আর্য্যজাতির আদি নিবাস
আর্য্যজাতির আদি নিবাস
তথা হইতে নানাদেশে গমন
ও ভারতে প্রবেশ।
শ্রীশিবচন্দ্র শীল
প্রণীত
আর্য্যজাতির আদি নিবাস
তথা হইতে নানাদেশে গমন
ও ভারতে প্রবেশ।
শ্রীশিবচন্দ্র শীল প্রণীত
চুঁচুড়া নগরীতে একটি সাহিত্য-পরিষৎ
স্থাপনকল্পে তত্রস্থ শীলবাটীতে
আহূত সভায় পঠিত।
চুঁচুড়ার শীলবাটী হইতে
শ্রীনিতাইচাঁদ শীল কর্ত্তৃক
প্রকাশিত।
সন ১৩২৮, জ্যৈষ্ঠ।
কলিকাতা
১৯৩.১এ বহুবাজার ষ্ট্রীট, চেরি প্রেস লিমিটেড হইতে
শ্রীতুলসীচরণ দাস দ্বারা মুদ্রিত।
শ্রীশ্রীশ্রীধরো বিজয়তে।
পদ্মাদেব্যাঃ সহ সুকৃতিনং শীল নীলাম্বরং প্রাগ্
বন্দে রাধা সহিত মদনং মোহনান্তং ক্রমেণ।
বন্দেমাতুশ্চরণ যুগলং রেবতী নাম যস্যা
বাবস্যাঙ্ঘ্রিং ত্রিদিববসতের্বীরনারায়ণস্য॥
আলোচ্য নানাশাস্ত্রাণি বেদ দীনি প্রযত্নতঃ।
অত্রাবিষ্ক্রিয়তে কিঞ্চিদৈতিহ্যং সুপুরাতনম্॥
আর্য্যাদিবাসে কেষাঞ্চিৎহ্রদাণাং সরিতাং তথা।
পুরাণাঞ্চাত্র সংস্থানং নগানাং নির্ণীতং ময়া॥
অনাবিষ্কৃতপূর্ব্বং তদিতি মত্বা কুতূহলাৎ।
বিলোক্যঃ শিষ্টৈর্গ্রন্থোঽয়ং ধীমদ্ভিশ্চ বিচক্ষণৈঃ॥
ভূমিকা
শ্রীযুক্ত রায় নগেন্দ্র নাথ ধর বাহাদুর, এম, এ, বি এল; শ্রীযুক্ত দীননাথ ধর, বি-এ, বি-এল; শ্রীযুক্ত দাশরথি ঘোষ, এম, এ, বি, এল,; শ্রীযুক্ত রমেশ চন্দ্র মণ্ডল; শ্রীযুক্ত দীননাথ সেন বি-এ, বি-এল; শ্রীযুক্ত রাজেন্দ্র লাল ঘোষাল, এল, এম, এস; শ্রীযুক্ত প্রসন্নকুমার শীল মহাশয়দের আহ্বানে গত ২২শে ফাল্গুন রবিবার অপরাহ্ন ৪ ঘটিকার সময়ে চুঁচুড়ার শীলবাটীতে একটি সভা হয়। এই সভায় মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এম-এ, সি, আই, ই; রায় মহেন্দ্রচন্দ্র মিত্র বাহাদুর, এম, এ, বি এল; শ্রীযুক্ত আশুতোষ বন্দ্যোপাধ্যায় এম এ, বি-এল (অবসর প্রাপ্ত সবজজ); মৌলবী এজাদ বক্স, এম-এ, বি-এল; শ্রীযুক্ত নৃত্যলাল রায়; শ্রীযুক্ত লালবিহারী বড়াল; শ্রীযুক্ত গোবর্দ্ধন শীল; শ্রীযুক্ত আশুতোষ হালদার; শ্রীযুক্ত রাখালরাজ রায়, এম-এ; শ্রীযুক্ত বলাইচাদ শীল, বি-এ; শ্রীযুক্ত বলাইচাঁদ দত্ত, বি-এ প্রভৃতি হুগলী-চুঁচুড়ার গণ্যমান্য মহাশয়গণ উপস্থিত হইয়া সভার পার্শ্বস্থিত প্রদর্শনী দর্শন করেন। প্রদর্শনীতে শীলবাটীর প্রাচীন পুঁথিসমূহ, প্রাচীন চিত্র সকল, স্বর্গীয় নীলাম্বর শীল, তৎপুত্র স্বর্গীয় জগমোহন শীল ও স্বর্গীয় মদনমোহন শীলের স্বহস্ত লিখিত ৩খানি পত্র, প্রাচীন দলিল প্রভৃতি প্রদর্শিত হইয়াছিল। অনন্তর সকলে সভায় উপবেশন করিলে শ্রীযুক্ত সাতকড়ি পাঠক শ্রীযুক্ত নিতাইচাঁদ শীল রচিত এই আবাহন সঙ্গীতটি গান করেন,—
স্বাগত হে সুধীগণ!
এ শীল ভবনে আজি দিলে দরশন!
পুণ্যশ্লোক নীলাম্বর
ছিল সর্ব্ব গুণাকর,
আজি তাঁর গৃহমাঝে করি আবাহন।
মোহন জলদ বেশে
এস হে শীতের শেষে
জ্ঞানের বিমল ধারা কর বরষণ!
বসন্তের রূপ ধরি
হৃদয় পুষ্পিত করি
এস, হে মনীষি! এস, বাণীপুত্রগণ!
এই অভ্যর্থনাসঙ্গীতের পর অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি শ্রীযুক্ত রায় নগেন্দ্রনাথ ধর বাহাদুর, সভ্যগণকে অভিনন্দন করিয়া ও প্রত্নতত্ত্ববিৎ শ্রীযুক্ত শিবচন্দ্র শীল মহাশয়ের পঠিতব্য প্রবন্ধের উল্লেখ অবসরে হর্ষ প্রকাশ করিয়া প্রস্তাব করিলেন যে, মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এম-এ; সি, আই, ই মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করুন। অনন্তর শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র মণ্ডল মহাশয় উহার অনুমোদন করিলে শাস্ত্রী মহাশয় পুষ্পস্তবকাদি শোভিত সভাপতির বেদিকায় আসন গ্রহণ করিলেন। অনন্তর তাঁহার গলে শোভন পুষ্পমালা দিয়া সভাপতিত্বে বরণ করা হইলে, সভাপতি মহাশয় প্রথমে বলেন যে, এই হুগলী ও চুঁচুড়ায় অনেক যোগ্য লোক থাকিতে তাঁহাকে গঙ্গার ওপার হইতে আনয়ন করিয়া সভাপতি করায় তিনি আপনাকে বিশেষ সম্মানিত জ্ঞান করিলেন এবং এই সম্মান তাঁহার মনে চিরদিন জাগরূক থাকিবে। অনন্তর তিনি বাঙ্গালী জাতিকে একটি আত্মবিস্মৃত জাতি বলিয়া বাঙ্গালার বাহিরে তিব্বত প্রভৃতি দেশে তাঁহাদের পূর্ব্বগত নানাকীর্ত্তির উল্লেখান্তর সুবর্ণবণিক্দিগকে বিশেষভাবে আত্মবিস্মৃত বলেন। সর্ব্বশেষে তিনি শ্রীযুক্ত শিবচন্দ্র শীল মহাশয়কে “আর্য্যদিগের আদি নিবাস, তথা হইতে নানাদেশে গমন ও ভারতে প্রবেশ” এই প্রবন্ধ পাঠের অনুমতি দিলে, শীল মহাশয় দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন;—
“সভাপতি মহাশয় ও সভ্যমহাশয়গণ! সভাপতি মহাশয়ের অনুমতিক্রমে আমার প্রবন্ধ পাঠের পূর্ব্বে আমার যে কিঞ্চিৎ বক্তব্য আছে, তাহা নিবেদন করিতেছি। আর্য্যদিগের আদি বাসস্থান সম্বন্ধে মতভেদ আছে। ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা বলিয়া গিয়াছেন যে আর্য্যজাতির আদিবাস মধ্য এসিয়া এবং তথা হইতে তাঁহারা নানাদেশে গিয়াছেন। আমি ইউরোপীয় পণ্ডিতদিগের কোনও গ্রন্থ বা প্রবন্ধ দেখি নাই, সংবাদপত্রে যাহা দেখিয়াছি তাহাই বলিলাম। বাঙ্গালার অদ্বিতীয় বেদজ্ঞ পণ্ডিত স্বর্গীয় সত্যব্রত সামশ্রমী, তাঁহার প্রকাশিত সামবেদের শেষে “আর্যজাতির আদি নিবাস” প্রবন্ধে ঐ সকল ইউরোপীয় পণ্ডিতদিগের এবং তাঁহাদের মতানুযায়ী ভারতীয় লেখকদের উক্তির ঘোরতর প্রতিবাদ করিয়াছেন। তাঁহার মতে আর্য্যগণ চিরকালই ভারতে আছেন। আর্য্যাবর্ত্ত তাঁহাদের স্থান। তাঁহারা ভারতের বহির্ভূত দেশ হইতে তাইিসেন নাই। তাঁহার এই প্রতিবাদের পর সংবাদপত্রে দেখিতে পাইলাম যে, কোন কোন ইউরোপীয় পণ্ডিত বলিতেছেন—আর্য্যজাতির আদিবাস ইউরোপ এবং তাঁহাদের যুক্তি এই— আর্য্যজাতি শুভ্রবর্ণ ছিল, ইউরোপে এখনো শুভ্রজাতি বাস করিতেছে, ইউরোপ হইতেই কোন কোন আর্য্যদল এসিয়ায় গিয়াছে। তার পর স্বর্গীয় লোক মান্য বালগঙ্গাধর তিলক বলিয়া গিয়াছেন, যে আর্য্যজাতির উৎপত্তি স্থান North Pole তাঁহার প্রবন্ধ দেখিবার সৌভাগ্যও আমার ঘটে নাই। সংবাদপত্রে তাঁহার মত যেরূপ উদ্ধৃত হইয়াছিল তাহাই বলিলাম। তার পর কশ্মীরের শ্রীযুক্ত জগদীশ চট্টোপাধ্যায়ের মত, যাহা Bengalee কাগজে প্রকাশিত হইয়াছিল তাহার কথা বলিতেছি। তিনি Asiatic Turkeyর Pontus নামক স্থানকে বেদোক্ত প্রত্নৌকস্ মনে করিয়া ঐ দেশ হইতে আর্য্যগণ দলে দলে অন্যান্য দেশে গিয়াছেন তাহা প্রমাণ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। অবশেষে অধ্যাপক শ্রীযুক্ত বৈকুণ্ঠ নাথ রায় এম, এ, মহাশয়ের মত, যাহা সন ১৩২৩ সালের ভারতবর্ষে “অয়ন বিচার” প্রবন্ধে প্রকাশিত হইয়াছিল তাহার কথা বলিতেছি। ইনি লিখিয়াছেন—“এই সমস্ত উদ্ধৃত বচন হইতে সহজেই প্রতীয়মান হয় আমরা যাহাকে ইংরাজীতে North Pole বলি, তাহাই সুমেরু এবং দেবতাদের বাসস্থান।” ঐ সকল মতের সহিত আমার মতের ঐক্য হয় না।” এই সকল কথা বলিয়া শীল মহাশয় তাঁহার প্রবন্ধ পাঠ আরম্ভ করিলেন।
শীলবাটী, চুঁচুড়া, |
শ্রীনিতাইচাঁদ শীল। |
শুদ্ধিপত্র।
| পৃষ্ঠা | পংক্তি | অশুদ্ধ | শোধন |
| ৬ | ১৭ | অর্য্য | অর্য |
| ১০ | ২৬ | গৃহ | গৃহ্য |
| ১১ | ৩১ | বৈদাুতাগ্নিনা | বৈদ্যুতাগ্নিনা |
| ১২ | ৪ | অনুবদ্ধ | অনুবন্ধ |
| ১২” | ২২ | সমার্যেহণে | সমারোহণে |
| ১৫ | ২৪ | সারণের | সায়ণের |
| ১৬ | ৩০ | ভারতের | ভরতের |
| ১৭ | ১৪ | নিষ্পদকাগ্নি | নিষ্পাদকাগ্নি |
| ১৯ | ২০ | সুক্তের | সূক্তের |
| ২৬ | ৩০ | বিবস্বন্ | বিবস্বান্ |
আর্য্যজাতির আদিনিবাস; তথা হইতে নানা দেশে গমন ও ভারতে প্রবেশ।
উত্তর কুরুদেশে আর্য্যদের আদি বাস ছিল। উত্তর কুরু কোথায়? ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (৮।৩।৩)—
তস্মাদেতস্যামুদিচ্যাংদিশি যে কেচ পরেণ।
হিমবন্তং জনপদা উত্তর কুরব উত্তর মদ্রা ইতি॥
অর্থ —উত্তর দিকে হিমবতের (তিব্বতদেশের) পরে উত্তর কুরু দেশ সমুহ ও উত্তর মদ্র (Media) দেশ সকল। উত্তর কুরু ও সুমেরু প্রবন্ধে[১] শান্তিপর্ব্বের প্রমাণে দেখাইয়াছি, ভারতবর্ষের উত্তরে হৈমবতবর্ষ তদুত্তরে মেরুবর্ষ। মেরুবর্ষ ইলাবৃতবর্ষের অন্তর্গত। মেরুর নামান্তর—সুমেরু ও মহামেরু। মেরু হইতে মূর ও মূর হইতে মূজ হইয়াছে। মানচিত্রে মূজতাগ ও বেলুতার্গ পর্ব্বতদ্বয় দৃষ্ট হয়। তাগ, পর্ব্বতবাচক তুরুষ্ক ভাষা শব্দ। সুমেরু যে নর্থপোল নয়, বরাহপূরাণে (১৭০ অ) তাহার প্রমাণ পাইয়াছি, যথা—
সুমেরোরুত্তরে পার্শ্বে মহর্ষিগণসেবিতে।
তপশ্চচার বিপুলং শুকো ব্যাসসুতো মহান্॥
অর্থ—মহর্ষিগণ সেবিত সুমেরুর উত্তর পার্শ্বে ব্যাসের পুত্র শুক বিপুল তপস্যা করিয়াছিলেন।
বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে জম্বুদ্বীপের মধ্যস্থলে ইলাবৃতবর্ষে কনকপর্ব্বত সুমেরু। সুমেরুর দক্ষিণে হরিবর্ষ, তাহার দক্ষিণে কিম্পুরুষবর্ষ, তাহার দক্ষিণে ভারতবর্ষ। সুমেরুর উত্তরে রম্যকবর্ষ, তাহার উত্তরে হিরণ্ময়বর্ষ, তাহার উত্তরে উত্তরকুরু। বিষ্ণুপুরাণে,—
ভদ্রা তথোত্তরগিরীন্ উত্তরাংশ্চ তথা কুরূন।
অতীত্যোত্তরমন্তোধিং সমভ্যেতি মহামুনে॥
ভদ্রানদী, উত্তরগিরি সমুদয় ও উত্তর কুরু দেশ সকল অতিক্রম করিয়া উত্তর সমুদ্রে মিলিত হইতেছে। অতএব বিবেচনা হয় পশ্চিম সাইবিরিয়াও উত্তর কুরু দেশ সমূহের অন্তর্গত এবং ভদ্রা সম্ভবত. ওবি বা ইর্টিস। ভীষ্মপর্ব্ব (৭ম অ) অনুসারে নীলপর্ব্বতের দক্ষিণে ও মেরুর পার্শ্বে ও উত্তরে সমুদ্র প্রান্তে ঐরাবতবর্ষ (Siberia)। ৮ম অধ্যায়ে লেখা আছে,—
ন তত্র সূর্য্যাস্থপতি ন জীর্য্যন্তেচ মানবাঃ॥
সেখানে সূর্য্য তাপ দেন না ও মানবেরা শীঘ্র জরাগ্রস্থ হয় না।
ঐ দেশের উরল (Ural) পর্ব্বতে ঐরাবত সদৃশ অতিকায় হস্তীর (Mammoth) পঞ্জর, বরফ গলিয়া যাওয়ার পর আবিষ্কৃত হইয়াছিল। বিবিধার্থ সংগ্রহ ৪র্থ পর্ব্বে উহার একটি চিত্র প্রকাশিত আছে।
সমুদ্র মন্থনের নিমিত্ত দেবাসুরের মন্ত্রণা হইয়া যে সমুদ্রের মন্থন হয়, তাহার নাম ‘কলশোদধি’। মানচিত্রে মুজতাগের ২০০ মাইল উত্তরে যে বলকস হ্রদ রহিয়াছে, তাহাই মহাভারতোক্ত কলশোদধি। দেবী পদ্মগৃহা লক্ষ্মী ঐ স্থানেই জন্মিয়াছিলেন। আদিপর্ব্ব (৬৬ অ) অনুসারে ব্রহ্মার দুই পুত্র— ধাতা ও বিধাতা, ইঁহাদের স্বসা দেবী পদ্মগৃহা লক্ষ্মী। ভীষ্মপর্ব্ব প্রমাণে অন্যত্র বলিয়াছি, মাল্যবান্ পর্ব্বতশৃঙ্গে পূর্ব্বপূর্ব্বানুগণ্ডিকা নদী আছে। উহার অনুগণ্ডিকা হইতে একালে ঐ নদীর নাম হইয়াছে ইংগোডা (Ingoda)। মহাভারতে উক্ত হইয়াছে, এখানকার মানবগণ ‘মহারজতসঙ্কাশ’ অর্থাৎ কাঞ্চনবর্ণ।
এই স্থানে আমার উক্ত প্রবন্ধ হইতে কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করা আবশ্যক মনে করিতেছি। শান্তিপর্ব্বে (৩৩৫-৩৪৩ অ) শ্বেতদ্বীপে নারদের গমনাগমন প্রসঙ্গে কথিত আছে, সেখানকার মানবগণ—“চন্দ্রবর্চ্চসঃ” চন্দ্রের মত রূপবান্ ও “শ্বেতাঃ” শ্বেতবর্ণ। ঐ দ্বীপ ক্ষীরোদধির উত্তরে সংস্থিত। ক্ষীরের সমুদ্র থাকাটা সম্ভব নহে, অতএব ক্ষীর সমুদ্র বলিতে ক্ষার সমুদ্র বুঝিতেছি, অর্থাৎ ঐ সমুদ্রের জল লোণা ছিল। ক্ষীরের অর্থান্তর জল, কবিকল্পনা বলে ক্ষার সমুদ্র ক্ষীর সমুদ্র হইয়াছে। ঐ সমুদ্র বর্ত্তমানকালে সম্ভবতঃ লুপ্ত হইয়া (Kirzit Kum Desert) মরুভূমি হইয়াছে। আর অরাল (Aral) সমুদ্রকে ক্ষারোদের ধ্বংসাবশেষ মনে হয়। খিল হরিবংশ পর্ব্বে (২ অ) লিখিত আছে—মহান্ প্রজাপতি ভগবান্ প্রাচীনবর্হি ‘মহতস্তমসঃপাবে’ মহান্ধকারের ওপারে সবর্ণানাম্নী সমুদ্র তনয়াকে দারা করিয়াছিলেন। মহৎতমঃ কোথায়? উইলফোর্ড Andemus পর্ব্বতের উল্লেখ করিয়া বলেন, —
Both words implying darkness (in the Turki language Belut Tagh previously referred to) but being joined together they imply it in a superlative degree; and it is the name of one of the divisions of the hill. On the Summit is the Belur or dark country of the maps[২]
যাঁহারা উইলফোর্ডের কথা বিশ্বাস করিতে চাহেন না তাঁহারা দেখিবেন উইলফোর্ড আজগুবি বলেন নাই। হরিবংশের “মহত্তমঃ” ও ঐ অন্ধতমঃ (Andemus) অভিন্ন। উহা বেলুর্তাগের অংশ বিশেষের নাম। বেলুর্তাগের পূর্ব্বোত্তরে সংস্থিত পূর্ব্বোক্ত কলশোদধির অধিপতির কন্যাকে প্রাচীনবহি বিবাহ করিয়াছিলেন।
মানচিত্রে মধ্যএসিয়ায় তিনটি হ্রদ দৃষ্ট হয়, তাহাদের নাম—করকুল, ইসিকুল (ঋষিকুল্য?) ও অলকুল। তদ্দেশ ভাষায় কুল অর্থে—হ্রদ। এগুলি আর্য্য ভাষা মূলক বোধ হয়। আর একটি হ্রদ আছে, তাহার নাম—বৈকাল।
ঋগ্বেদে (৫।১২।৬) অগ্নিকে ‘অঙ্গিরঃ' বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে, যথা— হে অগ্নে! অঙ্গিরাগণ, গুহায় অন্তর্হিত, বনে বনে আশ্রিত তোমাকে লাভ করিয়াছেন। হে অঙ্গিরঃ! তুমি মহৎ—সহসা অর্থাৎ মহৎ বলের দ্বারা মথ্যমান হইয়া জন্মিয়া থাক, তাহাতেই তোমাকে সহস্পুত্র বলে।
সামবেদের (উত্তরার্চিক ৯।১।১৮) ভাষ্যে সায়ণাচার্য্য লিথিয়াছেন—‘অঙ্গিরসাম্’ অঙ্গিরোগোত্রোৎপন্নানাং মধ্যে ‘জ্যেষ্ঠ্যং’ অতিশয়েন প্রশস্যম্ যদ্বা অঙ্গিরসাং অঙ্গারাণাং মধ্যে জ্যেষ্ঠং জ্বালাযুক্তত্বাৎ। অঙ্গিরা অঙ্গারা ইতি যাস্কঃ। ‘যে অঙ্গারা আসংস্তেঽঙ্গিরসোঽভবন্ ইতি শ্রুতম্।
বেদাদিশাস্ত্রে অঙ্গিরা ও তদ্বংশীয় ঋষিগণ প্রসিদ্ধ আছেন। যাহারা অঙ্গার ছিল, তাহারা অঙ্গিরা, কি আশ্চর্য্য কথা!! কয়লা ও মানুষ এক?
ঋগ্বেদে (১।৩১।১)—
ত্বমগ্নে প্রথমো অংগিরা ঋষির্দেবো দেবানা
সভবঃ শিবঃ সখা।
অর্থ—হে অগ্নি! তুমি অঙ্গিরা ঋষিদের প্রথম ঋষি। দেব হইয়া দেবদিগের মঙ্গলময় সখা হইয়াছ।
মহাভারতে (অনুশাসন পর্ব্ব ৮৫ অ) কথিত আছে—পশুপতি-বরুণের একটি যজ্ঞে দেবপত্নীগণ, দেবকন্যাগণ, দেবমাতৃগণ আগমন করেন, তাঁহাদিগকে দেখিয়া স্বয়ম্ভূর রেতস্ ভূমিতে পতিত হয়, উহাই অগ্নিতে হূত হইলে তাহা হইতে ভূতগ্রাম উৎপন্ন হয়। জ্বালা হইতে ভৃগু, অঙ্গার হইতে অঙ্গিরা, অঙ্গার সংশ্রয় হইতে কবি (নামক অঙ্গিরা), মরীচি সকল হইতে মরীচি, কুশোচ্চয় হইতে বালিখিল্যগণ; ভস্মব্যপোহ হইতে বৈখানসগণ, অগ্নির অশ্রু হইতে দুই অশ্বী, স্রোতস্ হইতে প্রজাপতিগণ, রোমকূপ হইতে ঋষিগণ, স্বেদ হইতে ছন্দস্ (বেদ), বল হইতে মনঃ হইলেন।
পণ্ডিতেরা বিবেচনা করেন, অঙ্গিরাবংশীয় ঋষিগণ দ্বারা অগ্নিপূজার প্রবর্ত্তন বা অগ্নিপূজার বিস্তার হইয়াছিল। মানচিত্রে পূর্ব্বোক্ত বৈকাল হ্রদের দুইদিকে দুইটী নদী বাহির হইয়াছে, দেখিতে পাই। দক্ষিণের নদীটির নাম অঙ্গার (Angara) এবং উত্তরের নদীটির নাম—উপর অঙ্গার (Upper Angara). বিবেচনা হয়, অঙ্গিরাগণ অগ্নি রক্ষার্থ সর্বদা তপ্ত ও অতপ্ত অঙ্গার লইয়া নাড়াচাড়া করা হেতু প্রথমে অঙ্গার নামে খ্যাত ছিলেন, পরে ঐ নামটি বিকৃত হইয়া অঙ্গিরা হয়। অনুমান হয়, তাঁহারা যে দুইটি নদীতীরে বাস করিতেন, তাঁহাদের নামানুসারে ও নদীদ্বয়ে প্রক্ষিপ্ত অঙ্গার সমূহ ভাসিয়া যাওয়া হেতু উহাদের নাম হয় অঙ্গার। মহাভারতের প্রমাণে বোধ হয়, ঐ ঐ স্থানেই অন্যান্য আর্য্যদেরও বাস ছিল।
বৈকাল হ্রদ, উত্তরকুরুর অন্তর্গত। অনুশাসন পর্ব্বে (১০২ অ) এখানকার অঙ্গিরা-আদি-আর্য্যগণকে ‘অগ্নিযৌন’ বলা হইয়াছে, যথা—
যত্রোত্তর কুরবো ভান্তি রম্যা
দেবৈঃ সার্দ্ধং সোদমানা নরেন্দ্র।
যত্রাগ্নি যৌনাশ্চ বসন্তি লোকা
অব্ যোনয়ঃ পর্বত যোনয়শ্চ॥
যত্র শক্রো বর্ষতি সর্বকামান্
যত্র স্ত্রিয়ঃ কামচারা ভবন্তি।
অর্থ—হে নরেন্দ্র! যেখানে হর্ষযুক্ত রম্য উত্তর কুরুদেশ সমূহ দেবগণের সহিত শোভা পাইতেছে। যেখানে অগ্নিযোনি, জলযোনি, ও পর্ব্বতযোনি লোকেরা বসতি করিতেছে, যেদেশে ইন্দ্র, সকল প্রকার কাম্যবস্তু প্রদান করেন, এবং স্বেচ্ছাচারিণী স্ত্রীগণ আছেন।
ব্যাখ্যা।—অগ্নিযৌন কি? পুরাকালে আর্য্যগণ, হিংস্রজন্তু হইতে রক্ষা পাইবার নিমিত্ত নানাপ্রকার উপায় অবলম্বন করিতেন! তাঁহারা বাসগৃহের চারিদিকে প্রত্যহ সূর্য্যাস্তের প্রাক্কালে অগ্নি জ্বলিয়া অগ্নির প্রাকার[৩] (পাঁচিল) করিতেন। অগ্নি বেষ্টিত স্থানে যাঁহাদের জন্ম ও বাদ বা অগ্নি বেষ্টিত স্থান যাঁহাদের যোনি অর্থাৎ উৎপত্তিস্থান ও গৃহ, তাঁহারা অঙ্গার বা অগ্নি নামে খ্যাত হইয়াছিলেন। অপ্যোনি কি? যাঁহারা বৈকাল হ্রদে কাষ্ঠাদি দ্বারা ঘর করিয়া বা বৃহৎ বৃহৎ কাষ্ঠ জলে ভাসাইয়া তাহার উপর গৃহ নির্ম্মাণ করিতেন এবং ঐরূপ গৃহে যাঁহাদের জন্ম ও বাস, তাঁহারা অপ্যোনি। জলে যাঁহাদের কাষ্ঠময় ভাসমান গৃহ সরিয়া বেড়ায়, তাঁহারা অপ্সর। পর্ব্বতে যাঁহাদের জন্ম ও বাস, তাঁহারা পর্ব্বতযোনি বা পাহাড়ি। বোধ হয়, ইহাদের নামান্তর গন্ধর্ব্ব। সায়ণাচার্য্য, এক স্থানে গন্ধর্ব্ব শব্দের ব্যুৎপত্তি করিয়াছেন,— ‘গবামুদকানাং ধর্ত্তা’ অতএব বিবেচনা হয়, যাঁহারা পাহাড়ের উপর জলাশয় করিয়া বর্ষাকালে সম্বৎসরের ব্যবহারের উপযুক্ত জল ধরিয়া রাখিতের তাঁহারা গন্ধর্ব্ব। ইহাদের মধ্যে যে বিবাহ প্রচলিত ছিল তাহাই গান্ধর্ব্ব বিবাহ।
কালান্তরে আর্য্যদল, ঐ সকল স্থান হইতে সুমেরু পর্ব্বতে ও তন্নিকটস্থ দেশে যান। সায়ণাচার্য্য সামবেদের ভাষ্যে একটি শ্রুতি ধৃত করিয়াছেন— ‘কশ্যপঃ পশ্যকো ভবতি’। অর্থাৎ কশ্যপ শব্দকে ডান দিক হইতে পড়িলে পশ্যক হয়। পশ্যক হইতে মনে হয় সকল আর্য্য দলের উপর তাঁহার দৃষ্টি ছিল বা শাসন ছিল। সায়ণাচার্য্য আর একটি শ্রুতি ধরিয়াছেন,—‘কশ্যপঃ প্রজাপতিঃ প্রজাপতিঃ কশ্যপোঽষ্টমঃ স মহামেরুং ন জহাতীতি’। অর্থাৎ অষ্টম প্রজাপতি কশ্যপ, মহামেরু অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত সুমেরু পর্ব্বতকে ত্যাগ করেন না।
আর্য্যদের কয়েক দল, মধ্য এসিয়া হইতে দিকে দিকে গমন করেন। কুমায়ুন প্রদেশের কুর্ম্মাচলে যেরূপ পাত্রাঙ্ক (Cup marks) সকল খোদিত আছে, সেইরূপ পাত্রাঙ্ক সকল, নর্থস্বরলণ্ড, স্কটলণ্ড, আয়ার্লণ্ড, বিট্টণী, নরবে, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশের পর্বতগাত্রে খোদিত আছে[৪]। অতএব বিবেচনা হয় মধ্য এসিয়ার লোকে ঐ ঐ দেশে গিয়া ঐরূপ চিহ্ন সকল করিয়া থাকিবে। প্রজাপতি দক্ষের দলভুক্ত কয়েক দল লোক যে দিকে দিকে গমন করেন, তাহার প্রমাণের উল্লেখ করিতেছি। শান্তিপর্ব্বে দশ সহস্র দক্ষ পুত্রের দিগন্তরে গমনের প্রসঙ্গ আছে। আমরা জানি হরিবংশ পর্ব্বের ও পুরাণের কথা অনুসারে, দক্ষের হর্য্যশ্ব নামক ৫০০০ পুত্র, পৃথিবীর পরিমাণ জানিবার নিমিত্ত দিকে দিকে গমণ করেন। তাঁহারা ফিরিলেন না দেখিয়া দক্ষের শবলাশ্ব নামক ১০০০ পুত্র তাঁহাদের অন্বেষণে গমন করেন, কিন্তু তাঁহারাও আর ফিরিয়া আসিলেন না। সম্ভবতঃ তাঁহারা পশ্চিম মহাসমুদ্রের তীরে গিয়া থামিয়াছিলেন। আমরা ঐ সমুদ্র তীরে—অতলান্তিক সমুদ্র তীরে ডাচদিগকে দক্ষ সন্তান বলিয়া চিনিতে পারিয়াছি। দক্ষ শব্দের উত্তর অপত্য অর্থে অন্ প্রত্যয় করিলে দাক্ষ হয়। দাক্ষ, প্রাকৃত ভাষায় দাচ্ছ এবং দাচ্ছ হইতে—ডাচ।
কালান্তরে আর্য্যগণ, সুমেরু সন্নিহিত দেশ ত্যাগ করিয়া দক্ষিণ দিকে আসিয়া যে স্থানে বসতি করেন, ইরাণীদের শাস্ত্রে তাহার নাম ‘ঐর্য্যণম্বেজো’। অবেস্ত শাস্ত্রের বেন্দিদাদ নামক সৃষ্টি প্রকরণে ঐ দেশের উল্লেখ আছে। উহা হিম প্রধান দেশ। ঐর্য্যণম্বেজো সংস্কৃত করিলে অর্য্যাণাংব্রজ বা অর্য্যাণুব্রজ হয়। ঋগ্বেদে (৮।৫১।৯) এবং সাম বেদে (উত্তারার্চ্চিক ৭।৩।১৯।১) ইহাই ‘অর্য্য’ ও ‘অর্য্য’ দেশ উক্ত হইয়াছে বলিয়া মনে হয়। ইহার পরেই ‘রুশম’ অর্থাৎ রুশ দেশ উক্ত হইয়াছে। সম্ভবতঃ অর্য্য খণ্ড (Yarkand) অর্য্য ও অর্য্যানুব্রজের স্মৃতি চিহ্ন বহন করিতেছে। যে ভূখণ্ডের পূর্ব্বসীমা অর্য্যখণ্ড (Yarkand) ও পশ্চিম সীমা ইরান্ (পারস্য), সেই বিস্তৃত ভূখণ্ডে আর্য্যগণ দলে দলে বাস করিতেছিলেন।
ভীষ্ম পর্ব্বে (১১শ অ) শাক দ্বীপের (Scythia) নদী সমূহের মধ্যে ও বায়ু পুরাণে (১।৪৭) চক্ষু নদী কথিত আছে। বিষ্ণু পুরাণে—
চক্ষুশ্চ পশ্চিম গিরীন্ অতীত্য সকলাংস্যতঃ।
পশ্চিমং কেতুমালাখ্যং বর্ষং গত্বেতি সাগরম্॥
চক্ষু নদী, পশ্চিম গিরি সকলকে অতিক্রম করিয়া ও পশ্চিম কেতুমালা নামক বর্ষে গিয়া সাগর প্রাপ্ত হইয়াছে। তদ্দেশবাসিগণ, ইহাকে চক্ষু বলে, ইহাই গ্রীকদের উক্ত ওক্সুস (Oxus)। আমার মনে হয়, চক্ষুসৌর্য্য (ঋগ্বেদ ১০ম মণ্ডলের ১৫৮ সুক্তের ঋষি) হইতে এই নদীর নামকরণ হইয়াছে। আরও মনে হয় ষষ্ঠ মনু চাক্ষুষ এই নদী তীরেই বাস করিতেন।
বারুণ হ্রদ ও পাতাল আবিষ্কার[৫] চক্ষু নদী যে সাগরে গিয়াছে, তাহার নাম বারুণ হ্রদ। উদ্যোগ পর্ব্ব ৯৭ অধ্যায়ে—
অগ্নিরের মহার্চ্চিষ্মান্ জাগর্ত্তি বারুণে হ্রদে।
উদ্যোগ পর্ব্ব ৯৮ অধ্যায়ে—
অত্রাসুরোঽগ্নিঃ সততং দীপ্যতে বারি ভোজনঃ।
ঐ যে বারুণ হ্রদ, ইউরোপের লোকে উহাকে কাস্পিঅন সি বলে। এখানে আজিও মহাদীপ্তিশালী ভয়ানক অগ্নি জাগিয়া রহিয়াছে। অগ্নির বারি ভোজন বিশেষণ হইতে বোধ হয়, সেখানকার জল সর্ব্বদা টগ্বগ্ করিয়া ফুটিতেছে।
বরুণ, পশ্চিম দিক্ পতি প্রসিদ্ধ আছেন। বারুণ হ্রদ নাম হইতে বিবেচনা হয়, বরুণ, এই হ্রদের নিকটে কিছুকাল রাজত্ব করিয়াছিলেন। ঋগ্বেদের অনেক স্থানে বরুণ-রাজা, সম্রাট্ বা দেবগণের সম্রাট্ বলিয়া পূজিত হইয়াছেন। বরুণ, মানবলীলা সম্বরণ করিয়া যমের সহিত যমলোকে গিয়া বিরাজিত আছেন, ঋগ্বেদ ১০।১৪।৭ ঋক্ এই,—
প্রেহি প্রেহি পথিভিঃ পূর্ব্যেভির্যত্রানপূর্বে পিতরঃ পরেয়ুঃ।
উভারাজানঃ স্বধয়ামদং তা যমং প্যসি বরুণং চ দেবং॥
মৃতব্যক্তির প্রতি উক্তি—
“আমাদের পূর্ব্বপুরুষেরা যে পথ দিয়া যেস্থানে গিয়াছেন, তুমিও সেই পথ দিয়া সেই স্থানে যাও। সেই যে দুই রাজা— যম আর বরুণ, যাঁহারা স্বধা প্রাপ্ত হইয়া আমোদ করিতেছেন, তাঁহাদিগকে যাইয়া দর্শন কর।”
রমেশচন্দ্র দত্ত।
বরুণ, ইন্দ্র অপেক্ষা প্রাচীন দেবতা। তিনি জলের অধিপতি হইলে মহাভারতে (১৩।৯১।২৬) লিখিত হইল—
উদকানয়নে চৈব স্তোতব্যো বরুণো বিভুঃ।
পূর্ব্বোক্ত পাতালপুরে ও তন্নিকটস্থ হিরণ্যপুরে বাসব কর্ত্তৃক হৃতশ্রী দৈত্যগণ ও দানবগণ বাস করিতেন। ঐ হিরণ্যপুরই হিরণ্যকশিপুর লীলাক্ষেত্র। হিরণ্যপুর, মানচিত্রে নাই। স্থানান্তরে বলিয়াছি, ইহার সান্নিধ্যে দেবদানবের ভয়ানক যুদ্ধ হইয়াছিল। যে যুদ্ধে গোমন্দপর্ব্বতে শয়ান, মধুসূদন গোবিন্দ, পর্ব্বত হইতে অবতরণ করিয়া যুদ্ধ করেন। সেই যুদ্ধে দনুসন্তান-দানবদের অনেক গণ, দেবগণ কর্ত্তৃক প্রহৃত হইয়া ইউরোপে পলায়ন করেন। তাঁহারা প্রথমে যে নদীতীরে উপনিবিষ্ট হইয়াছিলেন তাঁহাদের নামানুসারে সেই নদীর নাম হইয়া ছিল—দানবী (Danube)।
মানচিত্রে পারস্যের অন্তর্গত খোরাসান প্রদেশে নিশাপুর (Neeshapur) নামক একটি নগর দৃষ্ট হয়। বিবেচনা হয়, এখানে নিশানাম্নী এক দৈত্যনারীর বাস ছিল এবং তাঁহার পুত্রেরা ‘নিশাপুত্রাঃ’ নামে খ্যাত হইয়াছিলেন। হরিবংশে (ভ, প, ২৩৭ অ)।
খেচরাশ্চ নিশাপুত্রাঃ পাতালতল বাসিনঃ।
অতএব অনুমান হয়, নিশাপুরও পাতাল বা নাগলোকের অন্তর্গত।
শিবের গাজনে পূজারির মুখে অনেকেই শুনিয়া থাকিবেন—“স্বর্গে মন্দাকিনী পাতালে ভোগবতী, পৃথিবীতে অলকানন্দা”। ঐ ভোগবতী হইতেছে—বাকু। আদিপর্ব্বে (২০৯) ভোগবতীর উল্লেখ আছে! ভোগবতীর ‘ভোগ’ অপভ্রষ্ট হইয়া বাকু হইয়াছে। ভোগবতীর নামান্তর “পাতালপুর“ (উদ্যোগপর্ব্ব ৯৭ অ)। ইহা নাগলোকের নাভিস্থলে অবস্থিত। ভোগবতী সর্পদিগের পুরী। খিল হরিবংশ পর্ব্বে, ভবিষ্য পর্ব্বে (২৩৬ অ) —
বিশালরথ্যা দুর্দ্ধর্ষা সর্পানামালয়া পুরী।
তথা ভোগবতী চাপি * *॥
নাগলোকে সর্পদের বাস ছিল। ইঁহারা আর্য্যদের এক শাখা। ঋগ্বেদে ইঁহাদের নাম সর্পবিশ, অর্থাৎ সর্প নামক নর। জরৎকর্ণ ঐরাবত সর্প (১০।৭৬) ও অর্ব্বুদ কাদ্রবেয় সর্প (১০।৯৪) ঋগ্বেদের ঋষি। নাগগণ, উত্তরকালে নাগলোক হইতে আসিয়া ভারতে প্রবেশ করেন। ভোগবতীর সহিত বহুশত অশ্মন্বতী আবিষ্কার। বৎসর সম্পর্ক শূন্য হইলেও ভারতীয় নাগরাজগণ, আপনাদের শিল্পলিপিতে আপনাদিগকে “ভোগাবতীপুর পরমেশ্বর”[৬] বলিয়া পরিচয় দিতে আগ্রহান্বিত ছিলেন। এইবার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জ্ঞাতব্য ঐতিহাসিক আবিষ্কারের কথা বলিব। ‘সুবর্ণবণিক সমাচারে’র নিমিত্ত প্রবন্ধ লিখিতে হইবে বলিয়া আবার বেদ আলোচনায় প্রবৃত্ত হইয়া চারি বৎসর পূর্ব্বে অশ্মন্বতী নদীর আবিষ্কার করিয়াছি। প্রবন্ধান্তরে ও অগ্রে বলিয়াছি, আর্য্যদের কয়েক দল মধ্যএসিয়া হইতে পশ্চিম এসিয়ায় ও ইউরোপে প্রস্থান করেন। যাঁহারা রহিলেন, তাঁহাদের সংখ্যা বৃদ্ধির সহিত অন্নকষ্ট উপস্থিত হইলে, উর্ব্বরক্ষেত্রের অনুসন্ধানে তাঁহারা হিমবর্ষে প্রবেশ করিবার উদ্যোগ করিলেন। হিমবর্ষে প্রবেশ করিতে হইলে, প্রথমতঃ পথে একটি নদী পার হইয়া একটি পর্ব্বত পার হইতে হয়। যে নদীটি পার হওয়া আবশ্যক, ঋগ্বেদে (১।১৫।৫৬) তাহাকে ‘ধুনি’ ও ‘উদঞ্চসিন্ধু’ বলা হইয়াছে। ধুনি অর্থে নদী, উদঞ্চ সিন্ধু অর্থে উত্তর বাহিনী নদী। উদঞ্চ হইতে পঞ্জ নামের উৎপত্তি। পঞ্জ নদী উত্তর দিকে গিয়া অর্ব্বাচীন কালে আমুদরিয়া নাম পাইয়াছে। ধুনি বা উদঞ্চ সিন্ধু সমগ্র নদীর নাম নহে, সমগ্র নদীর নাম ‘অশ্মন্বতী’[৭]। ইহার অশ্মন্ হইতে অমন্ এবং অমন্ হইতে আমু। বোধ হর আর্য্যগণ ইহাকে উদঞ্চ অশ্মন্বতী ধুনি (উত্তরবাহিনী পার্ব্বত্য নদী) বলিতেন। একদা পরপারে যাইতে কৃতসঙ্কল্প আর্য্যদল এই নদীতীরে আসিয়া থামিয়াছিলেন। অগ্নি সৌচীক ঋষি বলিলেন (ঋগ্বেদ ১০।৫৩।৮)—
অশ্মন্বতীরীয়তে সংরভধ্বমুত্তিষ্ঠত প্রতরতা সখায়ঃ।
অত্রাজহাম যে অসন্নশেবাঃ শিবান্বয়মুত্তরেমাভি বাজান্॥
অশ্মন্বতী বহিতেছে, সখাগণ, উদ্যম কর। উঠ, পার হও, যাহা কিছু অসুখ আছে, তাহা এপারে ত্যাগ করিলাম, এই নদী পার হইলেই আমরা সুখ স্বচ্ছন্দে উত্তম অন্নের দিকে যাইব।
অথর্ব্ববেদেও ঐ ঋকটি কিঞ্চিৎ রূপান্তরিত ভাবে আছে, যথা—
অশ্মন্বতীরীয়তে সংরভধ্বং বীরয়ধ্বং প্রতরতা সখায়ঃ।
অত্র জহীত যে অসন্ দূরে বা আনমীবানুত্তরেমাভি বাজান্॥
অর্থ—অশ্মন্বতী বহিতেছে, উৎসুক হও, সাহস কর, পার হও বন্ধুগণ! যে সকল দুঃখ আছে, তাহা এই স্থানে ছাড়ো, এই নদী পার হইলেই আমরা সুস্থদেহে অন্ন লাভের দিকে যাইতে পারিব।[৮]
অনন্তর আর্য্যদল নদী পার হইয়া নিষধ নামক পর্ব্বতের নিকট পৌঁছিলেন। এই পর্ব্বত নৈষধ বা হরিবর্ষের সীমা পর্ব্বত। উহার আধুনিক নাম হিন্দুকুশ। যে সঙ্কট[৯] দ্বারা এই পর্ব্বত পার হইতে হয়, বর্ত্তমানে তাহার নাম উর্ম। এই সঙ্কট বড়ই সঙ্কটজনক দুর্গম নিবিড় বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন, নানা হিংস্র জন্তু রহিয়াছে, অজগর সাপ আছে—কি করিয়া প্রবেশ করা যায় ইত্যাদি চিন্তায় ও দুর্গমত্ব নিরাকরণের চেষ্টায় আর্য্যদলকে এই পর্ব্বতের নিকট কিছুদিন নিষণ্ণ অর্থাৎঃ বসিয়া থাকিতে হইতে হইল, তাহাতেই এই পর্ব্বতের নাম হইল (নি + সদ— অব্) নিষধ। এই সময়ে ভরদ্বাজ বার্হস্পত্য উচ্চৈঃস্বরে অগ্নিকে আহ্বান করিতে লাগিলেন (ঋগ্বেদ ৬।১৬.১০)
অগ্ন আয়াহি বীতয়ে গৃণাণো হব্যদতিয়ে।
নিহোতা সংসি বর্হিষি।
হে অগ্নি! তুমি অরণি কাষ্ঠদ্বয়ের ঘর্ষণে উৎপন্ন হইন্না বন জঙ্গল ও হিংস্র জন্তু সকল ভক্ষণের নিমিত্ত, দেবতাদের হবি প্রদানের নিমিত্ত ও তাঁহাদের আহ্বান কর্ত্তা—বা হোম নিষ্পাদক কর্ত্তা হইয়া আইস। তুমি আমাদের প্রীণন কর্ত্তা এই যে কুশাদি তৃণ রাশি, ইহাতে ‘নিষৎসি’ নিষণ্ণ হও।
এই ‘নিষৎসি’ হইতেও ঐ পর্ব্বতের নিষধ নাম হইতে পারে। অগ্নি কুশাদি তৃণ রাশিতে নিষণ্ণ হইয়া ক্রমে যে পর্ব্বতের বন পোড়াইতে লাগিল, অগ্নির সেই নিষণ্ণ হওয়া হেতু নেই পর্ব্বতের নাম হইল— নিষধ। অগ্নি সংযোগে বন জঙ্গল সকল দগ্ধ হইয়া উর্ম সঙ্কটের দুর্গমত্ব হ্রাস হইলে সশরীরে মানবদেহে বর্ত্তমান বিষ্ণু, অগ্রণী হইয়া ছাই পাঁশ পরিপূর্ণ সঙ্কট পথে, সাবধানে তিন পা ফেলিয়া যাত্রা করতঃ প্রবেশ করিলেন। (বিষ্ণু শব্দ প্রবেশ বাচক বিশ্ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন)। এই সময়ে মেধাতিথি কাণ্ব উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন (ঋগ্বেদ ১।২২।১৭)
ইদং বিষ্ণুর্বিচক্রমে ত্রেধা নিদধে পদং।
সমূলহমস্য পাংশুরে॥
সামবেদে এই ঋকের ‘সমূলহমস্য পাংসুরে’ স্থলে ‘সমূঢ়মধ্য পাংসুলে’ পাঠ আছে।
বিষ্ণু বিক্রম প্রকাশ করিলেন, এই ‘উলহ’ বা ‘উঢ়’ সঙ্কট প্রাপ্ত হইয়া পাংশুপূর্ণ পথে তিন প্রকারে—হ্রস্ব, মধ্যম ও দীর্ঘ করিয়া নিজপদ সম্যকরূপে প্রক্ষেপ করিলেন[১০]।
‘উলহ’ বা ‘উঢ়’ বর্ত্তমানে ‘উর্ম’ (Urma pass)। এই তিন নামের মূল সৌত্র উলধাতু, ইহার অর্থ—দাহ। এতদ্বারা জানা যাইতেছে ওখানে একটা ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড হইয়াছিল। প্রথম ও তৃতীয় শব্দের ‘হ’ ও ‘ম’ অনুবদ্ধ, যেমন, মট, অবসাদনে —মটহ। ‘ঢ়’ ও ‘র’ এ বিশেষ ভেদ নাই। ঐ ধাতু হইতে উৎপন্ন দুইটি শব্দ যথা —উলপ, উল্কা।
আয়ু কান্ব বলেন (ঋগ্বেদ ৮।৫২।৩)
য উক্থা কেবল দধে যঃ সোমং ধৃষিতাপিবৎ।
যস্মৈ বিষ্ণুস্ত্রীণি পদা বিচক্রম উপমিত্রস্য ধর্ম্মভিঃ॥
যে ইন্দ্র কেবল উক্থ ধারণ করিয়াছেন, যিনি ধৃষ্ট ভাবে সোম পান করিয়াছেন। বিষ্ণু সুহৃদের ধর্ম্ম অনুসারে যাঁহার দিকে (পূর্ব্বদিকে) তিন পা ফেলিয়া উপক্রম করিয়া চলিয়াছেন।
আর্য্যদল উলহ, উঢ়, বা উর্মগিরি সঙ্কট পার হইয়া বন্ধুর পার্ব্বত্য পথ দিয়া পূর্ব্বদিকে চলিলেন, তাঁহাদের পশ্চাৎদিক্—পশ্চিম, ডানদিক্—দক্ষিণ, বামদিক —উত্তর, পুরোদিক্—পূর্ব্ব নাম পাইল। কয়েকদিন পরে পূর্ব্বাপেক্ষা ভয়ানক ও দুর্গম আর এক গিরি সঙ্কট, তাঁহাদের গমন পথে বাধা দিল। তাঁহারা পূর্ব্বানুরূপ যত্নবান্ হইয়া এই গিরিসঙ্কটের বন জঙ্গল পোড়াইয়া ফেলিলেন। তদনন্তর আবার মহাবীর বিষ্ণু, সেই পথে অগ্রসর হইলেন। মেধাতিথি কাণ্ব উচ্চৈঃস্বরে প্রার্থনা করিলেন, (ঋগ্বেদ ১।২২।১৬)—
অতো দেবা অবংতুনো যতোবিষ্ণুর্ব্বিচক্রমে।
পৃথিব্যাঃ সপ্তধামভিঃ॥
অর্থ—যেহেতু বিষ্ণু, এই পৃথিবীর সপ্তধা বিভক্ত ভূমি উদ্দেশে অথবা পৃথিবীর
সপ্ত ভূমি লক্ষ্য করিয়া সাবধানে চলিয়াছেন, অতএব দেবতারা[১১] (বিষ্ণুর সহিত) আমাদিগকে (হিংস্র জন্তু ও দস্যু হইতে) রক্ষা করুন।
এই স্থানে লেখকের কিঞ্চিৎ বক্তব্য আছে, চারি বৎসর পূর্ব্বে ‘পুরাকথা’ প্রবন্ধে আর্য্যদলের সপ্তসিন্ধু প্রদেশ উদ্দেশে যাত্রার প্রসঙ্গে উল্লিখিত কয়েকটি ঋক্ ও তৎসম্বন্ধীয় ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশিত করিয়াছিলাম কিন্তু ঐ সকল আবিষ্কার সুবর্ণবণিকদের মধ্যে নিবদ্ধ ছিল, তাঁহাদের অধিকাংশই মৎকৃত আবিষ্কারের বিশেষতঃ অশ্মন্বতী আদি আবিষ্কারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করিতে পারেন নাই। সমাচারে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধগুলিকে অনেকে নীরস মনে করেন, আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন,—“উনি যে কি লিখিতেছেন, তাহা ত বুঝা যায় না।” এইবার পণ্ডিত মণ্ডলীর মধ্যে যাহাতে এই প্রবন্ধ প্রচারিত হয়, তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে। আশা করা যায়, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভাষাতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতগণ উদ্ধৃত ঋক্গুলির রচনাকাল নির্ণয় করিয়া ভারতীয় আর্য্য ইতিহাসের মহোপকার সাধন করিবেন। আমি বিবেচনা করি অগ্রে উদ্ধৃত ঋগ্বেদ ১০ম মণ্ডলের ‘অশ্মন্বতীরীয়তে’ এবং ১ম মণ্ডলের ‘ইদং বিষ্ণুর্ব্বিচক্রমে’ ও ‘অতো দেবা অবন্তুনো’ ইত্যাদি ঋক্ত্রয়, একই সময়ে রচিত; ১ম নাং ৯ম মণ্ডলের সমস্ত সূত্রই যে অতি প্রাচীন এবং ১০ম মণ্ডলের সমস্ত সূক্তই যে অপেক্ষাকৃত অপ্রাচীন তাহা নহে।
বিষ্ণু অগ্রে অগ্রে ও তৎপশ্চাতে আর্য্যদল পৃথিবীর সপ্তধাম উদ্দেশে চলিয়াছেন। এই সপ্তধাম কোথায়? এই সপ্তধাম হইতেছে,—সপ্তসিন্ধু প্রদেশ। সপ্তসিন্ধু এই,—১ সিন্ধু (সুষোমা), ২ বিতস্তা, ৩ অসিক্নী, (চন্দ্রভাগা, চেনাব) ৪ পরুষ্ণী (ইরাবতী, রাবি), ৫ আর্জিকীয়া (বিপাশা), ৬ শতুদ্রী (সৎলেজ) ৭ সরস্বতী। সিন্ধু তখন নদ হয় নাই, নদী ছিল। ঋগ্বেদে (৭।৩৬।৬)—‘সরস্বতী, সপ্তমী, সিংধুমাতা’—বিতস্তাদি পঞ্চনদী, তাহাদের মাতা সিন্ধু ও সরস্বতী এই সাত। ৮।৩৯।৮ ঋকে—‘যো অগ্নিঃ সপ্ত মানুষঃ শ্রিতো বিশ্বেষু সিংধুষু’—যে অগ্নি, বিশ্বনদী সকলেতে ও সপ্ত মনুষ্যলোকেতে পূজ্য। এই সপ্ত মানুষ বলিতে পূর্ব্বোক্ত সপ্তধাম এবং ‘বিশ্বসিংধু’র অর্থ—পূর্ব্বোক্ত সপ্ত নদী। ১।৭১।৭ ঋকে ‘সমুদ্রং ন স্রবতঃ সপ্ত বহ্বী’—এই সমুদ্রগামিনী সপ্ত বহূদকা নদী ও পূর্ব্বোক্ত সপ্ত নদী অভিন্ন।
অগ্রে ধৃত ঋগ্বেদের “অতো দেবা” ইত্যাদি ঋক্টি সামবেদেও আছে, কিন্তু তথায় “সপ্তধামভিঃ” স্থলে “অধিসানবি” পাঠান্তর হইয়াছে। সায়ণ উহার অর্থ করেন—“সমুচ্ছ্রিতে অধিকে দেশে স্বর্গাদি লোকে”। পর্ব্বতস্থ সমভূমি দেশে অর্থ করিলে সঙ্গত হয়[১২]। সামবেদ সঙ্কলনকালে ঋগ্বেদের “সপ্তধামভিঃ” “অধিসানবি” রূপে পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। যেহেতু সপ্তধাম বলিলে যে সপ্তসিন্ধু দেশ বুঝায়, বিষ্ণু যে তখন দেবতা হইয়াছেন, সূর্য্যের সহিত এক হইয়াছেন। বিষ্ণু মানবলীলা সম্বরণ করিয়া সূর্য্যলোকে গিয়া বিরাজ করিতেছেন। ঋগ্বেদে (১।২২।২০)—
তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্।[১৩]
কবিগণ, পুরুষের চক্ষুর ন্যায় (চক্ষোঃ সূর্য্যো অজায়ত ইতি শ্রুতিঃ) আকাশে বিস্তৃত সেই বিষ্ণুর উত্তম স্থানকে সর্ব্বদা দেখিতেছেন।
বনপর্ব্ব ২৬০ অধ্যায়ে বিষ্ণুর পদ অর্থাৎ স্থানকে সূর্য্যই বলা হইয়াছে,—
ব্রহ্মণঃ সদনাদূর্দ্ধং তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদম্।
শুদ্ধং সনাতনং জ্যোতিঃ পরংব্রহ্মেতি যংবিদুঃ॥
ব্রহ্মের (বৃহস্পতির) স্থানের ঊর্দ্ধে শুদ্ধ, সনাতন ও জ্যোতিঃ স্বরূপ সেই বিষ্ণুর উত্তম স্থান রহিয়াছে, পণ্ডিতেরা যাহাকে ব্রহ্ম বলিয়া জানেন।
ঋগ্বেদে (১০।১৪১।৩) আদিত্যগণ, বিষ্ণু ও সূর্য্য পৃথক্ পৃথক্ উক্ত হইয়াছেন; অগ্নি তাপস বলেন,—
সোমং রাজানমবসেঽগ্নিংগীর্ভির্হবামহে।
আদিত্যান্বিষ্ণুং সূর্য্যং ব্রহ্মাণং চ বৃহস্পতিং॥
আমাদিগকে রক্ষা করিবার নিমিত্ত আমরা গেয়গান দ্বারা সেমি রাজাকে, অগ্নিকে আহ্বান করি, আদিত্যগণকে, বিষ্ণুকে, সূর্য্যকে ও ব্রহ্মণস্পতি বৃহস্পতিকে আহ্বান করি।
বিষ্ণু দেবতাক সূক্তে[১৪] দীর্ঘতমা ঔচত্য বলেন (ঋগ্বেদ ১।১৫৪।১)—
বিষ্ণোর্নুকংবীর্য্যাণি প্রবোচং বঃ পার্থিবানি বিনমে রজাংসি।
যো অস্কভায়দুত্তরংসধস্থং বিচক্রমাণ স্ত্রেধোরুগায়ঃ॥
বিষ্ণুর বীর্য্যের কথা কি বলিব? যিনি পার্থিব ধূলি সমাকীর্ণ (পথ পাইয়া ও পার হইয়া উহাকে) মাপিয়াছেন, আর বহু প্রশংসিত যিনি, তিন প্রকার পদ বিক্ষেপ দ্বারা চলিয়া উত্তর প্রস্থ বা সানুকে স্তম্ভিত করিয়াছেন।
ঐ সূক্তের দ্বিতীয়া ঋকে বিষ্ণুকে ‘বীর্য্যেণ’ পরাক্রমে ‘ভীম’ ভয়ানক ‘কুচরঃ’ হিংস্র ‘গিরিষ্ঠাঃ’ গিরিশারী ‘মৃগঃ’ আরণ্য জন্তু এবং তৃতীয়া ঋকে ‘গিরিক্ষিৎ’ গিরিতে বিচরণকারী বলা হইয়াছে। উহার অনুসরণে হরিবংশপর্ব্বে (ভবিষ্যপর্ব্ব ২৩৬ অ) বিষ্ণু ‘মৃগেন্দ্র’ ও ‘নৃসিংহ’রূপে হিরণ্যকশিপুকে নখদ্বারা বিদারিত করিয়া নিহত করিয়াছেন।
ঐ সূক্তের ষষ্ঠী ঋক্ এই—
তা বাং[১৫] বাস্তূন্যুশ্মসি গমধ্যৈ যত্র গাবো ভুরি শৃংগা অয়াসঃ।
অত্রাহ তদুরুগায়স্য বৃষ্ণঃ পরমংপদমবভাতি ভূরি॥
হে ইন্দ্র ও বিষ্ণু! তোমাদের সুখের বাস্তুতে, যেখানে ভূরিশৃঙ্গ ও দ্রুতগামী গোগণ চরিতেছে, সেই স্থানে বহু প্রশংসিত বিষ্ণুর উত্তম স্থান শোভা পাইতেছে, তথায় যাইতে চাই।
ঐ যে গিরিরূপ সুখের বাস্তু, হরিবংশপর্ব্বে তাহার নাম, গোমন্দ পর্ব্বত যথা,
গোমন্দে পর্ব্বতে শেতে গোবিন্দো মধুসুদনঃ।
মধুদৈত্য বিনাশকর্ত্তা গবাধিকারী বিষ্ণু, গোমন্দ পর্ব্বতে শুইয়া আছেন।
শেষোক্ত গিরিসঙ্কটের বর্ত্তমান নাম—খাইবার পাস (Pass)। খাইবার অর্থ কি? ক্ষার (ছাই) হইতে খাই এবং বাট বা বর্ত্ম হইতে—বার। এই সঙ্কটের নিবিড় বনজঙ্গল আগুন লাগাইয়া। পোড়ান হইলে উহা ক্ষারবাট বা ক্ষারবর্ত্ম নামে খ্যাত হইল। ক্ষারবাট বা ক্ষারবর্ত্ম হইতে—খাইবার।
এই ক্ষারবাট সঙ্কটে প্রবেশ করিয়া আর্য্যদল বিশ্ নামে খ্যাত হইলেন। বিশ্ ধাতুর অর্থ—প্রবেশ। ইরাণীদের অবেস্ত শাস্ত্রে বিশ্ শব্দের রূপ ‘বীশ’। হিন্দু আর্য্যদলের সহিত একত্র থাকা অবস্থায় তাঁহারা ক্ষারবাট দিয়া সপ্তসিন্ধু বা হপ্তহেন্দুদেশে আসিয়াছিলেন। বেদের সপ্তসিন্ধু, অবেস্তশাস্ত্রে হপ্তহেন্দু। বিশ্গণ, শীতনিবারণ, হিংস্রজন্তু হইতে রক্ষা ও যাগাদি নিত্য প্রয়োজনীয় কার্য্য নির্ব্বাহের নিমিত্ত, অগ্নিকে সর্ব্বদা কাষ্ঠাদি দ্বারা রক্ষা করিতেন—পূজা করিতেন, অতএব ঋষিদের মুখ দিয়া সর্ব্বদা এইরূপ কবিতাময়ী ঋক্ সকল বাহির হইত (ঋগ্বেদে ৮।৭৪।১)—
বিশেষ বিশো বো অতিথিং বাজয়ন্তঃ পুরুপ্রিয়ম্।
অগ্নিঃ বো দুর্য্যংস্তবে শূষস্য মন্মভিঃ॥
ওহে বিশ্গণ! ওহে বিশ্গণ! তোমরা অন্নের ইচ্ছা করিতেছ—এই বহু প্রিয় পূজ্য অগ্নির পরিচর্য্যা কর, আমি তোমাদের লাভের নিমিত্ত গৃহের হিতকারী অগ্নিকে মনোহর বাক্যে স্তব করিতেছি।
আর্য্য দল সপ্ত সিন্ধু দেশের সন্নিকটে আসিয়া পূর্ব্বোক্ত সপ্ত নদীকে মা বলিলেন, (ঋগ্বেদ ৮।৯৬।১)—
অস্মা আপো মাতরঃ সপ্ত তস্থূনূর্ভ্যস্তরায়
সিংধবঃ সুপারাঃ॥
এই ইন্দ্রের ইঙ্গিতেই জলময়ী সপ্ত সিন্ধু মাতা, নর নারীদের তরণার্থ সুখে ভারতবর্ষের নামকরণ। পার হইবার যোগ্য হইয়াছেন। ঋগ্বেদে (৬।১৬।৪) ভারতের নাম ও পরিচয় এইরূপ,—
ত্বামীলে অব দ্বিতা ভরতো বাজিভিঃ শুনং।
ঈজে যজ্ঞেষু যজ্ঞিয়ং॥
“হে অগ্নি, হব্যদাতা ঋত্বিগ্গণের সহিত ভরত দ্বিবিধ ধর্ম্মাক্রান্ত (অর্থাৎ সুখদাতা ও দুঃখনাশক) তোমাকে সুখের উদ্দেশে স্তব করিয়াছিলেন ও হব্যদ্বারা যজ্ঞার্হ তোমার যাগ করিয়াছিলেন।”
(রমেশ চন্দ্র দত্ত)
ভাষ্যকার সায়ণাচার্য্য উল্লিখিত ভরতকে দুষ্মন্ত-তনয় ভরত মনে করিয়াছেন। ঋগ্বেদে (১।২২।১০)—
আগ্না অগ্ন ইহাবসে হোত্রাং যবিষ্ঠ ভারতীং।
বরুত্রীঃ ধিষণাং বহ॥
‘হে অগ্নি! আমাদিগের রক্ষার্থে দেবপত্নীদিগকে এই যজ্ঞে আনয়ন কর। হে যুবক! হোত্রা, ভারতী ও বরণীয়া ধিষণাকে আনয়ন কর।’
(রমেশ চন্দ্র দত্ত)
সায়ণাচার্য্য, হোত্রাকে—‘হোত্রাং হোম নিষ্পদকাগ্নি পত্নীং” ভারতীকে ভরত নামকস্য আদিত্যস্য পত্নীং’ এবং বরুত্রীকে—‘বরুত্রীং বরণীয়াং ধিষণা বাগ্দেবীং’ বলিয়াছেন।
ভাগবত (১১।২) অনুসারে স্বায়ম্ভুব মনুর বৃদ্ধ প্রপৌত্র—নাভি। জৈন হরিবংশে (৯০ সর্গে) লেখা আছে—নাভির পুত্র—নাভেয় (ঋষভ)। জৈন শাস্ত্র মতে—ঋষভদেব চতুর্ব্বিংশতি তীর্থকরের আদিম অর্থাৎ প্রথম তীর্থকর। ভাগবতে লেখা আছে (১১।২) ঋষভ দেবের সাত পুত্রের মধ্যে ভরত—জ্যেষ্ঠ। বিষ্ণুপুরাণ (২।১) মার্কণ্ডেয় পুরাণ (৬৩।৪০-৪১) অনুসারে ঋষভদেব ভরতকে রাজ্যে অভিষিক্ত করেন এবং ভরত হইতে হিমবর্ষের নাম ভারতবর্ষ হয়। জৈন মতে ঋষভ, ভারতবর্ষের প্রথম রাজা।
অনুশাসন পর্ব্বে (১৫০ অ) —
ত্রিলোক বিশ্রুতং বীরং ভরতঞ্চ প্রকীর্ত্তয়েৎ।
গবাসয়েন যজ্ঞেন যেনেষ্টং বৈ কৃতে যুগে॥
ঋগ্বেদে (১।৮৪) ইন্দ্রের রাজত্বকে তিন বার স্বরাজ্য বলা হইয়াছে। ইন্দ্র দেবরাজ্যে রাজা ছিলেন। দেবরাজ্য কোথায়? দেবরাজ্য স্বর্গে। স্বর্গ আবিষ্কার। স্বঃ বা স্বর্ অর্থে স্বর্গ। স্বঃ+রাষ্ট্র=স্বারাষ্ট্র, ইহার অপভ্রংশে—স্বাট্। পুরুষপুর বা পেসোবারের বিশক্রোশ কিঞ্চিৎ পূর্ব্ব উত্তরে Swat, বৌদ্ধ যুগে স্বাটের একাংশের নাম ছিল—উদ্যান। উদ্যান, ইন্দ্রের নন্দনোদ্যান ছিল না কি? আর্য্যগণ এখানে দীর্ঘকাল বাস করিলে, আজীগর্ত্তি শুনঃশেপ ইহাকেই প্রত্নৌকস্ অর্থাৎ পুরাতন স্থান বা পুরাতন বাড়ী মনে করিয়া ছিলেন। ঋগ্বেদ (১।৩০।৯) ঋকের ‘প্রত্নস্যৌকসঃ’ ব্যাখায় সায়ণাচার্য্য বলেন, “প্রত্নস্য’ পুরাতনস্য ‘ওকসঃ’ স্থানস্য স্বর্গরূপস্য” অর্থাৎ প্রত্নৌক হইতেছে—স্বর্গরূপ পুরাতন স্থান। ঋগ্বেদের ৮।৬৯।১৮ ঋকেও প্রত্নৌকসের উল্লেখ আছে। ইন্দ্র মানুষদিগর সম্রাট্ ও রাজা ছিলেন—‘সম্রাজং চর্ষণীনা মিংদ্রং’ (ঋগ্বেদ ৮।১৬।১), ‘ইন্দ্রো রাজা জগতশ্চর্ষণী নাম্' (ঋগ্বেদ ৭।২৭।৩)। সাম বেদে (৩।২।৯৭) লেখা আছে;—
অপাস্ফেণেন নমুচেঃ শির ইন্দ্রোদবর্ত্তয়ঃ।
বিশ্বায়দজয়স্পৃধঃ॥
হে ইন্দ্র! স্পর্দ্ধাবান্ সমস্ত অসুর জয় করিয়াছ। জলের ফেণার আঘাতে নমুচির মস্তক ছেদন করিয়াছ!
ঐ ঋক্টি ঋগ্বেদের ৮।১৪।১৩ সংখ্যক। আবার ১০ম মণ্ডলের ৬১।৮ ঋকে আছে—“স ঈং বৃষাণ ফেনমস্যদাজৌ” অর্থাৎ ইন্দ্র নমুচির সহিত যুদ্ধকালে তাঁহাকে বধ করিবার নিমিত্ত একখানা ফেণা ছুড়িয়া মারিয়াছিলেন।
সায়ণ, সামবেদে ‘অপাস্ফেণেন’ ইত্যাদি ঋকের ভাষ্যে বলেন,—ইন্দ্র, অসুরদিগকে জয় করিয়া নমুচি অসুরকে ধরিতে পারেন নাই। যুদ্ধ করিতে করিতে ঐ অসুর ইন্দ্রকে ধরিয়া ফেলিল। তখন সে গৃহীত ইন্দ্রকে বলিল,— তুমি যদি রাত্রী বা দিনের বেলায় শুষ্ক ও আর্দ্র আয়ুধ দ্বারা আমাকে না মারিয়া ফেল, তাহা হইলে তোমাকে ছাড়িয়া দিই। তদনন্তর নমুচি, ইন্দ্রকে ছাড়িয়া দিলে ইন্দ্র, দিন ও রাত্রীর সন্ধির সময় শুষ্কও নয় আদ্রও নয় এরূপ ফেণা দ্বারা তাহার মস্তকটি কাটিয়া ফেলিলেন। সামবেদ প্রকাশক স্বর্গীয় সত্যব্রত সামশ্রমী বলিয়া গিয়াছেন—‘শুষ্ক অথচ আদ্র উদক ফেণা কোন্ পদার্থ? তাহা এক্ষণে পদার্থবিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতেরাই বিবেচনা করিয়া দেখিবেন।’ প্রবন্ধান্তরে বলিয়াছি—সামবেদ প্রকাশের ৩১ বৎসর অতীত হইল, কই? কোন পদার্থবিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিত ত বিবেচনা করিলেন না? অতএব এই অবসরে একটি বিবেচনা করিয়া ফেলি। হায়! সামশ্রমী মহাশয়ের জীবনকালে বিবেচনা করিবার অবসর পাই নাই। উদ্যোগ পর্ব্বে আছে, ইন্দ্র, সমুদ্রে না শুষ্ক না আদ্র পর্ব্বতোপম ফেণ দেখিয়া, উহা গ্রহণ করতঃ বৃত্রের উপর নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে হনন করেন। ছেলে বেলা হইতে দেখচি, আমাদের ঘরে একটা জিনিষ আছে, উহা দীর্ঘ ও প্রস্থে, ৯ ও ৫ ইঞ্চি, তিন ধারে ১ নাং ২ ইঞ্চ পুরু এবং একধারে অর্দ্ধ সুতা পাতলা, মধ্যস্থলে খাল, দমে ভারি, বর্ণ সাদা ও মেটে রঙ্গে মিশ্রিত ও স্তরে স্তরে গঠিত। ইহাকে প্রস্তরীভূত ভূগর্ভস্থ অস্থি (Fossil) বলিয়া বোধ হইতেছে। ইহার নাম —‘সুমুদ্দরের ফেণা’। সমুদ্রে পড়িয়া থাকা অবস্থায় এইরূপ ফেণায় জল প্রবিষ্ট না হওয়ায় উহা আদ্রও নহে ও উহার ফাঁকে ফাঁকে ও নিম্ন অংশে জল থাকায় উহা শুষ্কও নহে। অতএব বিবেচনা হয়, ইন্দ্র একটা মস্ত সমুদ্রের ফেণার আঘাতে নমুচি বেচারির মাথাটা খ্যাঁস করিয়া কাটিয়া ফেলিলেন। এইরূপ অন্যায় কার্য্য করায় ইন্দ্রকে পাপগ্রস্থ হইতে হইয়াছিল। সামবেদ সংহিতার ভাষ্যে (৪২। ২) সায়ণ ধৃত ‘শাট্যায়নক ব্রাহ্মণ’এর উক্তি এইরূপ—ইন্দ্র, অসুরদিগকে হনন করিয়া আপনাকে অশুদ্ধ ও অমেধ্য জ্ঞান করেন এবং শুদ্ধি কামনা করিয়া ঋষিদিগকে বলিলে তাঁহারা ‘এতোন্বিদ্রং’[১৬] ইত্যাদি সাম দ্বারা স্তব করেন, তদনন্তর ইন্দ্র শুদ্ধ ও স্পর্শযোগ্য হইলেন। বনপর্ব্বে (৩।৭৫) এবং উদ্যোগ পর্ব্বে (১০—১৬ অঃ) কথিত আছে, দেবরাজ শত্রু ত্রিশিরা[১৭] এবং বৃত্রহননজনিত পাপ দ্বারা অভিভূত হইলে দেব ও ঋষিগণ নহুষকে দেবরাজ্যে অভিষিক্ত করেন।
শত্রু রাজ্যভ্রষ্ট হইয়া কোথায় গেলেন? তিনি হিমবান্ অতিক্রম করিয়া উত্তরপার্শ্বে গমন করেন এবং সমুদ্রের একটি মহাদ্বীপে যে এক বৃহৎসরঃ এবং তাহাতে পদ্মের যে ঝাড় তাহার ডাঁটার ভিতরে লুক্কায়িত হইয়া জর্ম্মাণির সম্রাট্ কৈশরের মত দীনভাবে কালযাপন করেন। পদ্মের নামান্তর—পুষ্কর। শত্রু সম্ভবতঃ বক্ষ্যমান পুষ্করদ্বীপে কৃষ্ণসাগরতীরে পলায়ন করিয়া আত্মগোপন করিয়াছিলেন। ইন্দ্র, ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ৪৮ নাং ৫০ সুক্তের ঋষি। রসাতল অবিষ্কার ঋগ্বেদে ৯।১০১।৭—৯ ঋকের দ্রষ্টারূপে ‘মানব নহুষ’ এবং ১০।৮০।৬ ঋকে নহুষ প্রসিদ্ধ আছেন। আদিপর্ব্ব অনুসারে রাজা নহুষ, চন্দ্রের (অর্থাৎ সোম রাজার) বৃদ্ধ প্রপৌত্র। চন্দ্রের বৃদ্ধ প্রপৌত্র মানব (মনুবংশীয়) হইলেন কিরূপে? মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে বৈবস্বত মনুর কন্যা ইলা, পরে পুরুষ সুদ্যুম্ন হইয়াছিলেন। ইলার (যাহা হইতে ইলাবৃতবর্ষ নামের উৎপত্তি হইয়াছে, মনে করি) প্রপৌত্র নহুষ, অতএব নহুষ, মনুরও বৃদ্ধ প্রপৌত্র ছিলেন; অতএব বেদে তাঁহাকে ‘মানব’ বলা হইয়াছে। নহুষের পুত্র—যযাতি। বনপর্ব্ব ৩।৭৫ ও উদ্যোগপর্ব্ব ১০—১৬ অধ্যায়ে ইঁহার চরিত কীর্ত্তিত আছে। নহুষ দেবরাজ্যে অভিষিক্ত হইয়। প্রথমে ধর্ম্মানুসারে রাজ্য শাসন করেন। ঋগ্বেদে লেখা আছে (১।৩১।১১) দেবগণ অগ্নিকে[১৮] প্রথমে মানব নহুষের মানুষ বিশ্পতি (সেনাপতি) করিয়াছিলেন। কালান্তরে নহুষের মতিগতি অন্যরূপ হইল। তিনি সতী সাধ্বী শচীদেবীকে নিজবশে আনিয়া তাঁহাকে ধর্ম্মচ্যুতা করিবার চেষ্টা করেন, ঋষিদিগকে বাহন করিয়া পাল্কিতে চড়েন এবং তৎপরে অগস্ত্যঋষির মস্তকে পা দেন। এইরূপ অধর্ম্মাচরণ হেতু নহুষ ইন্দ্রত্ব হইতে ভ্রষ্ট হইলেন। এবং শচীপতি[১৯] দেব, মহর্ষি, পিতৃ, যক্ষঃ[২০] ভুজগ, রাক্ষস,[২১] গন্ধর্ব্ব, দেব কন্যা ও অপ্সরোগণের সহায়তায় আবার দেবরাজ্য প্রাপ্ত হইলেন। পূর্ব্বোক্ত স্বাটের বিশক্রোশ ঠিক দক্ষিণে নউশেরো (Noushero)। নহুষের সহিত এই স্থাননামের কোনও সম্পর্ক ছিল বলিয়া বোধ হয়। শুক্রনীতিসারে—
অধর্ম্মাচ্চেব নহুষঃ প্রতিপেদে রসাতলম্।
রাজা নহুষ, অধর্ম্ম হেতু রসাতলে গমন করেন। রসাতল কোথায়? ঋগ্বেদে (১।১১২।১২, ৫।৫৩।৯, ৯।৪৩.৬, ১০।৭৫।৬, ১০।১০৮।১—২ ঋকে) রসা নামক একটি নদী পাইয়াছি। ইহা সিন্ধু-নদীর পশ্চিম পার্শ্বের করদ শাখা নদী। বর্ত্তমান কালে কাবুল নদী (কুভা) পঞ্জশির, কম প্রভৃতি উপনদী মিলিত হইয়া একটি নদীরূপে পূর্ব্ববাহিনী হইয়া সিন্ধু-নদীতে আসিয়া পড়িয়াছে। ইহাকেই রসা বলিয়া অনুমান করিতেছি। রসার অধোভাগে রসা পার হইয়া দক্ষিণস্থ ও দক্ষিণ পশ্চিমস্থ যে দেশ, তাহাই রসাতল। পুরুরবার পঞ্চম পুত্র—বনায়ু। বনায়ু হইতে বনায়ু দেশ ও তাহার রাজধানী বনপুর হইয়াছে। মানচিত্রে ঐ বনপুর অদ্যাপি দৃষ্ট হয়। সুতরাং বনায়ু বলিতে আরব দেশ নয়[২২]। এই বনায়ু আবিষ্কার রাজধানী বনপুর বনপুরের ৯০ মাইল উত্তরে Mt. Nousadir রহিয়াছে। এটি সংস্কৃত নাম নহুষাদ্রির অপভ্রষ্ট। রাজা নহুষ এই অদ্রিতে গিয়া বাস করিয়াছিলেন, তাহাতেই ইহার নাম হইয়াছিল—নহুষাদ্রি। পুরাকালেও রাজারা পর্ব্বতে গিয়া বাস করিতেন— তাহাতেই শুক্রনীতিসারে লিখিত হইয়াছে,—‘ন চিরং পর্ব্বতে বসেৎ’ কেন না, দীর্ঘকাল পর্ব্বতে বাস করিলে, উদরাময় প্রভৃতি কোন কোন রোগ হইবার সম্ভাবনা। নহুষের রসাতলে গমন ও তত্রস্থ কোন পর্ব্বতে বাস হেতু উত্তরকালে তাঁহার অজগর সর্পরূপত্ব ও সেই কল্পনার উপর আরও কল্পনার মাত্রা চড়াইয়া হিমালয়ে রাজর্ষি বৃষপর্বারি আশ্রমের নিকটে, তৎকর্তৃক ভীমসেনকে আক্রমণের কথাও বনপর্ব্বে (১৭৮—১৮১) কল্পনা করিয়া একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ডের অবতারণা করা হইয়াছে। আবার মহাভারতেই অনুশাসন পর্ব্ব ৮১ অধ্যায়ে,—
মান্ধাতা যৌবনাশ্বশ্চ যযাতির্নহুষস্তথা।
গা বৈ দদন্তঃ সততং সহস্রশত সম্মিতাঃ॥
গতঃ পরমকং স্থানং দেবেরপি সুদুর্ল্লভং।
যুবনাশ্বের পুত্র মান্ধাতা, যযাতি ও নহুষ, সতত লক্ষ লক্ষ গরুদান করিয়া দেবতাদেরও দুর্ল্লভ উত্তমস্থানে গিয়াছেন।
শান্তিপর্ব্বে ৮ম অধ্যায়ে নহুষের এই বাক্য ধৃত হইয়াছে,—
আকিঞ্চন্যং মুনীনাঞ্চ ইতি বৈ নহুষোঽব্রবীৎ।
অর্থাৎ ঐশ্বর্য্য ত্যাগ করিয়া দারিদ্রকে বরণ করা মুনিদের ধর্ম্ম।
বিবেচনা হয়, নহুষ কেবল রাজা ছিলেন না, শাস্ত্রকারও ছিলেন। কিন্তু তাঁহার কৃত কোন গ্রন্থ একালে বিদ্যমান নাই।
অনুশাসনপর্ব্বে (১৬৫ অ) প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের মধ্যে নহুষের নাম আছে, যথা,—
নৃগো যযাতির্নহুষো যদুঃপুরুশ্চ বীর্য্যবান্।
সায়ণাচার্য্য সামবেদ উত্তরার্চ্চিক ৩১৮ সূক্তের ভাষ্যে শাট্যায়ন শাখায় উক্ত ইতিহাস অবলম্বন করিয়া বলেন, —অথর্ব্ববংশীয় দধীচি যে সময়ে জীবিত শর্য্যণাবতী আবিষ্কার ছিলেন, সে সময়ে অসুরগণ, তাঁহাকে দেখিয়াই পরাভূত হইত। তিনি স্বর্গত[২৩] হইলে পৃথিবী অসুরদের দ্বারা পূর্ণ হইল। ইন্দ্র, সেই সকল অসুরদের সহিত যুদ্ধ করিতে না পারিয়া সেই ঋষিকে অন্বেষণ করিতে করিতে শুনিলেন তিনি স্বর্গে গমন করিয়াছেন। ইন্দ্র, তত্রত্য লোকদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—ইঁহার কোন পরিশিষ্ট অঙ্গ নাই কি? তাঁহারা বলিলেন,—যে অশ্বদেহ ধারণ করিয়া তিনি অশ্বিদ্বয়কে মধুবিদ্যা উপদেশ করিয়াছিলেন, সেই অশ্বদেহের মস্তক আছে, কিন্তু তাহা কোথায় আছে, জানি না। ইন্দ্র আবার বলিলেন,—অন্বেষণ কর। অন্বেষণকারিগণ, শর্য্যণাবৎতীরে তাহা পাইলেন। “শর্য্যণাদ্বৈ নাম কুরুক্ষেত্রস্য “জঘনার্দ্ধেসরঃ স্যন্দতে”—কুরুক্ষেত্রের (বর্তমান থানেশ্বরের) মধ্যভাগের অর্দ্ধাংশে সরোবর বহমান আছে। “শর্য্যণা নামানি দেশাস্তেষামদূরভবংসরঃ শর্য্যণাবৎ”—শর্য্যণা নামক দেশ সমূহ তাহার অদূরস্থ সরোবর—শর্য্যণাবৎ। দধীচি ঋষির মস্তক ঐস্থানের একটা পর্ব্বতে পড়িয়াছিল, ইন্দ্র তাহার অস্থিসকল দ্বারা বৃত্র নামক অসুরদলকে হনন করিয়াছিলেন। যাঁহারা আপনাদের শাস্ত্রে সপ্তসিন্ধুকে—‘হপ্তহেন্দু’, সরস্বতীকে—‘হরখইতি’, সরযুকে—‘হরযু’ লিখিয়াছেন, তাঁহারা (পারসিকেরা) ঐ শর্য্যণাকে হর্য্যণা বলিতেন। উত্তরকালীন ব্রাহ্মণে ও মহাভারতে এই দেশের উল্লেখ না থাকায় উহা হর্য্যণা নামেই উচ্চারিত হইত। কালান্তরে হর্য্যণা নাম আরও বিকৃত হইয়া হরিয়ানা হইল।
১৩৮৪ বিক্রমার্ক সংবতে ‘ইন্দ্রপ্রস্থ প্রতিগণে’ (পরগণায়) ‘গ্রামে সারবলে’ আগরবাল বণিক্ভ্রাতৃদ্বয়ের একটি কূপ খানিত হয়। ঐ কূপের প্রস্তর-প্রশস্তির একটি শ্লোক এই,—
দেশোঽস্তিহরিয়ানাথ্যঃ পৃথিব্যাং স্বর্গসন্নিভঃ।
ঢিল্লিকাখ্যা পুরী তত্র তোমরৈরস্তি নির্ম্মিতা॥
এই পৃথিবীতে হরিয়ানা নামক একটি স্বর্গতুল্য দেশ আছে। সেই দেশে তোমররাজগণ কর্ত্তৃক নির্ম্মিত ঢিল্লিকা (দিল্লী) নামক পুরী আছে।
ঐ প্রশস্তি প্রথমে এ, সো, জর্ণালে ও তৎপরে ইপিগ্রাফিয়া ইণ্ডিকায় প্রকাশিত হয়। এ, সো, জর্ণালে প্রকাশিত হওয়ার বহুপূর্ব্বে জনৈক ইংরাজ লেখক নিজ গ্রন্থে হরিয়ানাকে শোধিত করিয়া হিরণ্য (Hiranya) করিয়াছেন। ঐরূপ বানান ভ্রান্তিমূলক সন্দেহ নাই।
সামবেদ উত্তরার্চ্চিক ৪।২।১১ সূক্তে শর্য্যণাবৎ, আর্জীক, কৃত্ব, পস্ত্য ও পঞ্চজন এই পঞ্চদেশ সোমলতার উৎপত্তিস্থান কথিত হইয়াছে।
অগ্রে সায়ণাচার্য্য ধৃত শ্রুতিপ্রমাণে বলিয়াছি, কশ্যপ সুমেরুপর্ব্বতকে ত্যাগ করেন না। কশ্যপ ঋগ্বেদের ৯ম মণ্ডলের ১১৩ সূক্তের ঋষি। ঐ সূক্তের প্রথম ঋকে শর্য্যণাবতের ও তথাকার সোমের উল্লেখ দৃষ্টে বোধ হইতেছে, শর্য্যণাবৎ দেশ ও তদ্দেশ জাত সোম সুমেরুবাসী কশ্যপের অজ্ঞাত ছিল না। স্বর্গীয় তারানাথ তর্কবাচস্পতি, কশ্যপের ব্যুৎপত্তি করিয়াছেন,—কশ্যং মদ্যং পিবতি পা—ক। অতএব বলিতে হয়, কশ্যপ যে সে মদ্য পান করিতেন না, তিনি পূর্ব্বোক্ত শর্য্যণাবৎ হইতে সোমলতা আনয়ন করিয়া তাহাতে যে মদ্য প্রস্তুত হইত, তাহাই খাইতেন।
রাজতরঙ্গিণীকর্ত্তা কহ্লণ পণ্ডিতের কথা যদি বিশ্বাস করা যায়, তাহা হইলে বলিতে হয় হিমাদ্রির কুক্ষিতে অতি প্রাচীনকাল হইতে যে একটি জলপূর্ণ সরঃ ছিল, কশ্যপ উহার জল নিকাশ করিয়া দিয়া ঐ সরোভূমিতে কশ্মীর মণ্ডল নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন।
বণিক্ অতি প্রাচীন জাতি। যখন ভারতে বর্ণবিভাগ হয় নাই, তখনও নানা স্থানে ও ভারতের বহির্ভূত দেশেও তাঁহাদের বাস ছিল। ঋগ্বেদে এই পণী বা বণিক্ ও পুষ্করদ্বীপে দ্যৌস্পিতা বণিকৃগণ, পণিন্ নামে প্রসিদ্ধ আছেন। পণ ধাতু হইতে পণিন্, বণিক্, বণিজ, বণিজ্, ও বাণিজ শব্দের উৎপত্তি। পণ ধাতুর অর্থ—ক্রয় ও বিক্রয়। গঙ্গার উন্নত কূলে বৃবু নামক পণীদের এক অধিপতি বাস করিতেন। ঋগ্বেদে (৬।৪৫।৩১—৩৩) সংযুবার্হস্পত্য ঋষি বলিয়াছেন—পণীদের অধিপতি বৃবু, তাঁহাকে সহস্র ধেনু দিয়াছিলেন। অগ্রে বলিয়াছি—বর্ত্তমান আফঘানিস্থানে সিন্ধু নদীর রসা নামক যে শাখা নদী আছে, তাহার দক্ষিণে বা অধোভাগে যে দেশ, তাহাই রসাতল। ঋগ্বেদ (১০।১০৮) হইতে জানা যায়, রসানদীর ওপারে যে সকল পণীদের বাস ছিল, তাঁহাদের অধিকারে বিস্তর গাভী ছিল। ইন্দ্র, গাভীপ্রাপ্তির আশায় সরমা দেবশুনীকে দূতী করিয়া তাঁহাদের নিকট পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। পণিগণ, বিস্মিত হইয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন—‘তুমি রসানদীর জল কি করিয়া পার হইলে?’ সরমা উত্তর দিয়াছিলেন—‘জল আমাকে রক্ষা করিয়াছে, পাছে আমি তাহাকে উল্লঙ্ঘন করিয়া চলিয়া যাই।’ অতএব অনুমান হয়, সরমা নৌকার অভাবে কুক্কুরীর মত সাঁতরাইয়া রসা পার হন, তাহাতেই তাঁহার দেবশুনী অর্থাৎ দেবতাদের কুক্কুরী নাম হয়। ঋক্সংহিতায় বাবিলনের নাম—বম্রী এবং বভেরু জাতক নামক বৌদ্ধ শাস্ত্রে—‘বভেরু’। পণিগণ বাবিলন, মিতনি (উত্তর মেসোপোটেমিয়া) এসিয়া মাইনর প্রভৃতি দেশে গিয়া রাজত্ব করেন। ইহারা বৈদিক ভাষাভাষী ছিলেন। মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র, ও নাসত্য ইঁহাদের উপাস্য দেবতা ছিলেন। আর্ত্তসুবর ও আর্ত্ততম প্রভৃতি মিতনিপতির নাম আবিষ্কৃত হইয়াছে। ১৬০০ খৃষ্ট পূর্ব্বাব্দে ইঁহারা রাজত্ব করিয়াছিলেন। যাজ্ঞাবল্ক্যের সমসাময়িক আর্ত্তভাগ নাম হইতে বিবেচনা হয়, আর্ত্তসুবর ও আর্ত্ততম ভারত বা ভারতের প্রান্ত হইতে ঐ দেশে গিয়াছেন। ভারতের আদি বণিক্, পণিজাতি হইতে চারিসহস্র বৎসর পূর্ব্বে এসিয়া মাইনরে বেদোক্ত দেবপূজা ও ভারতীয় সভ্যতা প্রচলিত হইয়াছে নির্ণীত হইয়াছে।
পণিগণ, পাশ্চাত্য ভূখণ্ডে (সিরিয়ায়) গিয়া ফিনিসিয়ান, ফোনিক্ প্রভৃতি নামে খ্যাত হন এবং তাঁহাদের বাসভূমির নাম হয় ফিনিসিয়া। মান চিত্রে দেখিয়াছি ঐ দেশে বাণিয় (Bania) নামে একটি পুর অদ্যাপি বর্ত্তমান আছে, কিন্তু কেহই তাহা লক্ষ্য করেন নাই। বণিক্, বণিজ ও বাণিজ শব্দ প্রাক্কতে বণিয় ও বাণিয় হয়, অতএব বিবেচনা হয়, পণিগণ, ঐ দেশে গিয়া যে স্থানে প্রথমে বাস করেন, সেই স্থান বাণিয় নাম পাইয়াছে। উদাহরণ, জৈন শাস্ত্রে বৈশালীর নামান্তর বাণিয়গাম। ঢাকা জেলায় বাণিয় নামে একটি গ্রাম আছে। পণিগণ, ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ১০৮ সূক্তের ঋষি।
ভট্ট মোক্ষমূলর বলিয়াছেন—“খৃষ্টীয় ঊনবিংশ শতকের মানব জাতির ইতিহাসের মহৎ আবিষ্কার সংস্কৃত দ্যৌস্পিতর = গ্রীক্, জিউস্ পেতর্ = লাটিন, জুপিটর, প্রাচীন নর্স, টাইর”। দ্যোস্পিতর্ কোন দেবতা? ঋগ্বেদে (১।১৬৪।৩২) —
দ্যৌর্মে পিতা জনিতা নাভিরত্র বন্ধুর্মে মাতা পৃথিবী মহীয়ং।
আকাশ আমার পালক ও জনক, ভুবনের নাভি স্বরূপ যজ্ঞ (‘যজ্ঞো ভুবনস্য নাভিঃ’ ৩৪ ঋক্) আমার বন্ধু ও বিস্তীর্ণা পৃথিবী আমার মাতা।
ঋগ্বেদে (১।১৯১।৬)—
দ্যৌর্ব পিতা পৃথিবী মাতা সোমো ভ্রাতাদিতিঃ স্বসা।
আকাশ তোমাদের পালক, পৃথিবী মাতা, সোম ভ্রাতা, অদিতি ভগিনী।
১।১৬৪।৩৫ ঋকে, —
“ব্রহ্মায়ং বাচঃ পরমং ব্যোম”
এই ব্রহ্মা (ঋত্বিক্) বাক্যের পরম স্থান (রমেশচন্দ্র দত্ত)। আমি উহার এইরূপ অর্থ করিতে সাহসী হইয়াছি, —বাক্যের আদি স্থান বা শব্দগুণ বিশিষ্ট এই আকাশ হইতেছেন—ব্রহ্মা।
দিব্ শব্দ প্রথমার এক বচনে দ্যৌঃ, আর দিব্ ধাতু হইতে নিষ্পন্ন শব্দ— দ্যুঃ। দ্যুর অর্থান্তর—অগ্নি ও সূর্য্য। অগ্নিকে ব্রহ্মা বলে। পৃথিবীতে যিনি অগ্নি, অন্তরীক্ষে তিনিই সূর্য্য। আকাশ, অগ্নি বা সূর্য্যের মেলনে পৌরাণিক ব্রহ্মার উৎপত্তি। বিষ্ণু পুরাণে (২৪।৬)—
তস্মিন্নিবসতি ব্রহ্মা পুজ্যমানঃ সুরাসুরৈঃ।
সেই পুষ্কর দ্বীপে সুরাসুর বন্দিত ব্রহ্মা বসতি করিতেছেন। ঐ ব্রহ্মা হইতেছেন—দৌস্পিতা বা জুপিটর। সিরিয়া দেশে বালবেক নামক একটি বহু প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ আছে, তন্মধ্যে জুপিটারের মন্দিরের ধ্বংসাবশিষ্ট মণ্ডলাকারে নির্ম্মিত স্তম্ভশ্রেণী অদ্যাপি দণ্ডায়মান আছে। সিরিয়া, পুষ্কর দ্বীপেরই অন্তর্গত। পুষ্কর অর্থে—পদ্ম। সকলেই জানেন ব্রহ্মা পদ্মযোনি। ব্রহ্মা, জুপিটাররূপে ঐ দেশে প্রাদুর্ভূত হওয়ায়, তাঁহার পদ্মযোনি নাম হইয়াছে কি না বিবেচ্য। সূর্য্য ও ব্রহ্মা, তাহাতেই সূর্যোদয়ের কালকে ব্রাহ্ম মুহূর্ত্ত বলে।
বেদআলোচনাকর্ত্তা পণ্ডিতদের মতে ব্রহ্মা বৈদিক দেবতা নহেন, শিব ও বৈদিক দেবতা নহেন, উত্তর কালে হিন্দুদের দেবগণের মধ্যে স্থান পাইয়াছেন। ঋগ্বেদের ৭.৩৫ সূক্তে ইংদ্র, অগ্নি, বরুণ, সোম, পূষা, ভগ, নরাশংস, পুরংধি, ঘন, উত্তম যমযুক্ত সত্যের (বচন), অর্যমা,, ধাতা, ধর্তা উরূচী (পৃথিবী), স্বধা (অন্ন), রোদসী (দ্যাবাপৃথিবী), অদ্রি প্রভৃতি বিশ্বদেবগণের নিকট শান্তি প্রার্থনা করা হইয়াছে। ঐ সূক্তের দশমী ঋক্ এই,—
শংনঃ দেবঃ সবিতা ত্রায়মাণঃ শংনো ভবং ত্তূধসো বিভাতীঃ।
শংনো পর্জন্যো ভবতু প্রজাভ্যঃ শংনঃ ক্ষেত্রস্য পতিরস্তু শংভুঃ॥
সবিতাদেব, ত্রাণকর্ত্তা হইয়া আমাদের শান্তি দিন্, বিভাবতী উষাগণ আমাদিগকে শান্তি দিন, পর্জন্য আমাদের প্রজাদিগকে শান্তি দিন। ক্ষেত্রপতি শংভু, আমাদিগকে শান্তি দিন।
যজুর্বেদের রুদ্রাধ্যায়ে, এই শংভু রুদ্র, গিরিশন্ত, গিরিত্র, গিরিশ, নীলগ্রীব, কপর্দ্দী, সহস্রাক্ষ, বিলোহিত প্রভৃতি নাম পাইয়াছেন। রুদ্র ও সূর্য্যে ভেদ নাই। যিনি সূর্য্য তিনিই রুদ্র, এই হেতু তাঁহার আলোককে রৌদ্র বলে।
ঋগ্বেদ ১।৪৩।১ ঋকের রুদ্র শব্দের টীকায় রুদ্র ও অগ্নির অভিন্নত্ব দেখাইয়া রমেশচন্দ্র দত্ত লিখিয়াছেন—“রুদ্রের একটি নাম ‘ভব’ বেদে স্থানে স্থানে পাওয়া যায়। Max Muller স্থির করিয়াছেন—গ্রীদের সূর্য্যদেব Phœbus এই ‘ভবের’ রূপান্তর মাত্র।”
ঋগ্বেদের যে সকল ঋষি পণীদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ করিয়াছেন, অগস্ত্য তাঁহাদের অন্যতম। ইনিই পুরাণের সমুদ্রপানকর্ত্তা অগস্ত্য। সমুদ্র পান অগস্তের সমুদ্র পান। করা অসম্ভব ও আলৌকিক ব্যাপার নহ—সকলেই তাহা পারেন। সমুদ্র কি? ‘সমুদ্ দ্রবন্তি যস্মাদ্রসাঃ স সমুদ্রঃ’ ‘সমুন্দনঃ যস্মাৎ সমুদ্রবন্তি’ ইতি চ সায়ণঃ। সামবেদে অনেক স্থানে সোমকে সমুদ্র বলিয়া স্তুতি করা হইয়াছে, অতএব বিবেচনা হয়, অগস্ত্য সর্ব্বদা দেবভোগ্য সোমরস পান করিতেন, তাহাতেই তৎকর্ত্তৃক সমুদ্র পান করার প্রবাদের উৎপত্তি হইরাছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা জানেন, আদিম আর্য্যগণ উপাস্যদিগকে অসুর ও দেব বলিতেন, এ নিমিত্ত ইন্দ্র ও বরুণ প্রভৃতি উপাস্যগণ ঋগ্বেদের অনেক ঋকে হিন্দু ও ইরাণীয় আর্য্য। কখনও দেব কখনও বা অসুর বলিয়া সম্বোধিত হইয়াছেন, আবার অনেক ঋকে তাঁহাদের উপাসকদিগকে দেব বলা হইয়াছে। অপরন্তু আরও অনেক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি মৃত্যুর পর দেবত্ব ও অসুরত্ব প্রাপ্ত হইয়া দেব ও অসুর নামে অর্চ্চিত হইয়াছেন। উদাহরণ —ঋগ্বেদে বিবস্বন্ নামে এক মনু প্রসিদ্ধ আছেন। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহাকে সূর্য্য বা সবিতা হইতে অভিন্ন কল্পনা করিয়া তাঁহাকে দেব করা হইয়াছে। ইন্দ্রের বজ্রনির্মাণকর্ত্তা ত্বষ্টা এক সময়ে সশরীরে ধরাতলে বর্ত্তমান ছিলেন। ইনিই পুরাণের বিশ্বকর্ম্মা। ত্বষ্টা নিজ দুহিতা (সরণ্যু)র বিবস্বানের সহিত বিবাহ দেন—এই বিবাহে বিশ্বভুবন সমাগত হইয়াছিল। সরণ্যুর গর্ভে বিবস্বানের যম ও যমী নামে যমজ পুত্র ও পুত্রী জন্মে। যমী বৈবস্বতী ও যম বৈবস্বত ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ১০ম সূক্তের ঋষি। যম মৃত্যুর পর, দেবত্ব প্রাপ্ত হইয়া পরলোকের রাজা হইলেন। ঋগ্বেদের যমপুরীতে পূণ্যাত্মা লোক যাইয়া সুখে বাস করে। ঐ মণ্ডলের ১৪।১ ঋকে যমকে ‘যমং রাজানং’ বলা হইয়াছে। এই যম ইরাণীদের অবেস্ত শাস্ত্রে যিম। যিম আদি রাজা, ইনি অহুর মজদের আদেশ অনুসারে এক নূতন জগৎ সৃষ্টি করেন। পুণ্যবান্ লোক তাঁহার দর্শন পায় ও সুখে বাস করে।
সপ্তসিন্ধু-দেশবাসী আর্য্যগণ, একই প্রকার ধর্ম অবলম্বন করিয়া চলিয়াছিলেন। ক্রমে ইঁহাদের মধ্যে দলাদলি ও বিবাদ আরম্ভ হইল। এক পক্ষ উপাস্যদিগকে দেব নামে পূজা করিতে লাগিলেন ও অসুরদিগকে নিন্দা করিতে লাগিলেন। প্রতিপক্ষগণ নিজেদের উপাস্থ্যদিগকে অসুর নামে পূজা করিতে লাগিলেন ও দেবগণকে কটূক্তি করিতে লাগিলেন। এই বিবাদের ফলে দেবাসুরের যুদ্ধ হইল। অসুর অর্থাৎ অসুর উপাসকগণ যুদ্ধে পরাজিত হইয়া সপ্তসিন্ধুদেশ ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। তাঁহারা কোন পথে কোথায় গেলেন? তাঁহারা চলিয়া গেলে পরুচ্ছেপ দৈবোদাসি ঋষি বলিতেছেন (ঋগ্বেদ ১।১৩৩।১) —
উভে পুনামি রোদসী ঋতেব, দ্রুহোদহামি সংমহীরনিংদ্রাঃ।
অভিব্লগ্য যত্র হতা অমিত্রা, বৈলস্থানং পরিতৃড়হা অশেরন্॥
হে ইন্দ্র! যজ্ঞদ্বারা আকাশ ও পৃথিবী উভয়কে পবিত্র করিতেছি। মহীতলকে পোড়াইয়া ফেলিতেছি। প্রতিহত শত্রুগণ, বৈলস্থানে গিয়া যথায় পিপাসায় কাতর হইয়া শুইয়া পড়িয়াছে। দ্বিতীয়া ঋক,—
অভিব্লগ্যাচিদাদ্রিবঃ শীর্ষা যাতুমতীনাং।
ছিংধি বটুরিণা পদা মহা বটুরিণা পদা॥
হে ইন্দ্র! তথায় যাইয়া ঐ দুর্মতি অমিত্রদিগের জ্ঞানহীন মস্তক গুলা, তোমার বিশাল চরণ দ্বারা, মহা বিশাল চরণ দ্বারা ছেদন কর। তৃতীয়া ঋক্,—
অবাসাং মঘবঞ্জহি শর্ধো যাতুমতীনাং।
বৈল স্থানকে অর্মকে মহা বৈলন্থে অর্মকে॥
উল্লিখিত তিনটি মৎকৃত বঙ্গানুবাদ বিবিধ বিদ্যাবিশারদ স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্তের বঙ্গানুবাদের সহিত মিলাইয়া দেখিবেন। বাহুল্য ভয়ে আমি তাঁহার কৃত অনুবাদ এখানে উদ্ধৃত করিতে পারিলাম না। তিনি সায়ণ ভাষ্যের অনুসরণ করিয়া অনুবাদ করিয়াছেন সন্দেহ নাই। তাঁহার ঋগ্বেদের বঙ্গানুবাদের স্থানে স্থানে Max Muller প্রভৃতি নয় জন ইউরোপীয় মনীষীর এবং এ দেশের কোন কোন মনীষীর মত উদ্ধৃত দেখা যায়। অতএব বুঝা যাইতেছে, তিনি অনুবাদের সময় ঐ সকল মনীষীদিগের মতও বিবেচনা করিয়াছেন। রমেশ চন্দ্র, প্রথম ঋকের ‘বৈলস্থান’ অর্থে ‘শ্মশান’ ও তৃতীয় ঋকের ‘বৈলস্থান অর্মক’ অর্থে ‘কুৎসিত শ্মশান’ ও ‘মহা শ্মশান’ লিখিয়াছেন। ঐরূপ অর্থ সায়ণ সম্মত হইলেও অসঙ্গত ও ভ্রান্ত একথা বলিতে সাহসী হইয়া প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করিতেছি।
বৈলস্থান কি? বিল—গুহা। বিল যাহার উৎপত্তি স্থান, তাহাকেও বিল বলে। উহার অর্থ—উত্তম ঘোটক। বাজিনো বিলযোনয়ঃ ইতি বৈলস্থান, অর্ম্মক ও অবাসার আবিষ্কার। কালিদাসঃ। সেই বিল অর্থাৎ অশ্বোৎপত্তি স্থান যে দেশে আছে, তাহা বৈলস্থান। এ কালে বৈলস্থানের নাম হইয়াছে বেলেচুস্থান। প্রাচীন কালে অর্মক, বৈলস্থানের অন্তর্গত ছিল। তখন বৈলস্থান পশ্চিম দিকে অহিশির নদী পর্য্যন্ত এবং পারস্য উপসাগরের ব্যবধানে আরবদেশের কাছাকাছি বিস্তৃত ছিল। ‘অমর্ক’ বর্ত্তমানে অর্মজ প্রণালীস্থিত—অর্মজ দ্বীপ। ‘অবাসা’র বর্ত্তমান নাম—বন্দর অর্বাস। বিবেচনা হয়, অসুর উপাসক ইরাণীয়গণ, সপ্তসিন্ধুদেশ হইতে অপসৃত হইয়া জলপথে ঐ ঐ স্থানে গিয়া বাস করেন। কার্মন্, অমর্জ দ্বীপ ও বন্দর অবাসি অঞ্চল হইতে ১৮০ মাইল উত্তরে সংস্থিত। এখানে এখনও উহাদের বাস আছে। জানিনা রসাতলের পার্শ্বে গিয়া ইহাদের পার্শ্বিক ও তাহা হইতে পারসিক নাম হইয়াছে কিনা। ভীষ্মপর্ব হইতে জানি যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইঁহাদের একগণ, হূর্ণদিগের সহিত আসিয়াছিলেন। জানি না বাণরাজা ঐ ঐ সঙ্গে আসিয়াছিলেন কি না। শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধ, বাণরাজার কন্যা ঊষাকে হরণ করেন। বাণরাজার রাজধানী শোণিতপুর, গাড়বাল প্রদেশে বর্ত্তমান আছে। তাম্রশাসন হইতে জানা যায়, সহস্রাধিক বর্ষ পূর্ব্বে বাণবংশীয় ৮ জন রাজা দক্ষিণাপথে রাজত্ব করিয়াছিলেন। এই রাজাদের মধ্যে এক জনের নাম—“বাণ বিদ্যাধর”। দক্ষিণা পথের অচিন্ত্যবিহার। (Cave Temples of Ajanta) একটা প্রাচীন বৌদ্ধ কীর্ত্তি। ইহার দেওয়ালে যে চিত্র আছে, তদ্দৃষ্টে জানা যায়, কোন পারসিক রাজের দূতগণ, কোন হিন্দুরাজার সভায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। মুসলমানেরা যখন পারস্যদেশ অধিকার করেন, তখন একদল পারসিক, কার্মন্ হইতে পলায়ন করিয়া গুজরাট্ দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁহাদের বংশধরেরা বোম্বাই প্রভৃতি নগরে বাণিজ্যব্যবসায় দ্বারা ঋদ্ধিমান্ হইয়া বাস করিতেছেন।
সীরা নদী। অগ্রে অহিশির নদীর উল্লেখ করিয়াছি। আমার মনে হয় ইহাই ঋগ্বেদের সীরা নদী। ১।১৭৪।৯ ঋক্ এই,—
ত্বং ধুনিরিংদ্র ধুনিমতীঋর্ণোরপসীরান স্রবংতীঃ।
প্র-যৎসমুদ্রগতি শূর পর্ষিপারয়া তুর্ব্বশং যদুং স্বস্তি॥
হে শত্রুকম্পন ইন্দ্র! তুমি তরঙ্গবতী সীরানদীর জল চালাইয়া সমুদ্রকে বাড়াইয়াছিলে। হে শূর! তুমি যদু ও তুর্ব্বসের শুভকামনায় তাঁহাদের রক্ষার্থ স্নেহ করিয়াছিলে।
ঋগ্বেদে ১।৩২।১নাং ৫ ঋকে ‘অহি’ প্রসিদ্ধ আছেন। সারণ অহিকে মেঘ বলিয়াছেন। রথ (Roth) ও মুর (Muir) ও অহিকে মেঘ বলিয়াছেন। ঐ মতের অনুসরণ করিয়া রমেশ চন্দ্র দত্তও অহিকে মেঘ বলিয়াছেন। সম্প্রতি শ্রীযুক্ত এ, বি সেন, এম, এ, বলিয়াছেন,—“ঋগ্বেদ অনুসারে অহি দনু পুত্র এবং অবেস্ত শাস্ত্র অনুসারে দনুপুত্রগণ তুরাণীয়। জেন্দ অবেস্ত ও শতপথ ব্রাহ্মণে অহি বাবিলনের অধিবাসী কথিত হইয়াছেন, ইনি একজন প্রাচীন কালের রাজা ছিলেন। আসিরিয়া ও বাবিলনের রাজাদের মধ্যে যে তিনটি রাজার নাম আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাঁহাদের নামান্তে অহি আছে। যথা—“Assur—nadin Ahi i, Assur nadin Ahi ii, Mero dach nadin Ahi.’ অতএব বেদোক্ত অহি যে মেঘ নয়, শরীরধারী মানুষ ছিলেন, তাহা স্থির, Assur ও অসুর, ভিন্ন বোধ হয় না। ঐ দেশে অসুর (‘Ashur’) নামক স্থান অদ্যাপি বর্ত্তমান, উহা নিনিভার নিকটস্থ। ঋক্ সংহিতার দাস অহি, অবেস্ত শাস্ত্রে অজি দহাক (Azi Dahāka)। হয় ত, ইন্দ্র, সীরা নদীর তীরে অহির শিরশ্ছেদন করিয়াছিলেন, তাহতেই উহার নাম হইয়াছে অহিশির। মানচিত্রে উহার বানান ‘Ahi Shir’। ঋগ্বেদের ১।৩২।১ নাং ৫ ঋকে ইন্দ্র কর্ত্তৃক বৃত্র বা অহিকে হনন করা ও পর্ব্বত ভেদ করিয়া নদী প্রবাহিত ও সমুদ্র অভিমুখে জল চালাইয়া দেওয়ার কথা আছে। অহি—অনেক। ইন্দ্র অহিদের মধ্যে প্রথম জাতকে হনন করেন। হয় ত অন্যান্য অহি, এই স্থান হইতে বাবিলনে গিয়া রাজা হইয়াছিলেন। ৩।৩২।১১ ঋকেও ইন্দ্র কর্ত্তৃক অহি হননের উল্লেখ আছে। অগ্রে মহাভারতের প্রমাণে বলিয়াছি, ইন্দ্র, সমুদ্রে না শুষ্ক না আদ্র পর্ব্বতোপম ফেণ দেখিয়া উহা গ্রহণ করতঃ বৃত্রের উপর নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে হনন করেন। বৃত্র ও অহি একই ব্যক্তি। ইন্দ্র, পারস্য উপসাগরে সমুদ্রের ফেণা পাইয়া অহিশির ও সমুদ্র সঙ্গম স্থলে বৃত্র বা অহিকে হনন করিয়াছিলেন। হয় ত বৃত্রাসুরের পূর্ণ নাম ছিল—বুত্র নদীন অহি।
রমেশ চন্দ্র দত্ত লিখিয়াছেন—‘ইন্দ্র শুষ্ণকে হনন করিলেন, অর্থাৎ অনাবৃষ্টি প্রতিরোধ করিয়া বৃষ্টিদান করিলেন। বৃত্র, অহি, শুষ্ণ, নমুচি, পিপ্রু, শম্বর, কুষব, বর্চ্চী, অর্ব্বদ প্রভৃতি দনুপুত্রদিগের সহিত ইন্দ্রের যুদ্ধের এই আদিম অর্থ।‘ ঐরূপ অর্থ সঙ্গত বোধ হয় না, বৃত্রাদি সকলেই শরীরধারী ছিলেন। হরিবংশপর্ব্ব অনুসারে নমুচির রথের পতাকায় শার্দ্দূল চিহ্ন ছিল। শম্বরের রথ ক্রৌঞ্চধ্বজ ছিল। প্রহ্লাদের নাম সকলেই শুনিয়াছেন, তিনি তালধ্বজ ছিলেন অর্থাৎ তাঁহার রথের পতাকায় তালফল বা তালগাছ অঙ্কিত ছিল।
পুস্কর দ্বীপ ও গোলক আবিস্কার। পিজবনের পুত্র সুদাঃ রাজা ছিলেন। পিজবনের নামান্তর দিবোদাস। পূর্ব্বোক্ত পরুচ্ছেপ দৈবোদাসি, ইঁহারই সন্তান। ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় ব্রাহ্মণে—
এত মুহৈব প্রোবাচ বসিষ্ঠঃ সুদামে পৈজবনায়।
বসিষ্ঠ ঋষি, এই ভক্ষ (ও তাহার গুণ) পিঞ্জবনের পুত্র সুদাঃকে বলিয়াছিলন।
নিরুক্ত নামক বেদাঙ্গে—
বিশ্বামিত্র ঋষিঃ সুদাসঃ পৈজবনস্য পুরোহিতঃ।
বিশ্বামিত্র ঋষি, পিজবনের পুত্র সুদাঃর পুরোহিত।
ঐতরেয় ব্রাহ্মণে,—
এতেন হবা ঐস্ত্রেণ মহাভিষেকেণ বসিষ্ঠঃ সুদাসং
পৈজবন মভিষিষেচ তস্মাদ্ সুদাঃ পৈজবনঃ সমন্তং
সর্ব্বতঃ পৃথিবীং জয়ন্ পরীয়ায়াশ্বেন চ মেধ্যেনেজে
নঃ কিঃ সুদাসো রথং পর্যাস ন রীরম।
ইন্দ্রো যস্যাবিতা যস্য মরুতো গমস গোমতিব্রজে॥
সুদার রথ কেহ উল্টাইয়া দিতে পারে না, রোধ করিতে পারে না—ইন্দ্র ও মরুৎগণ যাঁহার রক্ষক, সেই সুদাঃ গোমান্ব্রজে গমন করিয়াছিলেন।
ঐ গোমান্ব্রজ কোথায়? দেখা যাউক, ঋগ্বেদে (৬।৪৭।২)—
দিবে দিবে সদৃশীমন্যমর্ধ কৃষ্ণাঅসেধসদ্মনোজাঃ।
অহন্দাসা বৃষভোবস্নয়ংতোদব্রজে বর্চিনংশংবরং চ॥
ইন্দ্র, পৃথিবীর যে অর্দ্ধে আমাদের বাস, সেই পৃথিবীর অপর অর্দ্ধ আক্রমণ করিয়া, দিনে দিনে সমান অর্থাৎ জোয়ার ভাঁটা যাহার নাই, সেই কৃষ্ণসমুদ্রের জলরাশিকে অল্প দূরে রাখিয়া উদব্রজে অর্থাৎ জনসন্নিহিতব্রজে বর্চি ও শম্বর নামক দুই ধনার্থী দাসকে সংহার করিয়াছিলেন।
সায়ন, দাস শব্দের অর্থ করিয়াছেন—দাসয়ন্তি উপক্ষয়ন্তীতি দাসা উপক্ষয়িতারঃ শত্রবঃ। দেখা গেল, কৃষ্ণসাগরের জলের হ্রাস বৃদ্ধি নাই, আর পুরাণোক্ত পুষ্করদ্বীপের সাগর সকলের (কৃষ্ণসাগর, বনহ্রদ, বারুণহ্রদ) জলের হ্রাস বৃদ্ধি নাই। বিষ্ণুপুরাণে—
পয়াংসি সর্ব্বদা সর্ব্ব সমুদ্রেষু সমানি বৈ।
ন্যূনাতিরিক্ততা তেষাং কদাচিন্নৈব জায়তে॥
(এখানকার) সকল সমুদ্রের জল সর্ব্বদা সমান থাকে, কখনও জলের ন্যূনতা ও অতিরিক্ততা হয় না।
বেদোক্ত ‘গোমব্রিজ’ ও ‘উদব্রজ’ পুষ্করদ্বীপেই আছে। ইন্দ্র, বর্চি ও শম্বরকে বধ করিয়া সুদাঃর নিমিত্ত এই লোক অর্থাৎ জনপদ করিয়াছিলেন। (৭|২০।২)—
কর্ত্তাসুদাসে অহ বা উ লোকং
সুদা পৈজবন, ঋগ্বেদ ১০ম মণ্ডলের ১৩৩শ সূক্তের ঋষি।
ঋগ্বেদে ৮।৯৬ সূক্তে দেখিতে পাই, ইন্দ্র, অংশুমতী-নদীতীরে দশসহস্রসৈন্যাধিপ কৃষ্ণনামক এক ব্যক্তিকে দেখিতে পান এবং বৃহস্পতির[২৪] সাহায্যে মরুদ্গণের সহিত দ্রুত গমন করিয়া চীৎকারকারী কৃষ্ণকে ও তাহার সৈন্যদলকে বধ করেন। সায়ণ, কৃষ্ণকে অসুর ও রমেশচন্দ্র অনার্য্য যোদ্ধা বলিয়াছেন। সত্যব্রত সামশ্রমী, কৃষ্ণকে কৃষ্ণবর্ণ মেঘ ও অংশুমতীনদীকে অন্তরীক্ষস্থ কিরণপ্রবাহ, ইন্দ্রকে মেঘবর্ষণ তেজ বিশেষ ও মরুৎগণকে বৃষ্টিবর্ষণকারী বায়ু বুঝিয়াছেন। আমার মনে হয়, অংশুমতীর বর্তমান নাম—ইউফ্রেটিস্।
বৌদ্ধশাস্ত্রানুসারে বৌদ্ধদের বিদিত পৃথিবী চারি খণ্ডে বিভক্ত, যথা—উত্তর কুরুদ্বীপ, পূর্ব্ববিদেহ, গোধন্য (বা অপর গৌড়) এবং জম্বুদ্বীপ। পূর্ব্বোক্ত বৈদিক, ‘গোমান্ব্রজ’ ‘উদব্রজ’ সুদাঃর নিমিত্ত কৃত ‘লোক’ আর বৌদ্ধদের গোধন্য অভিন্ন। বিবেচনা হয়, সুদাঃ, গোমান্ব্রজ ইত্যাদি নামে নামিত কৃষ্ণসাগরের কিঞ্চিৎ দক্ষিণস্থ দেশে উত্তর ইউফ্রেটিস নদীর সন্নিকটে পৈজবনপুর যাহা নিবেশিত করেন, তাহাই অধুনা পিজবন (Pizvan) নামে খ্যাত আছে, বনপর্ব্বে এই গোমান্ব্রজ ইত্যাদি নামে কথিত দেশের নাম—“গবাং লোক” বা গোলোক, যথা—
গবাংলোকং প্রাপ্যতে পুণ্যগন্ধং
পশ্যন্তিদেবং পরমঞ্চাপি সত্যম্।
(যাঁহারা এইরূপ তপস্যা করেন) তাঁহারা পুণ্যগন্ধ গোলোক প্রাপ্ত হয়েন এবং (সেখানে) পরম সত্যদেবকেও দেখিতে পান।
ঋগ্বেদে (১০।৩৫।২) যিনি সুযম সত্য তিনিই মহাভারতে পরম সত্য। সুযম সত্য বা পরম সত্য এই নামদ্বয় তাদৃশ প্রসিদ্ধ নহে, তবে এই দেবতার প্রকৃত নাম কি? ইহার প্রকৃত নাম—নাসত্য। গোলোকে গমন করিলে নাসত্যদেবকে দেখিতে পাওয়া যায়। পুষ্করদ্বীপে (পশ্চিম এসিয়ায়) বৈদিকদেবগণ, হিন্দুযোগ্যনামধারীরাজগণ কর্ত্তৃক পূজিত হইতেন। টেল্ এল-অমর্ণা নামক স্থানের আধুনিক আবিষ্কারে জানা গিয়াছে, ১৬০০ খৃষ্টপূর্ব্বের প্রায় সমকালে মিটানিতে মিত্রাবরুণ, ইন্দ্র এবং নাসত্য দেবের পূজক আর্ত্তসূবর ও আর্ত্ততম নামে দুই রাজা রাজত্ব করিতেন, ইহা পূর্ব্বেই বলিয়াছি। এই দুই রাজা যদি ইরাণীয় হইতেন, তাহা হইলে নাসত্য স্থলে ‘নঙ্ঘত্য‘ বা ‘নাহত্য’ পাওয়া যাইত। ইরাণীয়গণ, ইন্দ্র ও নাসত্যের পূজা করেন না, তাঁহাদিগকে ঘৃণা করেন। তাঁহারা বেরেথ্রঘ্ন (বৃত্রঘ্ন) কে পূজা করেন কিন্তু ইন্দ্র নামে জ্বলিয়া উঠেন। অতএব বিবেচনা হয়, ঐ দুই রাজা ও তাঁহাদের পূর্বপুরুষগণ ভারতের প্রান্ত দেশ হইতে ঐ দেশে গিয়া বসতি করিরাছিলেন।
ইদানীং মেসোপোটেমিয়ায় অনেক আশ্চর্য্য আবিষ্কার হইয়াছে। ওখানে কেবল বাবিলন নহে—অষ্ট সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ অতীত ইতিহাসের ধূলিকণায় মগ্ন হইয়া আছে এবং এখানে দেশব্যাপী বিস্তর ঢিপি বর্ত্তমান আছে। ছয় সহস্র বৎসরের অধিক প্রাচীন ইরিডু নামক নগর, সাহিত্য গ্রন্থ ও গ্রন্থকুটির (Library) জন্য বিশেষ বিখ্যাত ছিল। এখানে এক ভারতীয় যোদ্ধা অশ্বারোহণে যামিকভটতা করিতে করিতে তার (tar) ও খড় দ্বারা আশ্চর্য্যরূপে আবৃত ও সুরক্ষিত এক খণ্ড দগ্ধ মৃত্তিকা প্রাপ্ত হন। উহা একটি জালা। পরীক্ষা করিয়া দেখিবার সময় উহা অশ্বপৃষ্ঠ হইতে পড়িয়া গিয়া দুই খণ্ড হয়। তখন তিনি বিস্মিত হইয়া দেখেন যে ঐ দুই খণ্ডের উপরিভাগে সুন্দর লিপি, তার ও খড় বাঁধার দরুণ সুরক্ষিত রহিয়াছে। খর্পর দুইটি সযত্নে মঞ্জুষাবদ্ধ করিয়া বিলাতী যাদুঘরে প্রেরিত হওয়ায়, বিচক্ষণগণ ঐ যোদ্ধাকে বলিয়া পাঠাইয়াছেন যে উহা অমূল্য দ্রব্য। উহাতে প্রাচীন মানব ইতিহাসের অনেক তথ্য যাহা পৌরাণিক (Mythical) বিবেচিত হইত, তাহার উদ্ঘাটন হইয়াছে।
অগ্রে সুধাঃ পৈজবনের প্রসঙ্গ করিয়াছি। অনুশাসনপর্ব্বে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের মধ্যে “যবন” নামক এক রাজার নাম আছে। এই যবন হইতেছেন বেদোক্ত—পৈজবন। প্রবন্ধান্তরে দেখাইয়াছি, পূর্ব্বোক্ত “পৈজবন” কামন্দক-নীতিসারে “বৈযবন” ও শুক্রনীতিসারে “দ্বৈতবনে” হইয়াছে। আর বেদোক্ত “সুদাঃ পৈজবন” মনুসংহিতায় (৭।৪১) হইয়াছেন—”সুদাসো যাবনিঃ’ এবং অন্যত্র (৮।১০)—
বশিষ্ঠাশ্চাপিশপথং শেপে পৈষবনে নৃপে।
কুল্লুক ভট্টের টীকায়—সুদাসুকে “সুদামন্” করা হইয়াছে সুতরাং ভরত শিরোমণি বঙ্গানুবাদে “সুদাম” করিয়াছেন।
রুম, রুশম ও শ্যাবক আবিষ্কার ঋগ্বেদের ৮।৪।২ ঋগর্দ্ধ এই—
যদ্বা রুমেরুশমে শ্যাবকে কৃপ ইন্দ্র মাদয়সে স চা।
হে ইন্দ্র! যদিও তুমি রুম, রুশম, শ্যাবক ও কৃপদেশবাসিদের সহিত মত্ত হইয়াছিলে।
রুম হইতেছে, ইউরোপীয় টার্কির অন্তর্গত রুমেনিয়া অথবা এসিয়াটিক টার্কি। সে সময়ে রোমরাজ্যের উৎপত্তি হয় নাই। জ্যোতিঃশাস্ত্রে রোমের (Rome) উল্লেখ আছে যথা—
লঙ্কা কুমধ্যে যমকোটিরস্যা প্রাক্।
পশ্চিমে রোমক পত্তনঞ্চ।
পৃথিবীর মধ্যস্থলে (ইকোয়েটারের নিকট) লঙ্কা, ইহার পূর্ব্বে যমকোটি (সম্ভবতঃ আমেরিকা) পশ্চিমে রোমক পত্তন।
রুশম কোথায়? সায়ণ বলেন—“রুশম ইতি কশ্চিজনপদ বিশেষঃ অত্র রুশম শব্দেন তত্রত্যা জনা উচ্যন্তে। রুশমা ঋণঞ্চয় রাজ্ঞঃ কিঙ্করাঃ।” ৮।১৩—১৪ ঋকেও রুশমদিগের ও ৮।৩।২ ঋকেও রুশম, শ্যাবক ও কৃপদিগের উল্লেখ আছে। বিবেচনা হয়, রুশম, বর্ত্তমানে রুশ বা রুশিয়া, আর ঋণঞ্চয় ঐদেশেরই একজন রাজা ছিলেন।
শ্যাবক কোথায়? যাস্ক তাঁহার নিরুক্তে বলিয়াছেন ব এবং ম এই দুই বর্ণের কখন কখন ব্যত্যাস হইয়া থাকে, অতএব শ্যাব বা শ্যাবক হইতেছে শ্যাম বা শ্যামক। শ্যাম বা শ্যামক কোথায়? মুসলমানদের শাস্ত্রে উহার বানান শাম। বর্ত্তমান কালে উহা এসিয়া মাইনর ও এসিয়াটিক্ টার্কি নামে খ্যাত। শাম দেশের উত্তরে কৃষ্ণসাগর বা বাহরে আসওয়াদ ও ইউরোপীয় টার্কি, পূর্ব্বে ইরাণ। পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণে আরবদেশ। সিরিয়া ও প্যালেষ্টাইন এই শাম দেশের অন্তর্গত। এই শামদেশের লোক শ্যামবর্ণ বলিয়া বোধ হয় দেশের নাম শ্যাম বা শ্যাব হইয়াছিল। শামদেশের লোক হরিদ্রা বর্ণ বলিয়া আরবীরা তাহাদিগকে “রসুল আজহর” বলিত। অতএব শ্যাম বলিতে কৃষ্ণবর্ণ নহে, তাহাতেই শ্যামা স্ত্রীকে “তপ্তকাঞ্চন বর্ণাভা” বলা হইয়াছে। যথা—
“শীত কালে ভবেদুষ্ণা গ্রীষ্মেচ সুখশীতলা।
তপ্তকাঞ্চন বর্ণাভা সা স্ত্রী শ্যামেতি কীর্ত্তিতা”॥
সমাপ্ত।
রাঢ়েঽস্মিন্ বণিজাং মহত্ত্বমহসাং সংক্ষেত্রিণাং গৌতম
গোত্রাণামধুনা সুবর্ণবণিগিত্যাখ্যাত নাম্নাং বিশাম্।
আস্তে যঃ কনকাঙ্কুরাখ্যবিরুদ শ্রীমেঘশীলান্বয়ো
গ্রন্থঃ শ্রীশিবচন্দ্র দেববণিজা জাতেন তস্মিন্ কৃতঃ॥
পরিশিষ্ট।
১। ১৫ সূক্ত।
বিষ্ণুর বীর্য্যের কথা কি বলিব
রজোযুত ভূমি চলিলা লীলার
যার গুণ গায় সবে যিনি উরুগায়।[২৫]
খাটো ও মাঝারি দীঘল চরণ
ফেলি, চলি কৈলা, উত্তর সানুরে
স্তম্ভিত, নিরব ভগ্নে বনে পশুগণ। ১
ভয়ঙ্কর হিংস্র গিরিশায়ী মৃগ
প্রায় বীর্য্যে, যারে স্তব করে লোকে
যাঁহার বৃহৎ বিক্রমের পাছে
বিশ্বজন সব করিছে গমন॥ ২
মননীয় স্তোত্রে স্তব কর তাঁর
গিরিশায়ী তিনি ঘোষে লোকে যশ।
যিনি এই দীর্ঘ প্রযত সানুরে
তিন তিন পা ফেলি হৈলা পার। ত
যাঁর মধুময় পৃথু তিন ঠাইএ
অন্ন পানে মত্ত হইতেছে লোকে।
যিনি তিন ধাতু[২৬] পৃথিবী আকাশ
একলা ধরিল এ বিশ্ব ভুবন॥ ৪
দেবাশ্রয়ী নর যে পথে হর্ষিত
সেই প্রিয় পথ আমি সদা চাই।
সে পৃথু বিক্রমী বিষ্ণুপদে আছে
নধুময় উৎস তিনি হন্ বন্ধু॥ ৫
ওহে ইন্দ্র বৄিষ্ণু তোমাদের বাস্তু
অতি রম্যস্থান সেখানে যাইব।
বড় বড় শৃঙ্গ গোগণ যথায়
চরিছে, ভথায় অতীব শোভিছে
সে পরম স্থান, বহু প্রশংসিত
বিষ্ণু যথা বসে যেতে চাই তথা॥ ৬
১। ১৫৫।১
মহাবীর তরে ও বিষ্ণুর তরে
সোমরস পানা করহ সাদরে
ইন্দ্রকে বিষ্ণুকে করহ অর্চ্চনা।
মহাপরাজেয় তাঁহারা পর্ব্বত
সানুতে, দেখহ বিরাজেন যথা
মনোহর আর্বি ঘোড়ার উপরে॥
শেষ কথা।
অগ্রে লিখিত শীল মহাশয়ের প্রবন্ধটি অত্যন্ত দীর্ঘ ছিল বলিয়া প্রবন্ধের শেষভাগ তাঁহাকে সংক্ষেপে পাঠ করিতে হইয়াছিল। তাঁহার প্রবন্ধ পাঠের পর শ্রীযুক্ত লালবিহারী বড়াল মহাশয় শীল মহাশয়ের গবেষণাপূর্ণ প্রবন্ধের ভূয়সী প্রশংসা করিলেন।
অতঃপর শ্রীযুক্ত দীননাথ সেন বি, এ, বি, এল মহাশয় প্রস্তাব করিলেন যে, চুঁচুড়ায় একটি সাহিত্য পরিষৎ স্থাপন করা কর্ত্তব্য। পরিষৎ স্থাপন করিবার জন্য হুগলী চুঁচুড়াবাসী সাহিত্যিকগণকে লইয়া একটি কমিটি গঠিত হউক। ঐ কমিটী ঐ সাহিত্য পরিষৎ চালাইবার জন্য নিয়ম ও প্রণালী গঠন করিবেন।
শ্রীযুক্ত দাশরথি ঘোষ এম, এ, বি, এল মহাশয় ঐ প্রস্তাবটীর সমর্থন করিলে সভাস্থ সকলে উহা গ্রহণ করেন।
উপরোক্ত প্রস্তাবটি প্রস্তাবিত হইবার সময় ইহা স্থির হইয়াছিল যে চুঁচুড়ার সাহিত্য পরিষৎ কলিকাতার “বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে”র হুগলী জেলার শাখারূপে স্থাপিত হইবে।
পরে নিম্নলিখিত মহোদয়গণকে লইয়া সমিতি গঠিত হয়।
১। শ্রীযুক্ত রায় মহেন্দ্রচন্দ্র মিত্র বাহাদুর এম, এ, বি, এল।
২। শ্রীযুক্ত” দীননাথ সেন বি, এ, বি, এল।
৩। শ্রীযুক্ত” ব্রজবল্লভ কাব্যকণ্ঠ যোগবিশারদ।
৪। শ্রীযুক্ত” দাশরথি ঘোষ এম, এ, বি, এল।
৫। শ্রীযুক্ত” বলাইচাঁদ দত্ত বি, এ।
৬। শ্রীযুক্ত” দীননাথ ধর বি, এ, বি, এল, সাহিত্য বিশারদ।
৭। শ্রীযুক্ত” শিবচন্দ্র শীল।
৮। শ্রীযুক্ত” লালবিহারী বড়াল।
৯। শ্রীযুক্ত” গোবর্দ্ধন শীল।
১০। শ্রীযুক্ত” মৌলবী এজাদবক্স এম, এ, বি, এল।
পরিশেষে রায় মহেন্দ্রচন্দ্র মিত্র বাহাদুর, সভাপতি মহাশয়কে এবং বিশেষভাবে শ্রীযুক্ত শিবচন্দ্র শীল মহাশয়কে একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি বলিয়া ঘোষণা করিয়া আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদান করেন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলিয়াছিলেন যে শীল মহাশয় যে এরূপ. একজন বিচক্ষণ প্রত্নতত্ত্ববিৎ পণ্ডিত তাহা আমরা পূর্ব্বে জানিতাম না। আমি তাঁহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ না দিয়া এস্থান হইতে যাইতে পারিতেছি না।
অতঃপর সভা ভঙ্গ হয়।
|
শীলবাটী, চুঁচুড়া |
শ্রীনিতাইচাদ শীল। |
- ↑ ‘সুবর্ণ বণিক্ সমাচার’ ১ম বর্ষ ৩৬৭ পৃষ্ঠা।
- ↑ Asiatic Researches, Vol. VIII. p. 330.
- ↑ যে সময়ে অশ্বমেধ গোমেধ প্রভৃতি যজ্ঞ করিবার রীতি প্রচলিত হয় নাই, সেই প্রাগ্যজ্ঞ কালের অগ্নিময় প্রাকার অর্থাৎ অগ্নিময় প্রাচীরের দৃষ্টান্তে, পরবর্ত্তী যজ্ঞকালে উহার ব্যবহার দেখা যাইতেছে, ঐতরেয় ব্রাহ্মণে (২।২।২)
তথৈবৈতৎ যজমানা যৎ পর্য্যগ্নিকুর্বন্তি}}
সায়ণ ভাষ্য—যথা দেবৈরগ্নি প্রাকারা কৃতাঃ
তথৈবৈদ্যজমানাঃ পর্য্যগ্নিং কুর্বন্তিঅর্থ—পুরাকালে দেবতারা যেরূপ অগ্নির প্রাচীর করিয়াছিলেন, সেইরূপ এই যজমানেরা চারি দিকে অগ্নি করিতেছেন।
- ↑ Jour. Asi, Soci, Ben 1899.
- ↑ আমার এই আবিষ্কার ৩০ বৎসরের পুরাতন। সন ১৩১৭ সালে প্রকাশিত আমার “গৌড়ে সুবর্ণ বণিক্” (১ম সংস্করণ) পুস্তকের অবতরণিকায় ইহার প্রথম পরিচয় দিবার অবসর পাইয়াছিলাম।
- ↑ Epigraphia Indica Vol. II. P. 232.
- ↑ স্বর্গীয় সত্যব্রত সামশ্রমী সামগ অশ্মমতীর পরিচয় এইরূপ দিয়াছেন,—“বোধ হয়, ঋক্সংহিতার ৩য় মণ্ডলে (২৩,৪) এবং মনুসংহিতাদিতে ইহাই ‘দৃশদ্বতি’ বা দৃষদ্বতীর নামে ব্যবহৃত এবং ইহাই ইদানীং দিল্লীর উত্তর পূর্ব্বে প্রবাহিত কাগার বলিয়া প্রসিদ্ধ। স্বর্গীয় রমেশচন্দ্র দত্ত জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, “অশ্মন্বতী নদী কোথায়?
- ↑ উত্তর কালে অশ্মন্বতী নদীর সংস্থান ও উহা পার হওয়ার উদ্দেশ্য লোকে বিস্মৃত হইলে আশ্বলায়ন গৃহ সূত্রে ‘অশ্মন্বতী রীয়তে সংরভধ্বং’' এই অংশটুকু মাত্র ব্যবহৃত হইয়াছে। উহাতে বিনিযোগ করা হইয়াছে যে, বর বিবাহ করিয়া বাড়ী ফিরিবার সময়, পথে নদী প্রাপ্ত হইলে, বন্ধুকে নৌকায় উঠাইবার সময়, ‘অশ্মন্বতী-রীয়তে সংরভধ্বং’ (১।৮।২) এই মন্ত্র পড়িবেন।
- ↑ কশ্মীর দেশে Pass অর্থে ‘সঙ্কট’ শব্দ প্রচলিত আছে।
- ↑ বিষ্ণু, মনুষ্যদেহে বর্ত্তমান থাকিয়া সঙ্কট পথে পদক্ষেপ করিয়াছিলেন। তাঁহাকে যখন দেবতা করা হইল, তখন বিষ্ণু ও সূর্য্য অভিন্ন হইলেন। নিরুক্তকার যাস্ক খৃঃ পূঃ ৫ম শতকে বর্ত্তমান ছিলেন তিনি ঐ ঋকের এইরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন,—
‘যদিদং কিঞ্চ তদ্বিক্রমতে বিষ্ণুঃ ত্রিধা নিধত্তে পদং।
ত্রেধা ভাবায় পৃথিব্যাং অন্তরীক্ষে দিবি ইতি শাকপূণিঃ।
সমারোহণে বিষ্ণুপদে গয়শিরসি ইতি ঔর্ণনাভঃ।”অত্র দুর্গাচার্য্যের ব্যাখ্যা—
“বিষ্ণুরাদিত্যঃ কথমিতি যত আহ ত্রেধা নিধত্তে পদং নিধানং পদৈঃ। ক্ব তৎ তাবৎ। পৃথিব্যাং অন্তরীক্ষে দিবি ইতি শাকপূণিঃ। সমারোহণে বিষ্ণুপদে গয়শিরসি ইতি ঔর্ণনাভঃ। পার্থিবোঽগ্নিত্তভূত্বা পৃথিব্যাং যৎকিঞ্চিদস্তি তদ্বিক্রমতে তদধিভিষ্ঠতি। অন্তরীক্ষে বৈদাতাগ্নিনা। দিবি সূর্য্যাত্মনা যদুক্তং তমু অক্রিন্বন্ ত্রেধা ভুবে কমিতি। সমারোহণে উদয়গিরৌ উদ্যন্ পদমেকং নিধত্তে। বিষ্ণুপদে মধ্যন্দিনেঽন্তরীক্ষে। গল্পশিরস্যস্তংগিয়ৌ ইতি ঔর্ণনাভঃ আচার্য্যো মন্যতে।
স্বর্গীয় ভট্ট মোক্ষ মূলর ঐ মত গ্রহণ করিয়াছেন,—“The stepping of Visnu is emblamatic of the rising the culminating and setting of the sun.”
(রমেশচন্দ্র দত্ত ধৃত)
শাক পুণি আদি আচার্য্যদের ব্যাখ্যার বিরুদ্ধ অর্থ করিয়াছি এটা আমার পক্ষে দুঃসাহসের কার্য্য। বিষ্ণুকে বীর দেবতা (Hero God) স্বীকার করিলে মৎকৃত অর্থ সঙ্গত হইবে।
- ↑ নিরুক্তকার যাস্ক বলেন,—অগ্নি, বায়ু ও সূর্য্য এই তিনটি মাত্র দেবতা। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে ৩৩, নির্ঘণ্টু নামক বৈদিক কোষে ১৪৮টি এবং ঋগ্বেদে ১০ম মণ্ডলের ৫২ সূক্তে, ৯,৩০৩০০ এবং ৩০০০ দেবতার উল্লেখ আছে। মহাভারতে ৩৩,৩৩০০, এবং ৩৩০০০ দেবতা; তাহার পরে তেত্রিশ কোটি দেবতা। নিরুক্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের উল্লেখ নাই।
- ↑ সায়ণ, পরবর্ত্তী ১৬।২ ঋকের “পৃথিব্যা অধিসানবি” হলে ব্যাখ্যা করিয়াছেন— “পৃথিব্যা ভূম্যাঃ অধিসানবি” সমুচ্ছ্রিত দেশে—আর সামশ্রমী উহার অর্থ করিয়াছেন— “পৃথিবীর সমতল ভূমিতে”
- ↑ অত্র সারণ ভাষ্য—“সূরয়ঃ” বিদ্বাংসঃ ঋত্বিগাদয়ঃ বিষ্ণোঃ, সম্বন্ধি, ‘পরমং’, উৎকৃষ্টং তচ্ছাস্ত্র প্রসিদ্ধং, ‘পদ’ স্থানং শাস্ত্রদৃষ্ট্যা,‘সদা’ ‘পশ্যন্তি’। “দিবি” আকাশে যথা “আততম্” সর্ব্বত প্রসূতং চক্ষুর্ব্বিরোধাভাবেন বিশদং পশ্যতি তদ্বৎ।
অত্র রাবণ ভাষ্য—“বিষ্ণোঃ” ব্যাপনশীলস্যাঽপি পরমাত্মনঃ। “তৎপরমং” পরমার্থিকং পদং অভিব্যক্তি স্থানং। “দিবি” মূর্ধ্নি ভ্রূমধ্যে বর্ত্ততে। ত্রিপাদস্যামৃতং দিবীতি শ্রুতেঃ। সত্যজ্ঞানান্দাত্মকং বিষ্ণোঃ পদম্। তৎ কিম্। যৎ “দূরয়ো” মহানুভাবাঃ “চক্ষুরাততম্” বিস্তৃতমির কৃত্বা “সদা” অব্যবধানেন “পশ্যন্তি” নিরন্তরং সাক্ষাৎ কুর্ব্বন্তি। যদ্বা চক্ষুরর্থ প্রকাশকম্। ইব এবকারার্থে। আততমপরিচ্ছিন্নমেব যথাস্যাৎ তথা পশ্যন্তি। - ↑ এই সূক্তের ও ইহার অব্যবহিত পরবর্ত্তী সূক্তের প্রথম ঋকের পদ্যানুবাদ পরিশিষ্টে দ্রষ্টব্য।
- ↑ সায়ণ, এই ‘বাং’ সর্ব্বনাম শব্দের বাচ্য করিরাছেন যজমান ও যজমান পত্নী। যজ্ঞসিদ্ধির নিমিত্ত সারণের ঐরূপ উক্তি কল্পনা মাত্র। যজমান ও যজমান পত্নীর সহিত উহার কোনও সম্পর্ক নাই। Muir বলেন—Here we have rather proof of the fact that in the arrangement of the Veda many verses have been inserted in wrong-places. The verse is addressed to Mitra and Varuna, perhaps belonged to one of the hymns to those two gods which immediately precede this in the Sanhita. The verse has been introduced in to the wrong-place because Vishnu is named in it. (রমেশচন্দ্র ধৃত Saascrit Text.) এই মত ভ্রান্তি মূলক। পরবর্ত্তী সূক্তের দেবতা বিষ্ণু ও ইন্দ্র, উহার বাচ্য। এই ঋকের পুর্ব্ববর্ত্তী ৫টি বিষ্ণু দৈবত ঋক্ ডিঙ্গাইয়া এই ঋকে মিত্র ও বরুণ সম্বোধিত হইতে পারেন না।
- ↑ তথাহি—
এতোন্বিন্দ্রং স্তবামশুদ্ধং শুদ্ধেন সাম্না।
শুদ্ধৈরুক্থৈর্বাবৃধ্বাংসং শুদ্ধৈরাশীর্বান্মমত্তু॥ সামবেদ ৪।২।১১৮ঋষিরা পরস্পর বলিলেন,— শীঘ্র এসো, শুদ্ধ সাম দ্বারা ও শুদ্ধ উক্থ সমূহ দ্বারা ইন্দ্রকে শুদ্ধ করিয়া স্তব করি। শুদ্ধি উৎপাদক স্তোত্র বা ক্রিয়া বিশেষ দ্বারা, গধ্য আদি দ্বারা সংস্কৃত সোম, পাপ রাহিত্য হেতু বর্দ্ধমান ইন্দ্রকে মত্ত করুন।
- ↑ ত্রিশিরাত্বাষ্ট্র, ঋগ্বেদে ১০ম মণ্ডলের ৮।৯ সূক্তের কবি।
- ↑ ঋগ্বেদে মানব চক্ষুর পুত্র—চাক্ষুষ অগ্নি, অগ্নিপাবক, অগ্নিতাপস ও অগ্নিসৌচিক— এই মন্ত্রকার ঋষিগণ ও বনপর্ব্বে ২১৮ অধ্যায়ে বৃহস্পতির পুত্র—অগ্নিশংষু প্রভৃতি প্রসিদ্ধ আছেন।
- ↑ বঙ্গানুবাদিত ঋগ্বেদের ১০০৭ পৃষ্ঠায় ৺দত্ত মহাশয় লিখিয়াছেন— ঋগ্বেদের শচি অর্থে—যজ্ঞ, শচীপতি অর্থে—যজ্ঞপতি। ইন্দ্রকে অনেক স্থলে শচীপতি অর্থাৎ যজ্ঞপতি বলা হইয়াছে, অন্যান্য স্থানে অন্যান্য দেবতাকেও এই বিশেষণ দিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। পৌরাণিক কালে লোকে শচী শব্দের প্রকৃত অর্থ ভুলিয়া গেল এবং ইন্দ্রকে শচীপতি বলে বলিয়া ইন্দ্রের স্ত্রীর নাম শচী বিবেচনা করিল। এইরূপে পৌরাণিক গল্প সৃষ্ট হইয়াছে।” কিন্তু তাহা অন্যান্য দেবতা পক্ষে সঙ্গত হইলেও আমরা ঋগ্বেদে (১।২২। ১২) দেখিতেছি, বরুণানী ও অগ্নায়ীর সহিত ইন্দ্রাণীকে স্বস্তির নিমিত্ত ও সোমপানের জন্য আহ্বান করা হইয়াছে ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের ১৫৯ সূক্তের কবি—শচী পৌলোমী ও ১৪৫ সূক্তের কবি— ইন্দ্রানী।
- ↑ যক্ষ— ধনাধ্যক্ষ। পঞ্জাব অঞ্চলে যক্ নামক একটা জাতি আছে।
- ↑ রাক্ষস—রক্ষিসৈন্য, Palace-guards.
- ↑ স্বর্গীয় তারানাথ তর্কবাচস্পতি, তাহার শব্দত্তোম মহানিধি অভিধানে বনায়ুকে আরব দেশ বলিয়াছেন। ইহা ভ্রান্তিমূলক। প্রবন্ধান্তরে দেখাইয়াছি আরব দেশের বৈদিক নাম—অর্ব। উহার পশ্চিমে লৌহিত্য সাগর (Red Sea)— “রক্ততোয়ো ভীমবেগো লৌহিত্যো নাম সাগরঃ (হরিবংশ পর্বঃ)। বনপর্বেও লোহিত উদধির উল্লেখ আছে। বাচস্পতি মহাশয় আরট্টকেও আরব দেশ বলিয়াছেন। উহাও ভ্রান্তিমূলক, দ্রোণ পর্বের প্রমাণে অন্যত্র দেখাইয়াছি—উহা পঞ্জাবের অংশ বিশেষের নাম।
- ↑ বলা বাহুল্য—এই স্বঃ বা স্বর্গ পূর্ব্বোক্ত পৃথিবীর স্বর্গ নহে।
- ↑ বৃহস্পতি, ঋগ্বেদের (১০৭১—৭২) ঋষি।
- ↑ উরুগায়—বহুলোকে যাঁহার বহু গুণ গান করে, তিনি উরুগায়।
- ↑ তিন ধাতু—অপ, তেজ, মরুং বা স্বর্গ, মর্ত্ত, পাতাল।
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।