আমার দেখা তুরষ্ক/আঙ্কারায়
আঙ্কারায়
আঙ্কারা শহরের প্রাচীন ইতিহাসের খোঁজ করিতে গেলে ইহার মূল খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে সুদূর অতীতে। কাহারও কাহারও মতে নৌ-যুদ্ধে মিসরকে পরাজিত করিয়া প্রাচীন গ্যালেসিয়ানগণ এই অঞ্চলের অধিকার লাভ করেন। তাঁদের লুণ্ঠিত-দ্রব্যের মধ্যে ছিল নোঙ্গর বা anchor; তাঁহাদের নতুন শহরের নাম “আঙ্কারার’ মূলে ছিল জয়ের প্রতীক এই ‘এঙ্কর'।
পরবর্তী বিভিন্ন যুগে রোমান, বাইজেণ্টাইন প্রভৃতি জাতির আধিপত্য স্থাপিত হয় আঙ্কারায়। বিভিন্ন যুগে আরবেরাও আঙ্কারায় পদার্পণ করেন; জানা যায়, বাদশাহ্ হারুনর রশীদের সেনাবাহিনী অগ্রসর হইয়াছিল আঙ্কারা পর্যন্ত। সেলজুক তুর্কীরা আঙ্কারা দখল করেন একাদশ শতাব্দীতে। বার কয়েক হাত বদলের পর পরবর্তীকালে আঙ্কারা অটোম্যান সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে আঙ্কারা আল্পাকা শিল্পের জন্য খ্যাতি অর্জন করিয়াছিল। এই সময় ডাচ ও ফরাসী বণিকগণ ‘আলপাকার’ জন্য আঙ্কারায় আনাগোনা করিতেন। আঙ্কারার প্রাচীন খ্রীস্টান গোরস্তানে ইঁহাদের কাহারও কাহারও সমাধি আজো দেখা যায়।
ইহার পর তুরস্কের ইতিহাসে ক্রমেই কমিয়া আসিতে থাকে আঙ্কারার প্রাধান্য আঙ্কারার আশেপাশে স্তম্ভ, মন্দির, হামামখানা ও কেল্লা প্রভৃতির ধ্বংসাবশেষ আজো বিভিন্ন সভ্যতার স্মৃতি বহন করিতেছে। আধুনিক যুগেও চলিয়া আসিতেছে খননকার্য, উদ্ধার করা হইতেছে প্রাচীন ইতিহাসের মালমসলা।
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি
যুগ-যুগান্তের পুরাতন কীর্তি মলিন করিয়া দিয়া ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’র মত আঙ্কারা জগতের সমক্ষে এক নূতন গৌরবে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে বর্তমান শতাব্দীর গোড়ার দিকে।
ঘোর অকল্যাণের মধ্য দিয়া করুণাময়ের অদৃশ্য কল্যাণ-হস্ত মানুষের অভিনন্দনের কোন্ আয়োজন কিভাবে সম্পূর্ণ করিয়া তোলে বলা যায় না। তুর্কী জাতির ইতিহাসে দুর্যোগের কালরাত্রি নামিয়া আসিয়াছে, দুরপনেয় কলঙ্ক-কালিমায় তুরস্কের আকাশ অন্ধকার; সেই চরম সঙ্কট-সময়ে সকলের অলক্ষ্যে, কখন্ অরুণ-রবির সোনালি হাসির ছটা ঝিকমিক করিয়া উঠিল আঙ্কারার উদয়-দিগন্তে। ইস্তাম্বুলের তীরে তীরে বিদেশী শত্রুর ঘাটি বসিয়াছে, চিরদিনের মত নিশ্চিহ্ন হইতে চলিয়াছে একটা বিরাট জাতি,—এমন সময় কালরাত্রির অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া আঙ্কারার প্রান্তরে এক পুরুষসিংহের হাতে অরুণ ঊষার খড়্গ ঝলসাইয়া উঠিল।
১৯১৯ সালে মোস্তফা কামালপাশা কয়েকজন মাত্র সহচর লইয়া আঙ্কারায় আড্ডা গাড়িলেন। এই স্বদেশ-প্রেমিক বীর সেনাদল সংখ্যায় মুষ্টিমেয় হইলে কি হইবে, তাঁহাদের প্রতি রক্তবিন্দুতে আজাদীর নেশা ও স্বদেশ-প্রেমের উন্মাদনা; তাঁহাদের শিরায় শিরায় অনল-প্রবাহ। প্রতিদিন স্রোতের মত কতশত নরনারী আসিয়া তাঁহাদের এই মরণপণ সংগ্রামে যোগদান করিতে লাগিলেন। বফরাসের তীরে যে-সূর্য অস্তমিত হইয়াছিল, বীর শহীদানের তাজা খুনে রাঙিয়া সেই সূর্য আবার দেখা দিল আঙ্কারার আকাশে। সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস স্তূপের উপর গড়িয়া উঠিল একটি সুখী, আত্ম-সচেতন, শক্তিশালী নবীন জাতির নয়া বুনিয়াদ। জাতির জনকের ইঙ্গিতে একটি সদ্যজাগ্রত জাতি তুরস্কের মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে ভাঙিয়া চুরিয়া আধুনিক জগতের উপযোগী করিয়া রাতারাতি একেবারে নূতন ভাবে গড়িয়া তুলিল। আঙ্কারা নব নব বিস্ময়ে বিশ্ববাসীকে চমকিত করিয়া দিতে লাগিল প্রতিদিন।
আঙ্কারা পৌঁছিবার সঙ্গে সঙ্গে এমনি কতশত কথা আমার মনের মধ্যে ভিড় করিয়া আসিতেছিল।
খোশ আমদেদ্
এদিকে আমাদের ট্রেন স্টেশনে থামিতে না থামিতে দেখিতে পাইলাম প্লাটফর্মে লোকের অসম্ভব ভিড়।
পাকিস্তানী মেহ্মানদের খোশ আমদেদ্ জানাইবার জন্য আজ লোক ভাঙিয়া পড়িয়াছে আঙ্কারা স্টেশনে। সরকারী কর্মচারী, ইউনিভার্সিটির প্রফেসার, ছাত্রছাত্রী ও জনসাধারণ—সবই আছে তার মধ্যে। তুরস্কের বিখ্যাত কুস্তিগীর, যিনি ১৯৫০ সালে তুর্কী শুভেচ্ছা মিশনের সঙ্গে পাকিস্তান সফরে আসিয়াছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে আনিয়াছেন এক গাদা ফুলের মালা ও তোড়া। জনতার মধ্য হইতে ধ্বনি উঠিতেছে, ‘পাকিস্তান যিন্দাবাদ।’ ‘এ্যাশাসিন্ তুর্কীয়ে’ সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ তুলিতেছে আমাদের দল।
ভিড় ঠেলিয়া চলিতেছি আমরা ত্রিশ জন। ভিড়ের মধ্য হইতে কেউ জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ‘কই তোমাদের নীলুফার? নীলুফার যে আমার মায়ের নাম।’ আর কেউ বলিতেছেন, ‘মোস্তফা কামাল কোন্টি? সে তো নেহাত আপনজন আমাদের।’ ভাবিতেছি, জনসাধারণ কেমন করিয়া জানিতে পারিলেন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের নাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়িয়া গেল, করাচীতে তুরষ্কের চার্জ্জ দ্য এফেয়ার্স আবদেল আহাদ বে বলিয়া দিয়াছিলেন ‘পাকিস্তান শুভেচ্ছা মিশন’ তুরস্কে পৌঁছিবার আগেই সদস্যদের নাম ধাম পরিচয় সেখানকার খবরের কাগজে বাহির হইয়া যাইবে। আবদেল আহাদ বে আরো বলিয়াছিলেন, ‘তোমরা তুরষ্কে পৌঁছিলে তোমাদের ভাই-বোনেরা সেখানে অভ্যর্থনা করিয়া লইবে তোমাদের।’ বাস্তবিকই যতদিন তুরষ্কে ছিলাম, মনে হয় নাই বিদেশে আছি। তুর্কীরা ভাই-বোনের স্নেহ-মমতা ও আন্তরিকতায় আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিলেন আমাদের।
আঙ্কারায় আমাদের পার্টির মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ছয় জনের ‘জাহান পালাসে’ (Gahan - Palas) থাকিবার ব্যবস্থা হইল। মহিলা টেকনিক্যাল ট্রেনিং স্কুলের (Kiz Teknik Orithmen Okul) হোস্টেলে আমাদের ছাত্রীদের বন্দোবস্ত করিয়া রাখা হইয়াছে। ছাত্ররা থাকিবেন অন্য একটা হোস্টেলে। আমি কিন্তু ‘জাহান পালাসে’ না থাকিয়া মেয়ে-হোস্টেলে আমাদের ছাত্রীদের কাছাকাছি থাকিয়া গেলাম।
আঙ্কারা পালাস
আঙ্কারা পৌঁছিয়া আমরা পাকিস্তানের রাষ্ট্র-দূত রাজা গজন্ফর্ আলী খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে গেলাম রাত্রেই। তিনি ইরান হইতে সবেমাত্র আঙ্কারা আসিয়া পৌঁছিয়াছেন, এখনো কার্যভার গ্রহণ করেন নাই; তাঁহার নির্দিষ্ট বাসভবন এখনো দখল করা হয় নাই। তিনি এখন আছেন ‘আঙ্কারা পালাসে’ (Ankara Palas)। এটা আঙ্কারার বৃহত্তম হোটেল। মাস ছয় আগে গ্রীসের রাজা আঙ্কারা সফরের সময় এখানেই ছিলেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব মিঃ এণ্টনি ইডেন ও পাকিস্তানের বৈদেশিক মন্ত্রী মিঃ জাফ্রুল্লাহ্ খান ছিলেন এই হোটেলেই। আজ মিঃ গজন্ফর্ আলীর শরীরটা কিছু অসুস্থ। তাই ডাক্তার বাড়ির বাহিরে যাইবার অনুমতি দেন নাই।
নীচের তলায় প্রবেশের পথে ‘ওয়েটারের’ জিম্মায় আমাদের ভারী কোটগুলি জমা দিয়া আমরা উপরে চলিলাম। তাহারা ব্রাকেটের উপর কয়েকশো’ কোট সাজাইয়া রাখিয়াছে। ফিরিবার সময় আবার ইহাদের সাহায্য না হইলে কোট খুঁজিয়া পাওয়া আমাদের সাধ্যে কুলাইবে না। কোটের বদলে আমাদের প্রত্যেকের হাতে গুঁজিয়া দেওয়া হইয়াছে একটা করিয়া নম্বর-লেখা টিকেট। ফিরিবার সময় টিকেট দিলেই তৎক্ষণাৎ ফেরৎ পাওয়া যাইবে কোট।
প্রাথমিক সম্ভাষণের পর রাজা সাহেব রহস্য করিয়া এদেশের আবহাওয়ার কথা বলিলেন, ‘কবির ভাষায় বলিতে হইলে আবহাওয়া তো নয় যেন সুন্দরী মেয়ের মেজাজ; এখন ঠাণ্ডা, আবার তখন গরম, কিছুই তাল পাওয়ার জো নাই।’
আঙ্কারা পালাসে রাজা সাহেবের কাছ হইতে তাড়াতাড়ি বিদায় গ্রহণ করিয়া মেয়েদের হোস্টেলে পৌঁছিতে জন কয়েক টিচার ও চারশো’ ছাত্রী আমাদের অভ্যর্থনা করিয়া নিলেন। স্কুলটাতে ট্রেনিং বিভাগের ও সাধারণ বিভাগের সব শুদ্ধ হাজার খানেক ছাত্রী আছে, তার মধ্যে শ’ চারেক বোর্ডার। স্কুল ও হোস্টেল দুই-ই এক জায়গায়। আমরা একটু নড়িলে চড়িলে দশ বিশটি মেয়ে এক সঙ্গে ছুটিয়া আসিতেছে, কি চাই। অত মেয়ের মধ্যে দু’ চারটি মাত্র ইংরেজী জানে। আমার কিসের প্রায়োজন, তাহা বুঝাইবার জন্য বুঝাইবার জন্য ইশারা-ইঙ্গিতের কসরৎ শুরু করিতেই মেয়েরা ছুটিয়া যাইতেছে, চোখের পলকে ধরিয়া নিয়া আসিতেছে অন্য কোন একটি মেয়েকে, যে ভাঙ্গা ভাঙ্গা দু’ চার শব্দ ইংরেজী বলিতে পারে। এদিকে আমরা প্রথম রাত্রেই দু’ চারটা তুর্কী শব্দ আয়ত্ব করিয়া নিয়াছি; পিয়াস লাগিলে চাহিতেছি ‘স্যু’, পানি গরম করিতে হইবে বুঝাইবার জন্য বলিতেছি ‘সাজাক্’। ওরা আমাকে কেউ ডাকিতেছে ‘প্রফেসার’ আর কেউবা ‘বেগ্যুম’।
আতাতুর্কের মাযার
১৪ই নবেম্বর। আজ সকাল হইতে শুরু হইয়াছে আমাদের আঙ্কারার প্রোগ্রাম। আগে হইতেই প্রোগ্রাম তৈরী করিয়া রাখিয়াছেন তুরস্ক গভর্নমেণ্ট। পরামর্শ দিয়াছেন পাকিস্তানের দূতাবাস। সকালে আমাদের প্রথম কাজ হইল আতাতুর্কের মাযারে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল বেলায় সোনালী সূর্যের আলোয় আমরা ত্রিশজন পাকিস্তানী সমাধি-গৃহের সম্মুখে সেই বিশাল পুরুষের মূর্তির ছায়া তলে দাঁড়াইয়া চারিদিকে চোখ ফিরাইয়া দেখতে লাগিলাম তাঁর বিরাট কীর্তি। জায়গাটা বেশ একটু উঁচুতে, একটা পাহাড়ের উপর: নীচে চারি দিকে আঙ্কারা শহর। জাতির জনক যেন অতন্দ্র প্রহরীর মত নিশিদিন শিয়রে জাগিয়া আছেন অটল মহিমায়। জাতির এতটুকু ত্রুটি-বিচ্যুতি বুঝি এড়াইতে পারিবে না তাঁহার সতর্ক দৃষ্টি।
টাটকা ফুলের রঙীন-পাপড়ির পুরু আস্তরণে সমাধি ঢাকা। একটা জাতিকে যিনি দিয়াছেন দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করিয়া সসম্মানে বাঁচিবার অধিকার, নত মস্তকে সেই শক্তিধর মহাপুরুষের উদ্দেশে শ্রদ্ধা অর্পণ করিয়া আমরা নীরবে বাহির হইয়া আসিলাম।
উলুস্ ময়দান
ইতিমধ্যে পথে আমরা পুষ্পমাল্য অর্পণ করিয়াছি স্বাধীনতা সমরের স্মৃতি-স্তম্ভে। উলুস্ ময়দান অর্থাৎ উলুস্ স্কোয়ারে ১৯২৭ সালে নির্মিত হয় এই স্তম্ভ। চতুষ্কোণ স্তম্ভের চার পাশে সেই দারুণ সঙ্কট-সময়ে জাতির সর্বস্ব-পণের বিভিন্ন দৃশ্য খোদিত রহিয়াছে। কামাল আগাইয়া চলিয়াছেন, আশে পাশে তাঁর সহকর্মী সেনাপতিগণ, পশ্চাতে আগাইতেছেন জনসাধারণ। অন্য পাশে সশস্ত্র সেনাদল, কেহ কেহ কপালে হাত রাখিয়া চোখের উপর ছায়া রচনা করিয়াছে, গভীর মনোযোগের সঙ্গে দূরে লক্ষ্য করিতেছে শত্রুর গতিবিধি। দেশের নারী-শক্তি ঘুমাইয়া ছিল না সেই দুর্দিনে। স্তম্ভের একপাশে নারী-মূর্তি, বোমা বহন করিয়া চলিয়াছে। পুরুষের সঙ্গে সমানে শত্রু ধ্বংস করিতে গিয়া কোমল করে মারণাস্ত্র পর্যন্ত ধারণ করিতে হইয়াছে তাদের, সেই স্মৃতি জাগাইয়া রাখা হইয়াছে এই দৃশ্যে। অন্য এক পাশে পশ্চাৎ পট-ভূমিতে দেখা যাইতেছে, একটি বিরাট মহীরুহ ধ্বসিয়া পড়িয়াছে, আবার সেই বৃক্ষমূল হইতেই গজাইয়া উঠিয়াছে একটি সতেজ নধর চারা গাছ। অটোম্যান সাম্রাজ্যের ধ্বংস স্তূপের উপর গড়িয়া উঠিতেছে গণতান্ত্রিক নব্য তুরস্ক; ইহার মূলে রহিয়াছে এই কল্পনা, এ কথা বুঝিতে বেশী কষ্ট হয় না। স্তম্ভশীর্ষে শোভা পাইতেছে ঘোড়সওয়ার গাজী মোস্তফা কামাল পাশার মূর্তি।
আতাতুর্ক্ বুল্ভারি
উলুস্ ময়দান হইতে আমরা ইয়েনি শহর অর্থাৎ নূতন শহরে আতাতুর্কের বাসভবনে চলিলাম। উলুস্ ময়দান পুরাতন আঙ্কারায় অবস্থিত। প্রাচীন যুগের ধ্বংসাবশেষ সবই পুরাতন আঙ্কারায়। তার আশে পাশে রহিয়াছে ঘন বসতি, পুরাণো ধরণের বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট। সে অঞ্চলে আমাদের আনাগোনা হইতেছে না। পুরাতন আঙ্কারার পাশাপাশি গড়িয়া উঠিয়াছে ইয়েনি শহর। উলুস্ ময়দান হইতে ইয়েনি শহর পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে প্রায় চার মাইল দীর্ঘ প্রশস্ত রাজপথ, ‘আতাতুর্ক বুল্ভারি।’ গণতন্ত্রের আমলে এ পথের দু’ ধারে যেন যাদুকরের মায়াদণ্ডের স্পর্শে জাগিয় উঠিয়াছে ক্লাব, অপেরা হাউস, ব্যাঙ্ক, বিশ্ব-বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি, সরকারী দফ্তর, ম্যান্সন্ ও মনোরম উদ্যান। এক জায়গায় দেখিতেছি আঞ্জুমনে হেলালে আহ্মারের (রেড ক্রেসেণ্ট সোসাইটির) প্রাসাদতুল্য ভবন।
আতাতুর্কের বাসভবন
আতাতুর্কের পুরাতন বাসগৃহ একটা বিরাট জাতির নবজন্মের সূতিকাগার। স্বাধীনতা-সমরের সময় এবাড়ীতেই থাকিতেন তিনি। এর কক্ষে কক্ষে প্রতিটি ধূলিকণার মধ্যে বুঝি আজো ঘুমাইয়া রহিয়াছে তুর্কী জাতির মুক্তির ফরিয়াদ, ধ্বংসস্তূপের ভিতর হইতে নতুন সৃষ্টির বেদনা। মোস্তফা কামাল ও তাঁহার সহচরদের কত চিন্তাক্লিষ্ট দিবস ও কত বিনিদ্র রজনীর নীরবসাক্ষী এর প্রতিটি আসবাব ও সাজসরঞ্জাম। কোনটি কামালের শয়ন-কক্ষ, কোনটি তাঁর ডাইনিং রুম, আর কোনটি বা অভ্যর্থনা কক্ষ (Reception Room), যেখানে তিনি বিদেশী কূটনৈতিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা করিতেন। একে একে কামালের লাইব্রেরী, অফিস-রুম সবই আমরা ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিলাম!। একপাশে পড়িয়া আছে বিরাট বিলিয়ার্ড টেবিল। প্রত্যেক কামরার দেওয়ালে দেওয়ালে বিস্তর ফোটো এবং পেণ্টিং তুরষ্কের ইতিহাসের স্মরণীয় দিবস-রজনীর স্মৃতি বহন করিতেছে। কোথাও বল্কান্ যুদ্ধের ঘটনা আর কোথাও বা স্বাধীনতা সমরের কোন অভিযান—কামাল আগাইয়া চলিয়াছেন, পেছনে মুক্তিফৌজ; এক জায়গায় আরবী পোষাকে কামাল, অন্যত্র কামালের মর্মর মূর্তি, এটা কোন একটা আরব স্টেটের উপহার। কোথাও ইসমত ইনোন্যূর ছবি, কামালের শয়ন কক্ষে জননী যোবেদার চিত্র। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলাম, কামালের জীবনকালে যেমন ছিল প্রত্যেকটি জিনিস আজো ঠিক তেমনি অবস্থায় সাজাইয়া রাখা হইয়াছে।
প্রেসিডেণ্ট ভবন
এর পরে আমরা গেলাম প্রেসিডেণ্টের বাসভবনে। কামালের জীবনের অভিনব পটপরিবর্তন এবং তুরস্কের ইতিহাসের রোমাঞ্চকর নতুন অধ্যায়ের সূচনা দেখিয়াছে এই গৃহ। প্রাসাদের ভিতরের আঙিনায় সাঁতারের জন্য বিরাট সন্তরণাগার (Swimming Pool)—তার চারদিকে ঘোরানো মার্বেল পাথরের বারান্দা। ডাইনিং রুম পার হইয়া আমরা যে-ঘরে পৌঁছিলাম, সেখানে বিদেশী কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেন প্রেসিডেণ্ট। এ কক্ষের বিশেষত্ব এই যে ঝাড়-বাতির আয়নার টুকরা গুলিতে কক্ষের ভিতরকার লোকজনের ছায়া পড়ে বিপরীত ভাবে। আরো কক্ষে কক্ষে সাজানো রহিয়াছে নানান্ দেশের নানান্ রকমের সুন্দর সুন্দর উপহার। এক জায়গায় কামাল আতাতুর্ক ও জালাল বায়ারের একসঙ্গে তোলা একটা বড় ফটোগ্রাফ। কামাল তখন তুর্কী গণতন্ত্রের প্রেসিডেণ্ট আর জালাল প্রাইম মিনিস্টার।
![]()
প্রধান মন্ত্রী আদ্নান্ মেন্দেরিস ও পাকিস্তান শুভেচ্ছা মিশন। আদনান মেন্দেরিসের ডানদিকে পশ্চাতের সারিতে ডক্টর দানিয়েল বেদিজ। প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ারের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হইল না, কারণ ঐ সময় তিনি ছিলেন বুর্সায়। আমরা খাতায় (Visitors Book) নাম সহি করিয়া তিনি বুর্সা হইতে ফিরিলে সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করিয়া আসিলাম।
প্রেসিডেণ্টের বাসভবন হইতে সেক্রেটারিয়েটের দিকে চলিয়াছি। পাহাড়ের উপর হইতে ঢালু রাস্তা ধরিয়া আমাদের বাস ক্রমেই নামিতেছে নীচের দিকে। চারদিকে দেখিতেছি আঙ্কারা শহরের ঘনবিন্যস্ত সারি সারি দালান কোঠা, কোথাও পাহাড়ের গায়ে, কোথাও সমতল ভূমিতে ছোট ছোট খেলাঘরের মত সাজানো রহিয়াছে।
স্পীকার রফিক কোরাল্তান্
সেক্রেটারিয়েটে পৌঁছিতেই অভ্যর্থনা করিয়া নিলেন পার্লামেণ্টের স্পীকার রফিক কোরাল্তান্। হাত মিলাইতে গিয়া বলিলাম, ‘নাসিল্ সেনিজ্, এফেন্দেম্’ (How are you, Sir) তিনি ‘ই, ই, তাশাক্যুরে এদেরেম্ (Alright, thank you) বলিতে গিয়া হাসিয়া ফেলিলেন এবং তুর্কী ভাষায় আমাদের এরিমধ্যে অতখানি দখল জন্মিয়াছে দেখিয়া অভিনন্দন জানাইলেন।
মিঃ রফিক কোরালতান্ দীর্ঘ পঁচিশ বছর কামাল আতাতুর্কের সহচর ও সহকর্মী ছিলেন। তাঁহার সহিত সাক্ষাতের সময় বক্ততা প্রসঙ্গে তিনি সেই হারানো দিনের কথা স্মরণ করিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উল্লেখ করিয়া বলিলেন, ‘তুরস্ক আজ আজাদ। জাতির চরম দুর্দিনে মনে হইয়াছিল জাতির মৃত্যু হইয়াছে। কিন্তু সত্যই কি তাই? না, জাতির প্রাণের স্পন্দন স্তব্ধ হয় নাই এক মুহূর্তের জন্যও। গাছের পাতা ঝরিয়া পড়িয়াছিল বটে, কিন্তু মূল তেমনি সঞ্জীবিত ছিল প্রাণ-রসে। বিকল হইয়া পড়িয়াছিল দেশের শাসন-যন্ত্র মাত্র, জাতি নয়। দেশের কর্তৃত্বভার থাকিবে জনসাধারণের হাতে, জনসাধারণ ভোগ করিবে সমান অধিকার; অর্থনৈতিক সাম্যই হইবে মূলনীতি, এই-ই হইয়াছিল আমাদের লক্ষ্য। পাকিস্তানেরও লক্ষ্য তাই। পাকিস্তান আগাইয়া চলুক এই পথে, এই আমাদের আন্তরিক কামনা।’ কথা প্রসঙ্গে রফিক বে’ মিলিটারী ট্রেনিংয়ের উপর বিশেষ জোর দিলেন এবং জানিতে চাহিলেন পাকিস্তান এদিক দিয়া কতখানি অগ্রসর হইয়াছে।
আদ্নান মেন্দেরিস্ ও ফুয়াদ কপ্রুলু
সেক্রেটারিয়েটের ক্যাবিনেট-রুমে আমাদের অভ্যর্থনা জানাইলেন প্রধান মন্ত্রী আদ্নান মেন্দেরিস্ ও বৈদেশিক মন্ত্রী ফুয়াদ কপ্রুলু। দু’জনেই সংক্ষেপে কয়েকটি কথায় তুর্কী ও পাকিস্তানীদের বহু পুরাতন সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করিলেন এবং বর্তমান যুগে শুধু এই দু’জাতিরই নয়, সারা দুনিয়ার স্বার্থের খাতিরে তুরষ্ক ও পাকিস্তানের নিবিড়তর সৌহার্দের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশী বলিয়া মন্তব্য করিলেন। কপ্রুলু নিজে ইতিহাসের প্রফেসার ছিলেন। তিনি দু’দেশের ছাত্র ও অধ্যাপকদের ঘনিষ্টতর সম্পর্ক স্থাপনের এবং মন জানাজানির প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ জোর দিলেন। কপ্রুলু ইংরেজী জানেন না, তিনি আগাগোড়া আলাপ আলোচনা চালাইলেন তুর্কী ভাষাতেই। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আঙ্কারা টেকনিক্যাল টিচার্স টেনিং স্কুলের (Kiz Teknik Orithmen Okul) ফাইনাল ক্লাসের ছাত্রী বেদিয়া মিরাতা। মেয়েটি সাইপ্রাসের। ইংরেজী মোটামুটি বলিতে পারেন। দোভাষীর কাজ করিবার ভার পড়িল তাঁহার উপর। অন্য একজন মহিলাও সরকারী দোভাষীর কাজ করিতেছেন দেখিতে পাইলাম। আদ্নান্ মেন্দেরিস্ মোটামুটি ইংরেজীতেই কাজ চালাইলেন। পাকিস্তানীদের পক্ষে প্রফেসার এ. বি. এ. হালিম ও আমি বেদিয়ার দোভাষীগিরির উপর ভর করিরা প্রীতি ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করিলাম। বেদিয়া বলিতেছেন, ‘এই ফাঁকে ইংরেজীতে পাকা হইয়া গেলাম আমি।’
‘বালি’ কামাল আয়গুন
এর পর আমাদের সাক্ষাৎ দান করিলেন আঙ্কারার গভর্নর কামাল আয়গুন। বিলায়ে আঙ্কারার ‘বালি’ তিনি। গভর্নরকে ইহারা বলেন ‘বালি’। আলোচনা প্রসঙ্গে কামাল আতাতুর্কের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করিলেন। আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করিয়া তিনি বুঝাইলেন, জাতির ইতিহাসে এই দুইটি শহরের স্থান কোথায় ও কোন্ দিক দিয়া গুরুত্ব কতখানি। পাকিস্তানের প্রতি তুর্কী জাতির নিবিড় প্রীতি ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতে গিয়া তিনি বলিলেন, ‘তুরস্কের পথে পথে তুর্কীরা তোমাদের দেখিবার জন্য ভিড় করিতেছে—প্রত্যেকটি তুর্কীর চোখে মুখে ফুটিয়া উঠিতেছে পাকিস্তানের জন্য অকৃত্রিম মমতা ও দরদ।’
পার্লামেণ্ট হাউস
আঙ্কারা পালাসের সামনেই পার্লামেণ্ট হাউস। ভেতরে আমাদের ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখানো হইল। ওপরে দোতলায় তুরষ্কের প্রেসিডেণ্টের জন্য স্বতন্ত্র আসন নির্দিষ্ট রহিয়াছে দেখিতে পাইলাম। মনে পড়িতেছে, এই গ্র্যাণ্ড ন্যাশনাল এসেমব্লী হইতে তুরস্ককে গণতন্ত্র বলিয়া ঘোষণা হইয়াছিল ১৯২৩ সালের ২৫শে অক্টোবর; সঙ্গে সঙ্গে এই নবজাত শিশু-রাষ্ট্রের কর্ণধার নির্বাচিত হইলেন গাজী মোস্তফা কামাল। এখান হইতেই প্রতিদিন নব নব আইন প্রণয়ন করিয়া নিয়ন্ত্রিত করা হইতে লাগিল নব জাগ্রত জাতির ভবিষ্যতের গতিপথ। সেদিন যাঁরা ছিলেন জাতির ভাগ্যনিয়ন্তা, অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এই কর্মশালায় তাঁরা সুদক্ষ কারিকরের মত গড়িয়া লইয়াছেন নূতন নূতন হাতিয়ার, আর সেই হাতিয়ারের নির্মম আঘাতে যুগযুগান্তের পুঞ্জীভূত আবর্জনা ধ্বংস করিয়া সম্পূর্ণ নূতন ছাঁচে রাতারাতি গড়িয়া তোলা হইল নব্য তুরষ্কের নূতন সমাজ-ব্যবস্থা। আরো মনে পড়িতেছে, গাজী মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের প্রধান সহকারীদের মধ্যে নারীও আপন মহিমায় অধিকার করিয়াছিল বিশিষ্ট স্থান!
আঙ্কারা পৌঁছিবার আগে ট্রেনে পার্লামেণ্টের একজন সদস্যের কাছে শুনিয়াছিলাম বর্তমানে সর্বশুদ্ধ চারশো পঁচাত্তর জন সদস্যের মধ্যে মহিলা মাত্র তিনজন। গ্র্যাণ্ড ন্যাশন্যাল এসেম্বলী হাউসে ঢুকিয়া সে কথা ঘুরিয়া ফিরিয়া মনে পড়িতে লাগিল। পরে ![]()
কামাল আতাতুর্ক শুধু আইন প্রণয়ন করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, গণজীবনে তাহা কার্যকরী করিবারও ব্যবস্থা করিয়াছেন। রোমান হরফ প্রবর্তনের জন্য তাঁহাকে দেশময় প্রচারকার্য চালাইতে হইয়াছে। ৮০ পৃঃ মাদাম হালিদে এদিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইলে এবিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, ‘তাতে কি আসে যায়? পার্লামেণ্ট ছাড়াও তো কাজ করিবার ক্ষেত্র রহিয়াছে বিস্তর।’ মাদাম হালিদে ও তাঁর স্বামী,—এঁরা দু’জনে পার্লামেণ্টের মেম্বর। মহিলা-সদস্যের সংখ্যার কথা পরে আবার কথা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মিঃ কপ্লুর কাছে তুলিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, ‘মেয়ে-ভোটাররা ভোট দেন পুরুষ-প্রার্থীকে—এই সোজা কারণে মেয়ে প্রার্থীরা ভোট পান না।’ তুরষ্কে মেয়েদের জন্য স্বতন্ত্র সংরক্ষিত আসন নাই পার্লামেণ্টে।
শুনিলাম পার্লামেণ্টের আর্দালী, বেয়ারা সকলেই মূক। ভেতরের কথা যাহাতে বাহির না হয়, সেজন্যই লোক নিযুক্ত করা হয় সেভাবে। কথাটা কেমন যেন মনে হইল।
গাজী ফরেস্ট ফার্মে চিড়িয়াখানা
আমাদের বিকালের প্রোগ্রাম গাজী ফরেস্ট ফার্মে চিড়িয়াখানা পরিদর্শন। নানান্ রকমের পাখী, কয়েকটা সাপ ও নেকড়ে বাঘ, এই নিয়াই চিড়িয়াখানা। এক জায়গায় অনেকগুলি কুকুর খাঁচায় আবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে। উটগুলি নূতন ধরণের। ওদের ঘাড়ের উপর শোভা পাইতেছে দীর্ঘ কেশের ঝালর। উটের লোম হইতে কম্বল, পোষাক-পরিচ্ছদ হইতে শুরু করিয়া তৈরি হয় আরো অনেক কিছু। মনে হইল, চিড়িয়াখানার সবচেয়ে দর্শনযোগ্য জীব একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর দু’টি হাতী। হাতী দু’টির মধ্যে বড়টির নাম ‘আজাদী’; এটা তুরস্কের চিড়িয়াখানায় পাকিস্তানের উপহার। মনে পড়িল, বছর দুই আগে ‘আজাদী’ যখন প্রথম তুরষ্কে পৌঁছায় তখন তাকে নিয়া কি হৈ চৈ! আঙ্কারার খেলার মাঠের স্টেডিয়াম হইতে তার সঙ্গে তুরষ্কের জনসাধারণের হইয়াছিল প্রথম পরিচয়। ছোট হাতীটি ভারতের উপহার। হাতী দু’টির সামনে বারান্দায় দেয়াল-জোড়া লেখা রহিয়াছে তুর্কী ভাষায় তাদের পরিচয়। জন্মভূমি হইতে হাজার হাজার মাইল দূরে এই জানোয়ারগুলি ত্রিশজন স্বদেশবাসীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক অনুভব করিল কতখানি—রয়েল বেঙ্গল টাইগারটির দিকে চাহিয়া তাই ভাবিলাম। চিড়িয়াখানা হইতে আমরা বাহির হইয়া আসিলাম সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে।
মেয়র বেন্দের্ লিওলু
সন্ধ্যার পর আঙ্কারার মেয়রের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হইল। সারাদিন দৌড়াদৌড়ির পর এবার সাক্ষাতের পালা শেষ করিতে হইল সংক্ষেপে। মেয়র বেন্দের্ লিওলু তাঁর নাম দস্তখত-করা কতগুলি বই আমাদের উপহার দিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন। প্রথম দিনে প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ার ছাড়া অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের পরিচয়ের পালা এভাবে মোটামুটি সাঙ্গ হইল।
খানাপিনা
দুপুরে আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির রেক্টরের সঙ্গে আমাদের খানার দাওয়াত ছিল। রাত্রে তুর্ক-পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সঙ্ঘের তরফ হইতে খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হইয়াছিল গাজী ফরেস্ট ফার্মে।
একটা মজা হইল। ১৯৫০ সালের তুর্কী সাংস্কৃতিক মিশনের মারফতে তুর্কীরা জানিতে পারিয়াছেন যে রান্নার সঙ্গে বেশী পরিমাণ মসলা পাকিস্তানীদের পসন্দ। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আদান প্রদান এই সমিতির উদ্দেশ্য। তাই এঁরা বিশেষ যত্নের সঙ্গে আমাদের জন্য তৈরি করিয়াছেন পাকিস্তানী খানা। কিন্তু দেখা গেল, তরকারীতে এত বেশী মসলা দেওয়া হইয়াছে যে পাকিস্তানী মেহমানদের খাওয়াই হইল না।
যেমন ভাষায়, আচার ব্যবহারে, জীবন-যাত্রায়, তেমনি খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারেও দেখিতেছি এখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমাবেশ। পাশ্চাত্য ধরণে টেবিল-চেয়ারে, কাঁটা-চামচেই খাওয়া হইতেছে; কিন্তু খাদ্য পূরাপূরি পাশ্চাত্য নয়। পাশ্চাত্যের সিদ্ধ তরকারী ও মাছ-গোশতের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচ্য ধরণেরও অনেক কিছু দেখিতেছি সব জায়গায়। খাবার টেবিলে তুর্কী ডিসের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের সুযোগে কতগুলি খাদ্য পাকিস্তানী খাদ্যের সঙ্গে অভিন্ন বলিয়াই মনে হইল। ভেড়ার গোশত বা গাওয়া গোশতের রকমারি ‘কেবাবে’র মধ্যে রহিয়াছে ‘শিশ্কেবাব’।
এটা আমাদের শিক্কবাব ছাড়া আর কিছু নয়। জলপাইয়ের যা’ চেহারা আমাদের দেশের জলপাইয়ের সঙ্গে মেলে না মোটেই। কালো রংয়ের ছোট ছোট ফল—তাই এদের অলিভ বা জলপাই। ওদের ‘পিলাও’ আমাদের পোলাওয়েরই রূপান্তর। আমাদের যেমন সরিষার তৈলে রান্না হয়, তেমনি তুরষ্কের জলপাই তৈল। পিলাওটা পাকানো হইতেছে জলপাই তেলেই। সুগন্ধটা যে আমাদের ক্ষুধা বৃদ্ধির বেশী সহায়তা করিতেছে তা’ নয়। সালাদের সঙ্গে খিরা ও বিলাতি বেগুন ছাড়া এক রকম ছোট ছোট ফলও মেশানো রহিয়াছে, নাম ‘জৈতুন’। ফলটা আমাদের অপরিচিত নয়, কিন্তু আমাদের সালাদের সঙ্গে জৈতুন চলে না।
তুর্কী ভাষায় আমাদের শব্দ ভাণ্ডার ক্রমেই বাড়িতেছে। দই চাহিতে গিয়া বলিলাম ‘ইয়োর্ক’ (yorgk)। ওঁরা চিনি ছাড়াই দই সাবাড় করিতেছেন, কিন্তু আমাদের চাহিয়া নিতে হইল শ্যক্যর (চিনি)। দই ফেটিয়া তৈরি করা হইয়াছে মাঠা। ওটা খাবার টেবিলে ‘আয়রান’ নামে চলিতেছে আমাদের ‘বোরানীর’ মত। এর কোনটাই পাকিস্তানীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি হয় নাই।
একটা বিশেষ টার্কিশ ডিশ, ‘সার্মা’ (Sarma) আঙুর পাতায় জড়াইয়া ছোট ছোট ভাতের পুঁটলি রান্না করা হইয়াছে, বোধ হয় বাষ্পের ওপর। পাতে পাতে দু’একটা করিয়া পুঁটলি পড়িল। তুরষ্কের ছোট বড় প্রায় সব বাড়ীতেই গেটের দু’পাশে দেখা যাইবে আঙুর লতা। ছোট ছোট গৃহস্থ বাড়ীতে যেখানে বাড়ীর সামনে চমৎকার ফুলের বাগান সাজানো সম্ভব হয় নাই, সেখানেও দু’টি আঙুর গাছ লতাইয়া উঠিয়াছে ফটকের উপর; কিন্তু থোকা থোকা আঙুর কোথাও চোখে পড়িতেছে না। এটা আঙুরের মৌসুম নয়।
টেবিলে ফুলদানি ছাড়াও সব জায়গায় দেখিতেছি বাসনপত্রের ফাঁকে ফাঁকে নানা রংএর টাটকা ফুল ও লতাপাতা ডিজাইন করিয়া বিছাইয়া টেবিল সাজানো হইয়াছে।
সকাল বেলা হোস্টেলে পাউরুটির সঙ্গে একটা নূতন জিনিস খাইয়াছি—গোলাপ পাপড়ির জ্যাম। যুগে যুগে কবিদের কাব্য রচনার প্রেরণা জোগাইয়াছে গোলাপ ফুল। আমরা জরদা, ফির্নী, হালুয়া, বরফি তৈরি করিয়া দু’ এক ফোঁটা গোলাপ জল ছিটাইয়া দিয়াছি, যেন গোলাপের সুবাস পাওয়া যায়। আর এ যে আস্ত গোলাপ ফুল দিয়া তৈরি হইয়াছে জ্যাম। তৈরি করিবার প্রণালীটা জানিয়া নিলাম, কিছু কঠিন নয়। চিনির শিরার মধ্যে গোলাপ ফুলের পাপড়ি সিদ্ধ করিয়া নিলেই হইল। বেশ গোলাপী রং ও গোলাপী সুগন্ধ। কিন্তু আমাদের দেশের মেয়েরা এটা পারিবেন মনে হয় না। এত বিলাসিতা পোষাইবার মত প্রচুর গোলাপ এদেশে পাওয়া যাইবে কোথায়?
খাওয়ার সময় দেখিতেছি অপর্যাপ্ত ফলের আয়োজন। টেবিলবোঝাই নানা রকম ফল ছাড়াও খাওয়ার পর মিষ্টদ্রব্য (sweet dish), কোথাও কোথাও দেখিতেছি ফলের তৈরি ‘কম্পোস্তো’। টেবিলে ইউনিভার্সিটির একটি ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করিতেছি ইহার নাম ও প্রস্তুত প্রণালী। সে ওস্তাদী ধরণে বলিয়া দিতেছে, ‘একটা আপেলকে ফালি করিয়া কাটিয়া নিবে, তারপর প্রচুর পরিমাণ হালকা শিরার মধ্যে সামান্য একটু খানি সিদ্ধ করিয়া নিলেই তৈরি হইল ‘কম্পোস্তো’। আরো বেশী চিনিতে বেশ কিছুক্ষণ সিদ্ধ করিয়া শিরা গাঢ় করিয়া নিলে তৈরি হইয়া যায় জ্যাম। জ্যাম ও ‘কম্পোস্তোর’ মধ্যে কেন এই তো তফাৎ। এটা কুইন্ ফলের ‘কম্পোস্তো’। আপেল বা অন্য যে-কোন ফল দিয়া ‘কমপোস্তো’ হইতে পারে,—বলিতেছে ছেলেটি।
পানি বুঝাইতে হইলে ‘স্যু’ বলিয়া খালাস। কিন্তু পানিরই কত প্রকার-ভেদ। খাবার টেবিলে প্রত্যেকের সামনে একটা করিয়া সিলমোহর করা পানির বোতল। এ’পানি সাধারণ পানি নয়, খনিজ জল (Mineral water)। কত রকমের পানির সঙ্গেই না পরিচয় হইতেছে—কোনটা ‘চালায়ান’ (প্রবহমান), আর কোনটা বা ‘চির্চির্’। ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন জায়গার ঝর্ণা হইতে সারা তুরষ্কে এসব পানি সরবরাহ করে বিভিন্ন কোম্পানী। এসব বিভিন্ন নামে পরিচিত পানির এক একটা বিশেষ গুণ আছে। কোনটা পাকস্থলীর আর কোনটা বা মূত্রাশয়ের বিশেষ উপকার করে। যে যে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশী, তারমধ্যে ‘তাশ্দেলেন্’ একটি। বোতল-ভরা ‘তাশদেলেনে’র দেখা পাইয়াছিলাম আমরা আঙ্কারা পৌঁছিবার আগেই ট্রেণে।
চায়ের টেবিলে দুধের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইতেছে না কোথাও। আমরা ক্রমেই দাবী করিতে শিখিতেছি চায়ের সঙ্গে ‘স্যুত’ (দুধ) কখনো দুধ জোগাড় হইয়া যাইতেছে, কখনোবা ওদের বিব্রত দেখিয়া নিজেরাই বলিয়া দিতেছি—‘স্যুত্ ইয়োক্’, ‘দুধ নাই’। মনে পড়িতেছে, আঠার বৎসর আগে মাদাম হালিদা এদিবের কলিকাতা সফর কালে নিখিল ভারত নারী-সম্মিলন ও আঞ্জুমনে খাওয়াতীনে ইসলামের তরফ হইতে আমরা তাঁকে ওয়াই. ডব্লিউ. সি. এ. হলে চায়ের দাওয়াত দিয়াছিলাম। মনে আছে, তাঁর চায়ের কাপে দুধ পড়ে নাই; কাগজি লেবুর রস জোগাড় করিয়া আনিতে হইয়াছিল দুধের বদলে। শুনিয়াছিলাম, এর নাম ‘রাশিয়ান টি’।
বিশ্ববিদ্যালয়
১৫ই নভেম্বর। আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির রেক্টর প্রফেসার আকরাম ইজ্মেনের সহিত সাক্ষাতের সঙ্গে সঙ্গে আঙ্কারায় আমাদের দ্বিতীয় দিনের প্রোগ্রাম শুরু হইল। ইহার পর আমরা আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির কৃষি-বিভাগ ও পশু পালন বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলি দেখিতে গেলাম। তার আগে যোগদান করিলাম ইউনিভার্সিটির একটা অনুষ্ঠানে; একজন নবনিযুক্ত প্রফেসারের অভিষেক হইল সেদিন। সভা-সমক্ষে রেক্টর তাঁহাকে গাউন পরাইয়া দিলেন। এটা ইউনিভার্সিটিরই অনুষ্ঠান, আমাদের জন্য কোন বিশেষ অনুষ্ঠান নয়; কাজেই কোন দোভাষীর বন্দোবস্ত ছিল না। বক্তারা কি বলিলেন আমরা সে সম্পর্কে অন্ধকারেই রহিয়া গেলাম।
তুরষ্ক ফলের দেশ। কৃষি-ফ্যাকাল্টিতে ফলের চাষের উন্নতির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হইতেছে, শেখানো হইতেছে ফলসংরক্ষণের পদ্ধতি। ছয়শত ছাত্রছাত্রী এখানে শিক্ষা লাভ করিতেছেন। বিভিন্ন কক্ষে তরি-তরকারী ও ফলমূলের প্রদর্শনী সাজাইয়া রাখা হইয়াছে। টমাটো এবং অন্যান্য এক একটা তরকারী বা ফলের বিরাট আকার দেখিয়া আশ্চর্য হইলাম। এক আপেলেরই দেখিতে পাইলাম চারশো বিশ রকমের বিভিন্ন শ্রেণী-ভেদ।
পশু-পালন ফ্যাকাল্টিতেও ছাত্র সংখ্যা ছয়শত। একজন মহিলা-প্রফেসার সুন্দর ইংরেজী বলিতেছেন। তিনি ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখাইলেন—কোথায় মাখন তৈরি হয়, কিভাবে বিশেষ পদ্ধতিতে গো-পালন করিয়া বাড়ানো হয় দুধের পরিমাণ।
তুরষ্কের জাতীয় সঙ্গীত
ফিরিবার পথে এক জায়গায় পথের পাশে মার্বেল পাথরে খোদাই করা রহিয়াছে তুরষ্কের জাতীয় সঙ্গীত। নীচে কবির নাম লেখা, মোহম্মদ আকিফ। ১৮৭৩ হইতে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত তেষট্টি বৎসর তাঁহার জীবন কাল। ১৯২১ সালে রচিত হয় এই সঙ্গীত। ইহার মোটামুটি অর্থ জানিয়া নিলাম—
‘নীচে দুলিতেছে আমাদের পতাকা,
উপরে উজ্জ্বল আকাশ,
এই আমাদের জাতীয় পতাকা
এই পতাকা একান্ত ভাবে আমার
এবং আমার দেশের।’
![]()
তুরস্কের জাতীয় পতাকা সে দেশের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পর্যন্ত স্বদেশ-প্রেমে উদ্বুদ্ধ করিয়া তোলে। ৮৯ পৃঃ পথ হইতে একদল ছেলেমেয়ে আমাদের আশেপাশে জড় হইয়া গিয়াছে। তাহারা আপনাআপনি সকলে মিলিয়া তাহাদের জাতীয় সঙ্গীত গাহিতে শুরু করিল। দেখিলাম তাহারা সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাহিতে অভ্যস্ত। তাহারা যেমন সহজ আবেগ ও আনন্দের সঙ্গে গাহিল, তাহাতে মনে হইল শহরের বাহিরের সাধারণ ঘরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এই সঙ্গীতকে তাহাদের অন্তরের কথা বলিয়া গ্রহণ করিতে শিখিয়াছে।
মধ্যাহ্ন-ভোজনের ব্যবস্থা করিয়াছেন কৃষি ফ্যাকাল্টি। বিকালে দু’এক জায়গায় দেখা-সাক্ষাতের পালা সারিবার পর পাকিস্তানের চার্জ দ্য এফেয়ার্স মিঃ মীর মোহম্মদ শেখের বাড়ীতে আমরা চায়ের মজলিসে যোগদান করিলাম।
পরিহান কুতুরমান
রাজা গজনফর আলী খান এখন বেশ সুস্থ আছেন। খাওয়া দাওয়া ও বক্তৃতার মজলিসে তাঁর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হইতেছে। সব সময় তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আছেন একটি তুর্কী মেয়ে, তাঁর সেক্রেটারী। নাম পরিহান কুতুরমান। ভাল ইংরেজী জানেন, দোভাষীর কাজ করিতেছেন অনবরত। মনে হইতেছে নামটা খুব পরিচিত। পুরানো স্মৃতি ঝালাইয়া নিবার চেষ্টা করিতেছি। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিয়া ফেলিলাম,—‘আমাদের দেশে খবর কাগজে বহুদিন আগে বাহির হইয়াছিল তোমার নাম। কবে, কি উপলক্ষে, মনে পড়ে না। বলতো, কি বিরাট কাণ্ড করিয়াছিলে তুমি।’ মেয়েটি হাসিয়া চোখের কোণে একটুখানি সলজ্জ রসিকতার ভঙ্গী করিলেন। পরে জানিলাম, তিনি সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞ; সেই সংক্রান্ত কাজে ১৯৩৭সালের দিকে অবিভক্ত ভারতে আসিয়াছিলেন।
গাজী ইনস্টিটিউট
মিঃ ও মিসেস শেখের পার্টির শেষে আমি ও আমাদের সুরশিল্পী ফিরোজ বাচোম সেখানেই রহিয়া গেলাম। ঠিক হইল, আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া ওঁদের সঙ্গেই গাজী এ ইন্স্টিটিউটে যাইব রাত্রি ভোজনের জন্য। পথে যাইতে এক বিভ্রাট ঘটিল। মিঃ শেখ গাড়ী চালাইতেছেন, যাত্রী আমরা আরো তিনজন। কিন্তু পথের আর শেষ নাই। পাহাড়ী রাস্তায় ঘুরিয়া ফিরিয়া আমরা কোথায় যে চলিয়াছি তার কোন হদিস পাওয়া যাইতেছে না। গাজী ইন্স্টিটিউট দূরের কথা, ক্রমে এমন জায়গায় আসিয়া পড়িলাম যেখানে পথচারীর দেখা পাওয়া যাইতেছে না আর। ক্রমে রাস্তার বাতিও বিরল হইয়া আসিতেছে। এক একবার আমরা উঁচু রাস্তা বাহিয়া উপরের দিকে উঠিয়া যাইতেছি, আর এক একবার ঢালু রাস্তা ধরিয়া নামিতেছি নীচের দিকে। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাইতেছে না, সামনে কি আছে— রাস্তা, পাহাড় অথবা প্রান্তর। মিসেস শেখ বলিতেছেন, ‘আমরা কোথায় চলিয়াছি, বেহেশ্তে না দোজখে?’ ফিরোজ বাচোম বলিয়া উঠিলেন ‘আমরা তুরস্কের সীমা ছাড়াইয়া আসি নাই তো’? স্বল্পভাষী মিঃ শেখ কিন্তু নির্বিকার।
আমরা এদিকে ফাঁকে ফাঁকে নৈশ-আঙ্কারার মনোরম দৃশ্য উপভোগ করিয়া নিতেছি বেশ। চারিদিকে কোথাও উঁচুতে, কোথাও নীচুতে হাজার হাজার বাতিতে আঙ্কারা শহর ঝিকমিক করিতেছে। সঙ্কীর্ণ পাহাড়ী রাস্তায় সাবধানে গাড়ী ঘুরাইয়া আবার মিঃ শেখ পেছনের দিকে ফিরিয়া চলিলেন। ভাগ্যক্রমে একটা পুলিশের গাড়ীর দেখা পাওয়া গেল হঠাৎ। এবার এঁরাই আমাদের পথ দেখাইবার ভার নিয়া অল্পক্ষণের মধ্যে একেবারে গাজী ইন্স্টিটিউটের সামনে আনিয়া হাজির করিলেন।
গাজী ইন্স্টিটিউট তুরস্কের বিখ্যাত ট্রেনিং কলেজ। তিনশো ষাটজন ছাত্র-ছাত্রী এখানে একসঙ্গে সেকেণ্ডারী স্কুলের জন্য শিক্ষকতার ট্রেনিং লাভ করিতেছেন। টিচারদের মধ্যে কয়েকজন মহিলাও আছেন। স্বয়ং প্রিন্সিপাল একজন মহিলা। আমরা গিয়া দেখি, ততক্ষণে ছাত্র-ছাত্রীদের শরীর চর্চ্চা শুরু হইয়া গিয়াছে। বিরাট হলের মধ্যে ব্যায়ামের পোষাক পরা ছাত্র-ছাত্রীরা নানারকম খেলাধূলা ও ব্যায়াম চর্চা দেখাইলেন। নব্য তুরষ্ক ছাত্রদের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীদেরও শরীর-চর্চার উপর বিশেষ জোর দেয়। তুরষ্কের ভাবী জননীদের স্বাস্থ্য গড়িয়া তুলিবার এই আয়োজন সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল আগেই। বই-পুস্তকের পাতায় পাতায় ছবির মধ্য দিয়া দেখিয়াছি এই বিরাট আয়োজন। আজ মনে হইতেছে, ছবির সেই সুন্দরী আনন্দ-প্রতিমাগুলি যেন কোন্ মায়া-বলে জাগিয়া উঠিয়াছে; জীবন্ত মূর্তি ধরিয়া আমাদের চোখের সামনে হাসিয়া খেলিয়া বেড়াইতেছে।
এরপর নৈশ-ভোজনের পালা। ছাত্র-ছাত্রীরা ছুটাছুটি করিয়া আমাদের খাওয়াইলেন। খাওয়ার পর বক্তৃতা। প্রিন্সিপাল বেদিদে বাহা পার্স ও ডক্টর দানিয়েল বেদিজ সংক্ষেপে কয়েকটি কথায় আমাদের অভ্যর্থনা জানাইলেন ও পাকিস্তানের প্রতি তুরষ্কের গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিলেন।
ডক্টর দানিয়েল বেদিজ
ডক্টর দানিয়েল আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির জিয়োগ্রাফীর প্রফেসার। ১৯৪০ সালে তুরষ্ক হইতে চল্লিশ জন ছাত্র-ছাত্রী ও প্রফেসারের যে শুভেচ্ছা-মিশন পাকিস্তান সফরে আসিয়াছিল ডক্টর দানিয়েল ছিলেন তাহার নেতা
সকাল হইতে রাত বারটা পর্যন্ত যতক্ষণ আমাদের প্রোগ্রাম, ততক্ষণ ইনি ছায়ার মত আমাদের পার্টির সঙ্গে সঙ্গে থাকিতেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁহার পূর্ব পরিচয় হেতু সমস্ত ব্যাপারে তাঁহার সঙ্গে পরামর্শ করিয়াই হইতেছে আমাদের সব রকম ব্যবস্থা। আমরা যে ক’দিন তুরষ্কে আছি সে-ক’দিনের জন্য ইউনিভার্সিটি হইতে ছুটি দেওয়া হইয়াছে তাঁহাকে। তিনি জার্মাণীর মিউনিক্ ইউনিভার্সিটির ডক্টর। ভাঙা ভাঙা দু’চারটি শব্দ দিয়া ইংরেজীর কাজ সারেন। বলেন, আমি ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও ইটালিয়ান, এই তিনটি বিদেশী ভাষায় কথা বলিতে পারি। মুশকিলে পড়ি শুধু ইংরেজীর বেলায়।
ডিনার-টেবিলে তিনি বহুকালের পুরাতন একখানা গ্রুপ, ফোটোগ্রাফ বাহির করিয়া সকলকে দেখাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেন ফিরিয়া গেলাম বছর চল্লিশেক আগেকার যুগে। ছবিতে আট নয় বছরের একটা ছেলের দিকে দেখাইয়া দানিয়েল বে’ বলিলেন, ‘একে চিনিতে পারেন? এর নাম দানিয়েল বেদিজ।’ বলকান যুদ্ধের সময় পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানেরা যে তুরষ্কের সাহায্যের জন্য মাতিয়া উঠিয়াছিল তাহারই পরিচয় বহন করিতেছে এই ছবি। গ্রুপের মধ্যে আছেন ‘আনসারী মেডিক্যাল মিশনের’ নেতা ডাঃ এম. এ. আনসারী, দানিয়েলের পিতা ও বালক দানিয়েল। ডাঃ আনসারী যখন মেডিক্যাল মিশন নিয়া তুরষ্ক আসেন, তখন নাকি তিনি তাঁহাদেরই মেহমান হইয়াছিলেন, ডক্টর দানিয়েল বলিলেন। জনাব চৌধুরী খালেকুজ্জমান, জনাব আবদুর রহমান সিদ্দিকী, জনাব মাওলানা ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রভৃতিও এই মিশনের সদস্য হিসাবে সে-সময় তুরষ্কে আসিয়াছিলেন। খাবার টেবিলে বায়ান বেদিদে বাহা পার্স ও ডক্টর দানিয়েলের বক্তৃতার জবাবে প্রফেসার হালিম ও আমি দু’চার কথা বলিলাম। ‘আনসারী মেডিক্যাল মিশন’ সম্পর্কে আমি মাওলানা ইসমাইল হোসেন সিরাজীর কথা উল্লেখ করিয়া বলিলাম—‘আমাদের দেশের দূরতম প্রান্ত হইতে তিনি ছুটিয়া আসিয়াছিলেন তুরষ্কে; তুরষ্কের দুর্দিনে সেদিন আমাদের দেশের মুসলমানেরা তুর্কীদের চেয়ে কম বিচলিত হয় নাই।’ সিরাজী সাহেবের তুর্কী নারী-জীবনের আলেখ্য আমাদের দেশের মেয়েদের প্রেরণা দিয়াছে অনেকখানি, এ প্রসঙ্গে স্বীকার করিলাম একথা। বেদিদে বাহা পার্সকে অত বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল একজন নারী, এই বলিয়া অভিনন্দন জানাইলাম। আরো বলিলাম, ‘হাজার হাজার মাইল দূরে সমুদ্র-পর্বত-মরুভূমির ওপার হইতে তোমাদের জন্য আট কোটি পাকিস্তানীর প্রীতি ও শুভকামনা বহন করিয়া আনিবার গৌরব আজ আমাদের। তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের আজিকার নয়। নতুন জীবনের জন্য তোমাদের মরণপণ সাধনা অনেক খানি প্রেরণা জোগাইয়াছে আমাদের নব জাগরণের মূলে। আমাদের জাতীয় কবির যুগান্তকারী রচনা ‘ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই’—আমাদের ছোট ছেলেটি পর্যন্ত মুখে মুখে আবৃত্তি করিয়া বেড়ায়। তোমাদের হালিদে এদিব হানমের ‘স্মার্ণানন্দিনী’ আমাদের স্কুলকলেজের মেয়েরা অভিনয় করে ষ্টেজে ষ্টেজে। তোমাদের ছবি আমাদের কল্পনায় চিরউজ্জ্বল। যা ছিল স্বপ্ন, তাহাই বাস্তবে দেখিবার জন্য আমরা আসিয়াছি। সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়া আমরা আসিয়াছি তুরষ্ককে, তুর্কী-জাতিকে নূতন করিয়া আবিষ্কার করিতে। শুধু তাই নয়। আমাদের তোমরা নূতন করিয়া আবিষ্কার করিবে, তাহারও সুযোগ দিতে আসিয়াছি আমরা। পাহাড়-সমুদ্র-মরুভূমি যেন আজ নিঃশেষে বিলীন হইয়া আমাদের পথ ছাড়িয়া দিয়াছে, এক হইয়া গেছে দূরবাসী আপন মানুষেরা।
সঙ্গীতের আসর
খাওয়া দাওয়া ও বক্তৃতার পর কনসার্ট। বিস্তীর্ণ হলে লোক ধরে না। হলের পশ্চাৎ-পটভূমিতে তুর্কী ভাষায় লেখা রহিয়াছে আতাতুর্কের বাণী—‘আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে এভাবে গড়িয়া তুলিব যেন আধুনিক সভ্যতার ক্ষেত্রে আমাদের সংস্কৃতি একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিতে পারে।
গাজী ইনস্টিটিউটের পঞ্চাশটির মত ছাত্র-ছাত্রী একসঙ্গে কনসার্টে যোগদান করিলেন। সুরে পাশ্চাত্য প্রভাবের প্রাধান্য ধরা পড়ে অতি সহজে। বিভিন্ন দল বিভিন্ন স্কেলে গাহিতেছে একই সঙ্গে। মনে হইল না কেহ বেসুরো গাহিতেছে। ট্রেনিং কলেজের ছাত্র-ছাত্রী রীতিমত সুরের সাধনাও করেন বোঝা গেল।
আমাদের তরফ হইতে লায়লা আর্জুমন্দ্ বানু বাংলা, উর্দু ও ফার্সী গান পরিবেশন করিলেন, আর আয়ুব খান গাহিলেন একখানা তুর্কী গান। পিয়ানোতে কয়েকখানা গৎ বাজাইয়া শ্রোতাদের আনন্দ দান করিলেন ফিরোজ বাচোম।
কোনিয়া
২২শে নবেম্বর আমাদের পার্টি সকাল সাতটায় কোনিয়া যাত্রা করিল। কোনিয়ার জন্য রহিয়াছে এক দিনের প্রোগ্রাম। একদিন পর কোনিয়া হইতে আবার ফিরিয়া আসিতে হইবে আঙ্কারায়। আঙ্কারা ও কোনিয়ার দূরত্ব ২৬৫ মাইল।
তুরষ্কের এই প্রদেশটি নানা কারণে ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। একাদশ শতাব্দীর শেষ হইতে আনাতোলীয় সেল্জুক সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল কোনিয়া। কোনিয়ার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল যুগ দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দী। দ্বাদশ শতাব্দীতে সোলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদের সময় হইতে কোনিয়া জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রস্থল হইয়া দাঁড়ায়। এই সময় প্রাচ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল হইতে যে সকল মনীষী ভিড় করিয়াছিলেন কোনিয়ায়, মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী তাঁহাদের মধ্যে একজন। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সোলতান মোহম্মদ ফতেহ্ এর আমলে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় কোনিয়া। সেলজুক ও অটোম্যান আমলের স্থাপত্য ও অন্যান্য শিল্পের বহু নিদর্শন কোনিয়ায় ছড়াইয়া আছে। সেলজুক্ যুগের আলাউদ্দীন মস্জিদ ও অন্যান্য মসজিদ, অটোম্যান যুগের আজিজিয়া মসজিদ, সেলিমিয়া মসজিদ এবং আরো বহু প্রাচীন ইমারত বিভিন্ন সোলতানের নাম বহন করিতেছে এবং তাঁহাদের কীর্তি ঘোষণা করিতেছে সংগে সংগে। কিন্তু পাকিস্তানী মুসাফির দলের সব চেয়ে বড় আকর্ষণ মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমীর কবর। তাঁহার সমাধির সংগে গড়িয়া তোলা হইয়াছে নানাবিধ প্রাচীন শিল্পের যাদুঘর। কোনিয়ায় প্রোগ্রামে প্রধান স্থান পাইয়াছে মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমীর সমাধি ও তৎসংলগ্ন মিউজিয়াম। মিশনের কোন কোন সদস্য পাকিস্তান হইতে সংগে করিয়া আনিয়াছেন বই বা অন্য কোন উপহার; মনীষী রুমীর মাযারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সংগে সংগে অর্পণ করিবেন এই উদ্দেশ্য।
ভোরে উঠিয়া আমাদের দলের মধ্যে হৈ-হুল্লোড় পড়িয়া গেছে। বাসে চড়িয়া সবাই রওনা হইলেন কোনিয়ার পথে। হয়ত রাত কাটাইতে হইবে সেখানেই। সংগে চলিলেন ডক্টর দানিয়েল বেদিজ ও বেদিয়া। এঁরা আমাদের পার্টিকে পথ দেখাইবেন, দোভাষী গিরিও করিবেন সংগে সংগে। এঁদের ঐটুকু ইংরেজী-জ্ঞানই আমাদের দোভাষীগিরি করিবার পক্ষে যথেষ্ট মনে করা হইতেছে।
আমি কোনিয়া গেলাম না। কিন্তু আমরা কেউ যেন ফুরসুৎ না পাই এক মুহূর্তও—সে বিষয় এঁদের খুব সতর্ক দৃষ্টি। এখানে আঙ্কারায় আমার জন্য রহিল স্বতন্ত্র প্রোগ্রাম। করাচীর ছাত্রী নীলুফার অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে। হায়দরাবাদের (সিন্ধু) খুরশিদ আখুন্দেরও শরীর ভাল নয়। তাহাদেরও কোনিয়া যাওয়া হইল না।
শেখ পরিবার
মিসেস শেখ আসিয়া হোস্টেল হইতে আমাদের নিয়া গেলেন তাঁহাদের বাড়ীতে। একদিনের জন্য আমরা শেখ পরিবারের মেহমান হইলাম। স্বামী, স্ত্রী ও তিনটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়া শেখ পরিবার। মনে হইল বেশ সুখী পরিবার। মিঃ শেখ সিন্ধী; ভদ্র, অমায়িক, মার্জিত ব্যবহার, তার উপর আছে একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ। মিসেস শেখ বোম্বাইয়ের। মনে হইল বেশ শিক্ষিতা। দেখিতে সুন্দরী, চলাফেরা ও কথাবার্তায় চটপটে, স্মার্ট; বেশভূষায় সুরুচির পরিচয় আছে; আঙ্কারার সমাজে মহিলা সুপরিচিতা।
বাচ্চা তিনটি আরো চমৎকার। প্রথম সাক্ষাতেই আমাদের সঙ্গে এমন ভাব জমাইয়া ফেলিল, মনে হইতে লাগিল যেন কত কালের চেনা শোনা। ওদের নাম—আনোয়ার শেখ, ফরিদা শেখ ও আসিফ শেখ। বয়স যথাক্রমে বছর সাত, পাঁচ ও তিন। বিশেষ করিয়া মেয়েটি মায়ের সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ নীলুফারকে এটা ওটা আগাইয়া দিতেছে, মুরুব্বিয়ানা ধরণে আমার খোঁজ-খবর করিতেছে; ফাঁকে ফাঁকে হরেক রকমের বিষয়-বস্তু নিয়া ইংরেজী ভাষায় ছেলেমানুষী গল্প করিতেছে অনর্গল। কথায় কথায জানাইয়া দিতেছে ওরা পাকিস্তানী। এখানেই আমাদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তা, দেখিলাম সে-সম্পর্কে বেশ সজাগ।
বাড়ীতে চাকর দু’টি—একটি পুরুষ ও অন্যটি মহিলা। মহিলাটি তুর্কী ও পুরুষটি পাকিস্তানী। কোট-প্যাণ্টলুন-পরা লোক বাবুর্চি খানায় কাজ করিতেছে, আমার জন্য চা নিয়া আসিল: আমি কথা বলিতে শুরু করিলাম ইশারা ইংগিতে। তুরষ্কে আসা অবধি এটা একরকম অভ্যাস হইয়া গেছে। আমাকে অপ্রস্তুত করিয়া দিয়া সে ঘাড় চুলকাইতে চুলকাইতে মৃদু আপত্তি জানাইল, ‘বেগম সাহেব, ‘পাকিস্তানী’ চিনিতে পারিলেন না আপনি? আমি হাজার লোকের মধ্যেও চিনিয়া নিতে পারি ‘পাকিস্তানী’।’
মিঃ শেখ জানাইলেন, তুরস্কের পররাষ্ট্র সচিব মিঃ ফুয়াদ কপরুলুর বাড়ীতে আজ সারাদিন কাটাইতে হইবে। আজ রবিবার। ছুটির দিনে তাঁহারা পারিবারিক মজলিসের আয়োজন করিয়াছেন। সেই মজলিসে যোগদান করিবার জন্য আমি মিঃ ও মিসেস শেখ সহ বেলা দশটার সময় চান্কায়া কপরুলু ভবনে হাজির হইলাম। খুরশিদ আখুন্দ্ও সঙ্গে রহিল। চান্কায়া আঙ্কারার একটি বিশিষ্ট অঞ্চল। প্রধান-মন্ত্রীর বাস-ভবনও ঐ অঞ্চলে। মিঃ ও মিসেস্ কপরুলু এবং তাঁদের কন্যা বেহান আমাদের অভ্যর্থনা করিয়া নিলেন।
গুল্সেরেন গুনেশ্
বেহানের সমবয়সী আরো দু’টি মেয়ের দেখা পাইলাম সেখানে। একটির নাম গুল্সেরেন গুনেশ (Gulseren Gunesh); গুলসেরেন আমেরিকায় জার্নেলিজমের ট্রেনিং নিয়াছেন। তিনি লাহোরে ‘সিভিল এণ্ড মিলিটারী গেজেটের’ তুরস্কস্থ সংবাদ-দাতা (correspondent) ছিলেন কিছুদিন আগে পর্যন্ত। সম্প্রতি একটা ব্রিটিশ ফার্মে কাজ করিতেছেন।
গুলসেরেন্ কাজ-চালানো গোছের ইংরেজী বলিতে পারেন। মিঃ কপরুলুর সঙ্গে কথাবার্তা চালাইতে লাগিলাম গুলসেরেনের মধ্যস্থতায়। বায়নি কপরুলু অর্থাৎ বেগম কপরুলু বেশ আগ্রহের সঙ্গে আলোচনা শুনিতেছেন, মাঝে মাঝে দু’একটি ইংরেজী শব্দের সাহায্যে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করিতেছেন। তিনি সম্প্রতি ইংরেজী শিখিতে শুরু করিয়াছেন।
কপরুলু পরিবার
কপরুলুর কন্যা বেহান আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির গ্রাজুয়েট; ইউরোপের সুইজারল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশ ঘুরিয়া আসিয়াছেন, সুন্দর ইংরেজী বলেন। মাঝে মাঝে আসিয়া পিতার কাছ ঘেঁষিয়া বসিতেছেন এবং দোভাষীগিরি করিবার ভার নিতেছেন। আমাদের সামনে রাখা হইয়াছে বিভিন্ন রকমের আঙুর ও আপেল (তুর্কী ভাষায় ‘এল্মা’) প্রভৃতি ফল। আমরা খাইতেছি আর গল্প করিতেছি। এর আগে সম্পূর্ণ ডেলিগেশন নিয়া আমরা যখনই কোন নেতৃস্থানীয় লোকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছি, কথাবার্তার ফাঁকে আমাদের সামনে ধরিয়া দেওয়া হইয়াছে এক প্লেট ‘টফি’।
মিঃ কপরুলুর সঙ্গে আলোচনা হইতেছে হরেক রকমের বিষয় নিয়া। প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক লণ্ডন সফর, আরব স্টেটগুলির সঙ্গে তুরষ্কের সম্পর্ক, জাতিসঙ্ঘে তিউনিসিয়া ও মরোক্কোর প্রশ্ন, আরো কত কি; হঠাৎ তিনি প্রশ্ন করিলেন—‘ভারতের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্ক কি রকম?’ বলিলাম, ‘কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হইয়া গেলে আর কোন গোলযোগই থাকে না। এসম্পর্কে জাতিসঙ্ঘের প্রত্যেক সদস্য-জাতিরই বিশেষ দায়িত্ব আছে, তুরষ্কের দায়িত্বও কম নয়’,—আমি একথা বলিতে তিনি সংক্ষেপে বলিলেন, ‘ইন্শা আল্লাহ্’। অন্ততঃ এর মীমাংসার জন্য যেন কিছুতেই অস্ত্রের সাহায্য নিতে না হয়—তিনি বিশেষ জোর দিয়া বলিলেন একথা।
রাজনৈতিক ছাড়া সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ক নানা কথাও উঠিল। নিরক্ষরতা সম্পর্কে বয়স্ক-শিক্ষার কথা জিজ্ঞাসা করিতে তিনি বলিলেন, ‘আমরা গোড়ার দিকে বয়স্ক-শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়াছিলাম। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা সফল হয় নাই। আমরা বুঝিতে পারিয়াছি, প্রাথমিক শিক্ষার দিকেই মনোযোগ নিবদ্ধ করা প্রয়োজন।’ তুর্কী মেয়েরা সাধারণতঃ বিবাহিত জীবনই পসন্দ করে, বিবাহ করে মোটামুটি বছর বাইশ তেইশের সময়, শিক্ষা-বিভাগ এবং অন্যত্র পুরুষের সঙ্গে সমান বেতনই তারা পায়, এসব নানা তথ্য জানা গেল কপরুলুর সঙ্গে আলোচনায়। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলিলেন, তাঁরা তুরষ্কের জনসংখ্যা-বৃদ্ধি কামনা করেন। হিটলার-মুসোলিনী যে অবস্থায় বহুসন্তানবতী জননীকে পুরস্কৃত করিতেন, তুরষ্কের অবস্থাও সেই ধরণের, তিনি বলিলেন।
ইতিমধ্যে মধ্যাহ্ন-ভোজনের সময় হইয়া আসিয়াছে। ছোট বড়, মেয়ে-পুরুষ বেশ একদল কপরুলু ততক্ষণে জড় হইয়া গেছেন বসিবার ঘরে। এঁরা কেউ আসিয়াছেন ইস্তাম্বুল হইতে, কেউ আদিনা বা বুর্সা হইতে আর কেউবা থাকেন আঙ্কারাতেই। বহুদিনের পুরাতন প্রতিষ্ঠাপন্ন, বিখ্যাত এই কপরুলু পরিবার। অটোম্যান সাম্রাজ্যের পর পর পাঁচজন ‘সদরে আজম’ (প্রাইম মিনিস্টার) জোগাইয়াছে এই পরিবার; এটা সামান্য কৃতিত্বের কথা নয়। কপরুলু পরিবারের লাইব্রেরী সুবিখ্যাত। পরে ইস্তাম্বুলে দেখিয়াছিলাম কপরুলু পরিবারের লাইব্রেরী; এটা এখন পাবলিকের। খাবার টেবিলে এবং খাওয়ার পর ড্রয়িং রুমে, বাগানে এঁদের সকলের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় খুঁটিয়া খুঁটিয়া অনেক কিছু জানিয়া লইবার সুযোগ পাইলাম। বার তের বছরের ছেলেমেয়ে হইতে শুরু করিয়া উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী, এমন কি বছর ষাটের বয়সের বৃদ্ধা মহিলা পর্যন্ত উপস্থিত আছেন; সবশুদ্ধ চল্লিশ জনের কম নয়। গৃহস্বামী ফুয়াদ কপরুলুর সম্পর্কে ভাই হন—সেলিম হিক্মেন্ কপরুলু, আহমদ জামাল কপরুলু—কেউ বুর্সার ডেপুটি আর কেউ ডেপুটি আদির্ণার। কামাল কপরুলু সম্প্রতি ইরানে তুরস্কের রাষ্ট্র-দূত ছিলেন। তার আগে কোন সময়রাষ্ট্র-দূত ছিলেন স্পেনে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি আফগানিস্তানে রাষ্ট্র-দূতের পদে ছিলেন। তিনি একবার অবিভক্ত ভারতেও আসেন ঐ সময়। বিরাট কপরুলু-পরিবারের কথা রহস্য করিয়া তিনি বলিলেন ‘উর্দু’ শব্দটা আসিয়াছে ‘ওর্দ’ বা আর্মি (Army) হইতে; দেখিতে পাইলে তো, আমাদের পরিবারটাই একটা ‘আর্মি।’
খাবার টেবিলে ভাষা-তত্ত্বের কথা উঠিল। বাংলা ভাষায় ফার্সির ভেতর দিয়া ঢুকিয়াছে তুর্কী শব্দ ‘চক্মকি’ ও ‘বাবুর্চি’; আমি সে কথা বলিতে মিঃ ফুয়াদ কপরুলু বলিলেন, ‘হ্যাঁ, তুর্কী-ভাষায় ‘চকমক্’ শব্দের অর্থ ঘষিয়া আগুন জ্বালানো।’ ‘বাবুর্চি’র ‘বাবর’ ফার্সী শব্দ, ‘চি’ প্রত্যয়টুকু তুর্কী। তুর্কী ভাষায় ‘আশ্’ শব্দের অর্থ ‘সুপ’। তার সঙ্গে ‘চি’ যোগ করিয়া হয় ‘আশ্চি’—যার অর্থ পাচক। ‘বেগম’ শব্দটার সম্পর্ক রহিয়াছে তুর্কী ‘বে’এর সঙ্গে। আমাদের ‘চাচাজী’ প্রভৃতি শব্দের ‘জী’ আসিয়াছে তুর্কী ‘জেম’ হইতে, যার অর্থ তুর্কী ভাষায় ‘প্রিয়জন’। এমনি আরো অনেক কথা বলিলেন কপরুলু। তুর্কী ‘সার্মাক্’ শব্দের অর্থ ‘আচ্ছাদিত করা’। আমাদের প্রিয় পরিচ্ছদ ‘শাড়ী’র মূলে রহিয়াছে তুর্কী ‘সার্মাক্’, জানাইলেন তিনি। দেখা গেল, ইতিহাসের অধ্যাপক এবং বর্তমানে পররাষ্ট্র-সচিব কপরুলু ভাষাতত্ত্বের খুঁটিনাটি সম্বন্ধেও মাথা ঘামান কম নয়। সেলিম, জামাল ও কামাল প্রভৃতি কপরুলুরাও আলোচনায় অংশ গ্রহণ করিলেন।
তুর্কী জাতির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিগত সম্পর্ক প্রসঙ্গে মোগল বাদশাহ বাবরের কথা আসিল। ফুয়াদ কপরুলু বলিলেন, ‘তোমরা বাবর বল কেন? তুর্কী উচ্চারণ ‘বাবুর’। তাঁহার আত্ম-জীবনীতে তিনি নিজেই লিখিয়াছেন ‘বাবুর’। কাজেই তোমাদের ‘বাবর’ বলিবার কোন অর্থ হয় না।’
রেডক্রস সোসাইটি সম্পর্কে তিনি বলিলেন,—‘রেড ক্রস’ বদলাইয়া ‘রেড-ক্রেসেণ্ট’ করিয়া নিতে পারে পাকিস্তান। ইরানের ‘রেড-লায়ন’ ও তুরষ্কের ‘রেড-ক্রেসেণ্ট’ যেমন আন্তর্জাতিক রেড-ক্রস সোসাইটির অন্তর্ভুক্ত, তেমনি হইতে পারে তোমাদের শাখাও, নাম যাহাই হোক্ না কেন। মুসলমান দেশগুলিতে ‘রেড-ক্রস’ নাম শোভা পায় না।’ জবাবে বলিলাম—‘আমরাও নাম পাল্টাইয়া নিতে চাই, শুধু দেনা-পাওনার হিসাবপত্র পরিষ্কার করিয়া নিবার অপেক্ষা।’
খাওয়া দাওয়ার পর আড্ডা বসিল ড্রয়িং রুমে। মিঃ কপরুলুর, চাচী, খালা ও অন্যান্য আত্মীয়া বৃদ্ধা ও তরুণী যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে হইল শুধু হাসি বিনিময়; আলাপ সালাপ তেমন জমিল না। দুনিয়ার হালচাল সম্পর্কে মনে হইল না তাঁহারা বিশেষ মাধ্য ঘামান। শুধু বেহান ও তাঁহার জননী এটা ওটা দেখাইয়া আমাকে মশগুল রাখিবার চেষ্টা করিতেছেন। একপাশে টেবিলে সাজানো আছে কতগুলি ফোটোর এলবাম। বেহান বলিয়া চলিলেন প্রত্যেকটা ছবির পরিচয়। আজাদীর আগে ও পরে তোলা বহু ছবি পুরাতন স্মৃতি বহন করিতেছে। আতাতুর্কের মৃত্যুর পর রাজপথে বিশাল জনতা কাঁদিয়া আকুল হইতেছে, একটা ছবিতে তাই দেখিলাম। আতাতুর্কের সঙ্গে তাঁহার পিতার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, একথা বলিতে গিয়া বেহান একটা বই খুলিয়া দেখাইলেন, ১৯৩৭ সালের একটা ছবিতে একসঙ্গে আতাতুর্ক, জালাল বায়ার ও ফুয়াদ কপরুলু। এই বইখানি আমাকে উপহার দিতে গিয়া মিঃ কপরুলু বহু কষ্টে ফ্রেঞ্চ-মেশানো ইংরেজীতে দু’ লাইন লিখিলেন বইয়ের পাতায়।
হার এক্সেলেন্সী বায়ান কপরুলু আমার অটোগ্রাফের খাতায় নাম সই করিলেন ‘বেহিদে কপরুলু’। মনে হইল তাঁহার নাম ‘ওহিদা’। কারণ হালিদা হানমকে ওঁরা বলেন ‘হালিদে হানম।’ আমাদের পার্টির মসুদাকে ওঁরা ডাকেন ‘মেসুদে।’
বায়ান বেহিদে কপরুলু দু’খানা শাড়ী উপহার পাইয়াছেন। একখানা ভূতপূর্ব পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূতের পত্নী মিসেস বশিরের উপহার। অপরখানা মিসেস এস্মা নে’ম্যান (গ্র্যাণ্ড ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলীর ভূতপূর্ব সদস্য) যখন আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মিলনে যোগদান করিবার জন্য কয়েক মাস আগে লাহোর আসেন, তখন সেখান হইতে নিয়া যান। শাড়ী দু’খানি দিয়া তিনি ড্রেস তৈরি করাইয়াছেন, কিন্তু সেই ড্রেসের ডিজাইন শাড়ী পরিবার ধরণে রচিত, বলিলেন তিনি।
মিঃ ও মিসেস মীর মোহম্মদ শেখ তাঁহাদের মুভি ক্যামেরাটি সংগে আনিয়াছেন। তাহাতে বাগানে ফিল্ম তোলা হইল।
একটা জিনিস লক্ষ্য করিলাম। তুরস্কের পররাষ্ট্র-সচিব ফুয়াদ কপরুলুর উপর রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিশ্চয়ই কম নয়। কিন্তু সারা দিনের মধ্যে খোশগল্প ছাড়া সরকারী বা বেসরকারী অন্য কোন বিষয়ে এক মুহূর্ত্তের জন্যও মাথা ঘামাইতে দেখিলাম না তাঁহাকে। বেয়ারা একবারও খবর দিল না যে কেউ দেখা করিতে চায় বা বয় একবারও জানাইল না যে কেউ ডাকিতেছে টেলিফোনে। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি প্রাণ খুলিয়া বিদেশী মেহমান ও পরিবার পরিজনের সঙ্গে গল্পগুজব করিলেন। আমাদের দেশের সঙ্গে ওঁদের বোধহয় মস্তবড় একটা তফাৎ এখানে। মনে হইল, প্রত্যেক কাজেরই ওঁদের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। যে-কাজ করিবেন, ওঁরা ভাল করিয়াই করিবেন। আর আমাদের দেশে অনেক সময় তা’ ভাবাও কঠিন
আমরা বাড়ী অর্থাৎ মিঃ শেখের বাড়ীর দিকে ফিরিয়া চলিলাম সন্ধ্যার কিছু আগে। সারাদিন কপরুলু পরিবারের সঙ্গে আমাদের কাটিল বেশ। পথে যাইতে যাইতে ভাবিতে লাগিলাম, কি সাদাসিদা অনাড়ম্বর চালচলন, কি আন্তরিকতাপূর্ণ অমায়িক ব্যবহার এঁদের।
আবার আঙ্কারা পালাসে
বাড়ী ফিরিতে না ফিরিতে আবার আমাদের তাড়া পড়িল, ‘আঙ্কারা প্যালেসে’ মিঃ গজনফর আলী ডিনারে ডাকিয়াছেন। নীলুফারের জ্বরটা ছাড়িতেছে না, দুর্বলতা বেশ একটু বাড়িয়াছে। ডাক্তার আসিয়া তাহাকে দেখিয়া গেলেন, ঔষধ-পত্রের ব্যবস্থা হইল। তাহার জন্য একটু ভাবনা হইতেছে। আমাদের আঙ্কারাবাস শেষ হইয়া আসিল। সে যদি এর মধ্যে সারিয়া না উঠে।
‘আঙ্কারা পালাসে’ ডিনার-টেবিলে আলাপ হইল তুরষ্কস্থ ইরানের রাষ্ট্রদূত মিঃ হাকিম ও তাঁহার পত্নীর সঙ্গে। সেখানে আর উপস্থিত আছেন ডাঃ কিপার ও আয়লা কিপার। নীচের তলায় বড় হলের এক কোণে বসিয়া আমরা খাওয়া দাওয়া সারিলাম।
মিঃ গজনফর আলীর সবেমাত্র তুর্কী ভাষায় হাতেখড়ি হইতেছে। তাঁর মুখে সবে মাত্র শুনিতেছি এক আধটা তুর্কী কথা—যেমন, ‘নাসিল্ সেনিজ, এফেন্দেম’—How do you do, Sir!—সাক্ষাৎ হইলে প্রথম সম্ভাষণ। আমার মনে হয়, আমরা তাঁর চেয়ে আরো একটু তাড়াতাড়ি আগাইয়া চলিয়াছি। হোস্টেলে আমরা থাকি হাজার খানেক ছাত্রীর মধ্যে। সকাল নয়টায় শুরু হয় আমাদের প্রোগ্রাম, বাড়ী ফিরি আমরা রাত বারোটায়। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে একদল দোভাষী। স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে, লাঞ্চে, ডিনারে, বক্তৃতা-সভায় হাজার হাজার তুর্কীর সঙ্গে আমাদের ওঠাবসা হইতেছে। আমাদের শব্দভাণ্ডার ক্রমেই বাড়িয়া চলিবে, এ আর আশ্চর্য কি?
রাজা গজনফর আলী কিন্তু ইরানের রাষ্ট্রদূত ও তাঁর পত্নীর সঙ্গে ফার্সীতে কথা বলিতেছেন অনর্গল। ইরাণে তাঁহার বছর কয়েক রাষ্ট্রদূত থাকার ফল এটা।
ডাঃ কিপার তুরষ্কের সেরা ডাক্তার। তিনি আমেরিকায় ছিলেন বছর ছয়েক। কয়েকবার তিনি বিদেশে তুর্কী মেডিক্যাল মিশনের নেতৃত্ব করিয়াছেন। তুরস্কে পাকিস্তানী দূতাবাসের ডাক্তার তিনিই। নীলুফারের চিকিৎসা উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে আমাদের আগেই আলাপ হইয়াছিল। শুধু ডাঃ কিপারই নয়, মিসেস কিপার ও কন্যা আয়লা কিপার, দু’জনেই ইংরেজী বলেন। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, ডাঃ কিপারের ফিস মাত্র দশ লিরা (প্রতি লিরা এক টাকা তিন আনা)। রোগী অবস্থাপন্ন না হইলে অনেক সময় ফিস্ নেনই না। আয়লা সুশিক্ষিতা, সুন্দরী, সর্বোপরি তাহার মুখে এমন একটা কমনীয় সরলতার স্বাক্ষর রহিয়াছে যে সহজে শুধু দৃষ্টিই আকর্ষণ করে না, মনেও একটা ছাপ রাখিয়া যায়। জিজ্ঞাসা করিলাম তাহার নামের অর্থ কি? সে তৎক্ষণাৎ পিতার দিকে চাহিল। পিতা বলিলেন, ‘আয়লা’ শব্দের অর্থ—চাঁদের চতুর্দিকের চক্র (Hallow round the moon)। ডিনারের পর বহুক্ষণ ধরিয়া চলিল ‘বল ডান্স’ ও স্পেন দেশীয় ‘ক্যাবারেট’। আয়লা কিছুক্ষণের জন্য ‘বল ডান্সে’ যোগদান করিল, নৃত্যসঙ্গী হইলেন তাহার পিতা।
গল্পগুজব ও নাচ উপভোগ করিবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের টেবিলে একটা ছোটখাট চিত্র-প্রতিযোগিতাও হইয়া গেল। ফাউণ্টেন পেনের রেখায় দ্রুত চিত্রাঙ্কনের প্রতিযোগিতায় যোগদান করিলেন হার এক্সেলেন্সী মাদাম হাকিম, মিঃ শেখ ও মিস আয়লা। আমরা তিনজন—রাজা সাহেব, মিসেস শেখ ও আমি বিচারক। আমাদের বিচারে আয়লা, মাদাম হাকিম ও মিঃ শেখের অঙ্কিত আবক্ষ নারী-মূর্তি যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করিল।
অনেক রাত্রে বাড়ী ফিরিয়া দেখিলাম নীলুফার ও খুরশিদ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। আমরা সে-রাত্রি মিঃ শেখের বাড়ীতেই কাটাইলাম।
২৩শে নবেম্বর। আমাদের পার্টি কোনিয়া হইতে ফিরিয়া আসিলে আমরা আজ আবার মিলিত হইলাম হোস্টেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়-কলাবিভাগ
আঙ্কারা ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির তরফ হইতে আমাদের চায়ের দাওয়াত ছিল। প্রফেসার সিনাসি আল্তুন্দাগ (ডীন অফ্ ফ্যাকাল্টি অফ্ আর্টস্) ছাড়াও ইতিহাস, ভূগোল এবং বিভিন্ন বিদেশী ভাষার অনেক অধ্যাপকের সঙ্গে আমাদের আলাপ হইল। প্রফেসার আফেতিনান্ ও ডক্টর মেতাহাৎ ওজ্গ্ প্রভৃতি জনকয়েক মহিলা-অধ্যাপকেরও সাক্ষাৎ পাইলাম। ডক্টর মেতাহাৎ ওজ্গ্ জার্মান সাহিত্যের অধ্যাপক; ‘ডক্টরে’ উপাধি লাভ করিয়াছেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় হইতে।
সাংস্কৃতিক মজলিস
চায়ের পর নাচগানের মজলিস। পল্লী-অঞ্চল হইতে নাচের পার্টি আসিয়াছে। লম্বা-চওড়া, জোয়ান তুর্কীর দল রংবেরংয়ের ডোরা-কাটা পাজামা-কুর্তা ধরণের পোষাক পরিয়া মস্ত মস্ত জুতা পায়ে পল্লী-নৃত্যে যোগদান করিল। ‘দোতারা’ ধরণের বাজনা ‘বাল্মা’ ও ‘জুরি’ বাজাইল কেহ কেহ। নাচের পার্টির মধ্যে এ দিন মেয়ে দেখিতে পাইলাম না একটিও। এই পল্লী-নৃত্যের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানী খটক নৃত্যের মিল দেখা গেল অনেকখানি। অর্কেস্টার ভিতর যেসব বাদ্যযন্ত্র বাজানো হইতেছে তার মধ্যে কোনটার নাম ‘ম্যেঁয়’, কোনটার বা ‘যীল’। নাম অপরিচিত হইলেও বাজনা গুলির আকৃতি সম্পূর্ণ নূতন ধরণের নয়। আমাদের কাছে সম্পূর্ণ নূতন ঠেকিল শুধু একটা বাজনা, নাম ‘কাশেক’ বা ‘চামচ’ বাজনা। এক হাতে দু’খানা করিয়া ‘টেবিল স্পুনের’ আকার মোট চারিখানা কাঠের রং-করা হালকা চামচ নিয়াই এই বাজনা। নাচের সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ক্ষিপ্রগতিতে ঠকাঠক্ চলিতে লাগিল। নৃত্য-শিল্পীদের এক একটা হাতের দু’ দুখানা চামচে ঠোকাঠুকি।
রেডিও আঙ্কারা
নৈশ-ভোজনের আগে রেডিও আঙ্কারার একটা সঙ্গীতানুষ্ঠানের রিহার্সেলে উপস্থিত থাকিবার দাওয়াত ছিল আমাদের। ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত ও লোক-সঙ্গীতের বিরাট আয়োজন দেখিলাম। মনে হইল পাকিস্তানী বন্ধুদের উপস্থিতি প্রত্যেকটি শিল্পীকে এক নূতন প্রেরণায় অনুপ্রাণিত করিয়াছে। অর্কেস্টার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত সঙ্গীতের পর বিশিষ্ট গায়িকা নরীম্যান সোজোর গাহিলেন একক সঙ্গীত। রেডিও আঙ্কারার ডিরেক্টর রুশেন কাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকিয়া পাকিস্তান-শুভেচ্ছা-মিশনকে খোশ আমদেদ জানাইলেন।
মিলিটারী একাডেমী
১৮ই নভেম্বর। আজ আমরা প্রথমেই পরিদর্শন করিলাম মিলিটারী একাডেমী। তন্ন তন্ন করিয়া আমাদের দেখানো হইল সামরিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটি অংশ; সকলের শেষে আমরা দেখিলাম এখানকার ছাত্রদের অদ্ভুত ব্যায়াম-ক্রীড়া অনুষ্ঠান। দেখিতে দেখিতে মনে পড়িয়া যাইতেছে, স্বাধীনতা-সংগ্রামের প্রাণ-কেন্দ্র ছিল এই প্রতিষ্ঠান। যে সব স্বদেশ-প্রেমিক বীরের বিন্দু বিন্দু রক্ত দেশময় ছড়াইয়া দিয়াছিল স্বাধীনতার বীজ, এখানেই শিক্ষা গ্রহণ করেন তাঁদের অনেকে। স্বয়ং মোস্তফা কামাল ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র। দেশময় মুর্দাদিলের আবর্জনার মধ্যে এখান হইতেই প্রথম প্রবাহিত হইয়াছিল প্রবল প্রাণোচ্ছ্বাস। এখানেই মুক্ত-প্রাণের সন্ধানী সৈনিক তরুণ মোস্তফা কামাল নব-জীবনের দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য নিজেকে প্রতিদিন প্রস্তুত করিয়া তুলিতে থাকেন। মিলিটারী একাডেমী ইস্তাম্বুল হইতে আঙ্কারায় স্থানান্তরিত হয় গণতন্ত্রের আমলে।
হাইস্কুল-পরীক্ষা এই প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের নিম্নতম যোগ্যতা বলিয়া গণ্য করা হয়। যুদ্ধ-বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে এখানে ছাত্রদের ইতিহাস, ভূগোল, আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়। বহু পুরাতন এই প্রতিষ্ঠান আব্দুল আজিজ, সোলেমান পাশা ও মাহমুদ পাশা প্রভৃতি সোলতানের আপ্রাণ যত্নে গড়িয়া উঠিয়াছিল। দেয়ালের গায়ে একটা চার্টে গ্রাফের সাহায্যে দেখানো হইয়াছে শুরু হইতে আজ পর্যন্ত প্রতি বৎসর কত গ্রাজুয়েট এখান হইতে শিক্ষা লাভ করিয়া বাহির হইতেছে। দেখিলাম, মোট গ্রাজুয়েটের সংখ্যা ছত্রিশ হাজার। চার্টের মধ্যে ধরা পড়িয়াছে, প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় গ্রাজুয়েটের সংখ্যা ছিল শূন্যের ঘরে। ট্রেনিং তখন একেবারেই বন্ধ ছিল; এই প্রতিষ্ঠানটিকে তখন মিলিটারী ক্যাম্পে পরিণত করা হয়।
বিভিন্ন কক্ষে আমরা দেখিলাম টোপোগ্রাফি, ক্যামুফ্লেজের সাজ-সরঞ্জাম, মানচিত্র পাঠ ও ফিল্মের সাহায্যে শিক্ষার ব্যবস্থা, ফিল্ড্ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বেতার যন্ত্র। অস্ত্র-শস্ত্রের কক্ষে প্রাচীন ঢাল, তলোয়ার, ছোরা এবং আধুনিক স্টেন্গান, ব্রেন্গান ও মেশিনগান প্রভৃতি সাজানো রহিয়াছে। একটি কক্ষে সাজানো দেখিতেছি শত শত রঙ্গীন পুতুল। দুনিয়ার সমস্ত দেশের বিভিন্ন যুগের সৈন্যদল ও সেনাপতির পোষাক ও অস্ত্র-শস্ত্র দেখানো হইয়াছে এই সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিমূর্তির সাহায্যে। জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘সব দেশেরই আছে দেখিতেছি, কিন্তু পাকিস্তানের কোন নমুনা নাই কেন?’ জবাব পাইলাম, ‘আমরা চেষ্টা করিয়াছিলাম কিন্তু জোগাড় করিতে পারি নাই; পাকিস্তান যদি পাঠাইয়া দেয়, তবে তাহা সাদরে স্থান পাইবে এই প্রদর্শনীতে।’
মিলিটারী একাডেমীর অধ্যক্ষ লেফটেনেণ্ট কর্নেল ইয়াহিয়া ওক্চু সর্বক্ষণ আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আছেন। তিনি তুর্কী সেনাবাহিনীর এসিস্টাণ্ট কমাণ্ডার-ইন্-চিফ। দেয়ালের গায়ে দু’খানা বড় ছবির দিকে তিনি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। দু’খানাতেই চিত্রিত হইয়াছে স্বাধীনতা-সমরের ঘটনা। একখানা ছবিতে জাতীয় সেনাবাহিনী কামাল পাশার নেতৃত্বে একটা বড় রকমের আক্রমণের জন্য অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। অন্যখানাতে দেখানো হইয়াছে গ্রীক ও তুর্কী সৈন্যদলের প্রবল সংঘর্ষ। গ্রীক সৈন্যাধ্যক্ষের নাম জেনারেল উইকোপিস্ আর তুর্কী-সেনাবাহিনীর নেতা স্বয়ং মোস্তফা কামালপাশা।
২৬শে আগস্ট, ১৯২২ সাল। জেনারেল উইকোপিসের অধীনে গ্রীক সৈন্যদল আগাইয়া আসিতেছে, তুর্কী-বাহিনী ছত্রভঙ্গ হইয়া যাইবার উপক্রম হইল। একদিকে গ্রীকদের পররাজ্য-লিপ্সা, অন্যদিকে তুর্কী জাতির নবজাগ্রত স্বদেশ-প্রেম ও স্বাধীনতার উন্মাদনা। বীর সেনাপতি কামালপাশার কুশাগ্র সমর-কৌশল ও সেই সঙ্গে তুর্কী সেনাদলের দুর্বার বিক্রম মোড় ফিরাইয়া দিল যুদ্ধের। শত্রু-সৈন্য পরাজয় বরণ করিতে বাধ্য হইল। ‘শুধু তুর্কী জাতিই নয়, দুনিয়ার সমস্ত স্বাধীন জাতির কাছেই স্মারণীয় হইয়া থাকিবে, এই দিনটি’ একথা বলিতে বলিতে সেনাপতি ইয়াহিয়ার চেহারা যেন এক অপূর্ব উদ্দীপনায় প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল।
ইহার পর এক ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে মিলিটারী একাডেমীর ছাত্রগণ সামরিক বাদ্যের সংগে সংগে নানাবিধ ব্যায়াম ও অদ্ভুত ক্রীড়া-কৌশল দেখাইয়া আমাদের বিস্ময়-বিমুগ্ধ করিলেন। পশ্চাৎপটভূমিতে কায়েদে আযম ও আতাতুর্কের চিত্র পতাকার আকারে পরস্পর মুখোমুখিভাবে শোভা পাইতেছে।
প্রোগ্রামের অন্তর্গত প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের পর উঁচুতে তুলিয়া ধরা হইতেছিল পাশাপাশি পাকিস্তান ও তুরস্কের জাতীয় পতাকা। একদিকে চন্দ্র ও তারকা খচিত তুরস্কের রক্ত-পতাকা, অন্যদিকে সাদা ও সবুজ পটভূমিকায় চন্দ্র ও তারকা চিহ্নিত পাকিস্তানের ঝাণ্ডা, উভয় দেশের সৌহার্দ ও সম্প্রীতি ঘোষণা করিতেছিল।
অনুষ্ঠানের শেষে লেফ্টেনেণ্ট কর্নেল ওক্চু জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কেমন লাগিল আমাদের এই প্রতিষ্ঠান।’ বলিলাম—‘মনে হইল, এই একটা জাতি বটে, মরিতে মরিতে মৃত্যুর গ্রাসের মধ্যে থাকিয়া নতুন জীবন লাভ করিয়াছে—এ’জাতি মরে নাই, মরিতে পারে না।’ মিলিটারী একাডেমীর কর্তপক্ষ ও ছাত্রদের উদ্দেশে আরো বলিলাম, ‘এই বীর যুবকদের দিকে চাহিয়া আমার মনে পড়িতেছে সেই বীর-জননীদের কথা, যাঁরা বুকের রক্তে এঁদের মানুষ করিয়াছেন। জাতি হিসাবে আমাদেরও হইয়াছে নব-জীবন লাভ। দীর্ঘকালের বিদেশী-শাসন নষ্ট করিতে পারে নাই আমাদের জীবনী-শক্তি। আমাদের মেয়েরাও আজ কোমল করে অস্ত্র ধরিতে শিখিতেছে। কিন্তু আমাদের এই প্রচেষ্টা শুধু আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা মাত্র। কোন দেশ বা জাতির শান্তিভঙ্গ কোন দিনই পাকিস্তানের উদ্দেশ্য নয়। তুরষ্ক ও পাকিস্তান উভয় দেশেরই লক্ষ্য বিশ্ব-শান্তি।’ আমাদের জাতীয় নারীসেনা-বাহিনী (Pakistan Women National Guards) ও ছোটদের মুকুল ফৌজের আয়োজন, যতই সামান্য হোক্ না কেন, আমার ইচ্ছা হইতেছিল যদি তাহাদের ব্যায়ামক্রীড়ানুষ্ঠান ইহাদের সামনে পেশ করিতে পারিতাম; এ কথাটুকু বক্তৃতামুখে তাঁহাদের কাছে উল্লেখ না করিয়া পারি নাই।
কিজ্ টেক্নিক্ ওরিথ্মেন্ ওকুল্
আমরা বিকালে পরিদর্শন করিলাম মেয়েদের টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং স্কুল (Kiz Teknik Orithmen Okul)। এই স্কুলটার কথা উল্লেখ করিয়াছি আগেই, কেননা এখানেই আমরা মেয়েরা কয়েক দিনের জন্য বাসা বাঁধিয়াছি। এই শ্রেণীর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সারা তুরস্কে এটিই বৃহত্তম। যে টিচাররা এখানে শিক্ষালাভ করেন, তাঁরা ছড়াইয়া পড়েন সারা তুরস্কের স্কুলগুলিতে। চা’রতলা বাড়ীর বিভিন্ন অংশে স্কুলের বিভিন্ন বিভাগ দেখানো হইল আমাদের। এম্ব্রয়ডারি বিভাগে সোনালী ও রূপালী জরির সূক্ষ্ম কারুকার্য সত্যই চমৎকার মনে হইল। তা’ ছাড়া পোষাক-তৈরির বিভাগে ছাত্রীদের নানা রকমের কোট, নাইটড্রেস ও অন্যান্য ড্রেসের ছাঁটকাট শেখানো হইতেছে নিখুঁত ভাবে। ড্রয়িং, পেণ্টিং এবং চামড়ার কাজের বিভাগ স্বতন্ত্র। কাগজ ও কাপড়ের তৈরি ফুল-লতা-পাতা দিয়া যেন সত্যিকারের বাগান সাজানো হইয়াছে একটা বিভাগে। ফটোগ্রাফার ক্যামেরা উদ্যত করিয়া দাঁড়াইয়াছে—তুর্কী ছাত্রীরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের হাসিতে হাসিতে বলিতেছে, ‘এই সময় তোমরা ফুল শুঁকিতে থাক যেন সত্যই সুগন্ধ পাইতেছ।’ বাস্তবিকই তাহাদের সাজানো বাগানের দিকে চাহিলে মনে হয় যেন শুঁকিয়া দেখিলে প্রাণ মোহিত হইবে।
পরিদর্শন শেষ হইলে টিচার ও ছাত্রীদের উদ্দেশে বলিলাম, ‘আমরা আজাদী লাভ করিয়াছি এই সেদিন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢালিয়া সাজিতে হইবে, আমাদের দেশকে গড়িয়া তুলিতে হইবে নতুন ভাবে। তোমাদের মত আমাদেরও স্কুল কলেজগুলিতে হাজার হাজার ছাত্রী আসিয়া ভিড় জমাইতেছে। তাহাদের মধ্যে আজ নব-জীবনের বান ডাকিয়াছে। মাত্র কয়েক বছর আগে ইহার কল্পনাও ছিল কঠিন। আমরা রাষ্ট্র গড়িতে শুরু করিয়াছি একেবারে শূন্য হাতে, কাজেই বহু কষ্টে ইহাদের স্থান সংকুলান করিতে হইতেছে আমাদের। এই সময় তোমাদের এই সুন্দর শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলিতে আমরা যাহা যাহা দেখিয়া গেলাম, দেশে ফিরিয়া তাহা এই রাশি রাশি মেয়েদের জন্য কাজে লাগাইবার চেষ্টা করিব। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থাকে গড়িয়া তোলার ব্যাপারে যথেষ্ট সহায়তা করিবে আমাদের এই অভিজ্ঞতা।
হালিদে এদিব সকাশে
সন্ধ্যার আগে আঙ্কারা-প্যালেসে মেয়রের টি-পার্টিতে আমাদের দাওয়াত! প্রতিদিনের মত উপস্থিত আছেন কয়েকশত মেহ্মান। কিন্তু তাছাড়াও উপস্থিত আছেন একজন বিশ্ব-বিখ্যাত তুর্কী মহিলা, যাঁর সঙ্গে পাকিস্তানের ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয় সাধন করাইবার জন্য আমি অত্যন্ত উদ্গ্রীব ছিলাম। ইনি মাদাম হালিদে এদিব হানম, তুরষ্কের জাগ্রত নারী-শক্তির প্রতীক। তুরষ্কের মাটিতে পা দিয়া অবধি আমি চেষ্টায় ছিলাম, কোথায় কি ভাবে এঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আগেই জানিতাম, বার্ধক্য হেতু তিনি আজকাল সাধারণতঃ নিরিবিলিই থাকেন।
যাঁহারা আমাদের প্রোগ্রাম স্থির করিতেছেন তাঁহারা বলিয়াছেন, হালিদে এদিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইবে ইস্তাম্বুলে। তবু ফাঁক পাইলেই আবার জিজ্ঞাসা করিতেছি, স্মরণ করাইয়া দিতেছি—পাছে যদি বা ভুল হইয়া যায়, এই জ্যোতির্ময়ী নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হইতে বঞ্চিত হই। মনে হইয়াছিল, আজাদ পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসাবে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করিতে না পারিলে বৃথাই আমার তুরষ্কে আসা।
ইস্তাম্বুল পৌঁছিবার আগেই হঠাৎ সুযোগ ঘটিয়া গেল। আমরা জানিতাম না, গ্র্যাণ্ড ন্যাশনাল এসেমব্লীর অধিবেশন উপলক্ষে ইস্তাম্বুল হইতে হালিদে স্বামীসহ আঙ্কারায় আসিয়াছেন এবং স্বামী-স্ত্রী দু’জনে আঙ্কারা প্যালেসেই আছেন।
আমি আজিকার চায়ের মজলিসে গোড়ার দিকে উপস্থিত ছিলাম না। হোস্টেলে কি একটুখানি কাজ ছিল। হঠাৎ দেখি, ডক্টর দানিয়েল ও বেদিয়া ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া হোস্টেলে আমার কামরার সামনে হাজির। আমি বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইতেই কোন কথা জিজ্ঞাসা করিবার ফুরসুৎ না দিয়া তাঁহারা হাঁপাইতে হাঁপাইতে জানাইলেন, আঙ্কারা-প্যালেসে চায়ের আসরে হালিদে এদিব আসিয়াছেন; তাঁহাকে আমার কথা বলা হইয়াছে, আমার জন্য অপেক্ষা করিয়া আছেন তিনি। আমার এই মুহূর্তে যাওয়া দরকার। আমি আর বাক্য ব্যয় না করিয়া কোন রকমে এক মিনিটে তৈরি হইয়া নিলাম; ছুটিয়া বাহির হইয়া গেলাম তাঁহাদের সঙ্গে।
মাদাম হালিদে এদিবের সঙ্গে আমার এই দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার তাঁহার সাক্ষাৎ লাভ করিয়াছিলাম কলিকাতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করিবার আমন্ত্রণ পাইয়া তিনি কলিকাতা যান। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁহার বক্তৃতার জন্য একটি জনসভারও আয়োজন করিয়াছিলেন। সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যের স্মৃতি আমার মনে অক্ষয় হইয়া আছে।
কলিকাতা শহরের শিক্ষিত শ্রেণীর লোক সেদিন ভাঙিয়া পড়িয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ হল প্রাংগণে; আমরা কিছুসংখ্যক মেয়েরাও আছি। উপরে ব্যাল্কনিতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন বিশ্বের বিস্ময়, মহিমান্বিতা এক নারী—আপাদমস্তক শুভ্র বস্ত্রে আচ্ছাদিত, শুধু মাত্র মুখখানা খোলা; যেন দীপ্তিতে ঝলমল করিতেছে। এদিকে জনতা বিশৃঙ্খল হইয়া পড়িয়াছে; সকলেই এই বিশ্ব-বিশ্রুত নারীকে এক চোখ দেখিয়া লইবার জন্য ব্যাকুল। সকলেরই চোখ উপরে ব্যাল্কনির দিকে। হালিদে এদিব হানম বক্তৃতা শুরু করিয়াছেন, কিন্তু উদ্যোক্তারা জনতার স্থান-সঙ্কুলান করিতে পারিতেছেন না কোন রকমে। তাঁহারা এই বিরাট জন-সমাবেশের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সেদিনকার মত সভা স্থগিত না রাখিয়া উপায় নাই; ঘোষণা করা হইল, পরের দিন যথাযোগ্য ভাবে আবার সভার আয়োজন করা হইবে।
নিখিল ভারত নারী সম্মিলন ও আঞ্জুমনে খাওয়াতিনে ইসলামের তরফ হইতে আমরা হালিদে এদিবের সম্বর্ধনার জন্য ওয়াই. ডব্লিউ সি. এ. হলে এক নারী-সমাবেশেরও ব্যবস্থা করিয়াছিলাম। কলিকাতা লোয়ার সার্কুলার রোডের উপর ‘খলিল ম্যানসনে’ তাঁহার থাকার ব্যবস্থা হইয়াছিল। তিনি জনাব আবদুর রহমান সিদ্দিকীর মেহ্মান হইয়াছিলেন। সে সময় একাধারে সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক ও বীর যোদ্ধা এই তুর্কী নারীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাইয়াছিলাম কয়েকদিন।
দীর্ঘকাল পরে আজ আবার ‘আঙ্কারা প্যালেসে’ হালিদে এদিব সকাশে উপস্থিত হইলাম। তাঁহার কলিকাতা সফরের কথা স্মরণ করাইয়া দিতে তিনি মুহূর্তকাল নীরবে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন—‘হাঁ, তোমার চোখের পানে চাহিয়া তোমাকে ঠিকই চিনিতে পারিতেছি। মনে পড়িতেছে তুমি খুব উৎসাহী ছিলে।’ বলিলাম—‘সেদিন আমাদের দেশে দু’একটির বেশী মুসলমান মেয়ের তুমি সাক্ষাৎ পাও নাই। কিন্তু আজ তোমার সামনে দেখিতে পাইতেছ শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী একদল মেয়ে আমাদের। জ্ঞানলাভের আশায় এঁরা ছুটিয়া আসিয়াছেন এই দূর দেশে। আমাদের নবীনা ছাত্রী সমাজের প্রতিনিধি এঁরা। গৌরব ও আনন্দের সঙ্গে আমি তোমার সঙ্গে ইঁহাদের প্রত্যেকের পরিচয় করাইয়া দিতেছি। কুলসুমের দিকে দেখাইয়া বলিলাম, ‘এই মেয়েটি তিন সন্তানের জননী, অন্যদিকে পরিশ্রমশীলা মেধাবী ছাত্রী।’
‘ছাত্রী? হাঁ, শৈশবের দোলনা হইতে শুরু করিয়া কবর পর্যন্ত সারা জীবন আমরা ছাত্র-ছাত্রীই বটে,’ তিনি জবাব দিলেন। আরো বলিলাম—‘তোমাকে যখন আমাদের মধ্যে পাইয়াছিলাম সেদিন আমরা ছিলাম পরাধীন। কিন্তু আজ আমরা আসিয়াছি তোমাদের দেশে স্বাধীন নাগরিক হিসাবে। তোমাদের জন্য আমরা বহন করিয়া আনিয়াছি পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম রাষ্ট্রের শুভেচ্ছার বাণী।’ হালিদে এদিব ধীরে ধীরে বলিলেন, ‘পরাধীনতা বাহিরের জিনিস, তোমরা শুধু আজই আজাদ হও নাই, আজাদ ছিলে তোমরা সেদিনও। আত্মা তোমাদের কখনো শেকলে বাঁধা পড়ে নাই। সেইজন্যই তো তোমরা পরাধীনতার বন্ধন ছিন্ন করিতে পারিয়াছ আজ।’
কথা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলিলেন, ‘শুধু ইসলামের দোহাই পাড়িলে চলিবে না; অনুসরণ করিতে হইবে ইসলামের সত্যিকারের আদর্শ। জাতির অর্ধেকাংশ যদি অচল হইয়া থাকে, কোন কাজেই সাফল্য আসিতে পারে না।’
আমাদের পার্টির একটি ছেলে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘নারীর কর্মক্ষেত্র কতখানি বিস্তৃত হওয়া উচিত বলিয়া তুমি মনে কর? ক্ষেতখামারে বা কলকারখানায় সর্বত্রই কি নারী পুরুষের সঙ্গে সমানে আগাইবে?’ জবাবে তিনি বলিলেন, ‘নারী স্বাধীনতাই যদি চাই, সমান অধিকারই যদি আমাদের লক্ষ্য, তাহা হইলে কোন রকমের অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করিব আবার কোন্ দাবীতে?’ অতিরিক্ত সুবিধার কথা নয়, স্থান বিশেষে নারীর কর্তব্য ও কর্মক্ষেত্র যে পৃথক—সে কথাটা, মনে হইল তিনি এড়াইয়া গেলেন।
‘নারীর অধিকার সম্পর্কে পাকিস্তানে পুরুষের মনোভাব কি?’ প্রশ্ন করিলেন তিনি। সোজাসুজি জবাব না দিয়া দেখাইয়া দিলাম শুধু একটা দিক। নারীর ভোটাধিকারের প্রসঙ্গ তুলিয়া বলিলাম, ‘পাকিস্তানী মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে ভোগ করে ভোটাধিকার। বহুকাল আগে তুমি যখন আমাদের দেশ সফরে যাও, তখন নারীর ভোটাধিকারের জন্য আমরা জোর আন্দোলন চালাইতেছি। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ মেয়েদের ও বর্তমান মিসরের মেয়েদের তুলনায় তাহা কিছুই নয়।’ তখন হালিদে এদিব বলিলেন, ‘ভোটাধিকার সম্পর্কে মনে রাখিতে হইবে যোগ্যতম প্রার্থী নির্বাচনই বড় কথা, অধিকার লাভটা বড় কথা নয়। যোগ্যতম প্রার্থী নির্বাচন করিতে না পারিলে অধিকার হইয়া দাঁড়ায় অর্থহীন।’ উত্তরে বলিলাম, ‘এই ব্যাপারে বিচার-বুদ্ধি পরিচয় দিতে হইলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও শিক্ষার প্রয়োজন। শিক্ষা-বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিচার-শক্তি আপনি জন্মাইবে।’ তিনি ![]()
হালিদে এদিব সকাশে পাকিস্তানী ছাত্রছাত্রীদল।
মাদাম হালিদে এদিব হানন অটোগ্রাফের খাতায় দস্তখত করিতেছেন।
লেখিকাকে বাম পার্শ্বে উপবিষ্টা দেখা যাইতেছে। কিন্তু আমার সঙ্গে একমত হইলেন না। বরং বলিলেন, ‘বয়স্ক-ভোটাধিকার সম্পর্কে শিক্ষা অর্থে বোঝায় মাত্র অক্ষর-জ্ঞান। অথচ অক্ষর-জ্ঞানে বিশেষ কিছু আসিয়া যায় না, সাধারণ-বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হইলে অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা অক্ষর-জ্ঞান না থাকিলেও অনেক কিছু করিতে পারেন।’
কথা প্রসঙ্গে হালিদে এদিবকে জানাইলাম, তাঁহার পূর্বপরিচিত মনীষী আবদুর রহমান সিদ্দিকী এখন পূর্ব-বঙ্গের গভর্নর। জনাব সিদ্দিকীর কুশল-প্রশ্ন করিয়া তাঁহাকে শুভেচ্ছা জানাইতে অনুরোধ করিলেন তিনি।
আমাদের মিশনের সদস্যরা তুর্কী ভাষায় যত অনভিজ্ঞই হোন না কেন, একটা কথার মর্ম কিন্তু হাড়ে হাড়ে বুঝিয়াছেন, ‘চাবুক, চাবুক, চোক্ চাবুক’—‘জলদি কর, খুব জলদি।’ সকাল হইতে অর্ধ রাত্রি পর্যন্ত উঠিতে বসিতে, চলিতে ফিরিতে আমাদের ত্রিশটি প্রাণীকে জনকয়েক ভারপ্রাপ্ত তুর্কী পুরুষ ও মেয়ে যেন তাড়াইয়া নিয়া বেড়াইতেছেন। পর পর অত ঠাসাঠাসি ভাবে প্রোগ্রাম তৈরি করা হইয়াছে যে তাহা না করিয়া উপায় নাই। চোটটা বেশী পড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর। ‘চোক্ চাবুকের’ ঠেলায় তারা অস্থির। কোন্ মেয়েটি যেন রহস্য করিয়া সে কথা বলিতেছিলেন। কথাটা হালিদে এদিবের কানে গেল। তিনি বলিলেন, ‘হাঁ, একদিন তুর্কী-জাতির নীতি ছিল ‘গাওয়াশ্’ অর্থাৎ ‘ধীরে ধীরে’। কিন্তু সেদিন আর নাই। জাতি আগাইয়া চলিতেছে তীব্র গতিতে। আজ আমাদের মূলমন্ত্র—’চোক্ চাবুক্।’
আমাদের আঙ্কারা-বাস শেষ হইয়া আসিয়াছে। এর পর আমরা বুর্সা হইয়া যাইব ইস্তাম্বুল। হালিদে এদিবের কাছে শুনিলাম, বুর্সা প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ারের জন্মস্থান। স্মার্নার স্মৃতি আমাদের মনে চির-উজ্জ্বল। আমাদের প্রোগ্রামে কিন্তু স্মার্নার নতুন নাম ইয্মিরের উল্লেখ নাই। এ কথা শুনিয়া হালিদে বলিলেন, ‘বুর্সা ও ইস্তাম্বুলে তোমাদের দেখিবার অনেক কিছু আছে, স্মার্নায় নহে। স্মার্নার যাহা বৈশিষ্ট্য, তাহা শুধু আমাদেরই উপলব্ধি করিবার মত।’ কথাটায় সায় দিতে পারিলাম না। কেন? নাইবা থাকিল স্মার্নায় প্রাচীন স্থাপত্য-শিল্পের নিদর্শন বা উন্নত সভ্যতার অন্য কোন পরিচয়; আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের পরিচয় নাই-বা বহন করিল স্মার্না। নব্য-তুর্কীর ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এই স্মার্না; ইস্পাতে-গড়া একটি স্বাপ্নিক মানুষের স্বপ্নসাধ এখানেই তো প্রথম দানা বাঁধিতে শুরু করিয়াছিল; ইহার আকাশ-বাতাস ও ধুলিকণা কি দুনিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে যুগে যুগে সাড়া জাগাইবে না?
বিদায় লইবার সময় আঠার বৎসর আগেকার কথা স্মরণ করিয়া বলিলাম—‘মাদাম, এত দীর্ঘ কাল পরে তোমাকে দেখিলাম। মনে হইল না, কিছু মাত্র পরিবর্তন হইয়াছে তোমার মধ্যে। চিরন্তন, শাশ্বত নারী-শক্তির প্রতীক তুমি। সেদিন তোমাকে যেমন দেখিয়াছিলাম, মনে হইতেছে আজো ঠিক তেমনি আছ তুমি।’ হালিদে এদিব সকৌতুক গাম্ভীর্যের সহিত উত্তর দিলেন, ‘সত্যই কি তাই! সেদিনের সেই আমি হয়ত বাঁচিয়া আছি শুধু তোমার কল্পনাতেই, বাস্তবে নহে।
হালিদে এদিবের নিকট হইতে বিদায় নিয়া চলিলাম। কি এক প্রগাঢ় পরিপূর্ণতায় আমার সারা হৃদয় আচ্ছন্ন হইয়া রহিয়াছে। ফিরিবার সময় সারা পথ তাঁহার ব্যক্তিত্ব ও শান্ত-মধুর ব্যবহার আমার অবচেতন মনে সূক্ষ্ম কারুকার্য বুনিতে লাগিল। খর্বাকৃতি, উজ্জলকান্তি, মহিমময়ী নারী। ধীর-স্থির, প্রতিভা ও কর্মের গৌরবে সমৃদ্ধ জীবন; প্রদীপ্ত ব্যক্তিত্ব, কিন্তু উত্তাপ নাই। চারিদিক ঘিরিয়া যেন মর্যাদার ও সেই সঙ্গে স্নিগ্ধ প্রসন্নতার একখানি অপরূপ উত্তরীয় জড়ানো রহিয়াছে। দারুণ দুর্যোগে ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়া যে নারী একদিন তুর্কী জাতিকে অবিচলিত সাহস ও সঙ্কল্পের সঙ্গে পথ দেখাইয়া লক্ষ্যপথে লইয়া চলিয়াছিলেন, শুধু তুরস্কেই নয়, যিনি সারা দুনিয়ায় একদিন বিস্ময় সৃষ্টি করিয়াছিলেন, আজ জীবনের সায়াহ্ন-বেলায় তাঁহার সমস্ত উদ্যম ও কর্মতৎপরতা যেন এক অপূর্ব প্রশান্তিতে পরিণতি লাভ করিয়াছে।
মনে হইল, হালিদে এদিব নিজেকে নিঃশেষে বিলাইয়া দিয়া হালকা হইয়াছেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছড়াইয়া পড়িয়াছেন তুরস্কের দিকে দিকে লক্ষ লক্ষ নারীর জীবনে। তুরষ্কের স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যে আনন্দ-প্রতিমা ছাত্রীদের সাক্ষাৎ পাইয়াছি, প্রতিদিন যে রাশি রাশি ডাক্তার অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক বা সমাজকর্মী মেয়েদের সঙ্গে আলাপ পরিচয়ের সুযোগ পাইয়াছি, মনে হইয়াছে ইহাদের প্রত্যেকের মধ্যে আবার নূতন যৌবন ফিরিয়া পাইয়াছেন হালিদে এদিব।
তুরষ্ক সফরের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যে দীর্ঘকাল পরে হালিদে এদিবের এই অল্পক্ষণের উদার-প্রসন্ন সাহচর্য আমার জীবনের সম্পদ হইয়া রহিল। কেবলি মনে হইতে লাগিল, সার্থক হইল, আমার তুরষ্কে আসা সার্থক হইল। স্তব্ধ হইয়া হোস্টেলে ফিরিয়া যাইতেই তুর্কী মেয়েরা কয়েকজন কাছে আসিয়া জুটিয়াছে। প্রায়ই এমন হয়। আজ কোথায় কোথায় গিয়াছিলাম, কি কি দেখিয়াছি, হালিদে এদিব কি বলিয়াছেন,—তাহাদের এমনি ধরণের নানা প্রশ্নে আমার আচ্ছন্ন চৈতন্যের ধ্যান ভাঙিয়া গেল। সকৌতুকে বলিলাম, ‘হালিদে এদিব বলিলেন, আমাকে চিনিতে পারিয়াছেন চোখ দেখিয়া।’ আয়হান সরল গাম্ভীর্যের সঙ্গে বিজ্ঞের মত বলিয়া উঠিল, ‘ঠিকইতো বলিয়াছেন। চোখেইতো মানুষের পরিচয়। বহুদিন পর দেখা হইলে আমি চোখের পানে চাহিয়াইতো আমার বন্ধু-বান্ধবকে চিনিয়া লই।’
গজনফর আলীর গৃহ-প্রবেশ
রাত্রিবেলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত রাজা গজনফর আলী পাকিস্তানী শুভেচ্ছা মিশনের অভ্যর্থনার জন্য তাঁহার বাসগৃহে ভোজ-সভার আয়োজন করিয়াছেন। আজই প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ারের আহ্বানে আকস্মিকভাবে তাঁহাকে পরিচয়-পত্র পেশ করিতে হইয়াছে। আবার আজই তিনি ‘আঙ্কারা প্যালেস’ ছাড়িয়া আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহ-প্রবেশ করিলেন। নিমন্ত্রিত অতিথিবর্গকে সম্ভাষণ জানাইয়া তিনি বলিলেন, এই বিভিন্ন ব্যাপারের একত্র সন্নিবেশ বিশেষ শুভ লক্ষণই সূচনা করিতেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে পাকিস্তান শুভেচ্ছা মিশনের সাহচর্যে অভাবনীয় আন্তরিকতা ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে আমাদের নতুন রাষ্ট্রদূত তুরষ্কের সুধীসমাজের সঙ্গে পরিচয় সাধনের সুযোগ পাইলেন।
সপরিবার পররাষ্ট্র-সচিব মিঃ ফুয়াদ কপরুলু ছাড়াও তুরষ্কের জ্ঞানী ও গুণী সমাজের বহু লোক উপস্থিত আছেন এই অনুষ্ঠানে মেয়েদের মধ্যে আমার এক পরিচিত তুর্কী মহিলার সাক্ষাৎ পাইলাম। ইনি বায়ান এস্মা নে’ম্যান্, তুরষ্কের গ্র্যাণ্ড ন্যাশনাল এসেমব্লির ভূতপূর্ব সদস্য। তাঁহার মুখে শুনিলাম, তুরষ্কের বিশিষ্ট আইনজীবী মহিলা সুরাইয়া আ-ওলু সম্প্রতি কোন জার্মান ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছেন। আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মিলন উপলক্ষে এস্মা, সুরাইয়া, বায়কান গুনেল প্রভৃতি মহিলা কিছুদিন আগে লাহোর গিয়াছিলেন। তাঁহাদের সঙ্গে আমার তখনকার পরিচয়। এস্মা নে’মান বলিয়া চলিলেন ‘সুরাইয়া বিদেশীকে বিবাহ করায় সমাজে সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছিল। সংবাদ-পত্রগুলি মুখর হইয়াছিল তাঁহার নিন্দায়।’ ডক্টর দানিয়েল বেদিজ বলিয়া উঠিলেন, ‘সত্যই তো, কেন বিবাহ করিল সে বিধর্মীকে? আমি বরং পাকিস্তানী মেয়ে বিবাহ করিতে রাজি আছি; বিধর্মী বিবাহ করার প্রশ্নই তো উঠিতে পারে না।’ দেখিলাম এ সম্পর্কে একজন নারীর চিন্তাধারা একেবারে অন্যরূপ। এস্মা নে’ম্যান তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, ‘কেন, যেখানে ব্যক্তিগত রুচি নিয়া কথা, সেখানে ধর্মের প্রশ্নই বা আসিবে কেন?’
খাওয়ার পর বসিল সঙ্গীতের আসর। উর্দু, ফার্সী ও তুর্কী সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বনিত হইল বাংলা গানেরও সুর। নজরুল সঙ্গীতের মধ্যে লায়লা বেশীর ভাগ গাহিতেছেন, তিনটি ঝুমুর গান—‘চুড়ির তালে নুড়ির মালা’, ‘রুম ঝুম্, ঝুম ঝুম খেজুর পাতার নূপুর বাজে’ এবং ‘বাঁকা ছুরির মত বেঁকে উঠ্ল যে তোর আঁখিরে।’ -ক্বচিৎ কোনদিন মোস্তফা কামাল লায়লার সঙ্গে সমবেত কণ্ঠে গাহিতেছেন। লায়লার কণ্ঠে জসিম উদ্দীনের ভাটিয়ালী গান রণিত হইতেছে—‘নদীর কূল নাই, কিনার নাইরে!’ আয়ুব খান, একটা তুর্কী গান জানেন—‘য়্যুসক্যুদারা গিদা রিক্কেন
আলবেদা বেরিয়া মুর’;
নজরুলের ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহম্মদ’ গানটির সুর এই তুর্কী গানটিরই সুরের অনুরূপ। আয়ুব এই গানের একটা বিশেষ পদ গাহিবার সময় প্রত্যেক বারই তুর্কী শ্রোতাদের মধ্যে কি জানি কেন, হাসির হুল্লোড় পড়িয়া যাইতেছে। জানা গেল, গানটি কৌতুক রচনা। বাদল দিনে য়্যসক্যুদারার পথে চলিয়াছে একটি যুবক তাহার বান্ধবীর সঙ্গে। তাহাদের আচরণ ও বাক্যালাপে কৌতুকজনক কিছু আছে, তাহাতেই হাসির কারণ ঘটিতেছে। ইহা ছাড়া মাঝে মাঝে এক একটা ফ্রেঞ্চ এবং ইটালিয়ান গানও পরিবেশন করিতেছেন আয়ুব খান।
আঙ্কারা বেতারে পাকিস্তানী-অনুষ্ঠান
১৯শে নভেম্বর। আমাদের মধ্যে কয়েকজনকে আগেই জানাইয়া রাখা হইয়াছে যে আজ সকাল বেলা রেডিও আঙ্কারার প্রোগ্রামে আমাদের অংশ গ্রহণ করিতে হইবে। শেষ পর্যন্ত প্রফেসার হালিমের যাওয়া হইল না, তাড়াতাড়ি রেডিও-স্টেশনের দিকে চলিলাম আমরা চারজন—কবি জসিমউদ্দীন, ফিরোজ বাচোম, লায়লা ও আমি। কিছুক্ষণ ধরিয়া আমাদের গলার আওয়াজ পরীক্ষা, সময়ের পরিমাণ নির্ণয় করিবার পরে রেকর্ড। করা হইল আমাদের প্রোগ্রাম। কবি জসিমউদ্দীন আবৃত্তি করিলেন তাঁর স্বরচিত কবিতা ‘দাদীর কবর’, ফিরোজ বাচোম পিয়ানোতে বাজাইলেন কয়েকটা গৎ, লায়লা বাংলা, ফার্সী ও উর্দুতে কয়েকটা গান গাহিলেন আর আমি একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনায় জানাইলাম স্বপ্নের তুরষ্ককে বাস্তবে কেমন দেখিতেছি, বুঝিতেছি, উপলব্ধি করিতেছি। কেমন করিয়া জানি না, বেতারের সাহায্যে তুরষ্কের আকাশে পাকিস্তানের বাণী ধ্বনিত হইল যাহাদের কণ্ঠে, তারা সকলেই পূর্ব পাকিস্তানী। রেডিও-স্টেশন হইতে আমরা যখন বাহির হইলাম তখন খাওয়ার সময় হইয়া গিয়াছে। ‘বালি’ কামাল আয়গুনের তরফ হইতে আজ আমাদের খানার দাওয়াত।
জালাল বায়ার সমীপে
প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ার ইতিমধ্যে বুর্সা হইতে ফিরিয়া আসিয়াছেন। আজ রাত্রে প্রেসিডেণ্ট-ভবনে ‘পাকিস্তান কুল্তুর্ হেইয়েতি’ (Pakistan Cultural Mission) এর অভ্যর্থনার আয়োজন করা হইয়াছে। আমাদের পৌঁছিবার আগেই স্থানীয় অতিথি-অভ্যাগতদের উপস্থিতিতে প্রেসিডেণ্ট ভবন সরগরম। আমরা তাঁহাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় মশগুল হইলাম। ততক্ষণে প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য পাকিস্তান শুভেচ্ছা মিশনের বয়স্ক-সদস্যদের ডাক পড়িয়াছে।
উপর তলায় তাঁহার সন্নিধানে উপস্থিত হইলাম আমরা ছয়জন। ঘরখানার চারিদিকেই আলমারী-বোঝাই বই-পুস্তক, হয়ত এটা লাইব্রেরীই হইবে। তিনি একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনায় জানাইলেন পাকিস্তানের প্রতি গভীর প্রীতিপূর্ণ মনোভাব। সঙ্গে সঙ্গে আরো বলিলেন, ‘পাকিস্তানীদের আমরা বিদেশী বলিয়া গণ্য করিতেছি না, আমাদের নিতান্ত অন্তরঙ্গ মিত্র-রাষ্ট্র পাকিস্তান। তুরষ্কের কোন কিছুই তোমাদের কাছে গোপন রাখা হইবে না, মায় সামরিক ব্যবস্থা পর্যন্ত। যদি বিশেষ কোন ‘আরজু’ থাকে তোমাদের, অসঙ্কোচে প্রকাশ করিবে, এই আমার অনুরোধ; তাহা পূর্ণ করিতে আমরা কুণ্ঠিত হইব না।’ মিশনের তরফ হইতে পাকিস্তানের শুভেচ্ছার বাণী পেশ করিবার পর প্রফেসার হালিম কথাপ্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মিলনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করিলেন।
জালাল বায়ার বলিতেছেন—‘তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এই ধরণের আরো সাংস্কৃতিক মিশন বিনিময় অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি তুরষ্ক হইতে শীঘ্রই আর একটি শুভেচ্ছা মিশন পাকিস্তানে পাঠাইবার প্রস্তাব পেশ করিবেন গ্রাণ্ড ন্যাশনাল এসেমব্লীতে, একথাও জানাইলেন। এই সুযোগে আমি লাহোরের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মুসলিম মহিলা সম্মিলনের কথা উল্লেখ করিয়া বলিলাম, ‘নিখিল পাকিস্তান মহিলা সমিতি সম্মিলন আহ্বান করিয়া দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন; এবার তুরষ্কের মেয়েরা আন্তর্জাতিক সম্মিলনের জন্য দাওয়াত পাঠাইবেন, আমরা সেই আশায় আছি।’ এই ধরণের সম্মিলনে বিভিন্ন দেশের নারী-সমাজকে পরস্পরের সমস্যা আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করিয়া দেওয়ার ব্যাপারে তুরষ্ক-সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যাইবে, এই আশা প্রকাশ করিলাম। গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে প্রেসিডেণ্ট জালাল বায়ার এই প্রস্তাবে তাঁহার পূর্ণ সমর্থন জানাইলেন।
এই সাক্ষাৎকারে একটা নূতনত্ব দেখিলাম। যিনি দোভাষীর কাজ করিতেছেন তিনি উর্দুতে কথা বলিতেছেন স্বচ্ছন্দে; তিনি দোভাষীর কাজ চালাইতেছেন উর্দুতেই। এই তুর্কী ভদ্রলোক এককালে অবিভক্ত ভারতে ছিলেন বহু বৎসর এবং তাঁহার স্ত্রী সেখানকারই মেয়ে; তাহারই ফলে উর্দু ভাষায় তাঁহার দখল জন্মিয়াছে।
সাক্ষাৎকার শেষ হইলে জালাল বায়ার আমাদের সঙ্গে নিয়া নীচে নামিয়া আসিলেন। চায়ের ‘বুফে’ মজলিসের মধ্যে চলিতে লাগিল পাকিস্তানী ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁহার আলাপ পরিচয়। অটোগ্রাফের খাতায় নাম সহি করিতে গিয়া তিনি আমাকে স্মরণ করাইয়া দিতেছেন, ‘জালাল বায়ার’ নামে পরিচিত হইলেও তাঁহার আসল নাম ‘মোহম্মদ জালাল উদ্দীন।’
নীলুফার গিউসয়
প্রেসিডেণ্ট-দুহিতা নীলুফার গিউসয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল। কথা প্রসঙ্গে জানিতে পারিলাম মহিলা বিবাহিতা এবং তাঁহার শ্বশুর পক্ষের পারিবারিক পদবী ‘গিউসয়;’ সেই জন্যই বায়ারকন্যা ‘গিউসয়’ নামে পরিচিত। সামাজিক বিপ্লবের ঝড়ে যেদিন তুর্কী পুরুষের মাথার ‘ফেজ’ খসিয়া পড়িয়াছিল, উড়িয়া গিয়াছিল তুর্কী নারীর মুখের নেকাব, সঙ্গে সঙ্গে সেদিন নূতন নামে পরিচিত হইয়াছিল প্রত্যেকটি তুর্কী নরনারী। তুরষ্ক সরকার ঘরে ঘরে ফরমান জারি করিয়াছিলেন, নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে প্রত্যেক পরিবারের নির্দিষ্ট পারিবারিক পদবী স্থির করিয়া রেজিস্টারী করিয়া লইতে হইবে নূতন নাম। আসল নামগুলি আরবী রহিল ঠিকই। কিন্তু নূতন পারিবারিক পদবীগুলি খাঁটি তুর্কী শব্দ, তুরষ্কে আসিয়া প্রত্যেকটি নামের মধ্যে এটা লক্ষ্য করিতেছি। রাতারাতি নূতন নামকরণের ফলে বিপ্লবের যুগে পরিচিত বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-পরিজনের মধ্যে হঠাৎ গড়িয়া উঠিয়াছে অপরিচয়ের ধূম্রজাল; সামনাসামনি সাক্ষাৎ না হইলে কেবল মাত্র নাম শুনিয়া চিনিয়া লওয়া অসম্ভব হইয়াছে। পরস্পরকে নূতন করিয়া আবিষ্কার করিতে হইয়াছে অনেক সময়। এমনি কত শত কথা আলোচনা হইতেছে চা পানের সঙ্গে সঙ্গে।
নৃত্যগীতের আসর
চায়ের পর বিস্তীর্ণ হলে নৃত্যগীতের আসর বসিল। বিখ্যাত সুর-শিল্পীদের আধুনিক সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে পল্লী অঞ্চল হইতে আগত একদল শিল্পী পরিবেশন করিলেন লোকনৃত্য ও পল্লীসঙ্গীত। ইঁহাদের দলে নারী ও পুরুষ উভয়ই আছেন। গ্রামাঞ্চলের নৃত্য ও সঙ্গীত বিশিষ্ট ছন্দে ও সুরে অনুষ্ঠানটিকে উৎসবমুখর করিয়া তুলিয়াছে; উৎসবে নূতন রং যোজনা করিয়াছে পল্লীগ্রামের বিচিত্র বেশভূষা।
তুরষ্কের আধুনিক নৃত্য-গীতে পাশ্চাত্য প্রভাব প্রধান হইলেও পল্লীনৃত্য এবং লোক-সঙ্গীতের ভিতর দিয়া এদেশের নিজস্ব সুর ও বৈশিষ্ট্যটুকু আমাদের কাছে ঠিক ধরা পড়িতেছে। মনে হইতেছে, ইহা আমাদের একেবারে অপরিচিত নয়; আমাদের দেশের পল্লী-গীতি ও গ্রাম্য-নৃত্যের সঙ্গে কোথায় যেন ইহার মিল রহিয়াছে।
কবি হালিদে নুসরত
তুরস্কের বিখ্যাত মহিলা-কবি হালিদে নুসরত জোরুল্তানা উপস্থিত আছেন প্রেসিডেণ্ট-ভবনের এই মজলিসে। কবি হালিদে আমাকে তাঁহার একখানা তুর্কী কাব্যগ্রন্থ উপহার দিলেন, তাহাতে কাঁচা হরফে ইংরেজীতে নাম লিখিয়া দিতে ভুলিলেন না। বৎসর দুই পূর্বে ঢাকায় ‘হুর্রিয়েৎ’ সম্পাদক হিক্মত্ ফরিদুন্ এস্ ও তাঁহার পত্নীকে আলোচনা প্রসঙ্গে তুরস্কের কবি ও সাহিত্যিকদের কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। মনে পড়িল, মহিলা-কবিদের কথায় হালিদে নুসরতের নাম করিয়াছিলেন তাঁহারা।
হালিদে নুসরতের কবিতার বইয়ের পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি ‘তোমার কাব্যের বিষয়-বস্তু কি?’ ‘প্রকৃতির নব নব রূপই আমার কাব্যের বিষয়-বস্তু’, জবাব দিলেন তিনি। বলিলাম, ‘কেন, মানুষের বাস্তব-জীবনের রূঢ় ঘাত-প্রতিঘাত এবং সঙ্গে সঙ্গে ‘ভূতলের স্বর্গ খণ্ডগুলি’ কি তোমার কাব্য-সৃষ্টির প্রেরণা জোগায় না?’ ‘হ্যাঁ, মানুষও স্থান পাইয়াছে আমার কাব্যে,’ বলিতেছেন হালিদে নুসরত।
রাতের প্রহরী
কাল ভোরবেলা আমরা আঙ্কারা ছাড়িয়া বুর্সার পথে রওনা হইব। তাই জালাল বায়ারের চায়ের মজলিস হইতে অনেক রাতে বাড়ী ফিরিয়া আমাদের বাক্স-বিছানা মোটামুটি গোছাইয়া রাখিতে হইল। আমি একা একা দোতলার ঘরে গোছ-গাছ করিতেছি; যে ‘হিয্মত্চি’ (খেদমতগার) মেয়েটি রাত্রিবেলা ডিউটিতে থাকে, সে আসিয়া বারে বারে উঁকি মারিয়া যাইতেছে এবং দুর্বোধ্য ভাষায় আমাকে এটা ওটা পরামর্শ দিবার চেষ্টা করিতেছে।
যে ক’দিন আঙ্কারায় আছি, মেয়েরা রাত্রে শুইতে যাইবার পর হোস্টেলে এই বৃদ্ধা আয়াটি আমার কাছাকাছি থাকে। রাত্রে পাহারা দেওয়া তাহার কাজ। রাত্রে যখনই ঘুম ভাঙ্গে, দেখিতে পাই পা পর্যন্ত লুটানো, ঢিলাঢালা পোষাক পরা মেয়েটি কখনো সুদীর্ঘ বারান্দার এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ধীরে ধীরে টহল দিতেছে, কখনো বারান্দার এক কোণে জায়নমায পাতিয়া নমায পড়িতেছে বা তস্বীহ্ টিপিতেছে, উপরে নীচে আসা যাওয়া করিতেছে এক একবার; কোন ফাঁকে বা একটুখানি ঝিমাইয়া নিতেছে। সব সময় কিন্তু আমার দিকে নজর রাখিতেছে ঠিক। অনেক রাতে যখন বাড়ী ফিরি, হোস্টেলের চারশো’ ছাত্রী তখন ঘুমে অচেতন। আয়াটি নিকট-আত্মীয়ের মত আমার আশে পাশে ঘোরা ফেরা করে, যত্নের সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এটা ওটা আগাইয়া দেয়, কত শত কথা জিজ্ঞাসা করে, বলিয়া চলে, আমি তার খুব সামান্যই বুঝিতে পারি। তুরষ্কের সঙ্গে পাকিস্তানের কৃষ্টিগত সম্পর্কের কতটুকু খবর সে রাখে? রাজনীতি ক্ষেত্রে উভয় জাতির সৌহার্দের প্রয়োজন কতখানি, তা’ নিয়াও সে মাথা ঘামায় না। পাকিস্তান কবে আযাদী পাইল, আযাদীর পরে কতদূর অগ্রসর হইল উন্নতির পথে—সে সম্পর্কে কতখানি ওয়াকিব্হাল এই অশিক্ষিতা বৃদ্ধা নারী? তা সত্ত্বেও সে আমার মত অপরিচিত বিদেশী মেয়েটির কাছে তাহার দরদ-ভরা মনটির পরিচয় সহজে উদ্ঘাটিত করিয়া দেয়; ভাষার দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর সত্ত্বেও তাহার স্নেহের উত্তপ্ত স্পর্শটুকু অনুভব করিতে আমার এতটুকু অসুবিধা হয় না।
আমাদের পার্টির মেয়েরা থাকেন ওপরে চার তলার ঘরে। চা’র তলার সিঁড়ি ওঠা-নামার ভয়ে আমি দোতলার নির্জনপুরীই বাছিয়া নিয়াছি। গভীর রাত্রে ভয়ে যে এক একবার গা ছমছম করিয়া ওঠে নাই, একথা বলিয়া সত্যের অপলাপ করিব না।
ইলেকট্রিক হিটারের (Electric Heater) দৌলতে আমার কামরার ভেতরটা বেশ গরম। কিন্তু বারান্দায় বাহির হইলেই শীতে জমিয়া যাইবার উপক্রম হইতেছে। আঙ্কারার আশে পাশে নাকি বরফ পড়িয়াছে দিন কয়েক আগে।
গোছগাছ সারিয়া আমি যখন শুইতে গেলাম তখনো পর্যন্ত চা’র তলার ঘরে আমাদের মেয়েদের কাপড় ইস্ত্রী ও বাঁধাছাঁদার সঙ্গে সঙ্গে গল্প-গুজব শেষ হয় নাই। হোস্টেলের সম্মুখে আমার জানালার ধারে প্রশস্ত রাজপথ তখন কিছুটা ঝিমাইয়া পড়িয়াছে।
ছাত্রী-মহলে
২০শে নভেম্বর। ভোর রাতে উঠিয়া আমরা যাত্রার জন্য তৈরি হইয়া নিলাম। যে যত পারি হাত-পা ও দেহ গরম কাপড়ে মুড়িয়া নিতেছি। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে সারা হোস্টেল আজ ভোর রাতেই সজাগ হইয়া উঠিয়াছে। টিচাররা ও ছাত্রীরা আজ যেন অন্যদিনের চেয়েও বেশী যত্নের সঙ্গে আমাদের চা খাওয়াইতে বসিয়াছেন। আগের দিনই পাকিস্তানী ও তুর্কী ছাত্রীদের মধ্যে হইয়া গিয়াছে রুমাল, ব্রোচ, বই, ছবি, ফটোগ্রাফ, অটোগ্রাফ ইত্যাদি ছোটখাট স্মৃতি-চিহ্ন বিনিময়। শুধুই কি তাই! দু’দলের মধ্যে যে এ’কয়দিনে একটা হৃদয়ের যোগাযোগও স্থাপিত হইয়াছে তাহা স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছি। আমি নিজে যেন ওখানকার টিচারদের চেয়েও ছাত্রীদেরই হৃদয়ের স্পর্শ অনুভব করিতেছি বেশী। কাল নূর্তন, আয়হান এবং আরো কয়েকটি মেয়ে আসিয়া আমাকে স্কুলের তরফ হইতে একটা সুন্দর উপহার দিয়া গিয়াছেন। নীল রংয়ের সাটিনের উপর তুলিতে আঁকা একটি বিচিত্র রংয়ের চমৎকার ছবি, যেন ঐ সরল, সুন্দর কিশোরী মেয়েগুলির স্নেহপ্রীতির রংয়ে রাঙানো।
এই ক’টা দিন এই মেয়েগুলি আমাদের কতইনা যত্নে রাখিতে। চেষ্টা করিয়াছে। সকালবেলা খবরের কাগজখানি আগাইয়া দিবার জন্য অথবা টেলিফোন করিবার সময় নম্বরটা খুঁজিয়া দিবার জন্য কখনো ডাকিয়া বলিতে হয় নাই। এতগুলি মেয়ের মধ্যে যে দিকেই তাকাই সকলেরই মুখ হাসিতে ঝলমল। আমি বাহির হইতে আসিলে কয়েকটি মেয়ে দাঁড়াইয়া থাকে, আমার কাছে একটুখানি ইংরেজী শিখিবে। বলে, ‘বিনিময়ে তোমাকে তুর্কী ভাষা শিখাইব।’ বিদেশী ভাষার মধ্যে তুর্কীরা আগে শিখিত জার্মান, তাহার পর ফ্রেঞ্চ ভাষারও বেশ কদর ছিল কিছুদিন আগে পর্যন্ত। তুর্কী ভাষার মধ্যে মিশিয়া গিয়াছে প্রচুর ফরাসী শব্দ। সম্প্রতি আমেরিকার প্রভাবে ইংরেজীর আকর্ষণ বাড়িয়াছে। আমি দু’চার শব্দ ইংরেজী শিখাইয়া দিই, বিনিময়ে শিখিয়া নিই কয়েকটা তুর্কী শব্দ, যেমন—অ্যাবেত্ (হাঁ), ইয়োক্ (না), লুৎফেন্ (please), অথবা ‘গাজিতে’ (খবরের কাগজ)।
আঙ্কারা হইতে প্রকাশিত বিখ্যাত দৈনিক সংবাদ-পত্র ‘জাফের’। আয়হান একদিন একখানা ‘জাফের’ হাতে আমার কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। রোজই খবরের কাগজ নাড়াচাড়া করি। বুঝিবার মধ্যে শুধু বুঝি ‘পাকিস্তান কুল্তুর্ হেইয়েতি’ (Pakistan Cultural Mission) কথাটা, আর দেখি আমাদের মিশনের নানা রকমের ছবি। বাকি আমাদের গতিবিধি সম্পর্কে আলোচনা তুর্কী মেয়েরা কিছু কিছু বুঝাইয়া দেয়। আজ কিন্তু আয়হান পাড়িল অন্য কথা। একটা খবরের শিরোনামায় লেখা রহিয়াছে দেখিলাম, ‘জয়নাল আবেদিন।’ আয়হান বলিল, ‘তোমাদের আর্টিস্ট জয়নাল আবেদিন সম্বন্ধে একটা খবর বাহির হইয়াছে। আমি তোমাকে বুঝাইয়া দিতেছি, আর তুমি আমাকে তাঁর চিত্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ইংরেজীতে কিছু বল, আমি লিখিয়া নিব।’ জয়নাল আবেদিন সম্প্রতি তাঁহার ইউরোপ সফরের সময় তুরষ্কে আসিয়াছিলেন। ঐ সময় তাঁহার আঁকা ছবি এখানে কিছু রাখিয়া গিয়াছেন। শীঘ্রই আঙ্কারায় তাঁহার ছবির একটা প্রদর্শনী হইবে—খবর কাগজে তাহাই লেখা আছে। আমার এদিকে বাহিরে যাইবার তাড়া। অনভ্যাসের দরুণ মোজা, দস্তানা ও কয়েক পরত গরম জামাকাপড় পরিয়া নিতে বেশ কিছুটা সময় লাগিয়া যায়; বেদিয়া এই মাত্র তাগিদ দিয়া গেছে—‘চাবুক্, চাবুক, চোক্ চাবুক।’ জয়নাল আবেদিন সম্পর্কে আয়হানকে মোটামুটি কিছু বলিতেছি। সে যত্নের সঙ্গে লিথিয়া নিতেছে। আবার মাঝে মাঝে থামিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া নিতেছে ইংরেজী শব্দের বানান। লেখা শেষ হইলে আমি তাড়াতাড়ি চলিলাম। দেখা গেল মেয়েটির তৃপ্তি হয় নাই, হতাশার সুরে বলিল, ‘মাত্র এইটুকু।’
জয়নাল আবেদিন তুরষ্কে আসিয়াছিলেন মাত্র ক’দিনের জন্য। ছাত্রীরা তাঁকে দেখিবার সুযোগ পায় নাই। আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে—চিত্র-প্রদর্শনীর সময় তিনি কি একবার আসিবেন না? তখন তাঁকে দেখিবার সুযোগ হইবে না কি? হোস্টেলে থাকাতে খবর-বার্তা পাওয়ার অসুবিধা তাদের, আমি কি অন্ততঃ তাঁর খোঁজ খবরটা তাদের যোগাড় করিয়া দিতে পারি না?
আমরা যে-ক’দিন আঙ্কারায় আছি, সকালে আটটার আগে গোসল সারিয়া নিবার চেষ্টা করি। গোসলের জন্য সবাইকে যাইতে হয় নীচের তলায়। মেয়েরা হামাম পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিয়া সরিয়া দাড়ায়। আমরা ওদের য়্যাব্বড়া খড়ম পায়ে দিয়া হামামের মধ্যে ঢুকিয়া পড়ি। হামামে পানির ব্যবস্থা বড় মজার। পাশাপাশি তিনটা কল; দু’পাশে একটার পানি কনকনে ঠাণ্ডা ও অন্যটির ফুটন্ত গরম। দু’টা কল এক সঙ্গে খুলিয়া দিলে মাঝখানের কলটিতে ব্যবহারের উপযোগী মৃদু গরম পানি বাহির হইয়া আসে। মাথার উপরকার ঝাঁঝ্রাতে গোসল করিতে চাহিলেও পানির উত্তাপ ঐভাবে নিয়ন্ত্রণ করিয়া নিতে হয়। আমরা কিন্তু কল ঘুরাইয়া ঠাণ্ডা-গরমের পরিমাণ আন্দাজ করিতে শিখি নাই। গোসল করিতে করিতে পাশের হামাম হইতে কোন মেয়ে ভিজা কাপড়ে ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিতেছে ‘হায়, হায়, ফুটন্ত পানিতে পুড়িয়া মরিলাম।’ অন্য হামামের ভিতর কেহ চেঁচাইতেছে— ‘জমিয়া গেলাম শীতে।’ তুর্কী মেয়েরা হাসিতে হাসিতে দৌড়াইয়া আসিয়া উত্তাপের পরিমাণ ঠিক করিয়া দিতেছে; তারা সবাই মিলিয়া হাসিয়া গড়াইয়া পড়িতেছে এ’ এর গায়ে। রগড় হইতেছে বেশ।
বুর্সা রওয়ানা হওয়ার আগের দিন গরম পানির ব্যবস্থা ছিল না। বিশেষ করিয়া আমরা বাঙালী মেয়েরা বলিতে লাগিলাম, ‘বিনা গোসলে এতখানি পথ কি করিয়া যাইব, তাহাতে যে আরো বেশী কষ্ট হইবে।’ তুর্কী-মেয়েরা অগত্যা কয়েকজনকে হোস্টেলের ভিতরেই একটা নতুন জায়গায় নিয়া গেল। বিরাট কামরা জুড়িয়া গ্যাসের সাহায্যে মস্ত বড় বড় ভাণ্ডের মধ্যে কাপড় সিদ্ধ হইতেছে। ছুটির দিন, তাই ছাত্রীরা নিজেদের কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করিতেছে। আয়ারা সাহায্য করিতেছে সঙ্গে সঙ্গে। স্নানার্থিনীরা এক কোণে দাঁড়াইয়া অতগুলি বিদেশী মেয়ের সামনে সসঙ্কোচে স্নান সারিয়া নিল। তাহারা একটু বিব্রত বোধ করিলেও তুর্কী মেয়েরা কিন্তু সঙ্কোচ করিতেছে না একটুও। বরং ছুটিয়া আসিয়া সাবানটা, তোয়ালেটা আগাইয়া দিতেছে, তা’ছাড়া গভীর কৌতূহলের সঙ্গে পাকিস্তানী মেয়েদের চা’রদিকে উঁকিঝুকি মারিতেছে তাহাদের শাড়ী পরিবার কৌশলটি আয়ত্ব করিয়া নিবার চেষ্টায়।
আজ আসন্ন বিদায়ের ক্ষণে ইহাদের দিকে চাহিয়া আমার চিত্ত কেবলি ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিতেছে। বিদায়ের সময় এরা বারে বারে বলিয়া দিল ইস্তাম্বুল হইতে আমরা যেন এ’পথেই দেশে ফিরিয়া যাই। তাহারা আমাদের সঙ্গে আবার সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিবে।