আত্মশক্তি/ব্রতধারণ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


అను রবীন্দ্র-রচনাবলী নিত্রার সহায়তা কেহ করিয়ো না— আরাম আমাদের জন্য নহে, পরবশতার অহিফেনের মাত্রা প্রতিদিন আর বাড়িতে দিয়ে না— বিধাতার রুদ্রমূর্তিই আজ আমাদের পরিত্রাণ ! জগতে জড়কে সচেতন করিয়া তুলিবার এইমাত্র উপায় আছে— আঘাত, অপমান ও অভাব ; সমাদর নহে, সহায়তা নহে, স্বভিক্ষা নহে। ব্ৰত ধারণ কোনো স্ত্রীসমাজে জনৈক মহিল-কতৃক পঠিত আজ এই স্ত্রীসমাজে আমি যে উপদেশ দিতে উঠিয়াছি বা আমার কোনো নূতন কথা বলিবার আছে, এমন অভিমান আমার নাই । আমার কথা নূতন নহে বলিয়াই, কাহাকেও উপদেশ দিতে হইবে না বলিয়াই, আমি আজ সমস্ত সংকোচ পরিহার করিয়া আপনাদের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়াছি। যে-কথাটি আজ দেশের অস্তরে অস্তরে সর্বত্র জাগ্রত হইয়াছে, তাহাকেই নারীসমাজের নিকট সুস্পষ্টরূপে গোচর করিয়া তুলিবার জন্যই আমাদের অন্তকার এই উদযোগ । আমাদের দেশে সম্প্রতি একটি বিশেষ সময় উপস্থিত হইয়াছে, তাহা আমর। সকলেই অনুভব করিতেছি । অল্পদিনের মধ্যে আমাদের দেশ আঘাতের পর আঘাত প্রাপ্ত হইয়াছে । হঠাৎ বুঝিতে পারিয়াছি যে, আমাদের যাত্রাপথের দিকৃপরিবর্তন করিতে হইবে । যে-সময়ে এইরূপ দেশব্যাপী আঘাতের তাড়না উপস্থিত হইয়াছে, যে-সময়ে আমাদের সকলেরই হৃদয় কিছু না কিছু চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে, সেই সময়কে যদি আমরা উপেক্ষা করি তবে বিধাতার প্রেরণাকে অবজ্ঞা করা হইবে । # ইহাকে দুৰ্যোগ বলিব কি। এই-যে দিগ দিগন্তে ঘন মেঘ করিয়া শ্রাবণের অন্ধকার ঘনাইয়া আসিল, এই-ষে বিদ্যুতের আলোক এবং বঞ্জের গর্জন আমাদের হৃৎপিণ্ডকে চকিত করিয়া তুলিতেছে, এই-যে জলধারাবর্ষণে পৃথিবী ভাসিয়া গেল— এই দুৰ্যোগকেই যাহারা স্থযোগ করিয়া তুলিয়াছে তাহারাই পৃথিবীর অন্ন জোগাইবে । এখনই স্কন্ধে হল লইয়া কৃষককে কোমর বাধিতে হইবে । এই সময়টুকু যদি অতিক্রম করিতে দেওয়া হয় তবে সমস্ত বৎসর দুভিক্ষ এবং হাহাকার । আমাদের দেশেও সম্প্রতি ঈশ্বর দুর্যোগের বেশে যে-স্থযোগকে প্রেরণ করিয়াছেন তাহাকে নষ্ট হইতে দিব না বলিয়াই আজ আমাদের সামান্ত শক্তিকেও যথাসম্ভব সচেষ্ট অাত্মশক্তি \9 S করিয়া তুলিয়াছি । যে এক বেদনার উত্তেজনায় আমাদের সকলের চেতনাকে উংস্থক করিয়া তুলিয়াছে, আজ সেই বিধাতার প্রেরিত বেদনাদূতকে প্রশ্ন করিয়া আদেশ জানিতে হইবে, কর্তব্য স্থির করিতে হুইবে । নিজেকে ভুলাইয়া রাখিবার দিন আর আমাদের নাই । বড়ো দুঃখে আজ আমাদিগকে বুঝিতে হইয়াছে যে, আমাদের নিজের সহায় আমরা নিজেরা ছাড়া আর কেহ নাই। এই সহজ কথা যাহারা সহজেই না বুঝে, অপমান তাহাদিগকে বুঝায়, নৈরাপ্ত তাহাদিগকে বুঝায় । তাই আজ দায়ে পড়িয়া আমাদিগকে বুঝিতে হইয়াছে যে, ভিক্ষায়াং নৈৰ নৈব চ’। আজ আসন্নবিচ্ছেদশঙ্কিত বঙ্গভূমিতে দাড়াইয়া বাঙালি এ-কথা স্বম্পষ্ট বুঝিয়াছে যে, যেখানে স্বার্থের অনৈক্য, যেখানে শ্রদ্ধার অভাব, যেখানে রিক্ত ভিক্ষার ঝুলি ছাড়া আর কোনোই বল বা সম্বল নাই, সেখানে ফললাভের আশা কেবল যে বিড়ম্বনা তাহা নহে, তাহা লাঞ্ছনার একশেষ । এই আঘাত আবার একদিন হয়তো সহ হইয়া যাইবে— অপমানে যাহা শিখিয়াছি তাহা হয়তো আবার ভুলিয়া গিয়া আবার গুরুতর অপমানের জন্য প্রস্তুত হইব। যে দুর্বল, নিশ্চেষ্ট, তাহার ইহাই দুর্ভাগ্য— দুঃখ তাহাকে দুঃখই দেয়, শিক্ষা দেয় না । আজ সেই শঙ্কায় ব্যাকুল হইয়া সময় থাকিতে এই দুঃসময়ের দান গ্রহণ করিবার জন্য আমরা একত্র হইয়াছি । কোথায় আমরা আপনারা আছি, কোথায় আমাদের শক্তি এবং কোন দিকে আমাদের অসম্মান ও প্রতিকূলতা, আজ দৈবকৃপায় যদি তাহা আমাদের ধারণা হইয়া থাকে, তবে কেবল তাহাকে ক্ষীণ ধারণার মধ্যে রাথিয়া দিলে চলিবে না । কারণ, শুদ্ধমাত্র ইহাকে মনের মধ্যে রাখিলে ক্রমে ইহা কেবল কথার কথা এবং অবশেষে একদিন ইহা বিস্মৃত ও তিরোহিত হইয়া যাইবে । ইহাকে চিরদিনের মতো আমাদিগকে মনে গাঁথিতে এবং কাজে খাটাইতে হইবে । ইহাকে ভুলিলে আমাদের কোনোমতেই চলিবে না— তাহা হইলে আমরা মরিব । কাজে খাটাইতে হইবে । কিন্তু আমরা স্ত্রীলোক— পুরুষের মতো আমাদের কার্যক্ষেত্র বাহিরে বিস্তৃত নহে । জানি না, আজিকার দুদিনে আমাদের পুরুষেরা কী কাজ করিতে উদ্যত হইয়াছেন । জানি না, এখনো তাহারা যথার্থ মনের সঙ্গে বলিতে পারিয়াছেন কি না যে,— অশোর ছলনে ভুলি কি ফল লভিক্ষু, ছায়, एछाई लांबि भरन ! لاچ۱ ----وی\ ७३१ রবীন্দ্র-রচনাবলী ষে নিৰ্জীৰ, যে সহজ পথ খুজিয়া আপনাকে ভুলাইয়া রাখিতেই চায়, তাহাকে জুলাইবার জন্ত আশাকে অধিক বেশি ছলনা বিস্তার করিতে হয় না। সে হয়তো এখনো মনে করিতেছে, যদি এখানকার রাজার হইতে ভিক্ষুককে তাড়া খাইতে হয়, তৰে ভিক্ষার ঝুলি ঘাড়ে করিয়া সমুদ্রপারে যাইতে হইবে । সমুদ্রের এ-পারেই কি আর ও-পারেই কি, অনন্যশরণ কাঙাল সেই একই চরণ আশ্রয় করিয়াছে । কিন্তু এ-দশা আমাদের পুরুষদের মধ্যে সকলের নহে— তাহাজের বহুদিনের বিশ্বাসক্ষেত্রে ভূমিকম্প উপস্থিত হইয়াছে, তাহদের ভক্তি টলিয়াছে, তাহাদের আশা খিলালে-খিলানে ফাটিয়া ফাক হইয়া গেছে— এখন তাহারা ভাৰিতেছেন, ইহার চেয়ে নিজের দীনহীন কুটির আশ্রয় করাও নিরাপদ। এখন তাই সমস্ত দেশের মধ্যে নিজের শক্তিকে অবলম্বন করিবার জন্য একটা মৰ্মভেদী আহবান উঠিয়াছে । এই আহবানে যে পুরুষেরা কী ভাবে সাড়া দিবেন তাহা জানি না— কিন্তু আমাদের অস্তঃপুরেও কি এই আহবান প্রবেশ করে নাই । আমরা কি আমাদের মাতৃভূমির কস্তা নহি । দেশের অপমান কি আমাদের অপমান নহে। দেশের দুঃখ কি আমাদের গৃহপ্রাচীরের পাষাণ ভেদ করিতে পারিবে না । ভগিনীগণ, আপনারা হয়তো কেহ কেহ জিজ্ঞাসা করিবেন, আমরা স্ত্রীলোক, আমরা কী করিতে পারি— দুঃখের দিনে নীরবে অশ্রুবর্ষণ করাই আমাদের সম্বল । এ-কথা আমি স্বীকার করিতে পারিব না। আমরা যে কী না করিতেছি, তাই দেখুন। আমরা পরনের শাড়ি কিনিতেছি বিলাত হইতে, আমাদের অনেকের ভূষণ জোগাইতেছে হামিণ্টন, আমাদের গৃহসজ্জা বিলাতি দোকানের, আমরা শয়নে স্বপনে বিলাতের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া আছি । আমরা এতদিন আমাদের জননীর অন্ন কাড়িয়া তাহার ভূষণ ছিনাইয়া বিলাত-দেবতার পায়ে রাশি রাশি অর্ঘ্য জোগাইতেছি । আমরা লড়াই করিতে যাইব না, আমরা ভিক্ষা করিতেও ফিরিব না, কিন্তু আমরা কি এ-কথা বলিতে পারিব না যে, “না, আর নয়— আমাদের এই অপমানিত উপবাসক্লিষ্ট মাতৃভূমির অল্পের গ্রাস বিদেশের পাতে তুলিয়া দিয়া তাহার পরিবর্তে আমাদের বেশভূষার শখ মিটাইব না ? আমরা ভালো হউক, মন্দ হউক, দেশের কাপড় পরিব, দেশের জিনিস ব্যবহার করিব।” ভগিনীগণ, সৌন্দর্যচর্চার দোহাই দিবেন না ! সৌন্দর্যবোধ অতি উত্তম পদার্থ, কিন্তু তাহার চেয়েও উচ্চ জিনিস আছে । আমি এ-কথা স্বীকার করিব না, যে, দেশী জিনিসে আমাদের সৌন্দর্যবোধ ক্লিষ্ট হইবে ; কিন্তু যদি শিক্ষা ও অভ্যাসক্রমে আমাদের সেই রূপই ধারণা হয়, তবে এই কথা বলিব, সৌন্দর্যবোধকেই সকলের চেয়ে বড়ো আত্মশক্তি ఆసిరి করিবার দিন আজ নহে— সন্তান যখন দীর্ঘকাল রোগশয্যায় শায়িত তখন জননী বেনারসি শাড়িখানা বেচিয়া তাহার চিকিৎসার ব্যবস্থা করিতে কুষ্ঠিত হন না— তখন কোথায় থাকে সৌন্দর্যবোধের দাবি ? জানি, আমাকে অনেকে বলিবেন, কথাটা বলিতে যত সহজ করিতে তত সহজ নহে । আমাদের অভ্যাস, আমাদের সংস্কার, আমাদের আরামস্থহ, আমাদের সৌন্দর্যবোধ— ইহাদিগকে ঠেলিয়া নড়ানো বড়ো কম কথা নহে। নিশ্চয়ই তাহা নহে। ইহা সহজ নহে, ইহার চেয়ে একদিনের মতো চাদার খাতায় সহি দেওয়া সহজ । কিন্তু বড়ো কাজ সহজে হয় না। যখন সময় আসে তখন ধর্মের শঙ্খ বাজিয়া উঠে, তখন যাহা কঠিন তাহাকেই বরণ করিয়া লইতে হয় । বস্তুত, তাহাতেই আনন্দ,—সহজ নহে বলিয়াই আনন্দ, দুঃসাধ্য বলিয়াই মুখ । আমরা ইতিহাসে পড়িয়াছি, যুদ্ধের সময় রাজপুত মহিলারা অঙ্গের ভূষণ, মাথার কেশ দান করিয়াছে ; তখন স্থবিধা বা সৌন্দর্যচর্চার কথা ভাবে নাই—ইহা হইতে আমরা এই শিখিয়াছি যে, জগতে স্ত্রীলোক যদি বা যুদ্ধ না করিয়া থাকে, ত্যাগ করিয়াছে ; সময় উপস্থিত হইলে ভূষণ হইতে প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে কুষ্ঠিত হয় নাই। কর্মের বীর্ষ অপেক্ষা ত্যাগের বীর্ষ কোনো অংশেই নূ্যন নহে। ইহা যখন ভাবি তখন মনে এই গৌরব জন্মে যে, এই বিচিত্রশক্তিচালিত সংসারে স্ত্রীলোককে লজ্জিত হইতে হয় নাই ; স্ত্রীলোক কেবল সৌন্দর্য দ্বারা মনোহরণ করে নাই, ত্যাগের দ্বারা শক্তি দেখাইয়াছে । আজ আমাদের বঙ্গদেশ রাজশক্তির নির্দয় আঘাতে বিক্ষত হইয়াছে, আজ বঙ্গরমণীদের ত্যাগের দিন। আজ আমরা ব্রতগ্রহণ করিব। আজ আমরা কোনো ক্লেশকে ডরিব না, উপহাসকে অগ্রাহ করিব, আজ আমরা পীড়িত জননীর রোগশয্যায় বিলাতের সাজ পরিয়া শৌখিনতা করিতে যাইব না। দেশের জিনিসকে রক্ষা করা, এও তো রমণীর একটা বিশেষ কাজ । আমরা ভালোবাসিতে জানি । ভালোবাসা চাকচিক্যে ভুলিয়া নূতনের কুহকে চারিদিকে ধাবমান হয় না। আমাদের যাহা অাপন, সে স্বত্র হউক আর কুত্ৰ হউক, নারীর কাছে অনাদর পায় না— সংসার তাই রক্ষা পাইতেছে । একবার ভাবিয়া দেখুন, আজ যে বঙ্গসাহিত্য বলিষ্ঠভাবে অসংকোচে মাথা তুলিতে পারিয়াছে, একদিন শিক্ষিত পুরুষসমাজে ইহার অবজ্ঞার সীমা ছিল না। তখন পুরুষের বাংলা বই কিনিয়া লজ্জার সহিত কৈফিয়ত দিতেন যে, আমরা পড়িব না, বাড়ির ভিতরে মেয়েরা পড়িবে। আচ্ছা আচ্ছ, তাহাদের সে-লজার ভার আমরাই বহন ७२8 রবীন্দ্র-রচনাবলী করিয়াছি, কিন্তু ত্যাগ করি নাই। আজ তো সে-লজ্জার দিন ঘুচিয়াছে ! মে বাড়ির ভিতরে মেয়েদের কোলে বাংলাদেশের শিশুসস্তানেরা— তাহার কালোই হউক আর ধলোই হউক— পরম আদরে মানুষ হইয়া উঠিতেছে, বঙ্গসাহিত্যও সেই বাড়ির ভিতরে মেয়েদের কোলেই তাহার উপেক্ষিত শিশু-অবস্থা যাপন করিয়াছে, অল্পবস্ত্রের দুঃখ পায় নাই । একবার ভাবিয়া দেখুন, যেখানে বাঙালি পুরুষ বিলাতি কাপড় পরিয়া সর্বত্র নিঃসংকোচে আপনাকে প্রচার করিতেছেন সেখানে তাহার স্ত্রীকস্তাগণ বিদেশী বেশ ধারণ করিতে পারেন নাই। স্ত্রীলোক যে উৎকট বিজাতীয় বেশে আপনাকে সজ্জিত করিয়া বাহির হইবে, ইহা আমাদের স্ত্রীপ্রকৃতির সঙ্গে এতই একান্ত অসংগত যে, বিলাতের মোহে আপাদমস্তক বিকাইয়াছেন যে-পুরুষ তিনিও আপন স্ত্রীকন্যাকে এই ঘোরতর লজ্জা হইতে রক্ষা করিয়াছেন । এই রক্ষণপালনের শক্তি স্ত্রীলোকের অন্তরতম শক্তি বলিয়াই দেশের দেশীয়ত্ব স্ত্রীলোকের মাতৃক্রোড়েই রক্ষা পায়। নূতনত্বের বস্তায় দেশের অনেক জিনিস, ষাহ পুরুষ-সমাজ হইতে ভাসিয়া গেছে, তাহ আজও অন্তঃপুরের নিভৃত কক্ষে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আছে। এই বন্যার উপদ্রব একদিন যখন দূর হইবে তখন নিশ্চয়ই তাহাদের খোজ পড়িবে এবং দেশ রক্ষণপটু স্নেহশীল নারীদের নিকট কৃতজ্ঞ হইবে । । অতএব, আজ আমরা যদি আর-সমস্ত বিচার ত্যাগ করিয়া দেশের শিল্প, দেশের সামগ্রীকে অবিচলিত নিষ্ঠার সহিত রক্ষা করি, তবে তাহাতে নারীর কর্তব্যপালন করা হইবে । আমার মনে এ-আশঙ্কা আছে যে, আমাদের মধ্যেও অনেকে অবজ্ঞাপূর্ণ উপহাসের সহিত বলিবেন, “তোমরা কয়জনে দেশী জিনিস ব্যবহার করিবে প্রতিজ্ঞা করিলেই অমনি নাকি ম্যাঞ্চেস্টর ফতুর হইয়া যাইবে এবং লিভারপুর বাসায় গিয়া মরিয়া থাকিবে ।” সে-কথা জানি । ম্যাঞ্চেস্টরের কল চিরদিন ফুলিতে থাক, রাবণের চিতার ন্যায় লিভারপুলের এঞ্জিনের আগুন না নিভুক ! আমাদের অনেকে আজকাল যে বিলাতির পরিবর্তে দেশী জিনিস ব্যবহার করিতে ব্যগ্র হইয়াছেন, তাহার কারণ এ নয় যে, র্তাহারা বিলাতকে দেউলে করিয়া দিতে চান। বস্তুত, আমাদের এই-বে চেষ্টা ইহা কেবল আমাদের মনের ভাবকে বাহিরে মূর্তিমান করিয়া রাখিবার চেষ্টা। আমরা সহজে না হউক, অন্তত বারংবার আঘাতে ও অপমানে পরের বিরুদ্ধে নিজেকে যে বিশেষভাবে আপন বলিয়া জানিতে উৎসুক হইয়া উঠিয়াছি, সেই ঔৎসুক্যকে যে কায়েমনে-বাক্যে প্রকাশ করিতে হইবে— নতুবা দুই দিনেই তাহা যে বিশ্বত ও ব্যর্থ হইয়া আত্মশক্তি ૭૨૯ ধাইবে । আমাদের মন্ত্রও চাই, চিহ্নও চাই । আমরা অস্তরে স্বদেশকে বরণ করিব এবং বাহিরে স্বদেশের চিহ্ন ধারণ করিব । বিদেশীয় রাজশক্তির সহিত আমাদের স্বাভাবিক পার্থক্য ও বিরোধ ক্রমশই স্বম্পষ্টরূপে পরিস্ফুট হইয়া উঠিয়াছে। আজ আর ইহাকে ঢাকিয়া রাখিবে কে । রাজাও পারিলেন না, আমরাও পারিলাম না। এই বিরোধ ষে ঈশ্বরের প্রেরিত । এই বিরোধ ব্যতীত আমরা প্রবলরূপে, যথার্থরূপে আপনাকে লাভ করিতে পারিতাম না। আমরা যতদিন প্রসাদভিক্ষার আশে একান্তভাবে এই-সকল বিদেশীর মুখ চাহিয়া থাকিতাম ততদিন আমরা উত্তরোত্তর আপনাকে নিঃশেষভাবে হারাইতেই থাকিতাম । আজ বিরোধের আঘাতে বেদনা পাইতেছি, অস্ববিধা ভোগ করিতেছি, সকলই সত্য, কিন্তু নিজেকে বিশেষভাবে উপলব্ধি করিবার পথে দাড়াইয়াছি। যতদিন পর্যন্ত এই লাভ সম্পূর্ণ না হইবে ততদিন পর্যন্ত এই বিরোধ ঘুচিবে না ; যতদিন পর্যন্ত আমরা নিজশক্তিকে আবিষ্কার না করিব, ততদিন পর্যন্ত পরশক্তির সহিত আমাদের সংঘর্ষ চলিতে থাকিবেই। যে আপনার শক্তিকে খুজিয়া পায় নাই, যাহাকে নিরুপায়ভাবে পরের পশ্চাতে ফিরিতে হয়, ঈশ্বর করুন, সে যেন আরাম ভোগ না করে— সে যেন অহংকার অনুভব না করে ! অপমান ও ক্লেশ তাহাকে সর্বদা যেন এই কথা স্মরণ করাইতে থাকে যে, “তোমার নিজের শক্তি নাই, তোমাকে ধিক্ !” আমরা যে অপমানিত হইতেছি, ইহাতে বুঝিতে হইবে, ঈশ্বর এখনো আমাদিগকে ত্যাগ করেন নাই । কিন্তু আমরা আর বিলম্ব যেন না করি। আমরা নিজেকে ঈশ্বরের এই অভিপ্রায়ের অমুকুল যেন করিতে পারি। আমরা যেন পরের অনুকরণে আরাম এবং পরের বাজারে কেনা জিনিসে গৌরববোধ না করি। বিলাতি আসবাব পরিত্যাগ করিয়া আমাদের যদি কিছু কষ্ট হয়, তবে সে কষ্টই আমাদের মন্ত্রকে ভুলিতে দিবে না। সেই মন্ত্রটি এই— সৰ্বং পরবশং দুঃখং সর্বমাত্মবশং মুখম্। - 噸 যাহা-কিছু পরবশ, তাহাই দুঃখ , বাহা-কিছু আত্মবশ, তাহাই সুখ । আমাদের দেশের নারীগণ আত্মীয়স্বজনের আরোগ্যকামনা করিয়া দীর্ঘকালের জন্য কৃচ্ছত্রত গ্রহণ করিয়া আসিয়াছেন। নারীদের সেই তপঃসাধন বাঙালির সংসারে যে নিষ্ফল হইয়াছে, তাহা আমি মনে করি না। আজ আমরা দেশের নারীগণ দেশের জন্য যদি সেইরূপ ব্রত গ্রহণ করি, যদি বিদেশের বিলাস দৃঢ় নিষ্ঠার সহিত পরিত্যাগ করি, তবে আমাদের এই তপস্তায় দেশের মঙ্গল হইবে— তবে এই স্বস্ত্যয়নে আমরা পুণ্যলাভ করিব এবং আমাদের পুরুষগণ শক্তি লাভ করিবেন।