আনন্দমঠ (দ্বিতীয় সংস্করণ)/দ্বিতীয় খণ্ড/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

 তখন কোম্পানির অনেক রেশমের কুঠী ছিল। শিবগ্রামে ঐরূপ এক কুঠী ছিল। ডনিওয়ার্থ সাহেব সেই কুঠীর ফ্যাক্টর অর্থাৎ অধ্যক্ষ ছিলেন। তখনকার কুঠী সকলের রক্ষার জন্য সুব্যবস্থা ছিল। ডনিওয়ার্থ সাহেব সেই জন্য কোন প্রকারে প্রাণরক্ষা করিতে পারিয়াছিলে, কিন্তু তাঁহার স্ত্রী কন্যাদিগকে কলিকাতায় পাঠাইয়া দিতে বাধ্য হইয়াছিলেন এবং তিনি স্বয়ংও সন্তানদিগের দ্বারা উৎপীড়িত হইয়াছিলেন। সেই প্রদেশে এই সময়ে কাপ্তেন টমাস সাহেব দুই চারি দল ফৌজ লইয়া তশরিফ আনিয়াছিলেন। এখন কতক গুলা চোয়াড়, হাড়ি, ডোম, বাগ্‌দী, বুনো সন্তানদিগের উৎসাহ দেখিয়া পরদ্রব্যাপহরণে উৎসাহী হইয়াছিল। তাহারা কাপ্তেন টমাসের রসদ আক্রমণ করিল। কাপ্তেন টমাসের সৈন্যের জন্য গাড়ী গাড়ী বোঝাই হইয়া উত্তম ঘি, ময়দা, মুরগী, চাল যাইতেছিল—দেখিয়া ডোম বাগ্‌দীর দল লোভ সম্বরণ করিতে পারে নাই। তাহারা গিয়া, গাড়ী আক্রমণ করিল, কিন্তু কাপ্তেন টমাসের সিপাহীদের হস্তস্থিত বন্দুকের দুই চারিটা গুঁতা খাইয়া ফিরিয়া আসিল। কাপ্তেন টমাস তৎক্ষণেই কলিকাতায় রিপোর্ট পাঠাইলেন যে আজ ১৫৭ জন সিপাহী লইয়া ১৪,৭০০ বিদ্রোহী পরাজয় করা গিয়াছে। বিদ্রোহীদিগের মধ্যে ২১৫৩ জন মরিয়াছে আর ১২৩৩ জন আহত হইয়াছে। ৭ জন বন্দী হইয়াছে। কেবল শেষ কথাটাই সত্য। কাপ্তেন টমাস, ব্লেনহিম বা রসবাকের মত দ্বিতীয়যুদ্ধ জয় করিয়াছি মনে করিয়া গোঁপ দাড়ী চুমরাইয়া নির্ভয়ে ইতস্তত বেড়াইতে লাগিলেন। এবং ডনিওয়ার্থ সাহেবকে পরামর্শ দিতে লাগিলেন যে, আরকি, এক্ষণে বিদ্রোহ নিবারণ হইয়াছে, তুমি স্ত্রী পুত্রদিগকে কলিকাতা হইতে লইয়া আইস। ডনিওয়ার্থ সাহেব বলিলেন, “তা হইবে, আপনি দশদিন, এখানে থাকুন, দেশ আর একটু স্থির হউক, স্ত্রী পুত্র লইয়া আসিব।” ডনিওয়ার্থ সাহেবের ঘরে পালা মটন মুরগী ছিল। পনীরও তাঁহার ঘরে অতি উত্তম ছিল। নানাবিধ বন্যপক্ষী তাঁহার টেবিলের শোভা সম্পাদন করিত। শ্মশ্রুমান বাবুর্চীটি দ্বিতীয় দ্রৌপদী। সুতরাং বিনা বাক্যব্যয়ে কাপ্তেন টমাস সেইখানে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন।

 এদিকে ভবানন্দ মনে মনে গর গর করিতেছে, ভাবিতেছে কবে এই কাপ্তেন টমাস সাহেব বাহাদুরের মাথাটী কাটিয়া, দ্বিতীয় সম্বরারি বলিয়া উপাধি ধারণ করিবে। ইংরেজ যে ভারতবর্ষের উদ্ধারসাধন জন্য আসিয়াছিল, সন্তানেরা তাহা তখন বুঝে নাই। কি প্রকারে বুঝিবে? কাপ্তেন টমাসের সমসাময়িক ইংরেজেরাও তাহা জানিতেন না। তখন কেবল, বিধাতা মনে মনেই এ কথা ছিল। ভবানন্দ ভাবিতেছিল এ অসুরের বংশ একদিনে নিপাত করিব, সকলে জমা হউক, একটু অসতর্ক হউক, আমরা এখন একটু তফাত থাকি। সুতরাং তাহারা একটু তফাত রহিল। কাপ্তেন টমাস সাহেব নিষ্কণ্টক হইয়া দ্রৌপদীর গুণগ্রহণে মনোযোগ দিলেন।

 সাহেব বাহাদুর শিকার বড় ভাল বাসেন, মধ্যে মধ্যে শিবগ্রামের নিকটবর্ত্তী অরণ্যে মৃগয়ায় বাহির হইতেন। এক দিন ডনিওয়ার্থ সাহেবের সঙ্গে অশ্বারোহণে কতকগুলি শিকারী লইয়া কাপ্তেন টমাস শিকারে বাহির হইয়াছিলেন। বলিতে কি, টমাস সাহেব অসমসাহসিক, বলবীর্য্যে ইংরেজজাতির মধ্যেও অতুল্য। সেই নিবিড় অরণ্য ব্যাঘ্র, মহিষ, ভল্লুকাদিতে অতিশয় ভয়ানক। বহুদূর আসিয়া শিকারীরা আর যাইতে অস্বীকৃত হইল, বলিল ভিতরে আর পথ নাই, আমরা আর যাইতে পারিব না। ডনিওয়ার্থ সাহেবও সেই অরণ্যমধ্যে এমন ভয়ঙ্কর ব্যাঘ্রের হাতে পড়িয়া ছিলেন যে, তিনিও আর যাইতে অনিচ্ছুক হইলেন। তাঁহারা সকলে ফিরিতে চাহিলেন। কাপ্তেন টমাস বলিলেন “তোমরা ফেরো ফেরো, আমি ফিরিব না।” এই বলিয়া কাপ্তেন সাহেব নিবিড় অরণমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

 বস্তুতঃ অরণ্যমধ্যে পথ ছিল না। অশ্ব প্রবেশ করিতে পারিল না; কিন্তু সাহেব ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া কাঁধে বন্দুক লইয়া একা অরণ্যমধ্যে প্রবেশ করিলেন। প্রবেশ করিতে করিতে ইতস্ততঃ ব্যাঘ্রের অন্বেষণ করিতে করিতে ব্যাঘ্র দেখিলেন না। কি দেখিলেন? এক বৃহৎ বৃক্ষতলে প্রস্ফুটিত ফুল্লকুসুমযুক্ত লতাগুল্মাদিতে বেষ্টিত হইয়া বসিয়া ও কে? বাঘ কি?—বাঘ নয়, এক নবীন সন্ন্যাসী রূপে বন আলো করিয়াছে। প্রস্ফুটিত ফুল যেন সেই স্বর্গীয় বপুর সংসর্গে অধিকতর সুগন্ধযুক্ত হইয়াছে। কাপ্তেন টমাস সাহেব বিস্মিত হইলেন, বিস্ময়ের পরেই তাঁহার ক্রোধ উপস্থিত হইল। কাপ্তেন সাহেব দেশীভাষা বিলক্ষণ জানিতেন, বলিলেন, “তুমি কে?”

 সন্ন্যাসী বলিল “আমি সন্ন্যাসী।”

 কাপ্তেন বলিলেন “টুমি rebel।”

 সন্ন্যাসী। সে কি?

 কাপেন। হমি টোমায় গুলি কড়িয়া মাড়িব।

 সন্ন্যাসী। মার।

 কাপ্তেন একটু মনে সন্দেহ করিতেছিলেন যে, গুলি মারিবেন কি না, এমন সময় বিদ্যুৎবেগে সেই নবীন সন্ন্যাসী তাঁহার উপর পড়িয়া তাঁহার হাত হইতে বন্দুক কাড়িয়া হইল। সন্ন্যাসী বক্ষাবরণচর্ম্ম খুলিয়া ফেলিয়া দিল। একটানে দাড়ি, গোঁপ, জটা, খুলিয়া ফেলিল; কাপ্তেন টমাস সাহেব দেখিলেন অপূর্ব সুন্দরী স্ত্রীমূর্ত্তি। সুন্দরী হাসিতে হাসিতে বলিল “সাহেব, আমি স্ত্রীলোক, কাহাকেও আঘাত করি না। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি, হিন্দু মোছলমানে মারামারি হইতেছে, তোমরা মাঝখানে কেন? আপনার ঘরে ফিরিয়া যাও।”

 সাহের। টুমি কে?

 শান্তি। দেখিতেছ সন্ন্যাসিনী। যাঁহাদের সঙ্গে লড়াই করিতে আসিয়াছ তাঁহাদের কাহারও স্ত্রী।

 সাহেব। টুমি হামারী গোড়ে ঠাকিবি?

 শান্তি। কি? তোমার উপপত্নী স্বরূপ?

 সাহের। ইষ্ট্রির মট ঠাকিটে পার, লেকেন সাদি হইবে না।

 শান্তি। আমারও একটা জিজ্ঞাসা আছে; আমাদের ঘরে একটা রূপী বাঁদর ছিল, সেটা সম্প্রতি মরে গেছে; কোটর খালি পড়ে আছে। কোমরে ছেকল দেবো, তুমি সেই কোটরে থাক্‌বে? আমাদের বাগানে বেশ মর্ত্তমান কলা হয়।

 সাহেব। টুমি বড় spirited woman আছে, টোমাড় courage a হামি খুসী আছে। টুমি আমার গোড়ে চল। টোমার স্বামী যুড্ডে মরিয়া যাইবে। টখন টোমাড় কি হইবে?

 শান্তি। তবে তোমার আমার একটা কথা থাক। যুদ্ধ ত দুদিন চারিদিনে হবেই। যদি তুমি জেত তবে আমি তোমার উপপত্নী হইয়া থাকিব স্বীকার করিতেছি, যদি বাঁচিয়া থাকি। আর আমরা যদি জিতি, তবে তুমি আসিয়া, আমাদের কোটরে বাঁদর সেজে কলা খাবে ত?

 সাহেব। কলা খাইটে উট্টম জিনিষ। এখন আছে?

 শান্তি। নে তোর বন্দুক নে। এমন বুনো জেতের সঙ্গেও কেউ কথা কয়!

 শান্তি বন্দুক ফেলিয়া দিয়া হাসিতে হসিতে চলিয়া গেল।