আফগানিস্থান ভ্রমণ/কাবুল হতে বিদায়

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

কাবুল হতে বিদায়

 কাবুলে যা দেখবার সবই দেখেছিলাম, যা শুনবার শুনেছিলাম, এবার আমার প্রবল বাসনা হল কাবুল ত্যাগ করবার। কাবুল হতে গজনি পর্যন্ত ভূমি পর্বতময় ত বটেই, উপরন্তু বরফ পড়ে পথ অনেকস্থানেই বন্ধ ছিল। মাত্র ডাক চলাচলের সুবিধা ছিল; তাই প্রধান মন্ত্রীকে বলে ডাকের মোটরেই কান্দাহার যাবার বন্দোবস্ত করেছিলাম। অতি অল্প পরিশ্রমেই কাবুল পরিত্যাগের বন্দোবস্ত হয়েছিল।

 এক সুন্দর প্রভাতে বহু প্রত্যাশিত কাবুল শহরকে বিদ্যায় অভিবাদন জানিয়ে আবার নতুন পথে যাত্রা করলাম। যে মোটরে রওনা হয়েছিল তার নাম হল “মটরে পোস্ত”। শহর হতে বের হয়েই বুঝতে পারলাম তখন কাবুল পরিত্যাগ করা আমার পক্ষে অন্যায় হয়েছে। যে দিকেই দৃষ্টি যায়, সে দিকই বরফে সাদা হয়ে ছিল। সোঁ সোঁ করে প্রবল বাতাস বইছিল। আমার যত শীতবস্ত্র ছিল সব কটাই শরীরে জড়িয়েও শীতে থর থর করে কাঁপতে ছিলাম। তবুও কাবুলে ফিরে যেতে আর মোটেই ইচ্ছা হচ্ছিল না।

 পার্বত্যপথে মোটর অতি কষ্টেই চলছিল। অনেকবার পিছলপথের বাইরে মটর চলে যাচ্ছিল এবং চাকা বরফে ডেবে যাচ্ছিল। সুখের বিষয় আমাদের সংগে শাবল ও কোদাল ছিল। প্রত্যেকটা চাকাও চেন জড়ান ছিল। এতেও যখন মাঝে মাঝে মোটর পিছলে রাস্তার বাইরে চলে যাচ্ছিল তখন চেন না থাকলে আমাদের কি অবস্থা হ’ত তা সহজেই অনুমেয়। পথে কয়েকটি হিন্দু বস্তি পড়ছিল। ড্রাইভারের প্রতি সরকারী আদেশ ছিল, পথের মাঝে, যে কোন হিন্দু বস্তি পড়বে সে আমাকে যেন তা দেখিয়ে যায়।

 প্রথমদিন বিকালবেলা আমরা একটি হিন্দু বস্তিতে পৌঁছলাম। এই বস্তির লোকজনদের দেখে, আমার মনে হল না যে এরা হিন্দু এমন কি পাঠান। এদের শরীরের গঠন ঠিক স্কচদের মতই। লম্বা লালমুখো লোকগুলি যেন চলতি দুনিয়ার কোন ধারই ধারে না। স্তরেমসে, নমস্কার, সেলাম আলেকম ইত্যাদি কোন শব্দই তাদের মুখে শুনলাম না। এরা যে ভাষা বলে তার একটা শব্দও আমার বোধগম্য হল না।

 গ্রামের কয়েকটি লোক বরফ পরিষ্কার করছিল এবং অদূরে কতকগুলি লোক একটা উটের মাংস ভাগাভাগি করছিল। ওদের সংগে মোটর ড্রাইভার ইরানি ভাষায় কথা বলছিল। ড্রাইভার আমাকে বুঝিয়ে দিলে, যদিও এরা হিন্দু বলেই পরিচয় দেয় তবুও হিন্দুস্থানের হিন্দুদের সংগে এদের কিছুই মিল নেই। এরা সকল জানোয়ারেরই মাংস খায়। এদের জাত কোন মতেই যায় না। এরা সকল সময়ই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকে এবং কারো হুকুম মেনে চলতে রাজি নয়। পাঠানদের সংগে এদের কোনরূপ লেনদেন নেই। ইচ্ছা হয় খাজনা দেয়, যদি ভাল না লাগল তো গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। কাবুলের মত স্থানের গরমও এরা সহ্য করতে পারে না। এরা পর্বতবাসী। কারো কাছে আজ পর্যন্ত মাথা নত করে নি। উপহাস করে ড্রাইভার বললে এদের মাঝে হিন্দুপ্রীতি জাগাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। সুতরাং সেদিনই আমরা সেখান থেকে রওনা হয়ে সন্ধ্যার পূর্বেই একটি ছোট গ্রামে পৌছলাম। গ্রামে সরাই ছিল, সেখানেই রাত কাটাবার ব্যবস্থা হল।

 সরাইএ আসবার পর মনে হল যেন একটা খোঁয়াড়ে ঢুকেছি। চারিদিকে উটের অর্ধভুক্ত বিচালি এবং মলমূত্র বরফের সংগে মিশে জায়গাটাকে নরকে পরিণত করে তুলেছে। যে সকল লোক সরাইএ আশ্রয় নিয়েছিল তারা সবাই গরীব পাঠান। ওদের শীর্ণ মুখে পাণ্ডুর আভা। যে বস্ত্র সব পরে তারা শীত নিবারণ করছে তা অতি সামান্য। প্রত্যেকটি লোকের চোখেমুখে অসহায় ভাব। এরূপ লোকে ভরতি একটি ঘরের একাংশ দখল করলাম এবং সেই রাত্রি সেখানেই থাকতে বাধ্য হলাম। রাত্রে শুধু চা-রুটি খেয়েই থাকতে হল। যে দোকানগুলি আটা, চাল ও ডাল বিক্রি করত তারা নেক্‌ড়ে বাঘের ভয়ে দোকান বন্ধ করেছিল।

 রাত্রে সে ঘরে আলোর ব্যবস্থা ছিল না। অন্যান্য যারা ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল তারা ঘরের ভেতর হতে খড়কুটো জড় করে আগুন জ্বালাল এবং ছোট একটি অগ্নিকুণ্ডের সৃষ্টি করল; সেই অগ্নির সাহায্যে আমরা একে অন্যের মুখ দেখে গল্প আরম্ভ করলাম। এত আজগুবি গল্প এরা বলছিল যে সেগুলো শুনে আমার ঘরে টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠল। একজন বলছিল বাংগালীরা পৃথিবীর মধ্যে এক নম্বরের যাদুকরের জাত। ইচ্ছা করলেই যাকে তাকে ছাগল বানিয়ে রাখতে পারে। বাংগালীরা ছায়ামূর্তি ধারণ করে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে যায়, এজন্যই বাংলাদেশে পথঘাটের কোন বালাই নাই। আমি বাংগালী একথা তারা জেনেছিল, সেজন্যই এসব গল্পের অবতারণা হচ্ছিল। তারপর উঠল আমারই কথা। একজন বললে এই মুসাফিরের কোন ভয় সেই। যখনই কোন বিপদ আসে তখনই সে বিপদ হতে রক্ষা পাবার জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। বাংগালী পৃথিবী ভ্রমণ করবে না তো করবে কে? এরূপ নানাবিধ আলোচনার মাঝেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

 পরদিন প্রাতে উঠেই চা রুটি খেয়ে আবার রওনা হলাম। আজ আমরা অন্ততঃপক্ষে ষাট মাইল না গেলে কোন গ্রাম পাব না—একথা ড্রাইভার মহাশয় গম্ভীরভাবে ঘোষণা করলেন। যে সব মাল আমাদের ব্যবহার করবার জন্য নামান হয়েছিল সেই সকল যথাস্থানে রেখে, খাবারের জন্য কয়েকখানা পরোটা কাগজে মুড়ে রওনা হলাম। পথে জলের বড়ই অভাব ছিল, পার্বত্য দেশের ছোট ছোট নদী নালাগুলির সব জল জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল। শুধু পাতকুয়াতেই জল পাওয়া যেত। নিকটস্থ একটি পাতকুয়া হতে জল সংগ্রহ করবার জন্য মোটর থামল। পাতকুয়ার চারদিক বরফে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কুয়ায় ভেতর যে বরফ পড়েছিল তা গলে গিয়েছিল। আমরা কেরোসিন টিনে পরিমান মত জল ভর্তি করে ফের চল্লাম। এবারকার পথ বড়ই উঁচু নীচু। পাহাড়ের গা বেয়ে পথ চলেছে। ড্রাইভারের হাত ঠাণ্ডায় আড়ষ্ট হয়ে যাওয়ার দরুণ প্রত্যেক মুহূর্তেই ভাবছিলাম এই বুঝি গাড়ি পথ ছেড়ে নীচের দিকে চলল। সুখের বিষয় সেরূপ কিছুই ঘটে নি। ক্রমাগত পনের মাইল যাবার পর পথের পাশে একখানা পর্ণকুটির দেখতে পেয়ে মোটর দাঁড় করালাম।

 ঘরখানি বড় নয়, মাটির দেওয়াল, উপরে মাটির ছাদ। দরজায় করাঘাত করা মাত্র ঘরের মালিক দরজা খুলে আমাদের বেশ করে দেখে নিলেন। বোধ হয় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আমরা সবাই সরকারী লোক। সেজন্যই বোধ হয় তিনি চায়ের বন্দোবস্ত করতে ইতস্তত করছিলেন কিন্তু যখন মোটর ড্রাইভার আমার পরিচয় করিয়ে দিল তখন তিনি ভেতর দিককার একটা কুঠরীর দিকে যেয়ে তাঁর স্ত্রীকে চা এবং খাবার তৈরি করতে আদেশ দিলেন।

 প্রচুর চা, ডিম এবং শুক্‌নো রুটি খেয়ে আমাদের বেশ তৃপ্তি হল। গৃহের মালিককে প্রচুর পরিমাণে সিগারেট এবং চা উপহার দিয়েছিলাম। কুটিরবাসী পাঠান আমার প্রতি কৃপা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেছিলেন, “বাংলা দেশ গরম আর এ দেশ ঠাণ্ডা। শীতের সময় এ দেশে ভ্রমণ করা বড়ই কষ্টকর।” ড্রাইভারকে তিনি বার বার এই বলে হুূসিয়ার করে দিলেন যে বাংগালী মুসাফিরকে যেন শীত থেকে বাঁচিয়ে গন্তব্য স্থানে পৌছনো হয়, গজনী পৌঁছবার পূর্বেই যেন ফ্রস্ট্র‌্‌বাইট না হয়। দরিদ্র পর্ণ-কুটিরবাসীর আন্তরিকতা দেখে তার প্রতি আপনা হতেই মনে প্রীতির ভাব জেগে উঠেছিল।

 আমাদের মোটকার ‘মটরে পোস্ত’ হু হু করে এগিয়ে চলল। চা খাবার পর শরীর একটু গরম হয়েছিল কিন্তু নিমিষে তা লোপ পেল। আমি থর থর করে কাঁপতে ছিলাম। কয়েক মাইল পথ যাবার পরই মোটরকারের চাকা বরফে বার বার ডেবে যাচ্ছিল। অতি কষ্টে শাবলের সাহায্যে মোটরের চাকা বরফ হতে মুক্ত করে আবার চলতে লাগলাম। এরূপ ভাবে চলার জন্য ঘণ্টায় পনের মাইলের বেশি আমরা এগুতে পারছিলাম না।

 বিকালের দিকে আমরা ছোট একখানি গ্রামে পৌঁছলাম। এবার আমরা কোনও সরাই-এ না গিয়ে একজন গৃহস্থের বাড়ীতে অতিথি হলাম। গৃহস্থ বড়ই দয়ালু। তিনি আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানালেন। উত্তম খাদ্য দিলেন। শোবার জন্য প্রত্যেককে গরম বিছানা দিলেন। খাওয়া শেষ করে গরম বিছানায় আরাম করে বসবার পর গৃহস্বামী বললেন, এ পথ দিয়েই একজন ভারতীয় মোটর ড্রাইভার গজনী যাবার পথে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন। জল এবং পেট্রোলের অভাবেই তাঁর মৃত্যু হয়। বরফপাত শুরু হবার কয়েক দিন পর ঐ মটর ড্রাইভার কাবুল হতে গজনীর দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন পথে জলের অভাব হবে না। কিন্তু পথ ঘাট ভাল রকম জানা না থাকায় জলের সন্ধান পান নি। পেট্রোলের উপর নির্ভর করেই তিনি অনেক পথ এগিয়ে যান। শেষটায় পেট্রোলও যখন ফুরিয়ে গেল তখন মোটর আপনিই বন্ধ হয়। মোটরের ভেতর নিরাপদ স্থান না থাকায় এবং আত্মরক্ষার কোন ব্যবস্থা ছিল না বলে রাত্রে যখন নেকড়ে বাঘের দল তাঁকে আক্রমণ করল তখন তিনি প্রাণ রক্ষা করতে পারলেন না। নেকড়ের দল শুধু রেখে গিয়েছিল তাঁর ছিন্ন বস্ত্র। ড্রাইভার যে ভারতবাসী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল চারিদিকে ছড়ানো পাশপোর্টের পাতা দেখে। অতঃপর গৃহস্বামী দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন “আফগানিস্থান সুখ এবং দুঃখে পরিপূর্ণ। এখনও এদেশে সভ্যতার আওতা পুরোপুরি ভাবে আসে নি। রাজা আমানউল্লা সেজন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। দেশ বিদেশের পুঁজিবাদীদের তা সহ্য হল না। তাদের অপচেষ্টার ফলে আজ হতভাগ্য ভারতীয় মোটর ড্রাইভারের অপমৃত্যু ঘটল। আমানউল্লা যদি তাঁর নির্ধারিত মতে রাস্তা তৈরীর কাজ করে যেতে পারতেন তবে প্রত্যেক বারো মাইল অন্তর একটি করে সরাই থাকত। কিন্তু তা হল না। আমানউল্লা চিরতয়ে দেশ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।”

 করুণকাহিনী শোনার পর আর কোন কথাই ভাল লাগল না। সে দিনকার মত গৃহস্থের বাড়ীতে রাত কাটিয়ে পর দিন আমরা গজনীর দিকে রওনা হলাম। সুলতান মামুদের গজনী দেখবার জন্য প্রাণ উৎসুক ছিল। কিন্তু যা পথ! যখনই ড্রাইভার একটু অন্যমনস্ক হয়েছে অমনি গাড়ির চাকা বরফে ডেবে গেছে। আমাদের প্রাণপাত প্রয়াসে চাকা উঠিয়ে তারপর চলতে হয়েছে। সারাদিন পথ চলেও পথের শেষ হয় নি, রাত্রেও পথ চলতে হয়েছে।

 চন্দ্র আকাশে উঠেছে। স্বচ্ছ, সুনীল আকাশে নক্ষত্ররাজি ঝক্‌মক্‌ করছে। চতুর্দিকে পূর্ণচন্দ্রের শুভ্র আলো বরফে আবৃত পার্বত্যভূমির উপর পড়ে এমন সুন্দর দৃশ্য সৃষ্টি করেছিল যা দেখে মনে হচ্ছিল এমন অপরূপ জ্যোৎস্নারাত্রি এ জীবনে আর কখনো দেখি নি। ভাবছিলাম আমি যদি কবি বা সাহিত্যিক হতাম তা হলে হয়তো এই সৌন্দর্য ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে পারতাম।