিধা হইত। কারণ, এ-আদর্শ দেশের মধ্যেই আছে– একবার যদি আমাদের দৃষ্টি খুলিয়া যায় তবে ইহাকে আমাদের সমস্ত দেশের মধ্যে, থালায়, ধটিতে, বাটিতে, ঝুড়িতে, চুপড়িতে, মন্দিরে, মঠে, বসনে, ভূষণে, পটে, গৃহভিত্তিতে নানা-অঙ্গপ্রত্যঙ্গ-পরিপূর্ণ একটি সমগ্র মূর্তিরূপে দেখিতে পাইতাম ; ইহার প্রতি আমাদের সচেষ্ট চিত্তকে প্রয়োগ করিতে পারিতাম , পৈতৃক সম্পত্তি লাভ করিয়া তাহাকে ব্যবসায়ে খাটাইতে পারিতাম । আত্মশক্তি శ్రీ'లిలీ এই কারণে, আমাদের শিক্ষার অবস্থায় বিলাতী চিত্রের মোহ জোর করিয়া ভাঙিয়া দেওয়া ভালো। নহিলে নিজের দেশে কী আছে তাহ দেখিতে মন যায় না— কেবলই অবজ্ঞায় অন্ধ হইয়া যে-ধন ঘরের সিন্দুকে আছে তাহাকে হারাইতে হয় । আমরা দেখিয়াছি, জাপানের একজন স্ববিখ্যাত চিত্ররসজ্ঞ পণ্ডিত এ-দেশের কীটদষ্ট কয়েকটি পটের ছবি দেখিয়া বিস্ময়ে পুলকিত হইয়াছেন— তিনি একখানি পট এখান হইতে লইয়া গেছেন, সেখানি কিনিবার জন্য জাপানের অনেক গুণজ্ঞ তাহাকে অনেক মূল্য দিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু তিনি বিক্রয় করেন নাই । আমরা ইহাও দেখিয়াছি, যুরোপের বহুতর রসজ্ঞ ব্যক্তি আমাদের অথ্যাত দোকানবাজার ঘাটিয়া মলিন ছিন্ন কাগজের চিত্ৰপট বহুমূল্য সম্পদের ন্যায় সংগ্ৰহ করিয়া লইয়া যাইতেছেন । সে-সকল চিত্র দেখিলে আমাদের আর্ট স্কুলের ছাত্রগণ নাসাকুঞ্চন করিয়া থাকেন । ইহার কারণ কী । ইহার কারণ এই, কলাবিদ্যা যথার্থভাবে যিনি শিথিয়াছেন তিনি বিদেশের অপরিচিত রীতির চিত্রের সৌন্দর্যও ঠিকভাবে দেখিতে পান— তাহার একটি শিল্পদ্ধৃষ্টি জন্মে। আর, যাহারা কেবল নকল করিয়া শেখে তাহারা নকলের বাহিরে কিছুই দেখিতে পায় না । আমরা যদি নিজের দেশের শিল্পকলাকে সমগ্রভাবে যথার্থভাবে দেখিতে শিখিতাম, তবে আমাদের সেই শিল্পদ্ধৃষ্টি শিল্পজ্ঞান জন্মিত যাহার সাহায্যে শিল্পসৌন্দর্ষের দিব্যনিকেতনের সমস্ত দ্বার আমাদের সম্মুখে উদঘাটিত হইয়া যাইত। কিন্তু বিদেশী শিল্পের নিতান্ত অসম্পূর্ণ শিক্ষায়, আমরা যাহা পাই নাই তাহাকে পাইয়াছি বলিয়া মনে করি, যাহা পরের তহবিলেই রহিয়া গেছে তাহাকে নিজের সম্পদ জ্ঞান করিয়া অহংকৃত হইয়া উঠি । "পিয়ের লোটি’ ছদ্মনামধারী বিখ্যাত ফরাসি ভ্রমণকারী , ভারতবর্ষে ভ্রমণ করিতে আসিয়া আমাদের দেশের রাজনিকেতনগুলিতে বিলাতি আসবাবের ছড়াছড়ি দেখিয়া হতাশ হইয়া গেছেন। তিনি বুঝিয়াছেন যে, বিলাতি আসবাবখানার নিতান্ত ইতরশ্রেণীর সামগ্ৰীগুলি ঘরে সাজাইয়া আমাদের দেশের বড়ো বড়ো রাজারা নিতান্তই অশিক্ষা ও অজ্ঞতা বশতই গৌরব করিয়া থাকেন। বস্তুত বিলাতি সামগ্রীকে যথার্থভাবে চিনিতে শেখা বিলাতেই সম্ভবে । সেখানে শিল্পকলা সজীব, সেখানে শিল্পীরা প্রত্যহ নব নব রীতি স্বজন করিতেছেন, সেখানে বিচিত্র শিল্পপদ্ধতির কালপরম্পরাগত ইতিহাস আছে, তাহার প্রত্যেকটির সহিত বিশেষ দেশকালপাত্রের সংগতি সেখানকার গুণী লোকেরা জানেন— আমরা তাহার কিছুই না জানিয়া কেৰল টাকার থলি লইয়া মুখ দোকানদারের সাহায্যে অন্ধভাবে কতকগুলা খাপছাড়া ఆలీt3 রবীন্দ্র-রচনাবলী Q জিনিসপত্র লইয়। ঘরের মধ্যে পুঞ্জীভূত করিয়া তুলি— তাহাদের সম্বন্ধে বিচার করা আমাদের সাধ্যায়ত্ত নহে । এই আসবাবের দোকান যদি লর্ড কর্জন বলপূর্বক বন্ধ করিয়া দিতে পারিতেন তবে দায়ে পড়িয়া আমরা স্বদেশী সামগ্রীর মর্যাদা রক্ষা করিতে বাধ্য হইতাম— তাহ হুইলে টাকার সাহায্যে জিনিস-ক্রয়ের চর্চা বন্ধ হইয়া রুচির চর্চা হইত। তাহা হইলে ধনীগুহে প্রবেশ করিয়া দোকানের পরিচয় পাইতাম না, গৃহস্থের নিজের শিল্পজ্ঞানের পরিচয় পাইতাম । ইহা আমাদের পক্ষে যথার্থ শিক্ষা, যথার্থ লাভের বিষয় হইত। এরূপ হইলে আমাদের অস্তরে-বাহিরে, আমাদের স্থাপত্যে-ভাস্কর্ষে, আমাদের গৃহভিত্তিতে, আমাদের পণ্যবীথিকায় আমরা স্বদেশকে উপলব্ধি করিতাম । দুর্ভাগ্যক্রমে সকল দেশেরই ইতরসম্প্রদায় অশিক্ষিত। সাধারণ ইংরেজের শিল্পজ্ঞান নাই— সুতরাং তাহারা স্বদেশী সংস্কারের দ্বারা অন্ধ । তাহারা আমাদের কাছে তাহাদেরই অমুকরণ প্রত্যাশা করে । আমাদের বসিবার ঘরে তাহাদের দোকানের সামগ্রী দেখিলে তবেই আরাম বোধ করে— তবেই মনে করে, আমরা তাহাদেরই ফরমায়েশে-তৈরি সভ্যপদার্থ হইয়া উঠিয়াছি । তাহাদেরই অশিক্ষিত রুচি-অনুসারে আমাদের দেশের প্রাচীন শিল্পসৌন্দর্য স্থলভ ও ইতর অনুকরণকে পথ ছাড়িয়া দিতেছে । এ-দেশের শিল্পীরা বিদেশী টাকার লোভে বিদেশী রীতির অদ্ভুত নকল করিতে প্রবৃত্ত হইয়া চোখের মাথা খাইতে বসিয়াছে। * যেমন শিল্পে তেমনি সকল বিষয়েই । আমরা বিদেশী প্রণালীকেই একমাত্র প্রণালী বলিয়া বুঝিতেছি । কেবল বাহিরের সামগ্রীতে নহে, আমাদের মনে, এমন কি, হৃদয়ে নকলের বিষবীজ প্রবেশ করিতেছে । দেশের পক্ষে এমন বিপদ জার হইতেই পারে না । এই মহাবিপদ হইতে উদ্ধারের জন্ত একমাত্র দেশীয় রাজ্যের প্রতি আমরা তাকাইয়া আছি । এ-কথা আমরা বলি না যে, বিদেশী সামগ্ৰী আমরা গ্রহণ করিব ন। গ্রহণ করিতেই হইবে, কিন্তু দেশীয় আধারে গ্রহণ করিব। পরের অস্ত্র কিনিতে নিজের হাতখানা কাটিয়া ফেলিব না। একলব্যের মতো ধমুর্বিদ্যার গুরুদক্ষিণস্বরূপ নিজের দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুষ্ঠ দান করিব না। এ-কথা মনে রাৰিতেই হইবে, নিজের প্রকৃতিকে লঙ্ঘন করিলে দুর্বল হইতে হয় । ব্যান্ত্রের আহার্ব পদার্থ বলকারক সন্দেহ নাই, কিন্তু হস্তী তাহার প্রতি লোভ করিলে নিশ্চিত মরিবে । আমরা লোভবশত প্রকৃতির প্রতি ব্যভিচার যেন না করি । আমাদের ধর্মে-কৰ্ণে ভাবে-ভঙ্গীতে প্রত্যহুই তাহা করিতেছি, এইজন্ত আমাদের সমস্ত उप्रांज्रभंडि అలి4 উত্তরোত্তর জটিল হইয়া উঠিতেছে—আমরা কেবলই অকৃতকার্ধ এবং ভারাক্রাস্ত হইয়া পড়িতেছি। বস্তুত জটিলতা আমাদের দেশের ধর্ম নহে। উপকরণের বিরলত জীবনযাত্রার সরলতা আমাদের দেশের নিজস্ব – এইখানেই আমাদের বল, আমাদের প্রাণ, আমাদের প্রতিভা । আমাদের চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বিলাতি কারখানাঘরের ७धडूड जजांज पनि का नेिब्रा न ८कलि, डरब फूहे निक शहे८डहे भब्रिव-अर्थीं९ বিলাতি কারখানাও এখানে চলিবে না, চণ্ডীমণ্ডপও বাসের অযোগ্য হইয়া উঠিৰে । আমাদের দুর্ভাগ্যক্রমে এই কারখানাঘরের ধূমধূলিপূর্ণ বায়ু দেশীয় রাজ্যব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে— সহজকে অকারণে জটিল করিয়া তুলিয়াছে, বাসস্থানকে নির্বাসন করিয়া দাড় করাইয়াছে। র্যাহারা ইংরেজের হাতে মানুষ হইয়াছেন তাহার মনেই করিতে পারেন না যে, ইংরেজের সামগ্রীকে যদি লইতেই হয় তবে তাহাকে আপন করিতে না পারিলে তাহাতে অনিষ্টই ঘটে—এবং আপন করিবার একমাত্র উপায় তাহাকে নিজের প্রকৃতির অনুকূলে পরিণত করিয়া তোলা, তাহাঁকে যথাযথ না রাখা। খান্ত যদি খাদ্যরূপেই বরাবর থাকিয়া যায় তবে তাহাতে পুষ্টি দূরে থাক, ব্যাধি ঘটে । খাদ্য যখন খাদ্যরূপ পরিহার করিয়া আমাদের রসরক্তরূপে মিলিয়া যায় এবং যাহা মিলিবার নহে পরিত্যক্ত হয় তখনই তাহা আমাদের প্রাণবিধান করে। বিলাতি সামগ্রী যখন আমাদের ভারত প্রকৃতি র দ্বারা জীর্ণ হইয়া তাহার আত্মরূপ ত্যাগ করিয়া আমাদের কলেবরের সহিত একাত্ম হইয়া যায় তখনই তাহ। আমাদের লাভের বিষয় হইতে পারে— যতক্ষণ তাহার উৎকট বিদেশীয়ত্ব অবিকৃত থাকে ততক্ষণ তাহা লাভ নহে। বিলাতি সরস্বতীর পোষ্যপুত্ৰগণ এ-কথা কোনোমতেই বুঝিতে পারেন না । পুষ্টিসাধনের দিকে তাহাদের দৃষ্টি নাই, বোঝাই করাকেই র্তাহারা পরমার্থ জ্ঞান করেন । এইজন্যই আমাদের দেশীয় রাজ্যগুলিও বিদেশী কার্যবিধির অসংগত অনাবশ্বক বিপুল জঞ্জালজালে নিজের শক্তিকে অকারণে ক্লিষ্ট করিয়া তুলিতেছে। বিদেশী বোঝাকে যদি অনায়াসে গ্রহণ করিতে পারিতাম, যদি তাহাকে বোঝার মতো না দেখিতে হইত, রাজ্য যদি একটা আপিসমাত্র হইয়া উঠিবার চেষ্টায় প্রতিমুহূর্তে ঘৰ্মাক্তকলেবর হইয়া না উঠিত, যাহা সজীব হৃৎপিণ্ডের নাড়ির সহিত সম্বন্ধযুক্ত ছিল তাহাকে যদি কলের পাইপের সহিত সংযুক্ত করা না হইত, তাহা হইলে আপত্তি করিবার কিছু ছিল না। আমাদের দেশের রাজ্য কেরানিচালিত বিপুল কারখানা নহে, নিতুল নিবিকার এঞ্জিন নহে— তাহার বিচিত্র সম্বন্ধস্থত্রগুলি লৌহদণ্ড নহে, তাহা হৃদয়তত্ত— রাজলক্ষ্মী প্রতিমুহূর্তে তাহার কর্ষের । শুষ্কতার মধ্যে রসসঞ্চার করেন, কঠিনকে কোমল করেন, তুচ্ছকে সৌন্দর্ধে মণ্ডিত করিয়া দেন, জেনাপাওনার ব্যাপারকে কল্যাণের কাস্তিতে উজ্জল করিয়া তোলেন এবং ভুলক্রটিকে ক্ষমার অশ্রুজলে মার্জনা করিয়া থাকেন। আমাদের মন্দভাগ্য আমাদের দেশীয় রাজ্যগুলিকে বিদেশী আপিসের ছাচের মধ্যে ঢালিয়া তাহাদিগকে কলরূপে বানাইয়া না তোলে, এই-সকল স্থানেই আমরা স্বদেশলক্ষ্মীর স্তম্ভসিক্ত স্নিগ্ধ বক্ষঃস্থলের সজীব কোমল মাতৃম্পর্শ লাভ করিয়া যাইতে পারি— এই আমাদের কামনা। মা যেন এখানেও কেবল কতকগুলা ছাপমারা লেফাফার মধ্যে আচ্ছন্ন হইয়া না থাকেন—দেশের ভাষা, দেশের সাহিত্য, দেশের শিল্প, দেশের রুচি, দেশের কাস্তি এখানে যেন মাতৃকক্ষে আশ্রয়লাভ করে এবং দেশের শক্তি মেঘমুক্ত পূর্ণচন্ত্রের মতো আপনাকে অতি সহজে অতি স্বন্দরভাবে প্রকাশ করিতে পারে ।