আমার বাল্যকথা/রামচন্দ্র মিত্র

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

রামচন্দ্র মিত্র

 কলেজ আমাদের যে সব শিক্ষক ছিলেন তাঁদের মধ্যে রামচন্দ্র মিত্র উল্লেখযোগ্য। তাঁর কাছে আমরা শ্যামাচরণ সরকারের বাঙ্গলা ব্যাকরণ ও অন্যান্য বাঙ্গলা বই পড়তুম। তাঁর সম্বন্ধে অনেকগুলি প্রবাদ আছে; অনেকগুলি অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনাও আমাদের স্বচক্ষে দেখা;—তাঁর চেহারা ধরণ ধারণ সকলি কৌতুকাবহ। কোন বড় লোকের সঙ্গে আলাপ করতে হলে পায়ে পা ঠেকিয়ে ‘I beg your pardon’ বলে ক্ষমা প্রার্থনা করা হত; সেই আলাপের সূত্রপাত। ক্লাসের ছেলেরা দুষ্টুমি করে অনেক সময় তাঁকে জ্বালাতন করত কিন্তু কোন্ ছেলের প্রতি কিরূপ ব্যবহার করতে হবে—কোথায় নরম কোথায় বা গরম—তা তাঁর পাকা জানা ছিল। পাড়াগেঁয়ে ছেলেদের উপর তাঁর ভারি আক্রোশ, কেননা তিনি বেশ জানতেন তারা মুখের উপর কোন জবাব করতে সাহসী হবে না। অথচ অন্য অবাধ্য দুষ্টু ছেলে যাদের এক কথা বললে মুখের উপর দুকথা শুনিয়ে দেবে তাদের প্রতি অতি নম্র ব্যবহার। ‘শক্তের ভক্ত নরমের গরম’ তাঁর সম্বন্ধে অবিকল খাটত।

 একদিন আমাদের ক্লাসের একজন পাড়াগেঁয়ে ছেলে পাঠ্য বই আনেনি এই নিয়ে তিনি তার প্রতি মহা খাপ্পা হয়ে কটুবাক্য বর্ষণ করেছেন দেখে তারক বল্লেন, “ওকে ও রকম গালাগালি দিচ্ছেন কেন? ও কি করেছে? জানেন আমরা ফাস্ট ইয়ার ক্লাসে পড়ি।”

 তখনই তিনি নরম হয়ে অতি মৃদুস্বরে বল্লেন—“ও বই আনেনি তাই শাসন করলুম।” তারক উত্তরে বল্লেন “আমিও তো বই আনিনি আমাকেও কি ঐ রকম করে শাসন করবেন।” রাম মিত্র বল্লেন (মৃদুমন্দভাবে) “ওঃ তুমি বই আননি—তা পাশের ছোকরার বই দেখে পড়।”

 ছেলেরা যখন ভারি গোল করছে কিছুতেই বাগ মানে না তখন তিনি তাদের থামাবার একটি বিচিত্র উপায় অবলম্বন করতেন। নানা রকম মুখভঙ্গী করে কেদারা থেকে উঠে বোর্ডে খড়িতে বড় বড় অক্ষরে লিখতেন Silence! Silence! Silence! চুপ চুপ চুপ! তার পর চৌকিতে বসে বলতেন, “এখন কে গোল করবে করুক দেখি!”

 আমরা বিদ্যাশিক্ষার প্রণালী অনেক রকম শুনতে পাই, ওবিষয়ে নানা মুনির নানা মত— কিন্তু রামমিত্রের শিক্ষাপ্রণালী সম্পূর্ণ নূতন, আর কারো সঙ্গে তার তুলনা হয় না। দু-একটি নমুন৷ দিচ্ছি:—

 পৃথিবী গোল কি করে মনে রাখতে হয়? রসগোল্লা খেতে খেতে তার গোলাকার ধ্যান করা।

 ভুগোল শেখার সহজ উপায় কি? স্টুয়ার্টের জিওগ্রাফিখানি ২০ আনা মুখস্থ করা— লেখার সময় চার আনা ভুলে গেলেও—১৬ আনা মনে থাকবে।

 Composition ভাল লিখতে হয় কি করে? ভাল ভাষায় প্রকৃতি বর্ণনা করিতে গেলে সুশীতল সমীরণ এই দুটি কথা লিখতে হবে। তবে যেখানে সাধুভাষা মনে না আসে সেখানে ‘ঠাণ্ডা বাতাস' বসিয়ে দেবে। কলসের স-টা কোন্ স যদি মনে না থাকে তাহলে সেখানে ‘ঘট’ শব্দটা ব্যবহার করলেই ল্যাটা চুকে যাবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

 একবার পরীক্ষা দেবার সময় কোন ছাত্র তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল—মশায় এই বইটার কোন্ কোন্ অংশ ভাল করে দেখে রাখা চাই, আমাকে বলে দিন!

 উত্তর—(খানিকক্ষণ চিন্তা করিয়া)

 Mark the first page! Mark the second page!!

 বলতে বলতে বইটার কোন ভাগই বাদ গেল না, সে বেচারা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে প্রস্থান করলে।

 রামমিত্রের নামে অনেক গল্প আছে, আর কত বলব। কেশবচন্দ্র তাঁর নকল করতে বিলক্ষণ পটু ছিলেন। কেশরবাবু রামমিত্রের সম্বন্ধে একটি গল্প বলতেন, সেটি হচ্ছে এই:—

 একদিন রামমিত্র ছেলেদের বটানিকাল গার্ডেনে বেড়াতে নিয়ে গেছেন। বাগানের মধ্যে যে একটা গাছের ঘর আছে সেইখানে তাঁর দলবল নিয়ে তিনি যেমন প্রবেশ করেছেন— অমনি সেখানে উপস্থিত একটা রুক্ষ্ম মেজাজের ইংরাজ রেগে তাঁকে সম্ভাষণ করলে—

“Who the devil are you?”

তিনি ভীত হয়ে বল্লেন—

 “Professor Ramchandra Mitra, Professor Presidency College.”

 উত্তর হল—D—your Professor’ তখন তিনি ছেলেদের নিয়ে বাইরে এসে হাঁপ ছেড়ে বল্লেন—

 Let us forget and forgive, let us exercise the Christian virtue of forgiveness.

 আমরা সকলে একবার সিংহলে ব্যাড়াতে গিয়েছিলুম। স্টীমারে আমাদের সঙ্গে ছিলেন কেশববাবু আর কালিকলম গাঙ্গুলী বলে একটি আমুদে মজলিসী লোক,—‘কোলাই কোমল গাম্বলাই’ বলে আপনার পরিচয় দিতেন। সমুদ্রের উপরে রামমিত্রের গল্প আমাদের এক প্রধান খোরাক ছিল। সে সব কথা শুনে হাসতে হাসতে আমাদের নাড়ী ছিঁড়ে যেত।

 ‘কোলাই কোমল’ শেষে আমাদের ভারি মুস্কিলে ফেলেছিলেন। দেশে ফেরবার সময় তিনি কি একটা কাজের ছুতো করে বোটে উঠে ডাঙ্গায় নেমে গেলেন। এই আসছি বলে কোথায় যে অন্তর্ধান হলেন তার আর কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। তাঁকে ছেড়ে স্টীমার চলে গেল। তার দু-এক সপ্তাহ পরে তবে কলকাতায় আবার তাঁর দেখা পাই।